নেহরু ইনস্টিটিউট অব মাউন্টেনিয়ারিং: আমার অভিজ্ঞতা


রিপোর্টিংয়ের একদিন আগেই পৌঁছেছি। ক্যাম্পাসের প্রতিটি অলিগলি পরিচিত। চারপাশটা নিজের উঠান মনে হচ্ছে, যদিও প্রায় চার বছর পর আবার এসেছি। এর আগে এখান থেকেই পর্বতারোহণের মৌলিক প্রশিক্ষণ নিয়েছি। বলছি পর্বতারোহণ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ‘নেহরু ইনস্টিটিউট অব মাউন্টেনিয়ারিং’ এর কথা। এর ক্যাম্পাসটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪ হাজার ৩০০ ফিট উঁচুতে অবস্থিত। এপ্রিলের ২৪ তারিখ থেকে শুরু হল, ২৮ দিনের পর্বতারোহণের উচ্চতর প্রশিক্ষণ।

প্রথম দিন ভোর ছ’টার সময় সবাই রেডি হয়ে ফল-ইন করলাম। শুরু হল পাঁচ কিলোমিটার পাহাড়ী সর্পিল পথে দৌড়। দৌড়ের সাথে নানান ধরনের শারীরিক কসরত। শেষ শক্তি পর্যন্ত নিংড়ে বের করে নেওয়া হল, মনে হচ্ছিলো আর পারবো না, এখানেই থেমে যাই। আবার পরক্ষণেই মনে হলো না থামবো না। যতক্ষণ দম আছে ততক্ষণ পিছ পা হব না। চোখেও ঝাপসা দেখছিলাম। দেশেও প্রতিদিন শারীরিক চর্চা করেছি, দৌড়েছি ৮ কিলোমিটার করে। সেসব কোন কাজেই এলো না। মনে হলো অনেক কম প্রস্তুতি নিয়ে এসেছি। আর একটু বেশি প্রস্তুতি নিলে হয়তো কাজে দিতো। শেষ পর্যন্ত সকালের পর্বটা ভালোভাবেই শেষ করতে পেরেছি। তবে দেহের কোন অংশই বাকি রইলো না ব্যথার হাত থেকে। সেই ব্যথা শরীরের মানিয়ে নিতে সময় নিয়েছিলো প্রায় ৮/১০ দিন। রোপ ভাগ করা, পর্বতারোহণের পোশাক, গিয়ার দেওয়া ও আনুষাঙ্গিক কাজে দিনটি কেটে গেল। সন্ধ্যায় মাউন্টেইন ফিল্ম দেখে রাতের খাবার শেষ করে নয়টার মধ্যে ঘুম।

দ্বিতীয় দিন, ভোর সাড়ে ছ’টায় ফল-ইন করে ক্যাম্পাস থেকে ৯ কিলোমিটার পাহাড়ী পথে ট্রেকিং করে টেকলা গিয়ে রক ক্লাইম্বিং প্রশিক্ষণ চলে চার দিন। বেসিকে যেগুলো শিখিয়েছিল সেগুলো চর্চা করা এবং উচ্চতর প্রশিক্ষণের নতুন নতুন টেকনিক্যাল, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল—ভলদ্যুতি, জুমার উইথ ইতিয়র, এসসেন্ডিং উইথ চেস্ট জুমার, এইড ক্লাইম্বিং, জুমারিং উইথ আল্পাইন ক্ল্যাস ইত্যাদি। পঞ্চম দিন আর্টিফিশিয়াল ওয়াল ক্লাইম্বিং ও ষষ্ঠ দিন রিভার ক্রসিং। তারপর তিন দিনের ট্রেকিং পথ পাড়ি দিয়ে বেইজ ক্যাম্পে পৌঁছাই। এখানেও গ্লেসিয়ারে বেসিকের টেকনিক প্র্যাক্টিস এবং উচ্চতর প্রশিক্ষণের নতুন নতুন পদ্ধতি শেখানো হয়। আর এই উচ্চতর প্রশিক্ষণের মূল হচ্ছে পর্বত অভিযানের দলনেতা তৈরি করানো হয়, রেসকিউ, নেভিগেশন, রোড ওপেনিং, রোপ ফিক্সিং, অভিযান পরিকল্পনা, একক অভিযান ও উচ্চতায় প্রাথমিক চিকিৎসা শেখানো হয়।

এখানে একটা বিষয় বলে রাখতে চাই। আমাদের বাংলাদেশে বেশ কিছু নবীন ট্রেকার বা স্ব-ঘোষিত পর্বতারোহীরা আল্পাইনিজম চর্চা শুরু করেছে। এটা শুনতে ভালো লাগে তবে এটা কতটুকু আল্পাইনিজম সেখানে প্রশ্ন থেকেই যায়। একা একা বা সহযোগী ছাড়া ট্রেকিং করলেই কি আল্পাইনিজম হয়ে যায়? কখনই হয় না। একজন আল্পাইনিস্টকে পর্বতের সকল ব্যাকরণ জানতে হয়। সহজ কথায় বলতে গেলে ‘সকল পর্বতারোহী আল্পাইনিস্ট নয়, সকল আল্পাইনিস্টই পর্বতারোহী।’ পর্বতারোহণ হলো সাধনার বিষয়, শেখার বিষয়। তাই নবীনদের না জেনে শুনে হঠাৎ করে আবেগ ও রোমাঞ্চিত হয়ে কিছু করা সত্যিই বোকামি। এর ফলে অপূরণীয় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।

পর্বতারোহণের উচ্চতর প্রশিক্ষণের মূল অংশ হল এর অভিযান। বেইজ ক্যাম্পের তৃতীয় দিন থেকে শুরু হলো মূল অভিযান। ঝড়ের তেজ কমছেই না। সময় যতো বাড়ছে, তুষারঝড়ও বাড়ছে। আমরা তাঁবুতে সাতজন। তাঁবুর চারপাশে আমরা তাঁবু ধরে ঝড়ের সাথে যুদ্ধ করছি। তিন-চার ঘণ্টা ধরে একই অবস্থা। কোনভাবেই ঝড়ের তেজ থেকে তাঁবু রক্ষা করতে পারছি না। যদি তাঁবু ভেঙ্গে যায় তাহলে আমাদের স্লিপিং ব্যাগসহ সকল পোশাক ও জিনিসপত্র তুষারে ভিজে যাবে। আর ভিজে গেলেই হল, অভিযান শেষ। শুধু অভিযানই শেষ না, ফ্রস্টবাইট এমনকি মৃত্যুও হতে পারে। তাপমাত্রা হিমাংকের ২০ ডিগ্রি নিচে। প্রচণ্ড ঠাণ্ডা বাতাসের সাথে তুষারও তাঁবুর ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। তাই স্লিপিং ব্যাগসহ সকল পোশাক ও জিনিসপত্র বড় পলিপ্যাকে ঢুকিয়ে ফেললাম। ভয়ংকর একটি সময় পার করছি। রাত বারোটার দিকে ঝড় থেমেছে। ঝড় থামলেও তুষারপাত থামেনি। আমরা তাঁবু থেকে বাহিরে এসে দেখি আমাদের বেশির ভাগ তাঁবুই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে এবং তুষারের ভেতরে অর্ধেক ডুবে আছে।

চার দিনের ট্রেকিং শেষে ৪ই মে আমরা বেইজ ক্যাম্পে এসে পৌঁছাই। আবহাওয়ার সাথে আমাদের শরীর মানিয়ে নিতে এখানে আমাদের তিন চার দিন থাকতে হবে। এই কয়দিন আমরা ডুকরানি বামক গ্লেশিয়ারে ক্লাইম্বিং প্র্যাকটিস করেছি। ৮ই মে আমাদের বেসক্যাম্প থেকে অ্যাডভান্স বেইজ ক্যাম্পে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রেখে আসার কথা। কিন্তু আবহাওয়া সকাল থেকেই খারাপ হওয়ায় অ্যাডভান্স বেইজ ক্যাম্পে আর যাওয়া হল না। সারাদিন তাঁবুর ভেতরেই কাটাতে হল। গত কয়েকদিন টানা তুষারপাত হওয়াতে হাঁটু পর্যন্ত বরফ জমেছে। বরফের কঠিন পথ পারি দিয়ে আমরা ৬ ঘণ্টা পর অ্যাডভান্স বেইজ ক্যাম্পে এসে পৌঁছাই। এখানে আমরা প্রতি তাঁবুতে সাতজন করে থাকি। পাশের উঁচু পাহাড় থেকে একটু পরপর তুষারধ্বস হচ্ছে চারপাশ কাঁপিয়ে। একটি বড় তুষারধ্বস আমাদের ক্যাম্পের পাশ দিয়েই চলে যায়। রাতে তাঁবুর ভেতরে থাকায় সেটা দেখা হয়নি তবে বিকট শব্দ পেয়েছি। সকালে সেই তুষার ধ্বস দেখে সবারই চোখ কপালে। একটুর জন্য আমাদের ক্যাম্প রক্ষা পেয়েছে। তবে যেখান থেকে আমাদের খাবার পানি সংগ্রহ করতে হয় তার উপর দিয়েই ধ্বসটি চলে গেছে।

আজ ভোরেই জনলির কাঁধ ঘেষে সূর্য তার অস্তিত্ব জানান দিল। আমরা আজ ক্যাম্প-১ পর্যন্ত রোড ওপেন করতে ও মালামাল রেখে আসতে ট্রেকিং শুরু করলাম। পুরো পথটিই একটি গ্লেসিয়ারের উপর দিয়ে। হাঁটু পর্যন্ত তুষার তাই এগিয়ে চলতে খুবই বেগ পেতে হচ্ছে। পুরোটা পথে অসংখ্য ওপেন ক্রেভার্স ও হিডেন ক্রেভার্স। তাই খুবই সাবধানে পা ফেলতে হচ্ছে।

কঠিন কঠিন চড়াই পার হয়ে আমরা ক্যাম্প-১ এ পৌঁছাই। এখানে একটি তাঁবু করে তার ভেতরে মালামাল রেখে আবার অ্যাডভান্স বেইজ ক্যাম্পে ফিরে আসি। সারারাত তুষারপাতে ক্যাম্প-১ এর পথ আগের মতোই বরফে মিলিয়ে গেছে। তাই নতুন করে আবার রোড ওপেন করে ক্যাম্প-১ আসতে হয়েছে। এখানে যে তাঁবুতে মালামাল রেখেছিলাম সেই তাঁবু রাতের ঝড়ে ভেঙে বরফের নিচে চাপা পরে আছে। মুহূর্তের মধ্যেই আকাশ কালো মেঘে ছেয়ে গেল। তাড়াতাড়ি তাঁবু লাগিয়ে তাঁবুর ভেতরেই দুপুরের খাবার তৈরি করতে হল। এখানে নিজেদের খাবার নিজেদেরই তৈরি করতে হচ্ছে।

বিকেলে সামিটের রোড ওপেন করতে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু আবহাওয়া খারাপ হওয়ায় আর যাওয়া হলো না। রাত তিনটায় ক্যাম্প-১ থেকে সামিটের উদ্দেশে রওনা হলাম। হাঁটুর উপর পর্যন্ত বরফ ঠেলে কঠিন খাড়া চড়াইয়ে দঁড়ি ফিক্স করতে করতে আর রোড ওপেন করে স্বপ্নের পথে এগিয়ে চলছি। ১৪ই মে ভারতীয় সময় সকাল ৯ টা ২২ মিনিটে ১৮ হাজার ৭১১ ফিট উঁচু ভারতের উত্তরাখণ্ড অঞ্চলের গাড়ওয়াল হিমালয়ের দ্রুপদী কা ডান্ডা-২ এর চূড়ায় পৌঁছাই। তুলে ধরি অহংকারের লাল-সবুজের পতাকা। ভারতীয় সেনাবাহিনীর তত্বাবধানে পাঁচটি দেশের ৪২ জন্য অভিযাত্রীর মধ্যে ৩৯ জন সফলভাবে আরোহণ করি।


(Visited 1 times, 1 visits today)

One thought on “নেহরু ইনস্টিটিউট অব মাউন্টেনিয়ারিং: আমার অভিজ্ঞতা

  1. ‘সকল পর্বতারোহী আল্পাইনিস্ট নয়, সকল আল্পাইনিস্টই পর্বতারোহী।’ – দারুন লিখেছো শাকিল। তবে কয়েকটি শব্দ বুঝি নি – “ভলদ্যুতি, জুমার উইথ ইতিয়র, জুমার উইথ আল্পাইন ক্ল্যাস” – এগুলি বুঝিয়ে বললে ভালো হত।

মন্তব্য করুন

*Please Be Cool About Captcha. It's Fun! :)