প্রথম অংশ এখানে.
প্রতিবেদনটি আসিফ আলতাফ ও তাসকিন আলী সম্মিলিতভাবে লিখেছেন।


সপ্তম দিন
(বেইজ ক্যাম্প: দিন ১)

একদিন পাণ্ডুরূপা, আর একদিন সেরিতে বেশি থাকার কারণে আমরা পরিকল্পনা থেকে প্রায় ২ দিন পিছিয়ে আছি। তাই আমাদের টার্গেট ছিল আজ যেভাবেই হোক আমাদের বেইজ ক্যাম্প পৌঁছাতে হবে।

সেরি থেকে তিন্তা খুব একটা দূরের পথ না । কিন্তু পুরা পথটাই খাড়া । প্রায় ২-৩ ঘণ্টা লাগল আমাদের তিন্তা পৌঁছাতে। এর মধ্যে ছোট ছোট কিছু ছড়া পার হতে হল। আজ খুব একটা বিপত্তি ঘটল না। আজকের পথ বেশ ভাল ছিল। প্রায় ৪০০০ মিটারের কাছাকাছি হওয়াতে পরিবেশ বেশ রুক্ষ ভাব দেখানো শুরু করল। পুরোটা রাস্তা মোরেইনে ভরা।

বিপদ ঘটল বেইজ ক্যাম্প থেকে অল্প দূরত্বে । আবারও ঝুমঝমিয়ে বৃষ্টি। মাইকেল আর তাসকিন ভাই সবার আগে বেইজ ক্যাম্প পৌঁছে যায়। এর পর আমি এসে পৌঁছাই । কিন্তু বেশ ভারি ব্যাগ এবং তাঁবু আসাদ ভাইয়ের কাছে থাকাতে তাঁর কিছুটা সমস্যা হচ্ছিল । তার উপর বৃষ্টির কারণে তাঁবুর ওজনও অনেক বেড়ে গিয়েছিল। বেইজ ক্যাম্পে একটি দল আমাদের অভ্যর্থনা জানাল। তাঁরা আজ প্রায় ৭ দিন ধরে বেইজ ক্যাম্পে অবস্থান করছে। এ রকম কাক ভেজা অবস্থা ও কনকনে ঠাণ্ডায় তারা আমাদের চা পান করতে দিল। মনে হচ্ছিল আল্লাহ বোধহয় সরাসরি স্বর্গ থেকে পাঠিয়েছে।

আমি, তাসকিন ভাই সাদমান, মাইকেল মিলে দুইটা তাঁবু পিচ করলাম। মনে হচ্ছিল আবহাওয়া আমাদের সাথে মজা করছে। বৃষ্টি কিছুটা কমে আসলো সন্ধ্যার দিকে। রাতে জম্পেশ আড্ডা দিয়ে আমরা শুতে গেলাম। হঠাৎ রাত ১-২ টার দিকে পেট ব্যথায় ঘুম ভেঙ্গে গেল।

সব থেকে মনে রাখার মত ঘটনা ঘটল তাঁবু থেকে বের হওয়ার পর। আকাশ একদম পরিষ্কার। গত ৫-৬ দিন আমরা মোটামুটি একটা ফানেলের মধ্যে ছিলাম। আজ প্রায় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪০০০ মিটার উপরে, আকাশে আজ একফোঁটা মেঘ নেই। কিছুক্ষণ একা একা চেয়ে থাকলাম তারার রাজ্যে। পরে সাদমানকে নিয়ে বের হলাম ছবি তুলার জন্য। আকাশ গঙ্গা খুঁজে পেতে খুব একটা দেরি হল না। আমার পরিকল্পনা ছিল লং এক্সপোজার, টাইম ল্যাপ্স নিব। পরিকল্পনা মোতাবেক ছবি তোলা শুরু করলাম। প্রচণ্ড ঠাণ্ডাতে গ্লাভস খুলে ছবি তুলাটা বেশ চ্যালেঞ্জিং। ঘণ্টা ২ পর বুঝলাম আবার মেঘ আসতে শুরু করেছে, ওইদিনের মত ইস্তফা দিলাম।

অষ্টম দিন
(বেইজ ক্যাম্প: দিন ২)

আমরা প্রায় সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ৪২০০ মিটার উপরে চলে এসেছি । পূর্ব পরিকল্পনা মত বেইজ ক্যাম্পে অতিরিক্ত একদিন থাকার পরিকল্পনা ছিল আমাদের। তাই বলে তো দিনের পর দিন বসে থাকা যায় না। সবাই মিলে গেলাম আইস ক্রাফটের বেসিক বিষয়গুলো ঝালিয়ে নিতে । বেইজ ক্যাম্প থেকে কিছুটা উপরে একটা আইস ওয়ালে আমরা বিভিন্ন আইসে কিভাবে ক্লাইম্বিং করা হয় তার বিভিন্ন উপায় চর্চা করলাম।

আবহাওয়া কিছুটা খারাপ থাকলেও বৃষ্টি ছিল না। ওইদিন বেইজ ক্যাম্পে আমরা একা ছিলাম। সেদিনই সকালে বাকি দুটি দল ফিরতি রাস্তা ধরেছে। আমাদের শুভ কামনা জানিয়ে তারা বিদায় নিল।

সারাদিন আলোছায়ার খেলা দেখলাম। গত পরশু দিনের মত আজকের বিকালটাও ছিল মনে রাখার মত। সাদমান বরাবরের মতন আপন মনে হেডফোন গুজে গান শুনছে, আসাদ ভাই আর তাসকিন ভাই তাঁবুতে আমাদের দুই গাইডের সাথে আড্ডাতে ব্যস্ত, আর আমি ছবি তুলছি। ওই দিকে দেও তিব্বার চূড়া তখন মেঘের আড়ালে, দেখে মনে হচ্ছে সূর্য দেবতা অ্যাপোলোর, জিউসের সাথে বনিবনা না হওয়াতে হয়ত মেঘের আড়ালে লুকিয়ে আছে। কিছুক্ষণের মধ্যে চারিদিকে কুয়াশায় ঢেকে গেল। পশ্চিমের বাতাস জানান দিচ্ছিল তাঁবুতে ঢুকার সময় হয়েছে। সন্ধ্যা ৭ টার মধ্যে আমরা রাতের খাবার খেয়ে নিলাম।

গতকালের থেকে আজকে বাতাসের গতিবেগ অনেক কম। এর মধ্যে সাদমান প্রথমবার এত তারা ভরা আকাশ দেখে নিজেকে সামলে নিতে পারল না। প্লাস্টিক এর ব্যাগ নিয়ে তাঁবুর বাইরে মাটিতে শুয়ে পরল। সবাই চুপচাপ, এক দৃষ্টিতে উপরে তাকিয়ে আকাশের দিকে, মনে হল সময় বুঝি এখানে স্থির, লক্ষ কোটি নক্ষত্র যেন জীবিত হয়ে ঘিরে ধরছে আমাদেরকে। আমরা যেভাবে তাকিয়ে আছি, হয়ত তাদের মধ্যে কোন এক গ্রহে কেও আমাদের মত তাকিয়ে আছে ঠিক একি ভাবে, মহাজগতের বিশালতা এবং তার সত্ত্বাকে উপলব্ধি করার সময় বুঝি এটা।

আকাশ গঙ্গা তার যৌবনের সবটুকু রং ছড়িয়ে চলতে একটুও কার্পণ্য করছে না। মাঝে মধ্যে থেকে থেকে দু একটি তারা হারিয়ে যাচ্ছে গভীর অন্ধকারে। এভাবে কখন যে ঘড়ির কাটা ১ টা পেরিয়ে গিয়েছে টের পাইনি। ২-৩ টা টাইম লাপ্সও নেওয়া হয়ে গিয়েছে। এবার শুতে যাওয়ার পালা। আমাদের পরিকল্পনা মত আগামীকাল আবহাওয়া পরিষ্কার থাকলে আমরা দেও তিব্বার সর্বশেষ কঠিন বাধা, ধুয়াঙ্গন কোল উঠার জন্য রওয়ানা দিব।

নবম দিন 

যতই কাগজে কলমে পরিকল্পনা করে আসি না কেন, পাহাড় তার আপন নিয়মে চলবে। এখানে কারো নিয়ম চলে না। এবারও তার ব্যতিক্রম হয় নি। ভোর বেলা ঘুম থেকে উঠে তাঁবু থেকে মাথা বের করে ধুয়াঙ্গন কোল’র দিকে তাকিয়ে বুঝলাম আজকের দিন আমাদের ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হবে।

ধুয়াঙ্গন কোলের উপরে কাল মেঘ জাকিয়ে বসেছে। তিকাম বলল, দিন যত যাবে সামনে আবহাওয়া আরও খারাপ হতে পারে। আজকের দিনটাও আমাদের বেইজ ক্যাম্পে কাটাতে হবে। অযথা বসে না থেকে আমরা ঠিক করলাম ছোটা চন্দ্রতাল দেখে আসব। কিছুটা রক ক্লাইম্বিংও চর্চা হবে। তাসকিন ভাইয়ের পায়ের ব্যাথা থাকায় সে যেতে চাইল না। অবশেষে সকালের নাস্তা করে, আমি, আসাদ ভাই, সাদমান আর মাইকেল রওনা দিলাম ছোট চন্দ্রতাল দেখতে।

চন্দ্রতাল দেখে ফিরে আসতে আসতে আবার বৃষ্টি হানা দিল। বিকালের দিকে বৃষ্টির রেশ আবার কমে আসলো। ফিরে এসে সবাই মিলে আমরা সিরিয়াস আলোচনায় বসলাম। এভাবে আর কয়দিন বসে থাকব? এদিকে আমাদের রসদ ফুরিয়ে যাচ্ছে দ্রুত। আগামীকাল যদি আবহাওয়া ভাল না হয় তাহলে আমাদের অভিযান এখানেই শেষ, ব্যাপারটা মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু বাস্তবতা এটাই।

শেষ বারের মতন ওইদিন আমি টাইম লাপ্সের কাজটা করে নিলাম, ওইদিন সব ছবি দেও তিব্বাকে ঘিরেই ছিল। ধরেই নিয়েছিলাম হয়ত ওয়েদার ফ্রেমটা আমরা আর পাব না, আমাদের অভিযান এখানেই শেষ, অনেক জল্পনা কল্পনা করতে করতে ওইদিনের মতন সবাই ঘুমিয়ে পরলাম ।

দশম দিন

প্রতিদিনের মত তাসকিন ভাইয়ের পরেই আমার ঘুম ভাঙল। চোখ খুলে মনে হল এখনও আলো ফুটেনি, ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি ৫: ৫০। স্লিপিং ব্যাগ থেকে উঠে বসতেই তাঁবুর হাল্কা নড়াচড়ায় গত রাতে তুষারপাতে জমে থাকা কিছু তুষার ঝরে পড়ল। আমার দেখাদেখি তাসকিন ভাইও জলদি উঠে বের হয়ে আসলো। চারিদিকে সাদা, তার থেকেও বড় কথা উপরে গাঢ় নীল আকাশ দেখা যাচ্ছে।

সবাইকে ডেকে জলদি উঠানো হল। খাওয়া দাওয়া সেরে আমাদের আজকের টার্গেট ধুয়াঙ্গন কোলের দিকে যাত্রা শুরু করলাম। পরিকল্পনা মোতাবেক আমরা উপরে একটা তাঁবু নিয়ে যাব, যতটা হালকাভাবে উপরে উঠা যায়।

তিন দিনের রসদ নিয়ে আমরা রওনা হলাম। বেইজ ক্যাম্প থেকে কিছুটা এগিয়ে পানির উৎস ফেলে কিছুটা সামনে এগিয়ে গেলে গ্লেসিয়ার শুরু। তবে সরাসরি গ্লেসিয়ার ক্রস করতে হয় না দেখে এখান থেকে ক্রাম্পনের খুব একটা দরকার হয় না। যদিও সামনের কিছু জায়গাতে ক্রাম্পন দরকার। গ্লেসিয়ারের শুরুতে ছোট ছোট কিছু ক্রেভাস আছে। মাঝে মাঝে পা পিছলিয়ে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। প্রায় ঘণ্টাখানেক হাঁটার পর দেখি আসাদ ভাই বেশ খানিকটা দূরে। আমরা তার জন্য অপেক্ষা করছিলাম পাথরের উপরে বসে, এর মধ্যে আমাদের এক গাইড তিকামের নাকি হাঁটুতে ব্যথা হচ্ছে, এটা নাকি তার পুরনো ব্যথা। আমরা আসাদ ভাইয়ের জন্য বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর সে যখন কাছে এল তখন জানতে পারলাম একটা ক্রেভাসের কাছে আটকা পড়ে ছিল। আমাদের থেকে খানিকটা দূরে থাকায় এবং পথটা জিগজ্যাগ থাকায় উনি বুঝে উঠতে পারেন নাই। যাই হোক বিপদ ঘটেনি।

আশে পাশে থেকে মেঘ এসে দেও তিব্বাকে আমাদের চোখের আড়ালে নিয়ে যাচ্ছিল। ধুয়াঙ্গন কোলের বেইজে এসে পৌঁছাতে আমাদের প্রায় তিন ঘণ্টা লেগে গিয়েছিল। ঘাড় বাঁকা করে উপরে তাকালে, দেখে রীতিমত ভয় লাগছিল, অনেকটা ‘নর্থ ওয়ালে’র মতন। যারা ‘গেম অফ থ্রনস’ সিরিজটা দেখেন তারা বুঝতে পারবেন। প্রথম দিকে একেবারে লুজ রক, আমাদের আগের টিমের রেখে যাওয়া রোপ ব্যবহার করে আস্তে আস্তে সামনে আগাতে থাকলাম। যতটা উপরে উঠছিলাম রক ক্লাইম্বিং ততটা কঠিন হয়ে আসছিল।

পুরাটা রাস্তা আমাদের ছোট ছোট সেকশনে ভাগ করে পার করতে হচ্ছিল। সামনের টিমে তিকাম রোপ ফিক্স করছিল (পুরান রোপ খুলে ফেলছিল যেন কেও ভুল করে এইগুলা না ধরে) তার সাথে সাদমান আর আমি, পিছনের দলে মাইকেল, আসাদ ভাই আর তাসকিন ভাই, প্রায় পুরাটা রাস্তা রক ফল জোন বললে ভুল হবে না । একটা সেকশন এক টিম পুরা পার না হয়ে আরেক টিম উপরে আসা শুরু করতে পারছিল না। এর মধ্যে থেকে থেকে হোয়াইট আউট হয়ে গেলে কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছিল, আসাদ ভাই ছাড়া বাকি সবার এই প্রথমবার ‘স্নো বুট’ পরে এত লম্বা ট্রেক, তার সাথে ১৫ কেজির ব্যাকপ্যাক তো আছেই, তবে সব থেকে কঠিন রাস্তা অপেক্ষা করছিল শেষ ১০০-১৫০ ফিট। শেষ রক ফেসটা প্রায় ৭০-৮০ ডিগ্রী খাড়া। আর একটা বড় বাধা হচ্ছে একটা জায়গায় একটা বড় বোল্ডের পার হতে হয় যেখানে নিচের রোপ শেষ, সামনের রোপ বোল্ডের পার হয়ে তারপর নাগালের মধ্যে আসবে। সবার চেহারা দেখে বুঝা যাচ্ছিল কার কত টা খারাপ অবস্থা, সব বাধা শেষ করে যখন ধুয়াঙ্গন কোলের উপরে তখন ভেতরে ভেতরে একটা নিস্তব্ধতা অনুভব করছিলাম।

খুব বেশি দূর দেখা যাচ্ছিল না, যতটুকু দেখা যাচ্ছিল পুরাটা সাদা, এ যেন এক ভিন্ন জগত, একদম নীরব, শান্ত ছবির মতন, পিছনে রুক্ষ্ন পাথুরে পরিবেশ ঠিক উপরেই সব সাদা বরফে ঢাকা। মাইকেল হাতের ইশারাতে দেখাচ্ছিল সামনের পাহারের রেঞ্জ কোনটা কোথাকার, স্পিতির একটা রেঞ্জও চোখে পড়ল, সামনে যতগুলো পিক দেখা যাচ্ছে তার প্রায় সবই এখনও আনক্লাইম্বড। প্রায় সব গুলতে টেকনিক্যাল রক ক্লাম্বিংয়ে দক্ষ হওয়া জরুরি। আমরা প্রায় ৮ ঘণ্টা ট্রেক করে ২৫০০-২৬০০ ফিট উপরে উঠে এসেছি। বিকালে বাতাসের বেগ ও বেরে যাচ্ছিল সময়ের সাথে। আজ আর দেও তিব্বাকে দেখা যাচ্ছে না। খুব দ্রুত আমরা তাঁবু পিচ করলাম, মাইকেল পানির ব্যবস্থা করতে বেরিয়ে পরল। আমরা সবাই রান্নাতে সাহায্য করতে লাগলাম। আজকে আমরা ৪ জনের তাঁবু তে ৬ জন। কোনমতে মাথাটা রেখে স্লিপিং ব্যাগে শুয়ে পড়লাম।

একাদশ দিন

সকাল ৭ টার মধ্যে ঘুম ভেঙ্গে গেল সবার। তাঁবু থেকে বেড়িয়ে দেখি চমৎকার আবহাওয়া। উপরে অল্প কিছু মেঘ আছে। আজকে সামনের চূড়াগুলা আরও পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। দেও তিব্বা’র গায়ে সোনালি রোদের ছোঁয়ায় শুভ্র বরফ ঝিকিমিকি করছে। দূরের বেইজ ক্যাম্প দেখা যাচ্ছে ছোট একটা বিন্দুর মত। আবহাওয়া পরিষ্কার থাকায় সবার এগিয়ে যাওয়ার মতামত থাকলেও বাধা দিল আমাদের গাইড তিকাম।

সামনের পথের অবস্থা জেনে নিতে আরেকজন গাইড মাইকেলকে আমরা আগেই সামনে পাঠিয়েছিলাম। সে ফিরে এসে বলল ফ্রেশ স্নো খুব বেশি হলে ২-৩ ইঞ্চি হবে, তাতেই তিকাম সামনে যেতে রাজি না। তার মতে ক্রেভাসগুলা তুষারে ঢেকে গেছে, ফিক্সড রোপ ছাড়া সামনে এগুনো ঠিক হবে না। কিন্তু আমাদের পরিকল্পনা ছিল, কোন ফিক্সড রোপ হবে না। আমরা কেবল নিজেরা রোপ আপ হয়ে সামনে এগিয়ে যাব। এটা নিয়ে তাঁর সাথে অনেকক্ষণ বনিবনা করার চেষ্টা হল। সে কোন ভাবেই ঝুঁকি নিতে রাজি নয়। আসাদ ভাই অথবা আমার এই বিষয়ে খুব বেশি অভিজ্ঞতা না থাকায়, দলের নিরাপত্তার বিষয়টাকে প্রাধান্য দিয়ে আসাদ ভাই আমাদের অভিযানের সমাপ্তি টানলেন।

ব্যাপারটা আমরা কেউ মেনে নিতে পারছিলাম না। দেও তিব্বা’র এত কাছে এসে ধুয়াঙ্গন কোল উঠার পর আমাদের এভাবে ফেরত আসতে হবে? কিন্তু ঐ মুহূর্তে কিছু করার ছিল না। বারবার একটা জিনিস মনে হচ্ছিল, বিগত ২-৩ মাস ধরে এত পরিকল্পনা, গত ৯-১০ দিনের এত কষ্টের পর এভাবে ফেরত যেতে হবে। কারও শারীরিক সমস্যা হলে হয়ত মনকে মানিয়ে নেওয়া যেত। সকালে অক্সিজেন লেবেল যখন পরীক্ষা করা হল সবারই স্যাচুরেশন ৮০-৮৪ এর ঘরে ছিল, সবাই ছিলাম ফিট।

গত রাতে আমরা ৫০০০ মিটারের উপরে ঘুমিয়েছি। কারও কোন ধরনের সমস্যা হয়নি। আমরা নিজেদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। তারপরও কিছু কথা শেষে থেকে যায়, যেটা একান্ত পাহাড়ের ব্যক্তিগত। হয়ত দেও তিব্বা চায় না, এইবার আমরা তাঁর শৃঙ্গ আরোহণ করি। গত জুন মাসের পর দেও তিব্বায় কোন অভিযান সফলতার মুখ দেখে নি।

যাই হোক এবার বাড়ি ফেরার পালা। অনেকদিন আপন মানুষগুলার সাথে কথা হয় না। এই ভেবে মনটাকে একটু হালকা করার চেষ্টা করছিলাম। সব কিছু গুছিয়ে যখন নামার প্রস্তুতি চলছিল, আবার মেঘে ঢেকে গেল চারিদিক। আবার আমরা দুই টিমে ভাগ হয়ে নিচে নামতে শুরু করলাম। প্রথমে আমি, সাদমান আর মাইকেল। পিছনে আসাদ ভাই, তাসকিন ভাইয়ের সাথে তিকাম। নামার সময় তাসকিন ভাইয়ের হাঁটুতে ব্যথা হচ্ছিল। তাই তারা আস্তে ধীরে পেছন পেছন নামছিল। একটা পর্যায়ে ধুয়াঙ্গন কোল থেকে প্রায় নেমে এসেছি, এমন সময় শুরু হল শিলা বৃষ্টি।

গ্লেসিয়ার পার হওয়ার সময় বেশ কষ্ট হচ্ছিল। ১০-১৫ হাত সামনে কিছু দেখা যাচ্ছিল না আর বোনাস হিসাবে ঝড়ছিল শিলা। বেইজ ক্যাম্পের কাছে যখন ফিরে আসলাম দেখলাম আমাদের পিছনে থাকা বাংলাদেশী টিমটির ক্যাম্প। তারা আমাদের বেশ আপ্যায়ন করল। তাঁদের ওখানে খাওয়া দাওয়া সেরে আমাদের তাঁবুর কাছে যখন এলাম তখন বেইজ ক্যাম্পে মেলা মেলা পরিবেশ। এত তাঁবুর ভিড়ে নিজেদের তাঁবু খুঁজে পেতে সমস্যা হচ্ছিল।

এন সি সি’র একটা মেয়েদের টিম এসেছে দেও তিব্বা অভিযানে। তাঁদের বিশাল ব্যাপারস্যাপার। স্লিপ্পিং তাঁবু, কিচেন তাঁবু, ডাইনিং তাঁবু, যোগাযোগের জন্য আরেকটি তাঁবু, ২০ জন ক্যাডেট, গাইড, কুক, হেল্পার সব মিলয়ে তাদের ৩০-৩৫ জনের টিম। ওইদিন দুপুর থেকে শুরু হল একটানা তুমুল শিলা বৃষ্টি। দুপুরটা তাঁবুতে বসে কাটিয়ে দিতে হল। সন্ধ্যে বেলা সবাই খাওয়া-দাওয়া শেষে খুব একটা রাত জাগা হল না। পরের দিন সকালে ঘরে ফেরার পালা।

দ্বাদশ দিন

সকালে ঘুম ভেঙ্গে বেড়িয়ে দেখি চারিদিকে সব সাদা। প্রায় ৭-৮ ইঞ্চি স্নোফল হয়েছে রাতে। এনসিসি টিমের সবাই তুষার নিয়ে খেলা করছে। আমরাও তাঁদের সাথে যোগ দিলাম। তিকামেরর ভাষ্য মতে আমাদের নেমে আসাটা খুব ভাল সিদ্ধান্ত ছিল। না হলে আর সামনে এগিয়ে গেলে বিপদে পড়তে হত। তখন মনে হচ্ছিল সবই হয়ত অথবা হতে পারত। কিন্তু বাস্তবতা হল হয়নি। সব কিছু গুছিয়ে আমরা যখন রওনা দিব তখন এনসিসির সবাই আমাদের বিদায় জানাচ্ছিল। তাঁদের অভিযানের দলপতি করমর্দনের সময় বলল ‘Mountain will remain here as it is. Better luck next time.’ পিছনে ফিরে দেও তিব্বা’র দিকে তাকিয়ে মনে মনে বললাম, ‘হয়তবা, কোন একদিন…।’


দল/প্রতিনিধিত্ব: টিম হোয়াইট এক্স
সদস্য: আসাদ জামান( দলনেতা), তাস্কিন আলী, আসিফ আলতাফ, সাদমান সাকিব।

১লা সেপ্টেম্বর , ২০১৮ মানালি থেকে টিম হোয়াইট এক্স’র ৪ সদস্য চিকা র উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। প্রথম দিন চিকা, পরেরদিন সেরিতে ক্যাম্প করার কথা থাকলেও আবহাওয়া খারাপ থাকার কারণে দলটি পান্দুরুপাতে ক্যাম্প করতে বাধ্য হয়। পরদিন তারা সেরি তে পৌঁছে ২ দিন সেরি তে অবস্থান করে আবহাওয়া উন্নতি হওয়ার অপেক্ষা করে। কিন্তু অবস্থার উন্নতি না দেখে তারা এ অবস্থাতেই বেইজ ক্যাম্প পর্যন্ত যায়। বৈরি আবহাওয়ার কারনে বেইজ ক্যাম্পে আরও দুই দিন অপেক্ষা করতে বাধ্য হয় । অবশেষে সপ্তম দিন সকালে আবহাওয়া কিছুটা ভাল হলে তারা ধুয়াঙ্গন কল এর দিকে এগিয়ে যায়। ঐদিন তারা সমূদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫২০০ মিটার উচ্চতায় ধুয়াঙ্গন কল এ পৌঁছাতে সক্ষম হয়। কিন্তু বিগত কিছুদিনের বৃষ্টিপাত ও তুষারঝরের কারণে ধুয়াঙ্গনের উপরে ক্রেভাসগুলো ফ্রেশ স্নো তে ঢেকে গিয়েছিল । অবশেষে দলনেতার সম্মতিতে অভিযান ওখানেই সমাপ্তি টানা হয়। পরের দিন তারা ধুয়াঙ্গন কল থেকে বেইজক্যাম্পে ফিরে আসে।


(Visited 1 times, 1 visits today)

Leave A Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *