এক কিংবদন্তির জন্মদিন


১৯২৪ সালের আজকের এই দিনে পর্বতারোহণের ইতিহাসের এক অন্যতম ট্র্যাজিক ঘটনা ঘটেছিল যা আজও এক কিংবদন্তি ও অমীমাংসিত ধাঁধা হয়ে রয়েছে। এদিন ব্রিটিশ এভারেস্ট অভিযানের দুজন পর্বতারোহী জর্জ ম্যালরী ও এন্ড্রু আরভাইন চূঁড়ার খুব কাছ থেকে রহস্যময়ভাবে শ্বেতশুভ্র পর্বতের রাজ্যে চিরদিনের মত হারিয়ে যান।

আজ থেকে ৯৪ বছর আগে ৮ই জুন চিরদিনের জন্য হারিয়ে যাওয়া এই দুই পর্বতারোহীকে সর্বশেষ দেখেছিলেন অভিযানের আরেক সদস্য নোয়েল ওডেল। তার বক্তব্য থেকে জানা যায় সেদিন ঠিক কি ঘটেছিল। অভিযানের নেতা হাওয়ার্ড নরটনের লিখা বইয়ে ওডেল মুহুর্তের জন্য পর্বতারোহীদের দেখার ঘটনাটি বর্ণনা করেন।

৮ই জুন সকাল ৬টার দিকে ক্যাম্প-৫ এ থাকা ওডেলের ঘুম ভাঙে। আগের রাতে বাতাস অনেক কম ছিল আর তার ঘুম ও খুব ভালো হয়েছিল। সকাল ৮ টার দিকে তিনি পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ক্যাম্প-৬ এর দিকে আরোহণ শুরু করেন। তার এই আরোহণের মূল লক্ষ্য ছিল এভারেস্টের এই অঞ্চলের ভৌগলিক উপাত্ত সংগ্রহ করা এবং সামিটের উদ্দেশ্যে বের হওয়া জর্জ ম্যালরী এবং এন্ড্রু আরভাইনকে সহায়তা করা।

এর আগে সামিটের জন্য আরো দুটি পুশ দেয়া হয়েছিল। ১ জুন ম্যালরী ও ব্রুসকে শেরপাদের বিদ্রোহের কারনে ক্যাম্প-৬ স্থাপন না করেই নীচে নেমে যেতে হয়েছিল। এরপর দ্বিতীয় সামিট টিম হিসেবে নরটন ও সামারভেল ৪ই জুন সামিটের উদ্দেশ্যে ক্যাম্প-৬ থেকে রওনা হন। নানা ঘটনা-দূর্ঘটনার মধ্য দিয়ে হওয়ার্ড নরটন এভারেস্ট চূঁড়ার মাত্র ২৮০ মিটার নীচ থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হন।

১৯২৪ এর আগে দুইবার এভারেস্টের কাছ থেকে ফিরে আসা ম্যালরী শেষবারের মত আরেকটি সামিট পুশ দেয়ার জন্য অধৈর্য্য হয়ে উঠেছিলেন। নরটন ও সামারভেল সামিটের একদম নীচ থেকে চলে আসার পর ম্যালরী এন্ড্রু আরওয়াইনকে সাথে নিয়ে আরেকটি সামিট পুশ দেয়ার জন্য অভিযানের নেতা হওয়ার্ড নরটনের অনুমতি চান। পর্বতারোহণের একেবারেই অভিজ্ঞতা না থাকায় প্রথমে আরওয়াইনকে আরোহণের জন্য বিবেচনাই করা হয়নি। কিন্তু ম্যালরীর অভিজ্ঞতা ও একগুঁয়েমিকে দেখে নরটন তাদের সামিটে যাওয়ার অনুমতি দিয়ে দেন।

অনুমতি পাওয়ার পর ম্যালরী ও আরভাইন ৬ জুন সকাল ৮:৪০ মিনিটে আটজন পোর্টার সহ ক্যাম্প-৫ এর জন্য রওনা হন। তারা কৃত্রিম অক্সিজেনের যন্ত্র ও সামিট ক্যাম্পের জন্য রেশন নিয়ে আরোহণ করছিলেন। তাদের দুজন প্রায় ২৫ পাউন্ড করে ওজন বহন করছিলেন। সামিট ক্যাম্পের জন্য রওনা হওয়ার সময় ওডেল কাছ থেকে দুজনের সর্বশেষ ছবিটি তোলেন। ৭ই জুন ওডেল আরেকজন শেরপাকে সাথে নিয়ে সামিট টিমকে সহায়তা করার জন্য ক্যাম্প-৫ এ উঠে আসেন। কিছুক্ষণের মধ্যে উপরের ক্যাম্প থেকে নেমে আসা পোর্টারদের কাছ থেকে ওডেন ম্যালরীর পাঠানো দুটি বার্তা পান। যার একটিতে লিখা ছিল,

প্রিয় নোয়েল,
ভালো আবহাওয়ার জন্য আমরা খুব সম্ভবত আগামীকাল (৮জুন) খুব সকালে রওনা হব। ৮টার দিকে আমাদের স্কাই লাইন বা সামিট পিরামিডের কাছে রক ব্যান্ড অতিক্রমের সময় দেখা যেতে পারে”
তোমার,
জি ম্যালরী

৮ জুন সকাল থেকেই এভারেস্টের চূড়া ঘন কুয়াশায় ঢাকা ছিল। তাই তিন এভারেস্টের উত্তর-পূর্ব রিজলাইন দেখতে পারছিলেন না। বেলা প্রায় সাড়ে ১২টার দিকে তিনি ৭৯০০ মিটার উচ্চতায় একটা উচূ জায়গায় উঠে আসেন। এই জায়গাতেই তিনি একটি ফসিল খুঁজে পান। এত উচুটে প্রাচীনকালের একটি ফসিল আবিষ্কারের জন্য তিনি অস্বাভাবিক রকম উত্তেজিত ছিলেন। আর ঠিক তখনই হঠাৎ করে আকাশ পরিষ্কার হয়ে যায়। তার চোখ চলে যায় এভারেস্টের রিজলাইনের দিকে, যেদিক দিয়ে ম্যালরী ও আরভাইনের আজ চূড়ায় আরোহণ করার কথা ছিল। পর্যবেক্ষণ করার সময় হুট করেই ছোট্ট কালো একটি বিন্দুর উপর তার চোখ আঁটকে যায়। বিন্দুটি রিজলাইনের উপরের পাথুরে দেয়ালের নীচের একটি তুষারাবৃত ক্রেস্ট অতিক্রম করছিল। পরক্ষণেই তিনি আরেকটি চলন্ত বিন্দুকে প্রথমজনকে অনুসরন করতে দেখতে পান। তিনি তৎক্ষণাৎ তার ডায়রিতে লিখেন,

“ এম আর আই কে রিজলাইনের উপরে দেখলাম, তারা সামিট পিরামিডের বেশ কাছে রয়েছে।”

ওডেলের প্রথমেই মনে হয়েছিল, পর্বতারোহীরা উত্তর রিজলাইনের সেকেন্ড স্টেপে রয়েছে। তিনি দুই অভিযাত্রীর জন্য চিন্তিত ছিলেন, কারন পরিকল্পনা অনুযায়ী ম্যালরী ও আরভাইন প্রায় ৫ ঘন্টার মত পিছিয়ে ছিলেন। পর্বতারোহীদের আর দেখতে না পেয়ে ওডেল ক্যাম্প-৬ এ উঠে আসেন। বেলা দুইটার দিকে রিজলাইনের উপরে প্রচন্ড বাতাসে তুষার ঝড় শুরু হল আর পুরো রিজ লাইন ঘন তুষারে ঢেকে দিল। তুষার ঝড়ের মধ্যে ওডেল তাবু থেকে বেড়িয়ে এসে তাদের নাম ধরে চিৎকার দিতে থাকেন। কারন তার মনে হচ্ছিল এখন তারা ক্যাম্পে নেমে আসছেন আর তুষারঝড়ের মধ্যে তাদের পথ দেখানো টা জরুরী। কিন্তু ঠান্ডার জন্য খুব বেশীক্ষণ তিনি বাইরে থাকতে পারেন নি।

দুইজনের জন্য একটি তাবু দিয়ে ক্যাম্প-৬ স্থাপন করা হয়েছিল। তাই ম্যালরী আগে থেকেই বলে রেখেছিল ওডেল যেন নীচে নেমে যায়। সামিট থেকে ফিরে এলে ম্যালরীদের জন্য থাকার সমস্যা না হয় তাই বেলা প্রায় ৪ টার দিকে ওডেল ক্যাম্প-৬ থেকে নর্থকলে স্থাপন করা ক্যাম্প-৪ এ নেমে যান। পরদিনও ম্যালরী ও আরভাইনের কোন চিহ্ন পাওয়া না যাওয়ায় ওডেল দুইজন শেরপা নিয়ে আবারো উপরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পরদিন ৯ই জুন বেলা সাড়ে তিনটায় তারা ক্যাম্প-৫ এ পৌঁছান। এর পরদিন ওডেল একাই আবার ক্যাম্প-৬ এ আরোহণ করেন। ক্যাম্পে গিয়ে দেখতে পান তিনি ৮ তারিখে যেমনটা রেখে গিয়েছিলেন ক্যাম্প ঠিক সেভাবেই আছে। এর মানে হচ্ছে ম্যালরী ও আরভাইন সামিট পুশ থেকে এখনো ফিরে আসেননি। তারা হারিয়ে গেছেন…

পর্বতারোহীদের খোঁজে ওডেল ৮২০০মিটার পর্যন্ত আরোহণ করেন। কিন্তু তাদের কোন চিহ্নই খুঁজে পাওয়া যায় নি। ক্যাম্প-৬ এ ফিরে এসে তুষারের উপর তিনি সিগন্যাল দেয়ার জন্য ৬টি কম্বল দিয়ে একটি ক্রস চিহ্ন বানান। যার অর্থ,

“কোন চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায় নি, আর কোন আশা নেই, নির্দেশনার অপেক্ষায়”।

৮ই জুন পর্বতারোহণের এক বেদনাদায়ক দিনই শুধু নয়, এদিন একই সাথে জন্ম দিয়েছে ইতিহাসের এক অন্যতম এক রহস্য। চিরদিনের মত হারিয়ে যাওয়া পর্বতারোহীরা পরিনত হন এক কিংবদন্তীতে। যুগ যুগ ধরে তরুনেরা তাদের কাছ থেকে একই সাথে প্রেরণা পান ও সত্য সন্ধানের জন্য উদগ্রীব হয়ে আছেন। তাদের অনেকেই মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন সেদিন ম্যালরী ও আরওয়াইন এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছে গিয়েছিলেন। তাদের কাছে জর্জ ম্যালরী ও এন্ড্রু আরওয়াইন-ই প্রথম এভারেস্ট আরোহনকারী।

১৯৯৯ সালে এভারেস্টের নর্থকল থেকে উদ্ধার করা ম্যালরীর মৃতদেহ এই রহস্য আর ধাঁধাকে আরো উসকে দেয়। রহস্যের জট খুলতে গিয়েও অনেক তথ্য আজো অজানা থেকে যায়। অনেক নতুন নতুন প্রশ্নের উদ্ভব হয়।

ম্যালরী ও আরভাইন-ই কি প্রথম এভারেস্ট আরোহণ করেছিলেন?? এভাবেই ১৯২৪ সালের ৮ই জুন জন্ম নেয় মাউন্ট এভারেস্টের এক অমীমাংসিত কিংবদন্তি।

(Visited 1 times, 1 visits today)

মন্তব্য করুন

*Please Be Cool About Captcha. It's Fun! :)