অভিযান-অভিযাত্রী-মানচিত্র (৪র্থ পর্ব)


আগের পর্ব পড়ুন: ১ম পর্ব | ২য় পর্ব | ৩য় পর্ব                                      

[এক]

আগের পর্বে টোপোশীটের চিত্র নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। এখন টোপোশীটের মান নিয়ে কয়েকটা কথা বলি। যেহেতু এই মানের ওপর নির্ভর করেই চিত্রগুলো আঁকা হয় তাই এবার মান ঠিক মতো বুঝলে মানচিত্র বিষয়ক ধারণাও সম্পূর্ণ হবে।

এই আলোচনার ২য় পর্বে আমরা দেখেছি মান বলতে মূলত তিনটি বিষয়কে নির্দেশ করে,
১) দূরত্ব
২) দিক এবং
৩) উচ্চতা

আরও দুটো মান আছে কিন্তু তাদের উল্লেখ এখনই করছি না তার কারণ একজন অভিযাত্রীর কাছে সেই দুটো মানের থেকে প্রথম তিনটে মানের গুরুত্ব অনেক বেশি ।

তাহলে এই পর্বের আলোচনা দূরত্ব দিয়ে শুরু করা যাক।  যে কোন মানচিত্রের দূরত্ব তার ‘স্কেল’ দিয়ে বোঝানো হয়। ‘স্কেল’ এর অর্থ একটা সম্পর্ক। মানচিত্রের সঙ্গে আমাদের ভূপৃষ্ঠের সম্পর্ক। ভূপৃষ্ঠের যে অংশটি  মানচিত্রের যে নির্দিষ্ট অংশে আঁকা হয়েছে তাদের মধ‍্যেকার সম্পর্ক । ভূপৃষ্ঠের এক কিলোমিটার জায়গার চিত্র যদি কোনও মানচিত্রের ভেতর এক সেন্টিমিটার জায়গায় আঁকা হয়ে থাকে তবে সেই মানচিত্রের স্কেল হল ‘এক সেন্টিমিটার = এক কিলোমিটার’। এর অর্থ এই মানচিত্রে একটা গ্রাম থেকে আর একটা গ্রামের দূরত্ব যদি পাঁচ সেন্টিমিটার হয় তাহলে ওই একটা গ্রাম থেকে আর একটা গ্রামে যেতে আমাদের পাঁচ কিলোমিটার হাঁটতে হবে।

যদি আরো একটা মানচিত্রে ভূপৃষ্ঠের ১০০ কিলোমিটার জায়গার চিত্র, মানচিত্রের ওই এক সেন্টিমিটার জায়গায় আঁকা হয় তবে তার স্কেল হবে ‘এক সেন্টিমিটার = একশ কিলোমিটার’। সেক্ষেত্রে ওই মানচিত্রে দুটো শহর ২ সেন্টিমিটার দূরে থাকলে, একটা থেকে আর‌ একটায় যেতে আমাদের ২০০ কিলোমিটার পাড়ি দিতে হবে।ওই মানচিত্রে একটা নদী যদি ১০ সেন্টিমিটার লম্বা হয় তার অর্থ সেটা আসলে (১০ x ১০০)= ১০০০ কিলোমিটার লম্বা।

কলকাতা থেকে ঢাকা পাখি ওড়া দূরত্বে মোটামুটি ২৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে। এখন আমরা যদি ১ সেন্টিমিটার = ৫০ কিলোমিটার স্কেলে ওই দুটো শহর দেখিয়ে কোনো মানচিত্র আঁকতে যাই তাহলে কলকাতা থেকে ঢাকাকে অবশ‍্য‌ই ৫ সেন্টিমিটার দূরে দেখাতে হবে। তার কারণ ৫ সেন্টিমিটার x ৫০ = ২৫০ কিলোমিটার ।

একটা কথা মনে রাখতে হবে স্কেল ছাড়া কোনও মানচিত্র‌ই কিন্তু প্রকৃত মানচিত্র হিসেবে বিবেচিত হয় না স্কেল না থাকলে সেটা স্কেচ ম‍্যাপ হিসেবে গণ্য হবে।

ওপরে উল্লেখিত স্কেল দুটোর মধ‍্যে পার্থক্য হল মানচিত্রের এক‌ই জায়গার (এক সেন্টিমিটার) মধ‍্যে একটায় মাত্র এক কিলোমিটার অন‍্যটায় একশ কিলোমিটার ভূপৃষ্ঠের চিত্র আঁকা হয়েছে। ফলে এক‌ই পরিসরে দ্বিতীয় মানচিত্রে যেহেতু অনেক বেশি জায়গার চিত্র আঁকতে হচ্ছে সেহেতু তার প্রতীক চিহ্নগুলো হয় ছোট করে আঁকতে হবে নয়তো তাদের থেকে অবশ‍্য‌ই কিছু বাদ দিতে হবে। আর তাই প্রথমটার প্রেক্ষিতে দ্বিতীয়টা ছোট স্কেলের মানচিত্র

ওপরের স্কেল যেভাবে লেখা হল [এক সেন্টিমিটার = এক কিলোমিটার অথবা, এক সেন্টিমিটার = একশ কিলোমিটার] তাকে বলে ‘অক্ষর স্কেল’ বা Scale in Words

আরও দু’ভাবে মানচিত্রে স্কেল বোঝানো হয়। ‘এক সেন্টিমিটার = এক কিলোমিটার’ না লিখে আমি মানচিত্রে একটা এক সেন্টিমিটার লাইন টেনে তার ওপর যদি লিখে দি‌ই এক কিলোমিটার, তাহলেও মানেটা এক‌ই হয় । এর নাম ‘লাইন স্কেল’ বা ‘Linear Scale’

তৃতীয় স্কেল হল Representative Fraction Scale’ বা ‘আনুপাতিক স্কেল । ‘এক সেন্টিমিটার = এক কিলোমিটার’ না লিখে আমি লিখতে পারি : ১০০,০০০। তার কারণ ১ (সেমি) : (১কিমি. = ১০০০ মিটার = ১০০,০০০ সেমি.)। এখানে ১ হল মানচিত্রের একক আর ১০০,০০০ হল ভূপৃষ্ঠের একক।

সব টোপোশীটেই এই তিনটি স্কেল পাশাপাশি দেওয়া থাকে। আগের পর্বে আমরা যে তিন রকম ( ১:২৫০,০০০,  ১:৫০,০০০, ১:২৫,০০০) স্কেলের কথা বলেছি সেগুলো সব‌ই হল টোপোশীটের Representative Fraction Scale’ বা ‘আনুপাতিক স্কেল। সেখানেও মানচিত্রের ১ সেন্টিমিটার জায়গায় কোথাও পৃথিবীর ২৫০,০০০ কোথাও ৫০,০০০ কোথাওবা ২৫,০০০ সেন্টিমিটারের ছবি আঁকা হয়েছে । এই তিন ধরনে টোপোশীটের মধ‍্যে কোনটা অপেক্ষাকৃত ছোটো বা বড় স্কেলের সেটা নিশ্চয়ই আর বুঝিয়ে দিতে হবে না ।

[দুই]

মানচিত্রের দ্বিতীয় মান হল দিক। যে কোনো টোপোশীটে দিক নির্দেশ করে এমন কোনও লাইন টানা থাকে না। একটা টোপোশীট সোজা করে ধরলে তার ওপরের দিকটাই হল উত্তর দিক। সেই হিসেবে তার বিপরীত দিক অর্থাৎ টোপোশীটের নিচের দিকটা দক্ষিণ দিক, ডান দিকটা পূর্ব এবং বাঁ দিকটা পশ্চিম। ইংরেজিতে এই দিকগুলোকে বলে Cardinal Directions অর্থাৎ প্রধান দিক। সাধারণত এই চারটে দিক‌ই আমরা বেশি উল্লেখ করে থাকি। এই চারটে প্রধান দিকের মধ‍্যবর্তী দিকগুলো হল উত্তর-পূর্ব, উত্তর-পশ্চিম, দক্ষিণ-পূর্ব, দক্ষিণ-পশ্চিম। ইংরেজিতে এদের বলা হয় Primary Inter-Cardinal Directions অথবা Ordinal Directions।

ম‍্যাপ রিডিং ঘরে বসে খানিকটা করা যায় ঠিক‍ই কিন্তু প্রকৃত ম‍্যাপ রিডিং তখনই হয় যখন যেখানকার ম‍্যাপ সেই অঞ্চলে গিয়ে ম‍্যাপটা দেখা হয়। সেই সময় ম‍্যাপ রিডিংএর প্রথম কাজ‌ই হল দেখা বা পড়া শুরু করার আগে প্রকৃত দিকের সঙ্গে ম‍্যাপের দিক মেলানো। একে ইংরেজিতে বলে ম‍্যাপ set করা বা দিক মেলানো। তা না হলে ম‍্যাপে আঁকা বিষয়বস্তুগুলোকে দিক মিলিয়ে চার দিকে খুঁজে পাওয়া যাবে না।

যে অঞ্চলের ম‍্যাপ সেই অঞ্চলে নিয়ে গিয়ে, চার দিকের ভৌগোলিক বিষয়বস্তুগুলো ম‍্যাপের সঙ্গে মিলিয়ে, ম‍্যাপের দিক মোটামুটি মেলানো যায় ঠিক‌ই, কিন্তু প্রথম দিকে তাতে অসুবিধা হতে পারে অথবা একদম ঠিক ঠিক মেলানো নাও সম্ভব হতে পারে। তাই এই কাজটা করার জন‍্য সব থেকে ভাল উপায় হল কম্পাসের সাহায্য নেওয়া। এবং সেই কম্পাসটা যেন অবশ‍্য‌ই স্বচ্ছ প্লাস্টিক বা ওই জাতীয় জিনিসের ওপর বসানো থাকে। তার কারণ সেই কম্পাস ম‍্যাপের ওপর রাখলে তার ভেতর দিয়ে নিচে ম‍্যাপের লেখা বা প্রতীক চিহ্নগুলো ঢাকা পড়ে যাবে না। পড়তে সুবিধা হবে।


পড়ুন ল্যাংটাং ডায়েরি


যত কম্পাস বাজারে পাওয়া যায় তার মধ‍্যে, আমি যতদূর জানি, সুইডেনের Silva Compassই ম‍্যাপ রিডিং এর জন‍্য আদর্শ। এদের কাছ থেকে দু’রকমের কম্পাস পাওয়া যায় । প্রথমটা হল সাধারণ কম্পাস । (Silva Expedition, Silva Polaris, Silva Ranger) যাদের বর্তমান দাম ভারতীয় টাকায় ১৬০০ থেকে ৩২০০র মধ‍্যে। আর দ্বিতীয়টা হল আয়না বা mirror কম্পাস । ( Silva Ranger 515, Silva Ranger CLQ, Silva CL) যাদের দাম ৫৬০০ থেকে ৮২০০র মধ‍্যে। পর্বতারোহীর বা উচ্চমার্গের ট্রেকারদের দ্বিতীয় ধরনের কম্পাস বিশেষভাবে কাজে লাগতে পারে তা না হলে সাধারণ কম্পাস‌ই ম‍্যাপ রিডিংয়ের জন‍্য যথেষ্ট। কয়েক বছর হল ‘আয়না কম্পাসের’ দর্শনধারী চিনা সংস্করণ বেরিয়েছে।দাম খুবই কম, মাত্র ২০০টাকা। কিন্তু সেই কম্পাসের কার্যকারিতা এবং আয়ু দুইই আসলের ধারে কাছে আসে না।

আমরা সকলেই জানি কম্পাসের কাঁটা সব সময় উত্তর দিক নির্দেশ করে। একে বলে Magnetic North বা চৌম্বকীয় উত্তর। অনেকে হয়তো এটাও জানেন যে পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধে যে চৌম্বক ক্ষেত্র বা magnetic field আছে সেটাই এই কাঁটাকে তার দিকে টানে। আর ঠিক সেই কারণেই এর মধ‍্যেই একটা সমস‍্যা লুকিয়ে থাকে ।

এর একটু ব‍্যাখ‍্যা প্রয়োজন। আসলে ম‍্যাপ রিডিংয়ের ভাষায় তিন রকমের ‘উত্তর’ (North) আছে। প্রথম ‘চৌম্বকীয় উত্তর’ যা চৌম্বকীয় ক্ষেত্র দ্বারা নির্ধারিত হয়, দ্বিতীয় ‘ভৌগোলিক উত্তর’ যা উত্তর মেরুকে নির্দেশ করে আর তৃতীয়টি হল ‘গ্রিড নর্থ’ যা টোপোশীটের গ্রিড লাইন নির্দেশ করে। যে দুটি ‘মানের’ উল্লেখ আমি আগে করিনি তার একটি হল এই গ্রিড লাইন যেহেতু সব টোপোশীটে গ্রিড লাইন থাকে না এবং একমাত্র সামরিক বাহিনীর লোকেদের জন‍্য‌ই গ্রিড লাইন ব‍্যবহৃত হয় সেই কারণে গ্রিড লাইন বা গ্রিড নর্থ নিয়ে আমাদের না ভাবলেও চলবে।

সব টোপোশীটের ডাইনে বাঁয়ে দুই সীমানায় এবং মধ‍্যে যে দ্রাঘিমাংশ আঁকা থাকে তার সবগুলোই ওপরের দিকে ‘ভৌগোলিক উত্তর’ আর নিচের দিকে ‘দক্ষিণ’ দিক নির্দেশ করে। এই ভৌগোলিক উত্তরের বা দক্ষিণের কোনও রকম পরিবর্তন কখনোই হয় না। এক‌ইভাবে অক্ষাংশ রেখাগুলো পূর্ব অথবা পশ্চিম দিক নির্দেশ ক‍রে। এর‌ও কোন পরিবর্তন হয় না। এই অক্ষাংশ দ্রাঘিমাংশ হল মানচিত্রের পঞ্চম ‘মান’।

এখন চৌম্বকীয় ক্ষেত্র এবং উত্তর মেরুর অবস্থান এক জায়গায় নয় । সেই কারণে দ্রাঘিমাংশ যে দিকে উত্তর দিক নির্দেশ করে কম্পাসের কাঁটা সব সময় সেই দিকেই উত্তর দিক নাও দেখাতে পারে। চৌম্বকীয় ক্ষেত্র নিয়ে আরও একটা সমস্যা হল সে সব সময় পরিবর্তনশীল অর্থাৎ ৫০ বছর আগে চৌম্বকীয় ক্ষেত্র যেখানে ছিল এখন সেখানে নেই। আবার এখন যেখানে আছে কয়েক বছর পর সেখানে থাকবে না। ফলে কম্পাসের কাঁটা দেখে তার সঙ্গে ম‍্যাপের দিক মেলানো বেশির ভাগ যায়গাতেই একটা সমস্যা হতে পারে।

৩০ বছর আগে এই চৌম্বকীয় ক্ষেত্রটি ছিল কানাডার উত্তর প্রান্তে বুথিয়া উপদ্বীপে ( ৯৫° পশ্চিম / ৭০° উত্তর )। বর্তমানে সেটি আর‌ও উত্তরে উঠে (৮৬° উত্তর / ১৭২° পশ্চিম)  উত্তর মেরু থেকে মাত্র ২৭৬ কিলো মিটার দক্ষিণে, অবস্থান করছে। বর্তমানে সেটি প্রতি বছর ৫০ থেকে ৬০ কিলোমিটার করে সরে যাচ্ছে এবং বৈজ্ঞানিকদের ধারণা ২০৩০ সালে সেটি রাশিয়ার উত্তরে আর্কটিক সাগরে পৌঁছে যাবে।

এখন চৌম্বকীয় ক্ষেত্রটি উত্তর মেরু থেকে ২৭৬ কি.মি. দূরে আছে বলে কম্পাসের কাঁটাও সেই দিকেই মুখ করে থাকবে, উত্তর মেরুর অর্থাৎ ভৌগোলিক উত্তরের  দিকে নয় । ফলে মূলতঃ পৃথিবীর যে স্থানগুলো উত্তর মেরু আর চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের সঙ্গে এক রেখার ওপর থাকবে সেই জায়গাগুলো বাদ দিলে  বাকি সব জায়গাতেই ভৌগোলিক উত্তর আর চৌম্বকীয় উত্তরের মধ‍্যে কিছু না কিছু পার্থক্য তৈরি হবেই। একে বলে ‘চৌম্বকীয় পার্থক্য’ বা ‘Magnetic Variations’। সব টোপোশীটেই ওপরের দিকে টোপোশীটের নম্বরের বাঁদিকে ওই অঞ্চলের magnetic variation কত সেটা লেখা থাকে। ওই অঞ্চলের কম্পাস রিডিং নেবার পর চৌম্বকীয় পার্থক্য অনুযায়ী সেটাকে সংশোধন করে নিলেই দুই উত্তরের মধ‍্যে আর কোনও তফাৎ থাকবে না। টোপোশীটকেও সেই অনুযায়ী সেট করে নেওয়া সম্ভব হবে।

কোনও একটা সময়ে পৃথিবীর যে স্থানগুলোয় magnetic variation শূন‍্য, তাদের সংযোগকারী রেখার নাম Agonic Line সৌভাগ‍্যের বিষয় এই লাইনটা ভারতীয় উপমহাদেশের ওপর দিয়েই গিয়েছে। ফলে এই অঞ্চলের যে কোনও জায়গায় magnetic variation কখনো ১°র বেশি দেখা যায় না। ফলে ম‍্যাপ রিডিং এর সময় আমাদের এই বিষয়ে দুশ্চিন্তা না করলেও চলবে।

[তিন] 

 

টোপোশীটের তৃতীয় মানটি হল ভৌগোলিক বিষয়বস্তুগুলোর উচ্চতা। অধিকাংশ অভিযাত্রীর দৃষ্টিভঙ্গী অনুযায়ী, এটাই টোপোশীটের সব থেকে দুর্বোধ‍্য এবং জটিলতম মান।

একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খেয়াল রাখতে হবে যে প্রায়  সব ভৌগোলিক বিষয়বস্তুগুলো তিন মাত্রার (three dimensional) হলেও সেগুলো যেখানে আঁকা হচ্ছে সেই মানচিত্রের কিন্তু মাত্রা দুটো – দৈর্ঘ্য আর প্রস্থ। সেখানে তৃতীয় মাত্রা উচ্চতা বলে কিছু নেই।


সমন্নোতি রেখা / ছবি [উইকি মিডিয়া কমনস]


মানচিত্রে সব জিনিসের উচ্চতাকে এড়িয়ে গেলেও একটা পাহাড় বা পর্বতের উচ্চতাকে তো আর অস্বীকার করা যায় না। তাই তাদের সেই উচ্চতাকে মানচিত্রে সঠিকভাবে বোঝাবার জন‍্য‌ই সমন্নোতি রেখা বা Contour Line এর সাহায‍্য নেওয়া হয়েছে। এই দু’মাত্রার প্রতীক থেকে তিন মাত্রার কোনও বিষয়কে ধারণা করা প্রথম প্রথম একটু জটিল বা কঠিন মনে হতে পারে। কিন্তু যে কোনো জিনিসই অধিগত করা চর্চা সাপেক্ষ। সমন্নোতি রেখার অর্থ হল, সমুদ্র-পৃষ্ঠ থেকে এক‌ই উচ্চতা বিশিষ্ট স্থানগুলোর সংযোগকারী কাল্পনিক রেখা।



ধরা যাক আমাদের সামনে, ডালের বড়ির আকারে একটা বড় পাহাড় আছে। তার তলাটা চারদিকেই সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১০ মিটার উঁচু। এইবার সেখান থেকে একটু ওপরের দিকে উঠলে একসময় এমন একটা স্থান পাব যার উচ্চতা ২০ মিটার। পাহাড়টার চারদিকেই এই রকম অনেক ২০মিটার উচ্চতার স্থান থাকবে। তার‌ ওপরে ৩০ মিটার উচ্চতার‌ও বেশ কিছু স্থান পাহাড়টার চারদিকে পাব। পাহাড়ের সর্বোচ্চ বিন্দু হল ৪০ মিটার। এখন পাহাড়ের একেবারে নিচে ১০ মিটারের জায়গাগুলো একটা কাল্পনিক রেখা দিয়ে যুক্ত করলাম। এক‌ই ভাবে ২০ এবং ৩০ মিটারের স্থানগুলোকেও আলাদা দুটো কাল্পনিক রেখা দিয়ে যুক্ত করলে আমরা ১০,২০ এবং ৩০ মিটারের তিনটে সমোন্নতি রেখা বা contour line পাব। এইবার এই তিনটে কাল্পনিক রেখাকে মানচিত্রের স্কেল অনুযায়ী যদি মানচিত্রে এঁকে তাদের মাঝখানে একটা শৃঙ্গের প্রতীক চিহ্ন দিয়ে ৪০ এবং তিনটি সমোন্নতি রেখায় ১০, ২০ আর ৩০ লিখে দিই তাহলেই ত্রিমাত্রিক পাহাড়টাকে মানচিত্রের দু’মাত্রায় বোঝানো হল।

এইভাবে পৃথিবীর যেকোনও ভূসংস্থান (Landforms) যেমন সমভূমি, উচ্চাবচ ভূমি, উপত‍্যকা, মালভূমি, পাহাড়, পর্বত, গিরিশিরা, খাড়া পাথরে ঢাল ইত‍্যাদি সব‌ই সমোন্নতি রেখা এঁকে আর তাদের মান উল্লেখ করে সহজেই বোঝানো সম্ভব।


সমন্নোতি রেখার স্বর্ণ-বিধান

[১] মানচিত্রে সমোন্নতি রেখা সব সময় খয়েরি রঙের লাইন দিয়ে বোঝানো হয়।

কিন্তু যে কোন তুষার ক্ষেত্র বা ছোটো খাটো জমা বরফের স্তরের ওপর দিয়ে যদি এই কাল্পনিক সমোন্নতি রেখা চলে যায় তাহলে মানচিত্রে সেগুলো হয়ে যাবে খয়েরি রঙের বদলে নীল রেখা । হিমবাহের ওপর সব প্রতীক চিহ্নের রঙ‌ও ওই এক‌ই নিয়ম মেনে নীল রঙের হয়ে থাকে।

[২] দুটো সমোন্নতি রেখার মধ‍্যে সব জায়গায় সমান দূরত্ব নাও থাকতে পারে । কিন্তু তারা কখনোই একে অপরকে কাটবে না বা টপকে যাবে না সব সময় পাশাপাশি চলবে ।

[৩] ভূসংস্থান এবং মানচিত্রের স্কেল অনুযায়ী সমোন্নতি রেখার মান নির্ধারিত হয় । যেমন বাংলার সমভূমি অঞ্চলের একটা ১: ৫০,০০০ স্কেলের টোপোশীটে যখন দুই পাশাপাশি সমোন্নতি রেখার মানের পার্থক্য (contour interval) ১০ মিটার‌ই যথেষ্ট তখন ওই এক‌ই স্কেলের হিমালয় অঞ্চলের টোপোশীটে সেই পার্থক্য রাখতে হয় ৪০ মিটার। কেননা হিমালয়ে জমির ঢাল বেশি হ‌ওয়ার দরুন ১০ মিটারের পার্থক্য রাখলে অনেক বেশি সমোন্নতি রেখা টানতে হবে যার ফলে টোপোশীট জটিল হয়ে যাবে, দৃষ্টিকটু লাগবে। আবার হিমালয়ের ১:২৫০,০০০ স্কেলের টোপোশীটে সেটা ৪০ মিটারে‌ও রাখা যাবে না, ২০০ মিটার করতে হবে।

[৪] সমতল ভূমিতে যেহেতু ঢাল কম তাই সমোন্নতি রেখাগুলো একটু দূরে দূরে থাকে। ফলে দুই সমোন্নতি রেখার মধ্যে যদি কোন বিশেষ স্থানের উচ্চতা বোঝাতে হয় তখন সেই বিশেষ স্থানে একটা কালো বিন্দু দিয়ে তার উচ্চতা যত মিটার সেটা লিখে দেওয়া হয় । যেমন . 345। একে বলে spot height বা স্থানিক উচ্চতা।

[৫] ধরা যাক একটা ১:৫০,০০০ স্কেলে টোপোশীটের এক যায়গায় একটা পাহাড়ের ঢাল এক কিলো মিটারে, ৬০ মিটার থেকে ১০০ মিটার, অর্থাৎ (১০০ – ৬০)= ৪০ মিটার উঠে গেছে। সমন্নোতি রেখার পার্থক্য ১০ মিটার হলে সেই পাহাড়ের ঢাল ঠিকঠাক বোঝাতে সেই টোপোশীটের ২ সেন্টিমিটার যায়গায় (কেন না স্কেল অনুযায়ী টোপোশীটের ২ সেন্টিমিটার = ১কিলো মিটার) ৫ টা সমোন্নতি রেখা,৬০,৭০,৮০,৯০ এবং ১০০ মিটারের লাইন টানতে হবে।

আবার সেই টোপোশীটের‌ই অন‍্য যায়গায় অথবা এক‌ই স্কেলের অন‍্য টোপোশীটে যদি ওই এক কিলো মিটারে কোনও পাহাড়ের ঢাল ১৫০ মিটার উঠে যায় তাহলে সেই টোপোশীটের ২ সেন্টিমিটার জায়গায় ১০টা সমোন্নতি রেখা, ৬০, ৭০, ৮০, ৯০, ১০০, ১১০, ১২০, ১৩০, ১৪০, ১৫০ মিটারের লাইন টানতে হবে। এক্ষেত্রে ঢাল বেশি বলে অনেক বেশি সমোন্নতি রেখা টানতে হল ।

অত‌এব স্বাভাবিকভাবেই এ থেকে স্থির সিদ্ধান্ত হল কোনও টোপোশীটে সমোন্নতি রেখা দূরে দূরে থাকলে বুঝতে হবে সেই অঞ্চলের জমির ঢাল অপেক্ষাকৃত কম। অন্যদিকে এক‌ই মানের সমোন্নতি রেখা ঘন সন্নিবদ্ধ হলে বুঝতে হবে সেখানকার ঢাল অন‍্য যায়গার থেকে বেশি


(Visited 1 times, 1 visits today)
ত্রিদিব বসু
ত্রিদিব বসু
ভারত সরকারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ন্যাশনাল অ্যাটলাস অ্যান্ড থিমেটিক ম্যাপিং অর্গানাইজেশন (ন্যাটমো)'র সাবেক যুগ্ম পরিচালক।

মন্তব্য করুন

*Please Be Cool About Captcha. It's Fun! :)