অভিযান-অভিযাত্রী-মানচিত্র (শেষ পর্ব)


আগের পর্ব পড়ুন: ১ম পর্ব | ২য় পর্ব | ৩য় পর্ব | ৪র্থ পর্ব                                    

ম্যাপ রিডিং সম্পর্কে একটা মোটামুটি আলোচনা হল। এই আলোচনা সম্পূর্ণভাবেই একটা তাত্ত্বিক আলোচনা। এই সম্পর্কে চাক্ষুষ কিছু পরিচয় বা মাঠে ঘাটে ঘুরে দেখা বা দেখানোর সুযোগ ছিল না বলে বি‌ষয়ের বেশ গভীরে যাওয়া সম্ভব হল না। ফলে অনেকটাই জানার বাকি র‌ইল। অনেকের মনে হয়তো অনেক প্রশ্ন‌ও থেকে গেল। তার সমাধানের জন্য নিজেকে যেমন সচেষ্ট হতে হবে তেমনি আর‌ও শেখার সুযোগের অপেক্ষায় থাকতে হবে ।

যাই হোক এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেই ম্যাপ রিডিং সম্পর্কে কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলে বা মনে করিয়ে দিয়ে এই আলোচনায় ইতি টানব।

ম্যাপ রিডিংয়ের স্বর্ণ-বিধান

[১]  কেউ যদি ভেবে বসে থাকেন যে ম্যাপ রিডিং একমাত্র ভূগোলের ছাত্র-ছাত্রীদের বিষয় তাহলে মারাত্মক ভুল  করবেন এবং এক অকারণ হীনমন্যতায় ভুগবেন। স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পর্বে ভূগোলের যে পাঠ, খোঁজ নিয়ে দেখবেন তাতে রিডিংয়ের বিষয় অতি সামান্য, প্রায় নেই বললেই চলে। সব থেকে বড় কথা হল ভূগোল বিষয়টা বা তার পাঠ্যক্রম পর্বতারোহী বা ট্রেকারদের কথা মাথায় রেখে নির্ধারিত হয় নি। অভিযাত্রীদের কাছে ম্যাপ রিডিং বিষয়টা একশ ভাগ পর্বতারোহণ, ট্রেকিং, ক্যাম্পিং ইত্যাদি অ্যাডভেঞ্চার ভিত্তিক খেলার ওপর নির্ভর করে তৈরি হয়েছে। অভিযাত্রীরাই সেটা নিজেদের প্রয়োজনে নিজেদের মতো করে সহজভাবে তৈরি করে নিয়েছেন। সেদিক থেকে দেখতে গেলে ভৌগোলিক বা মানচিত্রকাররা অ্যাডভেঞ্চারের প্রয়োজন বা চাহিদার বিষয়ে প্রাথমিকভাবে অজ্ঞ‌ই থাকেন। মনে রাখবেন, অভিযাত্রীদের পর্বতারোহণ সংক্রান্ত শিক্ষণীয় বিষয় মানচিত্র পঠনের বিষয় থেকে অনেক বেশি কঠিন এবং শ্রমসাধ্য তাই যদি হয় তবে দুঃসাহসী অভিযাত্রীরা মানচিত্রকে(টোপোশীট) ভয় পাবেন কেন, কেন তারা তাকে সমীহ করে চলবেন?

[২] সাইকেল চালানো শিখতে গেলে একটা সাইকেল যে অবশ্যই দরকার, একথা নিশ্চয়‌ই মানবেন। আবার একথাও নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন যে সাঁতার শিখতে গেলেও পুকুর, নদী বা সুইমিংপুল না হলে চলবে না। এক‌ইভাবে ম্যাপ রিডিংয়ের ক্ষেত্রেও দরকার একাধিক টোপোশীট। আর তার স্কেল ১:৫০,০০০ অথবা ১: ২৫,০০০ হলেই ভাল। আরও ভাল হয় যে অঞ্চলের টোপোশীট সেই অঞ্চলে যদি সেই টোপোশীট নিয়ে ঘোরার সুযোগ থাকে।

[৩] টোপোশীট নিয়ে সেই টোপোশীটের অঞ্চলে গিয়ে ম্যাপ প্রথমে প্রকৃত দিকের সঙ্গে টোপোশীটের দিক মেলাতে (সেট করতে) হবে। তারপর টোপোশীটের ভেতর একটা একটা করে প্রতীক চিহ্ন দেখে চারপাশের জমির ওপর ভৌগোলিক বিষয়বস্তুগুলো খুঁজে বার করতে হবে। জমির ঢালের সঙ্গে সমোন্নতি রেখা মিলিয়ে দেখতে হবে । ম্যাপ রিডিং শেখার‌ এটাই মূল চাবিকাঠি।

[৪]  একটা কার্পেট মাটিতে পাতা আছে। আপনিও তার পাশে মাটিতে শুয়ে পড়লেন। এইবার বলুন এইভাবে শুয়ে শুয়ে কার্পেটে যে নক্সা আঁকা আছে সেটা কী ভালো ভাবে দেখতে পারবেন ? না, দাঁড়িয়ে একটু উঁচু থেকে দেখলে  কার্পেটের নক্সাটা  ভাল দেখবেন ? ম্যাপ রিডিংয়ের ক্ষেত্রেও তাই। আপনি যদি একটা উঁচু টিলা বা পাহাড়ের ওপর থেকে (অবশ্য যদি সেই অঞ্চলে তেমন কিছু থাকে) টোপোশীটটা হাতে নিয়ে চার পাশটা দেখেন তাহলে আপনার দেখাটা আরো ভালো হবে। এক জায়গা থেকেই অনেক কিছু দেখতে পাবেন এবং তাদের চিনে নিতে‌ও সুবিধা হবে ।

[৫]  আপনি একটা সাইকেল কিনে সেটা বৈঠকখানায় রেখে দিলেন , মাঝে মধ্যে ঝাড়পোঁছ করলেন, বন্ধুবান্ধবদের দেখালেন, এই করলেই আপনি সাইকেল চড়া শিখে যাবেন?

আপনার বাবা ‘How to Swim’ নামে একটা ভাল সাঁতার শেখার ব‌ই আপনাকে কিনে দিয়েছেন। সারাদিন নদী বা পুকুরের পাশে বসে সেটা ভাল করে পড়লেই আপনি সাঁতার শিখে যাবেন? উত্তরটা নিশ্চয়ই আমায় বলে দিতে হবে না ! ম্যাপ রিডিংয়ের ক্ষেত্রেও তাই। ম্যাপ নিয়ে মাঠে ময়দানে নামতে হবে। তা না হলে ম্যাপ হাতে নিয়ে ঘরে বসে থাকলে তার সব রহস্য উন্মোচিত হবে না।

[৬]  টোপোশীট অনেকটা পুরোনো আমলের গ্রামোফোনের ডিস্কের মতো। শুধু সেটা হাতে পেলে যেমন গান শোনা যায় না, তার জন্য একটা মেশিন লাগে, একটা ভাল পিনও লাগে। টোপোশীটের বেলাতেও তাই। মেশিনটা হল অভিযাত্রী, আর তার ‘দেখার চোখ’ হল ওই পিন। যার যত তীক্ষ্ণ দৃষ্টি হবে তিনি তত বেশি তথ্য টোপোশীট থেকে সংগ্রহ করতে পারবেন।

[৭]  আবার সাইকেল চালানো বা সাঁতার শেখার মতোই ম্যাপ রিডিং একবার শিখতে পারলে জীবনে কেউ কোনদিন সেটা ভুলে যাবেন না।

[৮]  তবু সব বিদ্যার মতোই ম্যাপ রিডিংয়ের চর্চাও অত্যন্ত জরুরী। সেটা নতুন শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে সব থেকে ভাল উপায় হল, যে আলোচনা এখানে হল অথবা অন্য সূত্রে যদি ম্যাপ রিডিং সম্পর্কে আরো কিছু তত্ত্ব বা তথ্য জানা যায় তাহলে প্রতি মাসে তার ওপর একটা আলোচনা-চক্র আহ্বান করা যেতে পারে। এক এক মাসে একজন কী দু’জন বলবেন। প্রশ্নোত্তর পর্ব চলবে। যে প্রশ্নের সঠিক উত্তর পাওয়া যাবে না সেটা লিখে রাখতে হবে। পরে অভিজ্ঞ কারো কাছ থেকে তার উত্তরটা জেনে নিতে হবে। এই ভাবেই সকলের সামনে বলতে বলতে সকলেই ধীরে ধীরে বিষয়টা আত্মস্থ করে ফেলবেন। মানচিত্র‌ (টোপোশীট) হয়ে উঠবে অভিযানে অভিযাত্রীর কাছে অন্ধের যষ্টি, অপথেও পথ দেখাবার নির্ভরযোগ্য বন্ধু এবং অভ্রান্ত পথনির্দেশক।

[সমাপ্ত]

(Visited 1 times, 1 visits today)
ত্রিদিব বসু
ত্রিদিব বসু
ভারত সরকারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ন্যাশনাল অ্যাটলাস অ্যান্ড থিমেটিক ম্যাপিং অর্গানাইজেশন (ন্যাটমো)'র সাবেক যুগ্ম পরিচালক।

মন্তব্য করুন

*Please Be Cool About Captcha. It's Fun! :)