ভাবনার পাহাড়

কবে যাব পাহাড়ে

[ছবি] আশফাক হাসান


এক.

আমার আব্বু একটা কথা প্রায় সময়ই বলে, পৃথিবীতে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হবে খাবারের পানির অভাবে। যত দিন যাচ্ছে আমিও কথাটার গুরুত্ব বুঝতে পারছি। একদিকে পৃথিবীর সঞ্চিত থাকা পানি গলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে আরেক দিকে দেখা দিচ্ছে খাবার পানির অভাব। পানির এই দ্বিমুখী প্রভাবে মানব সভ্যতা আজকে ধ্বংসের একেবারে দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। পৃথিবীর বিশুদ্ধ পানির প্রায় ৮০ শতাংশ পানি আসে পাহাড়-পর্বত থেকে। পাহাড়-পর্বত থেকে নেমে আসা এইসব জলধারা দিয়েই জন্ম নেয় নদ-নদী। নদীর পলি দিয়ে দুপাড়ে জেগে উঠে উর্বর ভূমি। এই ভূমিতেই চাষ হয় ফসল, যা দিয়ে আমরা সমতলের মানুষ আমাদের ক্ষুধা মেটাই। আবার এই নদীগুলোতেই বাঁধ দিয়ে উৎপন্ন হয় আমাদের সভ্যতার অগ্রগতির সবচেয়ে বড় হাতিয়ার, বিদ্যুৎ।

আবার পুরো পৃথিবী জুড়েই সবচাইতে বিপদজনক অবস্থানে আছে এই পার্বত্য অঞ্চলগুলো। জলবায়ু পরিবর্তন, মানুষের আগ্রাসী লোভ, নির্বিচারে প্রাকৃতিক সম্পদ হরণ, পাহাড়ে বসবাসকারীদের সাথে সামাজিক দূরত্ব ইত্যাদি নানা কারণে এই অঞ্চল ও অঞ্চলের মানুষগুলোই সবচেয়ে আশংকাজনক অবস্থায় আছে। তাই পৃথিবীর দেশ গুলোর সমিতি ‘জাতিসংঘ’ মানব সভ্যতার অস্তিত্বের স্বার্থে পৃথিবীর এই মহাবিপন্ন অঞ্চলগুলোকে রক্ষা করে আসন্ন বিপর্যয় ঠেকানোর জন্য সম্মিলিতভাবে একটি উদ্যোগ নিয়েছে। এই উদ্যোগের একটি অংশ হচ্ছে আন্তর্জাতিক পর্বত দিবস। পৃথিবীর সব কটি দেশে ১১ ডিসেম্বর এই দিবসটি সরকারিভাবে পালন করা হয়। এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য হল পাহাড়-পর্বত থেকে পাওয়া সম্পদ ও তা রক্ষা করা সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে আরও সচেতন করে তোলা।

আমাদের দেশেও এই দিবস বেশ ঘটা করেই পালন করা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে নেওয়া হয় নানা রকম কর্মসূচি। আয়োজন করা হয় সভা সেমিনার। প্রতি বছরই একটি প্রতিপাদ্য ঠিক করে দেওয়া হয়। সেই বিষয় নিয়েই বক্তারা বিশাল বিশাল বক্তব্য রাখেন। বিগত কয়েক বছর থেকে ঢাকায় পার্বত্য মেলারও আয়োজন করা হচ্ছে।

হঠাৎ করেই এই দিবস পালন নিয়ে আমরা মনে একটা প্রশ্ন জাগল? এইসব করে আদৌ কি আমাদের মত মানুষকে সচেতন করা সম্ভব? এই ধরনের সভা সেমিনারে সাধারণত তিন চার জন বক্তা থাকেন। তাদের বেশির ভাগই রাজনৈতিক বক্তব্য দেন। বাদ বাকি বক্তারা সবাই ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে একই গৎবাঁধা বক্তব্য রাখেন। আমি হলফ করে বলতে পারি, এই অনুষ্ঠানে দর্শকসারিতে বসা থাকা বেশিরভাগ মানুষ একেবারে অনিচ্ছায় এই অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন। তাদের এই দিবসের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য বা করণীয় সম্পর্কে কোন মাথা ব্যথাই থাকে না। তারা অধিকাংশই আমলা, সারাদিন এসি রুমে বসে ফাইলে ডুবে থাকেন। তারা পাহাড়েই যাননি কখনো, পাহাড় আসলেই কেমন আর কি কি সমস্যা আছে পাহাড়ে এই সম্পর্কে কোন ধারণাই তারা রাখেন না। তাই এই ধরনের ক্লান্তিকর আলোচনা অনুষ্ঠানে সিংহভাগ শ্রোতা বসে বসে হাই তোলেন নয়ত ফেসবুকে ব্যস্ত থাকেন।

অন্যদিকে আমার মত তথাকথিত পাহাড়প্রেমীরা সত্যি বলতে আসলে জানিই না এই দিবস পালনের উদ্দেশ্যটা কি। কেউ কেউ তো ভেবে বসে আছি এই দিবস বুঝি পর্বতারোহণকে প্রণোদিত করার উদ্দেশেই পালন করা হয়। সবাই মোটামুটি চিন্তায় থাকি পর্বত দিবস উপলক্ষ্যে ফেসবুকে কোন ছবিটা পোস্ট দিব আর সাথে কি ক্যাপশন দিব, কোনটাই বেশি লাইক পাওয়া যাবে তা ভাবতে থাকি। আর মাঝে মাঝে আফসোস করি, ইশশ জাপানের মত আমাদের দেশেও পর্বত দিবসে সরকারি ছুটি থাকলে কত ভালই না হত। সত্যি বলছি, এইসব দিবস টিবস, সভা-সেমিনার, মানববন্ধন-মেলা এইসব আমার মধ্যে কোন ধরনের সচেতনতাই তৈরি করে না। সেই সাথে এটাও হলফ করে বলতে পারি সাধারণ মানুষের মনেও এর কোন প্রভাব পড়ে না।

শুধু রাতে ঘুমাতে যাবার সময় মনে হয় আমি কতই না অক্ষম। আমার চোখের সামনে সব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে আর আমি কিছু করার চেষ্টাও করছি না। পুরো পৃথিবীর কিছুই আমি দেখিনি, কিন্তু আমাদের এই সবুজ পাহাড়ের আর্তনাদ কিভাবে আমি উপেক্ষা করি। কিছুই হয়ত হবে না, তবু মনে হল আমার ভাবনার পাহাড়গুলো লিখে ফেলি। আমি যে একেবারেই কিছু করিনি, আমি যে অক্ষম নই- এই আক্ষেপের জায়গায় অন্তত একটু স্বান্তনা থাক।

দুই.

ছোটবেলা থেকে ‘পরিবেশ পরিচিত ও বিজ্ঞান’ পড়েই তো বড় হয়েছি। এত বছর লেখাপড়া করে আমার মধ্যে কখনোই পরিবেশের প্রতি এই বোধ বা মমত্ব জাগ্রত হয়নি। আমাদের এই শিক্ষাব্যবস্থায় আমি চোখ কান বন্ধ করে এইসব তথ্য শুধু মুখস্ত করে গেছি, পরীক্ষার খাতায় যেন বমি করে দিতে পারি। এত বছর লেখাপড়া করে এইসব পাহাড়-পর্বত, পরিবেশ-প্রতিবেশ সম্পর্কে প্রেম-ভালোবাসা দূরের কথা, এদের গুরুত্ব পর্যন্ত উপলব্ধি করিনি।

এটা একই সাথে আমার সৌভাগ্য আর দুর্ভাগ্য যে আমি ঘুরতে ঘুরতে একসময় পাহাড়ে চলে গিয়েছিলাম। এটা আমার নিয়তিই হবে যার কারণে সেদিনের পর আমি পাহাড়ের অমোঘ আকর্ষণের আঁটকে গেছি। পাহাড়ে যেতে যেতে একদিন আমার মনে হল, আমার দৃষ্টি পাল্টে গেছে। এতদিন আমার চোখে ছানি পড়ে ছিল, কেউ এটাকে কেটে দিয়েছে। এখন আমি এমন এমন জিনিস দেখতে পাই যা কিছুদিন আগেও দেখতে পেতাম না। এমন সব কিছুর অস্তিত্ব টের পেতে শুরু করেছি যা এতদিন পেতাম না। খুব ছোট ছোট ঘটনাও আমার চোখে ধরা দিতে লাগল। মনে হচ্ছে আমাকে কেউ নতুন দৃষ্টি দান করেছে।

কার্তিকের কোন এক তারিখ ছিল। ভোর থেকে সারাদিন ট্রেক করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। শেষ দুপুরে এক জুম ঘরের মাচা দেখে আর না পেরে শরীর এলিয়ে দিলাম। এক সময় আকাশ জুড়ে গুছ গুচ্ছ সাদা ফ্যাকাসে মেঘ এসে আমাদের ঢেকে দিল। এরপর শুরু হল একেবারে মিহি মিহি গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি, ঠিক যেন শীতের ভারী কুয়াশার মত। আমি অপলক দৃষ্টিতে বৃষ্টি দেখতে লাগলাম। জুম ঘরের ঠিক সামনেই বিশাল এক কড়ই গাছ। কড়ই গাছের ডগার দিকের ছোট ছোট পাতা গুলোয় পানির ফোঁটাগুলো স্ফটিক বিন্দুর মত জমা হচ্ছে। একসময় ভার নিতে না পেরে নুয়ে পড়ে নিচের পাতা গুলোয় স্ফটিকগুলো প্রবাহিত করে দিচ্ছে। উপর থেকে নিচে পুরো গাছ জুড়ে চলছে জল স্পন্দনের জীবন্ত নৃত্য।

বিন্দু বিন্দু স্ফটিকগুলো এক হয়ে তৈরি করল সরু জলধারা। গাছের গোড়া থেকে ঢাল বেয়ে তিরতির করে নেমে যাচ্ছে। আশপাশ থেকে আরও কয়েকটি ধারা ঢালের নিচে মিলে তৈরি করল বড় এক জলধারা। যত নিচে নামছে ততই সে গতি পাচ্ছে। নামতে নামতে একসময় সেই ধারা বিলীন হয়ে গেল স্রোতস্বিনী রেমাক্রিতে। এর আগে আমি কখনো এমনটা দেখিনি। পুরোটাই আমার কাছে ছিল বিষ্ময়। আরে এটা তো জল-চক্র; এত দিন আগে পড়ে আসা পুঁথিগত বিদ্যা আমার কাছে অর্থবোধক হয়ে উঠল। নতুন কিছু আবিষ্কার করার আনন্দে আমার মধ্যে একটা শিহরণ খেলে গেল।

তখন ধীরে ধীরে আমার কাছে এই পাহাড়, এই বৃক্ষরাজি, এই বন-জঙলের নিগুঢ় রহস্য উন্মোচিত হতে থাকে। আমি বুঝতে শিখি কিভাবে এই পুরো সিস্টেম কাজ করে। গাছের শিকড় কিভাবে মাটিকে ধরে রাখে। কিভাবে গাছের পাতা পচে আঁধার তৈরি করে যাতে অনেক পানি সেখানে জমা থাকতে পারে। তাই বৃষ্টি নামলেই সব পানি ঢল বেয়ে নেমে বন্যা সৃষ্টি করতে পারে না। গাছ যে পানিটুকু ধরে রাখে তা অনেক দিনে চুইয়ে চুইয়ে নদীতে গিয়ে পড়ে। তাই শুষ্ক মৌসুমেও পানির অভাব হয় না। এভাবেই প্রকৃতি তার শৃঙ্খলা বজায় রাখে।

এই পাহাড়ে এসেই আমি শিখেছি যুগ যুগ ধরে মানব চরিত্র একই রকম আছে। খ্রিস্টের জন্মের হাজারো বছর আগে ঈশপ নামের ভদ্রলোক সোনার ডিম পারা হাঁসের গল্পে যেই লোভী চাষীর কথা বলেছিল এখনও আমাদের মধ্যে সেই লোভী মানুষের কোন অভাব নেই। এতদিন ধরে তার সেই নীতিগল্প পড়েও আমাদের মধ্যে কোন বিকার আসেনি।

আমাদের পুরো পার্বত্য অঞ্চলে যে বিপুল পরিমাণ ঐশ্বর্য ছড়িয়ে আছে তা আমরা সেই লোভী চাষীর মতই একবারে ভোগ করার আশায় নির্বোধের মত যে যেমনভাবে পারি লুটপাট নিচ্ছি। এমনভাবেই লুটে নিচ্ছি যে আজ আমাদের সবুজ পাহাড় ধ্বংস ও বিপর্যয়ের একেবারে কাছে চলে এসেছে। এই বিপুল সম্পদ যথাযথভাবে  সংরক্ষণ করলে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তর যে মিল্কিং করা সম্ভব সেই বোধই আমাদের মধ্যে নেই।

আমাদের নিরাপত্তার জন্য নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল বিশাল বৃক্ষগুলো কাটার জন্য আমাদের পাহাড় জুড়ে চলছে নির্বিচারে লগিং। চেরাই করা কাঠ সমতলে নিয়ে আসার জন্য যেন ট্রাক যেতে পারে তাই পাহাড় কেটে বানানো হচ্ছে বিশাল রাস্তা। কোন ধরনের নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে, আগাপাশতলা বিবেচনা না করে, দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব গবেষণা না করেই বানানো হচ্ছে এইসব অপরিকল্পিত রাস্তা। যা প্রতিবছর ধরে ভাঙে আর প্রতি বছরই ঠিক করতে হয়। আর এই রাস্তা বানানোর জন্য ব্যবহার করা হয় ঝিরি থেকে চুরি করে আনা পাথর। প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা টেন্ডার বের হয় শুধুমাত্র এই রাস্তা মেরামত বাবদ।

এখন কে তাদের বোঝাবে ঐ দূরের দূর্গম পাহাড়ে যেখানে কেউ থাকে টাকে না সেখান থেকে গাছ কেটে আনায় আসলে আমাদের ক্ষতিটা কি হচ্ছে। গাছ কেটে ফেলার কারণে যে প্রসবণগুলো একে একে মরে যাচ্ছে সেটা তো তারা দেখতে পারছে না, বুঝতেও পারছে না। পানির অভাবে ঝিরিগুলোও যে একে একে মরে যাচ্ছে সেটা তারা কিভাবে বুঝবে যতক্ষন পর্যন্ত না তারা বাকতলাইয়ের পানিশূন্য মলিন ভেজা দেয়াল দেখবে। তারা তো মার্চের কাঠফাটা গরমে হুট করে তাজিংডং থেকে মধ্য দুপুরে শিপলাম্পি পাড়ায় হাজির হয়ে দেখেনি পানির অভাবে পুরো গ্রামের মানুষ কতটা কষ্ট পাচ্ছে।  তাদের এই গাছ কাটা, ঝিরি থেকে পাথর তোলা, পাহাড় কাটার কারনেই যে গত বছর বন্যা হল, অতিবৃষ্টিতে পাহাড় ধ্বসে এতগুলো মানুষ মারা গেল, থানচি উপজেলার বিস্তৃর্ন এলাকা জুড়ে খাদ্যাভাব দেখা দিল, এসব তারা কিভাবে বুঝবে। তাদের চোখ থেকে ভোগবাদী সমাজের এই বিভ্রান্তিকর সুখের পর্দা তো এখনও সরে যায় নি!

তিন.

আমাদের পাহাড়গুলো দেশের অন্যান্য জায়গার তুলনায় সবচেয়ে বেশী নিরাপত্তা ভোগ করে। সেনাবাহিনী ও বর্ডার গার্ডের বাইরে পুলিশ র‍্যাবসহ সব নিয়মিত বাহিনী দিয়ে পুরো পার্বত্য অঞ্চল বেষ্টন করে রাখা আছে। এর পরেও আমি ঠিক বুঝতে পারি না প্রশাসনকে একেবারে নাকের ডগায় রেখে কিভাবে এইধরনের বেআইনী কাজগুলো দিনের পর দিন ধরে চলতে পারে? এতগুলো আর্মি ক্যাম্প ফাঁকি দিয়ে সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে কিভাবে কাঠের লগ পাচার হতে পারে। কিভাবেই বা সেনাবাহিনীর ত্বত্তাবধায়নে তৈরী করা রুমা বাজার থেকে বগা লেকের ৩০ফিট চওড়া রাস্তা তৈরিতে রুমা খালের পাথর ব্যবহার করা হয়।

তখনই উত্তর মিলে এটা চাহিদা। আমার চাহিদা, তোমারও চাহিদা, সবটা মিলে আমাদের সম্মিলিত চাহিদা। আর কে না জানে বাজারে চাহিদা থাকলে যোগান দিতেই হবে, যেকোন উপায়েই তা হোক না কেন।

আমার সবচেয়ে বেশি অবাক লাগে সভ্যতার অগ্রগতি মানেই নাকি এইসব চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়া। এটি এমন এক সামাজিক ব্যাধি যার চিকিৎসা করাতে কেউ চায় না। তাই তো কেউ কখনো বলে না আমরা আমাদের চাহিদা গুলো কমিয়ে ফেলি। কেন আমরা বুঝতে পারিনা রামপাল আর রূপপুর বানানো হচ্ছে আমাদেরই বাড়তি চাহিদার যোগান দেয়ার জন্য। কেউ কেন বলে না আমরা কাঠের আসবাব ব্যবহার করা বন্ধ করে দেই। মাটিতে বিছানা করে শুই। কেউ বলে না বিদ্যুতের ব্যবহার টা একটু কমিয়ে ফেলি, এসিটা অহেতুক ব্যবহার না করি। সবাই শুধু সুখ নামের এক আলেয়ার পিছে ছুটছি। আমাদের শেখানো হয়েছে এটা না পেলে, সেটা না পেলে আমি সুখী হবই না। এসব নতুন নতুন প্রযুক্তি ও পণ্য আমাদের জীবন দ্রুত করে দিচ্ছে, আরও সহজ করে দিচ্ছে। আমাদের কায়িক শ্রম কমে যাচ্ছে। আমরা অকর্মন্য হয়ে পড়ছি। আর এই অকর্মন্যতাই নাকি সভ্যতার অগ্রগতি।

কিন্তু আমরা বুঝতেই পারি না আমাদের জীবন যত দ্রুত হবে ততই তাড়াতাড়ি তা শেষ হয়ে যাবে। ধ্বংসের মধ্য দিয়েই যে সভ্যতা পূর্ণতা পায় সেটা তো ইতিহাসই সাক্ষী দেয়। এই দ্রুত থেকে দ্রুততম জীবন, উন্নয়ন, অগ্রগতি, সুখের জীবন যে একটা বিভ্রান্তি তা আমরা কেউই বুঝে উঠতে পারি না। আর তাই তো আমরা এইসব অপ্রয়োজনীয় ও অহেতুক চাহিদা গুলোকে ত্যাগ করে সরল ও সাধারণ জীবন যাপন করার কথা কল্পনাতেও আনতে পারি না।

ঘর থেকে বেড়িয়ে পাহাড়ে যাওয়া মানেই আমার সেন্স অফ সিকিউরিটি ভুলে, কমফোর্ট জোন থেকে দূরে গিয়ে খুবই সাধারণ ভাবে জীবনযাপ করা। এই লাইফ স্টাইলের প্রভাব সদূরপ্রসারী। যারা নিয়মিত এই লাইফ স্টাইল চর্চা করে থাকে তাদের কাছে ধীরে ধীরে এই ম্যাটেরিয়ালিস্টিক পৃথিবীর অর্থ পাল্টে যায়। খুব প্রয়োজনীয় জিনিস ছাড়া অহেতুক বিলাসী চাহিদা কমে যায়। পুঁজিবাদী এই সমাজ কাঠামো থেকে ততই নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়ার তাগিদ চলে আসে। খুব অল্পতেই তখন চাহিদা মিটে যায়। চাহিদা মেটানোর জন্য তখন দুশ্চিন্তা করতে হয় না। জীবন সরল ও স্বচ্ছ হয়ে উঠে। অহেতুক জটিলতা দূর হয়ে জীবনে প্রশান্তি চলে আসে, আর এটাই তো জীবনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিৎ।

চার.

মাঝে মাঝেই আমার মনে হয় এই যে এত এত পড়ালেখা জানা শিক্ষিত আমলারা আছেন আমাদের সরকারে, তারা কেউ কি এই বিষয় গুলো অনুধাবন করেন না?? এই জিনিসগুলো খারাপ হচ্ছে, এই জিনিসগুলো ভাল হচ্ছে, এটা করলে এই ক্ষতি হবে, ওটা করলে এই লাভ হবে, কিভাবে এই সমস্যা গুলোর সমাধান করা সম্ভব, এই বিষয়গুলো কেন তারা মন দিয়ে দেখেন না? এগুলো তো এতটাও জটিল কিছু নয়, শুধু স্বদিচ্ছাটুকু দরকার। এইসব প্রশ্নের জন্যেও একটি উত্তরই সামনে আসে, তারাও ঠিকভাবে এইসবের গুরুত্ব ঠিকভাবে অনুধাবন করেন না। পাহাড়ে গেলে ঠিক কি হয় এটাই তো তারা এখনও বুঝে উঠতে পারেননি।

পাহাড়ে ঘুরলে একসময় অন্তর্দৃষ্টি খুলে যায়। সমাজের চাপিয়ে দেয়া ঠুলি খুলে ফেলা যায়। হাবিজাবি প্রয়োজনীয়তা কমে না। এই ভোগবাদী ও বৈষয়িক চাহিদাগুলো দিন দিন কমতে থাকে। প্রকৃতিকে উপভোগ করার পাশিপাশি এর সম্পর্কে সংবেদনশীলও হয়ে উঠে। তাই আমি খুব পরিষ্কারভাবে বলতে পারি, এই সমস্যাগুলো পুরোপুরি বুঝে উঠতে আর আসন্ন এই বিপর্যয় থেকে আমাদের রক্ষা করতে হলে আমাদের পাহাড়কে খুব কাছ থেকে জানতে হবে। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, আমরা আজকাল আমাদের দেশের পাহাড়েই যাবার অধিকার রাখি না।

কেন আর কি কারণে আমি আমার নিজ দেশের পাহাড়ি অঞ্চল গুলোতে যাবার অনুমতি পাই না সেটার সুস্পষ্ট কোন কারণ এখনও আমার জানা নেই। স্থানীয় প্রশাসন আমাদের বলে থাকে পাহাড়ের এই অঞ্চল গুলো আমার জন্য নাকি নিরাপদ নয়। কিন্তু যারাই আমাদের পাহাড়গুলোতে অল্প বিস্তর ঘুরাঘুরি করেছেন তারা মাত্রই বুঝতে পারবেন এই ধরনের দাবীর পিছনে সত্যিকার অর্থে তেমন কোন কারণ নেই। আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে পাহাড়ের চাইতে নিরাপদ জায়গা আর দুটি পাইনি। আর পাহাড়ে যতটুকুই বিপদের সম্ভাবনা থাকে তা সমতলে তার চাইতে কয়েকগুন বেশিই হবে। তাই সমতলেই আমি সবসময় অস্বস্তিতে থাকি।

মাঝে মাঝে ভাবী আমি যেন সেই বেআইনী কাজগুলো দেখে না ফেলি, দেখে এসে হইচই না করতে পারি সেই কারণে সুকৌশলে আমাদের পাহাড় থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হচ্ছে না তো? এই যে আমাদের তরুণেরা যে পাহাড়ে যাওয়া শুরু করেছিল তাদের যে এভাবে থামিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হল সেটার কারণ আমি বুঝে উঠতে পারিনি এখনও।

একই সাথে যানবাহন, তথাকথিত গাইড সিস্টেম ও রিসোর্ট ব্যবসার সিন্ডিকেশন করে পুরো সিস্টেমটাকে প্রশাসনের মদতে দূষিত করে ফেলা হচ্ছে। সেই সাথে আমাদের নিরাপত্তার জন্য নিয়োগ প্রাপ্তদের ব্যবহারের কথা না বললেই নয়। পুলিশের থেকে শুরু করে সেনাবাহিনীর পাহাড়ে দায়িত্বরতরা আমাদের সাথে যেমন দূর্ব্যবহার করেন, কোন সভ্য দেশে এমনটা হয় কিনা আমার জানা নেই। তাদের হাবভাব দেখে মনে হয় আমরা অনেক বড় অপরাধ করে পাহাড়ে এসেছি বা করতে এসেছি। তারা এমন সব ভাষায় অপমানজনক কথা বলেন যা বেশিরভাগ সময়ই সহ্য করা যায় না।

তাদের অধিকাংশের ধারণাই নেই ট্রেকিং মানে কি? কেনই বা একজন মানুষ বারবার পাহাড়ে আসতে পারে। মাঝে মাঝে আমার খুব ইচ্ছা করে আর্মির বড় বড় অফিসারদের নিয়ে আমি নেপাল বা লাদাখ চলে যাই। ইন্ডিয়া আর চায়নার ভোলাটাইল বর্ডারে গিয়ে ট্রেকিং করিয়ে নিয়ে আসি তাদের। তারাও দেখুক সেই দেশের নিরাপত্তারক্ষীরা কিভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করেন। কিভাবে অতিথিদের সাথে ব্যবহার করেন।

ইন্ডিয়া, নেপাল, পাকিস্থানের সেনাবাহিনী, পুলিশ বাহিনী ও অন্যান্য বাহিনীর রীতিমত পর্বতারোহণ প্রশিক্ষণ হয়। তাদের মধ্য থেকে চৌকস দল নিয়মিত পর্বতারোহণ করে থাকে। আমাদের দেশের নিরাপত্তা বাহিনীগুলোতে এই ধরনের স্পোর্টসের চল কেন নেই এটাও আমাকে বিস্মিত করে। গলফ একটু কম খেলে ঘাসেব্রাম আরোহণের চেষ্টা করলেই তো তাদের আচরণটা পাল্টে যেত।

পাঁচ.

আমি আইজাক আসিমভের অসম্ভব রকম ভক্ত। তার ফাউন্ডেশন সিরিজের এনসাইক্লোপিডিয়া গ্যালাকটিকার সাইকো হিস্টোরির থিওরিটা আমি মনে প্রণে বিশাস করি। এই থিওরি অনুযায়ী, বিরাট সংখ্যক মানুষ একই সাথে যখন কোন কিছু ভাবে বা চিন্তা করে সেটাই একসময় গিয়ে ভবিষ্যতকে নিয়ন্ত্রণ করে।

দুঃখজনক হলেও সত্যি, বর্তমানে এই ২০১৭ সালেও আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের কাছে পাহাড় মানেই হচ্ছে আতঙ্ক। বেশিরভাগ মানুষই ভাবে সেখানে একদল জংলি, অসভ্য ও বুনো লোক থাকে। তারা জামা কাপড় পড়ে না, আজগুবি সব খাবার খায়, শিকার করে, বাইরের মানুষকে সহ্য করতে পারে না, বাঙ্গালী দেখলেই ক্ষতি করে। পাহাড়ের মানুষদের জীবনধারা, সংস্কৃতি ও বৈচিত্রময় সভ্যতা সম্পর্কে আমাদের অনেকের কোন ধারণা নেই। পাহাড়-সমতলের মানুষ একে অপরকে যদি ভালভাবে জানতেই না পারে তাহলে এই সমস্যা কি করে সমাধান করা সম্ভব?

খুব অল্প কদিন হল আমাদের দেশের তরুণরা ঘর থেকে বের হচ্ছে, দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়াচ্ছে। নানা রকম সমাজ, সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হচ্ছে। ধীরে ধীরে তাদের সামনে সৃষ্টির রহস্যগুলো উন্মোচিত হচ্ছে। এই অল্প কয়েক বছরে পাহাড় অনেকের জীবনই পাল্টে দিয়েছে। সেই সংখ্যাটা একেবারেই ফেলনা নয়। যতদিন যাচ্ছে পাহাড়ে যাবার প্রবণতা ততই বাড়ছে।

আমি জানি রাতারাতি কোন কিছুই পরিবর্তিত হবে না। কেউ যাদুমন্ত্রবলে সবকিছু আবার সুসজ্জিতভাবে সাজিয়ে দিবে না। এর জন্য দীর্ঘদিন আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। এই প্রজন্মের তরুণরা যখন এই উচ্ছল জীবনধারাকে বেছে নিয়ে নিয়মিত এর চর্চা করে যাবে ততই আমাদের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হবে। সবার মনে যখন একসাথে এই হাহাকার উঠবে তখনই অবস্থার পরিবর্তন হতে বাধ্য। এই প্রজন্ম তরুণ-তরুণীরা একদিন সরকারের নীতি নির্ধারক পর্যায়ে যাবে। তখনই অবস্থার পরিবর্তন হবে, তার আগে নয়।

সরকারের উচিত সম্ভাবনাময় ও সম্পদশালী আমাদের এই বিশাল পার্বত্যভূমিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য একটি কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া। দেশের সংরক্ষিত বনগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও নিয়ন্ত্রিত অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজমকে প্রোমোট করা। পর্যটকদের দৃষ্টি সবসময় একটি দর্পণের মত কাজ করে তাই,  গ্রহনযোগ্য কোন কারণ ছাড়া এভাবে পর্যটকদের পার্বত্য অঞ্চলে প্রবেশ করতে না দিলে সেখানকার প্রকৃত চিত্র কখনোই প্রকাশ্যে আসবে না। তাছাড়া নিয়ন্ত্রিত পর্যটন এই বিশাল অনগ্রসর এলাকার খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহ অন্যান্য মৌলিক চাহিদা গুলো নিশ্চিত করে একটি কাঠামোগত টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব। তাই বলে সাজেকের মত অপরিকল্পিত কোন আধুনিক বস্তি হোক-এটাও আমি চাই না। বিভিন্ন দিক গবেষণা করে এমন একটি মডিউল বানাতে হবে যেন সেখানকার প্রকৃতির উপর, স্থানীয় মানুষের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির উপর কোন রকম বিরুপ প্রভাব না পড়ে। এই আন্তর্জাতিক পর্বত দিবসে তাই আমার একটাই চাওয়া, পাহাড়ে যাওয়া সকলের বোধ জাগ্রত হোক।


(Visited 1 times, 1 visits today)
সালেহীন আরশাদী
সালেহীন আরশাদী
সারাদিন শুয়ে শুয়ে বই পড়া তার শখ। পাহাড়ে যাওয়াটাকে জীবন দর্শন মনে করেন। প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা পাহাড়ের ঔষধশাস্ত্র নিয়ে গবেষণা করা তার স্বপ্ন।

৫ thoughts on “ভাবনার পাহাড়

  1. অসম্ভব ভাল একটি লেখা ভাই! কিন্তু কথা হল, সরকার/প্রশাসন কবে বুঝবে?ভাল দিন কি আদৌ আসবে?

    1. তোমরা তথা কলেজ ইউনিভার্সিটির যেই ছেলে-মেয়ারা এখন প্রচুর ঘুরে বেড়াচ্ছে তারা যখন সরকার আর প্রশাসনে জয়েন করবে তখন ধীরে ধীরে অবস্থার পরিবর্তন হবে। এটা আমার বিশ্বাস।

মন্তব্য করুন

*Please Be Cool About Captcha. It's Fun! :)