এক.

গল্পটা অনেক আগের। স্কার্দুতে তখনো যাতায়াতের জন্য খুব ভালো কোন রাস্তা নেই, বিমান দূরে থাক, সড়কের অবস্থাও নাজেহাল। কোনমতে যদি স্কার্দুতে পৌঁছানও, সেক্ষেত্রেও আরও বিশাল ঝক্কি অপেক্ষা করছে। পৃথিবীর দুর্গমতম রাস্তার মধ্যে একটি ধরে আপনাকে পৌঁছাতে হবে আস্কোলি গ্রামে। আস্কোলি গ্রামের পূর্বদিকের ধূলিধূসর পাথরময় রাস্তা ধরে দিন তিনেক ধরে হাঁটতে থাকুন, আপনার চোখের সামনে ধীরে ধীরে পৃথিবীর সবচাইতে বৈচিত্রময় বিস্ময়গুলোর একটি ভেসে উঠবে, পাথুরে বিস্তৃত বাল্টোরো গ্লেসিয়ার আর ফেরিক অক্সাইড, গ্রানাইটে আবৃত বিস্তৃত এলাকা, চারপাশে অসংখ্য পর্বতচূড়া, কালচে পাথুরে গা, প্রায় সবগুলো চূড়াই শুভ্র বরফে আবৃত, দুপুরের পরপরেই যেখানে এত বেশি মেঘের আনাগোণা শুরু হয়, পর্বতগুলো আর দেখাই যায় না তখন। কারাকোরাম পর্বতমালার মূল অংশের শুরু এখানেই!

কারাকোরাম রেঞ্জকে অনেকেই স্বতন্ত্র পর্বতমালা হিসেবে চিহ্নিত করেন, আবার কেউ কেউ বৃহত্তর হিমালয়ের পশ্চিমাংশ হিসেবেও দাবি করেন, তাদের পক্ষে-বিপক্ষে দুই দিকেই যুক্তি আছে। হিন্দু কুশ নদী মধ্য এশিয়া আর ভারতীয় উপমহাদেশের বিভক্তিরেখা হিসেবে কাজ করেছে, এক্ষেত্রে কারাকোরাম স্বতন্ত্র পর্বতমালা, নাকি হিমালয়েরই অংশ, এ তর্কের পক্ষে-বিপক্ষ দুই দলে ঝামেলা বাড়িয়েছে বৈ কমায়নি। প্রাকৃতিক এই দৈত্যাকার মহাকীর্তির কারাকোরামে চারটি পর্বত আছে, যার প্রত্যেকেরই উচ্চতা ২৬,০০০ ফুটের চাইতে বেশি, সবাই একে অপরের কমবেশি পনের মাইলের মধ্যে। বাল্টোরো গ্লেসিয়ার ধরে কারাকোরামের এই পর্বতরাজ্যের বরফের মধ্যে দিয়ে হাঁটা শুরু করুন, আরো দিন তিনেক পরে, আর সব পর্বতকে ছাড়িয়ে হঠাৎ করে আপনার চোখের সামনে চলে আসবে কে-টু, পৃথিবীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ চূড়া।

কে-টু (K-2) এর নামকরণের বিষয়টি মোটামুটি কিংবদন্তীর মতই। ভারতে তখন গ্রেট ইন্ডিয়ান ট্রিগোনোমেট্রিক সার্ভে শুরু হয়েছে। এই সার্ভের আওতায়, লেফটেনান্ট থমাস জি মন্টগমারি বিশাল বিশাল যন্ত্রপাতি নিয়ে কাশ্মীরের বিভিন্ন চূড়াতে চড়ে বেড়াচ্ছিলেন। উদ্দেশ্য ছিলো রাজ্যের সীমা নির্ধারণ করা। ১৮৫৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে, এরকমই এক চূড়া থেকে যন্ত্রপাতি নিয়ে ঘাটাঘাটি করতে গিয়ে সর্বপ্রথম দুইটি প্রতাপশালী পর্বত লক্ষ্য করেন, একশ চল্লিশ মাইল দূরে। পর্বত দুইটি বৈশিষ্ট্যে এতটাই অনন্য, মন্টগমারি তার নোটবুকে পর্বত দুইটির দুইটি স্কেচও করে রাখেন এবং নাম দেন যথাক্রমে কে-ওয়ান এবং কে-টু, সাথে নোটবুকের নিচে তার আঁকাবাঁকা ঢেউ খেলানো স্বাক্ষর। ‘কে’ ছিলো কারাকোরামের অদ্যাক্ষর। মন্টগমারি শুধু এই দুইটি পর্বতেরই নামকরণ করেন নি, একই রেঞ্জে থাকা মোট ৩২ টি পর্বতকে K-1 থেকে শুরু করে K-32 টু পর্যন্ত নির্বিচারে নামকরণ করেছেন। মন্টগমারি যখন কে-টু এর উচ্চতার পরিমাপ করেন, তার হিসেবের পরিমাপ ছিলো ২৮,২৭৮ ফুট, যেখানে K-2 এর প্রকৃত উচ্চতা ২৮,২৫১ ফুট, মাত্র ত্রিশ ফিট এদিক-ওদিক। পরবর্তীতে খোঁজখবরে বের হলো, কে- ওয়ানের স্থানীয় নাম আছে, মাশারব্রুম। পরবর্তীতে এই নামটিই ম্যাপে এবং সর্বত্র স্থায়ী হয়ে যায়। কিন্তু কে-টু এর নাম পাল্টায়নি, কখনো কখনো একটু টানাপোড়ন হলেও শেষমেষ মন্টগমারির এই নামটাই এখন পর্যন্ত মানুষের মুখে মুখে ফিরে এসে স্থায়ী হয়েছে।

দুই.

মন্টগমারির সেই ভ্রমণের বছর পাঁচেক পরে, আরেক ইস্পাত কঠিন, গায়ে গতরে দৈত্যের মত শক্তিশালী, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের এক ব্যক্তি হেনরি হ্যাভারশ্যাম গডউইন অস্টিন, পাগলাটে স্বভাবের কারণে বেশ ভালোই পরিচিত, কে-টু এর সাথে পরিচিত হন এবং মানুষজনের সাথে পরিচয়ও করিয়ে দেন। তবে এবার অনেক দূর থেকে টেলিস্কোপে নয়, বরং একেবারে কে-টু এর কোলে গিয়ে হাজির হন তিনি। গডউইন ইউরোপিয়ানদের মধ্যে প্রথম ব্যক্তি হিসেবে বাল্টোরো গ্লেসিয়ার অতিক্রম করেন। বাল্টোরো গ্লেসিয়ারে গিয়ে সর্বপ্রথম তিনি কে-টু কে চোখের সামনে আবিষ্কার করেন, কে-টু কে তুলে আনেন আলোচনার টেবিলে।

হেনরি হ্যাভারশাম গডউইন অস্টিন, উইকিমিডিয়া কমনস, ক্রিয়েটিভ কমন লাইসেন্স – ৪.০ এর আওতায়

ভদ্রলোক ক্ষ্যাপাটে ছিলেন, সেই ক্ষ্যাপামির জোরেই দিব্যি পায়ে হেটে এতদূর চলেও গিয়েছিলেন। তার এই কীর্তির স্বীকৃতি হিসেবে রয়াল জিওগ্রাফিক সোসাইটি ১৮৮৮ সালে প্রস্তাব করে কে-টু এর নাম বদলে গডউইন-অস্টিন পিক হিসেবে পরিচিত করা হোক। যদিও প্রস্তাবটি গৃহীত হয় নি, তারপরেও এই নামটি দীর্ঘদিন প্রচলিত রয়ে গিয়েছিলো। বিংশ শতাব্দীর প্রচুর ম্যাপ, সংবাদপত্রে কে-টু এর নাম গডউইন-অস্টেন পিক হিসেবেই পরিচিত করা আছে। ঔপনিবেশিক আধিপত্য শেষ হবার পরে, কে-টু নামকরণই জয়লাভ করে, যদিও গডউইন-অস্টিনের নাম এখনো গ্লেসিয়ারের সাথে জড়িয়েই আছে।

তিন.

কে-টু এর কোলে এর পরে পদচিহ্ন পরে এক আমেরিকান দম্পতির। ইমপেরিয়াল সার্ভেয়রদের পরপরেই, পশ্চিমা অভিযাত্রী ও পর্যটকদের যাত্রা ধীরে ধীরে এই দিকে অনুপ্রবেশ করতে থাকলো। কাঁটাওয়ালা ভারী বুট, ভারী কাপড়চোপড় পরিহিত লোকজনদের ভীড় আস্তে আস্তে বাড়তে শুরু করলো। এদের মধ্যেই ছিলেন এক আমেরিকান দম্পতি, উইলিয়াম হান্টার ও তার স্ত্রী ফ্যানি বুলক। সেই সময়ে এই দম্পতি একই সাথে তাদের কার্যক্রমের জন্য বিখ্যাত এবং কুখ্যাত, দুইটিই ছিলেন। নিজেদেরকে মনে করতেন ভয়াবহ উঁচু জাতের, এবং উপমহাদেশীয় লোকজনদেরকে সর্বদাই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে বেড়াতেন। ইংরেজ শাসনের সুবিধায় থাকায় স্থানীয়দের ওপর সময়ে সুযোগে অত্যাচার করতেন অবলীলায়। উইলিয়াম ছিলেন একজন অবসরপ্রাপ্ত সার্জন, তার বিশ্বাস ছিলো ২২,০০০ ফুটের অধিক উচ্চতায় কোন মানুষই একরাতও পার করতে পারবে না, কারণ পর্যাপ্ত অক্সিজেন নেই বা মানুষের শরীর এই উচ্চতাতে কোনভাবেই মানিয়ে নিতে পারবে না। তার স্ত্রী ফ্যানি ছিলেন উচ্চবংশীয়, তার খুবই বাজে একটি অভ্যেস ছিলো, যে কোন স্থানেই নিজের নাম আর অই স্থান ভ্রমণের তারিখ খোদাই করে আসা। অভিযানের সময় স্থানীয়দের ওপর যখন তখন চাবুক আর রিভলভার ব্যবহার করা ছিলো সম্ভবত তাদের শখ, উভয়েই প্রচন্ড রকম উন্নাসিক ছিলেন। এই দম্পতির অন্যতম কীর্তি হচ্ছে, দুইজনে মিলে সমগ্র ভারতবর্ষ বাইসাইকেলে পরিভ্রমণ করেছিলেন।

সময়টা যখন ১৮৯৮, দুইজনে সিদ্ধান্ত নিলেন, তারা হিমালয়ে ঘুরে বেড়াবেন। এরই ধারাবাহিকতায় বছরখানেক বাদে তারা কে-টু এর পশ্চিমে সায়াচেন গ্লেসিয়ারে পৌঁছান এবং বেশ কিছু কারাকোরাম এর পর্বতচূড়া আরোহণ করেন। কে-টু এর আরেকটু পরিচিতি বাড়লো এই দফায়।

চার.

১৯০২ সালে, ছয় সদস্য বিশিষ্ট একটি অভিযাত্রী দল প্রথমবারের মত কে-টু এর চূড়ার লক্ষ্যে অভিযান চালায়। ব্রিটিশ, সুইস আর অস্ট্রিয়ান ক্লাইম্বারদের সমন্বয়ে গঠিত এই দলে ছিলেন ইংরেজ ক্লাইম্বার এলিস্টার ক্রাউলি। এলিস্টার ক্রাউলি আধিভৌতিক বিষয়ে বিশ্বাস করতেন এবং শয়তানের উপাসনা করতেন বলে গুজব প্রচলিত আছে। অবস্থা এমন পর্যায়ে গিয়েছিলো, এই অভিযানের কয়েক বছর পরে তাকে সবাই “৬৬৬” বা শয়তানের সংখ্যা দ্বারা পরিচয় করাতো। ক্রাউলির আরেকটি উদ্ভট বিষয় ছিলো, বিচিত্র রকমের এন্টিক সংগ্রহ। বিভিন্ন পশু, পাখি, মানুষের মাথার চুল, খুলি এসব সংগ্রহে রাখতেন তিনি। এন্টিক সংগ্রহ এতটাই কিম্ভূতকিমাকার ছিলো, মানুষজন তাকে উপাধিই দিয়েছিলো, “Wickedest Man in the World”, বা “পৃথিবীর সবচাইতে পাজি লোক”।

এলিস্টার ক্রাউলি;
উইকিমিডিয়া কমনস, ক্রিয়েটিভ কমন লাইসেন্স – ৪.০ এর আওতায়

যাই হোক, দীর্ঘ নয় সপ্তাহ ট্রেক শেষে, ক্রাউলির দল কে-টু এর চূড়া আরোহণের জন্য কে-টু এর বেইজ ক্যাম্পে উপস্থিত হন। এই বিশাল যজ্ঞের প্রস্তুতি হিসেবে প্রায় তিন টন পরিমাণ মালপত্র টেনে আনা হয় বেইজ ক্যাম্প পর্যন্ত, যার মধ্যে ক্রাউলির লাইব্রেরির প্রায় পুরোটাই ছিলো। ক্রাউলি চেয়েছিলেন দক্ষিণ-পূর্ব অংশের স্পার ধরে ওঠার জন্য এবং সেটি নিয়েই তিনি গো ধরে ছিলেন। কিন্তু অন্যান্য আরোহীদের ইচ্ছা ছিলো উত্তর-পূর্বের অংশ ধরে ক্লাইম্ব করা। পর্বতারোহণের রুট নিয়ে সমঝোতার পরে বেশ সামিটে পৌঁছাবার লক্ষ্যে অভিযান শুরু হয়। কিন্তু বিভিন্ন বার রূট পালটে, কৌশলে পরিবর্তন এনেও লাভ হয় নি। ক্রাউলি পর পর পাঁচবার চেষ্টা চালান, সর্বশেষ বারে ২১,০০০ ফুট পর্যন্ত ওঠার পরে এই প্রচেষ্টায় ক্ষান্ত দিতে হয়। কারণ আরোহীদের মধ্যে একজন অস্ট্রিয়ান পর্বতারোহী পালমোনারি এডিমাতে আক্রান্ত হন। পালমোনারি এডিমাতে ক্রমাগত ফুসফুসে পানি জমতে থাকে। উচ্চতাজনিত কারণে যে একিউট মাউন্টেইন সিকনেস (AMS) তৈরি হয়, এটি তার মধ্যে অন্যতম একটি। ক্রাউলি নিজেও ম্যালেরিয়া জ্বর ও ঠান্ডায় ভুগছিলেন। নিজেদের মধ্যেই বিবাদ শুরু হতে হতে একটা সময় এমন অবস্থা তৈরি হয়, ক্রাউলি তারই এক সহযাত্রীকে রিভলবার দিয়ে হত্যার হুমকি দেন। এরপর একটা যাচ্ছেতাই মারামারি, আক্রমণ-প্রতি আক্রমণ- এর মধ্যে তাকে নিরস্ত্র করা হয়।

এই অভিযানের শেষটা হয় একদমই বিশৃঙ্খলার মধ্যে, যদিও ক্রাউলির দল এখন পর্যন্ত অন্য যে কারো চাইতে কে-টু চূড়ার সবচাইত কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন। ততদিনে পৃথিবী জুড়ে বিভিন্ন স্থানে মানুষজন জানতে শুরু করেছে, পাকিস্তানের কারাকোরামের হৃদয়ে এক কঠিন পাথুরে পর্বত আছে, যা পৃথিবীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ এবং সম্ভবত সবচাইতে দুর্গমও বটে।

কে-টু এর গল্প এবার ছড়াতে শুরু করলো, অন্য যে কোন সময়ের চাইতে অনেক দ্রুত, অনেক উত্তেজনার মধ্যে।

পাঁচ.

ক্রাউলির এই অভিযানের পরে কে-টু এর এই মায়াজাল বিশালাকারে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯০৯ সালে, ক্রাউলির অভিযানের সাত বছর পরে এবারে মঞ্চে আগমন ঘটে ডিউক অফ আব্রুজ্জি, রাজপুত্র লুইগি আমাদিও-র। উত্তরাধিকার সূত্রে তিনি ইটালির রাজার দৌহিত্র, স্পেনের রাজপুত্র এবং ডিউক। ছোটবেলা থেকেই লুইগির পর্বত আরোহণের জন্য রীতিমত উন্মাদনা কাজ করতো। কারাকোরামে আসার আগের পুরো দশ বছর লুইগির কেটেছে আলাস্কার পর্বতমালাতে পাহাড়-পর্বতে চড়ে। আর্নেস্ট হেমিংওয়ের “আ ফেয়ারওয়েল টু আর্মস” রচনা যে স্থানের পটভূমিতে গড়ে উঠেছে, সেই স্থানও মোটামুটি ভেজে খাওয়া হয়ে গেছে তার আরো আগেই। ডিউক লুইগি যখন প্রথম আমেরিকান আল্পাইন ক্লাবে যোগ দেবার জন্য অ্যাস্টর হোটেলে যান, তার সম্মানে এক বিশাল তোরণ বানানো হয়, বলরুম সাজানো হয়। পত্রিকায় সংবাদ এসেছিলো,

“Great blocks of ice fashioned like mountains, with men roped climbing their steeps.”

নিউইয়র্ক টাইমস এর রিপোর্ট অনুযায়ী, লুইগি কে-টু কে নির্বাচন করেন কারণ এটি এখনো ম্যাপে খুবই অস্পষ্টভাবে আছে, প্রায় নামপরিচয়বিহীন একটা পর্বত, অথচ সেটি এতটাই উদ্ধত বলে পরিচিত, এরকম একটি পর্বতই তার অভিযানের পূর্ণতা দেবে, এমনটাই তিনি মনে করেছিলেন। অই সময়ে সর্বোচ্চ উচ্চতার অধিকারী ছিলেন দুইজন নরওয়েজিয়ান ক্লাইম্বার, লুইগির ব্যক্তিগত ইচ্ছা ছিলো উচ্চতার এই রেকর্ড ভেঙ্গে নিজে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন।

প্রিন্স লুইগি অ্যামাদিও, ডিউক অফ আব্রুজ্জি;
উইকিমিডিয়া কমনস, ক্রিয়েটিভ কমন লাইসেন্স – ৪.০ এর আওতায়

খুবই গোপনীয়তার মধ্যে লুইগি প্রথমে লন্ডনে যান অভিযানের প্রয়োজনীয় রসদ সংগ্রহ করতে। এই গোপনীয়তার কারণ হচ্ছে লুইগি চান নি কেউ তার আগে কোনভাবেই কে-টু’তে গিয়ে উপস্থিত হোক।

এক্ষেত্রে আরেকটি প্রচলিত গল্প আছে, লুইগির কে-টু নির্বাচনের কারণ হচ্ছে, তার ওই মুহূর্তে দূরে কোথাও পালিয়ে যাবার নিতান্তই প্রয়োজন ছিলো। তিনি তার প্রেমিকাকে রীতিমত চুরি করে দুই পরিবারের অসম্মতিতে নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন। লুইগির প্রেমিকা, ক্যাথেরিন এলকিন্স ছিলেন ইউএসএ এর ভার্জিনিয়া স্টেটের স্টেট সিনেটর স্টিফেন এলকিন্সের মেয়ে। ক্যাথেরিন সেই সময়ের তুলনায় যথেষ্টই দাপুটে ছিলেন, নিয়মিত ঘোড়ার পিঠে চড়ে বেড়াতেন, ঘুরে বেড়াতেন দেশে বিদেশে। তার লাল-চুলের সৌন্দর্য ছিলো সকলের আলোচনার-আড্ডার জমজমাট বিষয়। ডিউক ও ক্যাথেরিনের সাক্ষাৎ ঘটে রোমে, তারা একসাথে সমগ্র গ্রীষ্মকাল এন্টিক সংগ্রহ করে বেড়ান এবং তখনই তাদের প্রণয়ের সূত্রপাত ঘটে। দুই পরিবার থেকে কখনই তাদের এ সম্পর্ক মেনে নেওয়া হয়নি বলে, লুইগি তার প্রণয়িণীর সাথে কৌশলে পালানোর পরিকল্পনা করেছিলেন।

মার্সেইল থেকে এক স্টিমারে করে, সাড়ে ছয় টন মালামাল সহযোগে একদিন ডিউক বম্বে (বর্তমান মুম্বাই) এর উদ্দেশে যাত্রা শুরু করলেন, লক্ষ্য সেখান থেকে কারাকোরাম যাত্রা এবং কে-টু’তে সামিট করা। হাউজ অফ স্যাভয় আর ইটালির গৌরব অর্জনের এই যাত্রাতে লুইগির সহযাত্রী ছিলো ভিট্টোরিয়ো সেল্লা, এক পঞ্চাশ বছর বয়সী চিত্রগ্রাহক, যার গ্লাস প্লেট, ফটোগ্রাফি প্লেটের চিত্রগ্রহণের মধ্যে দিয়ে বিশাল একটা অংশ কে-টু এর আলোকচিত্র দেখার সুযোগ পায়, প্রসার ঘটে এর বিশালতার গল্পের। একশ বছর আগে তোলা ভিট্টোরিয়োর অনেকগুলো ছবি এখনো সেরা ছবিগুলোর মধ্যে বিবেচনা করা হয়।

কে-২ এর ছবি, ভিত্তোরিয়া সেল্লার ক্যামেরাতে
উইকিমিডিয়া কমনস, ক্রিয়েটিভ কমন লাইসেন্স – ৪.০ এর আওতায়

ডিউকের দশ সদস্যের দল শ্রীনগর পৌঁছায় বিশাল পরিমাণের বহর নিয়ে। তখনকার ব্রিটিশ গভর্নরের সাথে সাক্ষাত করার পরে ডিউকের জন্য রাজকীয়ভাবে যাত্রার আয়োজন করা হয়, শিকারা-তে (এক ধরনের অভিজাত নৌ-যান) করে লুইগি যাত্রা শুরু করেন, প্রতিটি শিকারাতে পনেরজন করে শক্ত সামর্থ্য দাড় টানার শ্রমিক। লুইগি বরাবরই বিলাসীভাবেই জীবন যাপনে অভ্যস্ত, এই অভিযানেও তার ব্যত্যয় ঘটে নি। এরকম একটা দুর্গম অভিযানেও তার বিলাসী জীবনধারা অক্ষুণ্ণ ছিলো। অভিযানের জন্য লুইগি সাথে নিয়ে এসেছিলেন চার লেয়ারের স্লিপিং ব্যাগ, প্রথম লেয়ার উটের পশমের, দ্বিতীয় লেয়ার ছিলো হাঁসের বুকের পালকের- যেটাকে আমরা ডাউন বলে থাকি, তৃতীয় লেয়ার ছিলো ভেড়ার চামড়ার এবং সর্বশেষ লেয়ার ছিলো ওয়াটারপ্রুফ ক্যানভাসের।

কনকর্ডিয়া হচ্ছে দুইটি গ্লেসিয়ার সংযোগস্থল, কে-টু এর কিছুটা আগে এর অবস্থান। দুই দিকে অসংখ্য তুষারাবৃত পর্বত, বিশাল হিমবাহ, আর ঠিক তার পথ ধরেই ডানপাশে একটু এগোলেই সেই কাঙ্খিত পর্বত, কে-টু । লুইগি কে-টু এর প্রথম দেখা পান এই কনকর্ডিয়াতে এসে। প্রত্যাশার চাইতে কে-টু অনেক বহুগুণে বেশি ছিলো লুইগির জন্য। লুইগি নিজেও ভাবেননি, কে-টু এতটা বিশাল, এতটা কঠিন, এতটা দুর্বিনীত। নিজের বক্তব্যেই তার কিছুটা প্রতিচ্ছবি পাওয়া যায়,

“the indisputable sovereign of the region, gigantic and solitary, hidden from human sight by innumerable ranges, jealously defended by a vast throng of varied peaks, protected from invasion by miles and miles of glacier.”

বালতোরো গ্লেসিয়ারের কয়েক মাইল দূরে উর্দুকাস থেকে সাপ্লাই সংগ্রহ করেন লুইগি প্রথম ক্যাম্প করেন। তাজা ফলমূল, পানি, জ্বালানী, চিঠিপত্র, সংবাদপত্র আর ডিমের সংগ্রহ আসতো কয়েক দিন পরপর বিরতিতে। ডিউক ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা মিলে টানা কিছুদিন দক্ষিণ-পূর্বের গডউইন-অস্টিন গ্লেসিয়ার ধরে ক্লাইম্ব করার চেষ্টা করেন। এই পথটিই পরবর্তীতে পর্বতারোহীদের সবচাইতে বহুল ব্যবহৃত পথ হিসেবে প্রচলিত হয়ে ওঠে এবং ডিউকের নাম চিরকালের জন্য স্থান পেয়ে যায়ে কে-টু এর ইতিহাসে, রূটের নামকরণ করা হয়ে ডিউকের নাম, আব্রুজ্জি স্পার। সৃষ্টির পরে আদম যেমন মর্ত্যের বিভিন্ন স্থান ঘুরে বেড়িয়েছেন, ডিউক লুইগিও তেমনি চারপাশে ঘুরে নতুন নতুন নামকরণ করতে থাকেন, নেগ্রেট্টো পাস, সেল্লা পাস, স্যাভোয়া গ্লেসিয়ার।

শেষমেষ ডিউক কে-টু তে চড়তে না পারলেও, নিকটবর্তী আরেকটু পর্বত, চোগোলিসা (Chogolisa) সামিট করতে না পারলেও উচ্চতার রেকর্ডটা ভাঙতে পেরেছিলেন। কিন্তু কে-টু কে যতবারই তিনি পদাবনত করতে চেয়েছেন, ততবারই কে-টু তাকে স্পর্ধাভরে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে। এর খাড়া ঢাল, তারসাথে ক্রেভাস, পাথুরে দেয়াল, প্রচন্ড ঝড়ো বাতাস, অ্যাভালাঞ্চ তাকে বারবার উপলব্ধি করিয়েছে, কে-টু এর কাছে লুইগি নিতান্তই তুচ্ছ। একে জয় করার ক্ষমতা ডিউকের নেই। বার বার চেষ্টা করার পরে, শেষমেষ ব্যর্থ মনোরথে ডিউক হাল ছেড়ে দেন, হতাশাভরে বলেছিলেন, তিনি কে-টু এর কাছে পরাজিত হয়েছেন এবং কে-টু আজীবন সব মানুষের জন্যই অপরাজেয়ই থাকবে।

ফিলিপ্পো ডি ফিলিপ্পি, লুইগির অভিযানের সহযোগী একজন ডাক্তার এ প্রসঙ্গে লিখেছেন,

“After weeks of examination, after hours of contemplation and search for the secret of the mountain, the Duke was finally obliged to yield to the conviction that K-2 is not to be climbed.”

ডিউক লুইগি এর এই বক্তব্য মিথ্যা প্রমাণ করবে তারই দেশের আরেকটি দল, অনেক বছর পরে। তবে সেটা আরেক গল্প।


তথ্যসূত্র

১. No Way Down: Life and Death on K2: Graham Bowley

২. K2 The Killer Summit – Documentary by BBC

৩. উইকিপিডিয়া

(Visited 1 times, 1 visits today)

3 Comments

  1. ক্রাউলি ব্যাটার চেহারার মধ্যেই কেমন যেন একটা অশুভ অশুভ ব্যাপার আছে। দেখলেই মনে হয় ওর দ্বারা ঐসব খুলিমুলি নিয়ে কাজ করা মোটেই অস্বাভাবিক না! 😛
    এত প্রাঞ্জল এবং তথ্যসমৃদ্ধ একটি লেখার জন্যে লেখককে ধন্যবাদ। এমন গোছানো লেখা সারাদিন পড়লেও বিরক্তি আসবে না। ভবিষ্যতে এমন লেখা আরো চাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *