পৃথিবীতে এখনো অতি সাধারণ কিছু মানুষ আছে, যাদের অতি সাধারণ সরল জীবন আপনাকে বিস্মিত করবে। যাদের পাশে থাকলে মনে হবে জীবনের হিসাবটা কি সত্যি এত সরল! যতক্ষণ এই মানুষগুলোর সংস্পর্শে থাকবেন, প্রতি মুহূর্তে আপনি উপলব্ধি করবেন, আমাদের জীবনের অধিকাংশ সমস্যাগুলো হয় অহেতুক নতুবা সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের যত জটিলতা, এই মানুষদের সম্পূর্ণ এক জীবনে এত জটিলতা আছে কিনা তা নিয়ে মাঝে মাঝে সন্দেহ হয়। এই অতি সাধারণ মানুষগুলোর সান্নিধ্য বেশিরভাগ সময়ই পেয়েছি পাহাড় ভ্রমণে। তাই ভ্রমণে যাবার আমার প্রথম পছন্দ সবুজ পাহাড়।

শুধু যে পাহাড়ের টানেই যাই ব্যাপারটা এমন না। “পাহাড় তো একই রকম, তাই বলে বারবার কি দেখতে যাও!” এমন প্রশ্নের সম্মুখীন হরহামেশাই হতে হয়। মানুষ ভেদে ভিন্ন ভিন্ন উত্তর দেই, তবে মূল ব্যাপারটা একই থাকে। আমার শৈশবকে খুঁজে পাই ঐ পাহাড়ের কোলের এক চিলতে মাঠে হাফপ্যান্ট আর গেঞ্জি পড়া দুরন্ত ছেলেটিকে দেখে। যখন আঁকাবাঁকা উঁচু নিচু পথ দিয়ে হেঁটে যাই নিজের আত্নবিশ্বাস ফিরে পাই। এই খাঁড়া পাহাড় বেয়ে যখন উঠি, প্রচণ্ড পরিশ্রমে টপ টপ করে ঘাম ঝরে। একটু পর এক চিলতে ঠাণ্ডা বাতাসে প্রাণ ভরে শ্বাস নেই, তখন মনে হয় আমি প্রচণ্ড জীবন্ত !

ঘুরতে যাওয়া বা ভ্রমণ একটা বিশেষ ব্যয়বহুল শখ, এক সময় ছিল যখন মানুষ অচেনা জায়গা অবিস্কারের উদ্দেশে ভ্রমণে বের হত। এখন উদ্দেশ্য পরিবর্তন হলেও, সমাজ ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনায় ভ্রমণ খুবই জরুরী। শহুরে যান্ত্রিক জীবনের থেকে বিরতি নিতেই যে এই ভ্রমণ ঠিক তা কিন্তু না, বরং নিজেকে ও প্রকৃতিকে জানার জন্যই ভ্রমণের প্রয়োজনীয়তা এবং গুরুত্ব ব্যাপক। আর ভ্রমণ মানে যে পাহাড় বা সমুদ্রে যেতে হবে ব্যাপারটা এমন না, পুরান ঢাকার অলিগলি ঘুরাও হতে পারে চমৎকার অভিজ্ঞতা।



দিন শেষে বিকালের মায়াবী আলোতে যখন অনেকগুলো অপরিচিত চোখে বিশ্বাস আর ভালবাসা মাখা স্নেহ দেখি তখন মনে হয় আমার স্বপ্নের সমাজটা তো এমনি ছিল!

আজকাল যেকোন জায়গা সম্বন্ধে তথ্য খুব সহজেই পাওয়া যায়। নতুন কোন জায়গায় যেতে হলে অব্যশই সেই জায়গার ব্যাপারে পড়াশুনা করতে হবে, তবে আমি নিশ্চিত এই পড়াশুনা আমাদের ক্লাসের রেগুলার অ্যাসাইনমেন্টের মত একঘেয়ে হবে না। একটু নেট ঘাঁটলে গাদাগাদা ব্লগ আর অনেক তথ্য চলে আসে, গুগল আর্থের কথা বাদই দিলাম। তবুও আমরা অনেকেই অন্যদের ভ্রমণের প্ল্যান দেখে অথবা ফেসবুকে পোষ্ট দিয়ে অন্যদের ভ্রমণের পরিকল্পনা করে দিতে বলি। এতে আসলে আমরা অনেক বড় একটা অ্যাডভেঞ্চার মিস করি। ভ্রমণের পূর্বে যে পরিকল্পনা থাকে তাতেও কিন্তু যথেষ্ট চ্যালেঞ্জ আর মজা থাকে। আর অন্য সবার প্ল্যান আমার পছন্দ মত নাও হতে পারে। যদিও শেষ পর্যন্ত কোন পরিকল্পনাই পুরোপুরি প্রয়োগ করা সম্ভব হয় না, তবে একটি সঠিক পরিকল্পনা ভ্রমণে অনেক সহায়তা করে। আমার মতে একটা ভাল পরিকল্পনা ছাড়া একটা সফল ভ্রমণ অসম্ভব।

“জীবনকে সাধারণ ভাবে চলতে দাও।
এতো ছুটোছুটি করে কি হবে, দিন শেষে তো সেই আমার মতো
তোমাকেও ঘরে ফিরতে হবে।”

প্রথম দিকের ভ্রমণের কথা যদি বলি, তাহলে বলতে হয় প্রথম দিকে উঁচু পাহাড় আর জলপ্রপাতের খোঁজে হন্যে হয়ে ঘুরতাম। নতুন কোন জলপ্রপাত বা পাহাড় চূড়া সামিটের ছবিতে আমি থাকব না, এটা যেন হতেই পারে না! এই ব্যাপারটা খুব যে খারাপ ঠিক তা না, হয়ত এভাবেই হাতেখড়ি হয়। তবে একসময় চিন্তা-ভাবনায় পরিবর্তন আসে। ধীরে ধীরে  পাহাড়ের সংস্কৃতি, জীবন দর্শন ও চাষাবাদ নিয়ে আগ্রহ জাগে। জানতে পারি মুরং সম্প্রদায়ের এক যুবকের দর্শন থেকে নতুন এক ধর্ম/মতবাদের “ক্রামা” প্রবর্তন নিয়ে। দেখেছি ম্রোদের বর্ণমালা, পেয়েছি রূপকথার মত নানান বুনো ফুল আর চমৎকার সব খাবার। হারিয়ে গেলে কম্পাস ব্যবহার করে অথবা অন্ধকারে তারা দেখে কিভাবে দিক খুঁজতে হয়, সত্যিকার অর্থে তা শিখেছি পাহাড়ে পথ হারিয়ে। যেদিন কোনটা নিয়মিত হেঁটে চলার পথ আর কোনটা মৌসুমি হাঁটার পথ চিনতে শিখেছি সেই দিন যে আত্নবিশ্বাস জন্মেছে আর মানসিক যে পরিতৃপ্তি ছিল তা মোটামুটি গোল্ডেন এ প্লাস পাওয়ার চেয়ে কম ছিল না।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আকর্ষণীয় ছবি দিয়ে অথবা দুর্গম স্থানে ভ্রমণ শেষে পরিচিত সমাজে বিশেষ ব্যক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার লোভে নয় বরং নিজেকে জানা আর নতুন নতুন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হবার লক্ষ্যেই ভ্রমণ হয় তা একসময় বুঝতে শিখি। বলা যায় ভ্রমণের একটি বিশেষ পর্যায়ে শুরু হয় পর্যবেক্ষণ তারপর উপলব্ধি, আর তখন ভ্রমণে আসে পূর্ণতা।

“মানুষ ততদিনই বাঁচে, যতদিন তার মধ্যে কৌতূহল বিদ্যমান থাকে”

একটা ছোট গল্প, আনুমানিক ২০১২ এর জুলাই বা অগাস্টের দিকে কিছু বন্ধু মিলে মেঘ, বৃষ্টি দেখব বলে সাইকত পাড়া যাচ্ছিলাম। রুমা বাজার পেছনে ফেলে বগামুখের মারমা পাড়া থেকে বেশ অনেকটা উঁচুতে সাইকত পাড়া। অনেকের মতে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বসতি হল সাইকত পাড়া। বান্দরবানের অন্যান্য জায়গার মত বম সম্প্রদায়ের বসবাস এই পাড়ায়। বম গোষ্ঠীর মানুষরা সাধারণত খুবই পরিছন্ন এবং তুলনামূলক কম ঝাল খায়। বি: দ্র: এই কম ঝাল চোখ আর নাক দিয়ে পানি পড়ার পরিমাণের উপর পরিমাপ করে বলা। বম জাতি লোকজন সচরাচর খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী। প্রতিটি বম পাড়ার মাঝামাঝি একটু খোলা, উঁচু জায়গায় একটা চার্চ থাকবেই এবং চার্চের সামনের খোলা জায়গার ভিউটা হবে সবচেয়ে সুন্দর। বান্দরবানের অন্যান্য জাতিদের মধ্যে এই বম জাতির মানুষদের মধ্যে তুলনামূলক বেশ কিছুটা আধুনিকতার ছোঁয়া দেখা যায়, তবে ব্যাপারটা দৃষ্টিকটু নয় আর মূলত এই আধুনিকতা রুমা বাজারের আশপাশ কেন্দ্রিক।

সাধারণত বর্ষার সময় বেশ কড়া রোদ থাকে। আর ঐ দিন সকালে মনে হয় সূর্য মামার ঘুম ভাল হয়নি, তাই সকাল থেকে মামার মেজাজ বেশ গরম। প্রচণ্ড রোদে আর গরমে আমরা সবাই বেশ কাহিল। একটু পর পর ছায়া পেলেই বাতাসের জন্য বসে যাচ্ছি আর গাঁ এলিয়ে দিয়ে পানি খাচ্ছি। এভাবে প্রায় দুই ঘণ্টা আস্তে আস্তে উঠার পর বড় একটা চালতা গাছের ছায়ায় এক পাহাড়ি দাদাকে শুয়ে থাকতে দেখলাম। আশেপাশে আর কেউ নেই, তাই এগিয়ে যেয়ে জানতে চাইলাম  ‘কি ব্যাপার?’ বলল, ‘পাশের যে ছড়া ছিল গয়াল তা নষ্ট করে দিয়েছে। তাই উপরে এসে পানি পায় নাই। বেশ পানির পিপাসা পেয়েছে।’ ভাগ্যক্রমে ব্যাগে কলা পাউরুটি আর কিছু পানি অবশিষ্ট ছিল, তাই ভাগ করে খেলাম। তারপর হালকা কথাবার্তা বলে আবার সাইকত পাড়ার দিকে হাঁটা শুরু করলাম।

ক্ষুদ্র এই ব্যাপারটা সাইকত পাড়া পৌঁছানোর আগেই ভুলে গেছি। তারপর, প্রায় দুই বছর পর ২০১৪ তে রুমা বাজারের ভিতর দিয়ে হাঁটছি, জুমের মরিচ পাওয়া গেলে বাসার জন্য কিনব বলে। হুট করে বাচ্চা কোলে নিয়ে এক পাহাড়ি লোক আমার সামনে এসে বলল, ‘দাদা, কেমন আছ!’ আমি কিছুটা অবাক হয়ে তাকাতেই আমাকে সাইকত পাড়া জুমের ঘটনা মনে করিয়ে দিল, পরম আন্তরিকতার সাথে দোকানে নিয়ে চা খাওয়াল আর পরিবারের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। আজও আমার ব্যাপারটা অদ্ভুত এক ঘটনা মনে হয়। সামান্য ১০/১৫ মিনিটের পরিচয়। হয়ত সামান্য দুই চুমুক পানির জন্য এত আন্তরিকতা আর ভালবাসা আমার শহুরে মন মেনে নিতে পারে নি!

আমাদের জীবনের অনেক কিছুই আমাদের মনে নেই, যতটুকু মনে নেই তা জীবন থেকে হারিয়ে গিয়েছে, যতটুকু মনে আছে ততটুকুই জীবন। হ্যাঁ,আমি আজও তার নাম জানি না, তবে সেই হাসিমাখা সরল মুখটি প্রায়ই মনে ভাসে। এ  রকম হাজারো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘটনা আছে, যা প্রতিবার জীবনকে নতুন ভাবে ভালবাসতে শিখিয়েছে।

জীবনই অভিজ্ঞতা, আর অভিজ্ঞতাই জীবন। অভিজ্ঞতার সমষ্টির নাম জীবন আর জীবনকে খন্ড খন্ড করে
দেখলে এক একটি অভিজ্ঞতা।’-সৈয়দ মুজতবা আলী


(Visited 1 times, 1 visits today)

1 Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *