ট্রেক প্রতিবেদন: স্মৃতিতে পাংগারচুলা


পাহাড়কে ভালোবাসার শুরু ক্লাস ফাইভের বাংলা বই থেকে। তেনজিং নোরগে আর স্যার এডমন্ড হিলারির এভারেস্ট অভিযানের রোমাঞ্চকর গল্প ছিল সেখানে। ছোটবেলায় বাসায় রাগারাগি হলে একা একা হাঁটতে বেরিয়ে পড়তাম। সারাদিন হেঁটে অনেক দূরে চলে যেতাম, সুন্দরবনের পাশেই বাসা বলে হয়ত প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যাবার একটা টান ছিল। সেখান থেকেই মনের অজান্তে অ্যাডভেঞ্চারকে ভালবেসে ফেলি। ডিসকভারি কিংবা ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেলে পড়ে থাকতাম সারাদিন। মনের কল্পনায় কেওক্রাডং-তাজিংডং চলে যেতাম। তবে কখনো ভাবিনি এগুলোতে আদৌ যেতে পারব।


ছবি [এমদাদ তুষার, হায়াত সিং ও সুমিত চন্দ]


পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভাল ছিল না,  তাই আমার অ্যাডভেঞ্চারের দুনিয়া এলাকার খাল বিল,  আর আশেপাশের রাস্তাঘাটেই সীমাবদ্ধ ছিল। এসএসসি পরীক্ষার পরে স্কাউটিং করার সুবাদে একটা আন্তর্জাতিক জাম্বুরিতে জাপানে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে যাই। সেখানে এক প্রোগ্রামের অংশ হিসেবে ছোট একটা পাহাড়ে ট্রেকিংয়ে গিয়েছিলাম। সেই থেকে পাহাড়কে ভালোবাসতে শুরু করি। দেশে ফিরেই টিউশনির টাকা জমিয়ে বান্দরবান যাই। পাহাড় আমকে প্রচণ্ড রকম আকর্ষণ করতে থাকে। বান্দরবানের পাহাড়গুলোয় ঘুরে বেড়ানোর মধ্যেই হিমালয়ের প্রতি তীব্র আকাঙ্খা জন্মে ওঠে। সময় আর সুযোগের অপেক্ষা করছিলাম শুধু।

পরিকল্পনা পর্ব

অনেক দিনের স্বপ্ন, শ্বেত শুভ্র পর্বত স্পর্শ করবো, কেমন হয় এই পর্বত সেটা জানার চেষ্টা করব। যখন প্রথম পাহাড় ভালোবেসেছিলাম, তখন থেকেই ইন্টারনেটে ঘাটতাম। সৌভাগ্যক্রমে ক্লাব কোয়েস্টের সদস্য হওয়ার সুযোগ পেয়ে যাই। ভার্সিটিতে অ্যাডমিশনের পরে থেকে ক্লাবের সদস্যদের ছুটির সাথে তাল মেলাতে না পারায় কোন অভিযানেই অংশ নিতে পারিনি। তাই শেষমেশ অন্য দুজনের সাথে গত ডিসেম্বরে [২০১৫] একটা পরিকল্পনা সেরে ফেলি। লাংটাংয়ের ইয়ালা পিক। কিন্তু পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাবে তা আর সম্ভব হয়নি। পরে কোয়েস্টের এক মিটিংয়ে নীল ভাইয়ের পরিকল্পনা ভালো লেগে যায়- শিথিধর পর্বতের। এদিকে ফরহাদ ভাই আর তুষার ভাইও রাজি হওয়ায় আমাদের ছোট একটা টিম হয়ে গেল।

পরিকল্পনা এগোতে থাকল। চলল প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের কাজ। কিন্তু সমস্যাটা ছিল শিথিধর সম্পর্কে অনলাইনে নির্ভরযোগ্য ও বিস্তারিত তথ্য খুবই কম থাকায় আমাদের বার বার অপারেটরদের উপর নির্ভর করতে হচ্ছিল। যোগাযোগের কাজটা আমি দেখছিলাম। শিথিধর সাধারণ অভিযান না হওয়ায় মাত্র দু’একজন অপারেটরের খোঁজ মিলল। ঠিক করা হলো রোজার ছুটিতে আমরা অভিযানে যাব। নিয়মিত গ্রুপ মিটিং হতে থাকলো। কেউ একটা তথ্য জানলে সবাইকে জানিয়ে দিতাম। যতটুকু বুঝতে পেরেছিলাম, পর্বতারোহণে অভিযাত্রীদের মধ্যে ঐক্য জিনিসটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সময় ঘনিয়ে এলো, একদিন খবর মিলল নীল ভাই ছুটি ম্যানেজ করতে পারলেও তার ভার্সিটির পরীক্ষা পড়ে যাবে অভিযানের মধ্যে। ভিসা না পাওয়ায় ফরহাদ ভাই, অসুস্থতার কারণে সায়মন ভাইও অনিশ্চিত হয়ে যাওয়ার পর এখন শুধু আমি আর তুষার ভাই আছি। আমাদের দুজনের জন্য তাই পরিকল্পনা পরিবর্তন করতেই হলো।

অবশেষে হিমালয়ে আমাদের অনভিজ্ঞতা, খরচ, সময় ইত্যাদি বিবেচনা করে আমরা বেছে নিলাম উত্তরাখন্ডে অবস্থিত ‘পাংগারচুলা’।  

কলকাতা পর্ব

দুজনেরই প্রথমবার ভারতবর্ষ ভ্রমণ, অনেক উত্তেজিত ছিলাম। সায়মন ভাই আর প্রভা আপু এসে ব্যাকপ্যাক গুছিয়ে দিলেন। দেশ থেকে শুভকামনা ও প্রস্তুতি সেরে উঠে পড়লাম রাতের বাসে। বান্দরবান অভিযানগুলোর সঙ্গী প্রিয় ইন্তিয়াজ ভাই শুভকামনা জানিয়ে গেলেন। দেশ ট্রাভেলসে্র বাস কল্যাণপুর ছেড়ে চলতে শুরু করলো। ভোর হওয়ার আগেই আমরা বেনাপোল পৌঁছে গেলাম। ফ্রেশ হয়ে বর্ডারের যাবতীয় কাজ সেরে ভারতে প্রবেশ করলাম। বেশ অনেক্ষণ পর খেয়াল হল আশেপাশের সবকিছুই কেমন অন্যরকম হয়ে গেছে। ঘরবাড়ি, মানুষজন, বাংলা লিখা কিছুই আর বাংলাদেশের মত নেই। উপলব্ধি করলাম একটা দেশের কাল্পনিক সীমানা মানুষের জীবনযাত্রার উপর কতই না প্রভাব ফেলতে পারে।

দীর্ঘ বাস যাত্রায় ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। কোন রকম একটা হোটেল ঠিক করেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। পরদিন ঘুম ভাঙলো বেশ সকালেই। ডিম রুটি দিয়ে ব্রেকফাস্ট শেষে হোটেলে চেক আউট করে কোলকাতা ঘুরতে বেরিয়ে পড়লাম। সায়েন্স সিটি কাছেই ছিল। ভেতরটা অনেকটা ধাঁধার মত। অনেক ভালো লাগলো জায়গাটা। একটা জায়গায় দেখলাম বিজ্ঞানের সব মজার প্রয়োগগুলো হাতে কলমে উপভোগ করার বিশাল যোগাজন্তর। আমাদের দেশে যেটা নভোথিয়েটারে করার চেষ্টা করা হয়েছে, যদিও এতটা বিশাল ভাবে নয়। আরেক জায়গায় দশের সূচকের মাধ্যমে এক ছোট মেয়ের পৃথিবীর অবস্থান থেকে শুরু করে বিশাল ব্রহ্মাণ্ডের বর্ণনা দেওয়া আছে। এখানে দাঁড়িয়ে যেই এভাবে দেখবে তারই মনে হবে সৃষ্টিতে তার অবস্থান কত ক্ষুদ্র, তার পরক্ষণেই তার মন থেকে অহংকার লোভ প্রভৃতি মুছে যাওয়ার কথা। দুপুরে খেয়ে দেয়ে ব্যাকপ্যাক নিয়ে আবারও বেরিয়ে পড়ি। এবার উদ্দেশ্য হাওড়া স্টেশন।  

আবারো যাত্রা

হাওড়া স্টেশন। ভিক্টোরিয়ান আর্কিটেকচারের বিশাল দুটি ভবন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। শুনেছি এই স্টেশনে ত্রিশটির মত প্ল্যাটফর্ম আছে। প্রতি মুহূর্তে এই প্ল্যাটফর্মগুলো থেকে ভারতের নানা জায়গার উদ্দেশে ট্রেন ছেড়ে যাচ্ছে বা আসছে। ভিতরে ঢুকে তো আমাদের চোখ ছানা বড়া। অনেক উঁচুতে ছাদ। বিশাল উঠানের মত জায়গায় হাজার হাজার লোক শুয়ে আছে। হাজারো লোকের আওয়াজে পুরো জায়গাটা গমগম করছে।

আমাদের ট্রেন দুন এক্সপ্রেস। হরিদ্বার হয়ে দেহরাদুন পর্যন্ত যাওয়া যায়। দুইদিনে এই ট্রেন প্রায় দেড় হাজার কি.মি পথ পাড়ি দেয়। পথে প্রায় ৭৩ টা স্টেশনে থামবে এই গাড়ি। স্টেশন খুঁজে আমাদের প্লাটফর্মে চলে এলাম। চারপাশের ব্যস্ততা অনুভব করতে করতে হঠাৎ খেয়াল হলো ওয়াইফাই সংযোগ মোবাইলে। ভারতের সব বড় বড় রেল স্টেশন আর এয়ারপোর্টে ইন্টারনেট সুবিধা পাওয়া যায়। আর এত সুবিশাল ট্রেন নেটওয়ার্ক সামলানো পৃথিবীতে অন্যতম কঠিন একটা কাজ। তাই হয়তো বলা হয়, দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান রেলওয়ে।

আমাদের ট্রেন যথাসময়ে এলো। এই প্রথম স্লিপার ধরনের কোন ট্রেনে চড়া, ব্যাপারাটা উপভোগ্য মনে হচ্ছিলো। ট্রেন সময়মতই ছাড়ল। কিছুদূর যাবার পরেই আমাদের কেবিনে আরো দুজন যাত্রী উঠলো, তাদের ব্যাকপ্যাক দেখেই বুঝা গেল আমাদের মতই ভ্রমণে বেড়িয়েছে। কথা বলতেই জানলাম তারাও বাংলাদেশী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ডেল্টা ভাই আর মুগ্ধ ভাই | প্রায় একমাসের ভারত ভ্রমণে এসেছেন। আপাতত তাদের রূপকুণ্ড ট্রেকই  লক্ষ্য। দুজনেই অনেক বন্ধুসুলভ। পরবর্তী দুইদিনের সম্ভাব্য বিরক্তিকর যাত্রাটা যে উপভোগ্য হয়েছিল এর জন্য সম্পূর্ণভাবে তাদের কাছে কৃতজ্ঞ।

 ২৯শে মে, ২০১৬

ঘুম ভাঙার পর থেকেই অস্বস্তি। ট্রেন ভোর রাতে পৌঁছানোর কথা কিন্তু ইতিমধ্যে ছয় ঘণ্টা লেট। ভোরে হরিদ্বার থেকে বাস ধরতে না পারলে আমাদের পুরো একটা দিন থেকে যেতে হবে। কপালে তাই জুটল। দুপুরে ট্রেন হরিদ্বার নামালো। আশেপাশে সব খবর নিয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম একটু এগিয়ে থাকা যাক। তাই চারজনই একসাথে ঋষিকেশের পথে রওনা হয়ে গেলাম। হরিদ্বার, ঋষিকেশ ধর্মীয় তীর্থস্থান। তার উপরে গঙ্গার ঘাটগুলোতে উপচে পড়া ভীড়।  এ সময়টাতে ডেল্টা ভাইয়ের কাছে জানলাম সন্ধ্যায় মন্দিরে আরতি হয়, যা খুবই দর্শনীয় ব্যাপার। মনে মনে ভাবলাম, ফেরার সময় দেখে যাব। হালকা পাহাড়ি পথে ওঠানামা করতে করতে ঘুমে ঢলে পড়লাম। উঠতেই দেখি ঋষিকেশে প্রায় পৌঁছে গেছি। বাসস্ট্যান্ডে নেমেই এই প্রথম স্বর্গীয় অনুভুতি হতে লাগলো। সামনে বিশাল হিমালয় পর্বতশ্রেণি এখানে এসে সমতলের সাথে মিশেছে। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে পুরো দৃশ্যটা উপভোগ করলাম।


ঋষিকেশ, যেখানে হিমালয়ের পাহাড়গুলা সমতলে এসে মিশেছে 


এখন যেতে হবে লক্ষণঝুলা, বেশীরভাগ হোটেল সেখানেই। পাহাড়ি রাস্তায় জ্যামের পথ পেড়িয়ে একটা হোটেলে ঘর ঠিক করেই বেরিয়ে পড়লাম গঙ্গার তীরে বৈকালিক ভ্রমণে। মন একদম ফুরফুরে হয়ে গেল।ঠিক এমনটা দেখেছিলাম জাপানের ফুকুওকা শহরে। তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছা করে একটানা। একটু এগুতেই প্রচুর জিপ উপরে উঠছে, ছাদে র‌্যাফট নিয়ে। এখানে প্রচুর র‌্যাফটিং হয়। জিনিসটা অ্যাড্রেনালিন ক্ষরণের জন্য অনেক ভালো একটা উপায়। পথে যেতে যেতে অনেক মন্দিরও চোখে পড়ল। এখানে যোগব্যায়ামের আশ্রম অনেক বেশি। ঋষিকেশকে যোগের রাজধানী বলা হয়। প্রচুর বিদেশী এখানে গঙ্গার পবিত্র আবহে যোগ শিখতে আসেন। এখানে থেকেই হিমালয় থেকে নেমে আসা গঙ্গা সমতলে মিশেছে।

ইতিহাস বলে, ঋষিকেশ প্রাচীনকালে কেদারখণ্ডের অংশ ছিল। শ্রীরামচন্দ্র লঙ্কায় অসুররাজ রাবণকে বধ করে এখানে এসে প্রায়শ্চিত করেছিলেন। ভাই লক্ষণ যে জায়গা থেকে পাটের সেতু করে গঙ্গা পার হয়েছিলেন, সেটা পরবর্তীতে শক্তপোক্ত কাঠামো দিয়ে প্রতিস্থাপিত হয়ে বর্তমানে স্টিল ও রৌপ্যব্রীজে পরিণত, এ জায়গাটিই লক্ষণঝুলা। এখানে গঙ্গাতীরে এক বিশাল আশ্রমও রয়েছে। প্রতি সন্ধ্যায় গঙ্গারতি হয় এখানে আর তা দেখতে প্রচুর পর্যটক ভীড় জমান।

পেটে ক্ষুধা চো চো করছিল সবার। একটা বড়সড় রেস্টুরেন্টে ঢুকে পড়লাম। ঋষিকেশ নিরামিষ শহর। আমিষ এখানে নিষিদ্ধ। এই ভেজ থালি খেয়েই আবার বেরিয়ে পড়লাম চার মুসাফির। গঙ্গার পবিত্র আবহে মন যে কখন পবিত্র হয়ে উঠলো বুঝতে পারিনি। সেই অনুভূতিই জানান দিচ্ছিলো, স্রষ্টার উপস্থিতির কথা। গঙ্গার মিষ্টি বাতাসের আস্বাদে প্রকৃতি উপভোগ করতে করতে কখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত নেমে এল টেরই পাইনি।  আরতি শেষে হোটেলে চলে এলাম। রাতে হালকা খেয়ে ঘুম দিলাম। ক্লান্তির ঘুম।

৩০শে মে, ২০১৬

খুব ভোরে বাস স্ট্যান্ডে চলে এলাম। ডেলটা ভাই আর মুগ্ধ ভাই অন্য পথে চলে গেল আর আমরা দুজন যোশীমঠগামী বাসে উঠে পড়লাম। বাস ছাড়ার একটু আগে দেখি ভাইয়ারাও হাজির। একসাথেই নাকি অনেকটা পথ যেতে হবে। বাস ধীরে ধীরে হিমালয়ের পাহাড় বেয়ে উঁচুতে উঠতে লাগলো। গঙ্গার ধার ঘেঁষে কখনো পাহড়ের ঢালে আবার কখনো পাথর কেটে বানানো হয়েছে রাস্তা। রাস্তার পাশে মজার মজার উক্তি দেওয়া কোথাও কোথাও। সব জায়গায় ‘BRO’ শব্দটার অনেক প্রয়োগ দেখছিলাম। মজা করেছিলাম এটা নিয়ে অনেক। পরে জানতে পারি সেটা ইন্ডিয়ান আর্মি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বিশেষ এক সংস্থা- Border Roads Organisation, সীমান্তবর্তী সড়ক নির্মাণ, তদারক করা ও নিয়ন্ত্রণ করাই BRO’র কাজ। এই ৩৫০ কি.মি দীর্ঘ পাহাড়ি রাস্তা সোজা চলে গেছে বদ্রীনাথ হয়ে তিব্বতের কাছে ভারতের শেষ গ্রাম মানা পর্যন্ত। গ্রীষ্মকালে চারধাম যাত্রায় এই অতি উচ্চতার বিপজ্জনক রাস্তাতেও ট্রাফিক জ্যাম লেগে যায়। পাঁচ/ছয় হাজার ফিট উঁচু এই রাস্তাটি বেশিরভাগ সময়ই গঙ্গার পাশে থেকে এগিয়ে গিয়েছে। এ রাস্তা চলে ধরে চললে পাঁচটি নদীর মিলনস্থল (বিষ্ণুপ্রয়াগ, নন্দপ্রয়াগ, কর্ণপ্রয়াগ, রুদ্রপ্রয়াগ আর দেবপ্রয়াগ) যাদের মিলনে গঙ্গা নদীর উৎপত্তি, সেই জায়গাগুলোর দর্শন মেলে ।



গাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তায় উঠছে। এদিকে টানা জার্নিতে তুষার ভাই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। একটু পরপর বমি করছিলেন তিনি। অনেকটা চিন্তায় পড়ে গেলাম। পুরো অভিযান নির্ভর করছে দুজনের সুস্থতার ওপর। তিনি কিছু খেতেও পারছিলেন না, ফলে আরও দূর্বল হয়ে পড়ছিলেন। কর্ণপ্রয়াগ এসে গেলে আমরা বাস থেকে নেমে পড়ি। ডেল্টা ও মুগ্ধ ভাইয়ারা আলাদা হয়ে যান। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য জোশীমঠ।

কিছুক্ষণ পর তুষার ভাই একটু সুস্থবোধ করায় আবার বাসে উঠে পড়ি। রাস্তা এখন আরো বেশি খাড়া। প্রায় ৬,০০০ ফিট উঁচু জোশিমঠে সন্ধ্যানাগাদ পৌঁছে গেলাম। কম খরচের মধ্যে একটা হোটেলও পেয়ে গেলাম। দেখতে ভালো না হলেও এর ব্যালকনিটা আমার কাছে সবথেকে সুন্দর ঠেকলো। এখান থেকেই জীবনে প্রথমবারের মতো মেঘের আড়ালে সাদা পাহাড়ের দেখা পেয়ে যাই। দুজনেই অনেক কৌতূহল নিয়ে সেদিকে চেয়ে ছিলাম অনেকক্ষণ। বিগত কয়েকদিন নিরামিষ খাবার খেয়ে খেয়ে শেষমেশ আমিষ খুঁজতে বের হলাম। খুঁজে পেতে বেশ বেগ পেতে হলো! এক রেস্টুরেন্টে পুরোদমে ক্ষেপে গিয়েছিল আমাদের ওপর। অবশেষে এক দোকানে মুরগীর মাংস পেয়ে বসে পড়লাম। দুজনের পেটে তখন আকাশ সমান ক্ষুধা। খেতে খেতে টিভি দেখছিলাম। বাংলাদেশ বনাম ভারতের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ম্যাচ। সবাই উৎসুকভাবে খেলা দেখছিল। আমরা চুপচাপ খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম।


হোটেলের ব্যালকনি থেকে থেকেই জীবনে প্রথমবারের মতো মেঘের আড়ালে সাদা পাহাড়ের দেখা 


জোশিমঠ শহরের ভৌগোলিক অবস্থানটা দারুণ। সামনে স্লিপিং লেডি নামের কালো বিশাল পাথুরে পাহাড়ের চূড়া যা সারাক্ষণ মেঘে ডুবে থাকে, আরেক পাশে সবুজ পাহাগের বুকে ধাপে ধাপে উঠে গেছে জোশিমঠ শহর। আর অনেক নিচ দিয়ে বয়ে গেছে অলকানন্দা নদী যা পরবর্তীতে ভাগীরথী নদীর সাথে মিশে গঙ্গা নামধারণ করেছে।

তিব্বতের সীমানা নিকটবর্তী শহর হওয়ায় নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি প্রচুর। তবে শহরের লোকেরা অনেক বন্ধুসুলভ। জোশিমঠ শহরটা দুর্গম জায়গায় হলেও অনেকটা আধুনিক। নিচে অলকানন্দার ওপর স্থাপিত জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র থাকায় ঘরে ঘরে বিদ্যুৎও আছে। এছাড়া এখানে জিনিসপত্র সস্তা, তবে ভাত ও চায়ের দাম কিছুটা বেশি লাগল আমাদের কাছে। খেয়ে দেয়ে হোটেলে ফিরবার সময় কয়েকটা এজেন্সির সাথে প্রাথমিক কথা বলে আসলাম। তুষার ভাই অসুস্থতার কারণে একদিন জোশিমঠেই বিশ্রাম নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। আটটা বাজতে না বাজতেই পুরো শহর ঘুমিয়ে পড়তে লাগল। আমরাও হোটেলে ফিরে এলাম।

আমাদের প্যাকেজ এক্সপিডিশনের কোন পরিকল্পনা ছিল না। কিন্তু নন্দাদেবী অ্যালপাইন এজেন্সির মালিক বিবেক দাদার বন্ধুত্বসুলভ আচরণ, প্রয়োজনীয় তথ্য আর সাশ্রয়ী অফার পেয়ে না করতে পারলাম না। সরকারী নিয়ম অনুযায়ী শুধু গাইড নিয়ে যাবো আর উপরে পোর্টার কুকের কাজ আমরা নিজেরাই করবো। আগামীকাল সকাল থেকেই ট্রেক শুরু হবে। এতদিনের পরিকল্পনা, প্রস্তুতি আর স্বপ্ন- সবকিছু ঠিকঠাকভাবে হবে তো- এসব ভাবনায় মগ্ন হয়ে ছিলাম বাকিটা সময়।



ট্রেকের শুরু

আমাদের গাইড হায়াত সিং, বয়স ৪০-৪৫ এর কাছাকাছি হবে। মুখে হালকা গোফদাড়ি আছে, এ কারণে হয়ত আরও বয়স্ক দেখাচ্ছে। পড়নে পাতলা একটি সোয়েটার। আমার কাছে তার লুকটা শার্লক হোমসের মতো মনে হল। তার চোখের দিকে তাকাতেই দেখলাম পাহাড়ি গ্রামের মানুষগুলোর সরলতা। কিছুক্ষণ কথা বলতেই তাকে খুব পছন্দ হয়ে গেলো। অনেক বন্ধুসুলভ এবং হেল্পফুল। যেটা আমরা মনে প্রাণে আশা করছিলাম। বিবেক দাদা জিপ রেডি করে রেখেছিলেন, চা খেতে খেতেই শুভকামনা নিয়ে রওনা হয়ে গেলাম তিনজন। আজকের গন্তব্য অলি।



বিশালাকার ওক বনের মধ্য দিয়ে জিপে চলেছি। মাঝে মাঝে দূরে পর্বত দেখা গেলে হায়াত সিংজির কাছে থেকে নাম শুনে নিচ্ছিলাম। এভাবে প্রায় সাড়ে তেরো কিলোমিটার রাস্তা পাড়ি দিয়ে জিপ যখন অলি পৌঁছলো, আমার কাছে পুরোটা স্বর্গ মনে হচ্ছিলো। আসলেই একটা জায়গা এতটা সুন্দর কিভাবে হতে পারে! শুভ্র পর্বতগুলো যেন হাতের কাছে, মেঘেরা যেন কালো পর্বতগুলোর চূড়াকে দুধ দিয়ে ভিজিয়ে রেখেছে। বেশিক্ষণ এ সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারলাম না। এখান থেকেই ট্রেকের পালা শুরু।



স্কি রিসোর্টের পেছন থেকে চড়াই শুরু হল। তুষার ভাইয়ের দ্রুতই দম ফুরিয়ে যাচ্ছিল আর ক্যামেরায় ছবি তুলতে গিয়ে ভাই পিছিয়ে পড়ছিলেন। একটু ফাঁকা জায়গা পেরুতেই আবার ওক বনের মধ্যে ঢুকে পড়লাম। কয়েকশ বছর ধরে গড়ে ওঠা জঙ্গল। একটু পার হতেই আবার একটা ছোট রিসোর্ট পেলাম। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার ট্রেক শুরু হল। এবার আরো ঘন জঙ্গলে প্রবেশ করলাম আমরা। আর পথও আগের চেয়ে অনেকটা খাড়া হয়ে গেল।


আমি পেছন পড়ায় অপেক্ষারত হায়াত সিং


একটু ভেতরে এক পাহাড়ি মন্দির পেয়ে গেলাম। মোবাইলে ছেড়ে দিলাম তিব্বতী ধর্মীয় সংগীত সুর ‘ওম মানি পদ্মে হম’। বন, পর্বত, মেঘের সাথে প্রার্থনা সঙ্গীত মিশে পুরো মায়ার জগতে ডুবিয়ে দিচ্ছিলো আমাদের। আরো ঘণ্টা খানেক ট্রেকের পর বন শেষ হয়ে গেলো।  এবার খোলা সবুজ পাহাড় বেয়ে উঠছি, আর সাদা পর্বতগুলোকে আরো বেশি কাছে মনে হচ্ছে। মাঝে মাঝে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে; আর সাথে ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে জোরেসোরে। ঠাণ্ডায় জমে যাওয়ার মতো অবস্থা। একটু উঠে পাথর পেয়ে আড়ালে বসে নিচ থেকে নিয়ে আসা প্যাকেট লাঞ্চ সেরে ফেললাম। এদিন ছিল সব থেকে লম্বা ট্রেক। তুষার ভাইকেও দেখলাম ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছেন। বৃষ্টিও এদিকে সমস্যা করছিলো। ঠাণ্ডায় জমে গেলে বা অসুস্থ হয়ে পড়লে এক্সপিডিশন বাতিল করে নেমে আসতে হবে।



আমার প্রচণ্ড ঠাণ্ডা লাগা শুরু হলো। ফ্লিসের জ্যাকেট ভেদ করে থার্মালের ওপর থেকে ঠাণ্ডা বাতাস জাকিয়ে বসছে। উঠতে উঠতে কিছুক্ষণ পরপরই বড় পাথরের বোল্ডার পড়ছিলো। সেগুলোর পিছে দাড়িয়ে গ্লাভস থেকে বের করে হাত দুটো ঘষে নিচ্ছিলাম। দুপুর গড়িয়ে গেলে আমরা রিজের ওপরে চলে এলাম। এইবার হিমালয় পুরোপুরি আমাদের সামনে নিজেকে যেন মেলে দিলো। শ্বেতশুভ্র বিশালাকার পর্বতগুলো তাদের দুগ্ধমাখা দেহখানা নিয়ে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে। এই সেই পর্বত! ঘরছাড়া মানুষকে হাতছানি দিয়ে ডাকে সবসময়। দৃঢ় প্রত্যয়ী সেই মানুষগুলোও জীবন বাজি রেখে নেমে পড়ে সেই পথে।



কিছুক্ষণ পরেই প্রথম দেখা পেলাম লক্ষ্যের। পাংগারচুলা পর্বতের বিশালাকার দেহখানা। চঞ্চল মেঘে ঢাকা মাথাখানি নিয়ে স্বাগত জানালো আমাদের। পা আর চলছিলো না, ইতিমধ্যে টানা প্রায় সাত ঘণ্টা ট্রেকিং করে উপরে উঠেছি। হায়াত সিং জানালো আধঘণ্টা পর ক্যাম্পসাইট। বিপজ্জনক রাস্তা ধরে পৌঁছে গেলাম তালি ক্যাম্প সাইট। অতি উচ্চতার তালি হ্রদের পাশেই এ ক্যাম্পসাইট। প্রায় ৩৫০০ মিটার উচ্চতার এই হ্রদটি বছরের অধিকাংশ সময় বরফাবৃত থাকে। গ্রীষ্মে উপত্যকায় রাখালেরা মেষপাল চড়াতে এখানে নিয়ে আসে। পাথরের গা ঘেষে সুবিধামত জায়গায় টেন্ট পিচ করে, হায়াত সিং নেমে গেলেন নিচ থেকে পানি আনতে- সেই ফাঁকে চারপাশটা ঢুঁ মেরে নিলাম। আমাদের ক্যাম্প থেকে সোজা তাকালে নন্দা দেবী পর্বতের অপূর্ব রূপ, একটু ডানে পাংগারচুলা। নিচে উপত্যকা চিড়ে প্রবাহিত হচ্ছে অলকানন্দা। হায়াত সিং পানি নিয়ে এলে খিচুড়ি রান্না শুরু করলাম। পানিতে ক্লান্ত হাত মুখ ধোয়ার চেষ্টা করতে গেলাম, হলো না। অনেকই বেশি ঠাণ্ডা। দ্রুত খাওয়া শেষ করে সন্ধ্যার আগেই তাঁবুতে শুয়ে পড়লাম। হিমালয়ের কোলে আমার প্রথম রাত্রি যাপন। ভেবেছিলাম উত্তেজনায় ঘুমই আসবে না, কিন্তু ক্লান্তিতেই ঘুমিয়ে পড়লাম।




তালি থেকে খুলারা যাবার রাস্তায় এভাবেই উঁকি দিত নন্দা দেবীর চূড়া


১ জুন, ২০১৬

খুব ভোরেই ঘুম ভেঙে গিয়েছে। এমনিতেই সারারাত ঘুম ভালো হয়নি। স্লিপিং ব্যাগের মধ্যেই ঠাণ্ডায় এদিক ওদিক করেছি কখন রোদ পাবো। বের হতেই আরো ঠাণ্ডা জেঁকে বসলো। হায়াত সিং আগুণ ধরালেন। কিছুক্ষণ আগুন পোহানো শেষে চলে এলাম পাথরের তৈরি প্রকৃতির ব্যালকনিতে- হাতে এক কাপ গরম কফি। চুমুক দিতে দিতে সোজা তাকালাম। পরিষ্কার আকাশ, সূর্য তখনো ভালোভাবে উঠেনি। পর্বতের কিনারে উঁকি মারছে কেবল। এই ঠাণ্ডাটা না থাকলে হয়তো সারাজীবনের জন্য এখানেই থেকে যাবার কথা চিন্তা করতাম। দূরে গারওয়াল রেঞ্জের বরফে প্রতিফলিত হতে থাকা আলোতে চোখ ঝলসে যাচ্ছিল বার বার। আমার কাছে ট্রেকিং ঘোরাঘুরি সবকিছু থেকেই এই একটা জিনিস শিখেছি, প্রকৃতির সান্নিধ্য উপভোগ করা।

কিছুক্ষণ পর তাঁবু গুছিয়ে নিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। আমরা তখনো মূল পর্বতে উঠিনি, একটা কিনার ধরে যাচ্ছি। আজকের গন্তব্য খুলারা বেইজ ক্যাম্প- সেটাই মূল পর্বতের অংশ। সেখান থেকেই মূল পর্বতে ওঠা শুরু হবে। আজকে অর্ধেক পথ নামা, তারপর ওঠা, বলতে গেলে সারাদিনে আমরা সর্বোপরি ১০০ মিটারের মতো নিচে নেমে যাবো। আবারো ওক বন শুরু হল। বেশ ঘন জঙ্গল আর অনেক পুরানো। কয়েকটা গাছের গুড়িতো চার পাঁচজন মানুষের সমান হবে। মাঝে মাঝে জঙ্গলের ক্যানোপি থেকে বিশালাকার নন্দা দেবী তার শ্বেতশুভ্র চূড়ার দর্শন দিচ্ছিলো। মাঝে মাঝে বসে বিশ্রামও নিচ্ছিলাম। হায়াত সিংয়ের সাথে আড্ডা দিয়ে সময় পার করছিলাম। হায়াত সিংয়ের গ্রাম নিচেই। তিন ছেলেমেয়ে আর স্ত্রী নিয়ে সংসার। ছোটোবেলায় জোরপূর্বক দেখা হিন্দী অনুষ্ঠান থেকে শেখা হিন্দী ভালোই কাজে দিচ্ছিলো। বিগত দু’দিনে মোটামুটি ভালো দখল চলে এসেছিল হিন্দী ভাষার ওপর!

হায়াত সিংয়ের দরিদ্র সংসার। সিজনে গাইডের কাজ করেন, বাকি সময়টা কৃষিকাজ। অন্যের জমিতে কাজ করেই কেটে যায় তার বছর। এ বছর তিনি আরো তিনবার অভিযানে এসেছেন। কেউই সামিটে পৌঁছাতে পারে নি। মিনি পাংগারচুলা সামিট করে ফিরেছেন সবাই খারাপ আবহাওয়ার মধ্যে। বিগত দুদিনের পর্যবেক্ষণও ভালো কোন আভাস দিলো না। ভালোমন্দ চিন্তা করতে করতে ঘণ্টা দুয়েক ট্রেক শেষে দেখা মিললো খুলারা বেইজ ক্যাম্পের। একটু উপরে পাথরের ভাঁজে বসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে নিতে উপত্যকায় পিপড়ার মতো মানুষগুলোকে ক্যাম্প গুটিয়ে চলে যেতে দেখলাম। হায়াত সিংয়ের কাছে শুনলাম, বিদেশীদের ক্যাম্প, কুয়ারি পাস ট্রেক শেষে এখন ফিরে যাচ্ছে।

দুপুর গড়াতে ক্যাম্পসাইটে নেমে এলাম। তাঁবু পিচ করে হায়াত সিং রান্না করতে লাগলো আর আমি বেরিয়ে পড়লাম আশপাশটা দেখে নিতে। নন্দাদেবী, দ্রোনাগিরির মতো বিশালাকার পর্বতগুলোর সন্ধ্যায় সোনালী রূপ দেখে বিমোহিত হয়ে পড়েছিলাম। আবহাওয়ার আভাসও তেমন ভালো না। বাইরের ঠাণ্ডায় আসলে রাতে আর বেরোতে ইচ্ছা করতোনা। পূর্ণিমার আলো দেখে তবুও বেরিয়েছিলাম। ঠাণ্ডা সে সময়টা বেশিক্ষণ স্থায়ী হতে দিলোনা। তাঁবুতে ঢুকে স্লিপিং ব্যাগের ওমের কাছে নিজেদের সমার্পন করলাম।

পরদিন ভোরেই ঘুম ভাঙলো। উঠে দেখি হায়াত সিং স্টোভ ধরিয়ে দিয়েছেন। চোখ ডলতে ডলতে বেরিয়ে এসে আগুণে হাত আর পায়ের আঙুলগুলো সতেজ করে নিলাম। রাতে তীব্র বাতাসে তাঁবুর কাঁপাকাঁপিতে ঘুম হয়নি ঠিকমতো। ফ্রেশ হয়ে তুষার ভাইকে ডেকে নাস্তা শেষে ক্যাম্প গুটিয়ে আবারও রওনা দিলাম। আজকের লক্ষ্য আমাদের অ্যাডভান্স বেইজক্যাম্প, গেলগড়।

অনেকে খুলারা থেকেও সামিট পুশ নেন তবে গেলগড় সাইটে অ্যাডভান্স বেইজক্যাম্প স্থাপন করলে সামিটের সম্ভাবনা বাড়বে এমনটাই বলে দিয়েছিলেন আরিফ ভাই দেশ থেকে। খারাপ আবহাওয়া কারণে উনিও সামিট করতে পারেননি। তার অভিজ্ঞতা থেকেই আমাদের এই পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিছুক্ষণ উঠতেই বুঝতে পারলাম আজকে প্রচণ্ড খাড়া পথ বেয়ে উঠতে হবে|। বনের পাথুড়ে ঢাল ধরে কখনো ঘুণে খাওয়া ঝুলে পড়া পাইন গাছ পেরিয়ে কিংবা কখনো বিশালাকার সব পাথরের খাঁজ পেরিয়ে এগিয়ে চলছি। কিছুক্ষণ পরে ট্রেকের বনাঞ্চল শেষ হয়ে এলো। এই উচ্চতা পর্যন্তই হিমালয়ের গাছপালাগুলো জন্মে। তারপরে প্রতিকূল আবহাওয়ায় বড় কোন উদ্ভিদ নেই বললেই চলে। উপরের দিকে শুধু ভেষজ গুল্ম জন্মে। ‘কিরিজরি’ নামের এই গুল্মগুলোর শেকড় খুঁজতে যান স্থানীয়রা। চীন থেকে এজেন্সিরা কিনে নিয়ে যান এই শিকড়গুলো। মাত্র কয়েক গ্রামের একেকটা শিকড় প্রায় ২০০ রুপি করে বিকোয়। অবশ্য এর উপকারিতা বা কাজ সম্পর্কে তারা কিছুই জানেন না। ভেবেও অবাক লাগলো যে প্রাচীনকালের চীনা বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা বিভিন্ন ভেষজ ঔষধের খোঁজে পুরো হিমালয় চষে বেড়িয়েছেন।


খুলারা ক্যাম্প থেকে দেখা সূর্যাস্তের আলোয় উদ্ভাসিত হাতি-ঘোড়া পর্বত  


এখনো উপর থেকে বরফগলা ঝিরির পাশ ধরে উঠে চলেছি। পা আর চলছিলো না আসলে। অনেক বেশি কষ্ট হচ্ছিলো। হয়তো অক্সিজেন স্বল্পতার ইঙ্গিত দিচ্ছিলো। তুষার ভাইও ছবি তুলতে তুলতে অনেক পেছনে পড়ে গিয়েছিলেন। হঠাৎ খেয়াল করলাম, মাস্তিফ (Bangara Mastiff) প্রজাতির একটা কুকুর পিছু নিয়েছে। ডাক দিলেই কাছে চলে আসলো। লোমশ কালো আর সুঠাম দেহ নিয়েই এরা আসলে পাহাড়ে ঘুরে বেড়ায়। আদিবাসীদের ক্যাম্পের আশেপাশে থাকে। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আরো উঠতেই একটি মন্দির দেখতে পেলাম। সেখানে থেকেই আবার বরফ আচ্ছাদিত চূড়া বের করে রাখা পাঙ্গারচুলাকে প্রথমবারের মত অনেক কাছ থেকে দেখতে পেলাম। কত কাছে মনে হলো! একটু এগোতেই গেলগড় ক্যাম্প পেয়ে গেলাম। কুকুরটাও দেখলাম সাথেই আছে। টেন্ট পিচ করলাম, শুকনো খাবার খেয়ে নিলাম কিছু।  মধ্যদুপুরে গণগণে রোদ পেয়ে পাথরের ওপর সটান মেরে শুয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। কুকুরটাও ঠিক পাশে রোদ পোহাচ্ছে। এই প্রথম ১২০০০ ফিট উপরে ট্রেক করে উঠে এসেছি।



কিছুক্ষণ পর এক্লাম্যাটাইজ করার জন্য কুয়ারি পাসের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। কিছুক্ষণ নেমে আবার ওঠা। কুয়ারি পাস বিখ্যাত ট্রেকিং স্পট। আশেপাশে প্রায় ২৭০° হিমালয়ান ভিউ পাওয়া যায়। আধঘণ্টার মতো ওঠা শেষে চিমনি মত জায়গা বেয়ে ঠিক উপরে উঠলাম। সুন্দরের মাঝে হারিয়ে গেলাম আমরা। ছোটবেলা থেকে বিভিন্ন টিভি চ্যানেল, বইতে দেখে আসা সব ছবিই তখন আমার সামনে। জলজ্যান্ত! কুকুরটা সেই সকাল থেকে সাথে। জ্যাকেটের জিপার পকেট থেকে স্নিকার্স ভেঙে কিছুটা দিলাম। ভাবলাম একে দেশে  নিয়ে যেতে পারলে মন্দ হতো না।

কিন্তু ফিরতেই হবে আবার ক্যাম্পে। পথেই একদল মিউলের পিছে তাদের মালিককেও পেয়ে গেলাম। কথা বলতে বলতে জানলাম তারা সুদূর তিব্বত থেকে মিউলগুলো নিয়ে এসেছেন। সিজনে এসব মিউল পর্বতারোহীদের জন্য দরকার পড়ে, এটাই তাদের ব্যবসা। তাদের আবার একজনের হাতে সেই মূল্যবান ‘কিরিজরি’রও দেখা পেয়ে গেলাম। একদম সাধারণ গাছের শিকড়, হয়তো এর ভেতরেই কোন অজানা রোগের প্রতিকার লুকিয়ে আছে। তারা চলে গেলো। তুষার ভাই ক্লান্ত হয়ে পড়ায় তাঁবুতে ঘুমিয়ে পড়লো, হায়াত সিং লেগে পড়লো রান্না করতে। আর আমি আবারও সটান শুয়ে পড়ে দেশের কথা চিন্তা করতে লাগলাম বহুদিন পর। সেই প্রিয়জন, বন্ধুদের ছেড়ে এসেছি আজ প্রায় দশদিন। আসলে দেশে থাকলে প্রিয়জনদের ভালোবাসাটা যতটা না অনুভর করা হয়, তার থেকেও বেশি অনুভব করা যায় বাইরে গেলে। কালকে আমাদের মূল সামিট পুশ। বিগত  তিন মাসের পরিক্লপনা, পরিশ্রম, অর্থ, সময়, সাপোর্টের ফলাফল কাল। হয়তো সামিট হবে- নয়তো ফিরে আসতে হবে। আবহাওয়া আজকে মোটামুটি ভালো। সবকিছু ঠিক থাকলে ভোররাতে ৪টার মধ্যেই সামিট পুশ শুরু করবো। তবে তার জন্য আরো আগে উঠতে হবে। হায়াত সিংয়ের সাথে কথা বললে সে কিছুটা ইতস্তত করলো। এ পর্যন্ত এটাই কথা ছিলো কিন্তু সে এবার মত দিলো আরো একটু পরে শুরু করার। হয়তো এই ক’দিনের টানা ট্রেক করে সে একটু বিশ্রাম চায়। কথা বাড়ালাম না। সন্ধ্যার আগেই খেয়ে দেয়ে তাঁবুতে ঢুকে পড়লো সবাই। আমি আজকের সন্ধ্যাটা ধরার জন্য বাইরে থাকলাম। পাহাড়ে সন্ধ্যা তাড়াতাড়িই হয়ে যায়, একদম হঠাৎ করে। শ্বেত পর্বতের সোনালী কিরণ উপভোগ করতে করতে সন্ধ্যা পড়ে যাওয়ার একটা টাইইমল্যাপ্স নিয়ে কতক্ষণ পরে ঠাণ্ডার প্রকোপে তাঁবুতে ঢুকে পড়লাম। ভোর ৩টার এলার্ম দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। সবথেকে চিন্তার ঘুম। ফাইনাল ম্যাচের আগের রাত বলে কথা!




কার্নিশ বেয়ে উঠার সময় এমন দৃশ্য চোখে পড়লেই ভয় করত
 


সামিট পুশ, ২০১৬

ভোর ৩টার এলার্মে ঘুম ভেঙে গেল। বাকিরা ঘুমাচ্ছে নাক ডেকে। মোজা থেকে হাত খুলে দেখি জমে যাচ্ছে। এই মাইনাস টেম্পারেচরে কিভাবে বেরিয়ে পড়বো সেটাই চিন্তা করতে লাগলাম। আরেকটা সমস্যা হলো বাইরের বরফঠাণ্ডা শিশির। স্লিপিং ব্যাগ থেকে বের হতে ইচ্ছা করল না। এদিকে চারটা বাজতে ডাকলাম দুজনকে। তুষার ভাই নড়েচড়ে বসলেও হায়াত সিং তখনো গভীর ঘুমে! নড়ে উঠে বললেন আরেকটু পরে। নিজের উচ্ছ্বাস আর বাইরের ঠাণ্ডার যুদ্ধে ঠাণ্ডাকে জয়ী করিয়ে চুপ মেরে রইলাম। অনেকক্ষণ ধরে তাঁবুর গায়ে কিছু একটা ঘষাঘষি করছিলো। হালকা ভয়ও পেতে লাগলাম। এদিকে ভোরও প্রায় হয়ে এসেছে। এইবার জোর করতেই সবাই উঠে গেল । ভয়ানক ঠাণ্ডা হাওয়ার মধ্যে স্যুপ খেয়ে নিয়ে হঠাৎই আবিষ্কার করলাম রাতের সেই অদ্ভুত আওয়াজের কারণ। গতদিনের সেই কুকুরটা। সে আমাদের ছেড়ে যায়নি। রাতের প্রকট ঠাণ্ডা বাতাস সামলাতে না পেরে তাঁবুর পেছনে আশ্রয় নিচ্ছিলো। কুকুরটার প্রতি ভালোবাসা অনেক বেড়ে গেলো।

ভোরের আলো তখনো ফুটে নি, তাপমাত্রাও প্রায় শূণ্যের কাছাকাছি। এর মধ্যেই আমরা সামিটের উদ্দেশে বেড়িয়ে পড়লাম। কিছুক্ষণ উঠতে শুরু করতে গা গরম হয়ে আরাম লাগছিল কিন্তু অদ্ভুত কারণে হাত ঠাণ্ডায় জমে যাচ্ছিল। আর বিশ্রাম নিতে বসলে উইন্ডব্রেকারের ফাঁকা দিয়ে বাতাস ঢুকে যন্ত্রণা দিচ্ছিল। ঘণ্টাখানেক উঠে আসতেই এক পাথুড়ে খাঁজ পেরিয়ে পাংগারচুলার দর্শন পেলাম। ভোরের আলোও ফুটতে শুরু করেছে। পেছনে ফিরলেই নিচ থেকে উঠে আসা পর্বতশ্রেণি, কালো তার দেহখানা কিন্তু মুখখানা সাদা। কালো কুকুরটা এখনো আমাদের পিছু পিছু উঠে আসছে।





পানির বোতল বের করে দেখলাম প্রায় শেষ ইতিমধ্যেই। হায়াত সিং আশ্বাস দিলো সামনেই বরফগলা ঝিরিতে পানি পাবো। সেই আশ্বাসে আবার উঠতে লাগলাম। আবারো আধঘণ্টা ট্রেক করে চোখের সামনে বরফ পেয়ে গেলাম। ঝিরিও সামনে। পাথরের খাঁজে জমে থাকা বরফ গলে ঝিরির উৎপত্তি। ঝিরির পাশ ঘেষে ছোট ছোট গুল্ম/ঘাস জাতীয় উদ্ভিদের আবাস। শীতকালে এগুলো সব বরফের নিচে থাকে। ছোট্ট শিশুর কাছে যেমন নতুন জিনিস কৌতুহলের প্রায় একই রকম কৌতুহল নিয়ে এগিয়ে গেলাম বরফ বরাবর। প্রকৃতির তৈরি প্রথম বরফ হাতে নিয়ে অনুভব করলাম বৈচিত্র্যময় সৃষ্টিকর্তাকে। খুড়িয়ে খুড়িয়ে একটু ভেঙে দৃঢ়তা পরীক্ষা করে নিলাম। এগুলো খুবই ভঙ্গুর, আর চলার জন্য বেশ বিপজ্জনক। ফিরে এলাম কিছুক্ষণের মধ্যেই। থার্মো ফ্লাক্সে পানি ভরে আবার ট্রেক শুরু করলাম। বরফ শুরু হতেই অপ্রত্যাশিতভাবে আমাদের সামনে পাথরের বিশালাকার বোল্ডার হাজির হল। প্রায় তিন/চার কিলোর মতো লম্বা, পাংগারচুলাকে ঘিরে রেখেছে প্রায় দুই তিনজন মানুষসম এই ভয়ঙ্কর বোল্ডারগুলো। আমাদের কাছে এগুলো সম্পর্কে পূর্ব থেকে কোনো তথ্যই ছিলো না।

এমন বোল্ডার পাড়ি দিতে খুব বেশি মনোযোগ আর ফ্লেক্সিবিলিটির প্রয়োজন। সমস্ত মনোযোগ একদিকে কেন্দ্রীভূত করে দ্রুতই অনেক আগে চলে এলাম। যতই উপরে উঠতে লাগলাম, বরফও বাড়তে লাগলো। হিমালয়ের সৌন্দর্যও বাড়তে লাগলো- রিজও দেখতে পেলাম। বরফ এড়িয়ে পাশ কাটিয়ে কিনারার মতো অংশে উঠে এলাম। তুষার ভাই আর হায়াত সিংয়ের জন্য এই জায়গায় অপেক্ষা করতে লাগলাম। এমন অবস্থার মধ্যেও হায়াত সিং এক মজার কারণ বের করলো। তুষার ভাইয়ের প্রেমিকা আছে বলে ভাই এত সতর্ক আর ধীর! এমন স্বর্গীয় প্রতিকুল প্রতিবেশে খানিকক্ষণের মত হাসির খোরাক জুটে গেল। আশ্চর্যের বিষয়- কুকরটা তখনো সাথে! অবাক হওয়ার সীমা শেষ হয়ে যাচ্ছিলো। একটু পর তুষার ভাইও পৌঁছে গেল। এখন সামিট রিজ দেখা যাচ্ছে। অনেক কাছে আর সহজ মনে হচ্ছিলো ট্রেইল।



উপরে ওঠা শুরু করতেই বড় একটা ভুল ভাঙলো। আমরা যাকে রিজ বলে ভাবছিলাম, প্রকৃতপক্ষে সেটা রিজ লাইন না, রিজলাইন আরো উপরে। কিন্তু রাস্তা অনেক ভয়ানক। পাশে প্রচণ্ড খাড়া, প্রায় ছয়-সাত হাজার ফিটের মতো গভীর খাঁদ, পাথরের বোল্ডার আবার বাড়তে লাগলো। ব্যাপারটা কিছু কিছু জায়গায় ক্লাইম্বিংয়ের মতো করে পার হতে হচ্ছিলো। একেকটা বোল্ডার পার হচ্ছি আর মনে হচ্ছিলো যেন পুলসিরাত পার হচ্ছি! আর আবহাওয়া প্রচণ্ড খারাপ হতে শুরু করেছে। মেঘের মধ্যে ডুবে যাচ্ছি ক্ষণে ক্ষণে, সেই সাথে ঠাণ্ডা বাতাস আর হোয়াইট আউট! ভাইরা পেছনে পড়তেই পাথরের খাঁজ ধরে দাড়িয়ে পড়লাম। বাসার কথা মনে পড়লো। পরক্ষণেই সাথের দুজন মানুষের কথা। একটু হাত পিছলালেই কিংবা বরফ ভেঙে পড়লে বা পাথরের ধ্বস পড়লে! বাকি চিন্তা করতে ইচ্ছা করছিলো না।

বোল্ডারের গোলকধাধার মধ্যে দিয়ে এগোনোর সময় খালি মনে হচ্ছিলো এরপরই সামিট, কিন্তু সামিট পাচ্ছিলাম না। হঠাৎ খেয়াল করলাম আমরা এখন আসলে ব্রিজের মতো সরু খাঁজ পার করছি। একটা পাথরও ঝুলে পড়লে সোজা গিয়ে চ্যাপ্টা হতে হবে আট ন’হাজার ফুট খাঁদে। সাহস যোগানোর জন্য নিচে তাকাচ্ছিলাম না। বাকি দুজনের কথা চিন্তা করেই হয়তো প্রত্যেকটা বাঁধা নিজে আগে পার হচ্ছিলাম। তারপর অপেক্ষা করছিলাম বাকি দুজনের। একেকটা বাধা পেরোতেই সাহস বাড়ছিল আর অন্য দুজনের মনোবল। এভাবে যুদ্ধ চললো বেশ খানিকক্ষণ! রিজলাইনে পৌঁছে গেলাম। চূড়া ঠিক কয়েক মিটার উপরেই। কিন্তু এক বিপদ দেখা দিলো। আমরা কোন ক্রাম্পন সাথে আনিনি কিন্তু রিজলাইন পুরোটাই সরু বরফে ঢেকে আছে! খালি পায়ে অ্যাটেম্পট নেওয়া যায় তবে বরফ একটু পিছলালেই কিংবা ভার নিতে না পেরে সরে গেলেই দ্বিতীয় কোন সুযোগ দিবে না। এইবার তিনজনেই থমকে গেলাম। খেয়াল করলাম , কুকুরটাও হাল ছেড়ে দিয়েছে, ডেকেও পেলাম না।

বোল্ডার ভরা রাস্তা, রিজলাইনের এমন অবস্থার কোন খবরই আমাদের কাছে আগে থেকে ছিলো না। আর এখন তো বরফ গলতে শুরু করেছে। সুতরাং, ভঙ্গুর থাকাই স্বাভাবিক। অভিযানে আসার শুরু থেকেই আমাদের একটাই কথা ছিলো- মৃত্যুঝুঁকি আমরা নেবো না। শেষ পর্যন্ত যতদূর যাওয়া সম্ভব যাবো। তুষার ভাই ফেরার পক্ষে মত দিলেন। হায়াত সিং নিচে কার্ণিশের মতো উচু মিনি পাংগারচুলা (পাংগারচুলা সামিটের কয়েকশ ফিট নিচু, প্রমিনেন্স কমের কারণে সেটা স্বতন্ত্র পিক নয়) দেখিয়ে বললেন ঐখানেই সামিট করে ফিরে যাই। ভেতর থেকে কান্না চলে আসছিল। এই সামান্য অংশ টুকুর জন্য ফিরে যেতে হবে এইটুকু ভেবে। সামিটও চোখের সামনে। মন মানতেই চাইছিলো না, বরফের উপর একটু এগিয়ে চেক করে দেখলাম। সমস্যা হচ্ছিলো না। কিন্তু হায়াত সিং মানতে নারাজ। সে যাবে না! বলল, আপনাদের সাহস থাকলে যান, আমি এখানে দাঁড়িয়ে থাকব।

জীবনের প্রশ্নে হয়তো এভাবেই প্রফেশনালিজম দেখাতে হয়। দমে গেলাম। কিছুক্ষণ সময় চাইলাম। মাথার মধ্যে অ্যাড্রেনালিনের ঝড় বয়ে যাচ্ছে। সবার কাছেই খাবার পানির মজুদ প্রায় শেষ। এখনো ফেরার রাস্তা পুরোটাই বাকি। এদিকে বার বার হোয়াইট আউট হচ্ছে। উইন্ডব্রেকারটাও এমন বরফ ঠাণ্ডায় সিক্ত হয়ে যাচ্ছে। এগুলো চিন্তায় নিলাম না। দেশে সবাইকে একটা সুসংবাদ, একটা অর্জন এনে দেওয়ার তীব্র আকাঙ্খা ভেঙে যাওয়ার কষ্টটা অনুভব করছিলাম খালি।

হঠাৎই হায়াত সিং রিজ লাইন বাদ দিয়ে পাশ থেকেই একটা পথ পরিকল্পনা করে ফেলল। দুজনে এগিয়ে গেলাম। একটার পর একটা বরফে ডুবে থাকা বোল্ডার, কিন্তু একটা জায়গায় কয়েক ফিট লম্বা বরফের জাংশন, ঐ অংশটুকু পাড়ি দিতে পারলেই হয়তো সামিট হয়ে যাবে। তবে এ পথ সামিটে পৌঁছাবে কি না তার নিশ্চয়তা নেই। অজানা কারণেই সেই অনিশ্চয়তার পথ বেছে নিলাম।

এবার দুজন সামনে, আমি পেছনে। একদম আস্তে শুরু করলাম। দুজনের কেউ স্লিপ করলে টেনে তুলবো- যদিও জানতাম সামান্যতম ভুলের জন্যও বিশাল খেসারত দিতে হবে। চওড়া বরফের জংশনটাতে খুব ঝুরঝুরে বরফ, একজন আরেকজনের হাত ধরে তাল সামলে পার করে গেলেন কিন্তু দুজন যেতেই বরফের পায়ের গর্তটা গভীর হয়ে গেলো। আমি নামতেই কোমর পর্যন্ত বরফে ডুবে গেলো প্রায়- কিন্তু ততক্ষণে ঐপারের পাথরটা ধরে ফেলেছি। পাথরের ওপর বসেই দেখলাম জুতার নিচের অংশ খুলে গিয়ে বরফ ঢুকে পড়েছে। উত্তেজনায় কিছু টের পেলাম না। প্রত্যেকটা মুহূর্ত সৃষ্টিকর্তার নাম নিয়েছি যেন সামনের দুজনের কিছু না হয়। হঠাৎই দেখলাম হায়াত সিং সোজা উঠে যাচ্ছে খাড়া স্লোপ ধরে। হ্যাঁ, পাথরের ট্রেইল ধরে সোজা উপরে যাওয়া যাবে। উত্তেজনায় একবার জোরে চিৎকার দিয়ে উঠলাম। পরক্ষণেই আবার হোয়াইট আউট।

 এবার পথ আগের তুলনায় সহজ কিছুটা। দ্রুত উঠে গেলাম। উপরে উঠে সামিটের ত্রিশুল দেখতে পেয়েই তুষার ভাইকে জড়িয়ে কেঁদে ফেললাম। ভয়, শক্তি, উত্তেজনা, সাফল্যের সে কান্না! চিৎকার করারও আর শক্তি ছিলো না।



সরু সামিটের পাশ ঘেঁষে বসে পড়লাম। কেন জানি এত বরফের মধ্যেও ঠাণ্ডা অনুভব হচ্ছে না। হাত পা কাঁপছিলো। একটু পরিষ্কার বরফ দেখে বোতলে ঢুকিয়ে নিলাম। আবহাওয়া পুরোদমে খারাপ। হোয়াইট আউটে কয়েক হাত দূরের কিছুও দেখা যাচ্ছিল না। হায়াত সিং এবার উঠে একটু সামনে এগিয়ে গেলেন অন্যপাশ থেকে নামার রাস্তা আছে কি না দেখার জন্য। তবুও তাকে সাবধান থাকতে বললাম। এবার ব্যাগ থেকে পতাকা বের করে ছবি তুললাম। হ্যাঁ- এটাই আমাদের অর্জন। সামিট মানেই কি শুধু একটা নির্দিষ্ট জায়গার ছবি তুললাম আর শেষ? আমার কাছে প্রকৃতির প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে প্রত্যেকটা মুহূর্ত যুদ্ধ করে লক্ষ্যে পৌঁছানো- এটাই সামিট। শক্তি ও সহনশীলতার চরম পরীক্ষা দিয়ে জীবনের কঠিন লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারাই সামিট। আমি পারবো- এটা বিশ্বাস করা এবং আমি পেরেছি- অবশেষে এটা বলতে পারাই হলো সামিট।

হায়াত সিংয়ের দেরী হওয়াতে চিন্তা বাড়তে লাগলে কিনারে গিয়ে ডাকাডাকি শুরু করার কিছুক্ষণ পর সে ফিরে আসলো। আমাদের আর কোনো উপায় নেই। এই পথেই নামতে হবে। আর কিছুক্ষণ হোয়াইট আউট সরে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করলাম। কোন লাভ হলো না। অগত্যা ফেরা শুরু করতে হলো। নামার সময় কিছুক্ষণের জন্য হোয়াইট আউট সরে যাওয়াতে কয়েকটা ছবি তুলে নিলাম কুয়েট ব্যাজের সাথে, কুয়েটিয়ানদের জন্য গিফট। দুজনে রওনা দিয়ে দেওয়ায় পেছনে পড়লাম। তুষার ভাইয়ের ডাকাডাকিতে নামা শুরু করলাম।

হোয়াইট আউটের কারণে নামার কিছুক্ষণের মধ্যেই টের পেলাম রাস্তা হারিয়ে ফেলেছি আমরা এবং সেটা দারুণভাবেই। বিকাল গড়িয়ে আসছে প্রায়, পথ অনেক বাকি। জুতার নিচ অংশ থেকে ঠান্ডা ঢুকছিলো আমার, ব্যথাও করছিলো। বুঝলাম ফোস্কা পড়েছে। তবে এখন প্রধান চিন্তা ক্যাম্পে পৌঁছানো। রাত পড়ে যাওয়া মানে ঠাণ্ডা বেড়ে যাওয়া। আর টানা ঠাণ্ডায় যে কারোই হাইপোথার্মিয়া হয়ে যেতে পারে। তাছাড়া এই বিপজ্জনক বোল্ডারের ট্রেইলে রাতে ট্রেক করাও এক প্রকার অসম্ভব।

মনে দৃঢ় মনোবল নিয়ে যত দ্রুত সম্ভব নামতে থাকলাম। এক পর্যায়ে এক কার্ণিশে এসে ট্রেইলও শেষ হয়ে গেল। আর রাস্তা নেই। নিচে সোজা ১০০° কোণে বাঁকানো প্রায় চার/পাঁচ হাজার ফিট গভীর খাঁদ। হায়াত সিং কার্নিশের এক পাশ থেকে বোল্ডারের খাঁজ ঘেষে রাস্তা করে নামতে লাগলেন। আমরাও অনুসরণ করতে লাগলাম। ভেতরটা ভয়ে কুঁড়ে খাচ্ছিলো। প্রায় সন্ধ্যা হওয়ার কিছু আগে সেই বিস্তীর্ণ বোল্ডার যেখানে প্রথম বরফের দেখা পেয়েছিলাম দেখেই চিৎকার করার চেষ্টা করলাম। হ্যাঁ- খুঁজে পেয়েছি, বুঝলাম আমরা যে পাশ থেকে উঠেছি ঠিক তার অন্য পাশ থেকে পুরো ঘুরে নিচে নেমেছি। পানি শেষ হওয়ায় উপায় না পেয়ে বরফ ভেঙে খেয়ে নিলাম। তারপর সেই আগের মতো বোল্ডার পাড়ি দেওয়া শুরু করলাম – এইবার দ্বিগুণ উৎসাহে। হায়াত সিং অনেক আগেই চলে গেছে।

অনেকটা ব্যাঙের মতো লাফাতে লাফাতে বোল্ডারগুলো পার হতে লাগলাম। হৃৎপিন্ড আর পেশিগুলোকে কম মাত্রার অক্সিজেনের মধ্যেও চূড়ান্ত মাত্রায় শাস্তি দিতে দিতে শেষ মেশ বোল্ডার জোন পার হয়ে এলাম। আর পারলাম না। শুকনা পাথুরে জমি পেয়ে আকাশের দিকে মুখ করে শুয়ে পড়লাম। জীবনের কঠিনতম চ্যালেঞ্জের সমাপ্তি। আমি পেরেছি। হঠাৎ কুকুরটার কথা মনে পড়ল। সে কি পেরেছে ঠিকঠাক ফিরে আসতে?

(Visited 1 times, 1 visits today)

One thought on “ট্রেক প্রতিবেদন: স্মৃতিতে পাংগারচুলা

মন্তব্য করুন

*Please Be Cool About Captcha. It's Fun! :)