পর্বতে মৃত্যু ও উইলি


জীবন বাজি রেখে ভয়ংকরতম খেলায় উন্মত্ত অংশগ্রহণ, মৃত্যুর পসরা সাজিয়ে বসে থাকা নির্দয় পর্বতে শত অনিশ্চয়তা উপেক্ষা করেও বারবার ছুটে যাওয়া- এসবের পেছনকার চালিকাশক্তি কি? উত্তর হল- চরম ঐকান্তিকতায়, প্রগাঢ়ভাবে বেঁচে থাকার স্পৃহা আর দুর্নিবার মোহ। সাধারণ মানুষ যেটাকে অযৌক্তিক বলে উড়িয়ে দেন, পাগলামি বলে হা-হুতাশ করতে থাকেন সেটাকেই চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে নেন এক শ্রেণির পাগলাটে এক্সট্রিম এথলেট। নরম বিছানার চেয়ে পাথরের চাই-এ ঝুলতে থাকা জীবন অনেক বেশি অর্থবহ তাদের কাছে। উইলি তাদেরই একজন। সলো এবং স্পীড ক্লাইম্বিং এর অজস্র কৃতিত্ব দেখিয়ে ‘সুইস ম্যাশিন’ খ্যাত উইলি স্টেক অমর হয়ে গিয়েছেন কয়েকদিন আগে মাউন্ট নুপৎসের সেই আচানক প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার আগেই।

উইলির এভারেস্ট-লোৎসে প্রোজেক্টের খবরাখবর রাখছিলাম নিয়মিতই। তার ফেইসবুক পোষ্টগুলোও নজর এড়াতো না। এরপর হঠাৎ শোনা মৃত্যুসংবাদটা সেদিনের সকালটাকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল একেবারে। পর্বতে মৃত্যু খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। তাই বলে উইলি! মেনে নিতে সত্যিই কষ্ট হচ্ছিল।

মিডিয়ার দেওয়া ‘সুইস মেশিন’  তকমাটা আসলে উইলিকে ঠিকঠাক উপস্থাপন করতে পারে না। উইলি তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু। আধুনিক যুগের সেরা এই আল্পাইনিস্ট পর্বতকে নিজের খেলার মাঠ বানিয়ে ফেলেছেন কৈশোর পার করা মাত্রই। এরপর লিপ্ত হয়েছেন নিজেকে ছাড়িয়ে যাবার যুদ্ধে। পেয়েছেন অভাবনীয় আর অদেখা সব সাফল্য। পর্বতারোহণ ছিল উইলির কাছে গতি বা দ্রুততার খেলা। তিনি জানতেন, গতি দিয়ে অনেক বিপদ এড়ানো যায়। পর্বতারোহণের শুদ্ধতম ধারা আল্পাইনিজমের সাথে গতি ব্যাপারটা আসলেই ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ডেথ জোনে রাত কাটানোর চেয়ে ‘লাইট এন্ড ফাস্ট’ ক্লাইম্ব করে নিচে চলে আসাটা তার কাছে ছিল বেশি পছন্দনীয় ব্যাপার। মাউন্ট আইগারের কুখ্যাত উত্তুরে প্রাচীর,  জীবন যেখানে দোদুল্যমান; সেটা ছিল তার কাছে ভার্টিক্যাল ম্যারাথনের রেইস ট্রাক।

মাত্র ৬২ দিনে আল্পসের ৮২ পর্বত চূড়া, ভয়ংকর অন্নপূর্ণা কিংবা শিশাপাংমায় স্পীড ক্লাইম্বিংয়ের যে নজীর তিনি স্থাপন করেছেন তা দিয়ে তিনি হয়ে গেছেন পর্বতে দ্রুততার অন্য নাম। উইলি আল্পাইন ক্লাইম্বিংকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছেন যে তার ভিডিও ফুটেজ দেখা ব্যাপারটা ফুটবল বা টেনিসের মতই চিত্তাকর্ষক এবং রোমাঞ্চকর। যদি বলা হয় উইলি স্টেক পর্বতারোহণে নতুন যুগের সূচনা করেছেন তবে একটুও বাড়িয়ে বলা হবে না। সত্যিই তিনি পর্বতারোহণ সম্পর্কে সাধারন মানুষের ধারণা পালটে দিয়েছেন। এরা এখন ভাবতে শুরু করেছে পর্বতারোহণ একটা স্পোর্টস; পর্বতারোহীরাও পারফর্মার, এথলিট। পর্বতারোহীদের যদি শুধুমাত্র গতি কিংবা দ্রুততা দিয়ে বিচার করা হত তাহলে উইলিকে নিঃসন্দেহ ইতিহাসের সেরা পর্বতারোহী বলা যেত।

