বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর পর ১৯৭৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বায়ত্তশাসনের দাবি আদায়ের লক্ষে শান্তি বাহিনী বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর সাথে সশস্ত্র সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। সংঘাত চলেছিল প্রায় বিশ বছর। চারিদিকে যুদ্ধাবস্থা, খানা তল্লাশি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, পারস্পরিক অবিশ্বাস, চোরাগোপ্তা হামলা, অপহরণের আশংকা সব মিলিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম সেই সময় পুরোপুরি রুদ্ধ অবস্থায় ছিল।

সংঘাত চলাকালীন প্রশাসন ও সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাড়া সমতল থেকে খুব কম মানুষই এই অঞ্চলগুলোতে পরিভ্রমণ করেছেন। মূলত ১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তির পরপরই সমতলে বাস করা মানুষের মধ্যে অচেনা, অজানা, দূর্গম, রহস্যময় ও দীর্ঘদিন রুদ্ধ থাকা বিশাল এই পাহাড়ি এলাকা সম্পর্কে কৌতূহল বাড়তে থাকে।

একই সময়ে ঘুরাঘুরিকে প্রাতিষ্ঠানিক রুপ দেয়ার লক্ষ্যে সমমনা কয়েকজন সংগঠিত হওয়া শুরু করেন। একে একে গঠিত হয় মাউন্টেইন ট্রেকার্স ক্লাব, এক্সপ্লোরার ক্লাব অব বাংলাদেশ, অ্যাডভেঞ্চার অফ বাংলাদেশ, বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল এসোসিয়েশন, নেচার অ্যাডভেঞ্চার ক্লাব, ডি-ওয়ে এক্সপেডিটরস প্রমুখ। এছাড়াও অনেকেই ছিলেন যারা বন্ধু বান্ধব মিলে নিজেদের মত পাহাড়ি অঞ্চল চষে বেড়িয়েছেন।

নতুন একটি ভৌগলিক অঞ্চলের দ্বার উন্মোচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে সমতলের তরুণরাই সবার আগে আকৃষ্ট হল। বিশেষ করে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা এই বিষয়ে অগ্রগামী ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘পরিব্রাজক’, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের ট্রেকার গ্রুপ, বুয়েটের ছাত্রদের নাম এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়।

১৯৯৮ সালের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চূড়া হিসেবে কেওক্রাডংকেই স্বীকৃতি দেওয়া হত। পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকার থেকে পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে ভৌগলিক সার্ভের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বাংলাদেশ সার্ভে ডিপার্টমেন্ট ফটোগ্রামাটিক সার্ভে করে বের করে কেওক্রাডং নয় থানচি উপজেলার কাছের আরেকটি চূড়া কেওক্রাডং থেকেও উঁচু,  যার স্থানীয় নাম তাজিং ডং। সরকারীভাবে পরে এই চূড়াটির নাম দেওয়া হয় ‘বিজয়’।

সর্বোচ্চ চূড়া নিয়ে দ্বিধা ও আমাদের পাহাড়গুলোতে সেই সময়ের অভিযাত্রাগুলো কেমন ছিল তা অভিযাত্রী মারুফ বিন আলমের লেখা ‘ফিরে দেখা: আমার প্রথম কেওক্রাডং অভিযান’ প্রতিবেদনটি পড়লে অনেকখানি আঁচ করা যাবে।

১৯৯৭ থেকে শুরু করে ২০০৩/০৪ পর্যন্ত সংগঠনের সাথে ও স্বতন্ত্র ভাবে অনেকেই রুমা বাজার, বগালেক, কেওক্রাডং ও তদসংলগ্ন অঞ্চল, রোয়াংছড়ি, রাইক্ষিয়াং উপত্যকা, তিনমাথা, এদিকে থানচি, বড় মোদক অঞ্চলের নানা জায়গা ঘুরে আসতে লাগল। তাদের মধ্যেই কয়েকজনের মধ্যে ঘুরাঘুরির সাথে সাথে এই অচেনা জায়গায় ভৌগলিক অনুন্ধানের আগ্রহ তৈরি হল। বাংলাদেশের ভৌগলিক সীমায় অবস্থিত চূড়াগুলো চিহ্নিত করা, পথের সন্ধান করে চূড়াগুলোর উচ্চতা পরিমাপ করা, জলপ্রপাতগুলোর স্থান চিহ্নিত করার মত কাজে তারা আত্মনিয়োগ করল। অনেকেই বুঝতে পারছিলেন তাজিংডং কোনভাবেই কেওক্রাডং থেকে উঁচু হবে না, এমনকি কেওক্রাডং থেকেও উঁচু চূড়া বাংলাদেশে থাকতে পারে। এই ভেবে শুরু হল অনেকের অনুসন্ধানী অভিযান।

এমন অনেকের মধ্যে একজন হচ্ছেন ঢাকার আজিমপুরের ‘আমাদের পাঠচক্র’র সঞ্চালক ও ভ্রমণ বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য গোলাম কিবরিয়া দীপু। তারা কয়েকজন এয়ারফোর্স, বাংলাদেশ আর্মির গোপনীয় মানচিত্র ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগে রাখা নথি ঘেটে ২০০১ সালের দিকে খুঁজে পেয়েছিলেন, কেওক্রাডং বা তাজিং ডং নয়- বাংলাদেশ মায়ানমার সীমান্তের বড় মোদক অঞ্চলেই রয়েছে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চূড়া। কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত এই অঞ্চলে তারা অভিযানে যেতে পারেন নি। [হলুদ পা হরিয়ালের খোঁজে, হাসান তারিক। পরিযায়ী প্রকাশনী। প্রকাশকাল ২০০২। পৃষ্ঠা-১১]

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের একটি দল ২০০৫ সালে মোদক অঞ্চলের দলিয়ান পাড়ায় ‘মোদক মুয়াল’ চূড়াটি রেকি করে আসেন। তাদের ধারণা ছিল এটিই বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চূড়া। এই দলে ছিলেন সুব্রত দাস নীতিশ ও ডাক্তার বিজয় শঙ্কর কর।

২০০৬ সালের সেপ্টেম্বরে নেচার অ্যাডভেঞ্চার ক্লাবের সদস্য সাজ্জাদ হোসেন উইকিপিডিয়ায় তথ্য পান বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চূড়া হিসেবে সেখানে মোদক মুয়াল নামে একটি চূড়ার কথা লিখা আছে। আরও আশ্চর্যের বিষয় হল একজন বিদেশী নাগরিক মাত্র চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে এই চূড়ায় আরোহণ করেছেন। এইটুকু তথ্য পেয়েই তারা অভিযানে যাবার জন্য তৈরি হতে লাগলেন।

পরের বছর (২০০৭) অক্টোবরের ঈদ উল ফিতরের বন্ধে তারা থানচি দিয়ে অভিযানে আবার সিদ্ধান্ত নিল। কিন্তু ভাগ্য তাদের সহায় ছিল না। প্রচুর বৃষ্টি ও ধসের কারণে তাদের তিন দিন থানচিতেই আটকে থাকতে হয়। থানচি থেকেই দলটি ফেরত আসতে বাধ্য হয়। এসময় তাদের সাথে নীতিশদের দেখা হয়। সেখানে নীতিশদের কাছে খবর পান মোদকের দলিয়ান পাড়ার কাছে মোদক মুয়াল চূড়াটি তারা সামিট করে এসেছেন। তাদের মতে এটিই বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চূড়া।

একই ছুটিতে বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল এসোসিয়েশনের তিন সদস্যের একটি দল রুমার কেওক্রাডং হয়ে তাজিং ডং আরোহণ করে থানচি দিয়ে বের হওয়ার অভিযানে ছিল। এই দলে ছিলেন মশহুরুল আমিন, নুর মোহাম্মদ ও সনেট। ১৯ অক্টোবর বগালেক থেকে যাত্রা শুরু করে তারা কেওক্রাডং হতে বাকতলাই পৌঁছান। ২০ অক্টোবর পাড়ার কারবারি লালরাম বম তাদের অবাক করা একটি গল্প শোনান। ইংল্যান্ড থেকে কিছুদিন আগে এক ভদ্রলোক নাকি জিপিএস ব্যবহার করে দেখতে পেয়েছেন মায়ানমার সীমান্তের একটি পাহাড় তাজিংডং থেকেও উঁচু। সে পাহাড়ের নাম ক্লাং ময়।

পরবর্তীতে এই দলের সদস্য সনেট, গুগল আর্থে দেখতে পান আসলেই তাই। স্যাটেলাইট ইমেজ থেকে পাওয়া তথ্য লালরাম কারবির দাবির সাথে মিলে যাচ্ছে। দলের আরেক সদস্য তাদের এই অভিযান ও অবাক করা নতুন তথ্য নিয়ে একটি প্রতিবেদন লিখেন যা ২০০৭ সালের ১৭ নভেম্বর দৈনিক প্রথম আলোর সাপ্লিমেন্ট ছুটির দিনে প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটিতে গুগল আর্থ থেকে পাওয়া সর্বোচ্চ চূড়ার সম্ভাব্য একটি স্থানাংকও প্রকাশ করা হয়।

প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হবার সাথে সাথে অনুসন্ধিৎসু অভিযাত্রীদের মধ্যে একটি আলোড়ন সৃষ্টি হল। অনেকেই চূড়াটিতে যাবার তোড়জোড় শুরু করে দিল। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও এই চূড়া ও সেখানে যাবার ব্যাপারে বিস্তারিত কোন তথ্য পাওয়া যাচ্ছিল না। তা স্বত্তেও বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চূড়ায় প্রথম বাংলাদেশী দল হিসেবে আরোহণ করার কৃতিত্ব নেওয়ার আকর্ষণে অনেকেই সর্বাত্মক চেষ্টা করতে থাকে। এদের মধ্যে এগিয়ে থাকে দুইটি দল, নেচার অ্যাডভেঞ্চার ক্লাব এবং মাউন্টেইন ট্রেকার্স ক্লাব। দুটি দলই ডিসেম্বরের ঈদ উল আজহার ছুটিতে অভিযানে যাবার সিদ্ধান্ত নেয়।

ইয়াহিয়া খানের নেতৃত্বে মাউন্টেইন ট্রেকার্স ক্লাবের ৭ জনের দল ১৯ ডিসেম্বর (২০০৭) ঈদের আগেই বান্দরবানের উদ্দেশে রওনা হন। তারা থানচি দিয়ে বাকতলাই গিয়ে লালরাম বম কারবারির সাহায্য নিয়ে চূড়ার দিকে যাওয়াই সমীচীন হবে মনে করেছিলেন। 

অন্যদিকে নেচার অ্যাডভেঞ্চার ক্লাব গতবারের থানচির অভিজ্ঞতা ভাল না থাকায় ও রুমা অঞ্চলে তাদের অভিজ্ঞতা ও চেনাজানা ভাল থাকায় এবার রুমা দিয়েই এগুনোর সিদ্ধান্ত নেয়। এই অভিযানে তাদের থাইক্ষিয়াং পাড়ার অভিজ্ঞ শিকারী রামথন বমের সাহায্য পাওয়ার নিশ্চয়তা ছিল। তাদের আগেই কেউ হয়ত চূড়াটিতে চলে যাবে এমন আতঙ্ক নিয়ে দলটি ঈদের পরদিন বান্দরবানের পথে রওনা দেয়। দুই দিক থেকে অভিযানে নামা দল দুটি বাদানুবাদ ও অসুস্থ প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়েছিল। চূড়ার নাম নিয়ে হওয়া তথ্য বিভ্রাট, সংবাদ সম্মেলন ও পাল্টা সংবাদ সম্মেলন মিলিয়ে পুরো পরিস্থিতি জটিল ও ঘোলাটে হয়ে দাড়ায়।

এখানেই শেষ নয়। এই কালচক্রে রয়েছে আরও রহস্যের জট। খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, তবু যেন মনে হবে কত আদিম। কালক্রমে এই ঘটনাগুলোর বিস্তারিত পড়ব আমরা ধারাবাহিক বা সিরিজে আকারে। যার নামকরণ করা হয়েছে ‘কালচক্রে সবুজ পাহাড়’। প্রকাশিত হতে শুরু করবে খুব শীঘ্রই অদ্রিতে।

আমরা নেচার অ্যাডভেঞ্চার ক্লাবের সাকা হাফং পর্ব দিয়ে শুরু করব এই ধারাবাহিকের যাত্রা।

পড়ুন: কালচক্রে সবুজ পাহাড়: নেচার অ্যাডভেঞ্চার ক্লাব ও সাকা হাফং

অদ্রি

(Visited 1 times, 1 visits today)

8 Comments

  1. এই ঘটনাটা ঘটেছে আমার জানাশোনার মধ্যেই, তাই আগ্রহী হয়ে রইলাম।

  2. লেখাটা খুব ভালো লাগলো। পরবর্তী পর্বের অপেক্ষায় থাকলাম।

  3. খুবই ভালো লাগলো। তথ্যগুলো অনেক ব্যাপার ক্লিয়ার করলো।

  4. প্রথম দিকের ভ্রমণ সংগঠঙ্গুলোর মধ্যে “ভ্রমণ বাংলাদেশ” এর নাম না দেখে অবাক হলাম। উল্লেখিত ‘আমাদের পাঠচক্র’ এর আয়োজনে অনুষ্ঠিত কেউক্রাডং অভিযানের সময় কেউক্রাডং এর চূড়াতেই ১৯৯৯ সালের ১৫ নভেম্বর এই সংগঠনের জন্ম হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *