কালচক্রে সবুজ পাহাড় ধারাবাহিকে ‘নেচার অ্যাডভেঞ্চার ক্লাব ও সাকা হাফং’ অধ্যায় থেকে আমরা জানতে পারি জিঞ্জ ফুলেন নামে এক ব্রিটিশ ভদ্রলোকের কথা, যিনি ২০০৬ সালের বান্দরবানের মদক রেঞ্জে অবস্থিত সর্বোচ্চ চূড়া চিহ্নিত করতে বাংলাদেশে আসেন। এশিয়ার দেশগুলোর সর্বোচ্চ চূড়ায় আরোহণের প্রজেক্টের কারণেই জিঞ্জ ২০০৫ সালে প্রথমবারের মত বাংলাদেশে এসেছিলেন। সেবার তিনি গিনেজ বুক অফ রেকর্ডস স্বীকৃত বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চূড়া ‘কেওক্রাডং’ আরোহণের লক্ষ্য নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু অভিযানের সময় নানা কারণে তাঁর মনে একটা খটকা ঢুকে যায়। দেশে ফিরেও তিনি বাংলাদেশের পাহাড়ি জনপদকে ভুলতে পারেননি। এক বন্ধুর সাহায্যে পুরনো মানচিত্র, বইপত্র, রেফারেন্স, স্যাটেলাইট ইমেজারি ইত্যাদি ঘেটে নিশ্চিত হন কেওক্রাডং বা তাজিন ডং কোনটাই বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিন্দু নয়।

তার এই অনুসন্ধানী অভিযানের পর থেকেই মূলত বাংলাদেশের ট্রেকিং ও পাহাড় নিয়ে আগ্রহীদের মাঝে ব্যাপক সাড়া পড়ে যায়। জিঞ্জ ফুলেনের সেই অনুসন্ধানী অভিযানের আদ্যোপান্ত (২ পর্বে) জানার প্রাক্কালে ‘প্রাককথন’ লিখছেন অদ্রি সম্পাদনা পরিষদের একজন সালেহীন আরশাদী


প্রাককথন

২০০৯ সালের শেষ দিকে অনেকটা ভাগ্যগুণে আমি প্রজেক্ট বাংলাট্রেকের সাথে জড়িয়ে পড়ি। বাংলাদেশের পাহাড় চূড়া, জলপ্রপাত, গুহাসহ ট্রেইলগুলোর বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে এক জায়গায় সমাবেশ ঘটানো ছিল এই প্রজেক্টের মূল কাজ। প্রজেক্টে কাজ করার সুবাদেই প্রথমবারের মত জানতে পারি জিঞ্জ ফুলেনের নাম। এই ব্রিটিশ ভদ্রলোকই নাকি খুঁজে বের করেছেন, ছোটবেলায় বইপত্রে পড়া কেওক্রাডং নাকি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চূড়া নয়। বান্দরবানের আরো দক্ষিণ-পূর্বে মায়ানমার সীমানার কাছে গহীন জঙ্গলের মাঝে লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চূড়া। প্রথম দিকে এই নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাইনি। কিন্তু এই ধারণা পাল্টে যেতে খুব বেশি দিন সময় লাগেনি।

তখন আমার সামনে আমাদের সবুজ পাহাড়ের রহস্যাবৃত রূপটি মাত্রই উন্মোচিত হওয়া শুরু করেছে। প্রতিদিন নতুন কিছু সামনে আসছে। কত সুন্দর, কত রহস্যময় আমাদের এই সবুজ পাহাড়। নতুন নতুন অঞ্চলে পা রাখা ও প্রকৃতির সৌন্দর্যকে দুচোখ ভরে দেখা তখন একপ্রকার নেশার মত হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই সময়ই উপলব্ধি করলাম বান্দরবানের নতুন নতুন অঞ্চলে কোন লক্ষ্য স্থির করা ও সেখানে পৌঁছানো চাট্টিখানি কথা নয়। এর জন্য প্রচুর কাঠখড় পোঁড়াতে হয়। তথাকথিত আধুনিক সভ্যতা থেকে দূরে, যোগাযোগ ব্যবস্থাহীন, থাকা-খাওয়া এমনকি পথ সম্পর্কে কোন প্রকার তথ্য না থাকা একটি জায়গায় পৌঁছানো কতটা কষ্ট সাধ্য ব্যাপার তা টের পেয়ে গেলাম। তখন থেকেই আমি বান্দরবানে অনুসন্ধানী অভিযানের জন্য পা রাখা আমার অগ্রজদের সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখতে বাধ্য হলাম।

বলা যেতে পারে এই উপলব্ধির পর পরই অগ্রজদের পুরনো অভিযানগুলোর গল্প জানার জন্য অন্য রকম এক আগ্রহ তৈরি হল। বিশেষ করে সেই সময়ে বান্দরবানে একজন বিদেশি হয়ে জিঞ্জ ফুলেন প্রশাসনিক ও নানা প্রাকৃতিক বাধা পেরিয়ে কিভাবে খুঁজে বের করেন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিন্দু? তার সেই অনুসন্ধানী অভিযান সম্পর্কে খুঁটিনাটি জানার আগ্রহ ও কৌতূহল দিন দিন বাড়তেই থাকল।

কিন্তু ইন্টারনেটে অনেক ঘাটাঘাটি করেও তার এই অভিযান সম্পর্কে তেমন কোন তথ্যই পাওয়া গেল না। অগ্রজ ট্রেকারদের কাছেও জিঞ্জে সম্পর্কে বা তার বান্দরবানে অভিযান সম্পর্কে তেমন কিছু জানা গেল না। ২০১৬ সালে অদ্রির পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয় জিঞ্জ ফুলেনের সাথে, বেশ কয়েকবার ইমেইল চালাচালি হয়। অভিযান সম্পর্কে যতটা পারা যায় খুঁটিয়ে প্রশ্ন করা হয়। সেই মেইলগুলো, গিনেজ রেকর্ডের জন্য পাঠানো প্রতিবেদন ও অভিযান চলাকালীন সময়ে সহযোগীদের সাথে আদান-প্রদান করা তার তথ্যগুলো মিলিয়ে একযুগ আগের সেই অভিযানের একটি চিত্র অদ্রিতে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।


এক.

কোন একজন ব্রিটিশ ভদ্রলোকের বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিন্দু খুঁজে বের করে সেখানে অনুসন্ধানী অভিযান চালানো হুট করে ঘটে যাওয়া কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। এর পিছনের ঘটনা বুঝতে হলে আমাদের জিঞ্জ ফুলেন মানুষটা সম্পর্কে আগে বিশদভাবে জানতে হবে।

১৯৬৮ সালের ২৫ শে ডিসেম্বর জন্ম নেওয়া জিঞ্জ ফুলেন একজন ব্রিটিশ অভিযাত্রী। পেশায় তিনি একজন ডিপ সী ডাইভার। সমুদ্রের তলদেশেই তার কাজ কারবার। জিঞ্জ ২০ বছর ধরে ব্রিটিশ নেভিতে একজন ক্লিয়ারেন্স ডাইভার হিসেবে কাজ করেছেন। এছাড়া সমুদ্রের তলদেশে কাজ করা ইঞ্জিনিয়ার দল, বিস্ফোরক অপসারণ দল ও গভীর সমুদ্রতলে নানা রকম পরীক্ষা নিরীক্ষা করা ডাইভিং দলের সাথে তিনি কাজ করেছেন। পৃথিবীর বেশ কয়েকটি কঠিন কোর্সে তিনি অংশ নিয়েছেন। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে মর্যাদাপূর্ণ ‘গ্রিন ব্যারেট’ কমান্ডো কোর্স।

বোমাং সার্কেলের পঞ্চদশ রাজা অং শৈ প্রু চৌধুরীর সঙ্গে জিঞ্জ ফুলেন

জিঞ্জ ফুলেন একজন জাত লড়াকু। যেকোন ধরনের চ্যালেঞ্জ নেওয়ার জন্য তিনি সবসময় মুখিয়ে থাকেন। পৃথিবীতে যত উদ্ভট রকমের প্রতিযোগিতামূলক খেলা আছে সবগুলোতে অংশ নেওয়া তার অন্যতম একটি শখ। ওয়ার্ল্ড কাস্টার্ড পাই চ্যাম্পিয়নশিপ, ওয়ার্ল্ড পেস্টি চ্যাম্পিয়নশিপ, পুডিং কিংবা বার্গার খাওয়া প্রতিযোগিতা, রাবার ব্যান্ড আঙুলে টেনে কে কত দূর পর্যন্ত নিতে পারে তার প্রতিযোগিতা, নিজের হাতে বানানো কার্ট রেস, কয়েন টস করার প্রতিযোগিতাসহ দেশ-বিদেশ ঘুরে উদ্ভট থেকে উদ্ভট  সব প্রতিযোগিতায় তিনি অংশ নেন।

এইটুকু বললেই আসলে তার পরিচয় শেষ হয়ে যায় না। মহাসাগরের গভীর তলদেশে ডুব দেয়ার পাশাপাশি তিনি একজন পর্বতারোহীও বটে। ১৯৯০ দশকে সবচেয়ে কমসময়ে ইউরোপের সবকটি দেশের (৪৭টি) সর্বোচ্চ চূড়ায় আরোহণের রেকর্ড করে তিনি সবার নজর কাড়েন।

পরবর্তীতে ২০০০-২০০৫ সালের মধ্যে আফ্রিকা মহাদেশের ৫৩ টি দেশের সর্বোচ্চ চূড়ায় আরোহণ করে আরেকটি গিনেজ রেকর্ড করেন। এরপরই মূলত পৃথিবীর সকল দেশের সর্বোচ্চ চূড়া বা বিন্দুতে পৌঁছানোর এক বিরাট পরিকল্পনা তিনি ফেঁদে বসেন। এই পরিকল্পনা থেকেই ১৯৯৬ সালে পৃথিবীর সর্বোচ্চ বিন্দু মাউন্ট এভারেস্ট আরোহণ করতে গিয়ে তার হার্ট অ্যাটাক হয়। ভাগ্যগুণে ও তার সঙ্গীদের তৎপড়তায় সেবার প্রাণে বেঁচে যান জিঞ্জ। এত বড় একটি দূর্ঘটনার পরেও তিনি তার অভিযাত্রা থেকে সরে আসেন নি। ৬০০০ মিটারের উপর যাওয়া প্রাণঘাতী হতে পারে তাই তার তালিকা থেকে ১২ টি দেশ বাদ দিয়ে ১৯৪ টি দেশের সর্বোচ্চ চূড়ায় আরোহণ করার তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে থাকেন জিঞ্জ। ২০০৫ সালে ১৫০ তম দেশের সর্বোচ্চ বিন্দু আরোহণের লক্ষ্যে তিনি পা রাখেন বাংলাদেশে।

দুই.

পূর্ব তিমুরে লক্ষ্যে পৌঁছানোর পর ২০০৫ সালের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে জিঞ্জ পা রাখেন বাংলাদেশে। একটা সময় জিঞ্জ ভেবেছিলেন বাংলাদেশ পর্বটা তার জন্য খুব সাদামাটা একটা অধ্যায় হবে, তাই এই নিয়ে মনে মনে একটু গড়িমসিও করছিলেন। কিন্তু তিনি যে কতটা ভুল ছিলেন, তা ধীরে ধীরে উপলব্ধি করতে থাকেন।

‘I was half putting off Bangladesh because I thought it might be quite boring. How wrong I was.’ 

কিভাবে কেওক্রাডং যাওয়া যায়, কি ধরনের পারমিট লাগবে, পারমিটের জন্য কি কি কাগজ পত্র লাগবে, কোন অথরিটি পারমিট ইস্যু করে ইত্যাদি প্রয়োজনীয় তথ্যগুলো তিনি ইন্টারনেট ঘেটে খুঁজে পাননি। জিঞ্জ মনে করেন কখনও কখনও উঁচু পাহাড় চূড়াগুলোতে পৌঁছানোর চেয়ে এগুলোকে খুঁজে বের করার জন্য যে প্রক্রিয়া তাতে অনেক বেশি আনন্দ অন্তরনিহিত।

বাংলাদেশের আসার আগে তিনি পৃথিবীর আরো দূর্গমতম অঞ্চলে ঘুরে এসেছেন। তুরষ্কের সর্বোচ্চ চূড়া মাউন্ট আরারাত আরোহণ কালে তাকে স্থানীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সাথে মুখোমুখি হতে হয়েছে, যুদ্ধবিদ্ধস্ত চেচেনিয়ায় বিদ্রোহীরা তাকে মারধোর করে তার সর্বস্ব লুঠ করে নিয়ে গেছে, সুইস আর্মির সদা সতর্ক চোখ ফাঁকি দিয়ে ভ্যাটিকানে তিনি প্রবেশ করেছেন। 

বান্দরবানে নেমেই রুমা বাজার যাবার অনুমতির জন্য তাকে যেতে হয় ডিসি অফিস। কোন প্রতিকূল পরিস্থিতিকে কিভাবে নিজের অনুকূলে নিয়ে আসা যায় তিনি সেটা ভালভাবেই জানেন। তার চোখে মুখে সেই হাল না ছাড়া, গোয়ার ও প্রত্যয়ীভাব খুব স্পষ্টভাবেই ফুটে উঠে। ডিসি অনুমতি দিতে বাধ্য হোন।

‘The DC said doing Keokradong and Tazing Dong would be impossible at first but refined his views to at least very difficult when he knew I wasn’t leaving his office without a permit for the area.’ 

প্রাথমিকভাবে তার পরিকল্পনা ছিল কেওক্রাডং চূড়া আরোহণ করে বাংলাদেশ অধ্যায়টি শেষ করবেন। কারণ গিনেজ বুকে কেওক্রাডংকেই বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চূড়া  হিসেবে নথিভূক্ত করা আছে। কিন্তু ডিসি অফিসে গিয়ে তিনি অদ্ভুত একটি বোর্ড দেখতে পান। যেখানে লেখা ছিল ‘তাজিং ডং’, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চূড়া। সেখানে তাজিং ডংয়ের উচ্চতা লেখা ছিল ৪,৫৯৯ ফিট। ঘটনার নতুন নাটকীয়তায় তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, এসেছেন যখন এই ফাঁকে তাজিং ডংও ঘুরে যাবেন।অদ্রি

পাহাড়ে অপহরণ সংক্রান্ত ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের সতর্কতা সত্ত্বেও পুলিশ প্রটেকশনের অনুরোধ তিনি তীব্রভাবে প্রত্যাখান করেন। শেষ পর্যন্ত আর্মিদের আতিথেয়তা, পারমিটের পেরেশানি ও পুলিশদের খবরদারি এড়িয়ে শুরু হল জিঞ্জের বান্দরবানের অভ্যন্তরমুখী যাত্রা।

অদ্রি

তিন.

বান্দরবান শহর থেকে লোকাল জিপ দিয়ে শুরু হল জিঞ্জের অভিযাত্রা। চিম্বুকের উপর ওয়াই জংশনে এসে গাড়ি বায়ে বাঁক নিল। কিছু জায়গায় পিচ ঢালা ও কিছু জায়গায় এবড়ো থেবড়ো রাস্তা ও ঝিড়ির উপর বেশ কয়েকটি লোহার ব্রিজ পেরিয়ে জিপ এসে পৌঁছালো কাইক্ষং ঝিড়ির মুখে। এখান থেকে বাকি পথটুকু নৌকায় যেতে হবে। 

সাঙ্গু নদীর উপর রুমার ব্রিজ তৈরির কাজ তখনও শেষ হয় নি। নদীর দুপাশে দুটি করে পিলার দাঁড়িয়ে গেলেও মাঝের স্ল্যাবটুকু একেবারে ফাঁকা। পিলার থেকে বের হয়ে থাকা জং ধরা লোহার রডগুলো সাক্ষী দিচ্ছে বহুকাল ধরে ব্রিজ তৈরির কাজ বন্ধ আছে।

দুই পাশের সবুজ খাড়া পাহাড়, দক্ষিণ থেকে নেমে আসা নদী, অর্ধ সমাপ্ত ব্রিজ দেখে মনে হয় এটি ব্রিজ ‘ওভার দ্যা রিভার কাওয়াই’ মুভির কোন সেট। এই মাত্র বোম দিয়ে ব্রিজটি উড়িয়ে দেয়া হয়েছে। রুমা গ্যারিসনে আরেকবার আর্মিদের খাতায় নাম লিপিবদ্ধ করে শেষ পর্যন্ত জিঞ্জে এসে পৌঁছালেন রুমা বাজার। নদীর পাড়ের এই বাজারটি দেখে জিঞ্জের মনে হল এখানে অনায়াসে হ্যারিসন ফোর্ডের ইন্ডিয়ানা জোন্স মুভির পটভূমি হতে পারে।

তার প্রথম লক্ষ্য ছিল কেওক্রাডং। তার কাছে তথ্য ছিল এই চূড়াটি ও তদসংলগ্ন অঞ্চল ১৯৪০ এর দশকে ব্রিটিশরা সার্ভে করেছে। ১৯৪৭ সালে ভারত উপমহাদেশের পার্টিশনের জন্য সীমানা ধরে স্যার সিরিল রেডক্লিফ যেই লাইন আঁকেন সেই সময়ই বাংলাদেশের পূর্ব সীমানা ও এই অঞ্চলটি সার্ভে করা হয়। স্থানীয় বেশির ভাগ মানচিত্রে কেওক্রাডংয়ের উচ্চতা দেখায় ৮৮৪ মিটার। সার্ভে অফ বাংলাদেশ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের সরকারীভাবে স্বীকৃত এই চূড়ার উচ্চতা ২৯০০ ফিট।

রুমা থেকে রওনা হয়ে কোন উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছাড়াই ১২ই অক্টোবর জিঞ্জ বগালেক হয়ে কেওক্রাডং পৌঁছান। চূড়ার ১০ মিটার নিচে তিনি মাটির রাস্তা পান, এরপর সিঁড়ি বেয়ে উঠে যান একেবারে চূড়ায়। জিঞ্জ চূড়ার উপর ১৯৯৩ সালে রাখা একটি পাথরের ফলক খুঁজে পান। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মেজর এ. এম. মোসাররফ হোসেনের নামাঙ্কিত এ ফলকে খোদাই করে লেখা ছিল কেওক্রাডং-বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চূড়া। উচ্চতা লেখা ছিল ৩,১৭২ ফিট।

ফুলেন ঘুরে যাবার পর ২০০৫ সালের ডিসেম্বর মাসে লেফটেন্যান্ট সায়েদ আরিফ (মুন) এর নামাঙ্কিত আরেকটি পাথরের ফলক দেখা যায়। জিঞ্জ ফুলেন তার সাথে থাকা গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম বা হ্যান্ড হেল্ড জিপিএস রিসিভার যন্ত্রের মাধ্যমের কেওক্রাডংয়ের উচ্চতা পান ৯৮৫ মিটার। 

exploreaudree.com

চার. 

মারুফ বিন আলমের লিখা ফিরে দেখা: আমার প্রথম কেওক্রাডং অভিযান’ থেকে জানা যায়, ১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে শান্তিবাহিনীর প্রধান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমার মধ্যে শান্তি চুক্তি হয়। এই চুক্তির ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের অসীম সৌন্দর্যের দুয়ার সমতলবাসীদের জন্য উন্মুক্ত হয়। সেই সময় পত্রপত্রিকায় একটা খবর প্রচার হচ্ছিল যে, কেওক্রাডং বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু চূড়া নয়। এর থেকেও উঁচু একটি চূড়া আবিস্কার হয়েছে যার নাম তাজিংডং।

সরকারিভাবে যার নতুন নামকরণ করা হয়েছিল ‘বিজয়’। ২৬ শে মার্চ ১৯৯৮ তারিখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নতুন ‘বিজয়’ শৃঙ্গটি উদ্ভোধন করার কথা ছিল। ১৯৯৮ সালে পাওয়া তথ্য উপাত্তের উপর নির্ভর করে শেষ পর্যন্ত তারা যেই চূড়াটি আরোহণ করেন আসলে সেটি কেওক্রাডংই ছিল।

এদিকে জিঞ্জ জানতে পারেন ২০০৩ সালে বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু পাহাড় চূড়া কোনটি এই নিয়ে বিতর্কের ব্যাপারটি এসেছিল। সেই বছর সার্ভে অফ বাংলাদেশ কেওক্রাডংয়ের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে ফটোগ্রামেটিক সার্ভে পরিচালনা করে। তাদের সার্ভেতে তাজিং ডংয়ের উচ্চতা পাওয়া গিয়েছিল ৯৮৭ মিটার বা ৩,২৩৮ ফিট। এদিকে বান্দরবানের ডিসি অফিসে তিনি দেখে এসেছেন তাজিং ডংর উচ্চতা ৪,৫৯৯ ফিট।’ তবে কেওক্রাডং বেশি লাইমলাইটে থাকায় স্থানীয় মানচিত্রগুলোতে তাজিন ডং তখনও স্থান করে নেয়নি।

‘তাজিং ডংয়ের জন্য নামফলক; ধরে আছেন গাইড মেংপং

বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চূড়া নিয়ে সৃষ্টি হওয়া এই মনের জট দূর করতে তিনি কেওক্রাডংয়ের পর তাজিং ডংয়ের দিকে যাত্রা শুরু করেন। বাক্তলাই পাড়ায় রাত কাটিয়ে প্রাতা পাড়া অতিক্রম করে সিম তল্যাং পি পাড়ার দিকে এগিয়ে যাবার পথে দূর থেকেই তিনি তাজিং ডংয়ের তিনটি চূড়া দেখতে পান। সিম তল্যাং পি পাড়ায় পৌঁছে তিনি জানতে পারেন বাক্তলাই আর্মি ক্যাম্পের একজন মেজর তার আসার দুই সপ্তাহ আগে ২রা অক্টোবর (২০০৫) পাথরে খোদাই করা একটি ফলক পাড়ায় রেখে গেছেন। ফলকে লেখা ছিল, ‘ তাজিং ডং; বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চূড়া’। এর উচ্চতা খোদাই করা ছিল ৩,৩৮০ ফিট। বাক্তলাই ক্যাম্পে অবস্থান করা মেজরের কাছ থেকে ফলকটিকে চূড়ায় পৌঁছে দেয়ার অনুমতি চাইলে মেজর সানন্দে রাজি হয়ে যান। জিঞ্জের মনে হয়েছিল ২ ঘণ্টা হেঁটে পাহাড় বেয়ে পাথরের এই টুকরোটি চূড়ায় স্থাপনের ব্যাপারে মেজর আদৌ আগ্রহী ছিলেন না। উলটো অন্য কেউ আগ্রহ নিয়ে এই কাজটি করতে চাচ্ছে দেখে মেজর হাফ ছেড়ে বেঁচেছিলেন। 

তাজিং ডংয়ের জন্য নামফলক রং করা হচ্ছে

অতঃপর জিঞ্জ পাড়া থেকে চারজন কুলির সাহায্যে পাথরে খোদাই করা সেই ফলক ও পাড়ার স্কুল শিক্ষককে সাথে নিয়ে চূড়ার পথে রওনা দেন। সেই মেজর ও পাড়াবাসীদের মতে মাঝের চূড়াটিই তাজিং ডংয়ের মূল চূড়া। আর এটিই সবচেয়ে উঁচু। এটিকেই সার্ভে দল স্বীকৃতি দিয়েছে। চূড়া পর্যন্ত ঝোপঝাড় পরিষ্কার করে রাখা ছিল। চূড়ার উপরে একটি ছাপড়া ঘরও তিনি খুঁজে পান। জিঞ্জের হ্যান্ডহেল্ড জিপিএস ডিভাইসে এই চূড়ার উচ্চতা পাওয়া যায় ৮৪৬ মিটার বা ২,৭৭৫ ফিট। 

এই চূড়া থেকেই তিনি স্পষ্ট দেখতে পান সর্ব উত্তরের চূড়াটিকেই সবচেয়ে উঁচু লাগছে। তাই তিনি এই চূড়াটিতেও যাবার সিদ্ধান্ত নেন। 

চার জন পোর্টার, স্কুল শিক্ষক ও জিঞ্জের ঝোঁপ-ঝাঁড় ও বাঁশের ঘন জঙ্গল পরিষ্কার করে চূড়া পর্যন্ত পৌঁছাতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগে। সৌভাগ্যক্রমে তারা মৌমাছির চাক ও একটি সাপকে বিরক্ত করা থেকে বেঁচে যান। আরো ৩৫ মিটারের মত আরোহণের পর তারা শেষ পর্যন্ত ওই চূড়ায় গিয়ে পৌঁছাতে সক্ষম হন। চূড়ায় পৌঁছে তিনি বুঝতে পারেন সার্ভের জন্য এর মধ্যে কোন মানুষ এই চূড়ায় আসেনি। কোন না কোনভাবে সার্ভে থেকে এটি বাদ পড়ে গেছে। এই চূড়াটির উচ্চতা পাওয়া যায় ৮৮১ মিটার। যা আগের চূড়াটি থেকে প্রায় ৩৫ মিটার উঁচু। 

চূড়া থেকে নেমে শেরকর পাড়া ও বোর্ডিং পাড়া হয়ে তিনি থানচি এসে পৌঁছান। 

পাঁচ.

বান্দরবান থেকে ফিরে তিনি (সার্ভেয়র জেনারেলের অফিসে) সেই মেজরের সাথে দেখা করেন যিনি ফটোগ্রামেটিক সার্ভে করেছিলেন। সার্ভে অফ বাংলাদেশের সঙ্গে তার পাওয়া তথ্য উপাত্ত নিয়ে সাক্ষাৎ করেন। জিঞ্জ তার পাওয়া তাজিং ডংয়ের উচ্চতা প্রকাশ করলে তারা দুজনই এই দাবি হেসে উড়িয়ে দেন।  তারা বলেন জিপিএস দিয়ে নিখুঁত তথ্য পাওয়া সম্ভব নয়, বরং তাদের করা ফটোগ্রামেটিক সার্ভেই বেশি বিশ্বাসযোগ্য।

জিঞ্জ কিছুতেই মানতে পারেননি তার পাওয়া তথ্য কোনভাবে ভুল হতে পারে। মিটিংয়ের পর ঢাকা থেকে তার সহযোগী গ্রান্ট হাচিসনকে পাঠানো ইমেইলে জিঞ্জে দাবি করেন, জিপিএস লগ রাখার সময় তিনি সচেতন ছিলেন আর তার জিপিএস ডিভাইসে ১০ মিটারের বেশি এরর কখনোই ছিল না। 

তিনি যখন মিটিং শেষে চেয়ার ছেড়ে উঠতে যাচ্ছিলেন তখনই সার্ভেয়র জেনারেলের চেয়ারের পিছনের দেয়ালে লটকে থাকা বেশ পুরনো একটি মানচিত্রের উপর তার নজর আটকে যায়। বিশাল সেই টপোগ্রাফিক মানচিত্র, ওয়ালপেপারের মত দেয়ালের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত জুরে আছে। ধুলো পড়া, মলিন হয়ে ক্ষয়ে যাওয়া সেই ১:২৫০০০০ আকারের বিশাল মানচিত্রের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল এই ম্যাপের দিকে অনেক বছর কেউ চোখ রাখেনি, এখানে এভাবেই অবহেলিত অবস্থায় ঝুলে আছে। 

মানচিত্রে চোখ বুলানো শুরু করতেই জিঞ্জ কেওক্রাডং খুঁজে পান। সেখানে তার উচ্চতা দেওয়া আছে ৩,১৭২ ফিট। তাজিং ডংয়ের কোন অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া গেল না। বাংলাদেশ-ভারত-মায়ানমার বর্ডারে অবস্থিত র‍্যাং তল্যাংয়ের উচ্চতা পাওয়া গেল ৩,১১০ ফিট। 

মানচিত্রের সামনে বেশ কিছু ধুলো মাখা, পুরনো স্তুপ করে ফাইল রাখা ছিল৷ ফাইলগুলো বাংলাদেশের হিল ট্র্যাকসের সর্ব দক্ষিণের কিছু অংশ আড়াল করে রেখেছে। অনুমতি নিয়ে ফাইলগুলো সরিয়ে মানচিত্রটি ভালভাবে দেখার অনুমতি চান জিঞ্জ। সার্ভেয়র জেনারেল ‘শিউর’ বলে অনুমতি দিয়েই আবার মেজরের সঙ্গে কথোপকথনে মনোনিবেশ করেন।

‘I then asked if I could look at a stack of old files that looked untouched in years that were blocking the southern half of the Hill Track area.’

জিঞ্জ পুরনো ফাইল ও বইপত্র সরিয়ে বাংলাদেশের একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে চোখ বুলানো শুরু করলেন। একেবারে দক্ষিণ-পূর্ব কোনায় মদক তং নামে ২,৯৬৯ ফিটের একটি চূড়া পাওয়া গেল। ধুলো পড়া একটা জায়গায় ফু দিয়ে পরিষ্কার করতেই বেড়িয়ে এল পূর্ব সীমান্তের চূড়া ৩,২৯২ ফিট উচ্চতার মদক মুয়াল। 

‘Mowdok Mual showed directly on the border with Myanmar, as did Mowdak Tung and Reng Tlang which is on the tri-border.  It is certainly a remote area and given the lower heights recorded of the main two contenders cannot be ignored.’

জিঞ্জে তৎক্ষণাৎ উপস্থিত সেই মেজরের সাথে বাজি (ডিনার) ধরে ফেললেন। তাজিং ডং বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চূড়া হতে পারে না। এমনকি কেওক্রাডংও সর্বোচ্চ হবে কিনা তাই নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। 

কেওক্রাডং ও তাজিন ডং থেকে ফিরে আসার পর বান্দরবানের ডিসির সঙ্গেও জিঞ্জ দেখা করেছিলেন। মদক মুয়ালের প্রসঙ্গ তুলতে ডিসি জিঞ্জকে না-সূচকভাবে মাথা নেড়ে বলেছিলেন,      

“Forget possible extremist groups hiding out from Bangladesh or Myanmar, and possible drug smuggling groups, the terrain is impossible.” 

তখনকার মত জিঞ্জকে বাংলাদেশ অধ্যায়টি সফল ধরে নিয়েই ফিরতে হয়। কারণ গিনেজ বুক ও বাংলাদেশের স্বীকৃত তথ্য অনুসারে সর্বোচ্চ দুইটি পাহাড়ই তিনি আরোহণ করেছেন।        

কিন্তু মনে মনে জিঞ্জ জানতেন তাকে আবার এই সবুজ পাহাড়ে ফিরে আসতে হবে। খুব শীঘ্রই বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চূড়ার এই রহস্য তাকে ভেদ করতে হবে। দেশে ফিরে যাবার মাত্র চার মাসের মাথায় তিনি আবারো বাংলাদেশে ফিরে আসেন। এবারে তার লক্ষ্য বাংলাদেশের পূর্ব সীমান্তের মদক অঞ্চল।

বাকি অংশ

(Visited 1 times, 1 visits today)

8 Comments

  1. আমি এতক্ষন কেওক্রাডং ও তাজিংডং ঘুরতে ছিলাম…
    চার মাস পর মদক যাবার প্লান করছি…

  2. আহ, শেষ হয়ে গেল?? আমি তো তাজিংডং এর চুড়ায় নিজেকে কল্পনা করছিলাম….
    খুব সুন্দর লিখা..একবারে পড়লাম…বাকিটুক কবে পাবো?কোথায় পাবো?

  3. দারুণ দারুন। অধির আগ্রহের সাথে অপেক্ষায় পরবর্তী কিস্তির জন্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *