পাহাড়ে যাইনা আজ অনেকদিন। প্রায় দেড় বছরেরও বেশি হয়ে গেল। ছাত্রজীবন শেষে একদিকে নিজের ইচ্ছা-আকাঙ্খা, অপরদিকে ক্যারিয়ার সমেত পরিবার-সমাজ-পারিপার্শ্বিকতা; এই সবকিছুর হিসেব মিলাতে গিয়ে হিমশিম খেয়ে উঠতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। স্বপ্ন আর সাধ্যের মধ্যকার ফারাকটা কমানোর চেষ্টাতেই কেটে যাচ্ছে এই ক্ষুদ্র জীবনের মূল্যবান মুহুর্তগুলো। আমাদের অধিকাংশেরই জীবনে হয়ত চলছে এই টানাপোড়ন। প্রতিনিয়ত জীবনটা হয়ে চলেছে জটিল থেকে জটিলতর। 

এডি ভেডারের সোসাইটি গানের সুরে সুর মিলিয়ে বলতে হয়,

It’s a mystery to me

We have a greed with which we have agreed…”

সত্যিই তো তাই। একটা লোভের সাথে আমরা নিজেদের অজান্তেই সহবাস করে চলেছি প্রতিদিন-প্রতিক্ষণ। এমনই একটা কাঠামোর বেড়াজালে বন্দী আমরা, শত চেষ্টা করেও যেখান থেকে মুক্তি পাওয়া এক কথায় অসম্ভব। পরিবারের, বাবা-মা’র প্রতি দায়িত্ব তো চাইলেও অবহেলা করতে পারেনা সবাই। সবসময় নিজেকে “উন্নতির চরম শিখরে” নিয়ে যাওয়ার চেষ্টায় রত থেকে ভুলেই যেতে হয় জীবনের হিসেবটা আসলে এতটা কঠিন হবার কথা ছিল না। 

আজ এই অসহায় মুহূর্তে বারবার মনে পড়ে যাচ্ছে ষাটোর্ধ্ব সেই মানুষটির কথা। কাঁধে দা নিয়ে খালি গায়ে হেঁটে এসে যিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন,’দাদারা কোথায় যাচ্ছো?’ দেখে একবারও মনে হয়নি তাঁর বয়স ষাটের উপরে। আমাদের সমাজে ঐ বয়সে অমন ঋজু ভঙিতে হেঁটে বেড়ানো কয়জন মানুষকে পাওয়া যাবে? প্রভাব-প্রতিপত্তির পেছনে ছুটতে ছুটতে যারা ভুলেই গেছে বেঁচে থাকার অর্থটা কী! অবশ্য তাদের কাছে বেঁচে থাকার অর্থই হয়তো ঝাঁ চকচকে গাড়ি, বিলাসবহুল বাড়ি আর সমাজে নিজের প্রভাব খাটিয়ে সবাইকে পদানত করে উপরে উঠে যাওয়ার প্রতিযোগিতা। 

কিন্তু এর বাইরে ঝুম বৃষ্টিতে জুম ঘরে বসে থেকে বৃষ্টি দেখা কিংবা চড়া রোদে খাড়া পাহাড় উঠে ক্লান্ত দেহে গাছের ছায়ায় বসে শরীরটা জুড়িয়ে নেয়ার মধ্যে জীবনের যে অনাবিল আনন্দ লুকিয়ে থাকে, সেটি তারা খুঁজে পায়না। খুঁজতেও চায় না! 

“বেঁচে আছি”- এই অনুভূতিটুকু মনে হয় পাহাড়ের মত আর কোনকিছুই অনুভব করাতে পারেনা। কিন্তু এই সমাজের সেই আত্মস্বীকৃত লোভের লোভাতুর গ্রাসের সামনে এই অনুভূতিটুকু খুবই ঠুনকো। মানুষেরা, বিশেষ করে আমরা বাঙালিরা এখনও ভ্রমণের শুদ্ধতম পর্যায়ে পৌঁছাতে পারিনি। প্রকৃতির কোলে আশ্রয় নিয়ে প্রকৃতির মৌন নিরাময় শক্তিকে কাজে লাগাতে শিখিনি এখনও। ভ্রমণের ধারণাগুলো এখনো আমাদের মধ্যে রয়ে গেছে শুধুই ভোগ বিলাসের উপায়, ‘ফেলো কড়ি, মাখো তেল’-এর মতই। নাহলে বিশুদ্ধতম প্রকৃতি ধ্বংস করে অরণ্য উজাড় করে পাকা দালান বানিয়ে আমরা ‘ভ্রমণ’ করতাম না। ঐ গাছের মগডালে যদি ছিমছাম একটা ট্রি হাউজ বানানো যেত সেটার নান্দনিক সৌন্দর্য ও অভিজ্ঞতা যে কতটা স্বর্গীয় হতে পারত সেটা কেউ ভেবেও দেখছি না। খুব ধীরে ধীরে অবস্থার পরিবর্তন আসছে ঠিকই। কিন্তু ভয় হয়, পরিবর্তনের সবটুকু আসতে আসতে অবশিষ্ট প্রকৃতিটুকু টিকে থাকবে তো? হয়তো দেখব কোনদিন বান্দরবানের একদা উচ্ছ্বল কোন জলপ্রপাতে কৃত্রিমভাবে মোটর ছেড়ে উপর থেকে পানি ঢালা হচ্ছে! এর থেকে আফসোস আর পরিতাপের বিষয় আর কিছু হতে পারে না! অবশ্য গরমকালে মাধবকুন্ড ও রাঙামাটির শুভলংয়ের পরিণতি তো এমনই হয়ে গেছে!

আমি প্রথম যেবার পাহাড়ে যাই, সেবার অদ্ভুত সুন্দর এক সন্ধ্যায় শুনেছিলাম পাড়ার গির্জায় তাদের প্রার্থনা সঙ্গীত। শহরে শত চেষ্টা করেও সেই একই সঙ্গীত আমার মনে প্রাণে প্রশান্তি আনতে পারেনি, যতটা পেয়েছিলাম আমি সেদিন। সব থেকে দামী পাঁচ তারকা হোটেলের কক্ষে ঘুমিয়েও তৃপ্তি আসবে না হয়ত, যতটা এসেছিল অসাধারণ এক ভয় নিয়ে ত্লাবংয়ের নিচে কাটানো রাতের সেই ঘুমে। এই পৃথিবীর সবথেকে দামী খাবার খেয়েও আমি তৃপ্তি পাব না, যতটা পেয়েছিলাম ভাতের অভাবে খাওয়া অল্প একটু আলু ভর্তায়। কী হবে তাহলে আমার জীবনে এত জটিলতা রেখে?

মাঝে মাঝে মনে হয় হয়তো পাহাড়ে যাওয়াটাই আমার ভুল ছিল। পাহাড়ে না গেলে হয়তো আমিও আর দশটা “সভ্য” মানুষের মত উপরে উঠার প্রতিযোগীতা নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে  পারতাম। প্রাণ-প্রকৃতি, জীবনবোধ, নিঃসঙ্গতার দর্শন, প্রকৃতির একাকীত্বতা- এতসব ভারি ভারি কথা আমার মাথায় ঘুরপাক খেত না। কিংবা আমি কে? আসলেই আমি কী চাই? কেন আমি আজ এখানে?- এসব অহেতুক প্রশ্ন নিয়েও ভাবা লাগতো না। 

“জন্মাবো, বংশবৃদ্ধি করব, সমাজের সর্বোচ্চ উচ্চতায় উঠতে উঠতে মারা যাব” – শেষ! 

এই সহজ সমীকরণটা জটিল করে দিল পাহাড় ! যে বেঁচে থাকার সত্যিকার অর্থ শেখাতে চায়, মুক্ত স্বাধীন  সরল জীবনের স্বপ্ন দেখায়, প্রকৃতির মাঝে নিসঙ্গতার আনন্দ সেচতে ডাকে, শূণ্য থেকে আসা আমাকে শূণ্যে বিলীন হয়ে যেতে বলে। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *