রুংরাং


রাজ ধনেশের নামে পাহাড় আছে বান্দরবানে। নাম তার রুংরাং তং। দূর থেকে কির্স তংয়ের ডান পাশে যে পাহাড় দেখা যায় সেটাই রুংরাং। ওখানে রাজ ধনেশের অপর নাম রুংরাং।

এখন পর্যন্ত চারবার যাওয়া হয়েছে কির্স তংয়ের সবচেয়ে কাছের পাড়া পারাওপাড়ায়। রাজ ধনেশের দেখা পেয়েছি তিনবার। এছাড়া বান্দরবানের রেমাক্রিতেও পাখিটির এক পরিবারের দেখা পেয়েছিলাম। এদের আকাশ জয় করে উড়ে যেতে দেখলেই ভালো লাগে। মনে হয় যে, নাহ… এখনও বান্দরবানে কিছু আছে। আর এখনই যদি বনটাকে রক্ষা করা না যায় তাহলে ওরাও হয়ত আর থাকবে না। পাড়ার অনেকের মতেই আগের তুলনায় কমই দেখা যাচ্ছে এই ধনেশ।

খুব তাড়াতাড়িই সন্ধ্যা নামে পারাওপাড়ায়। সময় অনুযায়ী আলো থাকার কথা থাকলেও দক্ষিণ পশ্চিমের রুংরাং পাহাড়ের ওপাশে চলে যায় সূর্যটা। বহু সকাল ওখানে থেকেছি। আমি সেই সকালটার অপেক্ষায় থাকি যেদিন পাড়ার উপর দিয়ে ধনেশ উড়ে যাবে কিন্তু কেও মেরে ফেলার জন্য এগিয়ে যাবে না। এসবের সঙ্গে আমিষের ঘাটতি মেটানোর ব্যাপারটা জড়িত আছেই আর শিক্ষা যে এখনো বহু আরাধ্য বিষয়!


[শুনুন রাজ ধনেশের নমুনা ডাক]


এক রাতে গল্প করছিলাম পাড়ার ডনের সাথে। সেদিন ধনেশ নিয়ে অনেক কথা হয়েছিলো। যা হুবহু মিলে যায় আমাদের জানা ঘটনার সাথে। ধনেশের বাচ্চা জন্মদান ব্যাপারটা অন্য সকল পাখি থেকে ভিন্ন। প্রজননের সময় মেয়ে ধনেশ বড় গাছের ফাঁপা গর্ত খুজে বের করে এবং সেই গর্তেই থেকে যায়। সেই গর্ত মুখের লালা, বিষ্ঠাসহ আরো নানা কিছু দিয়ে লেপে দেয়। এর মধ্যে একটা ছোট ছিদ্র থাকে যেখান দিয়ে সে ছেলের আনা খাবার নিতে পারে। ছেলে ধনেশ পুরো বন ঘুরে নানা ধরনের খাবার সংগ্রহ করে। ধনেশের খাবারের মধ্যে বেশিরভাগই ফল থাকে। ছোট ছোট প্রাণীও এরা খেয়ে থাকে। এভাবে ছেলেটি ৬-৮ সপ্তাহ মেয়েটিকে ঐ ছিদ্রের মধ্যে দিয়েই খাওয়া দিয়ে যায়। একসময় মেয়ে পাখির সকল পালক পড়ে যায়। নিজের এবং ছানার পালক গজানো না পর্যন্ত সে সেই গর্ত থেকে বের হয় না। খাবার সংগ্রহের কাজ করতে গিয়ে কিছু ছেলে ধনেশ এতটাই দুর্বল হয়ে পড়ে যে সে মারাও যায়। এর ফলে মেয়েটাও গর্তের মধ্যে খাবার না পেয়ে মারা যায়, সাথে বাচ্চাও!

ডনের মতে তারা প্রজনন মৌসুমে ধনেশ ধরে না। সাধারণত শীতের আগে আগে অনেক পাড়ার মানুষ ধনেশ ধরে। প্রায় প্রতি সকালেই দেখতাম পাড়ার ছোটরা (বয়স ১০ কি ১২ হবে) গুলতি আর নিজেদের বানানো ছোরা নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে। প্রায়ই ছোট পাখি ধরে আনত ওরা। যদিও অনেকের কাছ থেকে জেনেছি মাংসের পাশাপাশি ধনেশের ডিমও খায় পাহাড়িরা, বিক্রির ঘটনাও আছে।

প্রথম ধনেশ দেখার অভিজ্ঞতা খুব করে মনে থাকবে বহুদিন। খুব ভয় পেয়েছিলাম সেদিন। কোন পাখির ডানার যে এমন শব্দ হতে পারে ভাবিনি কখনো। শুনেছিলাম রাজ ধনেশের ডানার শব্দ আধা মাইল দূর থেকে শোনা যায়। আর এর ডাক আরো দূর থেকে শোনা যায়। এই ডাকের জন্যই এদের খুব সহজে বের করে ফেলা যায় বনের কোথায় আছে। ১৫০ সেন্টিমিটার প্রশস্থ এই পাখির ডানা।  আকারে বড় সড় পাখি হবার দরুন একে শিকার করে অনেকে। তাই দিন দিন কমে যাচ্ছে এদের সংখ্যা।



কোন এক ফেব্রুয়ারির দুপুরে এমনি বসে ছিলাম, এমন সময় খুব গা ছম ছম করা কিছু উড়ে যাওয়ার শব্দ পেলাম। মনে হলো একদম পাশ দিয়ে উড়ে গেল । আমি দেখে একটুর জন্য চিৎকার করে ফেলছিলাম। এ যে ধনেশ ! রাজ ধনেশ! তাহলে একদম পাশ দিয়ে উড়ে যাবার শব্দ কেমন হতে পারে ভাবুন একবার । বহু ডাল পালা আছে এমন একটা গাছে বসেছিলো । খুব কাছেই ছিল বলা যায়। সেদিনের উত্তেজনা ছিল আকাশ ছোয়া । দুচোখ ভরে দেখতে থাকলাম । কিছুক্ষণ পর পর মাথাটা চারদিকে ঘুরিয়ে সবকিছু ঠিক আছে কিনা দেখছিলো পাখিটা।

একই জায়গায় তিনবার এই রাজ ধনেশ দেখেছি। দুইবারই যুগল দেখেছি। বহু প্রতিকুলতা পেরিয়েই হয়ত বেঁচে আছে এরা এখানে। সাধারণত খুব সমস্যায় না পড়লে এরা জায়গা বদল করে না। বার বার একই স্থানে প্রজনন করে, একই বাসা ব্যবহার করে।



ইংরেজিতে একে Great Hornbill বলে। ইংরেজি Horn মানে হচ্ছে শিং আর bill মানে পাখির ঠোঁট বা চঞ্চু। ধনেশ পাখির শক্ত, বাঁকানো বিশাল ঠোঁটের কারণে বৈজ্ঞানিক নামকরণের সময়ও ওদের গোত্রের নাম রাখা হয়, Bucerotidae, গ্রীক ভাষায় buceros অর্থ গরুর শিং। অর্থাৎ ইংরেজিতে এই পাখির নাম, গরুর শিং ঠোঁটওয়ালা পাখি।

বাংলাদেশের বৃহত্তম পাখিদের মধ্যে রাজ ধনেশ আছে। এদের বিচরণ চিরসবুজ বনেই। পার্বত্য চট্টগ্রামেই রাজ ধনেশের দেখা মেলে। এর ঠোঁটের মাথা থেকে লেজের শেষ পর্যন্ত দৈর্ঘ্য ৯৫ থেকে ১০৫ সেন্টিমিটার। ঠোঁটের শুরুতে হলুদ আর প্রান্তে লালচে। কালো হলুদ সাদা এই তিন রঙের মিশ্রণই রাজ ধনেশ। বয়স ভেদে  ওজন প্রায় ৩-৬ কেজি হয়ে থাকে। স্ত্রী ধনেশের তুলনায় পুরুষ ধনেশ সবসময় বড় হয়ে থাকে।

এদের রয়েছে লম্বা, নিম্নমূখী বাঁকানো ঠোঁট। এইটাই একমাত্র পাখি যার প্রথম দুইটি ঘাড়ের হাড় ‘এক্সিস’ ও ‘এটলাস’ একে-অপরের সাথে লেগে থাকে। এতে করে অনেক লম্বা ঠোঁটকে ভালভাবে ধরে রাখতে সহায়তা পায় এরা।

সাধারণত এরা জোড়ায় জোড়ায় থাকে, মাঝে মাঝে পুরো পরিবারসহ দেখা যায়। বাংলাদেশ সহ ভারত, নেপাল, ভুটান, চীন, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়শিয়া, ইন্দোনেশিয়ায় এদের দেখা যায়। বিশ্বে এর অবস্থান প্রায় বিপদগ্রস্ত আর বাংলাদেশে মহাবিপন্ন বলে জানা যায়।


আরও পড়ুন

দাগিঘাড় কুটিপেঁচা

 

(Visited 1 times, 1 visits today)
সাহাদ রাজু
সাহাদ রাজু
পাখি পর্যবেক্ষক

২ thoughts on “রুংরাং

মন্তব্য করুন

*Please Be Cool About Captcha. It's Fun! :)