গ্রন্থ: সামিট ফিভার


‘কল্প ভ্রমণ’ বলে একটা শব্দ আছে। কিন্তু ‘কল্প পর্বতারোহণ’ বলে আদৌ কোন শব্দ আছে কিনা আমার জানা নেই। তবুও আমার অবসরের অনেকটা সময় কাটে এই কল্পনার জগতেো। দুঃসাহসিক পর্বতারোহীদের উত্তেজনাপূর্ণ অভিজ্ঞতা আর লোমহর্ষক বর্ণনায় ভরপুর পর্বতারোহণের গল্পগুলো আমার হৃদয়কে বরাবরই চঞ্চল করে তোলে। তাদের অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে বুঝার চেষ্টা করি একজন পর্বতারোহী সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও চরম পরিস্থিতে কিভাবে সিদ্ধান্ত নেয়, সব ধরনের নিরাপত্তার বাইরে গিয়ে কিভাবে নিজের সহ্য ক্ষমতার চরম পরীক্ষা দেয়, কিভাবে নিজের অভদুত, দুঃসাহসিক আকাঙ্খাগুলোকে জিইয়ে রাখে। বুঝতে চেষ্টা করি কোন কারণে সে এই নির্মম যন্ত্রনা সহ্য করে?

‘Summit Fever’ এমনই একটা বই। বইটির লেখক এন্ড্রু গ্রেগ, একজন কবি। পর্বতারোহী বন্ধু ম্যাল ডাফের প্রস্তাবে হিমালয়ের কারাকোরাম রেঞ্জের পাকিস্থান-চায়না সীমান্তের ‘মুসতাঘ টাওয়ার’ অভিযানে যোগ দেন। বিনিময়ে তাকে দায়িত্ব দেয়া হয় অভিযান নিয়ে একটি বই লিখার। তারই ফলশ্রুতিতে প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে লেখক নিরপেক্ষতার সাথে পুরো অভিযানের সমস্ত চড়াই-উৎড়াই মুন্সিয়ানার সাথে তুলে ধরেছেন। অন্যান্য পর্বতারোহণের বইগুলোর মতই এখানেও লেখক তার সম্মোহনী শক্তি দিয়ে এইরকম দূরহ একটি অভিযানের অনিবার্য সব সমস্যা, প্রতিকূলতা, প্রতিবন্ধকতা, নৈরাশ্য, ঝুঁকি, বিপর্যয়, প্রকৃতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং এই ভয়ানক পরিস্থিতে দলের সকলের মাঝে সম্পর্কের পারদ কিভাবে ওঠা-নামা করে তার বর্ণনা এমন ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যে পুরোটা সময় জুড়ে আমি সেই অভিযানের অংশ হয়ে ছিলাম।


১৯০৯ সালের ডিউক অফ আব্বুরাজির কে-টু অভিযানে প্রখ্যাত পর্বতারোহী ও আলোকচিত্র শিল্পী ভিট্টোরিও সেল্লা বালটরো কাংড়ির পশ্চিম ঢাল থেকে মুজতাঘ টাওয়ারের এই অনবদ্য ছবিটি তুলেছিলেন।


সত্যি বলতে এই বইটি কিছু খামখেয়ালী কিন্তু প্রতিভাবান পর্বতারোহীদের মুসতাঘ টাওয়ারের শিখরে পৌঁছানোর গল্প। কিন্তু আমার কাছে বইটি নিছক পর্বতারোহণের লাগেনি। বরং পর্বতারোহণের জগতে একজন আগন্তুক হিসেবে লেখক স্কটল্যান্ড থেকে শুরু করে পাকিস্তান পর্যন্ত প্রতিটি ঘটনা এতটাই নিপুনভাবে তুলে ধরেছেন যে পুরোটা সময় তা পাঠকদের আচ্ছন্ন রাখতে বাধ্য। যেহেতু তিনি একজন অনভিজ্ঞ পর্বতারোহী, তাই প্রতিটি জিনিস তিনি যেভাবে শিখেছেন সেভাবেই সহজ ও সাবলীল ভাষায় তা বর্ণনা করে গেছেন। একটি শিখরে পৌঁছাতে কি পরিমান প্রচেষ্টার প্রয়োজন হয় আর কতটা নিঁখুত আইসোলেশনের দরকার হয় তার বিস্তারিত বিবরণ বইটিকে আরও চমকপ্রদ করে তুলেছে।

বইটি শুধু বর্ণনায় ভরপুর তাই নয়। শেখারও আছে অনেক কিছু। সবসময় চূড়ায় পৌঁছানো কিংবা পর্বতে সফল হওয়াই শেষ কথা নয়। মুসতাঘ টাওয়ারের চূড়াতেও তিনি যেতে পারেননি কিন্তু তার সহযাত্রীদের ডায়েরী থেকে বাকি গল্পটা শেষ করেছেন। এই দীর্ঘ অভিযানে দলের অন্যান্য সদস্যদের সাথে তার পক্ষপাতশূন্য দৃষ্টিভঙ্গি ও দূরহ একটি অভিযানের চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা তাকে উত্তর দিয়েছে কিছু অনিবার্য প্রশ্নের, যার একটি হচ্ছে-

এত সংশয়,কষ্ট ও বিপদকে উপেক্ষা করে কেউ কেন পর্বতে যায়?

আপনি যদি পর্বতারোহন জগতের উপর ছোট্ট একটি ভূমিকা পেতে চান, তবে বলব এই বইটি আপনার জন্য অবশ্যপাঠ্য।


বই সম্পর্কিত তথ্যাবলী

নাম: সামিট ফিভার
লেখক: এন্ড্রু গ্রেগ
প্রকাশনী: ক্যাননগেট বুকস, এডিনবার্গ, ইউনাইটেড কিংডম
প্রকাশকাল: ১০ নভেম্বর, ২০০৫
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ২৮৮

 


 

(Visited 1 times, 1 visits today)
সোয়াইব সাফি
সোয়াইব সাফি
প্রচন্ড রকমের অন্তর্মূখী, নিজের ছোট্ট জগতে সারাদিন শুয়ে শুয়ে বই পড়া ও কোড করার ফাঁকে একটু অবসর পেলেই পাহাড়ে ছুটে যান; জীবনের অর্থ খুঁজতে। পর্বতারোহনকে জীবন দর্শন মনে করেন। জীবনের শেষ কটা দিন সমাজ বিচ্ছিন্ন হয়ে পাহাড়ে ছোট্ট বাড়ি আর একটি লাইব্রেরীর মাঝে কাটিয়ে দেয়ার স্বপ্ন দেখেন।

মন্তব্য করুন

*Please Be Cool About Captcha. It's Fun! :)