প্রথম খণ্ডের পর


সাল ১৯৪৪

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-১৯৪৫) মানব সভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ সময়কাল। যুদ্ধে তৎকালীন বিশ্বের সকল পরাশক্তি দেশগুলো বিভক্ত হয়ে সৃষ্টি করে দুইটি সামরিক জোট; মিত্রশক্তি ও অক্ষশক্তি। অক্ষশক্তির আগ্রাসন বা সম্ভাব্য আক্রমণ রুখতে মিত্রশক্তির দেশগুলো এই যুদ্ধে আরও জড়িয়ে পড়ে। 

পৃথিবীর বিভিন্ন ফ্রন্টে তখন অক্ষশক্তি ও মিত্রবাহিনীর মধ্যে লড়াই চলছে। ব্রিটিশরা মিত্রশক্তি জোটের অন্যতম প্রধান পরাশক্তি। জাপানি বাহিনী পুবদিক থেকে ঝটিকা আক্রমণ করে দ্বিতীয়বারের মত বার্মায় ঢুকে পড়ে ও দোর্দণ্ডপ্রতাপে বার্মা থেকে ব্রিটিশদের তাড়িয়ে দেয়। দক্ষিণে অগ্রসর হতে হতে জাপানি সৈন্যরা বার্মার আরাকান প্রদেশও এক সময় দখল করে নেয়। 

কিন্তু বঙ্গোপসাগর থেকে ধেয়ে আসা মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে বর্ষা শুরু হয়ে যাওয়ায় ব্রিটিশ বাহিনী বিপাকে পড়ে যায়। পাহাড় ধস, কাদা, অনবরত বৃষ্টির কারণে সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে ব্রিটিশ বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়। জাপানি সৈন্যরা ধীরে ধীরে পশ্চিমে অগ্রসর হয়ে একসময় সীমানা পাহাড় ‘মদক তং’য়ে ঘাঁটি গেড়ে বসে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ সীমান্ত হঠাৎ করেই হয়ে পড়ে অরক্ষিত।

বাংলায় যদি জাপানি সৈন্যরা ঢুকে যায় তাহলে ব্রিটিশ ইন্ডিয়াকে রক্ষা করা সম্ভব হবে না। তাই আধিকারিকরা তাদের দুর্ধর্ষ ২৬তম ইন্ডিয়ান লাইট ইনফেনট্রি ডিভিশনকে চট্টগ্রামে মোতায়েন করতে বাধ্য হয়।

১০শে অক্টোবর, ১৯৪৪ সিয়েরা লিয়ন রেজিমেন্টের প্রথম ব্যাটেলিয়ন সীমানা পাহাড় থেকে জাপানি সৈন্যকে হটিয়ে দিতে পুনরায় বান্দরবান শহর ত্যাগ করে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল আরাকানের আকিয়াব বন্দরের দখল ফিরে পাওয়া। অন্যদিকে ফিফথ ব্রিগেড ‘মদক তং’ থেকে চার মাইল দক্ষিণে, দক্ষিণ-পুবের একটি গ্রামে (সালোকিয়া) তাদের ঘাঁটি বানায়।

পরদিন ব্রিটিশ এয়ারফোর্সের বোমারু বিমান মদক তংয়ে অবস্থিত জাপানি ঘাঁটির উপর বোমা বর্ষণ শুরু করে। হামলার পর ঘাঁটির দখল নিতে ফোর্থ ব্যাটেলিয়ন নাইজেরিয়া রেজিমেন্টের একটি দল ঢাল বেয়ে উপরে উঠতে গেলে সীমান্তে শুরু হয় ব্যাপক গোলাগুলি। চূড়ার উপর ভারী মেশিনগানের আক্রমণে ব্রিটিশ বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়। পরদিন আরেকটি হামলা ব্যর্থ হয়। অবশেষে ১৪ই অক্টোবর নাইজেরিয়া রেজিমেন্টের ফোর্থ ব্রিগেড মদক তং চূড়া থেকে জাপানিদের হটাতে সক্ষম হয়। 


উৎস: OFFICIAL HISTORY OF THE INDIAN ARMED FORCES IN THE SECOND WORLD WAR, 1939 -45; Campaigns in the Eastern Theatre; THE ARAKAN OPERATIONS 1942-45. Chapter: Operation Romulus (page 195). 


আরাকান দখলে নেওয়ার এই যুদ্ধে স্থানীয় ভারতীয় সৈন্যদের পাশাপাশি বেশ কয়েকজন স্কটিশ সৈন্য মারা গিয়েছিল। এমনই একজন হতভাগা সৈনিকের মেয়ে পরবর্তী সময়ে বান্দরবানের মদক অঞ্চলে এসেছিলেন, তার বাবা কোথায় মারা গিয়েছিলেন তা খুঁজে বের করতে। তার ভ্রমণের ছোট্ট এই খণ্ডাংশ খুব মনযোগ দিয়ে পড়ছেন ব্রিটিশ অভিযাত্রী জিঞ্জ ফুলেন। 

‘The British fought in this area in WW2 and a Scottish lady had apparently been in a few years back to see where her father had been shot down and killed.’

ইন্টারনেট আর্কাইভ, ব্রিটিশ লাইব্রেরির নানা জার্নাল ও গ্যাজেটিয়ার ঘেটেও এই একটি ঘটনার উল্লেখ ছাড়া এই অঞ্চলে ‘মদক’ নামে আর কোন তথ্য তিনি জোগাড় করতে পারলেন না। 

এদিকে যতদিন যাচ্ছে তার মনে একটি খচখচানি বেড়েই যাচ্ছে। পৃথিবীর সবকটি দেশের সর্বোচ্চ চূড়ায় আরোহণ করে একটি বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চাচ্ছেন তিনি। এই প্রজেক্টের আওতায় ২০০৫ সালে তিনি বাংলাদেশ এসেছিলেন। কিন্তু অভিযানকালে তাঁর পাওয়া তথ্য উপাত্ত, পুরনো ম্যাপ ও আধুনিক প্রযুক্তির এসআরটিএম ডাটার সাহায্যে পাওয়া তথ্য উপাত্তের সাথে সরকারী দাবীকৃত তথ্যের সামঞ্জস্য না থাকায় তিনি আরও বিশদভাবে পর্যবেক্ষণ শুরু করেন। 

ট্রেকিংয়ে জিঞ্জ

আগের পর্বে আমরা জেনেছি সার্ভেয়র জেনারেলের অফিসে দেয়ালে লাগানো পুরনো এক মানচিত্র ঘেঁটে বান্দরবানের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে ‘মদক মুয়াল’ নামের একটি চূড়া দেখতে পান, যার উচ্চতা কেওক্রাডংও তাজিং ডং থেকে বহু উঁচু দেখাচ্ছিল। তখনই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চূড়ার রহস্য তিনি ভেদ করবেনই।

বান্দরবানের ডিসি’র মতই জিঞ্জের কাছে মদকের ব্যাপারটা শুনে সেনারা জানায়, ওই স্থানটিতে যাওয়া সত্যিই দুরূহ হবে। যে সেনা সদস্য এলাকাটি ঘুরে এসেছেন, তিনি স্থানটির নাম জানতেন কিন্তু এখানে যে দেশের সর্বোচ্চ চূড়া থাকতে পারে, তা তিনি ভাবেননি।

‘They have a small camp that in the area that they supply mostly by helicopter but it is possible sometimes to get up there by canoe which takes 2 days, then there’s the walk in which nobody had any good information about.

অন্যদিকে সর্বোচ্চ চূড়ার অবস্থান সম্পর্কে জিঞ্জের আরেকটি পর্যবেক্ষণ, 

‘The army says they are over the border into Myanmar though. I doubt all information locally though as everyone just goes to the nearest and easiest point or tells you what they think you want to hear.  This whole ridge line from Reng Tlang down to Mowdak Tung needs an extra look at.’

তাই, জিঞ্জের সকল আগ্রহ গিয়ে একীভূত হয় বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্তে। জিঞ্জের সন্দেহ উচ্চতম চূড়া নির্ণয়ে ফটোগ্রামেটিক সার্ভে করার সময় এই চূড়াগুলো হিসেবের ভেতর রাখা হয়নি।

সর্বোচ্চ চূড়ার এই রহস্যভেদে জিঞ্জ ফুলেনকে সবচেয়ে বেশী সহায়তা করেন আরেক স্কটিশ ‘গ্রান্ট হাচিসন’। নেগিভেশন এক্সপার্ট হিসেবে প্রতি দেশের চূড়া আরোহণের সময় জিঞ্জ গ্রান্টের সহায়তা নিতেন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও স্যাটেলাইট ইমেজারি, SRTM ডাটা, সোভিয়েত টপোগ্রাফি ম্যাপ, সিআইএ’ প্রণীত মানচিত্র ঘেটে তাঁকে সম্ভাব্য সকল সর্বোচ্চ চূড়ার অবস্থান ও উচ্চতা বিশ্লেষণ করে গ্রান্ট জিঞ্জকে একটি অনামী কিন্তু সুনির্দিষ্ট একটি স্থানাংক দিয়ে ইমেইল পাঠান।

‘The high “Mowdok” summit of 1053m I’ve been talking about is actually on the ridge between Reng Tlang and Mowdok Mual. It’s at 21 47.20N 92 36.55E. Mowdok Mual (1003m) is farther south, 21 40.40N 92 36.30E. I can send you a scan of the Russian topo if that’d be useful.’ 

কিন্তু গ্রান্টের দেওয়া স্থানাংকের সাথে মানচিত্রে দেখা মদক মুয়ালের স্থানাংক মিলছিল না। TPC, রাশিয়ান মিলিটারির টপোগ্রাফি মানচিত্র ও শাটল রাডার টপোগ্রাফি মিশন ঘেঁটে পাওয়া গ্রান্টের দেওয়া চূড়ার অবস্থান মদক মুয়াল থেকে আরও উত্তরে দেখাচ্ছিল। আর এই বিন্দুর উচ্চতা দেখাচ্ছিল ১,০৫৩ মিটার। তারা অন্য কিছু উৎস থেকে এই চূড়ার দুটি নাম খুঁজে পান, 

মদক তং 
খানকা তং

যদিও স্থানীয় রীতি অনুযায়ী এই নাম দুটি দিয়ে পুরো পর্বত শ্রেণিকেও বুঝানো হয়ে থাকে। 

ফেব্রুয়ারি ২০০৬

পূর্ববর্তী বছরের অভিজ্ঞতা থেকে জিঞ্জ বুঝতে পেরেছিলেন একটু ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় বান্দরবান গেলে সুবিধা পাওয়া যাবে। গত বছর যখন এসেছিলেন তখনও বর্ষা শেষ হয়নি। লাগাতার বৃষ্টি, কর্দমাক্ত পথ, জোঁক ও মশা ভালই যন্ত্রণা দিয়েছিল। এবার তাই বাংলাদেশে আসলেন ফেব্রুয়ারিতে।

আগেরবারের মতই রুমা বাজার থেকে বগালেক হয়ে তিনি কেওক্রাডং আরোহণ করেন। আরেকবার জিপিএসের সাহায্যে কেওক্রাডংয়ের উচ্চতা নিরীক্ষণ করে দেখেন। পাসিং পাড়া হয়ে তিনি কেওক্রাডং ও তাজিং ডংয়ের মাঝখানে ছোট্ট গ্রাম বাক্তলাই পাড়ায় চলে যান। সেখানে তার পূর্ব অভিযানের গাইড ও সঙ্গী মেংপংয়ের ঘরে গিয়ে উঠেন। পুবের মায়ানমার সীমান্তের দিকে রওনা হওয়ার আগে জিঞ্জ আরও একবার সিম তল্যাং পি পাড়া হয়ে তাজিং ডংয়ের উচ্চতা পরিমাপ করে পুরোপুরিভাবে নিশ্চিত হন। 

গাইড ও সঙ্গী মেংপং

তাজিং ডংয়ের চূড়া থেকে পুবদিকে জিঞ্জের সামনে পুরো মদক রেঞ্জ স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছিল। জিঞ্জ সহজে বুঝে গেলেন এখানেই তাদের যেতে হবে। পুরো রিজলাইন জুড়ে ঘন অন্ধকারময় বিশালাকায় গাছ ও বাঁশের জঙ্গলে ছেয়ে আছে। তাদের গন্তব্য প্রায় দশ কিলোমিটার দূরের বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমানা পাহাড়ে যার মাঝখানে বিস্তৃত একটি উপত্যকা রয়েছে, আর সেই উপত্যকা চিড়ে বেড়িয়ে গেছে খরস্রোতা রেমাক্রি। 

‘It could well be as far back as the Second World War maybe since any outside people have needed to enter the valley.’

সিম তল্যাং পি পাড়া থেকে নিচে নেমে গেলে থানদুই পাড়া। থানদুই পাড়া থেকে আরও কিছুক্ষণ উৎড়াইয়ের পর রেমাক্রি খালের শুরু। রেমাক্রি খাল পার করে ঐপারে কিছুক্ষণ ট্রেক করে পৌঁছানো যায় দুলাচরন পাড়া। দুলাচরন পাড়া থেকে চড়াই উঠে বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমানায় অবস্থিত সালোকিয়া পাড়ায় পৌঁছান জিঞ্জ। জিপিএস অনুসারে সালোকিয়া পাড়া থেকে কাঙ্ক্ষিত চূড়াটির দূরত্ব দেখাচ্ছিল মাত্র সাড়ে তিন কিলোমিটার।

দূর্গমতা, দূর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা, প্রশাসনিক বাধা ও অপহরণ আশংকার কারণে বিদেশি দূরের কথা সমতলের খুব কম বাঙালিই তখন এই জায়গাগুলোতে আসতেন। কেওক্রাডংয়ে কিছু পর্যটক দেখা গেলেও তাজিং ডংয়ের দিকে তাও দেখা যেত না। একজন ব্রিটিশ নাগরিক পাড়ায় এসেছে শুনতে পেয়ে কারবারির ঘরে পাড়ার সকলে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। 

এতদিন পর একজন বিদেশীকে তাদের পাড়ায় দেখে সালোকিয়া পাড়ার পৌড়দের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার স্মৃতি মনে পড়ে যায়। ১৯৪৪ সালে তাদের পাড়াতেই মিত্র বাহিনী ঘাটি গেড়েছিল। পাহাড়ের উপরে তারা নিশান উড়তে দেখতেন। পাড়া থেকে ঘণ্টা তিনেকের দূরত্বে মদক তং পাহাড়েই ছিল জাপানিদের ঘাটি। ব্রিটিশ বাহিনী সকল রসদ, গোলা বারুদ ও অস্ত্রশস্ত্র বহনের জন্য পাড়ার লোকেদের কুলি হিসেবে ব্যবহার করেছিল।

পাড়াবাসী তাকে জানালো মদক পাহাড় এখন ঘন জংগলে ছেয়ে গেছে। কেউই এখন সেখানে যায় না। ঘন জংগলে পরিষ্কার করে পথ খুঁজে বের করতে হবে। পাড়াবাসীর সহায়তায় চারজন কাটার পাওয়া গেল। তারা ছয়জনের দল খুব ভোরে পাড়া থেকে বেরিয়ে পড়ল। কাটাররা লম্বা দা দিয়ে জঙ্গল সাফ করতে করতে এগিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর পরই দৃষ্টিসীমায় একটি রিজলাইন পরিষ্কার হতে থাকে। মাঝে মাঝেই মায়ানমারের উপত্যকা ও পাহাড়গুলো স্পষ্ট চোখে পড়ছিল। বাংলাদেশের বনের চাইতে সেখানকার বনগুলো যেন আরো বুনো, আরও আদিম। দেখেই মনে হয় সেখানে যুগের পর যুগ ধরে কোন মানুষের পদচিহ্ন পড়েনি। 

পথ চলতে চলতে দলটি বুনো হাতিদের চলাচলের পথে গিয়ে পড়ে। হাতির পালের সামনে পড়ে গেলে ভয়ানক বিপদ হয়ে যাবে। কিছু সময় পর জঙ্গল পরিষ্কার করতেই বহু পুরনো একটি পথের চিহ্ন পাওয়া গেল। জিঞ্জের ধারণা প্রায় ৬০ বছর আগে বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন এই পথ ধরেই ব্রিটিশ সৈন্যরা মদক তং থেকে জাপানি সৈন্যদের হটিয়ে দিয়েছিল। এই পথ ধরে দ্রুত রিজলাইনের দিকে এগিয়ে যান জিঞ্জ।

‘We hacked our way up the ridgeline following an old well dug out trail in some places of the British soldiers over 60 years ago.’  

রিজলাইন ধরে কিছুক্ষণ এগিয়ে দলটি একটি উঁচু পয়েন্টে থামল। জিঞ্জের কাছে থাকা হ্যান্ডহেল্ড জিপিএস রিসিভারে দেখা গেল তারা ইতোমধ্যে ১,০০১ মিটার উঠে এসেছেন, অর্থাৎ এখন পর্যন্ত তারা ঠিক পথেই এগুচ্ছেন। রিজলাইন ধরে ঘন জঙ্গলের দক্ষিণে এগিয়ে গেলেই পাওয়া যাবে কাঙ্ক্ষিত সেই চূড়া। আরও কয়েকটা ঘণ্টা ধরে ঘন ছন ও বাঁশের জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করে কিলোমিটার খানেক এগিয়ে যাবার পর আরও দুটি উঁচু পয়েন্ট পেরিয়ে দলটি তৃতীয় চূড়ায় পৌঁছায়। কিন্তু তিন নম্বর চূড়ার জঙ্গল পরিষ্কার করতে করতে ২০০ মিটার দক্ষিণে আরেকটু উঁচু জায়গা চিহ্নিত হয়। সেখানে পৌঁছে দেখা গেল তৃতীয় পয়েন্ট থেকে এটি প্রায় ৬ মিটার উঁচু।

We had started clearing peak number three but after 20 minutes I caught sight of peak number four 200 metres away and 6 metres higher.

টানা কয়েক ঘণ্টা গরম, জঙ্গল, জোঁক ও মশার অত্যাচার মোকাবেলা করে অবশেষে তারা ১,০৬৪ মিটার উচ্চতার মদক তং চূড়ায় পৌঁছাতে সক্ষম হয়। 

মদক তং চূড়ায়

উত্তর থেকে দক্ষিণ মদকের টানা রিজলাইন দিয়েই বাংলাদেশ ও মায়ানমারের সীমানা চিহ্নিত করা হয়েছে। সীমান্তে তারা পুরনো কোন সেটেলমেন্ট বা মানুষ চলাচলের চিহ্ন খুঁজে পাননি। এমনকি চূড়াতেও কিছু খুঁজে পাননি। এই চূড়ার নামের বিষয়ে পাড়া থেকে আসা স্থানীয় ত্রিপুরা চারজনও কোন তথ্য দিতে পারল না। চূড়ায় দাঁড়িয়ে আশপাশ দেখে জিঞ্জের কাছে চূড়াটিকে তেমন প্রমিনেন্টও মনে হয় নি। 

কিন্তু এদিক থেকে ভাবলে দেখা যায় তাজিং ডং বা কেওক্রাডংয়ের প্রমিনেন্সও দৃষ্টি আকর্ষণ করার মত নয়। তাই সদ্য আরোহণ করা এই চূড়াটি শুধুমাত্র প্রমিনেন্সের জন্য বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চূড়া হতে পারবে না; এমনটা জিঞ্জ মানতে রাজি ছিলেন না। 

‘It is not that dramatic or very prominent, mind you neither is Tazing Dong or Keokradong. So there is no excuse there to want to name them the grand title of Bangladesh’s highest mountain.’

জিঞ্জ যখন এসব ভাবছিলেন সেইসময়ে কাটার চারজন ঘণ্টা খানেক ধরে চূড়ার উপরে জন্মানো ছন ও বাঁশের ঝাড় কেটে একটি টেনিস কোর্ট সমান জায়গা পরিষ্কার করে ফেলল।

চূড়ার পুব দিকের ঢাল একেবারে খাড়া হয়ে মায়ানমারের দিকে নেমে গেছে। চূড়া থেকে পরিষ্কারভাবে বর্ডারলাইন দেখতে পারছিলেন তারা, যে লাইনে ১,০৬৪ মিটারের এই পয়েন্টটাই মূল চূড়া। সবকিছু পর্যবেক্ষণ করার পর জিঞ্জ পুরোপুরি নিশ্চিত হয়ে গেল তারা বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চূড়াতেই এসেছে। চূড়া থেকে ১৮৮ ডিগ্রি বিয়ারিংয়ে ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটার দূরত্বে আরেকটি চূড়া দেখা যাচ্ছিল। জিঞ্জের ধারণা এটি হয়ত মদক মুয়াল ছিল। 

দূর থেকে মদক মুয়াল দেখে জিঞ্জের মনে তার উচ্চতা নিয়ে আবার একটি খটকা লাগে। তার মনে হচ্ছিল মদক মুয়ালের উচ্চতাও এর খুব কাছাকাছিই হবে। কিন্তু চোখের আন্দাজের চাইতে সোভিয়েত মানচিত্র ও তার বন্ধু গ্রান্টের পর্যালোচনার উপর জিঞ্জ ভরসা করল আর তার বাংলাদেশ অধ্যায় এক নতুন চূড়া সন্ধান করার মধ্য দিয়ে শেষ করল। 

দিন দুয়েক পর দলের সবাইকে বিদায় দিয়ে যখন জিঞ্জ দেশে ফিরছিলেন তখন তার ভাবনায় ছিল সেই সবুজ ঘন জঙ্গলের আচ্ছাদনে হয়ত আরও কোন উঁচু পাহাড় লুকিয়ে আছে। যার খোঁজে তাকে হয়ত আবার বাংলাদেশে ফিরতে হবে।

‘They hoped I would come back and maybe I will one day. Maybe there is another higher mountain somewhere out there in the bamboo forests of Bangladesh.’

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে একটা দেশের সর্বোচ্চ চূড়া খুঁজে বের করে সেটা আরোহণ করার পর জিঞ্জ ফুলেন এরপর কি করলেন? তিনি কি সেই তথ্য নিয়ে অন্যান্যদের মত কোন সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন? বা সংশ্লিষ্ট কাউকে বিষয়টি জানানোর চেষ্টা করেছিলেন? 

প্রজেক্টে সহায়তাকারী বন্ধু গ্রান্ট হাচিসনের কাছে জিঞ্জ ফুলেনের পাঠানো একটি ইমেইল থেকে জানা যায়, বান্দরবান থেকে ঢাকায় ফিরে জিঞ্জ সরাসরি চলে যান সার্ভে অফ বাংলাদেশের অফিসে। নতুন পাওয়া তথ্য উপাত্ত সার্ভেয়র জেনারেলের কাছে তুলে ধরেন। জিঞ্জের সামনে ১:৫০০০০ মাপের একটি মানচিত্র আনা হয়। জিপিএস এর মাধ্যমে পাওয়া চূড়ার স্থানাংক মানচিত্রে বসানোর পর পাওয়া গেল বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্তের একটি চূড়া, মানচিত্রে যার উচ্চতা দেখাচ্ছিল ৩,৪৫৪ ফিট ও পর্বত শ্রেণিটির নাম লিখা ছিল মদক তং। 

অন্য আরেকটি মানচিত্রে চূড়াটির উচ্চতা পাওয়া গেল ৩,৪৮১ ফিট। কিন্তু সেখানে চূড়াটির কোন নাম লিখা ছিল না। মানচিত্রগুলো হয়ত পুরোপুরি সঠিক ছিল না। কিন্তু প্রাথমিক কাজ চালিয়ে নেবার জন্য সেটাই যথেষ্ট ছিল। মানচিত্র থেকে পাওয়া সেই অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি ও কনট্যুর দেখে চূড়াটিকে নিশ্চিতভাবেই চিহ্নিত করা যাচ্ছিল। জিপিএস এর মাধ্যমে পাওয়া স্থানাংক ও উচ্চতা মানচিত্রের সাথে মিলে গেলে জিঞ্জ আরও বেশি নিশ্চিত হন। সেই সাথে নতুন চূড়াটির দক্ষিণে জিঞ্জ যেই চূড়াটি দেখেছিলেন মানচিত্রে তা মদক মুয়াল নামে চিহ্নিত করা ছিল, যার উচ্চতা লিখা ছিল ৩,২৯২ ফিট। ফলে দক্ষিণে এর চাইতে উঁচু কোন চূড়া থাকার সম্ভাবনাটুকু নাকচ হয়ে যায়। 

অনফিল্ড জিপিএস ডাটা, স্যাটেলাইট ইমেজ, পুরনো টপোগ্রাফিক মানচিত্র সবকিছু পর্যবেক্ষণ করার পর আর কোন সন্দেহ রইল না, জিঞ্জ ফুলেন যে অনামী চূড়ায় সদ্য আরোহণ করে এসেছে সেটাই বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পাহাড় চূড়া। 

সার্ভেয়র জেনারেল জিঞ্জকে তখনই জানিয়েছিলেন তারা একটি অফিসিয়াল টিমকে সার্ভে করার জন্য সেই অঞ্চলে পাঠাবেন, যা আজ একযুগ পরও বাস্তবায়ন হয়নি। একই সাথে সার্ভেয়র জেনারেলের সাথে হওয়া আলোচনায় বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চূড়ার নাম নিয়েও কোন সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। পরবর্তীকালে নানা অভিযানে হওয়া চূড়াটির নামের বিবর্তন নিয়ে বিস্তারিত জানতে পারবেন ‘কালচক্রে সবুজ পাহাড়’ ধারাবাহিকের আগামী কোন পর্বে।


14 Comments

    • সবুজ পাহাড়
      আমাদের সবুজ পাহাড়ের যেকোনো গল্পই
      খুব মন দিয়ে পড়ি।

      এটাও খুব ভালো লাগলো

  1. ধন্যবাদ অদ্রি টিমকে। খুব চমৎকার এবং অত্যন্ত দরকারি একটা বিষয় উপস্থাপন করার জন্য। আপনারা এমন এক ইতিহাস, এমন এক কাহিনী তুলে ধরেছেন যেগুলো অন্য কেউ তুলে আনে না, যেগুলো নিয়ে অন্য কেউ কাজ করে না। আপনাদের প্রতি শুভকামনা রইলো এবং বাংলাদেশি পাহাড়-পর্বত নিয়ে আরো আরো লেখালেখি উপহার দেওয়ার অনুরোধ রইলো।

  2. চমৎকার বিশ্লেষনী লেখা। আজ এক যুগ পরেও সার্ভেয়ার টীম সেই অঞ্চলে যেতে পারেনি, আর এই কারনেই অফিসিয়ালী এখনো বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চূড়ার নামটা স্বীকৃত হয়নি। জিঞ্জের স্বপ্ন কি আমরা বাস্তবায়ন করতে পারিনা? সার্ভে অফিসের সাথে ফলো আপ করে সার্ভেয়ার একটা দলকে কি আমরা নিয়ে যেতে পারিনা?

  3. ধন্যবাদ আদ্রিকে বেশ গুছিয়ে চমৎকার করে লেখার জন্য।
    এখানে “হতভাগা স্কটিশ সৈনিকের মেয়ে পরবর্তী সময়ে বান্দরবানের মদক অঞ্চলে এসেছিলেন, তার বাবা কোথায় মারা গিয়েছিলেন তা খুঁজে বের করতে” – এই মেয়েটির সাথে আমার দেখা হয়েছিলো। আমরা ২০০০ সালে বড় মদক, রিজার্ভ ফরেস্ট হয়ে বার্মা বর্ডার পর্যন্ত যাওয়ার আগে ১৯৯৯ – ২০০০ সালে চারবার থাঞ্চি হয়ে উপরের দিকে যাওয়ার চেস্টারত ছিলাম – খান ভাই, সানি ভাই, কিবরিয়া দিপু, রিফাত, মারুফ, রিমন, আফরিন, অপার, নিলিমা, স্বাধীন – প্রমুখ ছিলো সেই সব অভিযানে। সেই সময়েই একবার সাদা চামড়া’র দুইজন মেয়ে ও দুইজন ছেলের সাথে দেখা হয় – তাদের একজনই এই মেয়ে – ওরা আমাকে ঘটনাটা বলেছিলো। ওরা বড় মদকের কাছে ‘এয়ার স্ট্রিপ’, জিপ গাড়ি – ইত্যাদি দেখেছে – ছবিও তুলেছে – তবে ওদের নৌকাডুবি হয়ে সব ক্যামেরা হারিয়ে গিয়েছে বলে পরে ওদের মাঝিদের কাছে শুনেছিলাম – এই মাঝিদ্বয়ই আমাদের বড় মদক যাত্রার মাঝি ছিলো।

  4. অসাধারণ একটা লেখা। অনেক কাঙ্ক্ষিত এবং অবশেষে তৃপ্তিদায়ক।
    সালেহিনদাকে অসংখ্য ধন্যবাদ, সব গুছিয়ে লেখার জন্য।
    ঘটনা, না-জানা ইতিহাস আর আর্কাইভের ছবিতে রীতিমতো শিহরীত!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *