হিম ফুলের উপত্যকায়


এটা ছিল আমার হিমালয়ে প্রথম ট্রেকিংয়ের  অভিজ্ঞতা। প্রায় তিন  বছর আগে বিবিসিতে ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স নিয়ে চার মিনিটের একটা  ডকুমেন্টারি ফিল্ম দেখেছিলাম, তারপর থেকেই জায়গাটা সম্পর্কে খোঁজ খবর নেওয়া শুরু করলাম। যতই খোঁজ নিচ্ছিলাম ততই অবাক হচ্ছিলাম। ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স আবিষ্কৃত হয় ১৯৩১ সালে। ফ্রাঙ্ক স্মিথ ১৯৩১ সালের জুলাই মাসে মাউন্ট কামেটে সফল অভিযান শেষে ফেরার সময় ভারী বর্ষণের কবলে পরেন। পথ হারিয়ে তিনি তখন ভিউন্দর উপত্যকায় এসে উঠেন। তখন তিনি এই উপত্যকায় নানা রংবেরঙের ফুল দেখতে পান। তারপর থেকে তিনিই Bhyundar valley-কে valley of flower নামকরন করেন। ১৯৩৩ সালে তিনি এই অদ্ভুত ফুলের উপত্যাকা নিয়ে লিখেন ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার নামে বিখ্যাত এক বই।

আমার কাছে অবাক লেগেছে এমন অ্যাল্পাইন অঞ্চলে (যার গড় উচ্চতা ৩৩৫০ মিটার থেকে ৩৭০০ মিটার) কিভাবে ৫২১ প্রকারের লতা, গুল্ম ও ফুলের গাছ জন্মায় ! যার মাঝে আবার বেশির ভাগই ঔষধি গুণ সম্পন্ন। যতই এর ব্যাপারে জেনেছি এখানে যাওয়ার জন্য আগ্রহ ততই বেড়ে গেছে।মোটামুটি সহজ হওয়ার কারণে সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেললাম আমার হিমালয়ের প্রথম ট্রেক ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ারেই করব। প্রকৃতির অদ্ভুত খেয়ালে খুব অল্প সময়ের জন্য ফুলগুলো থাকে বিধায় তিন বছর ধরে সময় ও  সুযোগ এক করা যাচ্ছিল না। তথ্যমতে ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ারে ফুল ফুটে জুলাইয়ের শেষে ও  আগষ্টের প্রথম সপ্তাহে।  এবার আমার ভিসার মেয়াদ ছিল আগষ্টের ১২তারিখ পর্যন্ত তাই সিন্ধান্ত নিয়ে ফেললাম জুলাইয়ের শেষ সাপ্তাহে যাব। আমার রওনা দেই ২৮ তারিখ রাতে।

এই যাত্রায় আমার ট্রেকমেট হয় আরিফ।  আরিফ আগে  থেকেই যশোর যাওয়ার জন্য চিত্রা এক্সপ্রেস ও হরিদ্বার যাওয়ার জন্য  ২৯ তারিখ রাতের দূন এক্সপ্রেসের টিকেট কনর্ফাম করে রেখেছিল। ২৮ তারিখ সন্ধ্যার চিত্রা এক্সপ্রস  ভোর চারটার কিছু আগেই আমাদের যশোরে পৌঁছে দেয়। সকাল ৮ টার দিকে ইমিগ্রশন সম্পন্ন করে ইন্ডিয়ার স্থলভাগে পৌঁছে যাই। কলকাতার শ্যামবাজারে শুভদ্বীপ দার বাসায় বিশ্রাম নিয়ে সন্ধ্যায় বেড়িয়ে পরি। বড়বাজারে কিছু কেনাকাটা করে, যখনি হওড়া রেল স্টেশনে যাব, তখন দেখি রাস্তায় খুব জ্যাম। কোন উপায় না পেয়ে হেঁটেই চলে গেলাম হাওড়া।



ট্রেন ৬ ঘণ্টা লেট করে সকাল ১১টায় রাইওয়ালা নামিয়ে দিল। যারা সাধারণত বদ্রীনাথ রোডে যাতায়াত করে তারা হরিদ্বার নেমে বাসে উঠে যায়। আমাদেরকেও বদ্রীনাথের বাসে ধরতে হবে। কিন্তু আমরা রাইওয়ালা নেমেই আরেক ট্রেনে ঋশিকেশ পৌঁছালাম। কেননা হরিদ্বারের বাসগুলি ঋশিকেশ হয়েই বদ্রীনাথ যায়।  বর্থীনাথের বাস স্টপে গিয়ে মাথায় হাত। রাস্তা নাকি বন্ধ, তবে সাবই বললো চাম্বা হয়ে গেলে একটু ঘুরা হবে তবে যেতে পারবেন। চাম্বা হয়ে শ্রীনগররের বাসে উঠলাম। (উত্তরাখাণ্ডেও শ্রীনগর নামে জেলা আছে)। শ্রীনগর যেতে রাস্তায় দেখালাম বিশাল এক লেক। পড়ে জানলাম এইটা তেহেরী লেক। এখানে ড্রেম বানিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা, তাই কৃত্রিম লেকের সৃষ্টি হয়েছে। আবার সেই বিদ্যুৎ উৎপাদন (NTPC) কোম্পানি।  কিছুদিন আগেও  রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে  শ্লোগান দিয়েছিলাম, Go Back NTPC, Go Back India। সেই কথাও মনে পরে গেল। বাসে একদল ট্রেকারদের সাথে পরিচয় হল সবার বয়স প্রায় ৫০-৬০+ তারচেয়ে ভাল কথা হল তারা সবাই কলকাতা থেকে এসেছে এবং উনারাও ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ারে যাবেন।  হিমালয়ের রাস্তায় ডানে-বামে দুলতে-দুলতে  আর দাদাদের সাথে কথা বলতে বলতে বলতে সন্ধ্যায় শ্রীনগর পৌঁছলাম।

পরদিন সকাল ৬টায় একটা বাস আছে জসিমঠ পর্যন্ত যাবে। ওখান থেকে আবার গোবিন্দঘাট প্রায় ২০ কিলোমিটার অন্য গাড়িতে যেতে হবে। তা মেনে নিয়ে অন্য গাড়ি না খুঁজে এই  বাসের টিকেট কনর্ফাম করে হোটেলে উঠে পরলাম। ফ্রেশ হয়ে ঘণ্টাখানেক রেস্ট নিয়ে কিছু শীতের জামা কিনতে গেলাম। জামাকাপড় কিনে  খাওয়া-দাওয়া করে  রুমে এসে  শুয়ে পরলাম ঠিকই কিন্তু ঘুম আর হল না। যথারীতি সকালে বাসে ছাড়লো, জসিমঠের উদ্দেশে। রাস্তা মাশাল্লা, ৯০ ডিগ্রি ডানে ৯০ডিগ্রি বামে উপর নিচে, রোলার কোস্টারের মত বাস চলতে লাগলো। রুদ্রপ্রয়াগ এসে সকালের নাস্তা সেরে ফেললাম।  বাস চলছে তো চলছেই। এদিকে আমাদের আরিফ  অনেক্ষণ ঘুমিয়ে হঠাৎ বলে উঠলো ‘এ কেমন জায়াগায় যাচ্ছি যে চার দিন হয়ে গেল এখনো পৌঁছাতেই পারলাম না?’

কর্নপ্রয়াগ, চামোলি পেরিয়ে দুপুর ১:২০ মিনিটে জসিমঠ পৌঁছলাম। মাঝে আরো কিছু জায়গা ছিল যার নামের শেষে প্রয়াগ আছে। এক জনকে জিজ্ঞেস করলাম ‘প্রয়াগ’ মানে কি? তিনি বললেন, “দুই নদীর মিলনস্থলকে প্রয়াগ বলে”। কলকাতার ট্রেকারা নাকি অলি যাবে, যা স্কি করার জন্য বিখ্যাত, সাথে ক্যাবল কারের জন্যও। আমাদের জিজ্ঞেস করল, যাবো কি না। এখন যেহেতু স্নো নেই তার উপর ২টার পর গোবিন্দঘাট থেকে গাঙ্গারিয়া বেইজ ক্যাম্পে উঠতে দিবে না,  সে জন্য আমরা  অলিতে যাবো না বলে ঠিক করি। যেখানে বাস নামিয়েছে সেখানেই  ট্যাক্সি স্ট্যান্ড। দাদাদের বিদায় দিয়ে আমরা গোবিন্দঘাটের জন্য শেয়ার ট্যাক্সিতে উঠে পরলাম। যাত্রী ভরতে একঘন্টার মত লেগে গিয়েছিল, সেই ফাঁকে খাওয়া-দাওয়ার পাঠ চুকিয়ে ফেললাম। গোবিন্দঘাট পৌঁছাতে আমাদের প্রায় ৩টা বেজে গেল।


গাঙ্গারিয়া বেইজ ক্যাম্প। এখান থেকে সাধারণত সবাই হেমকুন্ড আর ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার যায়। এখান থেকে হেমকুন্ড ৬কিমি আর ভ্যালী অফ ফ্লাওয়ার ৩কিমি। ছবিটি হেমকুন্ড যাওয়ার সময় তোলা।


প্রবেশদ্বারে যিনি এন্ট্রি করেন তিনি বলেলেন আজকে আর হবেনা বেলা ৩ টা বেজে গেছে। অনেক অনুরোধ  করাতে জিজ্ঞেস করলেন, আমাদের সাথে লাইট আছে কি না? বললাম আছে। তার পরেও উনি লাইট দেখলেন। নাম এন্ট্রি করে একটা বারকোড স্টিকার কার্ড  লাগিয়ে দিলেন সাথে ছবি তুলে রাখলেন। গোবিন্দঘাট থেকে গাঙ্গারিয়া বেসক্যাম্প ১৩কিমি। প্রথম ৪কিমি জীপ যায়, তারপর থেকে ট্রেক শুরু। যারা ট্রেক করতে ইচ্ছুক নন তাদের খচ্চর দিয়ে যাওয়ার ব্যাবস্থা আছে। লক্ষনগঙ্গার পাশ দিয়ে আমাদের ট্রেক শুরু হয়, গোধূলী লগনে লক্ষনগঙ্গার পাশের জঙ্গল দিয়ে মেঘের খেলা  আর বিশাল বিশাল ঝর্ণার দুধ সাদা পানি দেখতে দেখতে এগুতে থাকি। অর্ধেক রাস্তা আসার পর অন্ধকারের সাথে বৃস্টি সমানে নামলো। তার একটু আগে পাঞ্জাব থেকে আসা একটা গ্রুপের সাথে পরিচয় হয়। যা বলা হয়নি তা হল, হেমকুন্ড হল শিখদের একটা তীর্থস্থান, উনারা সেখানেই যাবেন। গাঙ্গারিয়া উচ্চতা হল ৩০৫০ মিটার। এখানে উঠতে আমার খুব কস্ট হচ্ছিল। কারন, বৃস্টির কারনে ব্যাগ ভারি হয়ে যাওয়া, মাথা ব্যাথা গতকাল রাতের ঘুম না হওয়া ইত্যাদি কারনে। তবে আরিফ খুব ভালভাবেই এগিয়ে গেল। আমরা কাঁপতে কাঁপতে রাত ৯টায় গাঙ্গারিয়া পৌঁছলাম। পাঞ্জাবি গ্রুপটার সাথেই গুরুদুয়ারায় উঠলাম। অপরদিকে আমার মাথা ব্যাথা কমছেই না। গুরুদুয়ারয় ডাক্তার থাকে। তাদের কাছে যাওয়াতে তারা বললেন, উচ্চতাজনিত কারনে এমন হয়। আমি উনাকে বললাম, ৩০৫০ মিটারে এমন হলে কিভাবে হবে। অন্য কোন কারন থাকতে পারে প্লিজ দেখেন। আরেকজন ডাক্তার এসে ব্লাড প্রসার মেপে দেখে, প্রসার একবারে কম।ওরস্যালাইনের সাথে কিছু ঔষধ দিলেন আর হাই প্রোটিন খাবার খেতে বললেন। রাতে গুরুদুয়ারার ধর্মশালায় রুটি, সবজি, ছোলা বুট খেলাম, সাথে চা।  তাদের চা টাই ছিল সেই মানের। ভোজন পার্ট চুকিয়ে শুয়ে পরলাম। ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে মনে হয় সব ক্যালরি আবার শেষ হয়ে গেছে। সকালে কোথায় যাব চিন্তা করার সময় পাইনি।  কাঁপতে কাঁপতেই ঘুমিয়ে পরলাম।


হেমকুন্ড সাহিব, শিখ ধর্মাবলম্বীদের একটি পবিত্র তীর্থস্থান। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৪৫০০ ফিট উপর অবস্থিত। হিমবাহের পানি জমে তৈরি হয়েছে এই লেক। নভেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত তুষার পাতের কারণে এখানে পৌঁছানোর পথ বন্ধ থাকে।


অন্যদলের লোকেরা খুব ভোরেই যে যার মত হেমকুন্ড ও ভ্যালী অফ ফ্লাওয়ারে  চলে গেল। আগের রাতের অসুস্থতার কারনে আমরা ৮টার দিকে উঠে চিন্তা করলাম কোথায় যাওয়া যায়? পরে হেমকুন্ডই যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম।  ঘুম থেকে উঠে দেখি পুরো গাঙ্গারিয়া ফাঁকা পরে আছে। নাস্তা সেরে সাথে কিছু হালকা খাবার নিয়ে আস্তে আস্তে হেমকুন্ড রাওনা দিলাম। একটু উপরে উঠেই দেখতে পেলাম পাইন বনের মাঝে পুরো গাঙ্গারিয়াকে, অন্য দিকে ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার যাওয়ার সরু রাস্তা। পাহাড়ের সাথে মেঘের আলো ছায়ার খেলাগুলো চিরদিন মনে থাকার মত দৃশ্য। কিছু দূরে বিশাল এক ঝর্না দেখা দিল যার সৃষ্টি সারাসরি গ্লেসিয়ার থেকে। আমরা উপরে উঠেই যাচ্ছি কিন্তু ৬কিলোমিটারের রাস্তা যেন শেষই হয় না। দূর থেকে পাইনের জংগলের মাঝে গাঙ্গারিয়াকে অদ্ভুত  সুন্দর লাগছিল। একটু পর গ্লাসিয়ার দেখতে পেলাম, জীবনের প্রথম গ্লাসিয়ার দেখার পর মনের মাঝে কেমন অদ্ভুত অনুভূতি হল। কোথা থেকে যেন বিশাল এক খন্ড মেঘ  প্রবল বাতাসের সাথে বৃস্টি  নিয়ে এল। প্রায়  ৪৩৯০ মিটার উপরে এমন বাতাসের সাথে মুশুল ধারে ঝরা বৃস্টিতে ভিজে একাকার হয়ে কোন রকম  হেমকুন্ডের ধর্মশালায় আশ্রয় নিলাম।



পেটে ক্ষুদা, মাথা ব্যাথা, লো-প্রসার  পুরা যাচ্ছে তাই অবস্থা। মনে মনে ভাবলাম এমন সময় খিচুড়ি হলে ভাল হত। পরে দেখি কি ধর্মশালায় হচপচ স্যুপ দিচ্ছে, সাথে চা। তখন যে কি খুশি হয়ে ছিলাম তা লিখে বুঝনো সম্ভব না। চুলা থেকে সরাসরি খিচুরি তুলে দিচ্ছিল, অর্ধেক শেষ হতে না হতেই বরফ ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছিল। প্রায় বিশ মিনিট পর দেহ চাঙা হল। চারদিক একটু পরিষ্কার হওয়াতে কুন্ডের ছবি তুলতে গেলাম, ছবি তুলতে  না তুলতেই আবার বিশাল মেঘ এসে চারদিক অন্ধকার করে দিল। তাড়াতাড়ি নিচে নামার জন্য রওনা দিলাম। ডাউনহিলটা এতো সুন্দর আর ভাল লাগছিল যে বৃস্টির মাঝেও খুব তাড়াতাড়ি নেমে গেলাম। নামার সময় এক জায়গায় বহ্মকমল ফুল দেখলাম। গাঙ্গারিয়া নেমে এসে দেখি দোকানদার মিষ্টি বানাচ্ছে, তখনি ৪টা মিষ্টি খেয়ে ফেললাম। একটু পর আরিফও নেমে আসলো। এসে গুরুদুয়ারায় আরো একদিনের জন্য নাম এন্ট্রি করে উঠে পরলাম। আরিফের নাকি ভাল লাগছে না ঘুমাবে। আমি রুমে এসে শরীর মুছে কাপড় পাল্টিয়ে গাঙ্গারিয়া দেখতে বেরিয়ে পরলাম।

নিচে নেমে আসতেই দেখি কলকাতার দাদাদের, তখন কেন জানি মনে হয়েছিল অনেক দিনের পুরোনো কোন বন্ধুর সাথে দেখা হয়েছে। তারা আজ দুপুরে গাঙ্গারিয়া এসেছে। তাদের সাথে কথা বলতে বলতে চলে গেলাম বন বিভাগের অফিসের সামনে, সেখানে পর্যটকদের জন্য ডকুমেন্টারি ফিল্ম দেখার ব্যাবস্থা আছে। সবগুলি ফিল্ম হিমালয়ের বিভিন্ন অংশ নিয়ে। যেহেতু কাল ফ্লাওয়ার ভ্যালি যাব তাই আমারা ফ্লাওয়ার ভ্যালি নিয়ে তথ্যচিত্র দেখবো মনস্থির করলাম। আমি তাদের ফটো গ্যালারি দেখতে দেখতে দাদারা সবাই টিকেট করে ফেলেছে। আমার ওয়ালেট রুমে রেখে এসেছি, ভাবছিলাম দাদাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে টিকেট কেটে ফেলবো কিনা। যিনি টিকেট দিচ্ছিলেন তাকে সমস্যাটি বললাম। শুনে তিনি বললেন, “যাও দেখ গিয়ে। কাল এসে টাকা দিয়ে যেও”।


গাঙ্গারিয়া গুরুদুয়ারার পিছনের জঙ্গল।


ফিল্ম শুরু হল। কিভাবে এই উপত্যকার আবিষ্কার হল, কি কি ফুল ফুটে, ফুলগুলোর কি কি দোষ-গুন আছে তা দেখালো। আমার কাছে যেটা ভাল লাগলো তা হল, ফ্লাওয়ার ভ্যালি যাওয়ার আগের জংগলে বোজ গাছ জন্মায় যার আসল নাম Betula, Himalayan Birch। অনেকে আবার পেপারিয়াস গাছ নামেও চিনে। মূল কথা হল প্রচীনকালে এই গাছের বাকলেই লিখা হত। বেদ গ্রন্থও  লিখা হয়েছিল এই গাছের বাকলেই। ফিল্ম দেখে অন্য টিমের ক্যাম্পফায়ারে আড্ডাবাজি করে চলে এলাম গুরুদুয়ারায়। পেটের টানে গেলাম গুরুদুয়ারার খাবার ঘরে, আজ মেনুতে ছোলা, সবজি আর আটার রুটি। এত সুস্বাদু ছোলা ভুনা আমি আগে খাইনি, এক কথা অসাধারণ ছিল।

শুতে না শুতেই কোলকাতার দাদারা এসে বললো চা খাবে, আমি যাব কি না। আমি ভাবলাম এই ঠান্ডায় চা হলে ভালই হবে। উঠে গেলাম গুরুদুয়ারার চায়ের   ট্যাংকে। তাদের নিয়ম হল যতটুকু পার খাও কিন্তু নষ্ট করতে পারবে না।  আদা এলাচ দিয়ে দুধ চা এক কথায় অস্থির ছিল। এত দিন শুনে আসতাম “মাগনা গরুর দাঁত থাকে না” এই কথা গুরুদুয়ারার এসে ভুল প্রমাণিত হল। সাথে এক বোতল গরম পানি নিয়ে এলাম গুরুদুয়ারার হট ওয়াটার ট্যাংক থেকে, এনে কাপড় দিয়ে পেচিয়ে স্লিপিং ব্যাগের ভিতর রেখে দিলাম। এই কদিন ধরে রাতে বেশি পানির পিপাসা পাচ্ছে।

সকালে উঠে পরলাম, ফ্লাওয়ার ভ্যালি যাব বলে। আরিফ অনুরোধ করলো ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার ঘুরে এসে ১৩ কিমি দূরে গোবিন্দঘাট চলে যাবে। সেখান থেকে ২৫কিমি গাড়ির রাস্তা ধরে বদ্রীনাথ। কারন এত দিন বাসায় ফোন দিতে পারেনি তাই বাসায় সবাই চিন্তা করবে আর কিসের যেন ফর্ম আসবে মেইলে। আমার মাথায় যেন বাজ পরল।যেই জায়গা দেখার জন্য এত দূর আসলাম সেই জায়গা দেখবো দৌঁড়ের উপর? তারপরেও চিন্তা করলাম যদি সময় হয় নিচে নেমে যাব। সেই চিন্তা বাদ দিয়ে নাস্তা করতে গেলাম। নাস্তায় এমন এক নুডুলস খেতে দিল যা খেতেই পারলাম না। অনেক কস্ট করেও গলাদিয়ে নিচে নামাতে পারলাম না। তখন মনে হল খেতে না পারলে প্রসার লো হয়ে পরবে, কিন্তু বমি হলে আবার সমস্যা। তাই একটু বেশি করে শুকনো খাবার সাথে নিয়ে নিলাম আর আমাদের খেজুর তো আছেই।


‘ভ্যালী অফ ফ্লাওয়ার’ যাবার পথে


৫০০ মিটার এগোতে দেখলাম চেক পোস্ট, এখান থেকে পারমিট দেয়। ৫মিনিট দাঁড়িয়ে থাকার পর খাতা-কলম নিয়ে আসলো। আজকে আমরাই প্রথম ভিজিটর, পুলিশ আমাদের জিজ্ঞেস করল সামনে কেউ গিয়েছে কি না। বললাম আমরা দেখিনি। কোথা থেকে এসেছি জানতে চাইলে বললাম বাংলাদেশ। পাসপোর্ট নিয়ে নাম্বার, ঠিকানা লিখলো সাথে তিন জায়গায় সাইন রাখলো। সাথে কি কি আছে সব এন্ট্রি করলো এবং মালামালের জন্য ৫০০টাকা জামানত রাখলো। যদি কোন প্লাস্টিক রেখে আসি তাহলে জামানতের ৫০০টাকা ফেরত পাব না। ফরেনারদের জন্য ৬০০টাকা জন প্রতি কিন্তু টিকেট পেয়ে দেখি লিখা ১৫০রুপি মানে ইন্ডিয়ান্দের জন্য যা আমাদের জন্য তাই রাখলো। আমিও কিছু বলেনি, কেননা আমি তো পরিচয় লুকাইনি।

পারমিটের কাজ শেষ করে ধীরে ধীরে সামনে এগোতে থাকলাম। বিশাল বিশাল পাইন গাছগুলোকে মনে হচ্ছিল এই বুঝি আকাশ ছুঁয়ে ফেলবে। আরেকটু সামনে যাওয়ার পর দেখলাম বিশাল এক নদী উপর থেকে নেমে আসছে সাথে পানির তীব্র গর্জন। প্রায় এক ঘন্টা ট্রেক করার পর জংগলের ভিতর কিছু ছেলেমেয়ের বাংলা কথা শুনতে পেলাম, অবাক হলাম কারন আমরাই প্রথম এন্টি করিয়েছি। তারপর তাদের দেখা পেলাম। কথা হল, তারা কলকাতা থেকে এসেছে। চেকপোস্ট খুলার ১ঘন্টা আগেই তারা চলে এসেছে। তাদেরকে পিছনে ফেলে আর একটু উপরে উঠে দেখা পেলাম সেই পেপারিয়াস গাছ, ঝর্ণা তারপর দেখা পেলাম দূর থেকে ভ্যালি অফ ফ্লাওয়াস কে।


হিম ফুলের উপত্যকা


বসে বসে দূর থেকে ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার কে এক নজর দেখে নিলাম। তারপর ট্রেক চলে গেল সোজা ভ্যালির দিকে ফুলগুলোর মাঝ দিয়ে। ট্রেকের দু’পাশে লাল-হলুদ-গোলাপি আরো অনেক রংবেরং এর ফুল ফুটেছিল। ভ্যালি থেকে উপর দিকে তাকালে বিশাল বিশাল ঝর্নাগুলো দেখা যায় ঠিক ঝর্ণাগুলোর উপরেই রয়েছে বিশাল-বিশাল গ্লেসিয়ার। ভ্যালির মাঝে Joan Margaret Legge নামের এক মহিলার সমাধি, তিনি ১৯৩৯ সালের জুলাই মাসে এখানে ফুল নিয়ে গবেষণা করার সময় মারা যান। যার মৃত্যু এমন সহস্র ফুলের মাঝে হয়েছে তাকে নিঃসন্দেহে ভাগ্যবান বলা যায়। ওনার সমাধির কাছে যখন বসে আছি তখন বেলা ১১টার মত বাজে। সে সময় আমারও মাথা ব্যাথা শুরু হয়ে গিয়েছে। আরিফ তখন বললো চলো আমরা ফিরে গিয়ে নিচে নেমে যাই। তখন আমি অনেকটা রাগ নিয়েই বলি তোমার যদি যাওয়ার ইচ্ছে হয় যাও, আমাকে ফোর্স করনা। একটু পর আরিফ জানায়, আরিফ একাই নিচে চলে যাবে গোবিন্দঘাটে সেখান থেকে বদ্রীনাথ। আমিও ওকে আটকাইনি। ওর কাজ থাকলে ও যাক আমি আটকানোর কে?  আমাদের মাঝে কথা হল কাল  সকালে আমি  গাঙ্গারিয়া থেকে রওনা দিয়ে বর্থীনাথ যাবো।  আরিফকে বিদায় দিয়ে আমি  ভ্যালিতে একা ঘুরতে লাগলাম। শুকনো খাবারগুলো খেয়ে আস্তে-আস্তে ফিরা শুরু করলাম ৩টার দিকে।


সেই ব্রিটিশ ভদ্র মহিলার সমাধিক্ষেত্র

চেক পোস্টে প্লাস্টিকগুলো জমা দিয়ে জমানতের টাকা নিয়ে নিলাম। ভাবলাম আমাদের দেশেও এমন হলে ভালই হত। গাঙ্গারিয়ায় এসে গুরুদুয়ারায় আবার নাম এন্টি করালাম। ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে দেখি কলকাতার দাদারা হিমকুন্ড থেকে ফিরে এসেছে। আবার তাদের সাথে কথা বলতে বলতে গাঙ্গারিয়ার অলি গলিতে হাঁটছি, একটা দোকানে খুব সুন্দর বাঁশির সুর শুনতে পেলাম। কাছে গিয়ে দেখলাম একটি লোক দোকানে বসে মিউজিক শুনছে। পরে উনি বললেন, উনার এক ক্লায়েন্ট থাইল্যান্ড থেকে মাঝে মাঝে হিমালয়ে এসে ৩-৪মাস করে থেকে যায়, তখন তিনি এই সুর তুলেছিলেন। যার দোকান উনার নাম রাকেশ; বেশির ভাগ সময় গাইডের কাজ করে  এবং ওয়াইল্ড লাইফ ফোটোগ্রাফি করে। উনার সংগ্রহে স্নো-লের্পাড, ব্ল্যাক বিয়ারের ছবিও আছে। গতকালের টিকেটের টাকা দেওয়ার জন্য যাওয়াতে উনি বললো তোমাকে টাকা দিতে হবেনা তুমি এসেছ এতেই আমি খুশি হয়েছি। আমি বাংলাদেশী শুনে উনি এক কাপ কফি না খাইয়ে ছাড়লেন না। উনার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গুরুদুয়ারার খিচুরি খেয়ে সে রাতের মত শুয়ে পরলাম।




হিমদেশের ফুল


সকালে দেখালাম টিপ টিপ বৃষ্টি হচ্ছে, তাই একটু দেরি করে ঘুম থেকে উঠলাম। নিচের রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়ে দেখি ইন্ডিয়া নেভি থেকে কিছু লোক এখানে এসেছে। তাদের মাঝে ৪জন এক টেবিলে বসে বাংলাদেশ ও বাঙালী নিয়ে কথা বলছে, একেবারে আমার সামনের টেবিলে। তাদের আলোচনার মূল কথা হল, বর্তমানে বাঙালীরা পাহাড়ে এবং সমতলে অনেক ঘুরাঘুরি করে, সময় পেলেই বেড়িয়ে পড়ে। তখন আমি অদ্রির  ‘পাহাড়েই মঙ্গল’  টিশার্টি পরে ছিলাম, আমাকে দেখে মেয়েটি চিৎকার দিয়ে বলো, OMG,  you are bangali  right? আমিও বললাম yes, and I’m  Bangladeshi. মেয়েটা খুশি হয়েছিল, কারন যাদের সাথে কথা বলতে ছিল তারা তার কথা পুরোপুরি বিশ্বাস করছিল না। আমাকে পেয়ে হাতে না হাতে প্রমাণ দিয়ে দিল। সকালের খাবার খেয়ে গোবিন্দঘাটের উদ্দেশে ট্রেক শুরু করলাম। একটু পর একটা গাছে অনেক গুলো মুখপোড়া হনুমান দেখতে পেলাম। কমকরে হলেও ১০-১৫টা হবে, তখন একা সামনে যাওয়ার সাহস পাইনি তাই অপেক্ষা করে পিছনের দলের সাথে এগোলাম। গোবিন্দঘাট থেকে চার কিলোমিটার দূর যেখান থেকে জীপ যায়, সেখানে দেখি সব জীপ রির্জাভ করা। কেননা ওখানে প্রায় সবাই দল বেধে যায়। ১ঘন্টার মত দাঁড়িয়ে থেকে কোন জীপ পেলাম না, আবার বৃষ্টির কারনে হাটতেও  ভাল লাগছে না। তখন ইন্ডিয়া হাইকের টিম লিডারের সাথে পরিচয় হল। দিদি তখন  বলল তাদের গাড়ি দিয়ে যেতে। উনাদের সাথেই গোবিন্দঘাট আসলাম।



বিদায়। হিম ফুলের উপত্যকা


গোবিন্দঘাট এসে শুনি বদ্রীনাথ যাওয়ার রাস্তা বন্ধ, রাস্তায় পাথর পরেছে। আরিফকে ফোনে পেলাম, কথা হল কাল সকালে আমি বদ্রীনাথ যাবো। রাতে হোটেলে থেকে পরদিন সকাল পেরিয়ে দুপুর হল তবু রাস্তা খুললো না। তাই আমি জসিমঠ চলে আসলাম। এসে শুনলাম রাস্তা খুলেছে আর আরিফ আসছে। জসিমঠে একটু হাঁটাহাটি করে দেখলাম গভর্মেন্ট ট্যুরিস্ট গেস্ট হাউজ। লোকেশন খুব ভাল একটা জায়গায়। ভাবলাম বিকেল হয়ে গেছে আজ আর সামনে না এগুই। খুব সুন্দর একটি সকাল উপভোগ করে ঋশিকেশের উদ্দেশে রওনা দিলাম। বিকেলে ঋশিকেশের পৌছালাম। তখন ভাবলাম অন্য কোথাও যাওয়া যায় কিনা। হরিদ্বারের বাস পেয়ে উঠে পড়লাম। তখন আরিফ বললো পাঞ্জাব যাবে তার বন্ধুর কাছে। তাকে বিদায় দিয়ে আমি হাওড়ার টিকেট কাটলাম পরের দিন রাতের। সকালে ঘুম থেকে উঠে চলে গেলাম দেরাদুন। দেরাদুন শহরটা একবারে চুপচাপ শান্ত দেখে খুব ভাল লাগলো। শহর থেকেই দূরের বিশাল বিশাল পাহাড়গুলো দেখা যায়। দেরাদুন সেন্টার থেকে ৮কিমি দূরে রবার্স কেভ আছে। দেখতে গেলাম, বৃষ্টি থাকার কারনে পাহাড়ি ঢলে গুহার ভিতর আর যেতে পারেনি। আসার সময় ঋশিকেশের লক্ষণঝুলা দেখে রাতের কুম্ভ এক্সপ্রেসে উঠে পরলাম। ট্রেণের ঝিকঝিক শব্দের সাথে বাসায় ফিরছি ভ্যালী অফ ফ্লাওয়ার্সের রঙিন স্মৃতি নিয়ে।

(Visited 1 times, 1 visits today)
আঞ্জামুল হক আকাশ
আঞ্জামুল হক আকাশ
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে পড়ুয়া আকাশ একজন ব্যাকপ্যাকার। একা একা ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করেন। সাইকেল চালানো, মজার খাবাবের স্বাদ নেয়া আর ইতিহাস আর প্রিয় বিষয়।

২ thoughts on “হিম ফুলের উপত্যকায়

  1. বাহ দারুণ। ইচ্ছে আছে অদূর ভবিষ্যতে এই জায়গায় যাওয়ারর। দারুন লেখা, কিপ ইট আপ।

মন্তব্য করুন

*Please Be Cool About Captcha. It's Fun! :)