[এক]

১৮৮০ সালে ভারতীয় উপমহাদেশে উইলিয়ম উডম‍্যান গ্রাহামের উদ‍্যোগেই, মানুষের বিনোদন হিসেবে, হিমালয়কে কেন্দ্র করে প্রথম পর্বতারোহণের সূত্রপাত হয়। সেই সময় থেকে হিমালয়ে মূলত ইউরোপীয় মানুষজন, বিশেষ করে বৃটিশরা, এই মহার্ঘ খেলাটিতে অংশগ্রহণ করত। তাদের সেই সব অভিযানে স্থানীয় লোক বলতে দেখা যেত শুধু শেরপা এবং মালবাহকদের । ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা পাওয়ার পর‌ও একই ভাবে বেশ কয়েক বছর কেটে যায়।

পরিবর্তন এলো ১৯৫৩-র পরে, যখন হিলারির সঙ্গে তেনজিং, এক অভাবনীয় কৃতিত্বের সাক্ষর রেখে, প্রথম এভারেস্টের শীর্ষে উঠে বিশ্ববাসীকে বিষ্ময়ে  হতবাক করে দিলেন । ভারতবাসী প্রথম উপলব্ধি করল এই পর্বতারোহণ বস্তুটি চেষ্টা করলে তারাও ভাল মতোই অধিগত করতে পারেন । আর এই ব‍্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা নিলেন এক ডাক্তার । পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ডঃ বিধানচন্দ্র রায় । তেনজিংকে সামনে রেখে তিনি দার্জিলিংয়ে ১৯৫৪ সালে “ হিমালয়ান মাউন্টেনীয়ারিং ইনস্টিটিউট “ এর গোড়াপত্তন করলেন। ভারতে উন্মোচিত হল পর্বতারোহণের নতুন দিগন্ত । এরপর পর্বতারোহনের জনপ্রিয়তা এমন পর্যায়ে গেল যে ইতিমধ্যে এক ভারতেই হিমালয়ের কোলে পর পর জন্ম নিল আরও সাত সাতটি পর্বতারোহণ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র । তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে উপমহাদেশের নানা প্রান্তে সংগঠিত হল অসংখ্য পর্বতারোহনের ক্লাব । এক পশ্চিমবঙ্গেই তাদের সংখ্যা এখন একশোরও বেশি ।

অবশ্য প্রকৃত অর্থে পশ্চিমবঙ্গে পর্বতারোহনের নবযুগের সূত্রপাত হয়েছিল ১৯৬০ সালের সফল বেসরকারি নন্দাঘুন্টি অভিযানের পর থেকে । অসফল হলেও পশ্চিমবঙ্গ থেকে ১৯৯১ সালের বেসরকারি এভারেস্ট অভিযানও আর একটি সাড়া জাগানো ঘটনা । তার পর থেকেই পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ ক্লাবগুলোও এভারেস্ট জয়ের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে । এবং ২০১০ সালে তা বাস্তবায়িত হয়, যদিও ১৯৯১ এবং ২০১০ এর দুই অভিযানের মধ্যে যথেষ্ট গুণগত পার্থক্য রয়েছে ।


অদ্রি পাঠাগারে পড়ুন: পশ্চিম বাংলার প্রথম বেসামরিক সফল পর্বতাভিযানের গল্প


এখন তো শুধু এভারেস্ট আর সমপর্যায়ের আট-হাজারী শৃঙ্গ অভিযানের জোয়ারেই আমাদের পশ্চিমবঙ্গের তথা ভারতের পর্বতারোহীরা ভেসে চলেছে । আর অন্য কোনও দিকে তাদের তাকাবার বিষয়ও নেই, সময়ও নেই । শৃঙ্গ জয়ের নিরিখে কে কাকে টপকে যাবে এখন শুধু তারই প্রতিযোগিতা চলেছে । এর কোথায় শেষ তা কে জানে।

[দুই]

সাম্প্রতিক কালে পর্বতারোহণ সংক্রান্ত কাজকর্মে এই বৈপ্লবিক উত্থানের পাশাপাশি এর কিছু দুর্বল অংশও আমাদের সামনে প্রকট ভাবে ধরা পড়েছে । তার বিস্তারিত আলোচনায় আমরা এখন যাব না । শুধু সেই দুর্বল অংশের সবথেকে পুরনো যে বিষয় সেই দিকে নজর দেব । বর্তমান আলোচনা ওই বিষয়টুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে । আর সেটা হল অভিযানকে কেন্দ্র করে আমাদের অভিযাত্রীদের সঙ্গে মানচিত্রের সম্পর্ক — যা প্রথম থেকেই একটা নড়বড়ে ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে । মনে হয় ভবিষ্যতেও থাকবে । এই সম্পর্কের উন্নতি হবার সম্ভাবনাও খুব কম ।

প্রশ্ন উঠতে পারে তাই যদি হয় তাহলে আর এ বিষয়ে অযথা আলোচনার দরকারটা কী ? আলোচনার দরকার একটিই কারণে — সেটা হল আমাদের অভিযাত্রীরা জানেই না অভিযান মানচিত্র-নির্ভর হলে ‘অ্যাডভেঞ্চার’ কোন নতুন মাত্রায় পৌঁছয় । তারা জানে না অপার ঐশ্বর্যের অধিকারী বিশাল হিমালয়ের আরও কত নাম না জানা শৃঙ্গ, সৌন্দর্যের আকর মনোমুগ্ধকর উপত্যকার সন্ধান একমাত্র মানচিত্রই দিতে পারে । সেটা জানানোর জন্যই এই আয়োজন । একটা কথা খেয়াল রাখতে হবে — পর্বতারোহণের ওপর অসামান্য গ্রন্থ ‘ফ্রিডম অফ দ্য হিলস’এ অভিযানের সময় সমস্ত অভিযাত্রীর কাছে যে কয়টি জিনিস সবসময় রাখা জরুরী বলে উল্লেখ করা হয়েছে তার মধ্যে প্রথমেই রয়েছে মানচিত্র । আমাদের এইটুকুই আশা — অভিযানে মানচিত্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা জানার পর অন্তত কোনও না কোনও অভিযাত্রী , কোনও না কোনও পর্বতারোহণ সংস্থা, অথবা পর্বতারোহণ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বা সংশ্লিষ্ট সরকারী দপ্তর সব রকম অভিযানে মানচিত্রের ভূমিকার ব্যাপারে আগ্রহী হবেন এবং অন্যদেরও এ বিষয়ে উৎসাহী করে তুলবেন ।

[তিন]

কোনও একটা অভিযানের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সমস্ত কাজ যদি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লিষ্ট করা যায় তাহলে দেখা যাবে তার ভেতর একটা বড় এবং মুখ্য কাজ হল অভিযানের লক্ষ্য স্থির করা । সেটা একটা শৃঙ্গ হতে পারে, একটা উপত্যকা হতে পারে, একটা গিরিপথ হতে পারে, একটা হিমবাহ হতে পারে অথবা একটা দুর্গম বিচ্ছিন্ন অথচ আকর্ষণীয় পার্বত্য গ্রামও হতে পারে । এ নিয়ে কোনও বিতর্কের অবকাশ নেই । যে কোন অভিযানে সেটাই হল প্রথম কাজ ।

লক্ষ্য স্থির হলেই সঙ্গে সঙ্গে যে কাজটি সামনে চলে আসে তা হল আমি যেখানে আছি সেখান থেকে ওই লক্ষ্যে কীভাবে সহজে এবং নিরাপদে পৌঁছব ? ইংরেজিতে এই কাজটার একটা গালভরা নাম আছে — navigation যা বাংলায় খোলসা করে লিখলে লিখতে হয় — “ আমি যেখানে আছি আর যে লক্ষ্যে পৌঁছাতে চাই সেই দুটি স্থানকে নির্বিঘ্নে আমার চলা দিয়ে সংযুক্ত করার নামই navigation “ । অভিযানে এটা হল মানচিত্রের দ্বিতীয় কাজ । এবং অবশ্যই আসল কাজ । কেননা লক্ষ্যে পৌঁছতে না পারলে তো অভিযানটাই সফল হবে না ।

এই navigation ঠিকঠাক করতে গেলে অভিযাত্রীকে তার পরিকল্পিত চলার পথের আনুপূর্বিক তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। কেননা সেই তথ্যের ওপর নির্ভর করেই ঠিক হবে লক্ষ্যে পৌঁছতে কতদিন লাগবে, যাবার পথ কতটা কঠিন, কতটা দড়ি বা অন্যান্য পাহাড়ি যন্ত্রপাতি লাগবে ইত্যাদি ইত্যাদি। সেই তথ্য পাওয়ার তিনটি উপায় আছে —

(ক) পূর্ববর্তী অভিযাত্রীদের কাছ থেকে,

(খ) বই থেকে, আর

(গ) মানচিত্র থেকে ।

একটু চিন্তা করলে দেখা যাবে তথ্য সরবরাহের জন্য বই এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা প্রায় একই মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ । বইতে অভিজ্ঞতা লিখিত ভাবে থাকে আর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আমরা মুখে মুখেই জেনে নিই । অবশ্য সামনাসামনি কথা হলে আরও কিছু প্রশ্ন করে পথ সম্পর্কে আরও একটু স্পষ্ট ধারণা করে নেবার সুযোগ থাকে ।


মানচিত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে দুর্গম পার্বত্য অঞ্চল সম্পর্কে ঘরে বসেই জানা সম্ভব


এ ক্ষেত্রে মানচিত্রের ভূমিকা একটু অন্যরকম । ওপরের দুটি সূত্রে যে তথ্য পাওয়া যায়, মানচিত্র থেকে তার অনেকটাই পাওয়া সম্ভব । বরং অভিযান ক্ষেত্রের আরও সামগ্রিক চিত্র দিতে সে সক্ষম — যা বই অথবা পূর্ববর্তী অভিযাত্রীরা দিতে পারেন না । কেননা তাঁরা একটি বিশেষ পথেই সেখানে গেছেন, আমি সেই পথে নাও যেতে পারি । আমি আমার অভিযান আরও বিস্তৃত করতে পারি । আমি নতুন কোনও পথের সন্ধান করতে পারি । সব থেকে বড় কথা, যে অঞ্চলে কেউ যান নি বা যে অঞ্চল সম্পর্কে ভাল বিবরণ পাওয়া যাচ্ছে না, তার তথ্য একমাত্র মানচিত্রই আমায় দিতে পারে । যে কোনও অভিযানে মানচিত্রের ভূমিকা তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । সত্যি কথা বলতে কী — তথ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে বই বা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার যেখানে শেষ মানচিত্রের জয়যাত্রা সেইখান থেকে শুরু ।

অভিযানের শুরুতে যেমন অভিযান চলাকালীন এবং তার শেষেও মানচিত্রের বিশাল ভূমিকা আছে । যথা সময়ে তার বর্ণনা দেব । সব শেষে, অপ্রিয় হলেও, একটা কথা ছোট্ট করে বলে রাখি, পশ্চিমবঙ্গের পর্বতারোহণের ইতিহাসে অনেক বার দেখেছি অভিযানের আগে বা মধ্যে, যে পর্বতারোহীরা মানচিত্রকে আমল না দিয়ে পাশ কাটিয়ে গেছেন, অভিযান শেষে তারাই সেই মানচিত্রের পায়ে হত্যে দিয়ে পড়েছেন নিজেদের মহামূল্যবান অভিযানের সাফল্য তথা মর্যাদা রক্ষার তাগিদে ! অনেক মহার্ঘ অভিযান সাফল্য লাভ করছে কী করেনি তার শেষ কথা বলতে সাহায্য করেছে মানচিত্রই ।

আর তাই মানচিত্র আমরা যত ভাল ভাবে বুঝব, যত বেশি করে জানব অভিযানও ততই সুষ্ঠু, অর্থবহ এবং আনন্দময় হয়ে উঠবে ।

আগামী পর্বগুলোতে আমরা ধীরে ধীরে প্রবেশ করব মানচিত্রের ঐশ্বর্যময় জগতে।

দ্বিতীয় পর্ব পড়ুন এখানে