গত কয়েকদিন আগের ঘটনা, বিশ্বের সবচেয়ে রোমহর্ষক আর দম বন্ধ করা ঘটনার সাক্ষী হলাম আমরা বিশ্ববাসী। থাইল্যান্ডের মে সাই (Mae Sai) শহরে থাম লুয়াং নাং নন কেভ এ ঘুরতে গিয়ে আটকা পড়ে ১২ জনের একটা ফুটবল টীম (যাদের প্রত্যেকের বয়স ১২ থেকে ১৭ এর মধ্যে) এবং তাদের কোচ (বয়স ২৫ বছর)। প্রবল বৃষ্টিপাতে দীর্ঘ ২ সপ্তাহের বেশি সময় আটকে থাকার পর আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী বিভিন্ন দলের সহায়তায় তাদেরকে তিন দিন ধরে একে একে উদ্ধার করা হয়। এসময় উদ্ধারকারী দলের একজনের অক্সিজেনের অভাবে মৃত্যু ঘটে। ১০ই জুলাই সবাইকে সফলভাবে উদ্ধারের পর বিশ্ববাসী স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে।

এই ঘটনা পড়তে পড়তে আমার স্মৃতি কোঠায় জমে থাকা ১ বছর আগের ঘটনা মনে পড়ে যায়। চোখ বন্ধ করে আমি ঘুটঘুটে অন্ধকারে প্রবল হাওয়া, আর বিশাল বিশাল ঝর্ণার স্রোতের শব্দ শুনতে পাই। একটু আলো জ্বেলে দেখা যায় গুহার মাথা কয়েক কিলোমিটার খাড়া হয়ে আছে আর সামনে বয়ে যাচ্ছে প্রবল জল্ধারা। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে যার শুরু শেষ আন্দাজ করা সম্ভব নয়।

ঘটনার বিস্তারিত না লিখলে আসলে বোঝানো সম্ভব না।

কেভ হাইকিং শব্দটাই আমার কাছে এক অজানার উদ্দেশ্যে হাঁটার মতো মনে হয়। প্রতিটি পদক্ষেপে যার চমক লাগানো রহস্য যেন চাপা পড়ে আছে বছরকে বছর। গত বছর ভিয়েতনামের ফং না (Phong Nha) প্রভিন্সে একটি কেইভ এক্সপিডিশনে যোগ দেবার সুযোগ হয়েছিল। এসব কেইভে ট্যুর অপারেটর ছাড়া যাওয়া একদমই নিষিদ্ধ। তাই আমি আর রাব্বি অক্সালিস অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরসে নাম লিখিয়ে ফেলি। হ্যানয় থেকে রওনা হয়ে আমরা যেদিন ফং না পৌঁছাই তার পরদিনই আমাদের অভিযান শুরু হয়।

সান নদীর পাড় ঘেঁষে অসাধারণ সুন্দর অক্সালিস রিসোর্ট আর ক্যাফে। নদীর অন্য পাড়ে ছোট ছোট পাহাড়। সারাদিন ধরে মেঘ বৃষ্টির খেলা চলছে। অক্সালিস ক্যাফেতে আমাদের অভিযানের প্রি মিটিং হলো সকাল সাড়ে সাতটায়। লে বাও নামের ২৫/২৬ বছরের একটা ছেলে আমাদের গাইড। অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, আমেরিকা, জার্মান থেকে আসা আরো সাতজন অভিযাত্রী আমাদের সাথে যাচ্ছে।

সেফটি আর আইটেনারী ব্রিফিংয়ের পর আমরা ফং না কে বাং ন্যাশনাল পার্কের উদ্দেশে জীপে চড়ে রওনা হলাম। বিশাল বিশাল পাহাড় আর জঙ্গলের মাঝখান দিয়ে রাস্তা চলে গেছে। মাঝে মাঝে সান নদীর অংশটা দেখা যাচ্ছে। ফং না ন্যাশনাল পার্ক থেকে হো চি মিন ওয়েস্ট রোডের Km28 এর দিকে রওনা হলাম। Km28-এ পৌঁছে সবাই ব্যাগ কাঁধে নিয়ে নিচে নামতে লাগলাম। প্রত্যেককে একটা করে হেলমেট আর এক সেট গ্লাভস দেয়া হলো। রাস্তা থেকে আমরা জঙ্গলে ঢুকে গেলাম। টানা ৪০মিনিট ঘন গাছপালার মধ্য দিয়ে আমরা খাড়া ঢাল নামার সময় মনে হচ্ছিলো নামছিতো নামছিই এই পথ আর শেষই হচ্ছে না। ৪০ মিনিট পর আমরা প্রথম গুহার মুখে পৌঁছলাম। গুহার নাম নু ওক নাট (Nu Oc Nut)। সেখানে বসে আমরা পাউরুটি, পোর্ক, ডিম,সফট ড্রিংক্স দিয়ে আমাদের ব্রাঞ্চ সেরে নিলাম। প্রত্যেককে একটা করে হেড ল্যাম্প দেওয়া হলো, গুহার মাথা থেকে আরও চারজন সেফটি ক্রু জয়েন করল।



এরপর বড় বড় পাথর পার হয়ে আরও নিচের দিকে গাঢ় অন্ধকারে নেমে গেলাম। সেখানে নিচু দরজার মতো চিকন একটা প্রবেশদ্বার। ভেতরে ঢুকতেই দুইপাশে পাথর আর মাঝে চিকন রাস্তা চলে গেছে। স্যাঁতসেঁতে ভেজা সেই রাস্তা দিয়ে খুব সাবধানে সবাই লাইন ধরে এগিয়ে যাচ্ছি। সামনে একজন সেফটি ক্রু ফ্লাশলাইটের আলোতে পথ দেখাচ্ছে। মাঝে লে বাও আমাদের বলে চলেছে এই গুহার কয়েকশ বছরের ইতিহাস।

২০ মিনিট হাঁটার পর আমরা একটা লম্বা স্রোতশীল নালার কাছে পৌঁছলাম। প্রায় ৫ মিনিট সাঁতরে একে একে সবাই সেই নালা পার হয়ে অন্য পাড়ে চলে এলাম। এপাশটায় এসে চওড়া একটা খোলা ময়দানের মতো জায়গায় উঠলাম। বাও আর তার ক্রুরা লাইট দিয়ে পুরোটা জায়গা দেখাতে চেষ্টা করলো। একফোঁটা সূর্যের আলো এখানে কখনো পৌঁছেনি। ফ্লাশ লাইটের আলো পড়তেই চোখে পড়লো অনেক অনেক বাদুড় ঝুলে আছে, আর আছে অদ্ভুত কায়দায় ঝুলে থাকা রঙ বেরঙের মাকড়শা, আলো ফেললেই এরা চকচক করে।

এর মধ্য দিয়েই হাঁটতে হাঁটতে আমরা অদ্ভুত সুন্দর এক ঝর্ণার সামনে থামলাম। ঝর্ণাটা উঁচু থেকে নেমে নিচের দিকে ঢাল বেয়ে চিকন খালের মতো গুহার অন্ধকারে মিলিয়ে গেছে। সেখান থেকে ঘুটঘুটে অন্ধকারে হেড ল্যাম্প জ্বেলে সবাই খালে নেমে পড়লাম। হিম পানিতে তখন আমার দাঁতে দাঁত লেগে আসছে। হেড ল্যাম্পের আলোতে সামনে খুব সামান্যই দেখা যাচ্ছে। বাওয়ের গলা অনুসরণ করে আমরা সামনে সাঁতরে চললাম। বাও বলে চললো প্রত্যেকটা জায়গার বৈশিষ্ট্য আর পেছন থেকে সেফটি ক্রুরা আমাদের লক্ষ্য রেখে এগোতে লাগলো। পানি পার হয়ে একটি উঁচু খাড়া পাহাড়ি ঢালের মুখে পৌঁছালাম। প্রায় চল্লিশ মিনিট ধরে টানা ধারালো পাথর আর পিচ্ছিল রাস্তা বেয়ে গুহার মুখে পৌঁছে প্রথম সূর্যের আলো চোখে পড়লো। ক্যাম্প সাইটে পৌঁছাতে আরও বিশ মিনিট লেগে গেলো। সূর্য তখন প্রায় ডুবে গেছে।

সেখানে গিয়ে দেখি অসাধারণ ব্যবস্থা। আমাকে আর রাব্বিকে একটা তাঁবু দেওয়া হলো। আমরা ফ্রেশ হয়ে, কাপড় পাল্টে খেতে গেলাম। জঙ্গলে বাঁশ দিয়ে বানানো ডাইনিংয়ের ব্যাবস্থা, খাবারের আইটেমগুলোও অসাধারণ। সবাই তখন এতো ক্ষুধার্থ, চুপচাপ খেয়ে নিলাম। রাতে হল বিশাল ফিস্ট- চিকেন, পোর্ক, বীফ, বিনস, ভেজ কি নেই মেনুতে! ঘন জঙ্গলের অন্ধকারে হালকা আলোয় রেড ওয়াইন আর মাংস দিয়ে আমরা প্রথম কেভ এক্সপ্লোরেশনের অভিজ্ঞতা চিয়ার্স করলাম। ১০.৩০ এর দিকে সবাই শুয়ে পড়লাম। কারণ পরদিন আছে এই এলাকার দ্বিতীয় বিশাল কেভ হাং ভা জন্য যাত্রা।

সকাল ৭ টার মধ্যে নাস্তা সেরে সবাই হাং ভার দিকে এগোলাম। বিশাল বড় পাহাড়ের নিচে ছোট্ট একটা প্রবেশপথ। এর মুখে পৌছানোর পর সবাইকে একটা করে হারনেস, হেলমেট আর হেডল্যাম্প দেওয়া হল। সামনে থেকে দুজন আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে গেলো। অনেকটা উপরে উঠে একক পথ ধরে তারপর খাড়া অনেকখানি পথ নেমে আমরা বিশাল এক জলাশয়ের ধারে পৌঁছালাম। ঘুটঘুটে অন্ধকার আর চারপাশ থেকে শুধু পানি প্রবাহের শব্দ। পাথরের একপাশ ফেটে নদীর পানি গুহার ভেতরে ঢুকছে। হিম ঠান্ডা পানি পুরো গুহাকে হিমশীতল করে রেখেছে।

জলাশয়ের এক পাশটায় দেখলাম ক্রুরা দক্ষতার সাথে উঠে গেলো। এরপর রোপ ফিক্স করে একজন একজন করে কোমরে হারনেসের সাথে বেঁধে দিলো। অন্ধকারে প্রায় হাতড়ে হাতড়ে আমরা একজন একজন করে সেই খাড়া পাথরের খাঁজে পা রেখে পার হতে লাগলাম। মাঝপথে নিচের দিকে তাকিয়ে দেখি, প্রায় আধ কিলোমিটার নিচে ঘুটঘুটে অন্ধকারে পানি বয়ে যাচ্ছে। ভয়ে আমার দম বন্ধ হওয়ার মতো অবস্থা। জানি পা ফস্কে গেলে এই হারনেস আমাকে ঝুলিয়ে রাখবে। তবু অন্ধকার ঠেলে ভয় বারবার আমাকে আটকে ফেলতে লাগলো। গ্রুপের আমি একদিকে, রাব্বিও সামনে আছে জানি, তবুও বারবার ওকে খুঁজতে লাগলাম। ও ঠিক আছে তো? অনেকক্ষণ ডাকার পর সামনে থেকে জানান দিলো ঠিক আছে ও।



বাঁধ পার হয়ে নেমে আবার এক সারিতে সামনে এগুতে লাগলাম। সামনে গিয়ে দেখি যারা পৌঁছে গেছে তারা ছবি তুলছে শুধু। ছোট ছোট অনেক পাথরের মাথা ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে হিরের মত চিকচিক করছে। বছরের পর বছর সেখানে পানি থেকে নেওয়া মিনারেল, ফসফরাস, ক্যালসাইট, ফ্লোরাইট, কোলেমেনাইট ইত্যাদি আরও অনেক উপাদান জমে জমে পাথরগুলো এমন চকচকে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। সেখানে হেডল্যাম্পের আলো ফেলতে আরও চকচক করে উঠলো। পাথরের মাথাগুলো কোণের এর মতো। ওরা এসব পাথরকে বলে টাওয়ার কোণ, টুফা কোণ। কিন্তু চোখে দেখা অদ্ভুত সুন্দর এই পাথরের ছবি তুললে আর বোঝার উপায় নেই। কি অসাধারণ সুন্দর সেটি।

পথগুলো দিয়ে যাওয়ার জন্য কাঠ দিয়ে ছোট ছোট পুলের মতো বানানো আছে। একটার পর একটা প্রায় কয়েকশো ফিট বড় আর উঁচু উঁচু ঘরের মতো গুহাগুলো। এগুলো ঘুরে আমরা আরেকটা বিশাল দিঘীর পাশে পৌঁছালাম। ঘুটঘুটে অন্ধকারে হেডল্যাম্পের সামান্য আলোয় শুধু পানি প্রবাহের শব্দ শুনে তার বিশালত্ব টের পাওয়া যায়। দীঘির পাশ দিয়ে উঁচু পথ ধরে উঠে গুহা মুখ থেকে পৌঁছালাম ক্যাম্প সাইটে। পুরো জার্নিটা প্রায় ৬ ঘন্টা মতো সময় নিলো। সেখানে দুপুরের খাওয়া শেষ করে আরও এক ঘন্টা হেঁটে আমরা পৌঁছলাম চারপাশে জংগলে ঘেরা রাস্তার উপর। সেখানে দেখলাম অক্সালিসের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। সবাই মিলে বিয়ারের ঠান্ডা ক্যান খুলে সাকসেস চিয়ার্স করলাম সবাই।

অক্সালিস ক্যাফেতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা নেমে এলো। সাথে সাথে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলো। ক্যাফের পাশে নদীর ধারেই আমাদের ঘর। আমরা ঘর ছেড়ে হালকা আলোর ক্যাফেতে এসে বসলাম।

আমি তখনও একটা ঘোরের মধ্যে আছি। নতুন অভিযানের অভিজ্ঞতা তখনও হজম করছি।

গুহার যেসব জায়গায় রাস্তা নেই শুধু পাথরের খাঁজের ভেতরে পা ফেলে চলতে হয় কিংবা পিচ্ছিল একক রাস্তা অথবা যেখানে প্রচন্ড স্রোতের খাল, একটু অসাবধানতা কিংবা ভুল পদক্ষেপে যে কোন সময় প্রাণটা যেতে পারতো।

অন্যান্য অ্যাডভেঞ্চারের সাথে আমার অভিজ্ঞতার ঝুলিতে আরেকটা নাম জুড়লো কেভ হাইকিং, কেভ এক্সপ্লোরেশন।


[ছবি] ফজলে রাব্বি, লে বাও 

(Visited 1 times, 1 visits today)

Leave A Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *