আমাদের ক্যাম্পিং গিয়ার্সের মধ্যে তাঁবুই বোধ হয় সবচাইতে অবহেলিত। ট্রিপ আসলেই ব্যাকপ্যাকে তাঁবু নিয়ে চলে যাই। দুই তিনদিন মজা করে ক্যাম্প করে তাবু গুটিয়ে আবার বাসায় এনে জায়গামত রেখে দেই। সময় সময়ে গায়ের জামা কাপড়, পায়ের জুতো পরিষ্কার করা হলেও তাঁবু বেচারা কোন পরিচর্যাই পায় না। ফলশ্রুতিতে তাঁবুর কার্যক্ষমতা কমতে থাকে। যেই তাঁবু দিয়ে অনায়াসে চার পাঁচ বছর কাটিয়ে দেয়া যেত সেটা এক দুই বছরেই শেষ হয়ে যায়।

ময়লা জমতে জমতে তাঁবুর উপরের ওয়াটারপ্রুফ কোটিং ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্থ হতে থাকে। এছাড়া ক্যাম্পিংয়ের সময় মাটি বালি কাদা তাঁবুর পোলের ভিতর ঢুকে যায়, এভাবে আলুমিনাম পোলগুলো ক্ষতিগ্রস্থ হতে থাকে, একসময় জ্যাম হয়ে যায়। তাঁবুর চেইনের মাঝে ময়লা জমতে জমতে একসময় আঁটকে যায়। মাঝে মাঝে তাই হায়াত বাড়ানোর জন্য তাঁবুর পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার দরকার হয়। সাবান পানিতে ধুলে সারফেস টেনশন কমে গিয়ে ময়লাগুলো সহজেই বের হয়ে আসে। নিয়মিত পরিষ্কার করলে একটু ভালোমানের তাঁবু চোখ বন্ধ করে চার পাঁচ বা আরও বেশী বছর আপনাকে একই রকম সার্ভিস দিয়ে যাবে। 

অন্যান্য জামা কাপড় আমরা যেভাবে ধুই, অর্থাৎ ডিটার্জেন্ট গুলানো পানিতে কয়েক ঘন্টা ভিজিয়ে রেখে জোরে জোরে কচলিয়ে ময়লা তোলা বা ওয়াশিং মেশিনে দিয়ে দেয়া, তাঁবু বা পানিরোধী প্রলেপ আছে এমন কোন কিছু সেভাবে ধুতে পারব না। তাঁবু ধোয়ার জন্য নিচের পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করলে ভালো ফল পাওয়া যাবে। 

[১] তাঁবুর জন্য আমরা সাধারণ ডিটারজেন্ট বা কাপড় ধোয়ার সাবান ব্যবহার করতে পারব না। এতে কিন্তু হিতে বিপরীত হয়ে যাবে। তাঁবুর মত ওয়াটার প্রুফ ফেব্রিক ধোয়ার জন্য আমাদের যতটা সম্ভব পিএইচ নিউট্রাল সাবান দরকার। এর সবচেয়ে ভালো সোর্স হচ্ছে ডাভ শ্যাম্পু। এছাড়া রান্না ঘরে রাখা থালা বাসন ধোয়ার লিকুইড সোপ ও ব্যবহার করা যেতে পারে। লিকুইড সোপগুলোর পিএইচ সাধারণত নিউট্রাল হয়। কোন কিছু না থাকলে বাচ্চাদের বেবি শ্যাম্পু ব্যবহার করা যেতে পারে। 

[২] তাঁবুটিকে আবার কষ্ট করে একটু পিচ করবেন। দরজারগুলো পুরোপুরি খুলে ভিতরে থাকা ধুলোবালি মাটি, কাগজ, টিস্যুর টুকরো, চকলেটের খোসা উপুড় করে ঝেরে ফেলবেন। তাবুর ভিতরে থাকা পকেটগুলো ভালোভাবে পরিষ্কার করবেন। এরপর পোলগুলো খুলে ফেলে যেপাশ মাটিতে থাকে সেগুলোর ভিতর ছোট কাঠি দিয়ে খুচিয়ে জমে থাকা ময়লাগুলো বের করে ফেলবেন। এরপর একটি বালতিতে পানি নিয়ে পোলের প্রান্তগুলো শুধু (পুরো পোল না কিন্তু) পানিতে চুবিয়ে নাড়াচাড়া করে ঝেরে ফেলে বাতাসে রেখে শুকিয়ে ফেলবেন। এই পানি দিয়ে পেগগুলোও ধুয়ে ফেলুন। 

[৩] তাঁবুর বডি আর রেইন ফ্লাইইার একটি বড় বোল বা বালতিতে নিয়ে তাতে বেশী করে পানি নিয়ে নিবেন। রান্না ঘর থেকে মেরে দেয়া লিকুইড সোপ পরিমানমত ঢেলে দিবেন। এরপর সবকিছু একসাথে হালকা করে মিক্স করতে হবে। যেই জায়গাগুলোতে বেশী ময়লা জমে গেছে সেখানে আলাদাভাবে একটু লিকুইড সোপ নিয়ে ফোম বা আলাদা কাপড় দিয়ে হালকা করে ডলে পরিষ্কার করে ফেলতে হবে। এরপর তাঁবু পানির উপরে তুলবেন আর চুবাবেন। বেশ কয়েকবার এই প্রক্রিয়া পুনরাবৃত্তি করবেন। সাবান পানি তাঁবুর সমস্ত ফেব্রিকে গেছে কিনা সেটি নিশ্চিত করতে হবে। এরপর আধা ঘন্টার জন্য রেখে দিন। 

ট্রেকিংয়ে হাতেখড়ি বইটি সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন

[৪] আধা ঘন্টা পর তাঁবু উঠিয়ে দেখুন পানির রঙ নোংরা হয়েছে কিনা। নোংরা হলে সেই পানি ফেলে দিন। তাঁবুকে ঝুলিয়ে রেখে পানি ঝরতে দিন। পানি ঝরে গেলে বালতিতে পরিষ্কার পানি নিয়ে আবার তাঁবুকে কয়েকবার চুবান। নোংরা পানি বা সাবানের ভাব না যাওয়া পর্যন্ত এই প্রক্রিয়াটি দুই তিনবার পুনরাবৃত্তি করুন।। 

[৫] ধোয়ার পর এবার শুকানোর পালা। ভুলেও ভেজা তাঁবু রোদে রেখে শুকাবেন না। ছায়ায় রেখে বাতাসে রেখে শুকাতে হবে। এখানে কিছু বিষয় আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। পানি ঝরানোর সময় অন্যান্য কাপড়ের মত তাঁবু মোচড়ানো উচিত না। এতে ফেব্রিকের উপরে লেয়ার আর সিম সিলেন্টগুলো ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে। চিকন তারের উপর ঝুলিয়ে শুকানোও উচিত না। তাঁবুর ফেব্রিকের ভারে চিকন জায়গাটার উপর অনেক বেশী চাপ পড়ে, ঐ জায়গাটায় দাগ বসে যেতে পারে, লেয়ারও নষ্ট হতে পারে। আবার দুই কোনায় ক্লিপ লাগিয়ে ঝুলিয়ে রাখলে ফেব্রিকের প্রেশারে কোনা দুটি দুর্বল হয়ে যায়। তাই সবচেয়ে ভালো উপায় হল ফ্লোরে ভেজা তাঁবুটা বিছিয়ে দিয়ে ফ্যান ছেড়ে দেয়া। 

[৬] ভালোভাবে না শুকিয়ে তাঁবু প্যাক করা উচিত না। একটু ভেজা ভেজা ভাব থাকা অবস্থা রেখে দিলেও তাতে ছত্রাক আক্রমণ করতে পারে। তাই তাঁবু ধোয়ার পর একেবারে কড়কড়াভাবে শুকাতে হবে। আমি তিনচার দিন এমনি ফ্যানের নিচে রেখে দেই। এই ব্যাপারে তাড়াহুড়ো না করাই ভালো। 

এটা এক্সট্রা টিপস- 

 তাঁবুর জন্য আমরা সবাই একটা কম্প্রেশন স্যাক ব্যবহার করি। তাবু সেটার মধ্যে একদম টাইট করে রোল করে রাখি। এভাবে তাঁবু ক্যারি করতে খুব সুবিধা হয়। কিন্তু বাসায় ফিরে আসার পর তাঁবুকে এভাবেই রেখে দেয়া ঠিক না। কম্প্রেশন স্যাক থেকে বের করে হালকাভাবে বডি ও ফ্লাইয়ার আলাদাভাবে হালকা করে ভাঁজ করে রাখলে খুব ভালো হয়। এতে ফেব্রিক ব্রিদ করতে পারে। এই রকম ফ্রেবিকগুলো কখনোই কম্প্রেসেড বা চেপে আছে এমন অবস্থায় দীর্ঘদিন ফেলে রাখলে কার্যক্ষমতা কমে যায়। 

এইভাবে তাঁবুর যত্ন নিলে ভালোমানের একটি তাঁবু আপনাকে দীর্ঘদিন ধরে সার্ভিস দিয়ে যাবে। দীর্ঘ মেয়াদের কথা চিন্তা করে যেই তাঁবুটি কিনেছিলেন তখনই তার পয়সা উসুল হবে।

আরও পড়ুন: ট্রেকিং পোলের উপকারিতা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *