২য় পর্বের পর

২৬ ডিসেম্বর, ২০০৭

পাহাড়ে গেলে কিভাবে যেন আমার দেহঘড়ি চালু হয়ে যায়। যে কোন সময়ের হিসাব মোটামুটি ১০ মিনিট এদিক সেদিকের মাঝে থাকে। যখন বেলা দেখে সময় বলি এবং দেখি আসল সময় ১০ মিনিটের মাঝে, সেটা এক অদ্ভুত কারিশমা। তো এই অভিযানে আমাদের সময় আটকে গেল সকাল ৯ টায়।

সকাল ৯ টায় আমরা হাঁটা দিলাম গ্রুপ ফটোসেশন করে। সারাদিনের হাঁটা অপেক্ষা করছে। দাদার হিসাবে আজকের পাড়াটায় পৌঁছাতে অবশ্যই রাত হবার কথা।

থাইক্ষিয়াং পাড়া থেকে মোটামুটি সরাসরি দক্ষিণ দিকে হাঁটা শুরু হল। মোটামুটি সমতল রাস্তা। মাঝে ঝিরিতে বরফ ঠাণ্ডা পানি দিয়ে গোসল করলাম প্রায় ৩ দিন পর। যে গোসল করতে ১০ মিনিট লাগার কথা সেখানে আমাদের প্রায় ১ ঘণ্টা লাগলো। যখনই আমরা বিশ্রাম নিতে বসি তখনই ৩০ মিনিট নাই হয়ে যায়। এভাবে ধাক্কাতে ধাক্কাতে যখন আমরা তামলো পাড়ায় পৌঁছলাম তখন বেলা হেলে পড়েছে।

তামলো পাড়ার পথে বিশ্রামরত [ছবি: শামসুল আলমের আর্কাইভ হতে]

তামলো একটি বম পাড়া। এখানে কিছুক্ষণ জিরিয়ে আমরা আবার পথে নামি। মোটামুটি তামলো’র দক্ষিণ পূর্বে সরাসরি নেমে শেষ বিকালে সেই আরদ্ধ রেমাক্রির দেখা পেলাম। বড় বড় বোল্ডার দিয়ে পূর্ণ ওই জায়গাটায় যেখানে তামলো পাড়ার রাস্তা এসে রেমাক্রিতে মিশেছে। এখন আমাদের রেমাক্রি ধরেই এগুতে হবে এবং সামনেই নাকি একটি পাড়া আছে, দুলাচরন নামে, ম্রো পাড়া।

আমার একটা বাজে অভ্যাস আছে। যদি শেষ বিকালে কোন ঝিরি বা খাল পাই তাহলে আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকে যেভাবেই হোক পানি না মাড়িয়ে যেন যেতে পারি। সে চেষ্টা যদিও সেবার সফল হয়নি। পিচ্ছিল রেমাক্রি আমাকে কোমর পর্যন্ত ভিজিয়ে দিয়েছিলো। আর পানি কি রকম বরফ ঠাণ্ডা ছিল, সেটা বলার কিছু নাই।

কিছুদূর পর বাঁশের বেড়া দেওয়া বাগান মত দেখতে পেলাম। বুঝতে পারছিলাম, আমাদের গন্তব্য কাছাকাছি। আনুমানিক সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় পাড়ায় পৌঁছাই। যে পথ পারি দিতে চার থেকে সাড়ে চার ঘণ্টা লাগার কথা সেটা আমরা সাড়ে নয় ঘন্টা লাগিয়ে দিয়েছি।

আমাদের দেখে পুরো পাড়া যেন ভেঙ্গে পড়ল কারবারির ঘরে।

২৭ ডিসেম্বর, ২০০৭

যথারীতি সকাল ৯ টায় আমাদের সেদিনের যুদ্ধ শুরু হল। পাড়াটি ছিল একবারেই রেমাক্রির পাশে। সেদিনের পথটা ছিল অসাধারণ। মাঝে তাওক্রাই নামে একটা পাড়া পড়লেও, আমরা বসিনি সে পাড়ায়। পুরো দিনের পথ সমতল হওয়াতে বিশ্রামের তেমন কোন প্রয়োজন পড়েনি।

আমরা ততক্ষণে আমাদের কাংখিত সময় থেকে ১ দিন পিছিয়ে গেছি। কিন্তু সর্বোপরি স্বস্তি ছিল আলম ভাইকে নিয়ে। যে কিনা আগেরবার বগালেকই উঠলেন গাড়ী দিয়ে, উনি যে এই পর্যন্ত চলে আসবেন, এটা ছিল আমার চিন্তার বাইরে। কিন্তু এখন মনে হয়, রুবেল ভাইয়ের মত ধীর গতির দলনেতা পাওয়াতেই আলম ভাইয়ের আত্মবিশ্বাস এত বেড়ে যায়। উনার জিপিএস সহ ব্যাটারি আমিই বহন করছিলাম, আর উনি প্রচুর ছবি তুলছিলেন।

তাওক্রাই পাড়ায় একজন মা ও শিশু [ছবি: শামসুল আলমের আর্কাইভ হতে]

তাওক্রাই পাড়াতে আমরা সালোকিয়া পাড়ার লোক পেয়ে যাই। সালোকিয়াই হল সেই পাড়া যে পাড়া থেকে আমরা মোদক মুয়াল উঠার চেষ্টা করবো। সালোকিয়াকে মোদক মুয়ালের বেইজ ক্যাম্প বলা যেতে পারে। তাওক্রাই পার হয়ে তারপর চম্বক ওই (রেমাক্রির বুকে নাফাকুম এর মত ছোট একটা ড্রপ। কিন্তু উজানের দিকে তাই পানি কম ও প্রস্থেও কম) পাড় হয়ে কিছুদুর হেঁটে রেমাক্রি থেকে পূর্বে উঠা শুরু হল। প্রায় আধা ঘণ্টা পর সেই আরাধ্য গ্রাম সালোকিয়ার দেখা মিলল। এখানেও পুরো পাড়া মিলে আমাদের আমন্ত্রণ জানালো। যদিও আমি ব্যক্তিগতভাবে ম্রো গ্রাম পছন্দ করি। তারপরও আজ এই ত্রিপুরা গ্রামেই থাকতে হবে।

সালোকিয়াতে গিয়ে পাড়ার স্থানাংকের সাথে মিল পাই, যেটা আমাদের নোট করা ছিল। মোদক মুয়ালের দূরত্বও এখন ধরাছোঁয়ার মাঝে দেখাচ্ছিল। তার মানে মোটামুটি নিশ্চিত আমাদের এখন পর্যন্ত কোন ভুল হয়নি, থাইক্ষিয়াং পাড়ার দাদা আমাদের ঠিক পথেই এনেছেন। 

গত ২ দিনের যাত্রায় থাইক্ষিয়াং পাড়ায় দেখা হওয়া সেই দলটির কথা প্রায় ভুলেই গেছিলাম। মনের মাঝে তখনও একটা ক্ষীণ আশা ছিল, হয়ত তারাও নীতিশদাদের মত অন্য কোন পাহাড় চূড়াকে মোদক মুয়াল মনে করল কিনা। যদিও পাড়াবাসীদের কাছ থেকে নিশ্চয়তা পেলাম ২ দিন আগে একদল ঘুরে গেছে। বয়স তখন কম ছিল বলেই হয়ত, আমার হতাশা, আমার ক্রোধ ও বুকফাটা কষ্টের শ্বাস ধরে রাখতে পারিনি।

কিন্তু রেমাক্রিতে সারাদিন পথ চলা এবং সম্পূর্ণ নিজেদের চেষ্টায় একটা পথ বের করার আনন্দ আমার কষ্টে কিছুটা হলেও প্রলেপ লাগিয়ে দিয়েছিল।

সালোকিয়া পাড়া থেকে দেখা কাঙ্ক্ষিত সেই চূড়া [ছবি: শামসুল আলমের আর্কাইভ হতে]

সেদিন রাতে আমরা পাড়ার বুদ্ধিমান মাস্টার সহ পাড়াবাসীর সাথে আলোচনায় বসি, আমাদের অভিযান নিয়ে কথা বলতে। যেহেতু মাঝে ঘন জঙ্গল, তাই পথ বানানোর জন্য আমাদের কাটার নিতে হবে। মাস্টার সাহেবের কথা মত দৈনিক মজুরিতে ৪ জন কাটার নিতে হবে। উনি নিজেও যাবেন আমাদের সাথে।

যেহেতু দেশের সর্বোচ্চ পাহাড় চূড়া, তাই এর সঠিক স্থানীয় নামটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার গুরুত্ব অনুধাবন করে আমরা পাড়ার লোকেদের জিজ্ঞেস করি তারা এই পাহাড় কে কি নামে ডাকেন বা আদৌ কোন নামে ডাকেন কিনা। এটাও নিশ্চিত হয়ে নেই, মোদক মুয়াল নামটা তারা জানেন কিনা। আর যদি নামকরণের বিষয় আসে তাহলে কি নাম হওয়া উচিত। এ সব বিষয় নিয়ে বিশদ আলাপচারিতা করি। পরে পাড়ার কারবারি ও মাস্টার সহ সবাই আমাদেরকে এই চূড়ার নাম ‘সাকা হাফং’ বলেন, যেটাকে আমরা মোদক মুয়াল ভেবেছিলাম। তারা অনুরোধ করেন আমরা যেন ঢাকায় ফিরে এই নামটা তুলে ধরি।

আমরা ইতিহাসের সাক্ষী হওয়ার মত একটা উত্তেজনা নিয়ে ঘুমাতে যাই। কিন্তু পাড়াতে আমাদের জন্য যথেষ্ট কম্বলের ব্যবস্থা করা সম্ভব ছিল না তাদের পক্ষে। প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় ঘুমটা খুব কষ্টের হয়েছিল বলা যায়।

২৮ ডিসেম্বর ,২০০৭

আমরা ৬ জন, আমাদের থাইক্ষিয়াং পাড়ার দাদা, সালোকিয়ার মাস্টার দা, কারবারি, আর সাথে আরও ২ জন মিলে আমরা ১১ জনের দলটি রওনা করলাম। সালোকিয়া পাড়া ১,৫০০ ফিট উচ্চতায়। আমাদের কাঙ্ক্ষিত জায়গা ৩৪০০ ফিটের উপর। তার মানে আমাদের প্রায় ২,০০০ ফিট উঠতে হবে। পাড়াবাসীদের কথায় ৩-৪ ঘণ্টা লাগার কথা। সাথে আমরা কিছু শুকনো খাবার, চিড়া, গুড় নিয়ে নেই।

পাড়া থেকে কিছুটা চড়াইয়ের পর একটা সমতল মত জায়গা পাই। দেখতে পুরো চা বাগানের মত। মাস্টার বলল এখানে আগে চিকনকালা নামে একটা পাড়া ছিল। পরে কোন এক কারণে পাড়াটি চলে যায়। তাও ২০/২৫ বছর আগে। আমরা সেই সমতল সুন্দর জায়গাটা পার হওয়ার পর ২ টা ঘর দেখলাম এবং সেটা ম্রো পরিবার। জানতে পারি এখানে নতুন একটি পাড়া হচ্ছে। পাড়ায় ঘর বাঁধা হচ্ছে। কোন নাম ছিল না বিধায় আমরা এটাকে চিকনকালা পাড়া নামেই ডাকতাম তখন। এটাই হল এখনকার ‘নেফিউ পাড়া’।

চূড়ার পথে অসাধারণ জঙ্গল [ছবি: শামসুল আলমের আর্কাইভ হতে]

আমি পড়ে ২০১৩ তে আরও একবার যাই। তখন এই নেফিউ পাড়াতেই থাকি। ১৫/২০ পরিবার মত বড় পাড়া এখন এটা। পরের বার গিয়ে সালোকিয়াতে কেন থাকিনি, এর জবাব পাড়াবাসিই দিতে পারবেন। কেন কেউ সালোকিয়াতে থাকতে চান না, একটা কারণ হল, এখন সালোকিয়া মূল পথ থেকে ১ ঘণ্টা বাইরে, কোন প্রয়োজন নেই যাওয়ার। কিন্তু সালোকিয়া একটা ঐতিহাসিক ও খুব গুরুত্বপূর্ণ পাড়া হওয়া থেকে নিজেদের বঞ্চিত করেছে, এটা বলাই যায়।

আবার ২০০৭ এ ফিরে যাই। নেফিউ পাড়ায় একজনকে পেলাম যার কিনা পায়ে গভীর ক্ষত। জুমে কঠোর পরিশ্রম করার সময় এমন আঘাত লাগা তাদের জন্য খুবই স্বাভাবিক বিষয় হলেও, তার গভীর ক্ষতটা দেখে আমাদের জন্য মোটেও স্বাভাবিক লাগল না। তাকে কিছুটা প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে আমরা আবার রওনা হই।

ঘর দুটি পেরিয়ে কিছুদূর যেতেই শুরু হল সেই অসাধারণ জঙ্গল। আমার জীবনে সেটা ছিল সত্যিকারের কোন বড় জঙ্গল দেখা। এক একটা প্রমাণ আকারের শত বছর পুরনো বৃক্ষ, মাঝে মাঝে হরিণের ডাক, এক কথায় অসাধারণ অনুভূতি। মাঝে আবার কিছু সময় বাঁশের জঙ্গলও পড়ে। বাঁশের জঙ্গলগুলো খুব মজার, উঠতে অথবা নামতে। ধরে ধরেই উঠা নামা যায়, পায়ের একটু আরাম হয়। আবার সেই পথে কিছু অংশে মরা বাঁশের জঙ্গল বিভীষিকাময় ছিল। রীতিমত ক্রল করে এগুতে হয়েছিল।

সেদিন জিপিএসের ব্যাটারির ব্যাগটা ছিল মাস্টারের কাছে। হঠাৎ আমরা একটা সময় বার্মা দেখতে পেলাম। যারা সাকা হাফং গেছেন তারা জানেন, এটা একবারে সীমান্ত রেখায় পড়েছে এবং বার্মার পাশটায় পুরো খাড়া ঢাল। খুব সাবধান থাকা লাগে। সে সময় চূড়া, তার আগে পিছে, আসে পাশে পুরোটাই বাঁশের ঘন জঙ্গল ছিল । বাকি পথটা খুব সাবধানে পার হয়ে আমরা ১ টার কিছু আগে পরে চূড়ায় পৌঁছাই।

শহিদুল্লাহ, সাজ্জাদ, মিলন, রুবেল, হান, আলম [বাম থেকে ডানে]

সাকা হাফং থেকে শুধু বার্মাই দেখা যায়। বার্মার ক্লাতং পাহাড়টা খুব অসাধারণ লেগেছিল। সেই সাথে আমাদের চাইক্ষিয়াংয়ের পরে বার্মার পিক্ষিয়াং পাড়াটা দেখতে পারাটা ছিল বলার মত।

চূড়ায় ঘণ্টা খানেক অবস্থান করি আমরা। জিপিএস দিয়ে আমরা উচ্চতা পাই ৩৪৮৮ ফিট, যার নির্ভুলতার মাত্রা ছিল +/- ১০ ফিট। দেড় বছরের অধিক সময় ধরে একটা আগ্রহের কেন্দ্র বিন্দু, সাধনার ফসলটা আমরা পাই সেদিন।

জিপিএস রিডিং [ছবি: শামসুল আলমের আর্কাইভ হতে]

চূড়া থেকে চলে আসাটা ছিল একটু বেদনা বিধুর। হয়ত বয়সের কারণেই কিনা কে জানে, একটু আপ্লুত থাকতাম তখন পাহাড় নিয়ে।

বিকেলে আমরা ফেরত আসি সালোকিয়া পাড়াতে। রাতে সিদ্ধান্ত নেই বগালেক হয়েই ফেরত যাওয়ার, যেহেতু ওখানে আমাদের নাম লেখা আছে এবং নাম না কাটিয়ে চলে গিয়ে বগালেকের বন্ধুর ঝামেলা বাড়াতে চাইনি।

২৯ ডিসেম্বর, ২০০৭

এখনও স্পষ্ট খেয়াল আছে, সেদিন আমরা সকাল ৭.৩০ টায় বের হই। আমরা তখন ফিরতে চাইছিলাম যত দ্রুত পারি। ওই সময়টায় রুমার পর আর কোথাও মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া যেত না। সব মিলিয়ে অভিযান শেষ হওয়ার পর মন যখন বাসার দিকে টান দিত, তখন আর কিছুই ভালো লাগত না।

একই পথে আমরা দ্রুত ফিরতে শুরু করি। দুলাচরন পাড়ায় ঢুকার আগে রেমাক্রিতে গোসল করছিলাম। ঠিক এমন সময় ভুত দেখার মত একটা অবস্থা হয়। চশমা ছাড়া চোখ কুঁচকে দেখি খালের অন্য পাশে একদল আর্মি , যার অগ্রবর্তী দলটা শঙ্কিত ভাবে আমাদের দিকে রাইফেল তাক করে আছে। আমি দলের সবাইকে বললাম, সবাই যেভাবে যা করছেন করতে থাকেন। আর্মি আসছে, স্বাভাবিক থাকেন। আমাদের ভয়টা ছিল হানকে নিয়ে, দেখতে চৈনিক গড়ন হওয়াতে একটু ভিত ছিলাম ওকে নিয়ে।

তারা আসলেন এই পাড়ে। প্রথমেই, সেই কথা- আপনারা কে, এখানে কেন? সব কিছু তাদের খুলে বলাতে তারা আর ঝামেলা করে নাই। তারা তখন ভোটার আইডি করতে দুলাচরন এসেছিল। আমরা হাপ ছেড়ে বাঁচলাম। গোসল করে পাড়ায় গিয়ে দেখি বিশাল যজ্ঞ। মুরগির সাথে খিচুরি হবে। আমরা দাওয়াত পেলাম আর্মিদের কাছ থেকে। ইচ্ছা থাকলেও ঢাকায় ফেরার চরম নেশায় শুধু আর্মি বিস্কুট খেয়ে আমরা রুমার পথ ধরি। যতদূর মনে পড়ে তখন দুপুর ২ টা মত সময় হয়েছিল।

থাইক্ষিয়াং থেকে ফেরার পথে

আমরা এগুতে থাকি। দিনের আলো যখন পুরোপুরি শেষ ওই সময় আমরা থাইক্ষিয়াং থেকে ৩০ মিনিট দূরে। থাইক্ষিয়াং পৌঁছে পাড়ার দোকানে চা পান করে, আমরা কেওক্রাডংয়ের পথ ধরি। দাদাকে দোকানে বিদায় জানাই।

কেওক্রাডং যখন পৌঁছাই তখন রাত ছিল ১১ টা। যখন দার্জিলিং পাড়ায় গিয়ে বন্ধুর ঘরে উঠি তখন বাজে রাত ১২ টা। সাথের চিড়া, গুড় ও পানি খেয়েই ঘুম।

পরদিন সকালে উঠে বগালেক গিয়ে শুনি বন্ধু আগেই আমাদের নাম কেটে দিয়েছে। যেহেতু ঈদের পরপর তখন অনেক ভিড়ের সময় ছিল, তাই আমরা না থাকা অবস্থায় আমাদের নাম কাটা কঠিন হয়নি। তখন একটু আফসোস জাগলো, আগে যদি বুঝতাম তাহলে তাজিং ডংটা হয়ে ব্যাক করতে পারতাম। যেহেতু দলে ২ জন ছিল নতুন, তাদের জন্য এটা বড় একটা পাওয়া হত।

বগালেকে দেরি না করে রুমায় চলে আসি। সন্ধ্যায় তখনকার গ্যারিসন পর্যন্ত গিয়ে গাড়ী জোগাড় না করতে পেরে, বাজারে এসে দোকানে ঘুমাতে হয়েছিল।

ঢাকায় নামি ৩১ তারিখ রাতে।

নতুন বছরের ২ তারিখ দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায় আমাদের অভিযান নিয়ে প্রথম পাতায় খবর প্রকাশিত হয়। জনকণ্ঠ, ইত্তেফাক, প্রথম আলো সহ মোটামুটি সবগুলো দৈনিক পত্রিকায় আমাদের অভিযানের খবর আসে পরের ২ সপ্তাহ জুড়ে।

বান্দরবানের স্থানীয় পত্রিকাগুলোও বড় করে খবর করে। বান্দরবান জেলা প্রশাসক আমাদের নিমন্ত্রণ জানান। আমি আর রুবেল ভাই জেলা প্রশাসকের সাথে বেশ লম্বা সময় নিয়ে সৌহার্দপূর্ণ একটা বৈঠক করি। পর্যটনের স্বার্থে, দেশের স্বার্থে পাহাড় পর্বত নিয়ে ভুল তথ্য দূরীকরণ, প্রকৃতি সংরক্ষণ সহ নানা বিষয় নিয়ে আমাদের মাঝে কথা হয়। ২০০৬ এর সেপ্টেম্বর থেকে পুরো ২০০৭ ছিল আমার জন্য মোদক মুয়ালময়। আর ২০০৮ এর জানুয়ারীটা ছিল আমার আর রুবেল ভাই এর জন্য সাকা হাফং ময়। এভাবেই আমাদের সাকা হাফং অভিযান শেষ হয়।


(Visited 1 times, 1 visits today)

9 Comments

  1. সাজ্জাদ, অনে-ক দিন ধরে অপেক্ষায় ছিলাম পুর গল্পটা শুনবো বলে। সময় করে ধৈর্য্য নিয়ে লিখেছো, তার জন্য অনেক অনেক সাধুবাদ জানাই; কারণ লেখা পড়ে আমার বিশ্বাসই হচ্ছিলো না সাজ্জাদ এতো দারুণ করে স্মৃতিচারণ করতে পারে। লেখাটা শেষ করে আমিও একটা মোহের মধ্যে আছি; পাহাড় থেকে এলে এরকম মোহে থাকি; মোহভঙ্গ সহজে হবে না। আমি আবারও লেখাগুলো পড়বো, ইনশাল্লাহ।

    কৃতজ্ঞতা অদ্রিকে, অজানা গল্পটা সাজ্জাদের থেকে বের করে নিতে পেরেছে। ছোটখাটো কিছু বানান ভুল ছাড়া পুরো লেখাটা উপভোগ্যই ছিল। যেমন: শহিদুল্লাহ ভাই “আবৃতি” করেন না, করেন “আবৃত্তি”; ব্যাটারির “মহত্ত্ব” না, “মাহাত্ম্য”।

    অপূর্ব ঝকঝকে ছবিগুলোর জন্য আলম ভাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ আর কৃতজ্ঞতা।
    পাহাড় থাকুক; পাহাড় বাঁচুক।

  2. ভাইয়া, সাকা হাফং কে কেন অফিসিয়াল সর্বোচ্চ চূড়া ডিক্লেয়ার করা হচ্ছে না? মিয়ানমার সীমান্তে পড়েছে, তাই?

  3. সাজ্জাদকে ধন্যবাদ, লেখাটা এক নিশ্বাসে না হলেও পড়ে ফেললাম। প্রায় সবটাই জানতাম – শহীদুল্লাহ, রুবেল আর আমার মিতা (শামছুল আলম) এর কাছ থেকে সেই সময়েই শুনেছি – তবে বিস্তারিত জানতাম না – এখন সুন্দর লেখনিতে জানলাম। আবারো ধন্যবাদ।

  4. ভাই এমন অভিজ্ঞতা শেয়ার করার জন্য ধন্যবাদ , আরো ধন্যবাদ জানাই নতুন প্রজন্মের পক্ষ হতে যাদের সত্যিই এই ইতিহাস আর এই ছবি গুলো দেখা উচিৎ জানা উচিৎ, তাই আশা থাকবে আরো সুন্দর সুন্দর কিছু ভ্রমন অভিজ্ঞতা জানতে পারবো যা আমাদের অনুপ্রেরণা এর সাথে সাথে শিক্ষা ও দিবে 🙂

  5. অনেক অনেক ধন্যবাদ সাজ্জাদ ভাই ও অদ্রি। অনেক অজানাকে জানতে পারলাম। সাকা হাফং-এ আপনাদের অভিযান নিয়ে অনেক আগে পেপারে দেখেছিলাম। সেই থেকে অনেক আগ্রহ ছিলো আপনাদের অভিযানের ব্যাপারে বিস্তারিত জানবো। সেই সময়ের অভিযানগুলো নিয়ে পরবর্তীতেও আরো লিখবেন আশা করছি <3

  6. অসংখ্য ধন্যবাদ। এক নিশ্বাসে ৩ পর্ব পড়লাম। বহুদিনের আরাধ্য সাকা নিয়ে ফ্যান্টাসি টা আরও বেড়ে গেলো। ইনশাআল্লাহ্ একদিন… 🙂

  7. সাজ্জাদ ভাই কে অনেক ধন্যবাদ লেখাটার জন্য। পুরনো ঘটনা মনে করে লেখার সময় পুরনো অনুভূতি এবং দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি সৎ থাকা যথেষ্ট কঠিন। আমার মনে হয় সাজ্জাদ ভাই কঠিন কাজটি ভালো মতোই করেছেন।

  8. ভাই থাইক্ষিয়াং লেক সম্পর্কে কোথাও কোনো ইনফরমেশন পেলাম না।যদি কিছু ইনফরমেশন দিতেন!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *