কে-টু: ষড়যন্ত্র আর বিশ্বাসঘাতকতার গল্প

[ছবি] কে-টু / উইকিমিডিয়া কমন্স


১৯৫৪ সালের ৩১ জুলাই, পর্বতারোহণের ইতিহাসে প্রথমবারের মত ইটালির দুজন পর্বতারোহী পৃথিবীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ চূড়া কেটু আরোহণ করে। এই অভিযান ফ্যাসিস্ট রাস্ট্র হিসেবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইটালির পরাজয়ের লজ্জাকে কাটিয়ে উঠে নিজেদের বীরত্বকে জাহির করার একটি অভূতপুর্ব সুযোগ হিসেবে ধরা দেয়। জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুব্ধ এই অভিযান শেষ পর্যন্ত বিতর্ক এড়িয়ে যেতে পারেনি। এই অভিযানেই ঘটে পর্বতারোহণ ইতিহাসের এক জঘন্যতম বিশ্বাসভঙ্গ আর মিথ্যাচারের ঘটনা। সেই গল্পে যাওয়ার আগে আমরা জেনে নেই ঠিক কি কি হয়েছিল জুলাইয়ের শেষ চার দিন।    

জুলাই ২৮

এরিক আব্রাম, পিনো গালোত্তি, এচিলে কমপ্যাগনোনি এবং লিনো ল্যাচেডেলি ক্যাম্প-৮ এ তাদের প্রথম তাবু স্থাপন করে। নির্দ্ধারিত পরিকল্পনার ১০০ মিটার নিচেই সামিট ক্যাম্পের ঠিক আগের এই গুরুত্বপূর্ণ ক্যাম্পটি ৭৬২৭ মিটার উচ্চতায় তাদের স্থাপন করতে হয়। আব্রাম ও গালোত্তি নিচের ক্যাম্প-৭ এ নেমে আসে। ঠিক হয় কমপ্যাগনোনি ও ল্যাচেডেলি পরদিন ৮১০০ মিটার উচ্চতায় সামিট ক্যাম্প স্থাপন করে আবার ক্যাম্প-৮ এ নেমে আসবে। যেখানে একই দিন নিচের ক্যাম্প থেকে প্রয়োজনীয় রসদ ক্যাম্প-৮ এ পৌঁছে দেয়া হবে।
 
জুলাই ২৯
 
আব্রাম, গালোত্তি, রে ও বোনাত্তি ক্যাম্প-৭ থেকে সব সাজ সরঞ্জাম ও সামিটের জন্য অক্সিজেনের দুটো সেট নিয়ে রওনা হল। ৩০-৪০ মিটার যাবার পরই  রে আর আব্রাম আবার নিচে নেমে যায়। রে খুবই ক্লান্ত হয়ে পড়ছিল। আব্রামের পরিকল্পনা ছিল আজকের দিনটা বিশ্রাম নিয়ে আগামীকাল ক্যাম্প-৮ এ উঠে যাবে।
 
এদিকে গালোত্তির আব্রামের রেখে যাওয়া একটি অক্সিজেন সেটের ভার বইতে খুব কষ্ট হচ্ছিল। এক পর্যায়ে আর বইতে না পেরে সে সেট্টি নামিয়ে রেখে দেয়। বোনাত্তি ভাবল, খামোখা একটি সেট উপরে  নিয়ে গেলে কি হবে তার চেয়ে বরং আমার কাধেরটিও নামিয়ে রাখি। অক্সিজেনের জায়গায় সে ক্যাম্প-৮ এ স্থাপনের জন্য জন্য আরেকটি তাবু, প্রয়োজনীয় রসদ, ম্যাট্রেস ও বাড়তি একটি স্লিপিং ব্যাগ রুকস্যাকে ভরে নিল। বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার মুখে তারা ক্যাম্প-৮ এ গিয়ে পৌঁছাল। সেখানে কমপ্যাগনোনি ও ল্যাচেডেলিকে দেখতে পেল। তারা সেদিন মাত্র ১০০ মিটারের মত ক্লাইম্ব করেতে পেরেছিল।
 
ক্যাম্প-৮ এ অবস্থা তখন খুব একটা আশাব্যাঞ্জক ছিল না। তারা যদি সামিটে পৌঁছাতে চায় তাহলে খুব পরিকল্পিতভাবে সবার মধ্যে একটি সমন্বয় হওয়া দরকার ছিল। নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে তারা ঠিক করল, সামিটে পৌঁছাতে হলে নিচ থেকে অক্সিজেনের সেট দুটো ক্যাম্প-৯ (যেটা এখন পর্যন্ত স্থাপন করা হয়নি)  এ তুলে আনতেই হবে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী আরোহী ছিল বোনাত্তি। একমাত্র তার পক্ষেই সম্ভব ছিল ক্যাম্প-৮ থেকে নিচে নেমে গিয়ে ক্যাম্প-৭ এর কিছুটা উপরে ফেলে আসা অক্সিজেনের সেট দুটো আবার ক্যাম্প-৮ এরও ৩০০-৪০০ মিটার উপরের ক্যাম্প-৯ এ তুলে নিয়ে আসা।
 
 শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হল, গালোত্তি আর বোনাত্তি নিচে নেমে যাবে। নিচ থেকে অক্সিজেন সেট দুটো ক্যাম্প-৮ এ নিয়ে আসবে আর রাতের মধ্যেই ক্যাম্প-৯ এ পৌঁছে দিবে। এর মধ্যে কমপ্যাগনোনি ও ল্যাচেডেলি ক্যাম্প-৯ স্থাপন করে ফেলবে ও তাদের জন্য সেখানেই অপেক্ষা করবে।  কমপ্যাগনোনি এও বলে, যদি সামিট ক্যাম্পে সে নিজেকে দূর্বল মনে করে তাহলে বোনাত্তি তার জায়গায় সামিটে যাবে।
 
সবাই মিলে আরও সিদ্ধান্ত নেয় ক্যাম্প-৯ বা সামিট ক্যাম্পের জন্য পূর্ব নির্ধারিত ৮১০০ মিটার উচ্চতার জায়গাটি বেশী উঁচু হয়ে যায়। নিচ থেকে অক্সিজেন সেট তুলে সেই উচ্চতা পর্যন্ত পৌঁছাতে অনেক দেরী হয়ে যাবে। সিদ্ধান্ত হল, আনুমানিক ৭৯০০ থেকে ৮০০০ মিটারের কাছাকাছি তারা সামিট ক্যাম্প স্থাপন করবে। এর মানে হচ্ছে বোনাত্তিদের ২০০ মিটার নেমে ১৯ কিলোগ্রাম মালামাল নিয়ে আবার প্রায় ৫০০ (বাস্তবে ৭০০ মিটার) মিটারের মত উঠতে হবে।
 
জুলাই ৩০
 
সকাল ৮ টায় বোলাত্তি ও গালোত্তিক্যাম্প-৮ থেকে নিচে নামা শুরু করে। পথের মধ্যে তারা দেখে নিচ থেকে আব্রাম দুজন হানজা মুটে মাহদি আর ঈসাখাঁকে নিয়ে উপরে উঠে আসছে। মালামালগুলো ৫জন ভাগাভাগি করে উপরে নিয়ে যাওয়া শুরু করল। ক্যাম্প-৮ এ পৌঁছে গালোত্তি ও ঈসাখাঁ দূর্বল ও ক্লান্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু মাহদির অবস্থা খুবই ভাল ছিল। আব্রাম ও বোনাত্তি তাকে মোটা অংকের বোনাসের কথা বলে ক্যাম্প-৯ পর্যন্ত মুটে বইবার জন্য রাজি করিয়ে ফেলল।
 
