শান্ত পাহাড়ের দেশ


সবুজে ছাওয়া, পাহাড়ে ঘেরা ছোট্ট দেশ ভুটান। বহু শতাব্দী প্রাচীন স্থাপনা যেখানে মুহূর্তেই টেনে নিয়ে যায় ইতিহাসের পাতায়। প্রকৃতি যেখানে বুলিয়ে দেয় স্নিগ্ধ পরশ, বাতাস এসে ফিসফিসিয়ে বলে যায় সুদূর অতীতের না বলা সব আখ্যান, প্রথম দেখাতেই মানুষরা বরণ করে নেয় আন্তরিক হাসিতে। অদ্ভুদ মায়াময়, শান্ত পাহাড়ের সেই দেশ ভুটান।


শেষ বিকেলে পারোর রাস্তায় ঘুরতে গিয়ে দেখা হয়ে গেল প্রায় আমার দুই ভাতিঝিরই বয়সি এই দুই বান্ধবীর সাথে। শহরে ঢোকার মুখে বসানো বিরাট আকৃতির প্রেয়ার হুইলকে ঘিরে চলছিল তাদের খেলা। ছবি তোলার অনুমতি চাইতেই সানন্দে রাজি দুজনে, ছুটোছুটি বেড়ে গেল আরও। বেশ কিছুক্ষণের জন্য আমিও হয়ে গেলাম ওদের খেলা আর দুষ্টুমির সাথী। একদম ঠিক যেন আমার দুই ভাতিঝি, ওয়ানিয়া আর জুহাইরাকেই পেয়ে গেলাম দেশ থেকে দূরে, অন্য আরেক দেশে।

 

পারো শহরের অদূরেই বৌদ্ধ ভিক্ষুদের এক প্রশিক্ষণায়তনে শিক্ষার্থীদের অবসর সময় পার।

 

পারো যংয়ের দেয়ালে বৈচিত্র্যময় চিত্রকলা।

 

বদ্ধ এক করিডোর পার করে এখানে ঢুকবার সাথে সাথেই অদ্ভূত ধরণের দমকা এক ঝলক বাতাস এসে লাগল চোখেমুখে। মনে হল যেন সেই পঞ্চদশ শতাব্দীর ওপার থেকে বয়ে আসা সেই হাওয়া; চোখমুখ ছুঁয়ে দিয়ে এক পরশেই বলে দিতে চাইছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জমে থাকা না বলা সব হাসি-কান্না, গৌরব আর গ্লানির সাক্ষী হয়ে থাকবার কথা। অতীতে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের আশ্রম এবং দূর্গ হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া এমন স্থাপনাগুলো এখন সরকারের দাপ্তরিক কাজ ছাড়াও বৌদ্ধ ভিক্ষুদের বিভাগীয় কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়।  স্থান: পারো যং (পঞ্চদশ শতাব্দীতে নির্মিত), পারো।

পুবের পাহাড় টপকে থিম্পুর ওপর সূর্যের প্রথম আলোকছটা।

 

থিম্পুর রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে এক দোকানের ভেতর এই দিদিমার সাথে দেখা।  প্রথমে তো ছবি তুলতে দেবেন না কিছুতেই। এদিকে আমার হাতে ক্যামেরা দেখে তাঁর ছোট বোন নিজ থেকে এসে ছবি তুলে দিতে বললেন। বোনকে দেখে এরপর দিদিমাও কিছুটা নরম হলেন, মিলল অনুমতি।

 

ভুটান

থিম্পু স্তূপায় এক পূণ্যার্থী।

 

অদ্রি

পুনাখায় দেখা পেয়েছিলাম এই দিদিমার। কোলের ব্যাগে করে গাছের শেকড়বাকড় জাতীয় কিছু একটা বিক্রি করছিলেন তিনি। ভাষাগত ব্যবধানের জন্য কথা বলা সম্ভব হয়নি। ক্যামেরাটা দেখিয়ে ইশারা ইঙ্গিতেই অনুমতি নিয়ে তুলতে হয়েছিল ছবিটা। পরে জেনেছিলাম এমন চোঙাকৃতি টুপি যারা পরেন, তারা উঁচু এলাকার বাসিন্দা। এই উচ্চতা কিন্তু আর্থিক বা মর্যাদাগত নয় বরং ভৌগোলিক। এসব মানুষদের বাড়ি দেশটির দুর্গম সুউচ্চ কোন এক পর্বতভূমিতে।

 

অদ্রি

পুনাখার এক টুকরো নিসর্গ।

 

অদ্রি

পুনাখার কোন এক পাহাড়ের ওপর অবস্থিত স্তুপা থেকে।

 

অদ্রি

পুনাখা যংয়ের প্রধান ফটক দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন দু’জন বৌদ্ধ ভিক্ষু।

ভুটান_অদ্রি

ঘন পাইনের জঙ্গলে ঢাকা সব পাহাড়, ফব্জিখা উপত্যকার একাংশের ওপর থেকে দেখা মোহনীয় সূর্যাস্ত। ডিসেম্বরের হাড়কাঁপানো শীতের এক শেষ বিকেলে কেন্দ্রীয় ভুটানের এই অঞ্চলে পৌঁছে এমন দৃশ্য দেখে বেশ কিছুক্ষণের জন্য ঠান্ডার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম প্রায়। পরে হাতমোজা খুলে কয়েকবার শাটার চাপার পর খেয়াল হল আঙ্গুলে আর সাড়ই পাচ্ছিনা বলতে গেলে! পাইনের জঙ্গলে চিতা, শেয়াল, হরিণ ইত্যাদির আনাগোনা বিস্তর। শীতকালে এই উপত্যকা মুখরিত হয়ে ওঠে সুদূর তিব্বতের উচ্চভূমি থেকে আসা কালো গলার অপূর্ব সারস পাখিদের (Black Necked Crane) কলরবে। ভুটানের রয়েল সোসাইটি ফর প্রোটেকশন অফ নেচারের উদ্যোগে ও সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় নিকট অতীতেও বিপন্নপ্রায় এই সারসদের নিরাপদ শীতকালীন চারণভূমি হিসেবে অভূতপূর্ব পরিচিতি পেয়েছে এই উপত্যকা। ফলস্বরূপ গত কয়েকবছরে এখানে ঘুরতে আসা সারসদের সংখ্যাও বেড়ে গেছে উল্লেখযোগ্য হারে।

 

ভুটান

গোল গর্তওয়ালা বিশালাকৃতির এক বাটির মত দেখতে ফব্জিখা/গাংত্যে উপত্যকায়।

 

টাইগার্স নেস্ট (তাকশাং গুম্ফায়) উঠবার পথে একদন্ড জিরিয়ে নিচ্ছেন পর্যটক।

 

তাকশাং গুম্ফা কিংবা টাইগার্স নেস্ট নামেও বহুল পরিচিত এই বৌদ্ধ মঠের অবস্থান পারো শহরের খুব কাছেই।  পারো উপত্যকা থেকেও আরও প্রায় হাজার তিনেক ফিট বেশি উচ্চতায় পাহাড়ের খাঁড়া ঢালে সুনিপুণ স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এই মঠটি পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়।  কথিত আছে যে, এক অপদেবতাকে বধ করার উদ্দেশ্যে বৌদ্ধ আধ্যাত্মিক নেতা, গুরু রিনপোচে একটি বাঘিনীর পিঠে চড়ে সুদূর তিব্বত থেকে এখানে উড়ে আসেন।  অপদেবতা বধের পর এই পাহাড়েরই এক গুহায় গুরু ধ্যানমগ্ন হন। এ কারণেই পরবর্তীতে স্থানটি এতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং মঠ নির্মিত হয়।

(Visited 1 times, 1 visits today)
মিলন বাকী বিল্লাহ
মিলন বাকী বিল্লাহ
জীবনযুদ্ধে ব্যস্ততার ভিড়ে একটু হাঁফিয়ে উঠলেই ছুটে চলে যান পাহাড়ে। প্রকৃতির সাথে সাথে পাহাড়ের মানুষের সাথে মিশতে ও তাদের জীবন সম্পর্কে জানতে ভালোবাসেন।

মন্তব্য করুন

*Please Be Cool About Captcha. It's Fun! :)