১.

পাড়া থেকে কেউ একজন ডাকছে।

একাই যাচ্ছিলাম। ঝিরিতে পানি বিশেষ নেই। ঝিরির ওপাশের মারমা পাড়ার একপ্রান্তে এক লোক একটা মাচাংয়ে বসে আছে, পাশে তার অনুরাগীও আছে। এই লোকই ডাকছে। এগিয়ে গেলাম। কোথা থেকে কি বৃত্তান্ত ইত্যাদি ইত্যাদি। নাম লিখে রাখলো খাতায়। চলে আসার আগে জিজ্ঞেস করলাম আপনি কে? হুংকার এল, ‘আমি মেম্বার!’ পাশের মোসাহেব ঘাড় নাড়ে, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, উনিই তো মেম্বার।’

পাহাড়

মেম্বারের ভারিক্কী বোলচাল থেকে মুক্ত হয়ে আগালাম। বড় বড় সাদাটে পাথর, অল্প জল জমে আছে, স্রোত নেই। মাঝে মধ্যে মাছরাঙ্গা আর ওপাশের সেগুন বনের ফাঁকে শালিক গোছের সাধারণ পাখি। খানিক পরে দেখি একটা গাছ, গাছের নিচে দুইজন মানুষ শুয়ে আছে। পর্যটক। তাদের একটা দল আছে কাছেপিঠে। রাতটা ওরা লোকালয় থেকে দূরে জঙলের মাঝে ক্যাম্প করতে যাচ্ছে শুনে হাজির হয়েছি। কিন্তু সে আশায় গুড়ে বালি। অনুমতি না পাওয়ায় সবাই ফিরে যাচ্ছে। সেই একই পাড়ায় আবার ফিরে এলাম। যথারীতি এদের সাথেও মেম্বারের খিটিমিটি বেঁধে গেল। লোকটা মনে হয় সদ্য মেম্বার। পদটি নিয়ে অসীম গর্ব। তারপর রাতে পাড়ার স্কুল মাঠে তাঁবু গাড়া হল বেশ কয়েকটা। জঙ্গলে যখন হচ্ছে না তখন এখানেই সই।

জলপ্রপাত

গভীর অন্ধকার ফুড়ে আর্মির জীপ হাজির। জনৈক মেজর আর জনা দশেক সৈন্য। মেজরটি অতিশয় ভদ্রভাবে জানিয়ে দিল তাঁবুটাবু গুটিয়ে নিয়ে বাজারের কোন হোটেলে উঠতে হবে, কোন ছাড় নেই। বিস্তর বাক্যালাপের পর আমরা সুড়সুড় করে হোটেলে চলে গেলাম। মেজরটিই ঠিক করে দিয়েছিলেন। এই শক্ত বেড়াজালে আবদ্ধ একটি মফস্বল শহরের মাঝ দিয়েই ঢুকতে হয় রঙিন পাহাড়ি এলাকাটায়।

এবং পাহাড়

.

ভ্যাপসা গরম পড়েছে। জঙ্গল পেরিয়ে উঁচু গাছে ছাওয়া একটা ঢালে এসে দাঁড়াতে কিঞ্চিৎ বামপাশে মোরগ ঝুঁটির দেখা পাওয়া গেল। পাড়া থেকে এই বিশাল পাহাড়টা স্পষ্ট দেখা যায়। পাড়াটা যে নিচু উপত্যকাতে, সেই উপত্যকাতে নামবার রাস্তাটা থেকে তাকে আরো চমৎকার দেখা যায়। দূরে নীলচে ঝুঁটি, নিচে অসমতল ছোট জমি, ক্ষেত আর বাগান, অল্প জঙ্গল। তবে সেগুলি দূর থেকে বেশি সুন্দর। আপাতত ঢাল বেয়ে গজিয়ে উঠা ধারালো ছনের জঙ্গল ঠেলে এগুচ্ছি, হাত পা ছড়ে একাকার। জঘণ্য রকমের গরম।

মোরগের ঝুঁটি

বাঁশবনের খোঁচা খেয়ে এগুতে এগুতে একটা বড় গর্ত পাওয়া গেল। এটাই চূড়া। বিশেষ মনোহর কোন ব্যাপার নেই। কারণ বিস্তর বাঁশ আর আগাছায় চারপাশে ঠিকমত কিছুই দেখা যায় না। জঙ্গলের ফাঁক দিয়ে অবশ্য নিচের হালকা আর ঘন সবুজ অঞ্চলটা মাঝে মাঝে উঁকি দিচ্ছে । 

লোকমুখে শুনা যায় এই জঙ্গলে চিতাবাঘ থাকে। অবশ্য কেউ চোখে দেখেনি। কিন্তু কিছুদিন আগে ফাঁদে পড়া হরিণ সাবড়ে দেওয়ায় সবার ধারণা ওটা চিতাবাঘই হবে। কেউ কেউ আবার বলে বাঘ নয়, এটা ভাল্লুকের কাজ। প্রবীণেরা বলে ঠিক এখানেই মহাযুদ্ধের সময় ব্রিটিশদের ক্যাম্প ছিল আরও কতশত গল্প। কিঞ্চিত ঐতিহাসিক পটভূমি  আর কিঞ্চিত রহস্যময় জীব বৈচিত্র্যের মাঝে নিজেকে আবিষ্কার করে খুশি খুশি লাগছে।

.

‘আমি লুসাই, আমি এই পাড়ার একমাত্র লুসাই। আমি মিজোরামে যাই আবার এখানেও আসি। আমি অমুক অমুক জায়গা দেখেছি’ ঝিম মেরে তাঁর কথা শুনছিলাম। সত্য মিথ্যা নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই, কারণ শুনতে মজা লাগছিল। এদিকের লোকেদের অদ্ভূত ভাব। নিরস একটা ব্যাপারে রঙ চড়াবে, আবার রোমাঞ্চকর কোন ব্যাপার একদম নির্লিপ্তভাবে বলে যাবে।

পাড়ার সামনে কবরস্থান। পাথুরে ফলকে নাম, তারিখ লেখা। বড় বড় গাছে ছাওয়া সুনসান গম্ভীর এলাকা। একটি কবরের ওপরে ছড়িয়ে আছে অনেক লাল ফুল। ওপরের গাছটা নিষ্পত্র, ডালে কেবল ফুলগুলিই আছে।

টি শার্ট

পাড়ার একমাত্র লুসাই বাদে বাকিরা বম আর তংচগ্যা। কয়েকটি পরিবার বৌদ্ধ আর বেশীরভাগই ধর্মান্তরিত খ্রিস্টান। মাইকে নিয়মমাফিক ভজন হচ্ছে, প্রার্থনা হচ্ছে। কাঠের একটা চমৎকার গির্জা। আর পাহাড়ের নতুন আমদানী মোটরসাইকেল। ছেলে-মেয়ে মোটরসাইকেলে করে জুমে যাচ্ছে, দুপুরে দোকানে কফি খেতে খেতে সিনেমা দেখছে। দিব্যি হাশিখুশি এলাকা। এরই মাঝে হঠাৎ করে চোখে পড়ে হারিয়ে যাওয়া যুগের বুড়ো থুড়ত্থুড়ে কোন দাদুকে। তীর ধনুক নিয়ে পাড়ার গোড়ায় বড় গাছটার মাথায় সই করছেন। দিদিমা পাইপ হাতে হেঁটে যাচ্ছেন। নতুন আর পুরানো। অনেক হৈ চৈ, অনেক জমাট। রাত হলে অবশ্য সব চুপ। কেবল সঙ্গীর খোঁজে  পোকামাকড়ের একটানা ডাক আর একমাত্র লুসাইয়ের মত কোন গল্প বলিয়ের বিড়বিড়ানি। সবই অন্যরকম।

.

পাড়ার ঘণ্টা চারেক দূরত্বে যাব। ঘাসের ফাঁকে দেখা মিললো প্রকাণ্ড এক পাথরের। এখানে নাকি সত্তর দশকের শুরুতে একটা হাতি মারা হয়েছিল। এখন কেউ হাতি মারে না, কারণ হাতিই নেই। এয়ারগানধারী শিকারী কিন্তু এরই মধ্যে ইরাবতী কাঠবেড়ালী, সবুজ কাঠঠোকরা (গ্রেটার ইয়েলো নেপ) আর মাঝারী বসন্তবৌরি ঝোলায় পুরে ফেলেছে। বারণ করলে পাত্তা দেয় না। শিকার স্থানীয়দের পছন্দের কাজ কিন্তু পাড়ার আশেপাশে নাকি খানিকটা বন আলাদা করে রেখে দেওয়ার রেওয়াজ আছে। এই অংশে শিকার করা বা গাছ কাটা নিষেধ। কথাটি বেশি যাচাই করিনি কিন্তু সত্য হলে অতি উত্তম।  

 হাতি মারা পাথর

ওদিকে ডান পাশে প্রকাণ্ড এক পাথুরে পাহাড় দেখা যাচ্ছে। কলাগাছে ভর্তি পাদদেশ। মসৃণ পাথর বেয়ে পানি পড়ছে কোথাও কোথাও। বাশঁ, কলাবন, পাথর, পানি, খাড়া পাহাড় আর পাহাড়ের মাথার ইতস্তত খাটো গাছগুলির ওপরে উড়তে থাকা শিকারী পাখিটি সবাই যার যার মত নিশ্চিন্ত, চুপচাপ। আগাছায় ছাওয়া একটা রাস্তা পেরিয়ে খানিক জঙ্গল, পানির স্রোত আর খাদ। একটা ঝুপসী গাছ পার হয়ে মজার একটা দৃশ্য দেখতে পাওয়া গেল। শ্যাওলা পড়া মস্ত পাথরের রাস্তা বিশেষ। প্রায় মসৃণ, সামান্য পানি বইছে। দিব্যি স্লাইড করে নেমে যাওয়া যায়। ওপর থেকে পিছলে নিচের পানিতে এসে পড়তে প্রায় ২০ সেকেন্ড লাগে। স্থানীয়দের বনভোজনের জায়গা। তবে জায়গাটা মোটেও বুনো না। সবখানেই গাছের আচ্ছাদন কম, জুম আর বাগান বেশি। আমার মাথায় ঘুরছিল ঐ খাড়া পাথুরে পাহাড়টার কথা। ওটার মাথায় চড়তে পারলে বেশ হত কিন্তু আজ আর সময় নেই।

৫.

পাহাড়ে ঝকমকে সকাল নামল। শিকারে যাবেন নাকি গুহা দেখতে যাবেন? এয়ারগানধারী জিজ্ঞেস করলো। শিকারে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। অদ্ভূত খি খি করে হাসা একটা বেটেখাটো লোকের সাথে বাঁশবনে সেধোলাম। গুহা দেখাবে উনি।

এভারেস্ট

মলাট প্রকৃতি: পেপারব্যাক
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ২৪০

লেখকগণ: ১. সিরাজুল মোস্তাকিম পিয়াল, ২. এম.এ.মুহিত, ৩. নিশাত মজুমদার, ৪. দীপঙ্কর ঘোষ, ৫. কুন্তল কাঁড়ার, ৬. মীর শামছুল আলম বাবু, ৭. সুনীতা হাজরা, ৮. সালেহীন আরশাদী, ৯. আহমেদ পরাগ, ১০. অনিক সরকার, ১১. সোয়াইব সাফি

বাশঁবন পার হয়ে উঁচু পাহাড় উঁকি দিল। পাহাড়ে না চড়ে পাশের খাদে নেমে গেলাম। সেখানে আবার বাঁশবন, হড়হড়ে কাদা আর জোঁক সামলে নামলাম মসৃণ ক্যাসকেডে। বনমোরগ উড়াল দিল একটা। সামনে ময়লা কাদা জমা ডোবা আর একটা ঝর্ণা গোছের কিছু। পেয়ালার মত পাথুরে পাহাড় জায়গাটাকে ঘিরে রেখেছে। মায়াময় প্রসবন।

অদ্ভুত খিলখিলিয়ে হাসা সঙ্গীটি এর আগে বাস্তবিকই গুহা দেখিয়েছে। মস্ত এক গাছ একটা অগভীর ঝিরির ওপর পড়েছে। সেই গাছ দিয়ে হেঁটে গেলে বায়ের উঁচু পাচিলের মত পাহাড়ে একটা গুহা বা খোপ। পাথরের ঐ খোপ দিয়ে উবু হয়ে ঢোকা চলে। উঁকি মেরে দেখলাম বামদিকে আরো গভীরে চলে গিয়েছে। কোন বাদুড় চোখে পড়লো না, এরা ধরে সাবড়ে দিয়েছে বললো।

গুহা

ওদিকে জুমঘরে যে বন বেড়ালটা ঝিমুচ্ছিল সে আমাদেরকে মোটেই আশা করেনি। তড়াক করে পালালো। খানিক জিরিয়ে লোকটা আমাকে এক সেতু দেখাতে নিয়ে চললো। যেয়ে দেখি আসলেই বাঁশ কাঠের একটা কিম্ভুত সেতু, ভেঙ্গেচুরে পড়েছে প্রায়। ফুট তিরিশেক গভীর খাদের ওপরে এই সেতু। এর আগের সেই গুহা এই নিচের খাদের অংশে পড়েছে, তবে গুহার ওখানে খাদ এত গভীর না। পড়ে চ্যাপটা হয়ে যাব ভেবে আমার সঙ্গী  বার বার সতর্ক করছিল। জায়গাটা দিব্যি ছায়াছায়া, তবে অসহ্য গুমোট। 

বিকাল

এদিকে এরকম খুদে ক্যাসকেড আছে কয়েকটা। সবগুলোই বাশঁবনে ঘেরা, বর্ষাকাল ছাড়া পানি বিশেষ হয় না। এমনই এক ক্যাসকেডে যাওয়ার পথে একদিন চোখে পড়েছিল পাথরের খাঁজে ফুটকি দেওয়া তিনটি ডিম। কি পাখির কে জানে। কিন্তু চমৎকার দৃশ্য।

পাড়া ছেড়ে আসার দিন হঠাৎ বাম পাশের পোড়া ঘাসের বন থেকে আচমকা দৌড়ে আসলো এক বনমোরগ। রোদে ঝলমল করছে। মোটর সাইকেলের শব্দে উড়ে পালালো। এই গোটা এলাকা যেভাবে বদলাচ্ছে তাতে ওকে আরো বহুদূর পালিয়ে বেড়াতে হবে।


Leave A Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *