সম্পাদকের কথা
ধারাবাহিকের শুরুতে আমরা দেখি ২০০৭ সালের অক্টোবরে ঈদ উল ফিতরের বন্ধে নেচার অ্যাডভেঞ্চার ক্লাবের সদস্যদের প্রচুর বৃষ্টি ও ধসের কারণে থানচি থেকেই ফেরত আসতে হয়। এসময় তাদের সাথে সুব্রত দাস নীতিশের দেখা হয়। সেখানে তাঁদের কাছে খবর পান মোদকের দলিয়ান পাড়ার কাছে মোদক মুয়াল চূড়াটি তারা সামিট করে এসেছেন। তাদের মতে এটিই নাকি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চূড়া। পরের ঈদে নেচার অ্যাডভেঞ্চার ক্লাবের সদস্যরা সর্বোচ্চ চূড়ার সন্ধানে আবার যাত্রা করেন। সেই যাত্রায় তারা কি মোদক মুয়াল চূড়াটিই আরোহণ করে এসেছিলেন নাকি সন্ধান পেয়েছিলেন সাকা হাফংয়ের?- এই প্রশ্নের উত্তর মিলবে এই পর্বে।


প্রথম পর্বের পর

নভেম্বর, ২০০৭

দিন তারিখ মনে নেই। তবে রোজার ঈদ এবং কোরবানির ঈদের মাঝে কোন এক শনিবার প্রথম আলোর ‘ছুটির দিনে’ একটা লেখা বের হল । যতদূর মনে পড়ে “পাহাড় ঘুমায় মেঘের কোলে ওই ” [আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ঐ] এমন কোন নামে।

মোটামুটি ২০০৭ এর শুরুর পুরো সময়টাই তাজিং ডং যাওয়ার অনুমতি ছিল না। আর তখন পাহাড়ে যাওয়ার লোকও ছিল এখনকার তুলনায় একেবারেই কম। যারাই ছিলেন, তাদের বেশীর ভাগই তখন নেপালমুখী।

অনেক দিন পর বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল এসোসিয়েশনের অভিজ্ঞ একটা দল রোজার ঈদের ছুটিতে বাকত্‌লাই হয়ে তাজিং ডং যায়। বাকত্‌লাই গিয়ে, তারা জিঞ্জের গল্পটা শুনে। যে কিনা জিঞ্জকে গাইড করেছিল তার সাথেই তাদের কথা হয়। সেই দলের একজন ঢাকায় এসে গুগল করে জিঞ্জের উপর লেখা সেই ২ লাইন সহজেই পেয়ে যায়, যা কিনা আমরা প্রায় এক বছরেও বেশি সময় ধরে অতি গোপনে নিজেদের মাঝে রেখেছিলাম।

তারপর তারা তাদের তাজিং ডং ভ্রমণের গল্পটি প্রথম আলোতে দেয়, সেই গল্পে জিঞ্জের সেই মোদক মুয়ালের কথাও ছিল। আমি যখন ছুটির দিনে লেখাটা দেখি, সেটা ছিল আমার জন্য হৃদয় বিদারক। কারণ আমি বুঝতে পারছিলাম, এইবার কোন না কোন দল চূড়াটিতে লক্ষ্য স্থাপন করবেই। বিষয়টা যতটা না সবার আগে যাওয়ার ইস্যু ছিল, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল একটা বাক্সের মুখ খোলা।

আমার কাছে অবাক লাগত এই হাতে গোনা ২/৩ টা রুটের বাইরে কি আছে তা আমরা কেন জানি না। যখন আমি নিশ্চিত আমি কাউকে ফলো করে হাঁটছি না, সেই জিনিসটা আমাকে খুব টানতো। আসলে, দেশের যেটা সর্বোচ্চ চূড়া, সেটায় প্রথম, সবার আগে উঠতে কে না চায়। কিন্তু তার চেয়েও অনেক বড় নেশা হচ্ছে, একটা রুট ওপেন করা, একটা নতুন জায়গায় যাওয়া যেখানে আগে হয়ত কোন অভিযাত্রীর পায়ের ছাপ পড়েনি। সব মিলিয়ে প্রথম আলোর ওই সংখ্যাটা আমার জন্য হজম করা ছিল খুব কষ্টের।

কিন্তু আমার সেমিস্টার পরীক্ষা, দলের বাকিদের চাকুরীর ঝামেলার জন্য আমরা কোরবানির ঈদ (২০০৭) পর্যন্ত অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেই। এটা ছাড়া আমাদের কিছুই করার ছিল না। আমরা বুঝতে পারছিলাম, ঈদের পরদিন রওনা হওয়া মানে হয়ত ২/৩ দিন পিছিয়ে থাকা, কিন্তু আমাদের জন্য ঈদ বাসার বাইরে করার মত বাঁধনহারা হওয়ার সুযোগ কখনো আসেনি।

আবার জিপিএস আলম / আলম ভাই

ফেব্রুয়ারি ২০০৭-এ জিপিএস না থাকার কারণে রাইক্ষিয়াং লেকের উচ্চতা না মাপতে পারা আমাকে অনেক মানসিক পীড়া দেয়। ২/৩ মাসের মাঝে জিপিএস কেনার কথা থাকলেও আমাদের কেনা হয় নি। দেখতে দেখতে ডিসেম্বের মাস চলে আসে। অভিযানের আর এক মাসও বাকি নেই। রোজার ঈদের মত ভুল তো করা যাবেই না। দল যেমন ছোট হতে হবে তেমনি এবার জিপিএস লাগবেই।

আমি আর রুবেল ভাই আইডিবি গেলাম। ৩০ হাজারের নীচে জিপিএস নেই। দ্বিগুণের উপর দাম। মোটামুটি বুঝে গেলাম এবারও জিপিএস কেনা সম্ভব হচ্ছে না।

ফেব্রুয়ারীতে বগালেক থেকে আলম ভাই ফিরে আসার পর ফোনে যোগাযোগ হলেও সামনা সামনি তার সাথে আর দেখা হয়নি। আমিও নিশ্চিত ছিলাম আমাদের একসাথে আর পাহাড়ে যাওয়া হচ্ছে না।

হঠাৎ একদিন রুবেল ভাইয়ের সঙ্গে আলাপে আলাপে আলম ভাইয়ের প্রসঙ্গ উঠল। বললাম ‘উনি লোক ভালো। জিপিএস এর ব্যাপারে অগাধ জ্ঞান, মজার মানুষ। সব ঠিক আছে। কিন্তু বান্দরবানের পাহাড়ে যাওয়ার বিশদ অভিজ্ঞতা নাই। আগেরবার বগালেক থেকে ফেরত এসছিলেন। তাও গাড়িতে করে বগালেক গিয়েছিলেন। উনি জিপিএস ভাড়া দিলে সব চেয়ে ভালো, কিন্তু উনি কিভাবে এতদূর যাবেন আমি জানি না। সম্ভবই না’, আমার বক্তব্য ছিল এমনই।

রুবেল ভাই উনার সাথে দেখা করতে চাইলেন। আলম ভাইকে নিয়ে আমরা বসলাম এক সাথে। আলম ভাইকে জিপিএস ভাড়া দেওয়ার জন্য প্রস্তাব দিলাম। আলম ভাই সরাসরি জানিয়ে দিলেন উনার প্রিয় জিনিস উনি ভাড়া দিবেন না। উনাকে যদি সঙ্গে নেই আমাদের দলে, তাহলে উনার সাথে আমরা জিপিএস পাব। আমাদের উনাকে দলে ভিড়িয়ে নেওয়া ছাড়া আর কোন উপায় রইল না।

ডিসেম্বর, ২০০৭

ছোটবেলায় রোজার ঈদ প্রিয় ছিল কারণ রোজার ঈদে নতুন জামা পেতাম। কোরবানির ঈদ ভালো লাগত না। কোরবানির ঈদে একটা জুতা পেতাম শুধু। কিন্তু যখন এসএসসি পরীক্ষার পর থেকে ঘুরাঘুরি শুরু করলাম তখন থেকে কোরবানির ঈদ খুব পছন্দের আমার। এর একটা বড় কারণ অবশ্যই ঈদগুলো তখন শীতে পড়ত। সেটা অবশ্য দুই ঈদের বেলায়ই সত্য ছিল।

২০০৭/০৮ সালের কোরবানির ঈদের ছুটিটা বেশ স্পেশাল ছিল। কারণ ২০০৭ সালে আমরা ২ টা কোরবানির ঈদ পেয়েছিলাম। একটা ছিল জানুয়ারীর ১ তারিখ (২ তারিখ ও হতে পারে, খেয়াল হচ্ছে না। ১ হওয়ার সম্ভাবনা বেশী), আর একটা পড়লো ডিসেম্বরের ২১ তারিখ।

ডিসেম্বর মাস আমার এমনিতেই প্রিয় (স্কুল ছুটির মাস বলে)। তার উপর শীতকাল ও কোরবানির ঈদ। একেবারে সোনায় সোহাগা যাকে বলে। কিন্তু কোরবানির ঈদ ভ্রমণের জন্য বেষ্ট হওয়ার আরেকটা বড় কারণ হল অনেকের মত আমিও চাঁদ খুব পছন্দ করি। ভ্রমণের সময় বর্ধিষ্ণু চাঁদটা আমার খুব ভাল লাগে। কোরবানির ঈদের পরদিন বের হলে ২ দিন পর পূর্ণিমাটা পাওয়া যায়। পূর্ণিমার আগের রাত এবং পরদিনও প্রায় সমান বড় চাঁদ টা পাওয়া যায়।

তার মানে প্রিয় পাহাড়, প্রিয় কোরবানির ঈদের পরদিন বের হওয়া, পাহাড়ে হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডা তার উপর চাঁদ। এত কিছু যখন এক সাথে হয় তখন আর কিছু প্রত্যাশার করার আসলে বাকি থাকে না। ডিসেম্বরে কোরবানির ঈদের জন্য আমি আরও ২৫ টা বছর বাঁচতে চাই এবং সেই ঈদের পরদিন আমি আবার পাহাড়ে যেতে চাই।

বিচিত্র দল

আমরা ৬ জনের একটা মাঝারি বড় দল। দলে ছিলাম আমি, ছিল হান, জিপিএস আলম ভাই, শহিদুল্লাহ ভাই, শাকিল ভাই আর রুবেল ভাই। খুব বাজে কিসিমের দলই ছিল আমাদের। বাজে বলার কারণ আমাদের সবার বিচিত্র পেশা, বয়স, শারীরিক আকার। হান আর আমার বয়স ছিল ২২ বছর আর আলম ভাইয়ের বয়স ছিল ৪০’র কাছাকাছি। রুবেল ভাই শহিদুল্লাহ ভাই আর শাকিল ভাইয়ের বয়স ৩১/৩২। দলনেতা ছিলেন রুবেল ভাই যাকে হান ডাকতো ‘পাহাড়ি ভাল্লুক’ বলে। আমার মতে রুবেল ভাই হলেন পৃথিবীর সবচেয়ে ধীরগতির ট্রেকার।

শুরুতে কেবল আমি আর রুবেল ভাইই বিশদ লক্ষ্যটা জানতাম। হানের জন্য এটা শুধুমাত্র আরেকটা পাহাড় অভিযান। আমার খুব প্রিয় এই বন্ধুটি আমার জীবনের সেরা প্রাপ্তি। আমরা ২ জন পুরো ২ রকম মানুষ হলেও আমরা পাহাড় বুঝতাম ২ জনের চোখের ভাষা দিয়ে। ট্রেকের মাঝে আমাদের তাই কথা বলতে হত না।

শহিদুল্লাহ ভাইয়ের জন্য পাহাড়ের ছবিটাই মুল। একটা ভিডিও ক্যামেরা, আর একটা বিশাল ব্যাগ, সেই সাথে রাতে অসাধারণ আবৃতি। তার একটা বিশাল সম্পদ ছিল খাস চিটাগাংয়ের ভাষায় কথা বলার দক্ষতা। যা আমাদের স্থানীয় বাজার ঘাটে কাউকে কৌতূহলী না করে এড়িয়ে যেতে সাহায্য করতো।

আলম ভাইয়ের জন্য এটা হয়ে গেল আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার অভিযান। প্রথম বার বগালেক থেকে ফিরে গিয়ে উনি যারপরনাই লজ্জিত ছিলেন আমার কাছে (যদিও আমি কাউকে কোনদিন লজ্জা দেইনি)। বিশেষ অনুরোধে, এইবার ল্যাপটপটা নেননি। কিন্তু ৪ কেজি ওজনের জিপিএস ব্যাটারিটা ঠিকই আছে। এই ব্যাটারির মহত্ত্ব হল, জিপিএস যন্ত্রটিকে সর্বক্ষণ সার্ভিস দেওয়া লাগবে। ওর বন্ধ হওয়া যাবে না। পেন্সিল ব্যাটারি দিয়ে এই কাজটি করলে ভালো অঙ্কের খরচ আছে বিধায় এই ৪ কিলোর ব্যাটারি পাহাড়ে টেনে আনা। সাথে নাইকনের একটা ভারি ডিএসএলআর তো আছেই।

শাকিল ভাইয়ের জীবনের প্রথম পাহাড় দর্শন। কর্মসূত্রে উনি আরব আমিরাত থাকতেন। ছুটিতে দেশে এসে রুবেল ভাইয়ের ডাকে মোদক মুয়াল যাচ্ছেন। যিনি কিনা বগালেক কি তাও জানেন না তখন।

মুনলাই পাড়া । ২৩ ডিসেম্বর, ২০০৭

মুন বা চাঁদ থেকেই হয়ত এই পাড়ার নাম টা এসেছে কিনা আমি নিশ্চিত না। কিন্তু রুমা থেকে মাত্র ৪ কিলোমিটার দূরে বগালেকের পথে এই বম পাড়াটি খুব আধুনিক এবং মানুষগুলোও খুব ভালো। রুমা বাজারে সেদিন উপচে পড়া ভিড়। তখন হোটেল কেওক্রাডং ও হিলটন ছাড়া আর কোন হোটেল ছিল না থাকার জন্য। এমন ভিড়ের সময় তখন রুমা বাজারে থাকার বিকল্প ব্যবস্থা ছিল দোকানের মাঝে থাকা।

রুবেল ভাইয়ের ইডেন পাড়ায় থাকার ইচ্ছা হলেও, আমি তাকে ফুসলে মুনলাই পাড়ায় নিয়ে গেলাম। আমার যুক্তি ছিল পরদিনের জন্য আমি ৪ কিলোমিটার এগিয়ে থাকবো।

সে রাতটা খুব ঠাণ্ডা ছিল, কিন্তু আমাদের জন্য কম্বল ছিল মাথা পিছু ৪টা বা তারও বেশী। বিশাল কম্বলের গোডাউন ছিল বন্ধু পরিবারের। আমরা পাহাড়ে মাথার নিচে কম্বল দিয়ে আরেক কম্বল পেঁচিয়ে বালিশ বানাতে পারাকে বিলাসিতা ধরি। সে রাত টা ছিল বিলাসিতার।

মুনলাই পাড়ার স্থানীয়দের সঙ্গে [ছবি: শামসুল আলমের আর্কাইভ হতে]

২৪ শে ডিসেম্বর , ২০০৭

মুনলাই পাড়ার সকালটা ছিল অনেক কুয়াশাময়। বগালেক যাওয়ার গাড়ীর রাস্তা দিয়ে হাঁটা দিলাম আমরা। দলের স্থুলকায় তিনজন অবশ্য মাঝে গাড়ী পেয়ে কিছুদুর এগিয়ে গেল। আমি, হান আর শাকিল ভাই হেঁটেই চললাম। তখন একটা চেতনা কাজ করত আমার মাঝে, রুমা পার হওয়ার পর কোন গাড়ী চড়া যাবে না। চড়লে আমার জাত চলে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।

বলা ভালো আমাদের সাথে কোন গাইড ছিল না। বগালেক পৌঁছে ওখানকার বন্ধুদের মুচলেকায় নাম লিপিবদ্ধ হল। ব্যাপারটা এমন দাঁড়ালো, আমরা বড়দিন পালন করতে এসেছি বন্ধুর কাছে। যতদিন মন চায় থাকবো, ঘুরব, ফিরবো। আমরা আছি বগালেক, সমস্যা নেই কোন।

বগালেক পাড়ায় ঢুকলাম যতদূর মনে পরে দুপুর ২.৩০ টায়। গরম ভাত, ডিম ভাজা, মিষ্টি কুমরার তরকারি, সাথে ডাল খাওয়া হল। সব কিছুই খুব দ্রুত করা হল।

অতঃপর ,পড়ন্ত বেলায় আমরা যখন চিংড়ি ঝর্ণা পার হচ্ছি তখন ঘড়ির কাটায় ৪.৩০ বাজে। ৬ জনের দল নিয়ে আমরা তখন রীতিমতো ধুকছি। প্রায় রুমার কাছ থেকে সকালে বের হয়েছি, লক্ষ্য থাইক্ষিয়াং। এবং সে দলে একজন আছেন যিনি আগেরবার গাড়িতে উঠে ফেরত গিয়েছিলেন বগালেক থেকে। অনেক বলার পরও উনার বিশাল ব্যাগ, সাথে ৪ কেজি ওজনের জিপিএসের জন্য ব্যাটারি তো আছেই। তাছাড়া আছে সাথে দুবাই ফেরত শাকিল ভাই, যে জীবনে পাহাড়ে যায়নি।

এর মাঝেই আমাদের আবার মিনি দল হয়ে গেছে, আমি, হান আর শাকিল ভাই থাকি মোটামুটি আগে ভাগে। তার পেছনে শহিদুল্লাহ ভাই ও আলম ভাই, যারা কিনা মানিক জোর উপাধি পেয়েছিলেন ভ্রমণ শেষে। আর সবার পেছনে রুবেল ভাই। সাধারণত দলনেতা ভালো হাঁটবে ধরে নেওয়া হয়। কিন্তু রুবেল ভাইকে আমাদের থাইক্ষিয়াং পাড়ার দাদা ‘কচ্ছপ’ বলে ডাকতে বেশি পছন্দ করতেন। কোন পথে দাঁড়িয়ে নামতে আত্মবিশ্বাস না পেলে রুবেল ভাই গড়িয়ে গড়িয়ে নামতেন। কিন্তু কখন পারব না এই কথা শুনিনি তার কাছে।

সে যাই হোক দার্জিলিং পাড়ায় যাওয়ার আগেই আলম ভাইয়ের সেই ৪ কেজি ওজনের জিপিএসের ব্যাটারির ব্যাগটা আমার কাঁধে চলে আসল। আমি তখন ২২ বছরের টগবগে তরুণ। এগুলো তখন কোন ব্যাপারই না।

প্রায় পূর্ণ চন্দ্র রাত আর ঠকঠকানি ঠান্ডায় রাত ৯ থেকে ৯.৩০ টার দিকে কেওক্রাডং আরোহণ করি। অত রাতে কেওক্রাডং আরোহণ করা এক অনন্য অভিজ্ঞতা। তখন ২০০৭ এ কোন দোকান, কটেজ বা আর্মি ক্যাম্প কিছুই ছিল না। দুঃখ লাগে কেওক্রাডং আর কোনদিনই অমন হবে না।

আমরা কেওক্রাডং পার হয়ে গাড়ীর রাস্তা ধরেই থাইক্ষিয়াং পাড়া এগুতে লাগলাম। যদিও স্থানীয় কেউ ছিল না, কিন্তু ওপথে পথ হারানোরও কিছু ছিল না। যখনই বসা হয় লম্বা লম্বা বিরতি। একটা সময় মনে হচ্ছিল, এই রাত বোধ হয় কোনদিন শেষ হবে না আর। যেটা ২ দিনের রাস্তা সেটা আমরা ১ দিনে পার করছি শুধু মাত্র বড়দিনটা থাইক্ষিয়াং পাড়াতে দাদার সাথে কাটানোর জন্য। অবশেষে রাত ১ টার দিকে দূরে পাহাড়ে কুপির আলো চোখে পড়লো, ওটাই থাইক্ষিয়াং পাড়া। দাদার ঘরে যখন ঢুকি তখন রাত ২ টা বাজে।

২৫ শে ডিসেম্বর । বড়দিন

এটা আমার একটা শখ ছিল, বড়দিনে পাহাড়ে থাকবো। বড়দিনে দাদা পাড়াতেই থাকবেন, বের হবেন না। অবশ্য এমন আবদার করাও পাপ। মাঝে একবার আমরা ভেবেছিলাম থাইক্ষিয়াংয়ের আশেপাশে জলপ্রপাত কিছু দেখে আসি। কিছুই হল না। দুপুরে সাদা ভাত, ডিম ভাজা দিয়ে খাওয়া বাদে সারাদিন গড়িয়ে গড়িয়েই কাটে। সন্ধ্যা বেলায় গড়াতে গড়াতে বিরক্ত হয়ে ঘর থেকে বের হই।

থাইক্ষিয়াং পাড়া [ছবি: শামসুল আলমের আর্কাইভ হতে]

বড়দিনে পাড়ায় একটা নিলামের মত হয়। নিলামের টাকাটা চার্চে যায়। যার যা আছে, নিলামে উঠে। ডিম, মুরগিসহ যেকোন কিছু। রাতে আমরা দাওয়াত পাই পাড়ার কারবারি দাদার কাছ থেকে।

চার্চের বাইরে দাঁড়িয়ে বড়দিনের প্রার্থনা শুনছিলাম, দূরে চাঁদের আলোয় আলোকিত পাহাড় সারি। এখনো অনুভুতিটা মাঝে মাঝে ভর করে বসে। প্রার্থনা শেষে সবার সাথে কোরাস করতে করতে আমরা দাওয়াতে যাই। সাদা ভাতের সাথে গরুর ব্যবস্থা ছিল। খেয়ে আমরা কারবারির ঘরে বসে থাকা অবস্থায় কিছু বাঙ্গালীর কথার শব্দ শুনি। রাত তখন প্রায় ১০ টা বাজে। একটু চমকে যাই, কারণ আমাদের এখানে থাকার কথা ছিল না। আমাদের থাকার কথা বগালেক । প্রথমে একটু চমকে উঠলেও পরে অবশ্য বুঝতে পারলাম, কোন নিরাপত্তা বাহিনীর কেউ না।

ঘর থেকে বের হয়ে একটা ৩ জনের এক বাঙ্গালি দলের [মাউন্টেইন ট্রেকার্স ক্লাব] সঙ্গে দেখা হল। দুই একটা কথা যা হয়েছিল তাতে তারা দাবি করেন, তারা দক্ষিণ দিক থেকে এসেছে। তাদের দলের বাকি অর্ধেক অংশ বাকত্‌লাই পাড়ায় অবস্থান করছেন। তারা দাবি করে বসেন, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চূড়া আরোহণ করে এসেছেন। তারা নাকি চূড়াটির নাম দিয়েছে ‘স্বপ্নচূড়া’ এবং এই নামটিকেই প্রতিষ্ঠা করবেন। পাহাড়ের বাংলা নামকরণ আমার চিন্তাধারার পূর্ণ বিপরীত দেখে কথা আর সামনে এগোয় না। বিদায় নিয়ে চলে আসি।

আমরা ততক্ষণে মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গিয়েছি এই দল, ছুটির দিনের সেই লেখা অনুসরণ করেই এসেছে। সেই কাঙ্ক্ষিত পাহাড় চূড়া আরোহণ করেই এখানে এসেছে। আমাদের, বিশেষ করে আমার আর রুবেল ভাইয়ের মনের অবস্থা কতটা ভেঙে গিয়েছিল তা এত বছর পরেও আমার মনে পড়ে।

রাতটা খারাপ ছিল, খুব খারাপ। কিন্তু পরদিন সকালে একটা নতুন দিনের অপেক্ষায় রইলাম। বলে রাখা ভালো, আমাদের থাইক্ষিয়াং পাড়ার দাদাকে আমরা গুগল আর্থের সহায়তায় বানানো প্রমাণ আকারের ম্যাপ দেখাই এবং উনি দাবি করেন, ওই অঞ্চলে ২৫ বছর আগে তিনি শিকার করতে গিয়েছিলেন।

মন খারাপের মাঝেও একটা চরম উত্তেজনা ছিল। যে পথটায় কাল যাবো সে পথের ব্যাপারে কোন তথ্য নেই। ট্রেক শুরু করার কয়েক ঘণ্টার মাঝেই রেমাক্রি খাল পাব। আমার কাছে রেমাক্রি তখন গুগল আর্থে দেখা মানুষের মস্তিস্কের মত প্যাঁচানো একটা পাথুরে ভয়ংকর ঝিরি, যার বেশির ভাগ অংশে মানুষ যেতে পারে না।

শেষ অংশ পড়ুন

(Visited 1 times, 1 visits today)

Leave A Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *