প্রকৃতির প্রতিশোধ

[ফাইল ছবি] শামিমা মিতু


বাংলাদেশের পার্বত্যাঞ্চলে কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিপাত মানেই জায়গায় জায়গায় ভূমিধ্বস। ফলস্বরূপ শতশত তাজা প্রাণ চাপা পড়ে মাটির নিচে। গত কয়েকদিনের অতি বৃষ্টিতেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা দেড়শ ছুঁইছুঁই। এটা আসলে অনেক বড় একটা সংখ্যা। পুরোনো গাছ কেটে ফেলা, নিয়মভঙ্গ করে পাহাড় কেটে মাটি অন্যত্র অপসারণ, স্থাপনা কিংবা বসবাসের জন্য বাড়ি বানানো অর্থাৎ অর্থনৈতিক স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশে প্রকৃতির উপর নির্মম অত্যাচারই এই দুর্ঘটনার প্রধান কারণ।

মাত্রাতিরিক্ত বৃষ্টিপাত কিংবা সিসমিক এক্টিভিটির কারণে সৃষ্ট ভূমিধ্বস একটি প্রাকৃতিক বিপর্যয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে মানুষও ভূমিধ্বসের পেছনে অনেক বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। আমাদের পার্বত্যাঞ্চলের বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখলে এবং পুরো ব্যাপারটা নিয়ে একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে একে প্রাকৃতিক বিপর্যয় বলে চালিয়ে দেয়াটা সমীচিন হবে না।

যেসব জায়গায় বসতি এবং তথাকথিত শিল্পায়নের ছোঁয়া তুলনামূলক বেশি, হতাহতের খবরগুলো মূলত আসে সেসব জায়গাগুলো থেকেই। বান্দরবানের গহীনে পাহাড় ধ্বসের ঘটনা ঘটেছে, এমন কিছু শুনেছেন কখনো? তারাও তো পাহাড়ের ঢালে ঘর বাধে। যে ঘরের সব কিছুই বাঁশ দিয়ে তৈরি; ছাউনি, ছাদের কাঠামো, খুঁটি, এমন কি মেঝে পর্যন্ত। শুনেছেন দুর্গম জংগলে পাহাড়ের ঢালে বসবাসকারী কোন মুরং পাহাড় ধ্বসে মারা গেছে? এমনটা সত্যিই শোনা যায় না। কারণ তারা প্রকৃতির সাথে একাত্ম। প্রকৃতির সাথে তাদের সম্পর্ক অনেক নিবিড়, ঐক্যতানে আবদ্ধ। তারা জানে প্রকৃতিকে, পাহাড়কে কিভাবে শ্রদ্ধা করতে হয়।

পাহাড়ের ঢালে মাটি যখন অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে, নিজের ভার নিজে বহন করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে তখনই ভেঙ্গে পড়ে মাটি, পাথর, গাছ সবকিছু নিয়ে। মাটির গভীরে থাকা কিছু পিচ্ছিল পদার্থের কারণে একটু বেশি পরিমাণে বৃষ্টিপাত হলেই পুরো জায়গাটার ওজন বেড়ে যায় অর্থাৎ অভিকর্ষ বেশি বেশি কাজ করা শুরু করে। সামগ্রীক ভারসাম্য হারিয়ে জায়গাটা হয়ে যায় ভূমিধ্বসপ্রবণ। আকস্মিক দেবে যাওয়া, ভেঙ্গে পড়ার মত ঘটনা ঘটে তখনই। পাহাড় কেটে কেটে যখন সমতল তৈরি করা হয় তখন স্বাভাবিকভাবেই একটা খাড়া, অস্থিতিশীল ঢাল তৈরি হয়ে যায়। তৈরি হয় একটি নতুন মৃত্যুফাঁদ। সেটা হয়তো বাইরে থেকে বোঝা যায় না। কিন্তু ঘটনা ঘটে যায় কিছু বুঝে ওঠার আগেই। প্রাণ হারায় সেসব জোড় করে তৈরি করা সমতলে বসবাস করা বোকা মানুষগুলো।

পুরোনো গাছের শিকড়গুলো মাটির অনেক গভীর পর্যন্ত ঢুকে যায়। ভূ-অভ্যন্তরে তৈরি করে অভূতপূর্ব এক নেটওয়ার্ক। এতে করে মাটি-পাথর শক্তিশালী হয়ে পাহাড়ি ঢালের স্থিতিশীলতা বাড়িয়ে দেয় অনেক। মাটির সাথে শিকড়ের সম্পর্ক এতটাই গভীর যে শিকড়ের শক্তিটাই হয়ে যায় মাটির শক্তি। নিরীক্ষায় দেখা গেছে এই শিকড়ের পীড়ন এবং ঘনত্ব যত বেশি হবে পাহাড়ি ঢাল তত বেশি স্থিতিশীল হবে। অথচ নির্বিচারে কেটে ফেলা হচ্ছে গাছ। কারন ক্ষমতাশালী লোকজন থেকে শুরু করে প্রশাসন, বনবিভাগ সবারই গাছ বিষয়ক চিন্তাভাবনা টাকাকেন্দ্রিক। বন্যপ্রাণী, জীববৈচিত্র এসব গোল্লায় যাক; টাকার লোভের কাছে আমরা প্রজন্মের ভবিষ্যতকে বিকিয়ে দিচ্ছি। জলাঞ্জলি দিচ্ছি প্রতি বর্ষায় অনেকগুলো তাজা প্রাণ। অবশ্য যারা এই ন্যাক্কারজনক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত তারা কখনোই ওসব ভূমিধ্বসপ্রবণ এলাকায় বসবাস করেন না। স্থানীয় প্রশাসন, বনবিভাগ নির্বাক শুধু তাকিয়ে দেখে; গায়ে মাখে না।

অন্যদিকে, পাহাড়ি ছড়া-খালগুলো থেকে উত্তোলন করা হচ্ছে পাথর; নষ্ট করা হচ্ছে প্রাকৃতিক পরিস্রাবণ প্রণালী। এই পাহাড়ি ঝিরি-খালগুলো আশেপাশে গড়ে ওঠা বসতিগুলোর খাদ্য ও সুপেয় পানির যোগানদাতা, প্রাণের সঞ্চারিনী। ঘোর বর্ষায় যখন জলধারা প্রমত্ত হয়ে ওঠে তখন দুই দিকের পাহাড়কে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করে এই মহামূল্যবান পাথরগুলো। আর এগুলো তুলে নিয়েই করা হচ্ছে অনাকাঙ্ক্ষিত নগরায়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থার তথাকথিত উন্নয়ন। এতে করে হুমকির মুখে ফেলে দেওয়া হচ্ছে দুপাশের বেলে মাটির পাহাড়কে, আশেপাশে বসবাসকারী সহজ-সরল মানুষদের আর জীববৈচিত্রকে। গলা টিপে হত্যা করা হচ্ছে বাস্তুতান্ত্রিক ভারসাম্যকে।

সমগ্র পৃথিবীজুড়ে বড় ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ কিংবা প্রাণহানীর জন্যে ভূমিধ্বস ব্যাপারটা বেশ আলোচিত। ডারহাম ইউনিভার্সিটির ইন্টারন্যাশনাল ল্যান্ডস্লাইড সেন্টারের সার্ভে থেকে জানা যায় ২০০৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত পৃথিবীর নানা প্রান্তে ঘটে যাওয়া ভূমিধ্বসগুলোতে প্রাণ যায় ৩২,৩২২ জন মানুষের। ভূমিকম্পের ফলে সৃষ্ট ভূমিধ্বসে নিহতদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি কিন্তু এখানে। আমাদের বোঝা উচিত এই সংখ্যাটা কিসের ইঙ্গিত বহন করে? আমাদের জাগ্রত হওয়া উচিত এখনই।

সৃষ্টির শুরু থেকেই আমরা প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্যে বসবাস করছি। এই সম্পদের টেকসই হারে ব্যবহার তথা ভোগের মাধ্যমে অর্জিত হয় টেকসই পরিবেশ ব্যবস্থা অর্থাৎ এনভায়রনমেন্টাল সাসটেইনেবিলিটি। তবে বাস্তবসম্মত বা সত্যিকারের টেকসই ব্যবস্থা জারি করার জন্যে অর্থনৈতিক এবং সামাজিক দিক থেকেও একটা থিতু অবস্থা বজায় রাখা লাগে। সংস্কৃতি একটি সামাজিক সম্পদ; এর সঠিক চর্চ্চা বা টিকিয়ে রাখার ব্যাপারটা বেশ গুরুত্ববাহী। এছাড়া কোন শিল্প প্রতিষ্ঠান বা দেশও কিন্তু তার নিজস্ব সম্পদের উপর নির্ভরশীল। এই সম্পদের যথাযথ টেকসই ব্যবস্থায় ব্যবহার এনে দেয় অর্থনৈতিক সাসটেইনেবিলিটি। এই সবকিছুর মেলবন্ধন এবং দীর্ঘস্থায়ী উপায়ে ভোগ কিংবা ব্যবহারের উপর নির্ভর করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভাগ্য। উন্নয়ন তখনই টেকসই উন্নয়ন, যখন বর্তমানের সকল চাহিদা ভবিষ্যতের সাথে আপোষ না করে পূরণ করা হয়। আর এটাই হচ্ছে সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট।

আমরা প্রায়শই সাসটেইনেবিলিটি নিয়ে গলাবাজি করি। আসলে কি চাই আমরা, কিভাবে কি সাসটেইন করবে? আমরা প্রকৃতিকে তার ভেতর, তার মত করে সাসটেইন করতে দিতে চাই না। আমরা, হিংস্র মনুষ্য জাতি চাই প্রকৃতি আমাদের মত করে, আমাদের মন মত সাসটেইন করুক। আমরা প্রকৃতিকে, তার সম্পদকে রক্ষা করতে চাই নিজেদের ভোগের জন্যে, শিল্পের বিকাশ সাধনের জন্যে। প্রকৃতির উপর আধিপত্য বিস্তার করতে থাকা মানেই যে ধ্বংস অনিবার্য, এই কথাটা আমরা ভুলে যাই বারবার।

পাহাড় কেটে, বন উজাড় করে, নদী-খাল থেকে পাথর তুলে কিন্তু আমরা বাঁচতে পারব না। কিভাবে মরছি নিজেরাই টের পাব না হয়তো। সর্বপ্রাণবাদে বিশ্বাস করাটা বাধ্যতামূলক নয়; কিন্তু পাহাড়, বন, নদী রক্ষার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে শেখাটা বাধ্যতামূলক। সামগ্রীক প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার ব্যাপারে নজর দেয়া উচিত আমাদের নিজেদের স্বার্থেই; ভালোভাবে বাঁচার জন্যে। তা না হলে দিন গুণতে হবে মহাপ্রলয়ের।

 

(Visited 1 times, 1 visits today)
কামরুল হাসান সজীব
কামরুল হাসান সজীব
পেশায় সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার। সারাদিন রাত কাজ করেন, শুধুমাত্র মনমত কিছু সময় যেন পাহাড়ে কাটাতে পারেন। বাসা ও কাজের বাইরে সমস্ত জগত জুড়ে শুধুই পাহাড়। পাহাড়ে পথ হারিয়ে ঘুরে বেড়ানো ছাড়াও শখের মধ্যে হচ্ছে ছবি তোলা ও গিটার বাজানো।

One thought on “প্রকৃতির প্রতিশোধ

Leave a Reply