তিনজন স্যুপ খেয়ে দুপুর সাড়ে তিনটায় ক্যাম্প-৮ থেকে রওনা দিল। এক ঘন্টা পর সাড়ে ৪ টায় তারা সোল্ডারে পৌঁছে গেল। এখান থেকে পরবর্তী সামিট ক্যাম্প পর্যন্ত পথটুকু একেবারে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। বোনাত্তিরা উপরে থাকা  কমপ্যাগনোনি ও ল্যাচেডেলিকে ডাক দিল। তাদের গলার আওয়াজ পাওয়া গেলেও নিচ থেকে তারা তাবু দেখতে পাচ্ছিল না। এক পর্যায়ে তুষারে পায়ের ছাপগুলো মিলিয়ে গেল। তারা নিচ থেকে আবারও ডাক দিল। এবারে ল্যাচেডেলিকে চিৎকার করে বলতে শোনা গেল, ‘পায়ের ছাপ ধরে ধরে চলে আসো”।
 
ইতোমধ্যে সূর্য কেটু’র ঢালে মিলিয়ে গেছে। ঠান্ডা ধীরে ধীরে তার অস্থিত্ব জানান দিচ্ছে।  এভাবেই চলতে চলতে তারা ৭৯৫০ মিটার উচ্চতায় চলে আসল। এখানেই কোথাও ক্যাম্প স্থাপন করার কথা। কিন্তু আশেপাশে তাবু দেখা যাচ্ছে না। আব্রামের পা জমে যাচ্ছিল। বোনাত্তি আব্রামের বুট খুলে পা ঘষে দেয়ার চেষ্টা করল। সাড়ে ৬টার দিকে আব্রাম নিচে নামতে শুরু করল।
 
বোনাত্তি টানা ২৩ দিন ধরে কেটুর হাই ক্যাম্পগুলো থেকে আর নিচে নামেনি। আরও প্রায় দুই ঘন্টা ধরে খাড়া ঢাল বেয়ে উঠার পর মাহদি ক্লান্ত হয়ে পড়ল। বোনাত্তির এমন অমানুষিক ক্লাইম্ব করা দেখে মাহদির মনে ধারনা জন্মালো বোনাত্তি সামিটে যাবার জন্য মুখিয়ে আছে। ঠিক এক বছর আগে নাঙা পর্বতে সে হেরমান বুলের মধ্যেও একই ধরনের শক্তি দেখেছে। এতখানি উঠে আসার পরেও ক্যাম্পের কোন অস্তিত্ব তারা খুঁজে পাচ্ছিল না। এর মধ্যে রাতের অন্ধকার পুরো জাকিয়ে বসেছে। ক্যাম্প-৮ থেকে বেরুনোর পর থেকে কেউ এক ফোটা পানি খায়নি।
 
এই অন্ধকারে ক্লান্ত শরীর নিয়ে নিচে নেমে যাওয়া তাদের জন্য একপ্রকার অসম্ভব বিষয় ছিল। তারা বুঝতে পারছিল না সমস্যা কোথায় হয়েছে। কমপ্যাগনোনি ও ল্যাচেডেলি দুজনেই অভিজ্ঞ পর্বতারোহী। তারা খুব ভালভাবেই জানে সিদ্ধান্ত নেয়া জায়গা থেকে আরও উপরে ক্যাম্প করলে অক্সিজেন সেমস্নিয়ে সময়মত সেখানে পৌঁছানো একপ্রকার অসম্ভব। আর অক্সিজেন সেট ছাড়া সামিটের জন্যেও তারা রওনা দিতে পারবে না।
 
এদিকে রাত বাড়ার সাথে সাথে প্রচন্ড ঠান্ডা জাঁকিয়ে বসছিল। বোনাত্তি বুঝতে পারছিল ক্যাম্পে বসে থাকা দুজন ইচ্ছে করে জবাব দিচ্ছে না। আট হাজার মিটারের উপর খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে হবে চিন্তা করেই বোনাত্তি আর মাহদির মাথা খারাপ হয়ে গেল। বোনাত্তি গালাগালি করে সেই দুজনকে অভিশাপ দেয়া শুরু করল। এক পর্যায়ে সে হুমকি দিয়ে বলল, আমি নিচে নেমে তোমাদের কুকর্মের কথা সবাইকে বলে দিব।
 
তখনই কাছের অন্ধকার থেকে এক ঝলক হেডল্যাম্পের আলো জ্বলে উঠেই আবার নিভে যায়। একটু পর ল্যাচেডেলির কন্ঠস্বর দূর থেকে ভেসে আসলো, অক্সিজেন সিলিন্ডার কি নিয়ে এসেছো? বোনাত্তি হা বলার পর ল্যাচেডেলি বলল, এগুলো সেখানেই রেখে তোমরা নিয়ে নেমে যাও। এই কথা শুনে বোনাত্তি আর মাহদির মাথা খারাপ হয়ে গেল। তারা সাহায্যের জন্য চিৎকার শুরু করল। মাহদি ঘোরের মধ্যে সেই আলোক বিন্দুর দিকে ছুটে যাওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু তখনই হেডল্যাম্পটি নিভে গেল। সেখানেই বসে পড়ে মাহদি ডুকরে উঠল, নো গুড ক্যামপেগনোনি সাব, নো গুড ল্যাচেডেলি সাব…
 
জুলাই ৩১
 
ভোরের আকাশ ফিকে হয়ে উঠতেই মাহদি নিচে নেমে যেতে চাইল। সারারাত দুচোখের পাতা এক না করে থাকা বোনাত্তি মাহদির ক্রাম্পন জোড়া ভালভাবে বুটে লাগিয়ে দিল। এরপর ধীরে ধীরে অক্সিজেন সিলিন্ডারগুলোর উপর জমে থাকা তুষারগুলো হাতের গ্লাভস দিয়ে পরিষ্কার করে দিল, যেন সেগুলো খুঁজে পেতে সমস্যা না হয়। নিজের ক্রাম্পন দুটো ভালোভাবে এটে নিয়ে বোনাত্তিও এরপর নিচে নামা শুরু করল।
 
অন্যদিকে কমপ্যাগনোনি ও ল্যাচেডেলি তাদের ক্যাম্প-৯ থেকে নিচে নেমে বোনাত্তি ও মাহদির রেখে যাওয়া অক্সিজেন সিলিন্ডার দুটো নিয়ে আবার সামিটের দিকে রওনা হয়ে যায়। সেদিন সন্ধ্যা ৬টায় এইদুজন আজ্জুরি প্রথমবারের মত সবচাইতে কঠিন আট হাজার মিটার পর্বত হিসেবে কুখ্যাত কেটু আরোহণ করে।
ষড়যন্ত্রের শুরু
অভিযান শিবিরে কেটু আরোহণের আনন্দ উৎসব ঠিকমত জমে উঠতে পারেনি। পুরো আট হাজার মিটারের উপরে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটানোর ফলে পাকিস্থানী হানজা পোর্টার মাহদির দুই পা মারাত্বকভাবে ফ্রস্ট বাইটে আক্রান্ত হয়। যার ফলে তার দু পায়ের সবকটি আঙ্গুল কেটে ফেলতে হয়। বেইজক্যাম্পে নেমে অভিযানের লিঁয়াজো অফিসার পাকিস্থান আর্মির আতা উল্লাহকে মাহদি বিচার দেয়। বলে কমপ্যাগনোনি তাদের দুজনকে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে বাধ্য করে। সেই সাথে এটাও বলে যে বোনাত্তিকে দেখে তার মনে হয়েছে সে কমপ্যাগনোনি ও ল্যাচেডেলিকে টপকে সামিটে যেতে চাচ্ছিলো।
 
মাহদির এই অভিযোগের ব্যাপারে আতা উল্লাহ অভিযানের নেতা ডেশিও’র কাছে জানতে চায়। এরই মধ্যে পাকিস্থানের পত্রিকাগুলোয় মাহদির দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে দাবী করা হয় কেটু আরোহণের এই গর্বিত মুহুর্তটিকে পাকিস্থানী কারো সাথে ভাগ করবে না বলে ইচ্ছা করে ইটালির কমপ্যাগনোনি সামিটের ঠিক নিচে মাহদিকে থাকিয়ে দেয়। সেই সাথে এও অভিযোগ করে ইটালির আরোহীদের মত হানজা পোর্টারদের জামা-কাপড়, সাজ-সরঞ্জাম কিছুই দেয়া হয় নি। আর এই কারনেই পাকিস্থানি মাহদিকে এমন দূর্ঘটনায় পড়তে হল।
 
এদিকে ঘটনা ঠিক কি হয়েছিল তা জানতে ডেশিও ক্লাইম্বিং টিমের লিডার কমপ্যাগনোনিকে ডেকে পাঠায়। কমপ্যাগনোনি পুরো ঘটনার সমস্ত দায় চাপিয়ে দেয় বোনাত্তির উপর। কমপ্যাগনোনি এও অভিযোগ করে রাতে ঠান্ডা থেকে বাঁচতে সামিটের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ সেই অক্সিজেনও চুরি করে ব্যবহার করেছিল বোনাত্তি। এই কারনেই তার কোন ফ্রস্ট বাইট হয়নি আর সে নিজে বাঁচার জন্য আহত মাহদিকে ফেলে রেখেই নিরাপদে আশ্রয় নিয়েছিল। 
 
কমপ্যাগনোনির নাম ছড়িয়ে গেলে ইটালির এত বড় একটি অর্জন মাটি হয়ে যাবে ভেবে ডেশিও পাকিস্থানের ইটালির রাস্ট্রদূত ও আতা উল্লাহর সাথে মিলে মাহদির ঘটনাটি সেখানেই ধামাচাপা দেয়ার ব্যবস্থা করে। পাকিস্থান ও ইটালির মধ্যকার চমৎকার সম্পর্কে যেন চিড় না ধরে তাই সবাই মিলে বোনাত্তিকে বলির পাঠা বানিয়ে ফেলা হল।
 
ইটালির এই সাফল্যে অভিযানের সবচাইতে তরুন ও শক্তিশালী সদস্য বোনাত্তির ভূমিকাকে স্বীকার তো করাই হল না উলটো তাকে হেয় করা হল। সব দোষ তার ঘাড়ে চাপিয়ে ডেশিও অভিযানের অফিসিয়াল রিপোর্ট জমা দিল। একদিকে কমপ্যাগনোনি ও ল্যাচেডেলির বীরত্বে পুরো ইটালি যেখানে উৎসব করছিল অন্যদিকে বোনাত্তির এহেন ভূমিকায় সকলে ছি ছি করতে লাগল।
 
এই পুরো সময়টা বোনাত্তি একেবারে চুপ করে ছিল। অভিযানে যোগ দেয়ার সময়ই ডেশিও সকল সদস্যকে একটি চুক্তিপত্রে সই করিয়ে নিয়েছিল। যেখানে লিখা ছিল অভিযানের কোন সদস্য দুই বছর পর্যন্ত এই অভিযানের বিষয়ে প্রকাশ্যে কোন কথা বলতে পারবে না, কিছু লিখতেও পারবে না। আর সেই সময় তখন সে কিছু বললেই বা শুনত কে? জাতীয়তাবাদের উৎসবের শব্দে তার প্রতিবাদ ধামাচাপা পড়ে যেত।
 
তরুন বোনাত্তি এরপর এমন এক সংকল্প নিল যা তাকে পর্বতারোহণের ইতিহাসে এক অন্য জায়গায় নিয়ে যায়। নিজ দেশের অগ্রজদের মিথ্যাচারে বিপর্যস্ত বোনাত্তি আল্পস, হিমালয় ও আন্দিজে কঠিন ও দূরহ সব পর্বতে আরোহণ শুরু করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেয়। ইটালির সব পত্র পত্রিকায় প্রায় সময়ই তার সাফল্যের সংবাদ প্রচারিত হতে থাকে। বোনাত্তি এমন কিছু রাউটে আরোহণ করে যা তাকে সেই সময়ের একজন শ্রেষ্ঠ পর্বতারোহী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে দেয়। তার নামের পাশে লেগে থাকা কালিমা মুছে ফেলার এটাই সবচেয়ে ভাল উপায় বলে তার মনে হয়েছিল।
 
দ্যা কেটু ট্রায়াল
 
কেটু নিয়ে এমন মিথ্যাচারের কথা একসময় সবাই ভুলেই গিয়েছিল। কবর খুড়ে আবার এই ঘটনা সকলের সামনে চলে আসে ১৯৬৪ সালে। ইটালির কেটু আরোহণের এক দশক পূর্তির প্রাক্কালে ইটালির একটি পত্রিকায় কমপ্যাগনোনির একটি সাক্ষাৎকার ছাপা হয়। সেখানে কমপ্যাগনোনি জোরালোভাবে দাবি করে, বোনাত্তি মাহদিকে একা রেখে কাপুরুষের মত কাজ করেছিল আর দলীয় সিধান্তের বাইরে গিয়ে একাই সামীটে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। শুধু তাই নয় সামিটের জন্য অপরিহার্য অক্সিজেন সে ব্যবহার করেছিল যে কারণে সামিটের ২০০ মিটার আগেই তাদের অক্সিজেন শেষ হয়ে গিয়েছিল।  
 
এতবছর পর আবারও এমন নির্লজ্জ মিথ্যাচার দেখে বোনাত্তি আর সহ্য করতে পারেনি। ইটালিয়ান কোর্টে সে মানহানি মামলা করে দেয়। টানা তিন বছর ধরে সে মামলা চলে। অভিযানের দুই সদস্য পিনো গ্যালোত্তি ও এরিক আব্রাম ( যারা বোনাত্তি ও মাহদির সাথে অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে উপরে উঠছিল কিন্তু ৮০০০ মিটারের কাছ থেকে নিচে নেমে আসে) সাক্ষ্য দেয় বোনাত্তির সাথে সেই সময় সিলিন্ডারের অক্সিজেন ব্যবহার করার জন্য প্রয়োজনীয় কোন মাস্ক ছিল না। পাকিস্থান থেকে মাহদির লিখিত বিবৃতি থেকে প্রমাণিত হল বোনাত্তি তাকে ছেড়ে চলে যায়নি। শেষ পর্যন্ত ১৯৬৭ সালে বোনাত্তি সেই মামলা জিতে যায়। নাম নামে ছড়ানো সব ক’টি মিথ্যা ভুল প্রমাণিত হয়।
 
কোর্টে বোনাত্তির উপর উঠানো সব কটি অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হবার পরেও ডেশিও বা ইটালিয়ান অ্যাল্পাইন ক্লাব তাদের অফিসিয়াল রিপোর্টে এই ভুল গুলো সংশোধন ও বোনাত্তির ভূমিকার কথা স্বীকার করেনি। তাদের ভাবখান এমন ছিল যেন আদালত ভুল করেছে। সবাই বুঝতে পারছিল ইটালির দুজন কেটু আরোহীকে কোনভাবে দোষারোপ করলে কেটু আরোহণের গৌবরে ভাটা পড়ে যাবে। দেশের গৌরবে কালিমা লেপনের চেষ্টা করায় রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালি ডেশিও ও ইটালিয়ান অ্যাল্পাইন ক্লাব বোনাত্তির উপর চূড়ান্ত রকম ক্ষেপে যায় ও তাকে এক ঘরে করে দেয়।  
 
২০০৪ সালে কেটু আরোহণের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে এবার বোমা ফাটায় লিনো ল্যাচেডেলি। ইটালির সাংবাদিক জিওভানি সেনাচ্চিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে অপ্রাতাশিতভাবে নিজেদের ভুল ও মিথ্যাচারগুলো স্বীকার করে নেয়। কমপ্যাগনোনি আর সে ইচ্ছা করেই পুর্বনির্ধারিত জায়গা থেকে উপরে গিয়ে পাথরের আড়ালে ক্যাম্প সেট করেছিল, যেন বোনাত্তি কিছুতেই ক্যাম্প খুঁজে না পায়। তাদের ধারনা ছিল বোনাত্তি ক্যাম্পে চলে আসলে পরদিন সেও তাদের সাথে সামিটে যেতে চাইবে।
 
বোনাত্তির উপর অক্সিজেন ব্যবহার করার যেই অভিযোগ করা হয়েছিল সেটাও ছিল ভুল। অফিসিয়াল প্রতিবেদনে কমপ্যাগনোনি যেই দাবী করেছিল সেটাও ছিল ভুল।  অবশ্য ল্যাচেডেলি সব দোষ কমপ্যাগনোনির ঘাড়েই চাপিয়ে নিজের দায় সেরে বলে,  “যে জায়গায় ক্যাম্প করব বলে সিধান্ত নিয়েছিলাম আমি সেখানেই থেমে যাই। কিন্তু কমপ্যাগনোনি বলে সামনে এগিয়ে যেতে…”। “ বোনাত্তির উপর দোষ চাপিয়ে দেয়ার ব্যাপারে ডেশিও , কমপ্যাগনোনি ও আতা উল্লাহ’র মাঝে কোন যোগসাজশ হয়েছিল। বোনাত্তি মাহদিকে জোর করে ক্যাম্প-৯ এ উঠতে বাধ্য করেছিল, এমন অভিযোগ করা হয়েছিল। এটা অবশ্য এক অর্থে সত্যি ছিল। মাহদিকে জোরই করা হয়েছিল। কিন্তু এটা তারা করেছিল আমাদের সামিটের জন্য। এজন্য নয় যেন বোনাত্তি নিজে সামিটে যেতে পারে”। সেখানে ল্যাচেডেলি আরও স্বীকার করে নেয় যে এতদিন সে ভয়ে চুপ করে ছিল। প্রভাবশালী ডেশিও বোনাত্তির মত তাকেও একঘরে করে দিত এই ভয়েই সে এতদিন চুপ করে ছিল।   
 
২০০১ সালে ১০৪ বছর বয়সে লিটল মুসোলিনি হিসেবে খ্যাত আরডিটো ডেশিও মারা যাবার পর পরই আসলে সবার ভয়ের শৃঙ্খল ভেঙে যায়। এক এক করে অন্যরাও মুখ খুলতে শুরু করে। ইটালির প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ইটালিয়ান অ্যাল্পাইন ক্লাবকে ঘটনাটি খুটিয়ে দেখার আবারও অনুরোধ জানায়। চাপে পড়ে ২০০৪ সালে ইটালিয়ান অ্যাল্পাইন ক্লাব ৩ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। সেই কমিটি তদন্ত করে অফিশিয়াল প্রতিবেদনের অনেক জায়গায় অসংগতি খুঁজে পায়। ৩ বছর পর তারা তাদের অফিসিয়াল রিপোর্ট পরিবর্তন করে।
 
শেষ পর্যন্ত সত্য সকলের সামনে প্রকাশিত হল। বোনাত্তির উপর চাপিয়ে দেয়া সকল মিথ্যা অপবাদ তুলে নেয়া হয়। ইটালিয়ান অ্যাল্পাইন ক্লাব স্বীকার করতে বাধ্য হয় সেদিন বোনাত্তি ও মাহদির দুঃসাহসিক ও নিঃস্বার্থ ত্যাগ ব্যাতীত কমপ্যাগনোনি ও ল্যাচেডেলি তথা ইটালির পক্ষে কেটু আরোহণ করা সম্ভবপর ছিল না।

উপজীব্য

[১] The ghosts of K2 by Mick Conefrey
[২] K2 Lies and Treachery by Robert Marshall
[৩] Mountains of my life by Walter Bonatti

(Visited 1 times, 1 visits today)
সালেহীন আরশাদী
সালেহীন আরশাদী
সারাদিন শুয়ে শুয়ে বই পড়া তার শখ। পাহাড়ে যাওয়াটাকে জীবন দর্শন মনে করেন। প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা পাহাড়ের ঔষধশাস্ত্র নিয়ে গবেষণা করা তার স্বপ্ন।

মন্তব্য করুন

*Please Be Cool About Captcha. It's Fun! :)