অভিযান-অভিযাত্রী-মানচিত্র (৩য় পর্ব)

দ্বিতীয় পর্ব পড়ুন এখানে

ভারতে তিন ধরনের টোপোশীট কিনতে অথবা দেখতে পাওয়া যায়। আশা করি বাংলাদেশেও পরিস্থিতি একই রকম। ভারতে মানচিত্রের স্কেল অনুযায়ী তাদের বিভাগ হল,

১) ১:২৫০,০০০
২) ১:৫০,০০০
৩) ১:২৫,০০০

ব‍্যক্তিগত সংগ্রহের জন‍্য ১:২৫,০০০ স্কেলের টোপোশীট হলে ক্ষতি নেই। তবে সবদিক বিচার করলে ১:৫০,০০০ স্কেলের টোপোশীট‌ই ম‍্যাপ রিডিং শেখার জন‍্য আদর্শ। শেখার জন‍্য এবং অভিযানে ব‍্যবহারের জন‍্য ১:২৫০,০০০ স্কেলের টোপোশীট মোটেই সুবিধাজনক নয়। অবশ্য এক‌ই অঞ্চলের তিন রকম স্কেলের ম‍্যাপ জোগাড় করতে পারলে  তিন ধরনের ম‍্যাপের তুলনামূলক বিচার করতে সুবিধা হবে।

ধরে নেওয়া যাক আমরা এক‌ই অঞ্চলের তিন রকম স্কেলের টোপোশীট  সংগ্রহ করতে পেরেছি। আমাদের যেমন প্রত্যেকের একটা নাম আছে, প্রত্যেকটা টোপোশীটের‌ও তেমনি একটা করে নম্বর আছে। যেমন 73 I (অর্থাৎ 73  আই) হল :২৫০,০০০ স্কেলের যে টোপোশীটটা পেয়েছি তার নম্বর। এই স্কেলের সব টোপোশীটের‌ই এই রকম 73 I অথবা 53 A অথবা 97 E – এই ধরনের নম্বর হয়।

১:৫০,০০০ স্কেলের টোপোশীট যেটা পেয়েছি তার নম্বর 73 I/4। এই স্কেলের সব টোপোশীটের নম্বর‌ও এই রকম 76 P/12 অথবা 94 D/11  এই ধরনের হবে।

আর :২৫,০০০ স্কেলের টোপোশীটের নম্বর 73 I/ 4/NE। ১:৫০,০০০ স্কেলের টোপোশীটকে সমান চার ভাগে ভাগ করে এক একটা কোনের ( NE, SE, NW, SW) অংশকে দ্বিগুণ বড় করে এই স্কেলে আঁকা হয়েছে। এই স্কেলের নম্বরগুলো 65 H/8/ SW  অথবা 40 C/12/ NW এইরকম হবে।

কীভাবে, কোথা থেকে এই নম্বরগুলো এলো সেটা প্রথমে জানা দরকার।

সে ২০০ বছরের‌ও আগের কথা। ভারতীয় উপমহাদেশে এবং তার পূর্ব পশ্চিমের দেশগুলোর সমস্ত টোপোশীট বানানোর কাজ বৃটিশরাই প্রথম শুরু করেছিল; মূলত নিজেদের ব্যবসায়িক, প্রশাসনিক ও সামরিক স্বার্থ রক্ষার অস্ত্র হিসেবেই। আর সামান্য কিছু উন্নয়নের কাজে ভূপৃষ্ঠের পরিস্থিতি বোঝার জন্য বৃটিশরা এই গুরুত্বপূর্ণ এবং খরচসাপেক্ষ কাজ হাতে নিয়েছিল। ফলে খুব স্বাভাবিকভাবেই তৎকালীন বৃটিশ মানচিত্রবিদের পরিকল্পনা মাফিক ওই সব টোপোশীটের অবয়ব ও বিষয়বস্তু নির্ধারিত হয়েছে।

২০০ বছর আগে নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক (geo-political) স্বার্থের কথা মাথায় রেখে তারা ইরানের উত্তর-পশ্চিম প্রান্ত (৪০° উত্তর x ৪৪° পূর্ব) থেকে থাইল্যান্ডের দক্ষিণ পর্যন্ত (৪° উত্তর x ১০৪° পূর্ব) বিস্তৃত বিশাল ভূখন্ডের টোপোশীট তৈরির পরিকল্পনা নেয় [এখন এই অঞ্চলের একটা মানচিত্র পাশে রাখলে আলোচিত বিষয়টি বুঝতে সুবিধা হবে]। প্রথমেই তারা ওপরে উল্লেখিত অক্ষাংশ দ্রাঘিমাংশের মধ্যবর্তী অঞ্চলকে ৪° × ৪° মাপে ভাগ করে ফেলে। আর প্রত্যেকটা ভাগের, শুধু যেখানে স্থলভূমি আছে, তার একটা করে নম্বর দেয় । ইরানের উত্তর-পশ্চিম কোণ থেকে ১ নম্বর  দিয়ে শুরু করে দক্ষিণ দিকে এশিয়া মহাদেশের মধ্যে যতটা স্থলভাগ আছে ততটুকু পর্যন্ত ওই ৪°×৪° মাপের জন্য একটা করে নম্বর পরপর দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে নম্বরের প্রথম লাইনটি ইয়েমেনের কাছে ৭ নম্বরে গিয়ে শেষ হয়েছে। তারপর আবার ওপর থেকে ৮ নম্বর দিয়ে শুরু হয়েছে। ভারতে প্রথম ৪°×৪° অঞ্চলের নম্বর হল ৪০। শেষ হচ্ছে ৯২-তে। এর মধ্যেই আছে বাংলাদেশ। তার শুরু হচ্ছে ৭৮ দিয়ে শেষ হচ্ছে ৯৪-তে। অবশেষে থাইল্যান্ডে গিয়ে এই নম্বর শেষ হয়েছে ১০৪-এ।

[দুই]

এইবার এই ৪°×৪° মাপের সমস্ত ভূভাগকে ১°×১° করে ১৬ ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এবং এই প্রত্যেকটা ভাগের‌ও ইংরেজি অক্ষর দিয়ে A থেকে P পর্যন্ত নাম দেওয়া হয়েছে। এখন এই ১°×১° মাপের এক একটি অঞ্চলের জন‍্য‌ই প্রথম গোত্রের টোপোশীট ১:২৫০,০০০ স্কেলে আঁকা হয়েছে। তেমন‌ই একটা টোপোশীট হল 73 I , যেটা আমরা সংগ্রহ করতে পেরেছি। এর অক্ষাংশ দ্রাঘিমাংশের সীমা হল ২৩° থেকে ২৪° উত্তর এবং ৮৬°থেকে ৮৭° পূর্ব। এইবার টোপোশীটের দিকে দৃষ্টি দেওয়া যাক।

প্রত‍্যেক টোপোশীটের সীমানার ঠিক ওপরেই ডান দিক ঘেঁষে তার নম্বর লেখা থাকে। বাঁদিকে থাকে ওই অঞ্চলের প্রশাসনিক পরিচয়। আর সীমানার নিচে মাঝামাঝি জায়গায় দেওয়া থাকে তার স্কেল। আর এই স্কেলের দুপাশে টোপোশীটে সাধারণত যে সব রং এবং প্রতীক চিহ্ন ব্যবহার করা হয় তার দুটো তালিকা দেওয়া থাকে। অবশ্য টোপোশীটে যত রং বা প্রতীক চিহ্ন ব্যবহৃত হয়েছে তার সব কটাকেই ওর মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে না। অন্যদিকে ওই তালিকায় যত প্রতীক চিহ্ন আঁকা আছে তার‌ও সব কটাকে কোনও একটা টোপোশীটে খুঁজে পাওয়া যাবে না। ওটা একটা সাধারণ তালিকা।

এখন দেখা যাক 73 I টোপোশীটে কোন কোন ভৌগোলিক বিষয়বস্তুর চিত্র আঁকা হয়েছে। এতে আছে রাজ‍্য ও জেলার সীমা, অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশ, কাঁচা ও পাকা রাস্তা, রেল লাইন, নদী, জলপ্রপাত, জলাধার, বাঁধ, সেচের খাল, পাহাড়, জঙ্গল, গ্রাম এবং শহরের জনবসতি, পোস্ট অফিস, সরকারি বাংলো, থানা, ক্ষয়প্রাপ্ত ভূমি ইত্যাদি।

ওপরের তালিকা থেকে এটা নিশ্চয়ই বোঝা যাচ্ছে যে এই ধরনের টোপোশীটের ভেতর ভৌগোলিক বিষয়বস্তুর সংখ্যাও যেমন খুব কম তেমনি তার থেকেও কম বিষয়ে অভিযাত্রীদের আগ্রহ থাকার সম্ভাবনা।

[তিন] 

এখন এই ১:২৫০,০০০ স্কেলের ১°×১° মাপের টোপোশীটকে আবার ১৬টা ভাগে ভাগ করে তার এক একটা ১৫’×১৫’ মাপের ভূ-ভাগের জন‍্য  ১:৫০,০০০ স্কেলের টোপোশীট আঁকা হয়েছে। 73 I এর ক্ষেত্রে সেই ১৬টা টোপোশীটের নম্বর হল 73 I / 1, 73 I / 2 হয়ে 73 I / 16 পর্যন্ত। আমাদের কাছে তার মধ্যে 73 I / 4 টোপোশীটটা আছে। এই টোপোশীটের‌ও ওপরের দিকে ডানপাশে টোপোশীটের নম্বর লেখা আছে। নীচে যথারীতি মধ্যখানে স্কেল এবং তার দুপাশে প্রতীক চিহ্নের তালিকা দেওয়া আছে।

লক্ষ্য রাখতে হবে যে ১:২৫০,০০০ স্কেলের টোপোশীটে ওই ১৫’×১৫’ অঞ্চলের ছবি যতটুকু জায়গার ভেতর আঁকা হয়েছিল, একটা ১:৫০,০০০ স্কেলের টোপোশীটে সেই অঞ্চলটাই পাঁচ গুণ বড় জায়গায় আঁকা হয়েছে। ফলে ১:২৫০,০০০ স্কেলের টোপোশীটের ১৫’×১৫’ জায়গায় যত ভৌগোলিক বিষয়বস্তু আঁকা হয়েছিল ১:৫০,০০০ স্কেলের টোপোশীটে হয় তার থেকে অনেক বেশি ভৌগোলিক বিষয়বস্তু আঁকা সম্ভব হবে নয়ত ওই এক‌ই জিনিস আরো বিশদ ভাবে আঁকা যাবে। ফলে 73 I টোপোশীটে যা আঁকা হয়েছিল সেগুলো তো এখানে আছেই তা ছাড়া অতিরিক্ত যে ভৌগোলিক বিষয়বস্তু পাওয়া যাচ্ছে সেগুলো হল – নদীর বুকে বালির চর, সৃজিত বনভূমি, ঝোপ ঝাড়, পাথরের চট্টান, ছোট পাথুরে গোঁজ(rocky knob), পাথরের খাড়া দেওয়াল, নদীর ওপর পুল, সাপ্তাহিক হাট, বাজার, হাসপাতাল, গরুর গাড়ি বা জীপ যাবার রাস্তা, ঘোড়া বা খচ্চর যাবার রাস্তা, পায়ে হাঁটার রাস্তা , প্রস্রবণ ইত্যাদি ইত্যাদি। সমতল ভূমির থেকে যতই পার্বত্য অঞ্চলের দিকে যাওয়া যাবে ততই টোপোশীটে ভৌগোলিক বিষয়বস্তু ক্রমশ বাড়তে থাকবে।

একটা ১:৫০,০০০ স্কেলের টোপোশীটকে আবার সমান চার ভাগে ভাগ করে এক একটা, সাড়ে সাত ডিগ্রী × সাড়ে সাত ডিগ্রী মাপের, অঞ্চলকে দ্বিগুণ বড় করে ১:২৫,০০০ স্কেলের টোপোশীট তৈরি করা হয়েছে । এই চারটে টোপোশীট ১:৫০,০০০ স্কেলের টোপোশীটের চারকোনায় ( উত্তর পূর্ব, উত্তর পশ্চিম, দক্ষিণ পূর্ব, দক্ষিণ পশ্চিম) অবস্থিত বলে এদের নম্বর হয় এই রকম-

73 I / 4 / NE, 56 D / 12 / SW ইত্যাদি, অর্থাৎ একটা ১:৫০,০০০ স্কেলের টোপোশীট থেকে চারটের বেশি ১:২৫,০০০ স্কেলের টোপোশীট তৈরি হবে না। দ্বিগুণ বড় হলেও ১:৫০,০০০ স্কেলের টোপোশীটের থেকে ভৌগোলিক বিষয়বস্তু কিছুটা বিশদভাবে আঁকা ছাড়া এর আর বিশেষ কিছু গুণগত পরিবর্তন হয় না। আর একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ১:২৫,০০০ স্কেলের মানচিত্র এখনো সব অঞ্চলের, বিশেষ করে হিমালয়ের পাওয়া যায় না ।

তাই সবদিক বিচার করলে :৫০,০০০ স্কেলের টোপোশীট যে, যে কোন অভিযানের জন্য, আমাদের অভিযাত্রীদের কাছে সবথেকে বেশি উপযোগী হিসাবে বিবেচিত হবে সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই তাই এখন থেকে আমাদের সমস্ত মনোযোগ এই ১:৫০,০০০ স্কেলের টোপোশীটেই থাকবে।

সবশেষে আমরা দেখবো ১:৫০,০০০ স্কেলের য‍ত টোপোশীট আছে এবং সেখানে যত ভৌগোলিক বিষয়বস্তুর চিত্র আঁকা হয়েছে তার মধ্যে কোন কোন বিষয় কোন না কোন ভাবে একজন অভিযাত্রীর কাজে লাগতে পারে। নিচে তার তালিকা দেওয়া হল। এই কটা বিষয়ের প্রতীক চিহ্ন ঠিক ঠাক বুঝতে এবং পড়তে পারলেই ম্যাপ রিডিংয়ের সিংহ ভাগ শেখা হয়ে যাবে।

 ১-পাকা রাস্তা ২-কাঁচা রাস্তা ৩-ঘোড়া বা খচ্চর যাবার রাস্তা ৪-পায়ে হাঁটা রাস্তা ৫-ক‍্যাম্প করার উপযোগী জমি ৬-রেল পথ ৭-সিমেন্টের ব্রীজ ৮-কাঠের পুল ৯-তারের ঝুলন্ত সেতু ১০-বরফের সেতু ১১-কালভার্ট ১২-কজ‌ওয়ে(causeway) ১৩-জন বসতি ১৪-পরিত‍্যক্ত জনবসতি ১৫-চাষের জমি ১৬-প্রাকৃতিক বনভূমি ১৭-ঝোপঝাড় ১৮-সৃজিত বনভূমি ১৯-অনুর্বর জমি ২০-পাথুরে জমি ২১- ক্ষয়জাত ভূমি ২২-ছোটো পাথুরে গোঁজ(rocky knob) ২৩-পাথরের দেয়াল ২৪-বোল্ডার ছড়ানো ভূমি(boulder zone) ২৫-সারা বছর জল থাকে এমন নদী ২৬-বছরের এক বিশেষ সময়ে জল থাকে এমন নদী ২৭-ফেরি চলে এমন নদী ২৮- প্রস্রবণ ২৯-পাতকুয়ো ৩০-পুকুর  ৩১-জলপ্রপাত ৩২-জলাভূমি ৩৩-হিমবাহ ৩৪-পুরোনো গ্রাবরেখা(moraine) ৩৫-পার্শ্ব গ্রাবরেখা ৩৬-মধ‍্য গ্রাবরেখা ৩৭-প্রান্তিক গ্রাবরেখা  ৩৮-ক্রিভাস বা হিমবাহের ফাটল ৩৯ – তুষার ক্ষেত্র(ice patch) ৪০-হিমবাহের ওপর বরফের তীক্ষ্ম ফলা( ice pinnacle) ৪১-হিমবাহে বরফের দেয়াল (ice wall) ৪২-অসংখ‍্য টুকরো পাথরের বিশাল ঢাল ( scree zone) ৪৩-পাহাড়ের ঢালে ওপর থেকে যখন তখন পাথর পড়ার স্থান(rock fall zone) ৪৪-হিমবাহে যে কোনো সময় বরফের চাঙর ভেঙ্গে পড়ার স্থান(ice fall zone) ৪৫-গিরিপথ ৪৬-গুহা ৪৭-শৃঙ্গ ৪৮-পাথরের মহীঢাল(rock buttress) ৪৯-আপেক্ষিক উচ্চতা(relative height) ৫০-স্থানিক উচ্চতা(spot height) ৫১-চারণভূমি ৫২-সমন্নোতি রেখা (contour lines)– একমাত্র এটা দিয়েই ভূমিরূপ বোঝা যায়। এটাই হল একজন অভিযাত্রীর কাছে ম‍্যাপ রিডিং এর সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ এবং আপাতদৃষ্টিতে সবথেকে কঠিনতম বিষয়।

চতুর্থ পর্ব পড়ুন এখানে

(Visited 1 times, 1 visits today)
ত্রিদিব বসু
ত্রিদিব বসু
ভারত সরকারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ন্যাশনাল অ্যাটলাস অ্যান্ড থিমেটিক ম্যাপিং অর্গানাইজেশন (ন্যাটমো)'র সাবেক যুগ্ম পরিচালক।

মন্তব্য করুন

*Please Be Cool About Captcha. It's Fun! :)