টিম হোয়াইট এক্স: দেও তিব্বা পর্বতাভিযান

প্রতিবেদনটি আসিফ আলতাফ ও তাসকিন আলী সম্মিলিতভাবে লিখেছেন। 


প্রথম দিন

পাহাড় ধসের কারণে অনেক জায়গায় রাস্তা বন্ধ থাকায় আমাদের মানালী পৌঁছাতে খানিকটা বিলম্ব হয়। পরিকল্পনা ছিল মানালীতে দরকারী কেনাকাটাগুলো শেষ করে পরদিন পাতালসু ট্রেক করতে যাব। কিন্তু টানা বৃষ্টি হওয়ায় এবং দেরি হয়ে যাওয়ায় প্রথম দিন কিছুটা ঘুরোঘুরি করেই সময় কেটে যায়। প্রথম দিন আমরা নিজেদের সরঞ্জাম গুছিয়ে নিতে ব্যস্ত ছিলাম। ফারআউট হিমালয়া নামে একটা অ্যাডভেঞ্চার ফার্মের সাথে যোগাযোগ করে সব ঠিকঠাক করি। বলে রাখা ভাল আমাদের টিম লিডার আসাদ ভাইয়ের পুরনো বন্ধু প্রাশান্ত, ফার্মের একজন কর্ণধার। এর আগে ফ্রেন্ডশিপ পিক অভিযানেও এদের সহযোগিতা নিয়েছিলেন। ওই ফার্মের আরেকজন কর্ণধার বিক্রম আমাদেরকে দুই জন গাইডের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। আমাদের সঙ্গে এই অভিযানে যাচ্ছে তিকাম ও মাইকেল।

প্রথম দিন আমরা আমাদের অভিযানের জিনিসপত্র সব পরীক্ষা করে ঠিক করে নিচ্ছিলাম। জিনিসপত্র ঠিকঠাক করার সময় একটা জিনিস সবার মাথায় ঘুরতেছিল। আমরা এতো ওজনের ব্যাগ নিয়ে কি এতো উপরে এবং এতো লম্বা সময় ধরে ট্রেক করতে পারব কিনা। কারণ আমরা এবার কোন পোর্টার নিচ্ছি না। আর সবাই আত্নবিশ্বাসী ছিল নাকি তখন বোঝা যাচ্ছিল না। কিন্তু এক জন আরেক জনের মুখের দিকে তাকিয়ে হ্যাঁ বলেই দিল। আমি শুধু বললাম যে দেখে নিবো। মনের ভিতরে একটা জিনিস খোঁচা দিচ্ছিল, হাঁটুর পুরোনো ইনজুরিটা জানি না আমাকে কতটুকু ভোগাবে।

দ্বিতীয় দিন

আগের রাতে জাগার ফলে সকাল ৮ টার বদলে ৯ টায় ঘুম থেকে উঠলাম। নাস্তা করতে গেলাম বিক্রমের অফিসের উপর তলায়, বাবাজির রেস্তোরাঁয়। মানালীতে একটা জিনিস আমার খুব চোখে পড়ল, মোটামুটি সব রেস্তোরায় সাইকাডেলিক গান বাজে। নিজে এধরনের গানের শ্রোতা হওয়ায় যেদিকেই যাচ্ছিলাম সেখানেই ভাল্লাগছিলো।

নাস্তা শেষ করে আমরা সরকারি বনের ভেতর দিয়ে হাঁটা দিয়ে মলরোড গেলাম অভিযানের রসদ কেনার জন্য। বাজারে পৌঁছার পর থেকে শুরু হইল অপয়া বৃষ্টি। টের পেলাম আমার রেইন্ কোটের ভিতরে পানি ঢুকে যাচ্ছে। বুঝলাম এই ব্যাপারটা ব্যাপক আনন্দের হবে না। ৩ ঘণ্টা ধরে জিনিস পত্র কিনে অবশেষে হোটেলে ফিরলাম।

আমরা প্রায় ১২-১৩ দিনের রসদ নিয়ে অভিযানে যাওয়ার পরিকল্পনা করছি। ফেরার পথে বিক্রমের অফিসে সব রেশন রেখে গেলাম। আজকে সন্ধ্যায় সবচেয়ে বড় কাজ করতে হবে। ব্যাকপ্যাকের ভিতরে সব আটাআটি করে গোছাতে হবে। সবাই ৬ টার ভিতর বিক্রমের অফিসে গেলাম ব্যাগ গুছাতে। সব ঠিকঠাক মতো প্রস্তুত করতে করতে রাত ১০ টা বাজল। প্রত্যেকের ব্যাকপ্যাকের ওজন ২০-২২ কেজির কম না। এর মধ্যে এক জোড়া আইস বুট, আইস এক্স, ক্রাম্পন, হারনেস, হেলমেট, গাইটার, রোপ, একটা স্লিপিং ব্যাগ, শীতের কাপড়, জ্বালানি, খাবার সব মিলিয়ে একদম টাইটাই অবস্থা। এর মধ্যে সাদমান নিজের ব্যাগ নিয়ে দুই তিনবার ট্রায়াল দিল। ওর শরীরের তুলনায় ব্যাগটা বেশিই ভারী মনে হচ্ছিল। জনৈক এক অভিজ্ঞ ভদ্রলোক সাদমানকে কিভাবে ব্যাগ নিতে হবে বুঝিয়ে দিচ্ছিলো। আসাদ ভাই তাঁবু নেওয়ায় উনার ব্যাগ সবচেয়ে বেশি ভারী ছিল। সব শেষ করে ঐদিন রাতে সবাই সবার প্রিয় মানুষগুলার সাথে কথা বলে নিচ্ছিল। আমিও বাদ যাইনি। অনেক উত্তেজনার মধ্যে কিছুটা খারাপ লাগা ছিল। ঘুমোতে গেলাম কিছুটা দুশ্চিন্তা নিয়ে।

তৃতীয় দিন

দিনটা ছিল আসলে অভিযান শুরুর প্রথম দিন। সকাল ৬টায় যখন ঘুম থেকে উঠি তখনও দেখলাম রোদ। ফার আউটের গোডাউনে গিয়ে সব মালামাল একটা বোলেরো পিকাপ ট্রাকে লোড করলাম। এরপর খাঁটি বাংলা চাল-ডাল দিয়ে নাস্তা করলাম। অন্যরা ডিম পরোটা খেল। অনেক দিন খাবো না এরকম কিছু, তাই কষ্টে আমি দুই গাইডের সাথে চাল-ডাল দিয়ে নাস্তা সারলাম।

যাত্রা শুরু করেছিলাম ৯:৩০ মিনিটে। ড্রাইভারসহ ৭জন কোন ভাবে বসতে পেরেছিলাম। প্রচণ্ড বাজে রাস্তা থাকলেও জানালা দিয়ে ভিডিও করতে ব্যস্ত ছিলাম আমরা। ১ ঘণ্টা যাত্রা করার পর আমরা হাইড্রো ড্যাম্পে পৌঁছাই। মনে হচ্ছিলো একেক জনের কল কব্জা খুলে গেছে।

ট্রেক শুরুর ২০ মিনিটের ভিতরে আমার দুইটা পোলের জয়েন্ট খুলে গেলো। সবার ভাল রিভিয়ুর পরেও নেচার হাইকের পোল আমার বিশ মিনিটের ধকল নিতে পারল না কেন বুঝলাম না। ভাগ্য ভালো সাদমানের পকেটে কোনো কারণে প্রায় শেষ হয়ে যাওয়া সার্জিক্যাল টেপ ছিল। ঐটা দিয়ে জোড়া দিলাম আর ভিতরে কাগজ ঠুসে দিয়ে গেটিস দিলাম। সবার সামনে ঐদিন আমি আমার সাথেই প্রায় সাদমান আর পিছনে আসিফ আর আসাদ ভাই। এই সিরিয়াল ধরে চলছিলাম। একেকজন ৩০ মিটার দূরে। সামনে ছিল মাইকেল। তিকাম একেকবার একেক পজিশনে যাচ্ছিলো। ঘুরে ঘুরে সবার খেয়াল রাখছিলো।

আমাদের ট্রেক শুরুর পর চকচকা রোদ থেকে আকাশ কালো হতে দেড় ঘণ্টা সময় নিল। তারপর শুরু হলো কনকনে ঠাণ্ডায় ঝিরঝির বৃষ্টি। সাড়ে তিন ঘণ্টা পর আমরা চিক্কায় পৌঁছে ভাবলাম এইটাই হয়তো সবচে বাজে রাস্তা যেতে। বান্দরবানের মতো কাদা। পুরো বৃষ্টির মাঝেই তাঁবু গাড়লাম। আমার ততক্ষণে হাঁটুতে প্রথম ধকলের ব্যথা শুরু। তাঁবু পিচের পর আমার দায়িত্ব ছিল ট্রেঞ্চ খোদাই করা। প্রথম দিন মাটি খুঁড়ে হাত ভালোই ধরেছিলো। দায়সারা ভাবে প্রি-মেইড পরোটা দিয়ে দুপুরের খাবার সারলাম সবাই। দুই তাঁবু, কিন্তু ২, ৪ ফরমেশনে থাকছিলাম। দুই গাইড এক তাঁবুতে। আর আমরা ৪ জন এক তাঁবুতে।

বৃষ্টিতে সবাই ভিজে একাকার হওয়ায় প্রবল চিন্তায় পড়লাম, ভেজা কাপড়ে কিভাবে পার করবো ১ দিন। তখন বুঝিনি প্রতিদিন এই ধকলটা নিতে হবে। যাই হোক মানসিকভাবে শক্ত করতে এই ব্যাপারটা হেল্পফুল ছিল। প্রথম দিনের ট্রেকিং বিধায় ৪ জনের ঢাউস সাইজের ব্যাগ সহ কিভাবে তাঁবুতে থাকবো ঐটা নিয়ে ভালোই চিন্তায় ছিলাম। সবাই তাঁবুতে ঢুকার পরেও আমি পঞ্চ পরে বাহিরে হাঁটাহাঁটি করছিলাম। দেখছিলাম ঠাণ্ডাটা কি পরিমাণ সহ্য করা যায়। ১৫ মিনিটের ভিতর শিক্ষা হয়ে গেল। ঢুকে পড়লাম তাঁবুতে। খেয়াল করলাম ট্রেকিংয়ের ইনার উপরেরটা নিচেরটা সবই ভিজে গেছে। প্রথমবার ঠাণ্ডা ওয়েদারে এক্সপেডিশন হওয়ায় এইটা অনেক বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াল আমার মাথায়। কারণ রাতে স্লিপিং ব্যাগে ঠাণ্ডা কাপড় পরে ঘুমায়ে কাপড় শুকাতে হবে নিজের বডি টেম্পারেচার দিয়ে। এভাবেই শুরু হল সবার প্রথম দিনের ধকল।


ছবি: টিম হোয়াইট এক্স


একেকজনের ঘাড় বিকলাঙ্গের মত লাগছিলো। আসাদ ভাই কাঁপতে কাঁপতে স্লিপিং ব্যাগে ঢুকে গেলো। অনেক আলসেমির পর একজন একজন করে প্রাকৃতিক কাজে সারা দেয়া শুরু করল। কপালে চিন্তার ভাঁজ। এখনো সময় আছে চিক্কা থেকে একটু পিছনে একটা উঁচু জায়গায় গিয়ে বিক্রমকে ফোন দিয়ে ঘোড়া ম্যানেজ করা যায় নাকি। সবাই এতটাই টায়ার্ড হয়েছিল যে মনোবলে কিঞ্চিৎ চিড় ধরে গিয়েছিলো। দুর্ভাগ্য না সৌভাগ্য বলতে পারবো না, আমরা ওই উঁচু জায়গাটায় গিয়ে নেটওয়ার্ক পাইনি। আসাদ ভাই এবং মাইকেলকে পাঠানো হয়েছিল। আলো কমে আসায় আসাদ ভাই কাঁটা গাছে এক গাদা কাটার খোঁচা খেয়ে তাঁবুতে ফিরত আসলো। আমি আর আসিফ প্রথম দিনের ফটো সেশন নিয়ে তাঁবুর আশেপাশে ঘুরাঘুরি করলাম। অন্ধকার নামার পর সবাই তাঁবুতে চলে গেলাম। রাতের খাবারে জুটল সুপ্ নুডলস। রাঁধুনি দলনেতা আসাদ ভাই আর হেল্পার সাদমান। খাওয়া শেষে কিছু আজাইরা পেচালের পর গেলাম ঘুমাতে। আমার আর সাদমানের কিঞ্চিৎ শখ জাগলো রাতেও একবার বের হবো। যাইহোক ৫ মিনিটের জন্য বের হয়ে শিক্ষা হয়ে গেলো। আবার ঢুকে গেলাম তাঁবুতে। কোনভাবে জায়গা নিয়ে, দিলাম ঘুম। সকালে উঠে সব গোছাতে হবে আবার। রওয়ানা হবো সেরির জন্য, আপাতত এটাই পরিকল্পনা।

চতুর্থ দিন

ভোর ৬ টায় ঘুম থেকে উঠার পরিকল্পনা থাকলেও প্রথম দিনের ধকল কাটিয়ে উঠতে উঠতে আমরা ৭টা বাজালাম। উঠেই গত দিনের ধকল টের পেতে শুরু করলাম। শরীরের প্রত্যেকটা কলকব্জা মনে হচ্ছিলো ঢিলে হয়ে গেছে। কিন্তু আনন্দের বিষয় ছিলো চকচকে রোদ। সবাই আগের দিনের ভেজা জিনিসপত্র শুকাতে দিলাম। ওটসের মতো বিশ্রী জিনিসটা খেয়ে রওনা দিলাম, উদ্দেশ্য সেরি।

যেতে যেতে মাইকেল বললো ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা লাগবে যদি ওদের মতো হাঁটি। কিন্তু আমাদের যে অবস্থা মনে হচ্ছিলো কমলাপুরের কুলির মতো ঘাড় একটু মনে হয় নিচে নেমে গেছে। মোটামুটি সহজ ট্রেকের জায়গাটা পার হওয়ার পর আস্তে আস্তে সরু কাদা মাখা চড়াইয়ের জায়গাগুলো শুরু হলো। দেখে মনে হচ্ছিলো যে মেসি নেইমাররা এইখানে কিছুক্ষণ আগে ফুটবল খেলে গেছে। কিছুক্ষণ পর বুঝতে পারলাম এইটা ঘোড়া আর গাধার কাজ। কতগুলা গ্রুপ নিচে নেমে আসবে ওই জন্য চিক্কা থেকে আগের কয়েক দিন বেশ কয়েকটা ঘোড়া গাধা গেছে। এই জন্যই এমন অবস্থা। ৩ ঘণ্টা ট্রেক করার পর আমরা এতটাই হাঁপিয়ে গিয়েছিলাম যে মনের মধ্যে বান্দরবান ঘুরতেসিলো যে এতো কষ্ট তো বান্দরবানের জোঁক বেষ্টিত কাঁদাতেও হয় নাই। মাঝখানে এক জায়গায় অনেকক্ষণ আমরা ক্ষীণ আশা নিয়ে এক ঘোড়াওয়ালার সাথে কথা বললাম। শরীরের কলকব্জার অবস্থা অনেক বেশি খারাপ হওয়ায় এক বুক আশা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম যে, ঘোড়ার বেপারি হয়তো ২ টা ঘোড়া দিতে পারবে। গোটা কয়েক স্নিকার আর সল্টেড বাদাম খেয়ে সময় নষ্ট করার পর বুঝতে পারলাম, না হবে না। বেপারী আগেই বুকড হয়ে আছে। অগত্যা আমরা রওনা দিলাম। ততক্ষণে আবার বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে।

আবারো ভিজতে ভিজতে কিছুদূর এগিয়ে মাইকেলকে জিজ্ঞেস করলাম ‘বস অউর কিত্না দূর’ মাইকেলের উত্তর শুনে আমার মাথা কিছুটা চক্কর দিয়ে উঠল। বলল আরো ৫ ঘণ্টা। মুখ দিয়ে কোলা ব্যাঙয়ের মতো একটা আওয়াজ বের হইল। হাসপাতালের রোগীর মতো ভয়েসে জিজ্ঞেস করলাম ‘সেরির আগে কোন জায়গা আছে ক্যাম্প করার?’ বলল, পাণ্ডুরূপা। যেতে নাকি ২ ঘণ্টা লাগবে। আমি মনে মনে শপথ করে নিলাম যেভাবেই হোক আসাদ ভাইকে রাজি করতে হবে। গিয়ে বললাম ভাই পাণ্ডুরূপাতে ক্যাম্প করি। নাহলে আমি মনে হয় আর বাঁচব না। সবাইকে জানানোর পর মোটামোটি এক কথায় রাজি হয়ে গেল।

২ ঘণ্টার মধ্যে আমরা খুশি মনে বৃষ্টিতে ভিজে চিপচিপে হয়ে পাণ্ডুরূপা পৌঁছে ক্যাম্প করলাম। দ্বিতীয় দিনে বৃষ্টি কিছুটা গা সয়া হয়ে গিয়েছিলো। সমতল একটা জায়গা। পানি নেওয়ার জায়গাটা একটু দূরেই ছিলো। এতই ক্লান্ত ছিলাম যে কোন ভাবে ক্যাম্প করেই সবাই কাত। কোন ছবিও তোলা হয়নি ওই জায়গায়। একপাশে খাল আর আরেক পাশে পাথরের পাহাড়, খাড়া পাহাড়। এর মধ্যে সাদমানের ইচ্ছে হল পাহাড়ের নিচে একটা ছোট্ট গুহার মতো দেখা যাচ্ছে সেখানে ক্যাম্প করবে। এমনিতেই বৃষ্টিতে অনেক জায়গায় পানি জমাট বাধা ছিলো। সাদমানের আবদার শুনে ইচ্ছে হল ওকে খালে ঢিল দিয়ে ফেলে দেই। যাই হোক মোটামুটি আলসেমি আর রান্না করেই সন্ধ্যা হয়ে গেলো। আগেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম সেদিন।

পঞ্চম দিন

গতদিনের পরিকল্পনা অনুযায়ী আমাদের আজকের গন্তব্য সেরি। দিনের শুরুটা ছিল সুন্দর। রৌদ্রস্নাত নীল আকাশ। বরাবরের মতন সাদমান তার ব্যাগ গুছানোর পর আবার সব বের করে গুছানো শুরু করল। গত তিন দিন ধরে তার এই কাজ দেখে আমরা নিজেদেরকে মানিয়ে নিয়েছি।

তাড়াতাড়ি সকালের নাস্তা শেষ করে আমরা রওনা দিলাম আমাদের গন্তব্যে। ট্রেইল ছিল মোটামুটি কাদামাখা। প্রায় ৩ ঘণ্টা ট্রেক করে আমরা একটা ব্যারেন ল্যান্ডে চলে আসলাম। জায়গাটা মোটামুটি সমতল এবং মোরেইনে ভরা। সমতল জায়গা দেখে আমরা মোটামুটি খুশি হলাম। কিন্তু এই আনন্দ নিমিষে উড়ে গেল আমদের গাইডের কথা শুনে।

দীর্ঘ সময় ধরে একটানা হাঁটার কারণে আমরা এই জায়গায় একটু বিরতি নিয়েছিলাম। এই সময় মাইকেল বলল, আমাদের একটা ছড়া পার হতে হবে। ব্যাপারটা আমাদের জানা ছিল। কিন্তু পানির স্রোত এতটা হবে, এটা আমাদের ধারণা ছিল না। এতটা হিম শীতল ছড়া আগে পার হওয়ার কোন অভিজ্ঞতা ছিল না কারও। আমরা একে একে ছড়া পার হওয়া শুরু করলাম। অল্পের জন্য আসিফ প্রায় তার জুতা হারাতে বসেছিল। ছড়া পার হওয়ার সময় জুতা ওপারে ছুড়ে মারতে গিয়ে জুতা পানিতে পরে যায়। মাইকেল কোন মতে ঝাপ দিয়ে জুতাটা ধরতে সক্ষম হয়। আমি দূরে দাঁড়িয়ে পুরো ঘটনাটা দেখছিলাম।

আমি মোটামুটি নিশ্চিত ছিলাম যে আমি পানিতে পড়ে যাব । যাই হোক, কোন ধরনের দূর্ঘটনা ছাড়াই আমরা অবশেষে ছড়াটা পার হলাম। আবার বৃষ্টিতে কাক ভেজা হয়ে তাঁবু পিচ করলাম। ঐদিন থেকে আগের কোন কিছু নিয়ে আমাদের কোন অভিযোগ নেই। আমরা সব কিছু মেনে নিতে প্রস্তুত। এর থেকে খারাপ হওয়ার আর কিছু নেই কপালে। আমরা সেরিতে পৌঁছানোর পর থেকে টানা বৃষ্টি হচ্ছে। তাঁবুতে বসে গল্প করা আর খাওয়া দাওয়া ছাড়া খুব একটা বেশি কিছু করার নেই। ওইদিন রাতে খুব তারাতারি সবাই ঘুমিয়ে গেল।

ষষ্ঠ দিন

দিনের শুরুটা খুব একটা আশাব্যঞ্জক ছিল না। গত রাতে আসাদ ভাইয়ের বাম কাঁধে অনেক ব্যথা ছিল। কোনভাবে সে তার বাম কাঁধ নাড়াতে পারছিলেন না। সিদ্ধান্ত নিলাম আজকের দিনটা আমরা সেরিতে থাকব। অবশেষে প্রায় ১১ টার পর বৃষ্টি থামল। এর মধ্যে আমরা দেখলাম তিন্তা থেকে দুটো টিম নেমে আসছে। এর মধ্যে একটা ফ্রেঞ্চ টিম আরেকটা কলকাতার। ফ্রেঞ্চ টিমের অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে তারা কেউ কথা বলার অবস্থাতে ছিল না। তাদের অবস্থা দেখে, আরও খারাপ পরিস্থিতি যে সামনে অপেক্ষা করছে এটা বুঝতে দেরি হল না।

কলকাতার দলটি বলল, তাঁরা ধুয়াঙ্গন কোলের উপরে একটা ক্যাম্প করেছিল। গতকালের ঝড়ে তাঁদের অবস্থা বেগতিক হয়ে গিয়েছিল। তাই সোজা আজ যতটা সম্ভব নিচে নেমে যাবে। বেইজ ক্যাম্পে আর মাত্র ২ টা টিম আছে । এদের মধ্যে একটা টিম শেষ একবার চেষ্টা করবে। তাঁদের মতে আমরা ভুল সময়ে দেও তিব্বার জন্য চেষ্টা করছি।

দুপুরে আমরা আশেপাশের পরিবেশ দেখতে বের হলাম। একটা সমতল ভূমির চারপাশে বিশাল বিশাল রক ফেস। থেকে থেকে কিছুটা রঙ তুলির আঁচড় দেওয়া সবুজ। তার সাথে সূর্য মামার মেঘেদের সাথে লুকোচুরি আর রংধনুর আভা সব মিলিয়ে একটা স্বর্গীয় সৌন্দর্যের আবহ তৈরি করেছে। গত ৫-৬ দিনের মধ্যে সব থেকে ভাল একটা বিকাল পার করলাম আমরা।


বাকি অংশ এখানে। 

(Visited 1 times, 1 visits today)

মন্তব্য করুন

*Please Be Cool About Captcha. It's Fun! :)