২০১২ সাল। বান্দরবানের রুমা উপজেলার বগালেক থেকে কেওক্রাডংয়ের পথ। হাঁপাতে হাঁপাতে উঠছি। প্রথমবারের মত পাহাড়ে ট্রেকিংয়ে এসেছি। যা দেখছি সবই নতুন, এর আগে ঠিক এভাবে আসা হয়নি। আমরা বিশাল একটা কিছু করে ফেলছি এই ঘোর নিয়ে এগুচ্ছি, আর তখন শহুরে পোশাক পরা কয়েকজন আদিবাসী কিশোর-কিশোরী ব্যাগ পিঠে ঝুলিয়ে নেমে আসছিল। কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইলাম ওরা কোথায় যাচ্ছে? উত্তরে তারা জানালো কেউ রুমা, কেউ বান্দরবান, কেউ বা উত্তরবঙ্গের কোনো শহরের স্কুলের হোস্টেলে ফিরে যাচ্ছে ঈদের ছুটি কাটিয়ে। গালে ঠাশ করে থাপ্পর খেয়ে চমক ভাঙার মত ‘বিশাল একটা কিছু করে ফেলছি’ এই ঘোরটা কেটে গেল।

শহরে যখন আমরা বিভিন্ন বয়সের, বিভিন্ন স্তরের মানুষের শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা বোধ করে নানা প্রকার পদক্ষেপ নিচ্ছি, প্রকল্প বাস্তবায়ন করছি, তখন এখানকার বাচ্চারা এক একজন যাচ্ছে দূরদূরান্তের শহর কিংবা শহরতলীতে। সাথের গাইড বাসি মং দাদার সাথে কথা বলে জানতে পারলাম আশেপাশের কয়েক মাইল পাহাড়ি এলাকার মধ্যে দার্জিলিং পাড়াতে প্রাইমারি স্কুল আছে। কিন্তু, হাই স্কুল নেই। আবার এক পাড়া থেকে আরেক পাড়ার স্কুলে যাওয়া-আসা করাটা প্রায় অসম্ভবের কাছাকাছি ঘটনা মনে হচ্ছিল। যদিও আরও দু-একটা পাড়া পরে একটা হোস্টেল আছে, যেখানে দূরের বাচ্চারা থাকতে পারে। কিন্তু, সেটা কতখানি প্রয়োজন মেটাবে সেটা একটা বিষয়।

সেই ট্রিপ থেকে ফিরে আসার পর থেকেই মাথায় কেবল পাহাড়ের শিক্ষার সুযোগের বিষয়টা ঘুণপোকার মত কুট কুট করছিল। এদিকে বান্দরবানের প্রতি প্রেমটা এতটাই বেড়ে গেল যে, মোটামুটি মনস্থ করে ফেললাম এবার চাকরি করলে বান্দরবানেই করব। দুনিয়াতে কপালটাও এমন নিয়ে এসেছি, কয়েকমাসের মাথায় একটা মনের মত মাশআল্লাহ্‌ ধরনের চাকরিও জুটে গেল।

প্রকল্পের গবেষণার কাজে ২০১৩’র মার্চ-এ গেলাম খাগড়াছড়ি শহরে। এমন পরিচ্ছন্ন শহর দেশে আর দেখিনি। সকাল হতেই রাস্তায় স্কুলের পোশাক পরা ছেলে-মেয়েদের হন্তদন্ত ছুটে চলা দেখতে দেখতেই দীঘিনালা উপজেলার দিকে গাড়ি এগিয়ে যায়। একটা কমিউনিটি সেন্টারে গিয়ে সারাদিনের জন্য ঘাঁটি গাড়ি। একে একে বিভিন্ন পাড়া থেকে মানুষ আসতে শুরু করে। অতিদরিদ্র সুবিধাভোগীদের উন্নয়নের তথ্য নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে তথ্য সংগ্রহকারী দল। আর আমি মাথার ভেতরকার ঘুণপোকার কুটকুটানি থামাতে এক একজনের সাথে বাচ্চাদের পড়ালেখা নিয়ে আলাপ শুরু করি।

আগতদের বেশিরভাগ চাকমা বা মারমা আদিবাসী, দুই একজন ছিলেন ত্রিপুরা। কারও কারও বাচ্চা ইউনিসেফ পরিচালিত স্কুলে যায়, কারও বাচ্চা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ে। খুব কম মানুষই পেয়েছি যাদের বাচ্চা মাধ্যমিক শ্রেণিতে পড়ে। অনেক মেয়ে শিশুর আবার ঘরের ছোট ভাইবোনকে দেখতে গিয়ে স্কুলে যাওয়া হয় না। জুমচাষ নির্ভর পরিবারগুলোতে ছেলে-মেয়েরা কিছুটা বড় হবার পর জুমের কাজে সাহায্য করতে হয়। খাগড়াছড়িরই এক দিদি ছিলেন আমাদের সাথে। দিদি জানালেন, আগের তুলনায় অনেক স্কুল হয়েছে। বিশেষত প্রাথমিক পর্যায়ে। তবে শিক্ষকের আর শিক্ষার মানের বিষয়টা প্রশ্নসাপেক্ষ ব্যাপার। আবার প্রত্যন্ত এলাকার স্কুলগুলো প্রায় পুরোপুরি শিক্ষকের ইচ্ছা নির্ভর। অন্যদিকে হোস্টেলে রেখে কিছুটা মানসম্মত স্কুলে পড়ানোর ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সমস্যা একটা বড় বিষয়। অভিভাবকদের কথা শুনতে শুনতে মনে হতে লাগল, পাহাড়ের বাচ্চাদের শিক্ষার বিষয়টি সহজভাবে পর্যালোচনা করা বেশ দুষ্কর। মনের ভেতর নানা প্রশ্ন নিয়ে খাগড়াছড়ি থেকে গেলাম রাঙ্গামাটি সদরের একটা পাড়াতে। বাচ্চাদের স্কুলে অংশগ্রহণ বান্দরবান বা খাগড়াছড়ির চেয়ে তুলনামুলকভাবে বেশ ভাল মনে হল। মনটা কিছুটা ভাল হয়ে গেল। যাক, পাহাড়ে শিক্ষার ব্যাপারটা তাহলে অতটা জটিল নয় এই ভাবনা নিয়ে সেবারের মত ব্যস্ত শহরে ফিরে এলাম।

[ছবি] মিলন বাকী বিল্লাহ

২০১৩ সালের জুন-জুলাইয়ের কোনো একটা সময় প্রকল্পের কাজ দেখার জন্য লামা উপজেলায় গেলাম। সাথের সহকর্মীদের বলে রাখলাম, যে পাড়াতেই যাই না কেন অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি সেখানকার স্কুল তথা শিক্ষার অবস্থাটা সম্পর্কেও আমি জানতে চাই। দুই দিনে লামার সরই আর গজালিয়া ইউনিয়নের পাশাপাশি লাগোয়া প্রায় পাঁচ/ছয়টা ম্রো আর দুইটা ত্রিপুরা আদিবাসী পাড়ায় গেলাম। এর মাঝে একটা ত্রিপুরা পাড়া আর একটা ম্রো পাড়া ছিল গাড়ি-রাস্তার কিছুটা কাছাকাছি। আর সব পাড়াতে যেতেই কয়েক ঘণ্টার পাহাড়ি পথ পাড়ি দিতে হয়।

সেবার দূরবর্তী পাড়াগুলোর মধ্যে কেবল একটা ‘ম্রো’ পাড়ায় স্কুলমত একটা জিনিস পেলাম যা কোনো এক খ্রিস্টান মিশনারির যৎসামান্য টাকায় চলে। শিক্ষকের পক্ষে দিনের পুরোটা সময় স্কুলে দেওয়া সম্ভব হয় না, কেননা স্কুল থেকে যে বেতন দেয় তাতে তার মাসের চালের খরচও হয় না, তাই অর্ধেকবেলা তাকে চাষাবাদে সময় দিতে হয়। স্কুলঘরে গিয়ে দেখি টিনের চাল দুমড়ে-মুচড়ে আছে, বাঁশের বেড়া খুলে খুলে পড়ছে। কিন্তু, এত কিছুর মধ্যেও চোখ আটকে গেল ছাত্রছাত্রীদের বসার জন্য বাঁশ দিয়ে হাতে তৈরি টেবিল ও বেঞ্চ। এমনকি ব্ল্যাকবোর্ডটাও শিক্ষক নিজে করেছেন। শিক্ষক জানালেন, পাড়ার কারবারি (গ্রাম প্রধান) শিক্ষক যাতে চলে না যান, সেজন্য তাঁর থাকার জন্য পাড়ায় জায়গা দিয়েছেন। চাষাবাদের জন্য কিছু জমি দিয়েছেন। কারবারি বারবার দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন তার সাধ আর সাধ্যের কথা বলতে বলতে। এই শিক্ষক আবার এসেছেন অন্য উপজেলা থেকে। আর কতদিন তাঁকে ধরে রাখতে পারবেন এ নিয়ে কারবারি খুবই চিন্তিত ছিলেন। পরবর্তীতে কোন একভাবে জানা যায়, এই স্কুল নাকি সরকারের ‘হার্ড টু রিচ’ এলাকার জন্য ‘আনন্দ স্কুল’ নামক প্রকল্পের আওতাধীন এবং কাছাকাছি এক পাড়ার একজন যুবক এই স্কুলের শিক্ষক। যে কখনোই এই স্কুলে আসেনি, কিন্তু শিক্ষক স্কুলের নাম করে বেতন নিত। এদিকে গাড়ি-রাস্তার কাছাকাছি ত্রিপুরা আর ম্রো পাড়ার ছেলে-মেয়েদের পাশের সরকারি স্কুলে পড়ার সুযোগ ছিল। ম্রো পাড়ার কাছে একটা হোস্টেলও শুরু করেছিল দু/একজন স্বল্প শিক্ষিত ছেলে।

এর ক’দিন পরই ঘুরতে গেলাম আলিকদম উপজেলার একটা পাহাড়ে। সে পাহাড়ে যাওয়া-আসার পথে প্রায় ৪/৫ টা ম্রো পাড়া আর একটা ত্রিপুরা পাড়া পড়লো। এবারের ত্রিপুরা পাড়াটি ছিল উপজেলা সদরের বেশ কাছাকাছি, যেখানকার ছাত্রছাত্রীদের উপজেলা স্কুলে পড়বার সুযোগ ছিল। বাকি পাড়াগুলোর কোনটাতেই কোন স্কুল দেখিনি। প্রায় একই পরিস্থিতি দেখেছি থানচি শহর থেকে দতং পাহাড়ে যাবার পথে। পথে প্রায় ৪টা ম্রো পাড়ার একটাতে স্কুল ছিল আর দুটো ত্রিপুরা পাড়ার ১টাতে ইউনিসেফ আর ১টাতে কারিতাস পরিচালিত স্কুল। ফেরার পথে পদ্মমুখের কাছের মারমা পাড়ার স্কুলটা কিছুটা মানসম্মত মনে হল। থানচিতে তিন্দুর উপর খুমি পাড়ায় যাওয়ার পথেও পড়লো কয়েকটা ম্রো পাড়া। পাড়ার মানুষদের পরিচালিত একটা প্রাক-প্রাথমিক স্কুল চোখে পড়লো। তবে খুমি পাড়ার স্কুলটা বেশ ভালই মনে হয়ছিল তুলনামুলকভাবে। তিন্দু বাজারের স্কুলের হোস্টেল বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। যেটা আবার চালু করার কথা শুনেছিলাম চেয়ারম্যানের কাছে।

তিন্দু ছাড়িয়ে নাফাকুমের পাশের মারমা পাড়াতে কোন স্কুল ছিল না। অথচ বেশ বড় পাড়া। নাফাকুমে কত কত পর্যটকের ভিড় আর তার কাছের পাড়াতেই ছিল না কোন স্কুল। ২০১৫ এর জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে নৌকাতে যেতে যেতে রেমাক্রির চেয়ারম্যান বলছিল রেমাক্রিতে একটা হাইস্কুল খোলার কথা ভাবছেন। শহরে ফেরার ২০/২৫ দিন পরেই শুনলাম তিনি স্কুল খুলে ফেলেছেন। শিক্ষকও নিয়োগ দিয়ে ফেলেছেন। অবাক হয়েছিলাম। এত স্বল্প সময়ের মধ্যে কি করে স্কুল চালু করা সম্ভব আর সেটা কেমন হবে এটা ভাবতেই পারছিলাম না। সেবার কয়েকটা পাড়া ঘুরে একটা বিষয় পরিষ্কার বুঝলাম ‘ম্রো’ আদিবাসীদের মধ্যে শিক্ষার হার খুবই কম। জরিপ মতে তখন সে হার ছিল ১%। ত্রিপুরা আদিবাসীদের মধ্যে শিক্ষার হার ছিল তুলনামুলক ভাল।

২০১৪ সাল, পহেলা বৈশাখের সময় পানিখেলা উৎযাপন করতে রাঙ্গামাটির রাজস্থলীর এক মারমা পাড়াতে গিয়েছিলাম। সেখানে সদ্য চাকরি পাওয়া এক প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকের সাথে পরিচয় হয়। ওনার স্কুল ছিল অনেক ভেতরের এক ইউনিয়নে যেখানে কয়েক ঘণ্টা হেঁটে যেতে হত। আর শহুরে নাগরিক সুযোগ সুবিধার কিছুই ছিল না। তাই উনি মাসে একবার স্কুলে যেয়ে এক সপ্তাহ-দু’সপ্তাহ থাকত। এভাবে নাকি তাদের স্কুলের তিনজন শিক্ষক পালাক্রমে ক্লাস করাতো। মানে, প্রতি সপ্তাহে তিনজনের একজন স্কুলে উপস্থিত থাকতো। সে বছরই আলিকদমের দু’পাড়াতে ‘সানি ইন্টারন্যাশনাল’ নামক সংস্থার স্কুল দেখলাম। শিক্ষকদের তারা অন্যদের তুলনায় বেশ ভাল বেতন দিচ্ছিল। কিন্তু, পাড়াতে শিক্ষকের বিরুদ্ধে একই অভিযোগ ছিল। পাড়াতে দু/এক সপ্তাহের বেশি কোন শিক্ষকই থাকতে চায় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শিক্ষকেরা শহরের কাছাকাছি পাড়ায় বেড়ে উঠেছে এবং তাদের একটা বড় অংশ আবার পার্বত্য অঞ্চলের বাইরে থেকে লেখাপড়া করেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিক্ষক এক আদিবাসী গোষ্ঠীর আর পাড়া অন্য আদিবাসী গোষ্ঠীর হওয়াতে তাদের মধ্যে ভাষা-সংস্কৃতি-জীবনযাপন সবকিছুই আলাদা হয়। এর ফলশ্রুতিতে তথাকথিত সভ্যতার আলো পৌঁছায়নি যেসব পাড়ায়, যেসব পাড়ার মানুষ প্রকৃতির সাথে সখ্য করে এখনও জীবনযাপন করছে। সেসব জায়গায় গিয়ে এইসব শিক্ষক-শিক্ষিকাদের মানিয়ে নিতে খুবই বিপাকে পড়তে হয়। এ যেন ‘না ঘরের, না পরের’ অবস্থা। কদিন আগেই একটি ম্রো পাড়ার স্কুলের এক চাক আদিবাসী শিক্ষকের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, ম্রো পাড়ায় থাকাতে তার কোন আসুবিধা হচ্ছে কিনা। উত্তরে সে জানিয়েছিল, ম্রোদের খাবার সে খেতে পারছে না, যেটি বড় সমস্যা তার জন্য। বেশির ভাগ পাড়াতে দোকান-পাট না থাকাতে মন চাইলেই কিছু কেনাকাটা করা যায় না । আলিকদমের এক প্রাক্তন শিক্ষিক বলেছিল, মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক না থাকাতে সে চাকরি ছেড়ে দিয়েছে।

আমি যে প্রকল্পে কাজ করতাম তার মধ্যে নন-ফরমাল শিক্ষা কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রতিবার মাসিক সভার সময় দেখতাম প্রতি মাসে যে কয়টা স্কুল স্থাপনের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হত, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সেটি পূরণ হত না। এর কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখলাম, বেশিরভাগ পাড়ায় স্কুল চালাবার মত নুন্যতম পড়ালেখা জানা লোক নেই বললেই চলে। নুন্যতম শিক্ষাগত যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণি পাস থেকে নামিয়ে পঞ্চম শ্রেণি করেও তেমন কোন সারা মিলল না। সারা না মেলার আরেকটি কারণ ছিল, যারাই এক আধটু স্কুলে গিয়েছে তারা যে বেতন চাইত সে বেতন শহরের স্নাতক পাশ করা কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষকও পায় না। আবার অন্যভাবে বললে এইসব স্কুলের শিক্ষকদের জন্য যে বেতন বরাদ্ধ রাখা হত তাও খুব একটা সম্মানজনক ছিল না। স্কুলে কিছুটা লেখাপড়া করা এইসব ছেলে-মেয়েদের একটা অংশ আবার শহরে চলে যায় ছোট খাট কিছু একটা করে অধিক টাকা কামানোর আশায়। অন্যদিকে শহুরে ঝলমলে মেকী জীবনের হাতছানিকে এড়ানোও দুষ্কর অধিকাংশ ক্ষেত্রে। এতসব কিছুর পরেও যে সব শিক্ষকেরা কাজ চালিয়ে যান, যাচ্ছেন তাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালবাসা জেগে উঠে। নাটক-সিনেমায় দেখা নিবেদিত প্রাণ শিক্ষকেরা যে বাস্তবেও আছে তা এদের না দেখলে বিশ্বাসই করতাম না।

জীবনের ঘটনা ক্রমে পাহাড়ের চাকরি ছেড়েছি অনেকদিন আগে। মাঝে কিছুটা সময় পাহাড়ে যাবার সুযোগ হয়ে উঠেনি। কিছুদিন আগে লামা যাবার সুযোগ হয়েছিল অনেকদিন পরে। সাথে ছিলেন স্কুলের এক শিক্ষক দাদা। দাদা খুশি হয়ে জানালেন, বেশ কিছু হোস্টেল আর স্কুল হয়েছে প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে। তবে বেশির ভাগ মিশনারিদের করা। যাই হোক না কেন, বাচ্চাগুলো যে স্কুলে যেতে পারছে এইটাই বড় বিষয়। কিন্তু, তারপরেও মনের ভেতর একটা খচখচানি কোথায় যেন থেকে যায়। বাচ্চাগুলো নিজের সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে যাবে না তো! কয়েকটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা একসাথে মনে ভিড় করল। বগালেকের এক বিধবা দিদির একমাত্র ছেলেকে উত্তরবঙ্গের কোন এক মিশনারি স্কুলে পড়তে পাঠান। যতদূর মনে করতে পারি, সে স্কুলের শর্ত হল বাচ্চা তিন বছর হোস্টেল ছাড়তে পারবে না। কেবল মাত্র দিদি গিয়ে দেখা করে আসতে পারবেন ধরনের কিছু একটা বিষয়। দিদির ছেলে স্কুলে বাংলা শিখতে শুরু করে এবং আস্তে আস্তে নিজের বম ভাষা প্রায় ভুলতে বসেছে। এদিকে দিদি আবার বাংলা বলতে পারেন না। ফলে, মা-ছেলের মধ্যে যোগাযোগ কমতে থাকে। এখন এমন এক পরিস্থিতি, মা ছেলের কথা বুঝে না আর ছেলে মায়ের কথা বুঝতে পারে না।

হোস্টেল প্রসঙ্গে, আরেকটা ভয়ানক বিষয় হল যৌন নির্যাতন। গেল সপ্তাহে একটা হোস্টেলে গেলাম কয়েকটা বাচ্চার সাথে দেখা করতে। ‘কেমন আছো’ এই প্রশ্নের উত্তরে একটা মেয়ের অভিব্যক্তি দেখেই বুঝলাম ভাল নেই। কোন একটা কিছু ঠিকঠাক নেই। আবার হোস্টেলের মানুষদের সামনে কিছু বলতেও পারছে না। পরে সে জানালো, হোস্টেলের প্রধান কয়েকজন মেয়েকে দিয়ে তার বিকৃত যৌনাকাঙ্ক্ষা পূরণ করে, যার ভুক্তভোগী সেও। এই ঘটনায় সে মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েছে। দুই-এক বছর আগে এক ছোট ভাই বলছিল, সাভারের একটা মিশনারি হোস্টেলের মেয়েরাও এই একই অভিযোগ করছে। অনেকে মাঝ পথে লেখাপড়া ছেড়ে দিচ্ছে।

আদিবাসী সমাজে বিভিন্ন জায়গার শিক্ষকদের সাথে কথা বললে যে বিষয়টি সব সময় উঠে আসে তা হল, অপর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব। সব প্রকল্পগুলোই কম বেশি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে, কিন্তু বেশিরভাগই দায়সারা। অনেকটা দাতাদের বলেছে বলে কোটাপূরণ করা। ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়, স্কুলগুলোতে যে পাঠ্যক্রম ব্যবহার করা হয় সেটা ঠিক পাহাড়ের ছেলে-মেয়েদের জন্য উপযোগী না।

পাওমুম থারক্লা​ Pawmum Tharkla is a residential school of Mro community, located in Lama, Bandarban, Near about 85 children from different 4 different paras is getting education and medical facilities from here since 2016.

আরেকটা  ম্রো পাড়ায় দেখেছি সব বাচ্চারা হয় বৌদ্ধ না হয় ক্রামা ধর্মের। কিন্তু, স্কুলের শিক্ষক খ্রিস্টান হওয়াতে তাদের খ্রিস্টান ধর্মের বই পড়াত। আবার ক্রামা ধর্মের বই নেই বলেও এইটা করা হত। ছেলে-মেয়েরা দেখলাম নিজেদের খ্রিস্টান বলে পরিচয় দিচ্ছিল। কারণ জানাতে বলল, তারা স্কুলে খ্রিস্টান ধর্মের বই পড়ে, তার মানে তারা খ্রিস্টান হয়ে গেছে। পাহাড়ের মেয়েরা থামি নামক লুংগির মত পোশাক পরে। দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মেয়েরাও এই একই পোশাক পরে। কিন্তু, লামার একটা হোস্টেলে মেয়েদের থামি পরা নিষিদ্ধ। কেউ থামি পরলে শাস্তি পেতে হয়। এর পরিবর্তে লম্বা স্কারট পরে তারা। থামিও এক ধরনের স্কার্ট। কিন্তু, কেন মেয়েরা থামি পরতে পারবে না এই বিষয়টি কিছুতেই মাথায় ঢুকল না। এওতো এক ধরনের নিজস্ব সংস্কৃতি চর্চায় বাধা প্রদান। আর হোস্টেলগুলোর খাদ্যাভ্যাসের কথা যদি ভাবি, সেখানেও বাঙালি ধরনের রান্না আর খাবার। যা পাহাড়ি খাবার থেকে একেবারেই ভিন্ন। হয়ত সব হোস্টেলের চিত্র এরকম না, কিন্তু কোন কোন হোস্টেল বা স্কুলে তো ঘটছে এসব। এসব ঘটনা দেখে শুনে মনে হয়, আমরা পাহাড়ে শিক্ষার বিস্তার আসলে কেন করছি! শিশুদের তাদের শেকড় থেকে দূরে সরানোর জন্য কি?

পাহাড়ে শিক্ষার বিস্তারে যে প্রধান অন্তরায়গুলো আমার চোখে পড়ে-
শিক্ষকের অভাব
প্রশিক্ষণের সমস্যা
ভাষার সমস্যা
অবকাঠামোগত সমস্যা
অর্থ
যোগাযোগের সমস্যা
রেজিস্ট্রেশনের সমস্যা
অনুমতির সমস্যা
শিক্ষার মানের সমস্যা
উচ্চতর শিক্ষার সমস্যা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *