আপনি লেখাটি পড়া শুরু করেছেন। অর্থাৎ এই লেখার ‘ক্লিকবেইট’ শিরোনামটি সার্থক। ভাবছেন প্রয়াত আইয়ুব বাচ্চুর নাম নিয়ে এমনটি করা কি উচিত হল? শিরোনামে ভুল নেই, এই লেখার উদ্দেশ্য গল্পের গভীরে ঢুকলেই  সকলের বোধগম্য হবে।

বর্ষার শেষ অনেক আগেই। কিন্তু এই শরৎতেও বর্ষার প্রকোপে আমরা অধৈর্য্য। প্রতিদিন দুপুরের পর চারিদিক থেকে মেঘেরা এসে জড়ো হতে শুরু করে। মর্জি হলে শেষ বিকেলে কিছুক্ষণ বৃষ্টি ঝরিয়ে তারা বিদায় নেয়। এই সময়টায় আমাদের পাহাড়গুলো যেন নবরূপে জেগে উঠে। একদিকে ভেজা ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ, গাঢ় সবুজ বন, জুম পাহাড়ের কচি ধানের শীষ, সাদা তুলোদের ভেসে বেড়ানোর জন্য উজ্জ্বল নীল ক্যানভাস- মথ থেকে প্রজাপতির মত পুরো পাহাড় তার রং রূপ ও খোলস পাল্টাতে থাকে। পাহাড়ের কোনায় বসে চুপচাপ প্রকৃতির এই রূপান্তর চাক্ষুষ করতে পারার চাইতে আনন্দের আর কি হতে পারে?

যাত্রী ছাউনিতে বসে নিজেকে সেদিন এই প্রশ্নটাই করছিলাম। চিংড়ি ঝর্ণা পেড়িয়ে একনাগাড়ে বেশ অনেকখানি খাড়া পথ বেয়ে উঠার পর এই যাত্রী ছাউনিটির অবস্থান। আমার কাছে খুব অবাক লাগে, পাহাড়ের অধিবাসীরা এত চমৎকার সব স্থানে কি করে বিশ্রাম নেবার জায়গা তৈরি করে? খুব খাড়া পথ বেয়ে অনেকখানি চড়াইয়ের পর চারপাশ খোলা, বড় গাছের ছায়াযুক্ত ও সমান জায়গা দেখে তারা বিশ্রাম নেবার জায়গাগুলো তৈরি থাকে। পাড়া থেকে পাড়ার যাত্রাপথে সাধারণত বাঁশ দিয়ে তৈরি একটি বা দুটি বেঞ্চ বানানো থাকে। থ্রুং ভর্তি ভারী মালামাল পিঠে নিয়ে ওঠার সময় এই জায়গাগুলোতে কিছুক্ষণ থেকে বিশ্রাম নেয় স্থানীয়রা। চড়াই উঠতে উঠতে যখন হাঁফ ধরে যায়, মনে হয় আর যাওয়া সম্ভব নয়, পথেই বসে পড়ি, তখনই মরুভূমির বুকে ওয়েসিসের মত বিশ্রামাস্থলগুলো সামনে চলে আসে। 

বগালেক থেকে কেওক্রাডং যাবার পথের এই যাত্রী ছাউনিটির তিনদিক ঘিরে কাঠের বেঞ্চ বানানো আছে। ছাউনিকে ঘিরে দুটি অস্থায়ী টং ঘর দেখতে পেলাম। পাশের খুমি পাড়া বা হারমন পাড়ার লোক মনে হয়। ক্লান্ত যাত্রীদের ক্ষুধা ও তৃষ্ণা মেটাবার জন্য স্থানীয়রা পানি ও ফলমূলের পসরা নিয়ে বসে আছে। জুম থেকে পেড়ে আনা টসটসে মারফা, পাকা পেঁপে ও পাহাড়ি মিষ্টি কলা। আমার কাছে এই ব্যাপারটি ভালই লাগে। স্থানীয় সকল পরিবারকে নিয়ে এমন একটি কমিউনিটি ট্যুরিজমের মডেলের অন্তর্ভুক্ত করে বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারলে কতই না ভাল হত। 

ফালি করে কাটা রসালো একটি মারফা নিয়ে ছাউনির পাশে মাঝারি আকারের কড়ই গাছের ছায়ায় গিয়ে বসলাম। ঝিরিঝিরি বাতাসে ক্লান্ত শরীর জুড়িয়ে যাচ্ছে। ঠিক সামনেই দেখা যাচ্ছে গাঢ় সবুজে ছাওয়া তং মে’র চূড়া। রিজলাইনের উপর গুম্বুজের মত চূড়াটি আমার কাছে কেন যেন সিসটিন চ্যাপেলের মত মনে হয়। একই সাথে বিশাল, সুন্দর, পবিত্র আর রহস্যময়। এর ঠিক নিচের উপত্যকা জুড়ে এবার জুম করা হয়েছে। কচি সবুজ ধানের শীষে পুরো পাহাড় নিজেকে জড়িয়ে রেখেছে। থেমে থেমে বয়ে যাওয়া বাতাস জুমে নৃত্যের ঢেউ তুলছে। একই সাথে চলছে বাতাসের শোঁ শোঁ, বাঁশ পাতার শন শনানি, পাখির কিচিরমিচির, মৌমাছির ভোঁ ভোঁ শব্দের অর্কেস্ট্রা। আমরা কেউ কোন কথা বলছি না। সবাই নিশ্চুপ তন্ময় হয়ে প্রকৃতির এই প্রানবন্ত ও উচ্ছ্বল অডিও ভিজুয়াল প্রেজেন্টেশন উপভোগ করে যাচ্ছি। 

ঠিক সেই সময় নিচের ঢাল থেকে এক যুবক গলায় মুঠো আকৃতির ওয়ারলেস ব্লুটুথ স্পিকার গলায় ঝুলিয়ে উঠে এলেন। তার সাথে সাথে মঞ্চে প্রবেশ করলেন শ্রদ্ধেয় আইয়ুব বাচ্চু। বাতাস কাঁপিয়ে সেই স্পিকার থেকে ভেসে আসছে ছোটবেলার হিট গান,

“অভিলাসী আমি
অভিমানী তুমি
…আর বেশী কাঁদালে উড়াল দেব আকাশে…” 

স্পিকার থেকে ভেসে আসা উচ্চস্বরের গানের তোড়ে এতক্ষণ ধরে জমতে থাকা ভালো লাগার সব অনুভূতিগুলো এক ফুৎকারে উড়ে গেল। সেও আমার মত কেওক্রাডং পানে এগোচ্ছিল, কিন্তু সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছিলেন আইয়ুব বাচ্চুকে। এই গহীনে এসে ব্যাপারটা হতবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম। ব্যাপারটার মধ্যে একরকম উদ্দাম আচরণের ছাপ। শান্ত স্নিগ্ধ প্রকৃতির কথা বাদই দিলাম, সেখানে যে অন্যরাও আছে, আর এহেন কোলাহলের কারণে অন্যদের যে বিরক্তির উদ্রেগ হতে পারে এই বিষয়টুকু তাদের ভাবনাতেই নেই। একবার মনে হল তার কাছে গিয়ে অনুরোধ করি, যেন সে স্পিকারটি বন্ধ করে দেয়। কিন্তু সে একটি দলের সঙ্গে এসেছে, আর তাদের হাবভাব দেখে মনে হল আমাদের সংখ্যালঘুদের অনুরোধকে তারা পাত্তা তো দিবেই না বরং অপমানিত হতে হবে। কপাল খারাপ থাকলে চড় থাপ্পড়ও জুটে যেতে পারে। আর পাহাড়ে এসে এমন একটি অভিজ্ঞতা নেওয়ার কোন ইচ্ছাই ছিল না। তাই নিজেদের রাগ ক্ষোভ হতাশা গুটিয়ে নিয়ে এগিয়ে গেলাম কেওক্রাডংয়ের দিকে।

এমন ঘটনা বোধ করি এখন খুব স্বাভাবিক হয়ে গেছে। শুধু পাহাড়ে নয় নদী-নালা, হাওর-বাওরে, ঈদের সময় পাড়া মহল্লায় এমন উদ্দাম নৃত্য-সঙ্গীতের জলসা আজকাল সব জায়গায় দেখা যায়। প্রথম প্রথম খুব রাগ হত। কিন্তু পরে বুঝতে পেরেছি এদের উপর রাগ করে আসলে কোন লাভ নেই। এরা তো আসলে জানেই না তারা কি হারাচ্ছে। নিশ্চুপ থেকে প্রকৃতির শব্দ শোনার মজাটাই তারা পাচ্ছে না। প্রকৃতির অপার রহস্যের মাঝে তারা ডুব দিতে পারছে না। তখন তাদের অজ্ঞতার জন্য আমার দুঃখবোধ হতে লাগল। 

আনন্দ ফুর্তির সংজ্ঞা একেকজনের কাছে একেকরকম হয়। আমার পাহাড়ে যাবার স্টাইল কারও কাছে খুব বিরক্তিকর, গুরুগম্ভীর মনে হতেই পারে। আমি এটাও বিশ্বাস করি জীবনে সব সময় আনন্দ করতে হবে, সবসময় চিল মুডে থাকতে হবে। এইসব ধ্যান, মেডিটেশন, প্রকৃতির সাথে একাত্বতার মত ভারী ভারী শব্দ কারও ভালো না লাগতেই পারে। কেউ ভাবতেই পারেন অফিসে গাধার মত খাটুনির পর আমি নিজের মত একটু আনন্দ ডিজার্ভ করতেই পারি, নিজের পছন্দের গান শুনে ট্রেক করতেই পারি, এমন খোলামেলা জায়গাতেই তো সব কিছু ভুলে গিয়ে উচ্চস্বরে গান গাইতে ইচ্ছা করে… 

আর এখানেই আমার আপত্তি। এমন নয় যে সঙ্গীত আমি পছন্দ করি না। বরং সুর লয় তালের অনুরণন আমাদের জন্য যে অপরিহার্য এই বিষয়েও আমার কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু আমার আনন্দ উদযাপন যদি অন্যের বিরক্তি বা ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায় তখন সেটা আর গ্রহণযোগ্য থাকে না। কারও নিস্তব্ধতা পছন্দ না হলে, গান শুনে ট্রেক করতে ভালো লাগলে কানে হেডফোন গুঁজে নিলেই তো সব সমস্যার একবারে সমাধান হয়ে যায়। ট্রেইলে নিজের মত গান শোনাও হল আবার অন্যকে বিরক্তও করা হল না। 

আমরা অনেকেই বুঝতে পারি না অ্যাডভেঞ্চার মানে হল নিজেদের কমফোর্ট জোন থেকে বেরিয়ে আসা। উঁচু চূড়া, দূর্গম জলপ্রপাতের মত প্রাকৃতিক পরিবেশে যদি নিজেদের সাথে করে শহুরে কৃত্রিম কোলাহল নিয়ে প্রবেশ করি তাহলে অ্যাডভেঞ্চারটা রইল কোথায় বলুন।

প্রতিটি জায়গার আলাদা কিছু বিশেষত্ব আছে। সব জায়গায় সব ধরনের আচরণ করা যায় না। আমরা যেমন মসজিদ, মন্দির, গির্জায় বা যে কোন প্রার্থনালয়ে গিয়ে হৈচৈ করি না, সম্মান করে চুপচাপ ও শান্ত থাকি, একইভাবে মনে করতে হবে পাহাড়ের মত প্রাকৃতিক জায়গাগুলো কারও কারও জন্য স্রষ্টার সাথে সংযোগের মাধ্যম হতে পারে। তাই আমাদের সবার উচিত এই জায়গাগুলোর প্রতি সম্মান জানিয়ে চুপচাপ তাদের নিসর্গ উপভোগ করা।

6 Comments on “আইয়ুব বাচ্চুর সাথে কেওক্রাডং”

  1. সালেহীন ভাই অনেক দিন পর লিখলেন, এমনিতেই আপনি আমার কাছের মানুষ।

  2. একটা কথা আহমদ সফার উক্তি বলে বেশ প্রচারিত হয়ে আসছে। থিংক গ্লোবালি এন্ড এক্ট লোকালি। পাহাড় কিংবা সমুদ্র অথবা হাওড় কিংবা নিছক নতুন কোন যায়গায় গিয়ে সেখানকার লোকাল টাকে বোঝার মানসিকতা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাতেই হাজির নাই। আমরাই লোকাল নই মেবি। সব সেটেলার। এরোগেন্ট খুব। একবার একটা গ্রুপের সাথে অমিয়াখুং, নাফাখুং হয়ে রেমাক্রিতে অবস্থান নিলাম। রাতে সবাই খেয়ে নদীর পাড়ে ছোট চর মত যায়গায় আড্ডা দিচ্ছি। রাত ১০ টা কি ১১ টা। আড্ডার এক সময় এক পাহাড়ি মাতাল অবস্থায় এসে বললো আমাদের সাথে ছবি তুলতে চায়। সাথে থাকা আপুরা আপত্তি জানালেন। আর আপুদের বয়ফ্রেন্ডরা বীর দর্পে মাতাল এর সাথে বাহাসে জড়িয়ে গেলেন। শেষে আমি গিয়ে মাতালটার সাথে মাতলামি করা শুরু করলাম। তাকে কামডাউন করলাম। কিন্তু আপুদের বয়ফ্রেন্ডরা কিটেজে ফিরে যেতে যেতে আমাকে বোঝাতে চাইলেন লোকটা কি অসভ্য।
    অথচ কি অদ্ভুত বলুন। ওই পাহাড়ি হয়ত প্রতিদিনই মদ খায় এই সময়ে। রাতের ১০ টা মানে ওখানে তখন মধ্যরাত। উনারা এত রাতে উনাদের বাসার পাশে কই কই থেকে যাওয়া আমাদের উৎকট হাসি ঠাট্টার শব্দকে অসহ্য ভাবার কি কোন অধিকার রাখেন না?

    • এটা আমাদের চিন্তাভাবনা সংকীর্ণতা ছাড়া আর কিছুই নয়। আর আপনি ঠিক বলেছেন, পরিবার থেকে শুরু করে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার কোন ধাপেই এই জিনিসগুলোর শেখানোর কোন বন্দোবস্ত নেই। এটা আমাদের দূর্ভাগ্য।

  3. চিংড়ি ঝর্ণা পেড়িয়ে একনাগাড়ে অনেকটা খাড়া পথ বেয়ে উঠার পর সেই যাত্রী ছাউনিটিতে পৌছে আমারও ঠিক এমনটাই মনে হয়েছিলো। আমার কাছেও খুব অবাক লাগছিলো ভাবতে, পাহাড়ের অধিবাসীরা এত চমৎকার সব স্থানে
    কি করে বিশ্রাম নেবার জায়গা তৈরি করে!
    আসলে পাহাড়ের পথে পথে প্রকৃতির নিঃশব্দতার মাঝে ডুব দিতে পারার যে সুখ! যে মন একবার সেই সুখ পেয়েছে, সেই মনই জানে সুখের প্রকৃত অবগাহন কাকে বলে ! একান্তই মনের গহিনের ভাবনা গুলো এমন সুন্দর করে শব্দ মালায় রুপান্তর এর জন্য ধন্যবাদ আপনাকে Salehin Arshady। আপনি বার বার ফিরে আসেন এই না বলা অনুভুতি গুলো নিয়ে আমাদের মাঝে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *