প্রচ্ছদ ছবি কৃতজ্ঞতা Sandro-Gromen-Hayes


আফগানিস্তান…বর্তমান প্রজন্মের আমরা নামটি শুনলেই চোখে ভেসে ওঠে লাদেন-বুশের যুদ্ধ, তালেবানদের জন্মভূমি এবং যুদ্ধবিদ্ধস্ত একটি দেশ। কিন্তু একটা সময় দেশটি ছিল পৃথিবীর স্বর্গ। রবীন্দ্রনাথের কাবুলিওয়ালা সুদূর কাবুল থেকে কলকাতায় এসে ফল বিক্রি করত। মুজতবা আলীর শবনম পড়ে কাল্পনিক শবনমের প্রেমে পড়েনি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। আফগানিস্তানের মেয়ে শবনম মানুষকে ভালবাসতে শেখায়, ভালবাসার মানুষের জন্য অপেক্ষা করতে শেখায়। এত সমৃদ্ধ সংস্কৃতির একটি দেশ বিভিন্ন যুদ্ধ বিগ্রহে আজ মৃতপ্রায়। দীর্ঘদিন ধরে চলা ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং তালেবান শাসন আর বিশ্ব রাজনীতি মিলে দেশটিকে পঙ্গু করে ফেলেছে। এ দেশে মেয়েদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পাওয়া এখন কল্পনা করাও কষ্ট। তালেবান মোল্লাদের বিভিন্ন ফতোয়া পার করে স্বাধীন জীবন যাপন সেখানে এক প্রকার অসম্ভব। কিন্তু ইচ্ছা থাকলেই যে অনেক অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায় তারই উদাহরণ স্থাপন করল আফগান মেয়েরা। 

গত বছরের জুলাইয়ে আফগানিস্তানের সর্বোচ্চ পর্বত ২৪,৫৮০ ফুট উচ্চতার মাউন্ট নোশাক সামিট করেছে মেয়েদের একটি দল। যত সহজে আমার লেখাটি আপনারা পড়ছেন বা যত সহজে আমি লিখছি, গল্পটি এতটা সহজ ছিল না। তালেবান শাসিত আফগানিস্তানে মেয়েদের ঘরের বাইরে বের হওয়াই যেখানে নিরাপদ না, সে দেশের মেয়েদের পর্বত আরোহণ কল্পনা করতে কষ্ট হওয়া স্বাভাবিক। আজকের গল্প তাঁদের এই কষ্টকর সংগ্রাম নিয়েই…

হানিফা ইউসুফি, কাবুলের আর দশটা সাধারণ মেয়ের মতই তার বেড়ে ওঠা। তার বাবা মা কখনই তার জন্মদিন পালন করেনি। এমনকি হানিফা তার বয়সটাও নিশ্চিত করে বলতে পারে না। অনুমানের উপর নির্ভর করে বলে তার বয়স হয়তো ২৩ বছর হবে। দারিদ্রের মধ্যে দিয়ে বেড়ে উঠে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করাও হয়ে ওঠেনি কখনও। ভাল ইংরেজিও বলতে পারেনা সে।  ছোটবেলার কোন সুন্দর স্মৃতি সে মনে করতে পারে কিনা জিজ্ঞেস করলে জবাব দেয়, ‘খুবই অল্প!’ অন্য সব মেয়ের মত মাত্র ১৪ বছর বয়সে তাঁকে বিয়ে দেওয়া হয় বয়স্ক এক পুরুষের সঙ্গে।

বিয়ের পর সে চলে যায় পাকিস্তান। তার কথায়, ‘বাসার অন্য সব মেয়ে স্কুলে যেত কিন্তু আমি যেন তাদের রান্না করার আর ঘর পরিষ্কার করার চাকর ছিলাম।’ সেখান থেকে পালিয়ে যাবে তারও কোন উপায় ছিল না। ফতোয়ায় পড়ে তার জীবন তো যাবেই, তাঁর পরিবারটিও হয়তো ধ্বংস হয়ে যেতে পারে শুধু তাঁর জন্য। কিন্তু অনেক কষ্ট করেও সে অভ্যস্ত হতে পারেনি এমন জীবনের সাথে। দুই বছর পর সে পালিয়ে চলে আসে আফগানিস্তানে। কাবুলে নিজ বাড়িতে ফিরে আসার আগে সে ভয় পাওয়া শুরু করে হয়তো তাকে জায়গা দেওয়া হবে না। অন্যান্য মেয়েদের মত হয়ত তাকে একঘরে করা বা এসিডে ঝলসানো হবে কিংবা নাক কেটে দেওয়া হবে, হত্যাও করা হতে পারে। কারণ তাঁর অপরাধ সে পরিবারকে লজ্জায় ফেলেছে। কিন্তু এইসব বিপদের সম্ভাবনা থাকা সত্বেও পরিবার তাঁকে গ্রহণ করে। পালিয়ে আসার পর হানিফা একেবারেই চুপচাপ হয়ে পড়ে। ঘর থেকে খুব একটা বের হতনা সে। হানিফার ভাষায়, ‘আমি সবকিছু অপছন্দ করা শুরু করেছিলাম। জীবনটা আর ভাল লাগত না। খালি মনে হত মানুষ আমাকে নিয়ে বাজে কথা বলবে। আমি কোথাও বের হতাম না।’

বছর তিনেক আগে হানিফা Ascend এর নাম শোনে তার কাজিন সগুফার কাছ থেকে। সগুফাই তাকে Ascend-এ যোগ দিতে উৎসাহিত করে। Ascend হল আমেরিকার সাবেক আন্তর্জাতিক উন্নয়ন কর্মী ম্যারিনা লিগ্রির গড়ে তোলা একটি নন প্রফিট অর্গানাইজেশন যা গঠিত হয় ২০১৪ সালে। পরবর্তীতে এই সংগঠনটিতে বিখ্যাত কয়েকজন এথলেট যোগ দেয়। যার মধ্যে এমিলি ড্রিংকওয়াটার, আল্ট্রারানার মেগান কিমেল, মাউন্টেন গাইড ড্যানিকা গিলবার্ট উল্লেখযোগ্য। তারা টিমকে ফার্স্ট এইড দেওয়া থেকে শুরু করে টিমকে নেতৃত্ব দেয়ার দায়িত্বে ছিল। সংগঠনটির লক্ষ্য ছিল এথলেটিক্স এবং লিডারশিপ স্কিল ডেভেলপ করার মাধ্যমে আফগান নারীদের ক্ষমতায়ন। বিভিন্ন ফিজিক্যাল ও আউটডোর অ্যাক্টিভিটি যেমন হাইকিং, ক্লাইম্বিং বা মাউন্টেনিয়ারিংয়ের সঙ্গে সঙ্গে সংগঠনের কর্মীরা স্থানীয় উন্নয়নকাজে অংশ নেয়া এবং বিভিন্ন ওয়ার্কশপ করার সুযোগ পায় যা তাদের আত্মসম্মান ও আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করে।

দলের সঙ্গে এইসকল এক্টিভিটিতে জড়িয়ে হানিফা আবার আত্মবিশ্বাস ফিরে পেতে শুরু করে। মাউন্টেনিয়ারিং একসময়ের কুঁজো হয়ে হাঁটা হানিফাকে উর্ধ্ব শিরে হাঁটা শেখায়। সে তার জীবনের আশা ফিরে পেতে শুরু করে। Ascend এর প্রোগ্রাম অ্যাসিস্ট্যান্ট হয়ে এখন সে তাঁর পরিবারকেও কিছুটা সাহায্য করতে পারে। সে এখন অন্য মেয়েদের ক্লাইম্বিং শেখায়। 

অন্যান্য অনেক মেয়েদের জন্য যেখানে Ascend-এ যোগ দেওয়াটা ছিল নিছক আনন্দ কিংবা কিছু একটা আঁকড়ে থাকা। সেখানে হানিফার জন্য ব্যাপারটি ছিল টিকে থাকার লড়াই। দুই বছর ধরে সে প্রশিক্ষণ নিতে থাকে, নিজেকে প্রস্তুত করতে থাকে মাউন্ট নোশাক বেইজ ক্যাম্প পর্যন্ত যাওয়ার জন্য। ছোটকাল থেকে যন্ত্রনার মধ্যে বেড়ে ওঠা, তাকে সাহায্য করেছে পর্বত অভিযানের চড়াই উৎরাইগুলি পার হতে। ক্লাইম্বিং করার সময় তার মুখ থেকে কেউ কখনও কোন অভিযোগ শোনেনি। ক্লান্ত হয়েছে, পিপাসায় কাতর হয়ে গিয়েছে কিন্তু অভিযোগ না করে, হাল না ছেড়ে দিয়ে সে উঠে চলেছে উপরের দিকে।

কিন্তু পর্বত আরোহণ সবসময় কঠিন। মাউন্ট নোশাক কতটা কঠিন হতে পারে তা ছিল তাদের সবার ধারণারও বাইরে। এবার সে গল্পে আসা যাক। নোশাক পর্বত ঠিক টেকনিকাল কোন পর্বত না হলেও একে কঠিন করে তুলেছে এর দুর্গমতা। আফগানিস্তানের উত্তর-পূর্ব দিকের হিন্দুকুশ পর্বতশ্রেণিতে অবস্থিত মাউন্ট নোশাকের ডিটেইল্ড কোন টপো ম্যাপও নেই। সামিট রুট সম্পর্কে পাওয়া তথ্যের পরিমাণও অপ্রতুল। যা তথ্য পাওয়া যায় মাউন্ট নোশাককে নিয়ে তা থেকে জানা যায় ৬০ এবং ৭০ এর দশকে এখানে কিছু অভিযান হয়েছে। ১৯৬০ সালে জাপানিজ একটি টিম প্রথম পর্বতটির শিখরে ওঠে। সোভিয়েত আগ্রাসনের পর থেকে এদিকে অভিযাত্রীরা খুব একটা আসতে পারেনি। যে কারণে এটার সামিট, ইনজুরিজ, ফ্যাটালিটি রেট নিয়ে খুব একটা তথ্য পাওয়া যায় না। কিন্তু একটা ব্যাপারে সবাই নিশ্চিত, কখনও মাউন্ট নোশাক আফগান কোন নারী আরোহণ করেনি।

স্থানীয় আফগান নারীরা ascend এ যোগ দিতে চাইলে আগ্রহীদের একটি প্রাথমিক সাক্ষাৎকার গ্রহণের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। সাক্ষাৎকারে তাদের বাছাই করা হলে সকলকে তাদের নিজ নিজ পরিবারের অনুমতি নিতে হয়। পরিবারের পিতার অমতে এখানে কোন মেয়েই কোন কিছুতে চাইলেও অংশ নিতে পারবে না। ধর্মীয় গোঁড়ামি ও তালেবান শাসনের ফলে দেশটিতে এখনও অনার কিলিং চালু রয়েছে। পরিবারের কোন পুরুষ যদি মনে করে তাদের পরিবারের সম্মান নষ্ট করছে বা করতে চলেছে পরিবারটির কোন মেয়ে, সে চাইলেই মেয়েটিকে যে কোন ধরনের শাস্তি দিতে পারে। সেদিক থেকে Ascend-এ যোগ দেয়া প্রতিটি মেয়েই নিজের ও তার পরিবারের উপর ঝুঁকি নিয়েই যোগ দেয়।

হানিফা, সগুফা, ফ্রেসতা ইব্রাহিমি ও নেকি হায়দারী- এই চারজনকে মাউন্ট নোশাক এক্সপিডিসনের জন্য বাছাই করা হয়েছে। মাত্র কয়েক বছর আগেও এদের কেউ কখনও ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করতে পারত না কোন পর্বতের উঁচু-নিচু টেরেইনে যাওয়ার কথা।

কিন্তু অভিযান শুরু হওয়ার আগে দরকার প্রস্তুতি। যে দেশে মেয়েদের খেলাধুলা করা ভাল চোখে দেখা হয় না সেখানে মেয়েদের পর্বত আরোহণের ট্রেনিং নেওয়াটা কতটা কঠিন হতে পারে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। যে কারণে সকল এক্সারসাইজ যতটা পারা যায় লোকচক্ষুর আড়ালে কর‍তে হয়। এই অভিযানের সবথেকে বড় সমস্যা দেখা দেয় সকলের শারীরিক ফিটনেস। বাড়ির বাইরে ট্রেনিং এক্সারসাইজের জন্য অনুকূল পরিবেশ পাওয়া খুবই কঠিন। বাইরের পরিবেশ মেয়েদের জন্য মোটেই নিরাপদ না।

দুই বছর আগে ২০১৭ সালের মার্চে মেয়েদের দলটি কাবুল শহরের উপকণ্ঠে একটি পর্বতে অনুশীলন করতে যায়। সব ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু তারা যখন নেমে আসছিল, স্থানীয় কিছু বখাটে তরুণ তাদের দেখে উত্যক্ত করতে শুরু করে। প্রথমদিকে কটুকথা, গালিগালাজে সীমাবদ্ধ থাকলেও খুব শীঘ্রই তা শারীরিক আক্রমণে রূপ নেয়। তারা মেয়েদের দিকে গুলতি দিয়ে পাথর ছুড়ে মারছিল। তাড়াতাড়ি করে মেয়েদের দলটি সেদিন পাহাড় থেকে নেমে কাবুলে চলে আসে। 

এই ঘটনার পর মেয়ের আরও বেশি প্রত্যয়ী হয়ে উঠে। সগুফা, নেকি, ফ্রেসতা ও হানিফার জন্য নোশাক সামিট করা এটাই প্রমাণ করবে এই সমাজ মেয়েদের যতটা দূর্বল ভাবে তা একদম  সঠিক নয়। 

কয়েক বছর ধরে কয়েকবার চেষ্টা করা হয় সব ঠিক করে শুরু করতে। কিন্তু বারবার পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে থাকে বিভিন্ন কারণে। কোনবার নিরাপত্তার জন্য, কোনবার প্রশিক্ষণের বিরতি আবার কোনবার হয়তো যথেষ্ট অর্থ সংগ্রহ করতে না পারা। কোন না কোন কারণে বারবার পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে থাকে Ascend-এর। 

অবশেষে ২০১৮ সালেরর জুলাইতে সবকিছু একসাথে করতে পারে সংগঠনটি। কিন্তু অভিযান শুরুর মাত্র কিছুদিন আগে অভিযানটি আবারও প্রায় ভেস্তে যাচ্ছিল! ড্যানিকা গিলবার্টের ছিল এই অভিযানটির নেতৃত্ব  দেয়ার দায়িত্ব। কিন্তু কলোরাডো মাউন্টেনে এক অভিযানে ড্যানিকার পার্টনার মারাত্মক আহত হবার কারণে ড্যানিকাকে ওখানে থেকে যেতে হয়। দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব এসে পড়ে এমিলির কাঁধে।

অভিযান শুরু হতে আর মাত্র দুইদিন। দুইদিন পর অভিযাত্রী দলটির বদকশানের উত্তরাঞ্চলের একটি গ্রাম ইশকাশিমে যাওয়ার কথা, যেখান থেকে তাঁদের অভিযানটি শুরু হবে। এমন সময় তাঁরা আবার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। মাউন্ট নোশাকের সাথের একটি গ্রাম ‘যেবাকে’ তালিবানদের একটি দল আক্রমণ করেছে। ওদিকে যাওয়া এখন মোটেই নিরাপদ না। ম্যারিনা আবার নতুন করে নেগোশিয়েট করে চার্টার্ড এয়ারলাইনের সাথে। অপেক্ষাকৃত নিরাপদ একটি গ্রামে তাদের পৌঁছে দেয়ার জন্য এয়ারলাইনটিকে অনুরোধ করে ম্যারিনা। সেখান থেকে তাঁরা বেইজ ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে ট্রেক শুরু করবে।

অবশেষে সব বাধা বিপত্তি পার করে এমিলির দলটি এক্সপিডিশনের জন্য রওনা হয়। এত এত অনিশ্চয়তার পর অভিযানটি শুরু করতে পারাটা দলের সদস্যদের জন্য একপ্রকার মুক্তিই ছিল বলা যায়।

অভিযানের শুরুটা ভালই হল। চারিদিকে সূর্যস্নানরত সুউচ্চ পর্বতমালা, উষ্ণ বাতাসের ঝিরিঝিরি বয়ে চলা, হাতের ডানে পাহাড়ি খরস্রোতা এক নদী বয়ে চলেছে অবিরাম। এসবের মধ্যে দিয়ে হেঁটে চলেছে অভিযাত্রীরা। তাদের পায়ের তলায় উড়ছে ধুলো। বাতাসে ছড়িয়ে দিচ্ছে বুনো ল্যাভেন্ডারের মন পাগল করা গন্ধ। কিন্তু এই স্বর্গের মাঝেও রয়ে গিয়েছে মানুষের তৈরি করা নরকের উপাদান। সামনে থাকা এক গাইড একটি সাদা পাথর দেখিয়ে বলল, ‘সবসময় এই ট্রেইলের মধ্যে থাকবেন। আমরা একটি মাইনফিল্ডের মধ্যে আছি। আর এটিই একমাত্র রাস্তা যা থেকে মাইন সরানো হয়েছে। আশেপাশের কোন রাস্তাই পরিষ্কার না!’

রাস্তাটুকু সাবধানে পার হয়ে এল ওরা সবাই। এমিলির হিসেবে এক্সপেডিশনটি শেষ করতে লাগবে মোটামুটি ২৮ দিন। বেইজক্যাম্পে কিছুদিন থাকা হবে এক্লিমাটাইজেশনের জন্য। তারপর তারা আস্তে আস্তে উপরে উঠবে রেকি করে ধীরে ধীরে উপরের ক্যাম্পসাইটে চলে যাবে। সেখানে তারা তাদের সাথে থাকা খাবার ও গিয়ার রেখে আবার কিছুটা নিচে নেমে এসে থাকবে। বেইজক্যাম্পে ভালই ভালই কেটে গেল ছয়টা দিন।

অভিযানের সপ্তম দিনে এমিলি সিদ্ধান্ত নিল দলের মেয়েদের নিয়ে ১৮ হাজার ফিট উচ্চতায় ক্যাম্প ওয়ানে সাপ্লাই নিয়ে যাবে। ফ্রেসতার কয়েক মাস আগে হওয়া ব্যাক ইনজুরির ব্যথাটা নতুন করে হওয়াতে সে আর যেতে পারবে না।
 
বেইজ ক্যাম্প থেকে বের হয়ে কিছুদূর এগিয়ে যেতে সবাই দেখল তাদের সামনে বেশ উঁচু আর খাড়া একটি বরফে ঢাকা ঢাল উঠে গেছে। একেজনের পিঠে প্রায় ৪৫ পাউন্ড ওজনের ভারি ব্যাকপ্যাক। এই ব্যাকপ্যাক নিয়ে উঠতে গিয়ে কষ্টটা সবার আরও বেশি হচ্ছিল।

সগুফা বেশ কিছুক্ষণ ধরেই অভিযোগ করে চলেছে যে তার পেটে ব্যথা হচ্ছে। আর নেকি ওর ক্র‍্যাম্পনে বেঁধে বারবার হোঁচট খাচ্ছে, কখনও বা পড়ে যাচ্ছে। এই অবস্থা দেখে এমিলি নেকিকে নিচে নেমে যাওয়ার কথা বলে। কারণ নেকির গতি খুব বেশি ধীর হয়ে পড়ছে আর তার থেকেও বড় কথা সে এখন আর ঠিকমত তাল মিলিয়ে হাঁটতে পারছে না। নেকিকে কথাটা বলার পর স্বাভাবিকভাবেই সে মানতে চায়নি। কিন্তু তা ছাড়া আর করার কিছুই ছিল না। নেকি বুঝতে পারছিল সে যদি বেইজ ক্যাম্পে ফিরে না যায় তাহলে এক্সপেডিশন বাতিল করে তাদের সবাইকেই নিচে নেমে যেতে হবে। তাই আর সে কাউকে কোনকিছু না বলে উঠে দাঁড়ায় আর নিচের দিকে রওনা দেয়।

উপরে উঠার সময় দলের চারজন মেয়ের মধ্যে হানিফাই সবথেকে কষ্ট সহিষ্ণু ছিল। সব কষ্ট সহ্য করে সে উপরে উঠছিল এক পা এক পা করে। সগুফা প্রথমদিকে হানিফার সাথে তাল মিলাতে পারলেও আস্তে আস্তে পিছিয়ে পড়তে শুরু করে। তারপরেও সে হাল ছেড়ে না দিয়ে এগোতে থাকে সবার সাথে।

দিন গড়িয়ে চলল। একদিনের জন্য যথেষ্ট হয়েছে বুঝতে পেরে এমিলি টিমের সবাইকে নিয়ে বেইজ ক্যাম্পে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। সত্যিকার অর্থে এই ক্লাইম্বিংটা ছিল একপ্রকার রিয়েলিটি চেক। দলের সকলের আজকের পারফরমেন্স আর সক্ষমতা দেখে এমিলি ও ভিবস সিদ্ধান্ত নিবে পরবর্তীতে তাদের কি করতে হবে। সামনের দিনের জন্য পরিকল্পনা করা হবে আজকের দিনে সবার অবস্থার উপর ভিত্তি করে। আর সবার অবস্থাও খুব একটা আশাব্যঞ্জক ছিল না।

বেইজ ক্যাম্পে ফিরে এসে এমিলি আর ভিবস সবদিক ভেবে সিদ্ধান্ত নিল সামিটের উদ্দেশে শুধু হানিফাকেই নেওয়া যায়। অন্য সবাইকে নিলে অভিযান সফল হওয়ার সম্ভাবনা কমতেই থাকবে। কারণ নেকি, সগুফা বা ফ্রেসতা-কারও অবস্থাই ভাল না।  রাতে বেইজ ক্যাম্পে সবাই একসাথে হওয়ার পর এমিলি মেয়েদেরকে তাদের সবগুলো অপশনের কথা জানাল। জানাল, যে তাদের সামনে দুইটি পথ কেবল খোলা রয়েছে। এক, সকলে টিমওয়ার্ক করে ক্যাম্প-ওয়ানে উঠে যাওয়া। কিন্তু সেক্ষেত্রে সামিট হবে না। ক্যাম্প ওয়ান থেকে আবার ব্যাক করা লাগবে। আর সেক্ষেত্রে এই অভিযান বিফলে যাবে। এক্সপিডিশন হয়ে উঠবে একপ্রকার ট্রেনিং এক্সারসাইজ। দুই, হানিফাকে একা উঠে যেতে দেওয়া।

এমিলি বলল, ‘একটা ব্যাপার আমাদের সবার মাথায় রাখতে হবে আমরা একজন আরেকজনের সাথে দড়ি দিয়ে বাঁধা থাকব। আর আমি অ্যাংকর হিসেবে কাজ করব। তাই একজন যদি আমার পিছনে পড়ে যায় সে তাহলে আমাকে নিয়েই পড়বে। আর আমার দড়ির টান খেয়ে বাকি সবাই পড়ে যাবে। এখন বাকি সিদ্ধান্ত তোমাদের।’ সবাই আরো কিছু সময় ধরে ভেবে অবশেষে সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে হানিফা একাই উঠবে আফগান নারীদের মধ্যে।

অভিযানের ১৪তম দিনে এমিলি ক্যাম্প-ওয়ানে ওঠার প্রস্তুতি নেয়। এরপর তারা পর্বতের আরও উপরে উঠে যাবে। বেইজ ক্যাম্পে থেকে যাওয়া বাকি সঙ্গীদের জড়িয়ে ধরে হানিফা বিদায় নিয়ে ক্যাম্প ওয়ানের দিকে অগ্রসর হয়। ক্যাম্প ওয়ানে দুইদিন অবস্থানের পর তারা ক্যাম্প-টুয়ের দিকে উঠতে শুরু করে। কিন্তু হানিফার সামনে একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ এসে উপস্থিত হয় এবার। প্রায় ২৩০০ ফিটের একটি ভার্টিকাল গেইন ক্লাইম্ব করতে হবে। শুরু হয় হানিফার কঠিন সংগ্রাম। প্রতিটি পদক্ষেপ কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠতে শুরু করেছে। উপরের বাতাস এতটাই ঠাণ্ডা যে নিঃশ্বাসের সাথে সাথে গুড়ো বরফ ফুসফুসে গিয়ে যেন আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে।

একরাত ক্যাম্প-টুতে থেকে পরেরদিন সকালে হানিফার ঘুম ভাঙে প্রচণ্ড মাথা ব্যথা নিয়ে। তাঁবু থেকে বেরিয়ে কয় পা যেতেই সে পড়ে যায় ও বমি করে। এমিলি হানিফার রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা মেপে দেখে।  সি লেভেলে রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা থাকে ৯৫-১০০%। তারা যেই উচ্চতায় আছে সেই উচ্চতায় রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা ৭০-৮০% এর মধ্যে থাকলেও তাকে নরমাল হিসেবে ধরা যেত। কিন্তু হানিফার রক্তে সেখানে অক্সিজেনের মাত্রা রয়েছে মাত্র ৪৯%! হানিফার অবস্থা ক্রমান্বয়ে খারাপ হতে থাকে। সে যাই খায়, তাই বমি করে। এমিলি ঘণ্টায় ঘণ্টায় হানিফার অবস্থা দেখছিল। সে বলে যত দ্রুত সম্ভব হানিফাকে নিয়ে ক্যাম্প ওয়ানে যেতে হবে। যদি ওখানে তার অক্সিজেনের মাত্রা না বাড়ে তাহলে বেইজ ক্যাম্পে ফিরে যাওয়া লাগবে। বেইজ ক্যাম্পে থাকা সাপ্লিমেন্টারি অক্সিজেন দিয়ে হানিফার অক্সিজেন লেভেল বাড়াতে হবে তখন। কিন্তু হানিফা প্রতিবাদ করে বলে যে সে যাবে ক্যাম্প-থ্রি’তে। নিচে নামবে না! যদিও তার করার কিছুই ছিল না। পর্বতের উপর জোর খাটানো যায় না! হানিফাকে নিয়ে এমিলি ক্যাম্প ওয়ানে নেমে যায়।

দুইদিন এমিলি ও হানিফা ক্যাম্প-ওয়ানে থেকে পরের দিন হানিফা বেশ খানিকটা সুস্থ হয়। এমিলি রেডিওতে ক্যাম্প-টুকে বলে যে তারা আবার উপরে আসছে। হানিফা এখন সুস্থ!

হানিফা যখন উপরে ওঠার জন্য যুদ্ধ করছিল, ওদিকে বেইজ ক্যাম্পে তখন বাকি সবাই হতাশ। পর্বতের দীর্ঘ যাত্রা সবার মনে চাপ সৃষ্টি করছে। রেডিওতে হানিফার সাথে কিছু মনোমালিন্যও ঘটে সগুফার। সগুফা রেডিওতে হানিফাকে বলে সে কাবুলে ফিরে যেতে চায়। স্যাটেলাইট ফোনে পরিবারের সাথে কথা বলে তার মনে হয়েছে হয়তো কোন খারাপ কিছু ঘটেছে। তার পুরো পরিবার গারদেজ নামের এক গ্রামে আছে এখন। সে এটাই ভেবে পাচ্ছিল না কেন তার পরিবার কাবুল ছেড়ে গারদেজে থাকবে। যতবার ফোনে সে জিজ্ঞেস করেছে বাসার সবকিছু ঠিক আছে কি না, একবারও তার সেই প্রশ্নের ঠিকমত উত্তর দেয়নি কেউ। এসব ভেবে সে বেইজ ক্যাম্পে আর না থেকে কাবুলে ফিরে যেতে চায়। হানিফার কাছে জানতে চায় সে এখন কি করবে? হানিফা জবাব না দিয়ে সিদ্ধান্ত সগুফার উপরই ছেড়ে দেয় আর রেডিও দিয়ে দেয় এমিলির হাতে। পর্বত তাদের দুইজনের শরীর ও মনের উপর যথেষ্ট চাপ সৃষ্টি করছিল।

হানিফার রক্তে অক্সিজেন মাত্রা অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। প্রায় সবসময়ই মাত্রা থাকে ৫৫-৬৫% আর  এল্টিটিউড সিকনেসের লক্ষণ বেশিরভাগই তার আর ছিলনা। হানিফার সুস্থ অবস্থা দেখে সবাই সিদ্ধান্ত নেয় ২১৮০০ ফিট উচ্চতায় উঠে ক্যাম্প-থ্রি স্থাপনের।

ক্যাম্প-থ্রিতে তারা তুষারঝড়ের কবলে পড়ে। টানা একদিন বয়ে চলে সেই ঝড়। অভিযানের ২৩তম দিনের ঊষালগ্নে ওরা ২৩,০০০ ফিট উচ্চতায় ক্যাম্প-ফোর স্থাপনের জন্য রওনা দেয়। এই পথে প্রায় ২০০ ফিটের মত খাড়া একটি রক ওয়াল আছে তাদের ও ক্যাম্প-ফোরের মধ্যে। রকওয়ালটা পার করার জন্য এমিলি ফিক্সড রোপ ব্যবহার করে যাতে তাদের ক্লাইম্ব আরো বেশি নিরাপদ ও সহজ হয়।

ক্যাম্প-ফোরে তারা যখন পৌঁছায় সূর্য ততক্ষণে ডুবতে বসেছে। আর মাত্র ১৫০০ ফিট পরেই সামিট! বরফ ঠাণ্ডা বাতাস অবিরাম বয়ে চলেছে বিস্তীর্ণ স্নোফিল্ডের উপর দিয়ে। সবথেকে বেশি কাবু হয়ে পড়েছিল হানিফা। সবাই যখন তাঁবু স্থাপনে ব্যস্ত, হানিফার তখন চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না। এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিল সে। ভিবস ডেক্সামিথাসোন ট্যাবলেট নিয়ে যায় হানিফার জন্য। কিন্তু গিয়ে হানিফাকে ঘুমন্ত দেখে আর ডাকে না ওরা। কিন্তু বেশ কয়েক ঘণ্টা সবাই হানিফাকে অবজারভেশনে রাখে।

হানিফার সামিট নিয়ে আশা সবাই একপ্রকার ছেড়েই দেয়। পরের দিন সকালে হয়তো সবাইকেই নেমে যেতে হবে এক্সপিডিশন অসফল রেখেই। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে হানিফা পরেরদিন সকালে ওঠে চনমনা একটা ভাব নিয়ে। একরাতে বেশ কিছুটা বিশ্রাম পেয়ে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে গিয়েছে হানিফা। উপরে যাওয়ার জন্য তৈরি।

সূর্য ততক্ষণে কিছুটা উপরে উঠে গিয়েছে। আলোয় ঝলমল করছে সামিট পয়েন্ট। হানিফা সেদিকে এক আঙুল তুলে বলে, ‘ইয়েস!’ সাধারণত ফাইনাল সামিট পুশের দিন সবাই সূর্য ওঠার আগে সামিটের জন্য রওনা দেয়। আর এদিকে ক্যাম্প-ফোরেই ততক্ষণে সকাল নয়টা বেজে গিয়েছে। প্রতিটা মিনিট চলে যাওয়ার সাথে সাথে ওদের জন্য সামিটের সম্ভাবনাও কমে যাচ্ছে। ক্যাম্প-ফোর থেকে উঠে সামিট করে আবার ক্যাম্প-ফোরে ফিরে আসা কমপক্ষে দশ ঘণ্টার রাস্তা। আবার এর মধ্যে তাদের খাওয়া লাগবে, বরফ গলিয়ে পানি করা লাগবে। সেখানে বেশ সময় যাবে। সবকিছুর পরেও তারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে তারা দেখবে কতদূর উঠতে পারে।

দুপুরের কিছুটা আগে তারা ফাইনাল সামিট পুশের জন্য রওনা দেয়। প্রতিটি পদক্ষেপ তাদের মধ্যকার শেষ শক্তিটুকু নিংড়ে নিচ্ছিল। এক পা এক পা করে এগোতে এগোতে বিকালে ৫ টায় তারা একটি সরু রিজের সামনে এসে থামে। এখান থেকে সামিট আরও প্রায় ঘন্টা দুয়েকের রাস্তা। তাদের কাছে মনে হচ্ছিল এই ওঠা হয়তো তাদের শেষ হবে না। এরই মধ্যে বাতাসের গতিও বেড়ে গিয়েছে। এমিলি আর ভিবস নিজেদের মধ্যে কথা বলছে আর সামনে এগোনো ঠিক হবে কি হবে না সেটা নিয়ে। এমিলি বলল, ‘আমাদেরকে অন্ধকার আর প্রচণ্ড ঠাণ্ডার মধ্যে দিয়ে নিচে নামা লাগবে। আর এটা প্রচণ্ড ঝুঁকিপূর্ণ!’

অতি উচ্চতায় সবথেকে যার অভিজ্ঞতা বেশি সে হল ভিবস। সে বলল, ‘আমরা অনেকদূর চলে এসেছি। এতদূর এসে ফিরে না গিয়ে আরেকটু সামনে এগোনোর চেষ্টা করি সবাই।’ কথাটুকু শেষ করে সে হানিফাকে বলল, ‘উপরে উঠতে চাও? সামিট করতে চাও তুমি?’ এক টুকরো হাসি দিয়ে ক্লান্ত গলায় জবাব দিল হানিফা, ‘হ্যাঁ!’

এমিলি, ভিবসের হাতে দায়িত্ব নিশ্চিন্তে ছেড়ে দেয় কিন্তু একটা শর্ত দিয়ে। যেই মুহূর্তে হানিফা একটুও অসুস্থবোধ করবে সেই মুহূর্তেই সবাই ওরা যেন নামার পথ ধরে। ভিবস হানিফার কপালে একটা চুমু খেয়ে তার সাথে থাকা কিছু পানি খেতে দিয়ে হানিফার এক হাত নিজের কাঁধে তুলে নেয় এবং সামনে এগোতে থাকে। তারা চুপ করে এগিয়ে যাচ্ছিল। কথা বলতেও শরীরের শক্তির প্রয়োজন হয়। সেই শক্তিটুকুও তারা জমিয়ে রাখছিল। যন্ত্রের মত একের পর এক পা ফেলে এগিয়ে চলা। হানিফার আত্মবিশ্বাস ও একাগ্রতা ওর ক্লান্তিকে হার মানিয়ে দিয়েছে। যত কষ্টই হোক, হানিফা আর থামবে না।

আগস্ট ১০, সন্ধ্যা ০৭:০২। সূর্য এইমাত্র মাউন্ট নোশাকের নিচে চলে গেল। এই সময় হানিফা পা রাখে সামিটে; কয়েক বছর আগে দেখা ওর স্বপ্নকে সত্যি করে। হানিফা স্বপ্ন দেখেছিল একদিন সে আফগানিস্তানের সর্বোচ্চ শিখরে নিজের পায়ে উঠবে। যারা এত সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে যায় আফগানিস্তানে প্রতিনিয়ত, সেইসব মেয়ের প্রতিনিধি হয়ে। তাদের হয়ে সে উঠে দাঁড়াবে মাউন্ট নোশাকের চূড়ায়। দীর্ঘ ২৪ দিনের অমানুষিক কষ্ট, সাধনার পর অবশেষে সে তার স্বপ্নকে সত্যি করেছে। সামিটে উঠে সে হাঁটু ভাঁজ করে বসে পড়ে পায়ের নিচের বরফকে চুমু খেতে। ওদিকে ভিবস, রব আর স্যান্ড্রো তখন আনন্দ করছে আর হাততালি দিচ্ছে হানিফার জন্য।

সামিট করার দুইদিন পর হানিফা বেইজ ক্যাম্পে ফিরে আসে। প্রচণ্ড আনন্দ আর উৎসাহ নিয়ে চিৎকার করে ডাকে তার সঙ্গীদের। কিন্তু সেখানে ফ্রেসতা, নেকি কিংবা সগুফা-কেউই ছিল না। হানিফা যখন সামিটের জন্যে এগিয়ে যাচ্ছিল, বেইজ ক্যাম্পে তখন তারা কনফিউশনে পড়ে যায় কে থাকবে না থাকবে তা নিয়ে। কিন্তু হানিফা তখনও জানে না যে আগস্টের তিন তারিখ গারদেজের এক মসজিদে দুই আত্মঘাতী বোমা হামলা করা হয়েছে। নিহত ২৩ জনের মধ্যে চারজন ছিল সগুফার আত্মীয়। স্বাভাবিকভাবেই বেইজক্যাম্পে থাকা আর সব মেয়েকে কাবুলে ফিরে আসতে হয়েছিল।

চারদিন পর যখন হানিফা কাবুল এয়ারপোর্টে নামে, তাঁর চোখ তখন খুঁজছিল তার আত্মীয়-স্বজন ও তার টিমমেটদের। খুঁজতে খুঁজতে সে এক কোনায় দেখতে পায় সবাইকে। তার উদ্দেশ্যে চিৎকার করছে সবাই। হাতে ফুল ও ফুলের তোড়া। বিমান থেকে নেমে সে ছুটে গিয়ে সগুফাকে জড়িয়ে ধরে। তাদের মধ্যেকার সব অভিমান যেন সব ধুয়ে মুছে গেছে।

এক্সপিডিশনের পর ‘ম্যারিনা’ আফগান মিডিয়ায় ব্যাপারটি প্রচার করেনি। খবরটি আফগান মিডিয়ায় প্রচার পেলে মেয়েগুলো মৌলবাদীদের নজরে পড়ে যাবে আর এতে তাদের জীবনের ঝুঁকি আসবে। কিন্তু মাউন্ট নোশাক সামিটের মধ্যে দিয়ে আফগান নারীদের মধ্যে আস্তে আস্তে পরিবর্তণ আসছে। যদিও তা একেবারেই ছোট্ট পরিসরে। অভিযানে অংশ নেওয়া নারীরা এখন স্কুলে স্কুলে গিয়ে গিয়ে তাদের অভিযানের গল্প করে। মেয়েদেরকে উৎসাহিত করে। তারা এখন সবার কাছে রোল মডেল। তারা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে মেয়েরা কি পারে। আসছে জুনে হানিফা, সগুফা ও আরেকজন Ascend মেম্বার ফ্রান্সের চ্যামোনিক্স যাবে একটি আল্পাইন মাউন্টেনিয়ারিং কোর্সের জন্য। আর এতে সম্পূর্ণ স্পন্সর করছে জোনাথন কনভিল মেমোরিয়াল ট্রাস্ট নামের একটি সংগঠন যারা ইয়ং ক্লাইম্বারদের ট্রেনিং দিয়ে থাকে।

সামিটের দশদিন পর
কাবুলে হানিফার বাসায় তার জন্য একটি ওয়েলকাম-ব্যাক পার্টির আয়োজন করা হয়েছে। সাদা জামার উপরে ফুলের কারুকাজ করা পোশাকে হানিফাকে যেন রাজকন্যার মতই লাগছিল। এটা ঠিক যে এই উৎসবের পরেই হানিফাকে আবার ফিরে যেতে হবে তার প্রতিদিনকার কাজে। আবার হয়তো কোথাও আত্মঘাতী বোমাহামলা করে নিরীহ মানুষ মেরে ফেলবে কোন হামলাকারী। কিংবা কোথাও কোন মেয়েকে পাথর নিক্ষেপ করবে আফগান মোল্লারা। অনেক কিছুই ঘটবে, ঘটে যাবে। হয়তো সুদিন আসবে। কিন্তু সেসব ভবিষ্যতের কথা এই মুহূর্তে কেউ ভাবছে না এই ঘরে থাকা মানুষগুলি। আজকের দিনে কেবল হানিফার জয়জয়কার। আজকের দিনটি কেবল আফগান নারীদের।


উপজীব্য
১. Inside the First Afghan Women’s Ascent of Mount Noshaq, outsideonline.com
২. ‘I did it for every single girl’: the first Afghan woman to scale Mount Noshaq, theguardian.com
৩. An Interview with Hanifa Yousoufi: First Afghan Woman to Climb Mt. Noshaq, explorersweb.com
 

(Visited 1 times, 1 visits today)

Leave A Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *