কোন এক শ্রাবণ মাসের ঝুম বর্ষায় একদল অভিযাত্রী আঁটকা পড়ল বান্দরবানের গহীনের কোন এক জুম ঘরে। বাইরে এতই বৃষ্টি, যে বের হওয়ার কোন উপায় নেই। চুলোর মধ্যে একটু পর পর লাকড়ির যোগান দিয়ে যেতে হচ্ছে। ধিকিধিকি আগুন জ্বলতে থাকে। সীমাহীন অবসরে জমে যায় আড্ডা। এক কথা দু কথা থেকে আড্ডার বিষয় মোড় নিল যথারীতি পাহাড়, পর্বত পদচারণা আর পর্বতারোহণে। গল্পোচ্ছলে কেউ একজন সরল মনে জিজ্ঞেস করে বসল, ‘আচ্ছা এই ইন্টারনেটের যুগে প্রবেশের আগে কি আমাদের মত কেউ কি পাহাড়ে আসত?’

এই প্রশ্নটাই সত্যিকার অর্থে অদ্রি’র শুরুর কথা।

বর্তমানে কোন বিষয়ের উপর তথ্য পাওয়া যতটা সহজ, আজ থেকে কুড়ি বছর আগে তেমনটা চিন্তাও করা যেত না। সেই সময়ে বা তারও আগে যারা এই রকম পথে হেঁটে বেড়িয়েছিলেন তাদের সেই অভিযাত্রার গল্প নিশ্চয়ই অসামান্য হবে। কি রকম পরিস্থিতি ছিল তখন? কিভাবে তারা তথ্য সংগ্রহ করতেন? কি কি সমস্যায় তারা পড়েছিলেন? এই অচেনা অজানা পথে পা বাড়ানোর অনুপ্রেরণায়ই বা তারা পেলেন কোথায়; এই প্রেক্ষাপটটাই মূলত অগ্রজদের সাথে বর্তমানের আগ্রহী নবীনদের মাঝে বিশাল পার্থক্য গড়ে দেয়।

আধুনিক প্রযুক্তি বিকাশের যুগে ঘরে বসেই বিস্তারিত তথ্য উপাত্ত চলে আসে হাতের মুঠোয়। কিভাবে যাব প্রশ্ন করতে দেরি, কিন্তু উত্তর পেতে দেরি হয় না। এমনকি কোথায় যাচ্ছি না যাচ্ছি, জায়গাটা দেখতে কেমন, সবই এখন ঘরের চার দেয়ালে মাঝে দেখে নেওয়া যায়। পুরো প্রেক্ষাপটই তাই এখন ভিন্ন।

অন্তর্জালে সামাজিক মাধ্যমগুলোর পরাবাস্তব জগতে সাধারণত আমাদের অগ্রজরা তাদের নিজেদের কথাগুলোকে প্রকাশ করার জন্য ঠিক উপযুক্ত জায়গা বলে মনে করেন না। কারণ এখানে অনেক কিছু চাইলেও নিয়ন্ত্রন করা যায় না। পাহাড়ে চলার পথে তারা যে বাধাগুলোর সম্মুখীন হয়েছেন, পাহাড়ে দীর্ঘদিনের পথ চলা থেকে তাদের পাওয়া অভিজ্ঞতা, অনুসন্ধান, ভুল, সফলতা, পথ চলতে চলতে শেখা নীতি ও নৈতিকতা মোট কথা আমাদের ট্রেকিং ও পর্বতারোহণ কমিউনিটিতে তাদের অবদানগুলো, অনেকটা এ কারণেই  ধীরে ধীরে আমাদেরই নির্লিপ্ততা, উদাসীনতা ও উপযুক্ত একটি মাধ্যমের অভাবে আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। বিচ্ছিন্ন অবস্থায় যাও কিছু আছে সেগুলো আবার সহজলভ্যও নয়। সদ্য এই মোহময় জগতের সংস্পর্শে আসা নবীনরা জানতেই পারছে না তাদের পূর্ববর্তীদের কথা। এই যে দুই প্রজন্মের মাঝে বিশাল এক শুণ্যতার সৃষ্টি হয়েছে, আর এর ফলেই বর্তমানে নানাবিধ সমস্যা তৈরি হচ্ছে।

যেহেতু নবীনেরা তাদের অগ্রজদের রেখে যাওয়া পদাঙ্ক সম্পর্কে জানতে পারছে না, তাই তারা সহজেই বিভ্রান্ত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর অনিয়ন্ত্রিত কাঠামো এই বিভ্রান্তিকে আরো কয়েকগুন বাড়িয়ে দিচ্ছে। বর্তমানে ট্রেকিং ও পর্বতারোহণের যেই অভ্যাসটি জনপ্রিয় হচ্ছে, এর পিছনের ভিত্তি খুবই দূর্বল ও নাজুক অবস্থায় আছে। এই নবীন পাহাড়প্রেমীদের অনেকের মাঝেই তাই পাহাড় নিয়ে আপাত আলাদা কোন দর্শন নেই।

পাহাড়ে ট্রেকিং ও পর্বতারোহণের মত বিষয় সম্পর্কে বিশদ লেখাপড়া না করে, না জেনে, না বুঝে, কোন রকম প্রস্তুতি-পরিকল্পনা ছাড়া ঝোঁকের মাথায় অনেকে পথে নেমে পড়ছেন। যান্ত্রিকতার যাতাকলে ও সঠিক দিক নির্দেশনার অভাবে পুরো বিষয়টাই নিছক একটি ফ্যাশন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কতজন মন থেকে প্রকৃতিকে অনুভব করতে আজকাল পাহাড়ে যাচ্ছেন সেটা নিয়ে বিতর্ক হতেই পারে। পাহাড়ে আজকাল স্পট গুনে ঘুরতে যাওয়া হচ্ছে, একবারে সর্বোচ্চ কতটা স্পট কভার করা সম্ভব সেই হিসাব করে আজকাল পরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে।

প্রকৃতির ব্যাপারে অজ্ঞতার ফলে পাহাড়ের প্রকৃতিকে রক্ষা বা সংরক্ষণের ব্যাপারেও তাদের থেকে যায় উদাসীনতা। সুন্দর দর্শনীয় কোন জায়গাকে ময়লার আস্তাকুড় বানিয়ে ফেলতে তাই খুব বেশী দিন লাগে না। তাদের মনের ভেতর থেকে এই বিষয়গুলো ঠিক আসে না। কারণ ঘুরাঘুরি, ব্যাকপ্যাকিং বা ট্রেকিংয়ের নীতি-নৈতিকতা, বোধ, দর্শনের বিষয়গুলো সবার কাছে পুরোপুরিভাবে পৌঁছাইনি। যেখানে ব্যাকপ্যাকিং, ট্রেকিংয়ের সংজ্ঞাই হচ্ছে প্রকৃতিকে কোন রকম ক্ষতি না করে প্রকৃতির কাছাকাছি গিয়ে তার রুপসুধা আস্বাদন করা, সেখানে দলবেধে অনেকে হৈ হৈ করে আনন্দ ফূর্তি করতে চলে যাচ্ছেন পাহাড়ে। শান্ত-স্নিগ্ধ-নির্মল কোন প্রাকৃতিক পরিবেশে চুপ করে বসে থাকাও যে আনন্দের হতে পারে, এটা অনেকের ভেতরে হয়ত কাজই করে না। পাহাড়ের স্বাভাবিক গতিতে চলা সমাজ ব্যবস্থাতেও পড়ছে এর বিরূপ প্রভাব।

আমাদের এই সমস্যাগুলোর মূল কারণ হচ্ছে দুই প্রজন্ম আর দুই ধারার এই পাহাড়প্রেমীদের মাঝখানের দূরত্ব। একদিকে অগ্রজরা পাহাড় নিয়ে তাদের জ্ঞানগুলো সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে আগ্রহ দেখান না, কারণ তাদের ভেতর একটি শঙ্কা কাজ করে। শঙ্কাটা হচ্ছে, তারা যে জ্ঞানটা ধীরে ধীরে পরিণত করেছেন, সেটা অপরিণত পাঠক বা দর্শকের হাতে চলে গেলে সেটার অপব্যবহার হতে পারে। অন্যদিকে এই দূরত্বের কারণে নবীনদের সামনে নেই কোন দৃষ্টান্ত যা দেখে বা পড়ে তারা উপলব্ধি করতে পারবে আর নিজেকে পরিণত করে গড়ে তুলতে পারবে। পাহাড়ে যাওয়া নবীনদের একটা বিশাল অংশ তাই থেকে যাচ্ছে অপরিণত। কারণ বৃহৎ পরিসরে তাদের কাছে পৌঁছানোর চেস্টাই করা হয়নি কখনো। আবার যারা নিজ নিজ অবস্থান থেকে চেষ্টা করে যাচ্ছেন, তারা একা একা একটা বড় অংশের কাছে তার বার্তাটা নিয়ে শেষমেষ পৌঁছাতে পারছেন না।

পর্বতারোহণের মৌসুমগুলোতে প্রতি বছর আমাদের দেশ হতে পৃথিবীর উঁচু পাহাড়গুলোতে অভিযানের সংখ্যাটা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে, যেটা খুবই আশাপ্রদ একটি দিক। অদ্রি বিশ্বাস করে আমাদের পর্বতারোহণ কমিউনিটির মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সম্মান ও সব কিছুর উর্দ্ধে গিয়ে একে অপরকে সহযোগিতা করাটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। যে কারণেই হোক, বর্তমানে সেটির অনেকাংশে ঘাটতি রয়েছে। কাউকে ঠিকমত না জানলে, গভীরভাবে না বুঝলে  শ্রদ্ধাবোধ, সম্মান এমনি এমনি একদিনে তৈরি হবে না। তাই এই একে অপরকে জানার ধারণা থেকেই অদ্রির প্রয়োজনীয়তা। সফলতা-অসফলতার উর্দ্ধে গিয়ে প্রথমত আমরা যেন একে অপরকে শ্রদ্ধা করতে পারি। পর্বতে শুধু সফলতা নয়, প্রচেষ্টাকেও যেন তারিফ করতে শিখি। অদ্রি নিজেও তার মাধ্যমে এই নীতিগুলো অনুসরণ করবে। কমিউনিটির একে অপরের মধ্যে দূরত্ব, একতাবদ্ধ না থাকার ফলে মৌলিক বিষয়গুলোতে স্বভাবতই একটা শূন্যস্থান বিরাজ করে ।

প্রকৃতি কিন্তু শূন্যস্থান পছন্দ করে না, এই শূন্যস্থানটাও অপরিণত কিছু দিয়েই পূরণ হতে শুরু করবে। তাই এখনই আমাদের সকলকে সেই শুণ্যস্থানগুলো পূরণ করার উদ্যোগ নিতে হবে। শূন্যস্থান ঘুচানোর চিন্তা অন্তরে ধারণ করেই অদ্রির যাত্রা শুরু। এটি এমন একটি মাধ্যম হতে চায় যেখানে অগ্রজদের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানও থাকবে, সেই সঙ্গে নবীনদের আগ্রহ আর কৌতূহলও থাকবে। যেখানে সমস্যার চাইতে, সেই সমস্যার সমাধান নিয়ে সবাই বেশী মাথা ঘামাবে। যেখানে এক অভিযাত্রী আরেক অভিযাত্রীকে তার প্রাপ্য সম্মানটা দিবে, আবার ভিন্ন মত থাকলেও সুস্থ-সুন্দর উপায়ে তা প্রকাশ করবে।

অদ্রির লক্ষ্য বাংলা ভাষাভাষীদের মধ্যে পাহাড় সম্পর্কে আগ্রহ তৈরি করা, ট্রেকিং ও মাউন্টেনিয়ারিংয়ের মত পাহাড় সম্পর্কীয় আউটডোর একটিভিটিগুলোকে জনপ্রিয় করার সাথে সাথে অগ্রজদের দর্শন ও নৈতিকতাগুলোকে নবীনদের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করে তাদের পরিণত হওয়ার পথটা সুনিশ্চিত করা। কমিউনিটির সকলের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করা।

অদ্রি: পাহাড় পর্বতের প্যাঁচালী  


পাহাড় বিষয়ক যাবতীয় সবকিছু নিয়েই অদ্রি। অদ্রি তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পাদনের জন্য ইতোমধ্যে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে আর আগামীতে কিছু উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে। যেমন,

অদ্রি মাধ্যম
এটাই হবে সেই মাধ্যম যেখানে পাহাড় নিয়ে আপনি আপনার সকল অনুভূতি ব্যক্ত করতে পারবেন। এখানে থাকবে আমাদের ইতিহাস, অগ্রজদের সংগ্রাম ও অভিজ্ঞতার গল্প, চারিদিকে সংগঠিত হওয়া অভিযানের খবর, অভিযানের বিশদ বর্ণনা, প্রতিবেদন, পাহাড় নিয়ে নিবন্ধ, টোটকা, সাজ-সরঞ্জামাদি নিয়ে আলোচনা, কোন অভিযান নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা, পাহাড়ে কাটিয়ে আসা সুন্দর মুহুর্ত গুলো, আমাদের করা ছোট খাট ভুলগুলো…সবই এক জায়গায়, একসাথে বাংলা ভাষায়। এখানে থাকবে নিয়মিত কুইজ, শিক্ষামূলক ভিডিও, পর্বতারোহণের মত আউটডোর স্পোর্টসে আরেক ধাপ অগ্রসর হওয়ার যাবতীয় খুঁটিনাটি।

অদ্রি পাঠাগার
অদ্রি পাঠাগারে থাকবে পাহাড়-পর্বত সম্পর্কিত সব ধরনের বই। হিমালয়, আল্পস, আন্দিজ থেকে আমাদের বান্দরবান। পাহাড়ের জন্ম, গঠন, ভূগোল, ইতিহাস, দর্শন, পাহাড়ে বাস করা মানুষদের জীবনশৈলী থেকে শুরু করে পাহাড়ে চালানো রোমাঞ্চকর সব অভিযান নিয়ে লেখা বই। সাথে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষনা ও পর্বতারোহণের উপর লেখা জার্নাল, গাইড বই, মানচিত্র, চলচিত্র, তথ্যচিত্র সহ আরও অনেক কিছু।

অদ্রি পাঠশালা
ট্রেকিং, মাউন্টেনিইনিয়ারিং, কায়াকিং, স্নো বোর্ডিং, ক্লাইম্বিং এর মত আউটডোর স্পোর্টস আর একটিভিটিগুলোতে অংশগ্রহণ করতে চাইলে দরকার হয় বিশেষ সরঞ্জামাদি, বিশেষ দক্ষতা, প্রশিক্ষণ ও দীর্ঘ অনুশীলন। পাহাড় প্রেমীদের যে বিষয়গুলো বিশদভাবে জানা দরকার সেগুলো জন্য পাহাড়ের দূর্গম পরিবেশে টিকে থাকার কৌশল থেকে শুরু করে পাহাড়ের খুটিনাটি বিষয়ের উপর নিয়মিত কর্মশালা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, যেন সবাই স্বাবলম্বী হয়ে পাহাড়ে যাওয়ার মত দক্ষতা অর্জন করতে পারে।

অদ্রি প্রকাশনা
মৌলিক, গবেষণাধর্মী ও অনুসন্ধানী লেখা নিয়ে অদ্রি থেকে বাৎসরিক একটি জার্নাল বের করার পরিকল্পনা রয়েছে। যেখানে উল্লেখযোগ্য সব অভিযান, অভিযাত্রী, তাদের অভিজ্ঞতা ও গবেষনা ও অনুসন্ধানী ফলাফল দিয়ে ভরপুর থাকবে।
এছাড়া অনলাইনে সল্প পরিসরে নিয়মিত ডিজিটাল প্রকাশনা ছাড়াও অদ্রি থেকে অভিযাত্রীদের কোন অভিযানের উপর বা পাহাড় পর্বত ও এই সংক্রান্ত একটিভিটি সম্পর্কিত মৌলিক বা অনুবাদের গ্রন্থ প্রকাশনার উদ্যোগ নিবে।

 

(Visited 1 times, 1 visits today)
উপরে