২০১৮ সালের নভেম্বর মাস। আমেরিকার সিয়াটলের পর্বতারোহী ডন ওয়ারগোস্কির নেতৃত্বে নেপালের বরুণৎসে শৃঙ্গে অভিযান চলছে। এক মাসের অভিযানের আজ দশম দিন। বরুণৎসে শৃঙ্গ আরোহণের আগে দলটি মেরা (২১,২৪৭ ফুট) নামেরই একটি শৃঙ্গ আরোহণ করে ফিরছিল। এমন সময় তার সঙ্গে দেখা। কয়েকদিন আগেই তাকে নেপালি শহর কারে’তে দেখেছে। কিন্তু দলটিকে দেখে সে বিশেষ একটা পাত্তা দেয়নি। কত আরোহী আসছে কত যাচ্ছে, কে কার খবর রাখে; তখন ভাবটা ছিল এমন। কিন্তু আজ প্রায় ১৭,৫০০ ফুট উঁচুতে, ফিক্সড লাইনের ওপরে কোথা থেকে লেজ নাড়তে নাড়তে এগিয়ে এলো। হয়তো খাবারের আশায় বা অন্য কোনও আকর্ষণে। কিন্তু সে এর জন্য ক্রেভাস ভর্তি গ্লেসিয়ার পেরোনোর ঝুঁকি নিয়েছে। দলটি, চকচকে ঘন কালো লোমের স্ত্রী কুকুরটির নাম দিলো মেরা। সদ্য আরোহণ করা শৃঙ্গের নামে।

পর্বতারোহী দলের নেতা ওয়ারগোস্কির সঙ্গেই সবচেয়ে বেশি বন্ধুত্ব হল কুকুরটির। ওয়ারগোস্কি তাকে নিজের তাঁবুতে ক্যারিম্যাট আর জ্যাকেট দিয়ে সুন্দর বিছানা করে দিয়েছিল। এর পর প্রায় তিন সপ্তাহ দলপতি ওয়ারগোস্কির তাঁবু পার্টনার ছিল মেরা। টিবেটান ম্যাসিফ আর হিমালয়ান শিপ ডগের মিলনজাত মেরা খুব শান্ত, বুদ্ধিমান এবং অল্প খাবারে সন্তুষ্ট। মেরা শৃঙ্গ আরোহণের পর দলটি এবার বরুণৎসে শৃঙ্গ আরোহণের জন্য প্রস্তুত হলো।

‘একদিন সকালে খুব জোরে বাতাস বইছিল, তাঁবুর অ্যাঙ্কর উপড়ে ফেলেছিল প্রায়। আমাদের তাঁবু কয়েক ফিট হড়কে গিয়েছিল। মেরা শুধু একবার উঠলো, আমায় দেখলো, আবার ঘুমিয়ে পড়লো ও জানত আমি ওকে বিপদ আসলে ঠিক বাঁচাব। এতটাই আমাকে বিশ্বাস করা শুরু করেছিল’–ডন ওয়ারগোস্কি

Posted by Don Wargowsky on 2019 m. kovo 6 d., trečiadienis

.
দলটির শেরপারা যখন বরুনৎসের ক্যাম্প-ওয়ান (২০,১০০ ফুট) যাওয়ার পথটিতে রোপ ফিক্স করতে গেল, মেরা নিজে থেকেই শেরপাদের সঙ্গে গেলো। প্রথমে খাড়া বরফের দেয়াল, তারপর কিছুটা ন্যাড়া পাথুরে স্ল্যাবের ওপরে উঠে দেখতে লাগলো নিচে শেরপাদের কাজ। শেরপারা ঠিক মতো রোপ লাগাচ্ছে কিনা তারই তদারকি করতে এসেছে যেন। কিন্তু ফেরার সময় একটু মুস্কিল হলো। খাড়া ঢালু পথে সে বেইজ ক্যাম্পে নামতে পারলো না। আবহাওয়া খারাপ হয়ে আসছে, শেরপারা দ্রুত মেরাকে ছেড়েই বেইজ ক্যাম্পে ফেরার পথ ধরল। ক্যাম্প-ওয়ানে রয়ে গেল মেরা। হিমশীতল গ্লেসিয়ারের ওপর, অস্বাভাবিক ঠাণ্ডা ও জোরালো বাতাসের ঝাপটা সহ্য করে দুই রাত একা ক্যাম্প-ওয়ানে কাটাল মেরা।

দলনেতা ওয়ারগোস্কি নিশ্চিত ছিলেন যে মেরা মারা যাচ্ছে। শেরপারা যখন ক্যাম্প-ওয়ান থেকে ক্যাম্প-টু’র পথে রোপ লাগাতে গেলেন, তাঁদের ওয়ারগোস্কি বলেছিলেন, মেরা বেঁচে থাকলে ফিরিয়ে আনতে। কিন্তু তাঁকে ও শেরপাদের অবাক করেই মেরা ওই ঠাণ্ডায়, দুদিন না খেয়ে, খোলা আকাশের নিচে বেঁচে ছিল। শেরপারা মেরাকে খাবার দিয়েছিলেন এবং শেরপাদের আরও অবাক করে ক্যাম্প-ওয়ান থেকে ক্যাম্প-টু’ র পথেও মেরা উঠলো শেরপাদের সঙ্গে। তারপর আবার শেরপাদের সঙ্গে নেমে এলো ক্যাম্প-ওয়ান হয়ে সরাসরি বেইজ ক্যাম্পে।

মেরার পা রক্তাক্ত হয়ে গিয়েছিল। নখ ভেঙে গিয়েছিল। আঙ্গুলের গাঁট ফেটে গিয়েছিল। তাকে দেখে ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল দলনেতা ওয়ারগোস্কির। সঙ্গে সঙ্গে মেরার চিকিৎসা হলো। প্রথম প্রথম শেরপারা মেরাকে পাত্তা দিচ্ছিল না। দলনেতার আদর পাচ্ছে বলে মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছিল। কিন্তু আজ ক্যাম্প-ওয়ান থেকে ক্যাম্প-টু’ র পথে মেরার আরোহণ ক্ষমতা দেখে শেরপারা রীতিমতো ভালোবেসে ফেললো। তারা ওয়ারগোস্কিকে জানাল এর আগে তারা কোনও কুকুরকে মানুষের মতো রুট খুঁজে নিয়ে ক্লাইম্ব করতে দেখেনি। শেরপারা বললো মেরা বরুণৎসে অভিযানে দলটির সৌভাগ্যের প্রতীক। ও কুকুর নয় ঈশ্বর প্রেরিত কোনও দূত।

Posted by Don Wargowsky on 2019 m. kovo 6 d., trečiadienis

.
পরের দিন ওয়ারগোস্কি বেইজ ক্যাম্প থেকে তাঁর টিম নিয়ে ক্যাম্প-ওয়ানের পথে এগিয়ে গেলেন। কঠিন পথ, দুদিকেই হাজার ফুটের খাদ। খাদের দেওয়ালে তুষার জমা। ওয়ারগোস্কি মেরাকে বেইজ ক্যাম্পে বেঁধে দিয়ে গিয়েছিলেন। যাতে সে ওয়ারগোস্কির দলকে ফলো না করে। কারণ সে আহত। কিন্তু কোথায়, কী আধ ঘণ্টা যেতে না যেতেই মেরা আবার দলের সঙ্গে। গলায় বাঁধা দড়ি চিবিয়ে ছিঁড়ে চলে এসেছে। এবং ঠিক দলনেতা ওয়ারগোস্কির পিছনে পিছনে চলতে শুরু করেছে। অতি উৎসাহে এগোতে গিয়ে একবার পা ফসকে পড়ে যাচ্ছিল ৬০০ ফুট খাদে। ওয়ারগোস্কি এক হাতে রোপ ধরে, অন্য হাত দিয়ে ক্যাচ লোফার মতো লুফে নিলেন মেরাকে। কৃতজ্ঞতায় ওয়ারগোস্কির গাল একবার চেটে দিয়েই আবার ক্যাম্প ওয়ানের পথে দৌড় লাগায়।

বরুনতসে অভিযানে একরাত্রি ক্যাম্প ওয়ানে কাটিয়ে পর্বতারোহীরা ক্যাম্প-টুতে মুভ করেন। কিন্তু খারাপ আবহাওয়ার জন্য টিমটিকে ক্যাম্প ওয়ানে চার দিন থাকতে হলো। ওয়ারগোস্কি তাঁর স্যুপ, পাস্তা মেরার সঙ্গে ভাগ করে খেলেন। চারদিন পর টিমটি উঠে এলো ক্যাম্প-টু’তে।

৯ নভেম্বর, ২০১৮
ঘণ্টায় ৬০-৭০ কিলোমিটার বেগে হাওয়া বইছে। ২১০০০ ফুট উচ্চতার ক্যাম্প-টু থেকে রাত দুটোর সময় শৃঙ্গ আরোহণের জন্য দলটি যাত্রা শুরু করলো তখন মেরা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলো। ওয়ারগোস্কি একটু চাপমুক্ত। তিনি চাননি মেরা তাঁর সঙ্গে আরও ওপরে চলুক। ক্যাম্প-টু’তে রয়ে যাওয়া শেরপার কাছ থেকে পরে দলটি জেনেছিল, “বেলা পর্যন্ত ঘুমিয়েছিল মেরা, তারপর ঘুম ভাঙতেই দৌড়েছিল ক্যাম্প-টু থেকে শৃঙ্গে যাওয়ার দড়ি ফেলা পথটি চিনতে চিনতে।

সাত ঘণ্টায় ওয়ারগোস্কিরা যে পথ এসেছিলেন মাত্র দুঘণ্টায় সেই পথ চলে এলো মেরা। খাড়া গিরিশিরার ওপর দিয়ে পথ গেছে শৃঙ্গের দিকে। একটু পা হড়কে গেলেই হাজার হাজার ফুট নিচে মৃত্যু অপেক্ষা করছে। কিন্তু মেরার বিন্দুমাত্র চিন্তা আছে বলে মনে হলো না। দল ছেড়ে বেরিয়ে গিয়ে পথ দেখে আবার ফিরে আসছে। যেন সে একটু বিরক্তই হচ্ছে পর্বতারোহীদের মন্থর গতিতে।

Posted by Don Wargowsky on 2019 m. kovo 6 d., trečiadienis


‘আমার বুঝতে অসুবিধা হচ্ছিলো, সত্যিই কি মেরা এই পথে আগে এসেছে? এতো আত্মবিশ্বাস! আকাশ পরিস্কার, কিন্তু তাপমাত্রা মাইনাস কুড়ি। ৬০-৮০ কিলোমিটার গতিবেগ নিয়ে হাওয়া বইছে। আমার জীবনে আমার পায়ের নিচে এতো ঠাণ্ডা অনুভব করিনি। আমার দলের প্রত্যেকেই দামী এবং এভারেস্টে আরোহণের উপযোগী ডাউন-স্যুট এবং হেভি ডাবল বুট পরে ছিল। বুটের নিচে ছিল ক্র্যাম্পন। এছাড়া আইসঅ্যাক্স ও রোপ, হার্নেস, জুমার, ক্যারাবিনার আরও কত কী। কিন্তু মেরা কিচ্ছু না নিয়ে আলপাইন স্টাইলে আমাদের টেক্কা মেরে দিচ্ছে। তবে কিছু কিছু জায়গায় আমরা ওকে রোপে জুড়ে দিতে বাধ্য হয়েছি। ও রাজি ছিল না।’
–ওয়ারগোস্কি

শৃঙ্গের আগে শেষ গিরিশিরায় মেরা ওয়ারগোস্কির চেয়ে এগিয়ে গেল। এগিয়ে গিয়েও সামিট করলো না। যেন বলতে চাইলো তুমি আগে সামিট করো, তুমি দলনেতা। তারপর ২৩,৩৮৯ ফুট উঁচু বরুণতসে সামিট করলো মেরা। বিশ্বের কুকুরদের মধ্যে সেই প্রথম একটি স্বীকৃত টেকনিক্যাল শৃঙ্গ আরোহণ করলো এবং সর্বোচ্চ স্থানে উঠল। আশেপাশে বিশ্বের উচ্চতম ও নামীদামী কিছু শৃঙ্গ থাকায় এভারেস্টের দক্ষিণে অবস্থিত বরুণৎসে শৃঙ্গটি খুব একটা পরিচিত না। কিন্তু এই শৃঙ্গটি আরোহণ করা বেশ কঠিন। কিছু অংশে রোপ ফিক্স করা থাকলেও একটা বড় অংশ রোপ ছাড়াই আরোহণ করতে হয় মাউন্টেনিয়ারদের। শেরপার সাহায্য নিতে বাধ্য হন। কিন্তু মেরা নামের কুকুরটি প্রায় বিনা সাহায্যে শৃঙ্গে আরোহণ করে গোটা বিশ্বে তাক লাগিয়ে দিল।

Posted by Don Wargowsky on 2019 m. kovo 6 d., trečiadienis

Posted by Don Wargowsky on 2019 m. kovo 6 d., trečiadienis

.
যারা নেপালের পর্বতারোহণের পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য সংগ্রহ করেন, সেই হিমালয়ান ডাটাবেসের বিলি বায়ার্লিং জানালেন, ‘আমার জানা নেই আজ অবধি কোনও কুকুর নেপালের কোনও শৃঙ্গ আরোহণ করেছে কিনা’ বায়ার্লিংয়ের দেওয়া তথ্য থেকে দেখা গেছে, কিছু কুকুর এভারেস্ট বেইজ ক্যাম্প এবং কিছু কুকুর খুব বেশি হলে খুম্বু আইসফল পেরিয়ে ক্যাম্প-টু পর্যন্ত গেছে। এটাই সম্ভবত কুকুরদের সর্বোচ্চ স্থানে আরোহণের বিশ্বরেকর্ড।

লাকপা রিতা শেরপা, আল্পাইন অ্যাসেন্ট ইন্টারন্যাশনাল এর সিনিয়র গাইড, তিনিও অবাক, বরুণৎসে মাউন্ট রেনারের চেয়ে কঠিন পিক। আমি জানি না কিভাবে কুকুরটি বেশ কিছু কঠিন অঞ্চল পার হলো বিশেষ করে মাশরুম গিরিশিরা। দুই রাত ক্যাম্প-টুতে খোলা আকাশের নিচে সে কিভাবে বাঁচলো। ওই উচ্চতায় মানুষের অল্টিটিউড সিকনেস, চূড়ান্ত অবসন্নতা, মাথা ব্যথা, বমি ও পালমোনারি ও সেরিব্রাল ইডিমার শিকার হয়।

Posted by Don Wargowsky on 2019 m. kovo 6 d., trečiadienis


‘টিবেটান ম্যাস্টিফ আর হিমালয়ান শিপ ডগের সঙ্কর হওয়ায় মেরা এতো উচ্চতায় সহজে খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছে ’
– মার্থ টিসকট ভ্যান পাটট (পালমোনারি সাইকলজিস্ট)

মেরা একমুহূর্তে সেলিব্রেটি হয়ে গিয়েছিল। কত পর্বতারোহী দেখতে আসছিলেন বরুণৎসে ক্লাইম্ব করা মেরাকে। অনেকে বিশ্বাস করছিলো না। কিন্তু টিমটি পুরো আরোহণ পর্ব ক্যামেরায় ধরে রাখে।

টিমটি ফিরে এসেছিলো লুকলায়। সেখান থেকে বিমানে কাঠমন্ডু ফিরবে। রাস্তার কুকুরদের হোটেলে ঢুকতে দেওয়া হয় না। কিন্তু মেরাই সেই আইন ভাঙল। ওয়ারগোস্কির বিছানায় শুলো।

কিন্তু ওয়ারগোস্কির টিম কাঠমন্ডু ফিরবে। পথের কুকুর মেরা আবার পথেই রয়ে গেলো।

ওয়ারগোস্কি জানিয়েছিলেন, আমর ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল মেরাকে ছেড়ে যেতে। কিন্তু মেরাকে বিমানে নেওয়া যাবে না। ও ওর জায়গা ছাড়া বাঁচবেও না। তাই বেইজ ক্যাম্প ম্যানেজার কাজি শেরপার সাহায্যে একজনকে ১০০ ডলার দিলাম। যে কাঠমান্ডু যাওয়ার বাস ধরিয়ে দেবে। মেরা এখন কাঠমন্ডুতে কাজির বাড়িতে। তার নাম এখন বারু।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *