প্রামাণ্যচিত্র: দ্যা লাস্ট আইস মারচেন্ট


আমাদের কয়েকজনের সিনেমা দেখার একটা বদভ্যাস আছে। প্রায় সময়ই আমরা ‘ভাল’ সিনেমা দেখতে বসি। এবার কোন ‘ভাল’ সিনেমাটা দেখা যায় সকলে মিলে সেই সিদ্ধান্ত নিতে প্রতিবার আমাদের বেশ বেগ পেতে হয়। সেদিন কোন সিনেমা দেখব কিছুতেই আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না। একজন এটা বলে তো আরেকজন আরেকটা। কেউ থ্রিলার দেখতে চায় তো কেউ ওয়েস্টার্ন। একসময় বিরক্ত হয়েই তূর্য বলল, ‘সিনেমা দেখার দরকার নাই। আজকে একটা ডকুমেন্টরি দেখেন সবাই।’ দেখতে বসলাম একটা শর্ট ডকু ফিল্ম ‘দ্যা লাস্ট আইস মারচেন্ট’।

পৃথিবী এখন একুশ শতকে প্রবেশ করেছে। বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির কল্যাণে মানুষের জীবনযাত্রা হয়ে গেছে অনেক সহজ। বিদ্যুৎ আর ফ্রিজের কল্যাণে আমরা এখন ঘরে বসেই বরফ পেয়ে যাচ্ছি। তাই তীব্র গরমে তৃষ্ণা নিবারণের জন্য আমাদের পর্বত থেকে কেটে নিয়ে আসা বরফের দরকার পড়ে না। তবুও পুরনো অভ্যাস আর বাবার শিখিয়ে যাওয়া এই কাজের প্রতি ভালোবাসার জন্য ইকুয়েডরের এক প্রান্তিক লোকের বরফ খনিতে কাজ করার সংগ্রাম নিয়েই তৈরি হয়েছে এই প্রামাণ্যচিত্র। পর্বতে উঠে হিমবাহ কেটে বরফ নিয়ে আসা। আর সেই বরফ দিয়ে ঠান্ডা সরবত আর আইসক্রিম খাওয়া- তথ্যচিত্রের পুরো বিষয়টাই আমার কাছে অন্য রকম মনে হয়েছিল। সবার প্রথমেই যে প্রশ্ন মনে জাগে তা হল- এই বরফের খনি আবার কি জিনিস?

১৪ শতকে পুরো বিশ্ব জুড়ে তখন ইউরোপীয় শক্তিগুলোর মাঝে নতুন ভূমি আবিষ্কার করে উপনিবেশবাদের সূচনা হচ্ছিল। এই সময় একদল স্পেনিয়ার্ড দক্ষিণ আমেরিকায় প্রবেশ করে। ধীরে ধীরে তারা ছড়িয়ে পড়ে ইনকাদের দেশে। এই সময়কালেই তারা উপনিবেশ গড়ে খনিজ সম্পদে ভরপুর দেশ ইকুয়েডরে। সোনা, রুপা, তামা, দস্তার খনি আবিষ্কার করে স্থানীয়দের দিয়ে আহরণ শুরু করে এইসব খনিজ সম্পদ। ইউরোপ থেকে আগত স্পেনিয়ার্ডদের দক্ষিণ আমেরিকার গ্রীষ্মকালের গরমে বেশ কষ্ট হত। তখন তারা স্থানীয়দের পাঠিয়ে দিত দূর পর্বতে। সেখান থেকে তারা হিমবাহ কেটে নিয়ে আসত প্রাকৃতিক বরফ। সেই বরফের টুকরো দিয়ে গলা ভেজাত স্পেনিয়ার্ডরা। এভাবেই প্রায় ৭০০ বছর আগে এখানে শুরু হয়েছিল ‘আইস মাইনিং’ বা বরফের খনি।

প্রথম কয়েক মুহুর্ত দেখেই আসলে আমি তন্ময় হয়ে গিয়েছিলাম। হুট করে চলে গিয়েছিলাম আন্দিজে, ইকুয়েডরের সর্বোচ্চ পর্বত মাউন্ট চিম্বোরাজোর ঢালে। চিম্বোরাজো নিয়ে আমার আলাদা একটা ফ্যাসিনেশন আছে। পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে যদি আমরা মাপা শুরু করি তাহলে এভারেস্টকে হটিয়ে দিয়ে এই চিম্বোরাজোই হবে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বত। এর পাদদেশে ছোট এক গ্রামে বাস করে বালথাজার উশা, যিনি সমস্ত ইকুয়েডরে ‘দ্যা লাস্ট আইস মারচেন্ট’ নামে পরিচিত।


আরও পড়ুন: এভারেস্ট কি আদৌ পৃথিবীর সর্বোচ্চ চূড়া?


স্পেনিয়ার্ডরা চলে যাবার পরেও বরফ খনির চাহিদা ছিল অনেক। খাবার-দাবার বিশেষ করে মাছ তাজা রাখতে তখন প্রচুর বরফ লাগত। সেইসাথে হাতে বানানো আইসক্রিমের জন্যেও বরফের প্রচুর চাহিদা ছিল। একটা সময় ছিল যখন অনেকেই সাদা বরফের ঢাকা পর্বতগুলোতে বরফ আহরণের কাজ করত। কিন্তু এখন অবস্থা পাল্টেছে। এখন আর কেউ এত পেরেসানি করে নিয়ে আসা বরফ চায় না। তবুও বালথাজারের কিছু চেনা গ্রাহক আছে যারা এখনও তার কাছ থেকে চিম্বোরাজো পর্বত থেকে নিয়ে আসা বরফ কিনে থাকে। কারণ তাদের বিশ্বাস, হাজার বছরের পুরোনো এই প্রাকৃতিক বরফে প্রচুর উপকারী খনিজ আছে আর এই বরফ খেতেও খুব ভাল আর মিষ্টি।

আবহাওয়া যাই থাকুক না কেন প্রতি বৃহস্পতি আর শুক্রবার বালথাজার চিম্বোরাজো পর্বতে চলে যান । রুটি আর কড়া করে বানানো কফি দিয়ে নাস্তা করে তার তিনটি গাধাকে নিয়ে তিনি ট্রেকিং শুরু করেন। গ্রাম থেকে হিমবাহের গোঁড়ায় যেতে তার চার ঘন্টা লেগে যায়। যাবার পথেই সে এক গাদা ঘাস কেটে নিয়ে যায়। এই শুকনো ঘাসে মুড়িয়ে বরফের ব্লকগুলো নিচে নামিয়ে আনেন। গাইঁতি আর কুড়াল দিয়ে কেটে বরফের বড় বড় ব্লক কেটে বের করতে তার সময় লাগে প্রায় তিন ঘন্টা। এরপর এক মন ওজনের একেকটি বরফের ব্লক শুকনো ঘাস দিয়ে মুড়ে দুটি করে ব্লক গাধার পিঠে চড়িয়ে দেয়। এক মন ওজনের এমন একটি ব্লক স্থানীয় বাজারে বিক্রি করেন প্রায় দুই থেকে আড়াই আমেরিকান ডলারে।

মাত্র দশ থেকে বার ডলারের জন্য এত কষ্ট করা পোষায় না বলে এক এক করে বালথাজারের ভাইসহ গ্রামের সবাই এই বরফ নামানোর কাজ ছেড়ে চলে গেছে। একমাত্র বালথাজার তীব্র সংগ্রাম করে এই ঐতিহ্যবাহী জীবিকা ধরে রেখেছেন। এই বরফের গ্রাহকরা তাকে কঠিন শর্ত দিয়ে রেখেছেন। যদি কোন একবার সে সময়মত তার বরফ পৌঁছাতে না পারেন তাহলে আর কখনো তারা বালথাজারের নিয়ে আসা চিম্বোরাজোর বরফ রাখবে না।

আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে বালথাজারের অবস্থা এখন কিছুটা হলেও পরিবর্তন হচ্ছে। তাকে নিয়ে বানানো হয়ে বেশ কিছু টিভি প্রোগ্রাম ও ডকুমেন্টরি। আজ পুরো ইকুয়েডরে বালথাজার উশা একটি পরিচিত নাম। পুরনো ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার জন্য সেদেশের প্রেসিডেন্টও বালথাজারকে বিশেষ সম্মান জানিয়েছেন। এই বিচিত্র ও রোমাঞ্চকর জীবিকার খবর চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ার কল্যানে এখন অনেকেই এই অঞ্চলে ঘুরতে আসছে। ভ্রমণকারীরা অনেকেই বালথাজারের সাথে থেকে তার এই বিচিত্র জীবিকার স্বাদ নিতে চায়। পর্যটনের কল্যাণে আর্থিকভাবে বালথাজারের অবস্থা ধীরে ধীরে পরিবর্তন হলেও সত্তর পেরিয়ে যাওয়া বালথাজার আর কতদিন এই জীবিকা ধরে রাখতে পারবেন সেটাই দেখার মত বিষয়। বালথাজারের পর আর কাউকেই হয়ত আইস মারচেন্ট হিসেবে পাওয়া যাবে না। সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে যাবে প্রাচীন এই জীবিকা।

এই প্রামাণ্যচিত্রে পাহাড়ে বসবাসকারী স্থানীয় অধিবাসীদের কঠিন জীবনযাত্রা, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন খুবই ভালভাবে দেখানো হয়েছে। কিভাবে সময়ের সাথে সাথে এই অধিবাসীদের জীবনযাত্রা প্রভাবিত হয় সেটাই দেখানো হয়েছে বালথাজার ও তার দুইভাইয়ের মাধ্যমে। তিনজনের দৃষ্টিতে তাদের সমস্যা, আকাঙ্খা ও স্বপ্নগুলো দেখানো হয়েছে। পরিচালক স্যান্ডি প্যাচ তিন ভাইয়ের গল্পের মাধ্যমের পাহাড়ের ছোট একটি সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি ও সময়ের সাথে সাথে আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের চিত্রটি অনেক মুন্সিয়ানার সাথে তুলে ধরতে পেরেছেন।

প্রায় পনের মিনিটের এই প্রামাণ্যচিত্রটির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একেবারে তন্ময় করে রাখবে। প্রামাণ্যচিত্রের থিম থেকে শুরু করে এর সিনেম্যাটোগ্রাফি, এর গল্প, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর সহ প্রতিটি কাজ অনেক চমৎকার হয়েছে। ফিল্মটি শেষ হবার পর মানব সভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে কিভাবে আমাদের সংস্কৃতিগুলো হারিয়ে যায় এই ভাবনা অনেকক্ষণ আপনাকে বুঁদ করে রাখবে।

(Visited 1 times, 1 visits today)
সালেহীন আরশাদী
সালেহীন আরশাদী
সারাদিন শুয়ে শুয়ে বই পড়া তার শখ। পাহাড়ে যাওয়াটাকে জীবন দর্শন মনে করেন। প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা পাহাড়ের ঔষধশাস্ত্র নিয়ে গবেষণা করা তার স্বপ্ন।

মন্তব্য করুন

*Please Be Cool About Captcha. It's Fun! :)