একটা অন্ধকার রাত, কাল বৈশাখীর আগমনী বৃষ্টিতে পিচ্ছিল। দুর্গম এক অচেনা পাহাড়ি শহরে ভ্রমণপিপাসী কিছু মানুষ। লোকাল সিএনজি, গুগল ম্যাপস সম্বল করে যাত্রা। পাহাড়ের ঢালে একটা বাড়ি, নাম কল্পতরু। আইভরি এন্ড কুরিও, নামের সাইনবোর্ড। বজ্রপাতের সাথে থেমে থেমে, থেকে থেকে অচেনা এক কুকুরের ডাক। এক পশলা বৃষ্টি; একটু অস্বস্তি, একটু শঙ্কা। পুরোনো লোহার দরজা পেরুলেই অন্ধকারের ভেতর খাড়া ঢাল বিছানো ইটের রাস্তা। লোডশেডিং জয় করে একটু এগুলেই বনেদী এক দোতলা বাড়ি।

জায়গাটার নাম জুড়াছড়ি। ছড়ি শব্দের অর্থ ঝর্ণা। এভাবেই বলেছিলো মোটরসাইকেল চালক কাম গাইড তাপস। স্থানীয় সোনালী ব্যাংকে কাজ করে, শুক্র-শনি ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালায় সে। পাহাড়ি, লাজুক, মিশুক এই মানুষটির ডাকে ছুটে যাওয়া দূরে, আরো দূরে। জুড়াছড়ি ছাড়িয়ে, বাঁশের সাঁকো পেড়িয়ে, শান্ত, সবুজ, রোদমাখা কিছু পাহাড়ের চূড়ায়, বিশাল এক বৌদ্ধ মঠ। বনভন্তের মিউজিয়াম দেখা শেষ হলে যেথায় মন ছুঁটে যায় খোলা এক দর্শনায়। রেলিং পেরুলেই ঐতো আকাশ, ঐতো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা অনড় গাছের সারি। বৃষ্টিতে সিক্ত দামাল তরুণের বাবড়ি চুলের ডগা বেয়ে চুয়ে পড়া ফোঁটার কাল্পনিক শব্দ।

বৃষ্টিভেজা বিকেল। আর্মি ক্যাম্পের রাস্তার ওপাড়েই ২য় পার্বত্য চলচ্চিত্র উৎসব। রাখাইন এক ফ্লিমমেকারের চাকমা ভাষায় নির্মিত ছবি; মাই বাইসাইকেল। আয়োজকদের ভীষণ আন্তরিক আমন্ত্রণ আর উষ্ণ আতিথেয়তায় মুগ্ধ হয়ে এক অন্য বাংলাদেশের সিনেমা দর্শন।পাহাড়ি জীবনযাত্রার অনেক অজানা প্রশ্নবান, আর বাঁশের তৈরি ধাবায় ধুম্রপান।সূর্যটা ততক্ষণে হেলে পড়েছে।

ঘুমকাতুরে, রাতপ্রহরীদের সকাল ৭টায় রিজার্ভ বাজার আগমন। সদরঘাটের মত চাঞ্চল্যকর হিজিবিজি একটা ব্যস্ত জায়গা। সিএনজি যে জায়গাটায় নামিয়ে দেয়, সেখান থেকে হরেক অলিগলি পেরুলেই লঞ্চঘাট। ছোট্ট ছাউনিটায় জনাদশেক নানা বয়সী আদিবাসী মানুষ। হুড়মুড় করে ট্রলারে উঠে পড়া, আর ডেকের পেছনে জায়গা দখল করা। ব্যস্ততায় হঠাৎ মনে পড়ল সকালের নাস্তা ভুলে যাওয়া। দেখতে দেখতেই ট্রলার যায় ছেড়ে, ছোট্টো গলি পেরিয়ে জেনো চারলেনের বিশাল এক রাজপথ। ঢেউয়ের দোলায় রাঙানো, দূরে পাহাড়, সবুজ আর মেঘের হাতছানি।

চলতে চলতেই হঠাৎ আবারো সেই পুরোনো মন খারাপ হওয়া। এই সবুজের মাঝেও, এই উদ্দাম রোদের ব্যালকনিতে, থেকে থেকে যে টবে লাগানো দুরন্ত মেঘ এসে ঝড়ের জানান দেয়, তার অবসরে তাড়িয়ে বেড়ানো সেই পুরোনো বিষণ্ণতা। কোন কারণ ছাড়াই বিশেষ বিশেষ দিনগুলোতে, বিশেষ বিশেষ জায়গায় না বলা অভিমানী এক মন খারাপের মেঘ ছেয়ে দেয় মনের তেপান্তরের মাঠ। ছবি তোলায় ব্যস্ত স্বজনের কাছে তখনো তাই সান্ত্বনা খোঁজা। আহা, তাঁকে ছাড়া এই প্রকৃতি দেখাও যে পাপ। এত সুন্দর, এত প্রাণ, এত রূপলীলা, কেউ একজন প্রাণ ভরে দেখুক। জুড়িয়ে যাক তার বাবুই পাখির প্রাণ; একটু না হয় গোত্তা খেয়ে উড়ে বেড়াক পানকৌড়ি আর হাঁসেদের দলে, মেঘের সাঁতারে।

হ্যাপির মোড়, নামের অদ্ভুত রকম একটা জায়গায় শুক্রবার সকালে নামিয়ে দিলো বাস। ঝিরঝিরে বৃষ্টি পড়ছে তখন। স্থানীয় একজন ‘ঝর্ণা’ আমাদের আবাসনের ব্যবস্থা করেছেন। পুরো হোটেলে কোনো মানুষজন, কেয়ারটেকার, বিদ্যুৎ এবং পানি নেই। প্রধান দরজার বাইরে হোটেলের চাবি লুকিয়ে রাখা হয়। কি অদ্ভুত একটা ভুতুড়ে জায়গা। কোনো মানা নেই, কোনো সংকোচ নেই। যেনো আমারি এক আপন আধার। (অসমাপ্ত)

[প্রচ্ছদ ছবি] আশফাক হাসান
[অন্যান্য ছবি] 
তানভীর আলীম 


(Visited 1 times, 1 visits today)

4 Comments

  1. যতবার পড়ি, ততবারই নতুন করে ভালো লাগে। লেখকের আর কোনো লেখার লিংক পাওয়া যাবে? এই লেখার পরের পর্ব মনে হয় না আর আসবে। অপেক্ষায় আছি যদিও।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *