সম্পাদকের কথা: ইন্তিয়াজ মাহমুদের এই লেখাটি আমাদের হাতে আসে ২০১৬ সালে। দীর্ঘ ৫ বছর পর লেখাটি প্রকাশ পেতে যাচ্ছে ।

নামটা শুনেই আমার কৌতুহল হচ্ছিল। বারবুনিয়া! একটু যেন কেমন। আগে কখনো এই নাম শুনিইনি। আর সেখানেই নাকি তার জন্ম। আমার হাইস্কুলের বন্ধু কামরুলের কথা বলছি। কোন একসময় বারবুনিয়াতে ছিল এপিবিএন ব্যাটালিয়ন (আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন; বাংলাদেশ পুলিশের বিশেষায়িত একটি দল), তখন ওর বাবার পোষ্টিংও ছিল সেখানে। আর সেখানেই ওর জন্ম হয়। কিন্তু তার পরেই সেখান থেকে চলে আসে তারা। আর সেই সাথে বারবুনিয়া হয়ে যায় একটা রূপকথা, বারবুনিয়ার সূর্যাস্ত চিরকালই থেকে যায় অচেনা অদেখা। এদিকে আমিতো নাম শুনেই কুপোকাত। ও নিপাত যাক, আমার নিজেরই তো এখন বারবুনিয়া যাওয়া ফরজ হয়ে গেছে।

আমাদের পরবর্তী পাহাড় যাত্রা সেভাবেই পরিকল্পনা করা হল। প্রথমে আরেকটা বন্ধুর শৈশবস্মৃতি স্নাত বোয়ালখালী (কালুরঘাট) ঘুরে দেখবো তারপর কেরানীহাট হয়ে সোজা বান্দরবান, সেখান থেকে নাফা-আমিয়ার জলে গা ভিজিয়ে আসবো রাঙ্গামাটি, আর রাঙ্গামাটি থেকে হাতরে হাতরে বারবুনিয়া, এরপর মহালছড়ি-খাগড়াছড়ি হয়ে আবার ঢাকা। অতঃপর পরিকল্পনা অনুযায়ী আমরা এসে হাজির হলাম রাঙ্গামাটিতে।

এবার বারবুনিয়ার রাস্তা খোঁজার পালা। নানা রকম বিপদের আশংকায় কামরুলের বাসা থেকে কিছুতেই ওকে ওদিকে যেতে অনুমতি দিচ্ছে না। তাই, ওর বাবা ওকে যাবার উপায়ও কিছু বলছেন না। তাছাড়া উনিও সেখানে গেছেন প্রায় ২০-২২ বছর আগে। আমরাও বেশ কয়েক জন স্থানীয় মানুষকে জিজ্ঞেস করে তেমন কোন কিছু পেলাম না। শেষে লংগদুতে আমার এক বড় ভাইকে ফোন করে বেশ কিছু তথ্য জানলাম। ওখানে যাবার পথ একটাই, জলপথ, হয় যাত্রীবাহী স্টিমারবোট কিংবা স্পীডবোট। স্পীডবোট ভাড়া করার মত আলগা টাকা আমাদের নাই, তাই হাতে থাকে স্টিমারবোট। এবার রাতেই আসলাম লঞ্চঘাটে। এখানে এসে মোটামুটি বিস্তারিত সবকিছু জানলাম।

সমস্যা হল, দিনে কেবল একটাই বোট বারবুনিয়াতে যায়, তাও সেটা সকাল দশটা এগারোটারও পরে আর পৌঁছাতে লাগে প্রায় চার ঘণ্টারও বেশি। তার মানে সেদিন আর আসা সম্ভব হচ্ছে না। আবার অন্যদিকে বারবুনিয়া বেশ দূরবর্তী একটা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন জনপদ হওয়ায়, এখানে নাকি নেই কোন থাকার জায়গা কিংবা ভালো খাবারের দোকান। তার চেয়ে বড় কথা সেখানে একটা রাতের থাকা খাওয়ায় খরচ করার মতো বাড়তি টাকাও আমাদের হাতে নেই। একটা রাত বাড়ানো মানে আমাদের পরিকল্পনা থেকে একটা স্থান ছেঁটে ফেলা। আর সবার কাছ থেকেই শুনলাম থাকার জন্যে তেমন একটা নিরাপদ জায়গাও না। অনেকেই বোট ভাড়া করে মাইনি (কাছাকাছি কিন্তু অপেক্ষাকৃত উন্নত আরেকটি জনপদ) গিয়ে থাকার পরামর্শ দিলেন।

তখনকার মত ঘাট থেকে ফিরে এলাম। ঘাট থেকে ফিরে এলে ওখানকার জেলা প্রশাসকের অফিসে চাকরিরত আমাদের পরিচিত এক ভাইয়ার সাথে কথা বলতে বলতে তিনি উপদেশ দিলেন, যেহেতু ওদিকে এখনো এপিবিএনের ছোট ছোট পোস্ট আর ক্যাম্প আছে, তাই আমার বন্ধুর বাবার পরিচয়ে ওদের সাথে যোগাযোগ করে ওদের মাধ্যমে যাওয়াটাই সুবিধাজনক ও নিরাপদ হবে। এপিবিএনের রিজিওনাল কার্যালয়টা আমাদের হোটেলের পাশেই ছিল। উনার কথা মত আমরা হানা দিলাম সেখানে। সেখানে গিয়ে যে সহযোগিতা আর সম্মান পেলাম, তা আমরা আশাও করিনি। এপিবিএনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বেশ সময় নিয়ে বন্ধুত্বপূর্ণভাবে আমাদের সাথে কথা বললেন। উনি আমাদের সব কথা শুনে, আমার বন্ধুর বাবার সাথে ফোনে কথা বললেন, তাঁকে আশ্বস্ত করলেন (উল্লেখ্য, কামরুলের আব্বু, আংকেল কোন এক জেলার পুলিশের আরআই)। তারপর বারবুনিয়া ক্যাম্পে কথা বলে আমাদের যাওয়ার সব বন্দোবস্ত করে দিলেন। নাস্তা করে ওনার কাছ থেকে বিদায় নিলাম। যাক, এবার মনে মনে আমি অবশ্য অন্য এক কারণে খুশি। যদি নিজেরা নিজেরা গিয়ে সত্যি সত্যিই কিছু একটা হয়ে যেত, তবে ওর বাবা সবার আগে আমাকেই ধরত। আর যাই হোক না হোক, সেদিক থেকে অন্তত হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। অবশেষে, অনেক লম্বা কাঠখড় পোড়ানো অংশের পাঠ চুকিয়ে এখন আমরা বারবুনিয়ার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত।

সকাল আটটায় আমরা রাঙ্গামাটি থেকে লংগদুগামী একটা বিরুতিহীন বোটে চড়ে বসলাম। বোট এগিয়ে চলল একটা বিশাল জলপ্লাবিত পাহাড়ি অঞ্চল দিয়ে। কাপ্তাই লেক! লেকের পানিতে প্লাবিত বিস্তীর্ণ পাহাড়ভূমি। একটু পর পরই এখানে ওখানে পাহাড় কিংবা ছোট ছোট টিলাগুলো লেকের পানি ছাড়িয়ে মাথা উঁচিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। টিলাগুলোর ফাঁক গলে দৃষ্টি চলে যায় বহুদূর, জলাচ্ছাদিত দিগন্তরেখায়, যেখানে জল আর আকাশ মিলেছে এক বিন্দুতে। আবার মাঝে মাঝেই হুটহাট কাছে চলে আসে স্থলভূমি। কি জানি, ওগুলোও হয়তোবা বড় কোন দ্বীপ মত কিছু একটা হবে হয়তো, কিন্তু অপর প্রান্ত দেখা যায় না। লেকের জল জুড়ে তখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল রাশিরাশি কুয়াশা, ধোঁয়ার মত উঠছিল জল ছেড়ে ওপরের দিকে। এ যেন এক অন্যরকম রাঙ্গামাটি। নাকি রাঙ্গাজল? যাই হোক। সচরাচর আমরা রাঙ্গামাটিকে যেমনটা ভাবি, মনের পর্দায় যেভাবে আঁকি রাঙ্গামাটি শব্দের বিম্ব, এটা তার থেকে সম্পূর্ণ, সম্পূর্ণ আলাদা।

প্রথমেই আসে শুভলং। এখানেই মূলত সব টুরিস্ট নেমে যান, জলপ্রপাত দেখতে। আর শুভলং পার হলেই লেকের আসল সৌন্দর্য নজরে আসে। আশেপাশেই মৎস্যজীবী মানুষের আনাগোনা, কেউ মাছ আহরণে ব্যস্ত, কেউবা সেগুলো ট্রলারে তুলতে। এখান থেকেই মূলত রাঙ্গামাটি শহরের মাছের যোগান আসে। একসময়, আমরা বোটের ডেকে দাঁড়িয়ে ঠাণ্ডা বাতাসে গরম ধোয়া ওঠা চা দিয়ে নাস্তা সারলাম। ধীরে ধীরে সূর্যের চাঁদবদন… উহু, সূর্যবদন নজরে আসতে লাগল। বোটের ছাদে উঠে, সূয্যি মামার রূপ-লাবণ্য গায়ে মাখতে লাগলাম। ফেয়ার অ্যান্ড লাভলীর কাজ যদিও হয়নি, কিন্তু শীত বেটার খোঁচানির হাত থেকে রেহাই।

দেখতে দেখতে চলে এলাম কাট্টলী নামের একটা দ্বীপের কাছাকাছি। এখানে, কাট্টলীতে এই বোটটা থামে না। এখান থেকেই বারবুনিয়া যাবার রাস্তা আলাদা হয়। তাই এখানেই একটা নৌকা নিয়ে থাকার কথা এখানকার একজন এপিবিএন সদস্যের। পরে এখান থেকে আমাদের বারবুনিয়া যাবার ব্যবস্থা করে দিবেন। কালকে এপিবিএনের সেই কর্মকর্তা এভাবেই ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন আর ফোন নম্বর দিয়েছিলেন। আমরা সে নম্বরে কল দিলে ওনারা বোটের কাছে একটা নৌকা পাঠিয়ে দেন। তার পর বোটের গতি কমিয়ে দিলে আমরা নৌকায় উঠে কাট্টলী আসি। এবার এখানে আরো দুইটা ভাইয়ের সাথে পরিচয় হয়। কামরুলকে মোলাকাত, মুসাবিদা ও বাতচিত পর্বে লাগিয়ে দিয়ে, আমি আর মোস্তাফিজ ঝট করে কাট্টলী বাজারে একটা চক্কর দিয়ে আসলাম।

কাট্টলী একটা অন্যরকম জায়গা। লংগদুর ভাসান্যাদম ইউনিয়নে এর অবস্থান। ছোট্ট একটা দ্বীপ, তার পুরোটাই একটা বাজার, ছোট মানে আসলেই ছোট্ট। বাজারের ধাঁচটাও একেবারে ভিন্ন ধরনের। একটু যেন কেমন নব্বই নব্বই ধাঁচের। সবকিছুতেই পুরোনো পুরোনো একটা জং ধরা ধরা ভাব। আবার বেশ ঐতিয্যবাহীও মনে হয়। আসলে জং পড়লেই তো কোনকিছু ঐতিয্যবাহী মনে হয়। মাছ আর শুঁটকি নিয়েই এখানকার সব কাজ-কারবার। প্রতি সোমবার এখানে হাঁট বসে, সেদিন ছিল হাঁটের দিন। আমরা এক জায়গায় কয়েকজন মানুষ দেখে গিয়ে দেখি কচ্ছপের মাংস বিক্রি হচ্ছে। আমরাও গেলাম, আর মাংসের শেষ ভাগটাও বিক্রি হল।

ততক্ষণে কামরুলের বাতচিত পর্ব শেষ, আমাদের জন্য নৌকাও প্রস্তুত। কাট্টলী পোস্টের সেই ভাইদের বিদায় জানিয়ে ক্যাপ্টেন হ্যাডক সেজে উঠে বসলাম গুলুইয়ের উপরে। দুর্দান্ত একটা যাত্রা। থৈথৈ জলে ভটভট শ্যালো ইঞ্জিনের নৌকা চকচকে জল চিরে এগিয়ে যাচ্ছে। ওটা আসলে যতটা না নৌকা, ততটাই ট্রলারের মত। চার দিকে যাই দেখছি সবই যেন কোন পাকা হাতে তোলা ছবি। আর প্রকৃতির আঁকা সে ছবিগুলো চুরিতে ব্যস্ত তখন আমাদের সেলফোনগুলো। মাঝির সাথে কথা বলতে বলতে আমরা আমাদের আসার ব্যবস্থা করে ফেলি। আগে আমরা ঠিক করেছিলাম, হয় দুপুর দুইটার মধ্যে দ্রুত বারবুনিয়া দেখে কাট্টলী এসে দাঁড়াবো বোটের আশায়, নয়তো মাইনি চলে যাব। আর মাইনি থেকে পরিস্থিতি বুঝে সড়কপথে দীঘিনালা হয়ে খাগড়াছড়ি। আর যদি কোনটাই না করতে পারি তবে, এপিবিএন ক্যাম্পে রাত কাটাবো। কিন্তু মাঝি আমাদের বলল, তার পরিচিত একটা মাছের ট্রলার রাতে মাইনি থেকে মাছ নিয়ে রাঙ্গামাটি যায়, সেটা রাত আটটার দিকে বারবুনিয়াতেও আসতে পারে, আমরা যদি চাই সে ওই ট্রলারটায় আমাদের যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে পারে। একেতো বারবুনিয়াতে সারাদিন তার উপর রাতের মধ্যে ফিরে যাবার সুযোগ, এর চেয়ে ভাল আর কি হতে পারে? মাঝি ওই ট্রলারের চালককে কল দিয়ে সব ঠিকঠাক করে দিলেন।

ঘড়িতে তখন সাড়ে এগারোটা কি বারোটা, আমরা নামলাম সেই বহু কাঙ্ক্ষিত বারবুনিয়াতে। নৌকা থেকে নামতেই বারবুনিয়া ক্যাম্পের বেতার যোগাযোগ রক্ষাকারী ও সেখানকার এপিবিএন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মিজান ভাইয়া এসে শুভেচ্ছা বিনিময় করলেন। উনি মাঝির সাথেও কথা বলে আমাদের যাবার ব্যাপারে নিশ্চিত হলেন। এবার পালা বারবুনিয়ার পথের ধুলো গায়ে মাখার। বারবুনিয়াকে যেমনটা ভেবেছিলাম, ছোট্ট একটা দ্বীপ হবে হয়তো, এটা কিন্তু মোটেও সেরকম না। এটার একটা দিক স্থলভাগের সাথে সংযুক্ত। এটি পড়েছে রাঙ্গামাটি জেলার লংগদু উপজেলার লংগদু ইউনিয়নে। এর আরেকটা নাম আছে, ভাইবোনছড়া। পাহাড় আর সমভূমির এক দারুন মিশেল এই বারবুনিয়া। দিগন্তজোড়া পাহাড় ঘেরা অরণ্যভূমি এসে মিশেছে লেকের তীরবর্তী একটা অজপাড়া গায়ে। বেশ দূরের কতগুলো পাহাড় দেখা যায়, ওগুলোর নাম কালপাহাড়। পাহাড়শ্রেণি পার হয়ে গেলেই নাকি খাগড়াছড়ি অঞ্চল। বাঙালিদের বাস কেবল লেকের ধারের ছোট্ট গ্রামটাতেই। আর পাহাড় ঘেরা বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে আদিবাসীদের বসবাস। এখানকার আদিবাসীরা বাংলাদেশের অন্য যেকোন অঞ্চলের আদিবাসীদের চেয়ে আলাদা। ওরা অনেক বেশি বিচ্ছিন্ন আর বিভিন্ন আদিবাসী উগ্রপন্থী সংগঠন দ্বারা শোষিত। বাঙালিদের সাথে বিরোধও হয় বেশ। মানবেতর আর আত্মনির্ভর জীবনযাপন তাদের।

মিজান ভাই আমাদের ক্যাম্পের আয়ত্বাধীন বাঙালি অধ্যুষিত অঞ্চলটা ঘুরিয়ে দেখালেন। আমাদের মাথায় তখন অন্য ভাবনা, আমরা একটু পাহাড়ের দিকে যেতে চাইছিলাম। মিজান ভাইয়ের কড়া নিষেধাজ্ঞা শুনে কিছু বলতেও পারছিলাম না। যাক, ওনার সাথে আরো কিছুক্ষণ ঘুরে বললাম আমরা এবার গ্রামের ভেতর দিক থেকে ঘুরে আসি। তো উনি ক্যাম্পের দিকে হাঁটা দিলেন, চার্জ দিতে আমার ফোনটা সাথে নিয়ে গেলেন। আসার পথে ক্রমাগত ছবি তুলতে তুলতে ওটার চার্জের বারোটা। এদিকে আমাদের বন্ধু মোস্তাফিজ নৌপথে যাবে বলে ডুবে মরার ভয়ে ওর সদ্য কেনা গ্যালাক্সি গ্র্যান্ড সেভেনটা রেখে এসেছে রাঙ্গামাটি। পুরো বারবুনিয়া ভ্রমণে এটাই আমাদের একমাত্র আফসোস, ভালো করে ছবি তুলতে পারিনি।

আমরা হাঁটছিলাম গ্রামের পথে, উদ্দেশ্য গ্রাম পেরিয়ে পাহাড়ের কাছে যাওয়া। এখানে আজ অবধি আমরা ছাড়া আর কোন টুরিস্ট এসেছে কিনা কে জানে, গ্রামের লোকজনের চোখে আজব একটা চাহনি। যে দু একজনের সাথে কথা হচ্ছিল, তাদের একটাই প্রশ্ন, কেন এসেছি এখানে? গ্রামের শেষ প্রান্তের দিকে এসে দেখি সামনে পানি। এখানে প্রায়ই টিলাগুলোর মাঝের ফাঁকে ফাঁকে পানি ঢুকে ছোট ছোট লেকের সৃষ্টি করে। তাই, এক টিলা থেকে অন্যটায় যেতে নৌকা লাগে। আমরা দাঁড়ালাম কিছুক্ষণ সেখানে। চারপাশে তাকাই আর আফসোস করি, আমাদের ছবি না তুলতে পারার কষ্ট তখন দেখে কে? সেদিন ছিল বারবুনিয়াতে বাজারের দিন। একসময় দূরে তাকিয়ে দেখি, হাঁটের পাঠ শেষে কিছু মানুষ নৌকায় করে বাড়ি ফিরছে। আমরা তাদের ডেকে পাড়ে এনে উঠে পড়লাম উনাদের সাথে। তারপর আমরা অন্য একপাড়ে আদিবাসী পল্লীর দিকে নামলাম। ওনারা নিষেধ করছিলেন, এইখানটায় নাকি সবসময়ই দুই একজন শান্তিবাহিনী কিংবা এলপি এজেন্ট থাকেই। পরিচিত লোক ছাড়া কেউ যায় না ওদিকে।

আমরা টিলার ওপরের ছোট্ট দোকানগুলো দেখেই ফিরে আসবো বলে নেমে গেলাম। আমরা ওপরের দিকে গেলাম। তিন চারটে দোকান আছে এখানে। কোন বাঙালি নেই। সবাই একবার একবার ফিরে তাকাচ্ছিল। বাতাসে নাপ্পি টাইপ একটা তীব্র গন্ধ। আমরা এক দোকানিকে জিজ্ঞেস করলাম, ওদিকে আরেকটু ভেতরে যাওয়া যায় কিনা। ও ব্যাটা এমন একটা উত্তর দিলো, তার কিছুই বোঝার সাধ্য আমাদের নেই। এগোলাম আরেকটু সামনে। একটা ছেলের কাছ থেকে জানলাম সামনেই আছে পাড়া। ভাবলাম, যাক সব বিধিনিষেধ ঠেলে এতদূরই যখন এসেছি, তো পাড়া পর্যন্ত অন্তত যাই। এমন সুযোগ জীবনে আর নাও আসতে পারে। হাঁটলাম পাড়ার পথে। সবার নিষেধে নিষেধে আমাদের কৌতূহল তখন চরমে। আর কিছু দূর যেতেই, আমাদের একজন বেঁকে বসল, সে আর যাবে না। দাঁড়ালো তো দাঁড়ালোই, ও আর হাঁটছেই না। যদিও আমার নিজেরও একটু একটু শিহরণ হচ্ছিল, কিন্তু তখন ভয়-ডর ছাপিয়ে মাথায় চেপে বসেছিল কৌতুহল আর অহম। দুইজন কিছুটা হেঁটে একটু সামনে গিয়েও পরে ওর জন্য শেষমেশ ফিরে আসতে হল। তখন যদিও রাগ হচ্ছিল অনেক, কিন্তু এখন মনে হয়, ওই বোধহয় ঠিক ছিল। হয়তো, না যাওয়াটাই সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল।

আমরা নেমে এলাম টিলা থেকে। একটা জায়গায় দড়ি বাঁধা একটা নৌকা পেলাম। ওটায় চড়ে দড়ি টেনে টেনে আবার ফিরে এলাম গ্রামে। নৌকো থেকে নেমে পাড়ে যেতেই আমাদের দেখল স্থানীয় এক মাছ চাষী। তিনি এগিয়ে এসে আমাদের সাথে কথা বলেন, অনেকক্ষণ আলাপ হয় ওনার সাথে। বারবুনিয়ার গল্প, আদিবাসীদের কথা, ওনার নিজের গল্প, আরো অনেক কিছু। তারপর, বিকেলের দিকে ফিরে এলাম এপিবিএন ক্যাম্পে। এখানে আমাদের জন্য দুপুরের খাবারের আয়োজন করা হয়ে ছিল। খাবার খেয়ে লেকের ধারে বহুদূর থেকে ছুটে আসা খোলা বাতাসের অন্তরঙ্গতায় মিলিয়ে নিলাম কিছুক্ষণ। নৌকো নিয়ে মোস্তাফিজ আর আমি নেমে গেলাম লেকের অশান্ত জল শান্ত করতে। বেশ কিছুক্ষণ চলল দাপাদাপি।

এবার, সন্ধ্যের একটু আগে সবাই বেরোনোর জন্যে প্রস্তুত হয়ে নিলাম। যাবো বারবুনিয়া বাজারে আর সেখান থেকেই রাতে মাছের ট্রলারে ফিরে যাবো। ক্যাম্প থেকে মিজান ভাই ও আরো একজনসহ আমরা নৌকায় করে এলাম বাজারে। বাজার ঘুরে দেখে, সবাই চা খেলাম। ততক্ষণে সন্ধ্যা। আমরা এপিবিএনের বাজার পোস্টে এলাম। ওনারা বের করে দিলেন একটা ক্যারামবোর্ড। দুনিয়ায় আমরাই বোধহয় প্রথম ব্লিচিং পাউডার দিয়ে ক্যারাম খেলেছি। যাকগে, তারপর, একদম ট্রলার আসা পর্যন্ত, ক্যারামের বোর্ডেই বিসর্জন দুই ঘণ্টা। মাঝে বিদায় নিলেন মিজান ভাই। উনাদের উষ্ণ আতিথেয়তার জন্যে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানিয়ে ওনার কাছ থেকে বিদায় নিলাম।

রাত আটটার দিকে ট্রলার আসলে বাজার থেকে গরম গরম গুলগুলা (চিনতে না পারলেও কিছু করার নেই) নিয়ে উঠে পড়লাম ট্রলারটায়। সামনের দিকে পুরো পাটাতন জুড়ে মাছের ডেকচি, পেছনে একটা চৌকি, তার সাথেই ইঞ্জিন, চালক ইঞ্জিন বরাবর ছাউনির উপরে। আমরা কিছুক্ষণ ছাউনির বাইরে ডেকে দাঁড়াই আবার, কিছুক্ষণ পর শীতের গুতানি খেয়ে ভেতরে চৌকিতে যাই। এমন করতে করতে চলে আসে কাট্টলী, সেই কাট্টলী বাজার, সকালে যেখানে নেমেছিলাম। ওরা মাছ তুলবে। আমরা আসলাম বাজারে, দিনের দেখা বাজারের সাথে রাতেরটা পার্থক্য করতে। এখানে একটা মজার দৃশ্য দেখলাম। একটা মোবাইলের দোকানে বড়সড় একটা সোলারের ইকুপমেন্ট। তার সাথে লম্বা একটা জায়গা জুড়ে গোটা পঞ্চাশেক টু-পিন প্লাগ বসানো আর ওতে লাগানো রাশি রাশি মোবাইল চার্জার, চার্জ দেয়া হচ্ছে মোবাইলে, প্রতি মোবাইল পাঁচ টাকা। বাইরে বসে আছেন মোবাইল মালিকরা। সত্যিই, দুর্দান্ত ভাবনা। সবার সামনে গিয়ে শত সংকোচ সত্ত্বেও চট করে চার্জারগুলোর উপর একটা ক্লিক দিলাম। আহ, সবার একেবারে সামনে, হাতে কামেরা, পরনে শহুরে পোশাক, ছবি তুলছি কিনা মোবাইল চার্জারের।

এখানে আবার লোকাল দোকানের পরোটা দেখে লোভ সামলানো গেলো না। পটাপট গপাগপ দু-চারটা ঠেসেঠুসে পেটে পুরে নিয়ে আবার ট্রলারে। এবারের গন্তব্য সোজা রাঙ্গামাটি, আর থামবে না। একটা মজার ব্যাপার হল এই ট্রলারগুলোর চালকরা একেবারে কোনকিছুর সাহায্য ছাড়াই এই বিশাল অন্ধকারের জগতে একদম ঠিকঠাক দিক চিনে চলতে পারে। ট্রলারটা যখন ফুল স্পিডে বাতাস কেটে এগোচ্ছে, আমি একবার গিয়ে দাঁড়ালাম ডেকে, ট্রলারের একদম সামনে। চারদিকে নিকষ কালো অন্ধকার, মাঝে দুএকটা জেলে নৌকার কুপির আলো, আমার পিঠ টান টান সোজা দাঁড়িয়ে, গায়ে মোটা জ্যাকেট পায়ে বুট, মুখে পেঁচানো ডোরাকাটা গামছা, ঠাণ্ডা বাতাস চিরে ছুটে চলেছি অথৈ জলের বুকে, একটা জলদস্যু জলদস্যু অনুভূতি। এবার চৌকিতে ফিরে এসে, ব্যাগ থেকে দুটো পাতলা গেঞ্জি নিলাম, দুটোকে দুই কানের কাছে রেখে গামছা দিয়ে ভালো করে পেঁচিয়ে বেঁধে, হাঁটু বুকে মিলিয়ে সেই এক ঘুম। ঘুম থেকে যখন জাগি, তখন ট্রলার রাঙ্গামাটির মাটি ছুঁই ছুঁই করছে। আমরা ঘাট ছেড়ে রাঙ্গামাটি শহরে আসতে আসতে তখন রাত বারোটার বেশি। অবশেষে, বেশ নিরাপদেই অসাধারণ একটা ভ্রমণ হয়ে গেল আমাদের। তারপর, আরো দু তিন দিন মহালছড়ি আর খাগড়াছড়ি জুড়ে ভবঘুরে বেয়াড়াপনা করে, আমরা ফিরে ছিলাম যার যার আপন নিবাসে। আর, এখন বসে বসে এসব লিখছি আর ভাবছি, আবার কবে সব বাঁধন ছিঁড়েছুঁড়ে, সব কাজের মাথা খেয়ে, ডানা মেলবো মুক্ত আকাশে কিংবা পা ফেলবো পিচ ঢালা পথে…. কবে হারাবো আবার অন্য কোন অচেনা বারবুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *