সম্পাদকের কথা
[আজ থেকে প্রকাশিত হতে শুরু করল ধারাবাহিক ‘কালচক্রে সবুজ পাহাড়’। ধারাবাহিকের শুরুতে থাকছে নেচার অ্যাডভেঞ্চার ক্লাবের সাকা হাফং অন্বেষার ঘটনা। পড়তে শুরু করার আগে একটি বিষয়ে খেয়াল রাখুন ‘মোদক মুয়াল’ ও ‘সাকা হাফং’ বাংলাদেশের দুটি ভিন্ন ভিন্ন পাহাড় চূড়া] [পড়ুন এই ধারাবাহিকের প্রারম্ভিকা]


সাজ্জাদ হোসেন

তখনও ফেসবুক আসেনি, দেশের কেউ তখনও এভারেস্ট আরোহণ করেনি। সেই সময় হাতে হাতে জিপিএস তো দূরে থাক, এন্ড্রোয়েড ফোনই ছিল না। গুগল আর্থ বলে কিছু আছে সেটা জানত বা গুগল আর্থ ব্যবহার করতো হাতে গোনা কয়েকজন, এমন একটা সময়েই শুরু হয় নেচার অ্যাডভেঞ্চার ক্লাবের পথ চলা।

এই চলার পথটা খুব একটা মসৃণ ছিল না। ২০০৬/২০০৭, ডানিডার কর্মকর্তা অপহরণ পরবর্তী সময়টায় পাহাড়ে চরম মাত্রায় কড়াকড়ি চলছিল। তদুপরি তথ্য ছিল একদমই কম। বগালেক, রাইক্ষিয়াং লেক, তাজিং ডং, বড় মোদক ছিল বান্দরবানের অভিযানকৃত অঞ্চল। কেউ এর বাইরে অন্য দিকে যায়নি তখনও, এমনটা বলব না। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম না থাকায় জানা যেত না।

২০০৫ সালে, আমি

আমি ব্যক্তিগতভাবে তখন ট্রিপ অ্যাডভাইজর ও ভার্চুয়াল ট্যুরিস্টে লিখালিখি করতাম। তীর্থের কাকের মত বসে থাকতাম একেক জন বাংলাদেশির জন্য। কালে ভাদ্রে হয়ত পেতাম কাউকে কাউকে। এই ভার্চুয়াল ট্যুরিস্টেই ২০০৬/২০০৭ এর বিভিন্ন সময়ে কয়েকজন বিখ্যাত ব্যক্তির সাথে পরিচয় হয়। তারা সবাই আজ স্ব-মহিমায় উজ্জ্বল।

আলম ভাই/জিপিএস আলম

২০০৬ সালের শুরুর দিকে এই বুদ্ধিটা মাথায় আসে। বগালেক মাপবো, সাথে পুকুরপাড়া যাব, রাইক্ষিয়াং লেকও মাপবো বলে। কিন্তু সাথে নেই জিপিএস বা অল্টিমিটার। বাইরে থেকে আনানোর লোক পাচ্ছি না। দেশে ২/১ টা যা পাই, সেগুলোর দাম অনেক বেশী। হঠাৎ একজনের সাথে ভার্চুয়াল ট্যুরিস্টে পরিচয় হল। পরে ফোনে লম্বা সময় কথার তালে তালে জানতে পারলাম তিনি জিপিএসের মালিক। পাহাড়ে ঢুকতে চান। আর আমি চাই জিপিএস। একে একে দুই হয়ে গেল। উনাকে দেখে একটু দমে গেলেও, জিপিএসের লোভে নিয়ে নিলাম দলে।

২০০৭ এর ফেব্রুয়ারিতে আমরা গেলাম বগালেক হয়ে নিষিদ্ধ রাইক্ষিয়াং লেক। তখন রাইক্ষিয়াং লেক যাওয়ার অনুমতি ছিল না। আলম ভাই তার জিপিএস, ল্যাপটপ, জিপিএস এর ৪ কেজি ওজনের ব্যাটারি সব মিলিয়ে প্রায় ১৮/১৯ কেজির ব্যাকপ্যাক নিয়ে জীবনে প্রথম বারের মত পাহাড় অভিযানে গেলেন। আমার বলা ওজনের সীমাকে পাত্তা না দিয়ে উনি যা যা পেরেছেন সব কিছু নিয়ে এসেছেন। যাই হোক, রুমা বাজার থেকে বগালেক পর্যন্ত গাড়ী মারফত উনার ব্যাগ পাড় করা হল। আমরা গেলাম ঝিরি পথে। বগালেকের উচ্চতা পাওয়া গেল ১,২১৩ ফুট। প্রথমবারের মত আমরা জানতে পেলাম বগালেকের উচ্চতা।

শামসুল আলম

রাতে আলম ভাই বাগড়া দিলেন। উনি ঢাকা চলে যাবেন পরদিন। আমাদের সাথে রাইক্ষিয়াং লেক যাবেন না। আমার পক্ষে উনার কাছে জিপিএসটা চাওয়া সম্ভব হয়নি। উনি পরদিন চলে গেলেন ঢাকায়। আমরা রওয়ানা দিলাম রাইক্ষিয়াং লেকের উদ্দেশে। সারাদেশে তখন জরুরি অবস্থা চলছে। এদিকে বগালেক ছাড়া আর কোথাও যাওয়ার অনুমতি নেই। যেভাবেই হোক, দ্বিতীয় বারের চেষ্টায় সেবার আমরা রাইক্ষিয়াং যেতে পেরেছিলাম। কিন্তু আফসোস সেবার রাইক্ষিয়াং লেকের উচ্চতা মাপা হল না।

রাইক্ষিয়াং লেকে, ২০০৭

সেবার আমি নিশ্চিত ছিলাম আলম ভাইয়ের সাথে আমার এটাই শেষ কোন পাহাড় ভ্রমণ। ঢাকায় গিয়ে আগামী ২/৩ মাসের মাঝে জিপিএস কিনব ক্লাব থেকে, এমনই পণ করলাম। 

জিঞ্জ ফুলেন

২০০৬ সালের কথা। কিছুদিন আগে তাজিং ডং থেকে ফিরেছি। তাজিং ডং উঠেই বুঝেছিলাম এটা কেওক্রাডং থেকে উঁচু হতেই পারে না। যে কেউই বুঝবে, অনুসন্ধানী চোখ থাকলে। মে মাসের কাঠফাটা গরমে অভিযান শেষে ম্যালেরিয়া বাধিয়ে ১ মাস বিছানায় কাটিয়ে আবার ফিরলাম স্বাভাবিক জীবনে। সেসময় লেখালেখি করি টুকটাক আর ভার্চুয়াল ট্যুরিস্ট ঘাটি। ওই যুগের হিসেবে মোটামুটি নেট পাগল ছিলাম। হঠাৎ একদিন একটা তথ্য চোখে পড়ল, উইকিপিডিয়ায় ব্রিটিশ অ্যাডভেঞ্চারার জিঞ্জ ফুলেনের বাংলাদেশে মোদক মুয়াল অভিযানের উপর দুই লাইন। ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর সবেধন নীলমণি ভার্চুয়াল ট্যুরিস্টে বিজ্ঞাপন দিয়েও কাউকে পেলাম না যে কিনা মোদক মুয়াল গেছে। গুগল আর্থ খুঁজে যা বুঝলাম জিঞ্জ যে জায়গাটার কথা বলেছে তা বাংলাদেশ মায়ানমার সীমান্তে এবং থানচি থেকে কাছে।

মাঝে এক বছর চলে গেল। এর মাঝে অনেক অভিযান হয়েছে পাহাড়ে, সাগরে, বিভিন্ন দিকে। কিন্তু কেন যেন মোদক মুয়ালের দিকে লক্ষ্য স্থির করা হয়নি।

হান ও আমি, তাজিং ডং অভিযানে, ২০০৬ [ছবি: লেখকের ব্যক্তিগত আর্কাইভ হতে]

অক্টোবর, ২০০৭

পাক্কা একবছর পর থানচি যখন পৌঁছলাম তখন সাঙ্গুর পানি পাড় ছোয় ছোয়। অক্টোবরের ১০ তারিখ হবে দিনটা। নদী পাড় হতে গিয়ে আমাদের নৌকা ডুবল, ব্যাগ ভিজলো। রেস্ট হাউসে থাকার জায়গা হল। ৫০ টাকায় একজন, এমনই রেট ছিল তখন। দলটা অনেক বড় ছিল আমাদের, মোট ১০ জন। দল ও প্রকৃতি কোনটাই আসলে আমাদের মোদক মুয়ালে যাওয়ার যোগ্য ছিল না।

মুষলধারে টানা বৃষ্টি হচ্ছে। থানচি বাজারে থাকতে হল টানা ৩ রাত। সারাদিন বসে থাকতাম আর বাজারে নেমে বিভিন্ন পাড়ার লোকদের সাথে কথা বলতাম। পাহাড়ে ঢল নামলেও তাদের জীবিকার প্রয়োজনে বাজারে আসতে হয়। দলিয়ান, জিন্না এমন অনেক পাড়ার লোকদের কাছে তাদের আশপাশের পাহাড়গুলোর গল্প শুনতাম।

মজার ব্যাপার হল, রেস্ট হাউজে আরও ২ জনের সাথে সেবার দেখা হয়। যারা কিনা বছর খানেক আগে বাংলাদেশের সব চেয়ে উঁচু পাহাড় চূড়ায় উঠে এসেছেন বলে দাবী করলেন। যদিও মোদক মুয়াল নামটা তারা জানেন না। এইবার একটু কষ্ট পেলাম। কারণ আমাদের ধারণা ছিল প্রথম বাংলাদেশি দল হওয়ার গর্ব আমরা অর্জন করবো। কিন্তু তাদের কাছ থেকে যা বর্ণনা শুনলাম তাতে বুঝলাম তারা যে চূড়ার কথা বলছেন আর জিঞ্জ যেটার কথা বলেছে সে দুটি ভিন্ন চূড়া। তারা দলিয়ান পাড়ার কথা বলছিল বারবার। জিঞ্জের কোন তথ্য নেই তাদের কাছে। তাদের মাঝে যেটা দেখেছিলাম তা হল পাহাড়টা নিয়ে প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস, যেটাকে তারা বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চূড়া বলছেন।

জিঞ্জের স্থানাংক নিয়ে বিশদ লেখাপড়া করা ছিল বলে এটা নিশ্চিত ছিলাম এটা দলিয়ানের দিকে হতেই পারে না। যাহোক একটু খুশি হলাম, আমাদের লক্ষ্য এখন পর্যন্ত আমাদেরই আছে।

উনারা ২ জন হলেন, বাংলাদেশের খুব নিভৃতচারী পর্বতপ্রেমী, নীতিশদা এবং আরেকজন সম্ভবত ডাক্তার বিধান (বিজয়)। সেবারের পরে কখনো আমার সাথে আর তাদের দেখা হয়নি।

আমাদের মোদক মুয়াল সে যাত্রায় কোন ভাবেই হল না। আর এভাবে আসলে হয়ও না। মুষলধারে বৃষ্টি, কোন জিপিএস আনা হয় নাই, শুধু জানি তাজিং ডং থেকে আরও পূর্বে। আর জানি নাম মোদক মুয়াল। মজার ব্যাপার হল থানচি বাজারে ৩ দিন কারও সাথে কথা বলে মোদক মুয়াল কি জিনিস তা বুঝতে অথবা বুঝাতে পারিনি।

ব্যর্থ অভিযান শেষে ঢাকায় ফেরার পথে থানচি থেকে বলিপাড়া হেঁটে এসে দুধের স্বাদ ঘোলে মিটাই। যদিও আমার মতে কম উচ্চতার মাঝে এটা বাংলাদেশের সেরা দৃষ্টিনন্দন পাকা সড়ক। আসার পথে বলিপাড়ায় কাঠ কাটার বাঙ্গালি একটা দলের হেলাল ভাই নামে একজনের সাথে দেখা হয়। যার কাছ থেকে জীবনে প্রথমবারের মত আন্ধারমানিক, লিক্রে এই জায়গাগুলোর নাম শুনি। সেসময় থানচির উজানে বড় মোদক পর্যন্ত তথ্য ছিল আমার কাছে, এরপর সবকিছুই ছিল রহস্যময়। জীবনের অন্যতম সেরা কথোপকথন ছিল সেটা, যা ২০০৯ থেকে আমার পাহাড়ে যাওয়ার রাস্তাই পাল্টে দেয়।

বগালেক [ছবি: শামসুল আলমের আর্কাইভ হতে]

এরপর ৪ জনের একটি দল যাই বগালেক। পরবর্তী অভিযানের জন্য কিছু তথ্য সংগ্রহ করতে। সেখানে আবার দেখা হয়, ডি-ওয়ে এক্সপেডিটর’স খ্যাত জহিরুল ইসলাম আকাশ ভাই, শুভ ভাইদের সাথে। তারাও ১২ জনের বিশাল দল নিয়ে এসেছিল এবং ঝিরি পথ দিয়ে বগালেক আসতে গিয়ে পাহাড়ি ঢলে খুবই বাজে অবস্থায় পড়েছিল। পরের ৩ টা দিন দুই দল মিলে অনেক মজা করেই কাটাই বগালেকে, তথ্য সংগ্রহ আর হল না।

অতঃপর ঢাকা

ঢাকায় এসে আমি আর রুবেল ভাই গুগল আর্থ নিয়ে বসলাম। হঠাৎ ভাবনা আসলো, যদি থানচি দিয়ে যাওয়া যায়, তাহলে রুমা দিয়েও যাওয়া যাবে। হয়ত সময় একটু বেশী লাগবে। কিন্তু রুমা অঞ্চলে আমাদের নির্ভরযোগ্য লোক আছে। থানচিতে তেমন কেউ নেই। রুমা দিয়ে ঢোকাটাই তাই আমাদের জন্য সুবিধার হবে।

থাইক্ষিয়াং ঝিরি [ছবি: শামসুল আলমের আর্কাইভ হতে]

থাইক্ষিয়াং পাড়াতে আমাদের একজন দাদা আছেন, যিনি আমাদের পথ দেখিয়ে আগে তিন মাথা নিয়ে গিয়েছেন (জানুয়ারি, ২০০৭)। এদিকে রুমা থেকে আমরা থাইক্ষিয়াং পাড়া পর্যন্ত চোখ বন্ধ করেও চলে যেতে পারব। গুগল আর্থে এবার দেখার পালা থাইক্ষিয়াং থেকে জিঞ্জের সেই মোদক মুয়াল কতদূর!

যা দেখলাম তাতে চোখ ছানাবড়া। থাইক্ষিয়াং থেকে মনে হল মাত্র এক থেকে দেড় দিনের হাঁটা রাস্তা। তাও আবার মোটামুটি রেমাক্রি ধরেই পাহাড়টার কাছাকাছি চলে যাওয়া যাবে বলে মনে হল। আমি আর রুবেল ভাই সিদ্ধান্ত নিলাম আমরা রুমা দিয়েই ঢুকব। পাহাড়ে ঢোকার আগে আমরা দুই জন ছাড়া দলের কেউই জানবে না আমাদের আসল গন্তব্য। ঠিক হল আমরা যাত্রা করবো আগামী কোরবানির ঈদের পরের দিন রাতে।

পরের অংশ পড়ুন।

(Visited 1 times, 1 visits today)

8 Comments

  1. চোখের নিমিষেই শেষ হয়ে গেলো লিখাটা।
    আর এমন জায়গায় এনে ছেড়ে দিলেন…

  2. আমিও যেন হাটছি অইপ পথে,
    লেখা পড়ে, তাই মনে হচ্ছে বারবার,
    কালকের অপেক্ষায় থাকলাম।

  3. প্রথম বার লিক্রে যাই ২০০২সালে ।প্রথম অভিযাত্রী নিয়ে যাই খুব সম্ভবত ২০০৭/৮ সালে ঠেলা নৌকা দিয়ে /টিম মেট ছিলেন আবু বক্কর ভাই ।

  4. সাজ্জাদকে ধন্যবাদ লেখাটার জন্য, আমি অনেক আগে থেকে বান্দরবান যাই – রাইক্ষিয়াং লেক যাই ২০০০ সালে। আর কাজী হামিদুল হোক ভাই সহ বগালেক সার্ভে (উচ্চতা, গভীরতা) করি সেবছরই। তখনই জানতে পারি আমাদের বহু বহু আগেই এইসব অঞ্চলে বহু লোক এসেছে – মেপেছে – সবচেয়ে পুরাতন রেকর্ড পাই ১৮৫৬ (হ্যাঁ – ১৯৫৬ নয় ১৮৫৬) সালের। সেই ১৮৫৬ সালের মাপামাপি’র সময়ই ‘মোদক মোয়াল’ এর কথা জানা যায়। যার কথা আমার বই (২০০৭ এর ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত) তে আছে। ১৯৯৬ তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক তার পিএইচডি গবেষণার জন্য এই অঞ্চল সার্ভে করেন – উনি বইও লিখেছেন। আমি নিজেও ১৯৯৯ সাল থেকে পার্বত্য অঞ্চলে নানা জায়গায় গিয়েছি – এমন অনেক জায়গায় গিয়েছি যেখানে এখন এই সামাজিক যোগাযোগের চুড়ান্ত সময়েও কেউ যায় নি। উপরের লেখা পড়ে সেই সময়ের কথাগুলো মনের পর্দায় ভেসে উঠলো।

    • প্রিয় বাবু ভাই, আপনারা পথপ্রদর্শক, আপনারা ইতিহাস। সেই পুরোনো দিনের অভিযান গুলোর ঐতিহাসিক মূল্য অনেক। আমরা জানতে চাই আপনার সেই অভিযান গুলো সম্পর্কে, সামাজিক যোগাযোগের এই ব্যাপকতার যুগেও যেসব জায়গায় আমরা কেউ যেতে পারিনি। দয়া করে, উন্মুক্ত করুন গল্প গুলো। আমরা আলোকিত হই, শিহরিত হই, ইতিহাসও সমৃদ্ধ হোক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *