ভার্টিকাল ড্রিমার্স থেকে গত বছরের সেপ্টেম্বরে ভারতের হিমাচল প্রদেশের মাউন্ট দেও তিব্বায় অভিযানের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। অভিযানটি হবে  আল্পাইন স্টাইলে। আমরা জানতাম বছরের ওই  সময় আবহাওয়া  খারাপ  থাকবে। আমাদের ৫ জনের দল। দলের একজনেরই শুধু অতি উচ্চতায় অভিযানের পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল। তবে আমরা এই এক্সপেডিশনের ব্যাপারে বেশ আশাবাদী ছিলাম কারণ ক্লাবের  বিভিন্ন  মাউন্টেনিয়ারিং ওয়ার্কশপে  অংশগ্রহণ করে  আমাদের সবার মোটামোটি প্রস্তুতি ভালো।  ৬০০০ মিটার উচ্চতার দেও  তিব্বা মোটামুটি টেকনি্ক্যাল একটি পিক, তাই যতই প্রস্তুতি থাকুক;  আমরা কঠিন কিছুর সম্মুখীন হতে হবে।

মানালিতে যখন পৌঁছালাম আবহাওয়া তখন অনেক খারাপ। কিন্তু খারাপেরও তো একটা সীমা থাকে। মানালিতে পৌঁছানোর দিন তুমুল বৃষ্টির জন্যে রাস্তা ভেঙ্গে নদীতে ভেসে গিয়েছিল। আমরা মানালিতে প্রবেশের পরেই  অনেকটা রাস্তা হেঁটে মল রোডে যেতে হয়েছিল। এরপর শুরু হল বৃষ্টি থামার অপেক্ষা।

দুই দিন অপেক্ষা করার পর রোদের দেখা পেলাম। সবকিছু ঠিক করে ২৬ তারিখ দেও তিব্বার উদ্দেশে রওনা দিলাম। গাড়িতে প্রথমে আমাদের কানোলে যেতে হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য তখনও আমাদের পিছু ছাড়েনি। ড্রাইভার আমাদের দেও তিব্বার বদলে হাম্পতা পাসের দিকে নিয়ে যায়। অনেক ঝামেলা, অনেক নাটকের পর যখন আমরা ট্রেকিং শুরু করতে পেরেছিলাম তখন ঘড়িতে দুপুর ২টা বেজে গেছে। এখান থেকে শুরু হয়েছিল আমাদের অম্ল মধুর অভিযান।


প্রথম দিনের ক্যাম্প সাইট চিক্কা। জীবনে প্রথম ২৫ কেজির কাছাকাছি ব্যাকপ্যাক নিয়ে ট্রেক করছি। অবস্থা কি পরিমাণ খারাপ ছিল ওইটা আর বললাম না।  হাঁটতে হাঁটতে নিজেকে গাল দিচ্ছিলাম কিসের জন্যে আরামের জীবন ছেড়ে পাহাড়ে মরতে আসছি। কিন্তু ধীরে ধীরে যখন প্রকৃতির অসাধারণ দৃশ্য গুলো দেখছিলাম কষ্টগুলো ভুলে যেতে শুরু করেছিলাম।  ট্রেইলের  পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছিল  বিয়াস নদী  আর পিছে দেখা যাচ্ছিল সাদা পাহাড়ের সারি।


আমাদের প্রথম দিনের ক্যাম্প সাইট। বিকাল ৫ টায় ক্যাম্প সাইটে পৌঁছাই আমরা। এরপর স্যুপ নুডুলস খেয়ে সব গোছাতে গোছাতে রাত ৮ টা। হঠাৎ আকাশে তাকিয়ে দেখি পাহাড়ের পিছন থেকে বিশাল এক পূর্নিমার চাঁদ বের হয়ে আসছে। আর সেই চাঁদের আলো গিয়ে পড়ছে সামনের সাদা পাহাড়ের বুকে। তখন সাদা পাহাড়গুলোকে মনে হচ্ছিল স্বর্গীয় কিছু। সারাদিনের কষ্টগুলো যেন মুছে দিয়ে গেল এই দৃশ্য। হিমালয়ের বুকে প্রথম রাত্রিযাপন সব সময় স্মরনীয় হয়ে থাকার কথা সবার জন্যে। আর সেই রাতকে আরো মহিমান্বিত করতে যদি পূর্নিমার আগমন ঘটে তাহলে আর কি লাগে।


অভিযানের দ্বিতীয় দিন আমাদের অনেকটা পথ যেতে হবে। এজন্য দলনেতা সাদাব ভাইয়ের নির্দেশে ভোর ৪ টায় উঠতে হয়েছিল। রাতে ভালোই ঠান্ডা ছিল। মনে হয় তাপমাত্রা মাইনাসের নীচে ছিল। তাঁবু ছেড়ে যখন বের হলাম তখনও মাথার উপর পূর্নিমার চাঁদ আর সামনে আলোকিত সাদা পাহাড়। সকালের নাস্তা খেয়ে তাড়াতাড়ি বের হয়ে যেতে হবে। তাই ঘুম থেকে উঠেই সবার তোরজোর শুরু হয়ে গেল। সাদাব ভাই নাস্তা বানাতে বসে গেল। নাস্তা পোহা নামক একরকম ডিহাইড্রেটেড ফুড, খুবই অখাদ্য। কিন্তু সারাদিনের পথের কথা চিন্তা করে বাধ্য হয়ে এই খাদ্য গিলতে হয়েছিল। এরপর কফি খেয়ে ক্যাম্প গুছিয়ে রওনা দিয়ে দিলাম।

যখন বের হচ্ছি তখন প্রায় ৭ টা বাজে। আজকের শেষ গন্তব্য সেরির শেষ প্রান্ত। প্রায় ৭- ৮ ঘন্টার পথ। ডান পাশে বিয়াস নদী রেখে আমরা জিপিএস দেখে হাঁটা শুরু করি। ১০ মিনিট হাঁটি আর ২-৩ মিনিট বিশ্রাম নিয়ে আবার চলতে শুরু করি। নদীর আশেপাশের সৌন্দর্য অসাধারণ। দুই পাশের পাহাড় আর মাঝে দিয়ে বয়ে যাওয়া সরু এক নদী। নদীতে পড়ে থাকাপাথর গুলো যেন পাহাড়ের কাঠিন্য প্রকাশ করার দায়িত্ব নিয়েছে আর পাহাড়ের ঢালের সবুজ যেন সেই কাঠিন্যে কোমলতা যোগ করছে।


সাদাব ভাই বলেছিল দ্বিতীয় দিন আমাদের ক্যাম্প হবে সেরির কোন এক কর্দমাক্ত মাঠের শেষ প্রান্তে। আমরা হাঁটছি তো হাঁটছি। কিন্তু কোন মাঠের দেখা পাই না। প্রতিটি পাহাড়ের বাক দেখলেই আশা করি এরপরেই মাঠের দেখা পাব। কিন্তু সব আশাই বৃথা যাচ্ছিল। একটা সময় বিরক্ত হয়ে গিয়েছিলাম। শরীরের সব শক্তি অনেক আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। শুধু মানসিক শক্তি দিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। পথে কয়েকজন মেষপালকের দেখা পেলাম ঘোড়া আর ভেড়া চড়াতে। একজনকে মাঠের কথা জিজ্ঞাস করতেই বললো একটু সামনে। কিন্ত এই সামনের দেখা পেলাম প্রায় ঘন্টা খানেক পর। দূর থেকে আমাদের দেখেই তন্ময় আর সাদাব ভাই আমাদের দিকে আসা শুরু করলো। যেতে যেতে শুনলাম তানভীর ভাই কিছুটা অসুস্থ হয়ে গিয়েছিল শেষ মুহূর্তে। আর বাকি সবাই খুবই ক্লান্ত। এতক্ষণ হেঁটে আসার পর কারো শক্তি ছিল না রান্না করার। তাই চকলেট আর খেজুর খেয়েই সবাই তাঁবুতে শুতে চলে গেলাম। পরদিন আমাদের গন্তব্য টেন্টা। বরফের উপর পথচলা শুরু হবে কালকে থেকেই। সামনে আরো কঠিন কিছু অপেক্ষা করছে আমাদের জন্যে।


অভিযানের তৃতীয় দিন আমাদের ভোর ৪ টায় উঠে সেরি থেকে টেন্টা হয়ে বেইজ ক্যাম্পে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু আগের দিনে ট্রেক শেষে সবাই এত ক্লান্ত ছিলাম যে সাদাব ভাই কাউকে ডাকেনি ভোর বেলায়। সেই সাথে বেইজ ক্যাম্পে যাওয়ার পরিকল্পনাটাও বাদ হয়ে যায়। টেন্টাতেই ক্যাম্প করে থেকে যাওয়ার পরিক্লপনা হয়। সেই অনুযায়ী আমরা ধীরে সুস্থে নাস্তা করে ক্যাম্প গুছিয়ে বের হই।

যখন আমরা টেন্টার জন্যে হাঁটা শুরু করি তখন সকাল ১০ টার কাছাকাছি। সেরি থেকে টেন্টা যাওয়ার জন্যে আমাদের প্রায় খাড়া একটি পাহাড় বেয়ে উঠতে হবে। এর আগে আমাদের একটি নদী পার হতে হবে। প্রায় হাঁটু সমান উচ্চতার নদী পার হওয়া কঠিন কিছু না। সমস্যা হচ্ছে এর প্রচন্ড ঠান্ডা পানি।

নদী পার হয়ে পাহাড় বেয়ে উঠা শুরু করি। প্রায় ২ ঘন্টা হাঁটার পর আমরা উপরে উঠতে পারি। পিঠে বিশাল ব্যাগ নিয়ে এই পাহাড় উঠা অনেক কষ্টকর ছিল। আর সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে যতো উপরে উঠছি ক্লান্তি ততো বাড়ছে। আমরা তখন প্রায় ৪০০০ মিটার উচ্চতায় ছিলাম। যেদিকে তাকাই শুধু বরফ আর বরফ। এই বরফের মাঝেও আমাদের আবার নদী পার হতে হবে। তাও দু বার। পানি আগের চেয়েও অনেক বেশি ঠান্ডা আর স্রোতও বেশি। পানিতে পা রাখা মাত্র পা অবশ হয়ে যাবে মনে হচ্ছিল। তার উপর পায়ে যখন তুষার লাগে হাড় কাঁপুনি আরো বেড়ে যায়। নদী পার হয়ে অনেকটুকু সমতল পথ হাঁটার পর টেন্টার ক্যাম্প সাইটে পৌঁছাই।


ক্যাম্প সাইটে আমরা যতটা তুষার আশা করেছিলাম তার থেকে অনেক বেশি তুষারাবৃত ছিল। সামান্য জায়গাও ছিল না তুষার ছাড়া। টেন্ট পিচ করার কোন জায়গা খুঁজে পেলাম না। তাই বাধ্য হয়ে আজকেই বেইজ ক্যাম্পে উঠে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তখন নরম তুষারের উপর দিয়ে বেইজক্যাম্প যাওয়া অনেক কষ্টের হবে। কিন্তু উপায় নেই। সেই সাথে হালকা স্নোফল শুরু হয়েছিল তখন।

অনেক ক্লান্ত শরীর নিয়ে আমরা বেইজক্যাম্পের জন্যে উঠতে থাকি। প্রায় আধ ঘন্টা যাওয়ার পর উপর থেকে একজন মানুষকে নামতে দেখি। কথা বলে জানতে পারলাম সে এক গ্রুপের গাইড। তার থেকে জানতে পারলাম উপরে কোথাও ক্যাম্প করার জায়গা নেই। তাদের অনেক দূরে থেকে পানি আনতে হচ্ছে গাধা দিয়ে টেনে। তাই আমাদেরকে উপরে যেতে মানা করলো। সে আরো বললো তারা দেও তিব্বা যাওয়ার জন্যে বেইজ ক্যাম্প থেকে উপরে উঠার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। কোলের মাঝে প্রায় ছয় ফুট তুষার জমে আছে। কোন রকমেই ওই কোল পার হওয়া যাবে না। তাই তারা আগামীকালই নেমে আসবে বেইজ ক্যাম্প থেকে। এইসব কথা শুনে আমরা বুঝতে পারি আমাদের আর সামিট করা হবে না এবার। আমরা নেমে আসতে শুরু করি টেন্টাতে আর একটা বড় পাথরের আড়ালে বরফের উপরেই ক্যাম্প সেট করার সিদ্ধান্ত নেই।

যখন ক্যাম্প সেট করা শুরু করি ততক্ষণে স্নো খুব তীব্র মাত্রায় পড়া শুরু হয়েছে। চারদিকে হোয়াইট আউট হয়ে গেছে। প্রচন্ড ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে ভেজা কাপড় নিয়ে টেন্ট পিচ করতে থাকি। তাঁবুতে ঢুকার পরেই কিছুটা শান্তি পাই। এরপর টেন্টের ভিতরেই রান্নার কাজ শুরু করে দেয় সাদাব ভাই। সেই যে টেন্টে ঢুকেছি, সারাদিন আর বের হওয়ার সাহস পাই নি। খাওয়া শেষ করে স্লিপিং ব্যাগের ভিতর সোজা ঢুকে শুয়ে ছিলাম। মাইনাস ১০ ডিগ্রির স্লিপিং ব্যাগ এতদিন ভালই সার্ভিস দিচ্ছিল। কিন্তু ওইদিন ঠান্ডায় খবর হয়ে যাচ্ছিল। রাত যত বাড়ছিল ঠান্ডা তত বাড়ছিল। আর সেই সাথে স্নোফল তো ছিলই। সব মিলিয়ে এক নির্ঘুম রাত কাটাতে হয়েছিল।


অভিযানের ৩য় দিনেই আমরা বুঝে গিয়েছিলাম আমাদের এবার সামিট করা হবে না। ওইদিনের সিদ্ধান্ত ছিল ৪৬০০ মিটারের ছোট চন্দ্রতাল আর সম্ভব হলে জগতসুখ পর্যন্ত উঠা । চতুর্থ দিন ছিল বিশ্রামের দিন। আগের রাতে ঠান্ডায় কারো ঠিক মত ঘুম হয় নি। তাপমাত্রা শেষ রাতে -১০ ডিগ্রির নীচে ছিল। আর সেই সাথে ছিল তুষারপাত। কিছুক্ষণ পর পর উঠে তাঁবুর উপরের তুষার ফেলতে হচ্ছিল। তাঁবু থেকেই বুঝা যাচ্ছিল বাইরে অনেক চাঁদের আলো, কিন্তু ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও এত ঠান্ডায় তাঁবু থেকে বের হওয়ার সাহস ছিল না।

সকালে সবাই ধীরে সুস্থে উঠে তাঁবু থেকে বের হলো। বের হয়ে সবার আগে তাবুর আশেপাশের তুষার পরিস্কার করতে হলো। বাইরে তখন ভালোই রোদ। আকাশও পরিষ্কার ছিল। তাই বরফের উপরেই রান্নার আয়োজন হলো সেদিন। সারাদিন কাটিয়ে দিলাম আড্ডা দিয়ে।


এর মাঝে অনেকবার প্রচন্ড শব্দে এভালাঞ্জ হল। একটা এভালাঞ্জ আমাদের তাঁবুর ঠিক পিছনের পাহাড়ের উপরে। তখন আমি আর সাদাব ভাই জুতা শুকানোর জন্যে একটু সামনে গিয়েছিলাম। হঠাৎ বিকট শব্দে উপরে তাকিয়ে দেখি এভালাঞ্জ। সাদাব ভাই বলল এটা পাউডার স্নো এভালাঞ্জ। ওনার নির্দেশে পাথরের আড়ালে লুকিয়ে নাক মুখ ঢেকে নিলাম। সারাদিনের উত্তেজক ঘটনা এই একটি।


পঞ্চম দিন সকালে উঠেই ছোট চন্দ্রতালের যাওয়ার জন্যে বের হয়ে গেলাম। আমরা তাঁবুতে ব্যাকপ্যাক রেখে ডেপ্যাক নিয়ে বের হয়েছিলাম। স্নোবুট পড়ে হাতে আইস এক্স নিয়ে সবাই ধিরে ধিরে উঠা শুরু করলাম। পুরো পথটাই তুষারে ঢাকা। ৫-৬ ইঞ্চি তুষারের স্তর। তাই অনেক আস্তে আস্তেই উঠতে হচ্ছিল। এভাবে বেইজ ক্যাম্পে পৌঁছাইতে এক ঘন্টার বেশি লেগে গিয়েছিল। বেইজ ক্যাম্পে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিই আমরা। ছবিটি বেইজ ক্যাম্পে থাকা মন্দিরের।


বেইজ ক্যাম্প থেকে ছোটা চন্দ্রতাল উঠার সময়ে শুরু হয় ঝামেলা। তুষারে জায়গাটা এত ভরে গিয়েছিল যে উপরে উঠার রাস্তা বুঝা যাচ্ছিল না। সবচেয়ে অবাক হয়েছিলাম এতো উঁচুতে কুকুরের পায়ের ছাপ দেখে। চিন্তা হচ্ছিল এটা কুকুরের পায়ের ছাপ নাকি অন্য কিছু। আমরা বাধ্য হয়ে কুকুরের পায়ের ছাপ দেখে দেখে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। আমাদের হাঁটু সমান তুষারের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছিল। কোথাও কোথাও আরো বেশি। তাই আইস এক্স দিয়ে বরফের গভীরতা যাচাই করে করে উঠতে হচ্ছিল। সঠিক পথ খুঁজে পেতে অনেক কষ্ট হচ্ছিল। আবার এক পর্যায়ে আমাদের বরফ কেটে কেটে সামনে যেতে হল। এজন্যে ১০০-২০০ মিটার উঠতেই আমাদের লেগে গেল ৩-৪ ঘন্টা। এর মাঝে আবার শুরু হল স্নোফল। এত কিছুর পর যখন চন্দ্রতালে পৌঁছালাম তখন বরফে ঢাকা একটা লেক দেখতে পেলাম। ৪৬০০ মিটার উচ্চতার এই লেকের সৌন্দর্য আমি বর্ননা আর নাই করলাম।

তুষারপাত বেড়ে যাওয়ায় বেশিক্ষণ থাকতে পারিনি উপরে। পনের- বিশ মিনিট পড়েই নীচে নামার শুরু করি ১৫-২০ মিনিট। নীচে নামতে গিয়েও আমরা একবার পথ হারিয়ে ফেলি। বেশ কিছুক্ষণ পরে উপর থেকেই আমাদের ক্যাম্প দেখা পেলাম। আমাদের ক্যাম্পের আসেপাশে আরো কিছু ক্যাম্পও দেখলাম। অভিযানের প্রথম প্রতিবেশী।

ক্যাম্পসাইটে গিয়ে নতুন প্রতিবেশীদের সাথে কথা বলে জানলাম একটা রাশিয়ান টিম আর একটা ইন্ডিয়ান নেভির টিম এসেছে চন্দ্রতাল পর্যন্ত যেতে। কিন্তু স্নোয়ের অবস্থা দেখে ঠিক করেছে তারা আর সামনে যাবে না। গাইড ছাড়া নিজেদের সব জিনিষ নিজেরা নিয়ে এতদূর এসেছি শুনে তারা অনেক অবাক হয়েছিল। সেদিন অনেক দেরি হয়ে যাওয়া্তে সেরিতে আর যাওয়া হয় নি। শেষবারের মতো তাই বরফের উপর রাতটা কাটাতে হয়েছিল। ছবিটি ছোট চন্দ্রতালের।


৬ষ্ঠ দিন সকালে উঠেই নাস্তা করে হাঁটা শুরু। গন্তব্য একেবারে মানালি। কয়েকদিনের তুষারপাতে ট্রেইল ভেজা ছিল। এজন্যে সেরিতে নামতে একটু কষ্ট হয়েছিল। যাওয়ার সময় সেরি যেমন দেখেছিলাম আসার সময় টা কিছুটা ভিন্ন ছিল। এই ছবিটি নামার সময় সেরির ছবি ।


বৃষ্টি থেকে রেহাই পাওয়ার জন্যে যত কম সম্ভব রেস্ট নিয়েছিলাম। তাই শেষ মুহূর্তে ক্লান্তি এমনভাবে ধরেছিল যে ব্যাকপ্যাক নিয়ে চলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছিলাম আমি। হাইড্রো প্রজেক্টে যখন পৌঁছালাম তখন বিকাল ৪ টা। এরপর প্রজেক্টের অফিসে গিয়ে গাড়ির জন্যে অপেক্ষা। প্রোজেক্টের এক অফিসার তার অফিসের ভিতর আমাদের বসতে দিয়েছি্লেন। অফিসে হিটারের সামনে বসেও ঠান্ডায় কাঁপছিলাম। অফিসের লোকটার কাছেই শুনলাম বাংলাদেশ আবার ভারতের কাছে এশিয়া কাপের ফাইনালে শেষ বলে হেরেছে। আর এভাবেই শেষ হলো আমাদের অভিযান। এটা সত্য আমরা ৪৬০০ মিটারের বেশি উঠতে পারিনি। কিন্তু কোন গাইড ছাড়া এত তুষারের মধ্যে যে আমরা এতদূর পর্যন্ত যেতে পেরেছিলাম এটাও একটা সফলতা। পরবর্তী যেকোন অভিযানে এই অভিজ্ঞতা আমাদের অনেক কাজে লাগবে।