কোন পর্বতারোহীই একই ভুল দু’বার করতে চান না। সব ধরনের রিস্ক ফ্যাক্টর বিবেচনায় রেখে প্রতিবন্ধকতাকে চ্যালেঞ্জ করাটা তাদের সহজাত; কারণ বেঁচে ফিরতে হবে। উইলি নুপৎসে ওয়ালের যে জায়গা থেকে ফসকে হাজার মিটার নিচে আছড়ে পড়েছেন, অমন জায়গা হয়তো তিনি হাজার বার অতিক্রম করেছেন কোন বিপত্তি ছাড়া। ক্ষুদ্র সেকেন্ডের মনোযোগ বিচ্যুতি হয়তোবা তার প্রাণনাশের কারণ। ‘মোর হিউম্যান’  বলা হলেও তিনি কিন্তু হিউম্যান। তবে আসলে কি হয়েছিল সেটা আমরা হয়তো কখনোই হয়ত জানতে পারব না। মাত্রাতিরিক্ত গতিসম্পন্ন উইলির জীবন ছিল ফিজিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অনবদ্য এক উদাহরণ। তিনি প্রতিনিয়ত নিজস্ব সীমাকে সামনের দিকে ঠেলেছেন। তার অবিশ্বাস্য দ্রুততা কিন্তু একদিনে তিনি অর্জন করেননি। তার ‘মোর হিউম্যান’ এক্টিভিটিই তার মৃত্যুর কারণ, এটা বললে অবশ্যই ভুল হবে। তিনি দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় নিজেকে, নিজের নিরাপত্তার ব্যাপারটাকে গতির সাথে খাপ খাইয়ে নিয়েছিলেন। তিনি গতির সাথে সখ্যতা গড়েই নিজের ‘কমফোর্ট জোন’ খুঁজে নিতেন; মাত্রাতিরিক্ত ঝুঁকি নেয়ার বিপক্ষে ছিলেন তিনিও। তিনি বলেছিলেন হৃদয়কে অনুসরণ করতে, গতি কিংবা উচ্চতা এসব কোন ব্যাপার নয়!

পর্বতারোহণের সবচেয়ে পুরোনো সঙ্গী হচ্ছে মৃত্যু; উইলির তিরোধানের ব্যাপারটা ছিল সেটারই অনুস্মারক বা অভিজ্ঞান। উইলি কি মরে যাবার জন্য পর্বতে গিয়েছিলেন? অবশ্যই না। তিনি গিয়েছিলেন বাঁচতে, জীবনের সাথে গভীরভাবে নিবিষ্ট হতে।

[ছবি] www.uelisteck.ch


আরও পড়ুন
আইগারের উত্তুরে মৃত্যু প্রাচীর
‘সামিটে পৌঁছাতে না পারা ব্যর্থতা নয়, পর্বতে মৃত্যুই হল ব্যর্থতা’
তুষারনদী, পাহাড় আর নিশ্চুপ ভালোলাগার গল্প

 

(Visited 1 times, 1 visits today)
কামরুল হাসান সজীব
কামরুল হাসান সজীব
পেশায় সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার। সারাদিন রাত কাজ করেন, শুধুমাত্র মনমত কিছু সময় যেন পাহাড়ে কাটাতে পারেন। বাসা ও কাজের বাইরে সমস্ত জগত জুড়ে শুধুই পাহাড়। পাহাড়ে পথ হারিয়ে ঘুরে বেড়ানো ছাড়াও শখের মধ্যে হচ্ছে ছবি তোলা ও গিটার বাজানো।

One thought on “পর্বতে মৃত্যু ও উইলি

  1. উইলির চলে যাবার খবর শুনে সত্যিই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম… তবুও পৃথিবী থেমে থাকে না…

    আমাদের সৌভাগ্য যে জীবদ্দশায় এমন একজন পর্বতারোহীকে দেখেছি। দু:খ লাগে যে আর কোনদিন তাকে দেখা হবে না পর্বতের বুকে অনায়াসে অসামান্য সব কীর্তি গড়ে বেড়াতে।

Leave a Reply