পথ পরিক্রমা: সান্দাকফু ট্রেক

ফালুট থেকে গোরখে

সান্দাকফু পশ্চিমবঙ্গের উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ। এই পর্বতের চূড়ার উচ্চতা ৩,৬৩৬ মিটার। সিঙ্গালিলা জাতীয় উদ্যানের ধারে পশ্চিমবঙ্গ-নেপাল সীমান্তে অবস্থিত এই শৃঙ্গ পূর্ব হিমালয়ের সিঙ্গালিলা গিরিশিরার সবচেয়ে উঁচু বিন্দু। সান্দাকফু অর্থ ‘Height of the Poison Plants’। সান্দাকফুর চূড়ার কাছে (বিখেভাঞ্জান থেকে) এক ধরনের বিষাক্ত গাছ একোনাইট জন্মায়। সেখান থেকেই এই নাম এসেছে ।

হিমালয়ের সুবিশাল ক্ষেত্রে ট্রেকিংয়ে হাতেখড়ির জন্য এই ট্রেককে বলা যায় আদর্শ। সান্দাকফু চূড়ার ৩৬০ ডিগ্রি ভিউ থেকে এভারেস্ট, কাঞ্চনজঙ্ঘা, লোৎসে ও মাকালু – পৃথিবীর পাঁচটি সবচেয়ে উঁচু শৃঙ্গের চারটিই সান্দাকফু থেকে দেখা যায়।

ভোরবেলা যখন সূর্যের সোনালী আলো কাঞ্চনজঙ্ঘা ম্যাসিফের উপর এসে পড়ে তখন শুয়ে থাকা বুদ্ধ জেগে উঠে। কুম্ভকর্ণ, কাঞ্চনজঙ্ঘা, কোকথাং, রাথোং, ফ্রে, কাবরু, সিমভো, পান্দিমের চূড়াগুলো মিলে তৈরি করে বুদ্ধের শুয়ে থাকা অবয়ব।

পূর্ব হিমালয়ের এই ট্রেইলের আরেকটি বৈশিষ্টপূর্ণ স্থান হচ্ছে কালাপোখারি বা কালো হ্রদ। বলা হয়ে থাকে কুচকুচে কালো এই হ্রদের পানি কখনোই নাকি জমে না। বৌদ্ধ ধর্মালম্বীরা তাই একে পবিত্র হিসেবে মানে।

রঙবেরঙের রডোডেনড্রন, উঁচু উঁচু পাইন বন, রেড পান্ডাদের আবাসস্থল সিঙ্গালিলা জাতীয় উদ্যানের মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া এই ট্রেইল মাঝারি সহজ বলে যারা অতি উচ্চতায় ট্রেকিং শুরু করতে চান তাদের জন্য একদম আদর্শ। শুধু চোখ জুড়ানো সৌন্দের্যের জন্যই নয়, হিমালয়ের অতি উচ্চতা ও ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় নিজেকে যাচাই করার জন্যেও এই ট্রেকটি উত্তম।


মানচিত্র


দিনপঞ্জী

দিন [০১] মানেভাঞ্জন অথবা চিত্রে

দিন [০২] মানেভাঞ্জন থেকে তুমলিং: ১৪ কিলোমিটার, ৭-৮ ঘন্টা

দিন [০৩] তুমলিং থেকে কালাপোখরি: ১১ কিলোমিটার, ৬-৭ ঘন্টা

দিন [০৪] কালাপোখরি থেকে সান্দাকফু: ৬ কিলোমিটার, ৩-৪ ঘন্টা

দিন [০৫] সান্দাকফু থেকে সাবারগ্রাম হয়ে ফালুট: ২১ কিলোমিটার, ৬-৭ ঘন্টা
অথবা, সান্দাকফু থেকে সাবারগ্রাম থেকে মলে হয়ে শ্রীখোলা  

দিন [০৬] ফালুট থেকে সরাসরি শ্রীখোলা (গোরখে-রামাম হয়ে): ২৪ কিলোমিটার, ৮-১০ ঘন্টা
অথবা, ফালুট থেকে গোরখে: ১৫ কিলোমিটার, ৩-৪ ঘন্টা
অথবা, ফালুট থেকে রামাম

দিন [০৭]  শ্রীখোলা থেকে রিম্বিক হয়ে মানেভাঞ্জান/দার্জিলিং
অথবা, রামাম থেকে শ্রীখোলা হয়ে, রিম্বিক থেকে মানেভাঞ্জান হয়ে দার্জিলিং
অথবা, রামাম থেকে শ্রীখোলা হয়ে, রিম্বিক থেকে মানেভাঞ্জান (রাত্রিযাপন)

দিন [০৮] দার্জিলিং/মানেভাঞ্জান থেকে শিলিগুড়ি হয়ে চ্যাংড়াবান্ধা/ফুলবাড়ি


পরিকল্পনা

যে কোন ট্রেকিংয়ের ক্ষেত্রে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরিকল্পনা করা অনেক জরুরি। এমনকি আপনার গ্রুপের দলনেতা থাকলেও, জরুরি কোন কারণে হয়ত আপনাকে একা ফিরে আসতে হতে পারে। তাই দলের সকলের পুরো পরিকল্পনাটি ভালভাবে জানা জরুরি।

সান্দাকফু-ফালুট ট্রেক মুলত মানেভাঞ্জান থেকেই শুরু হয় এবং এখানেই শেষ হয়। মানেভাঞ্জান থেকে ফোর হুইল ড্রাইভ (১৯৫৪ সালের টয়োটা ল্যান্ড রোভার) অথবা অধুনা মহিন্দ্রা/বলেরো সান্দাকফু পর্যন্ত যায় আর রাস্তা ভালো থাকলে আপনি তাদের ফালুট পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারবেন কারণ এই পর্যন্ত পুরোটাই গাড়ির রাস্তা।

আপনার ভ্রমণ পরিকল্পনায় যদি দার্জিলিং ভ্রমণ না থাকে তাহলে শুধু সান্দাকফু-ফালুট ট্রেকটি করতে সম্ভাব্য খরচ হতে পারে ১৩০-২০০ ডলার অর্থাৎ প্রায় ১০-১৫ হাজার টাকার মত।

মানেভাঞ্জান থেকেই আপনাকে এই ট্রেকের জন্য নাম তালিকাভুক্ত করতে হবে। এছাড়া সিঙ্গালিলা জাতীয় উদ্যানে প্রবেশের জন্য টিকেট কিনতে হবে এবং সরকারি তালিকাভুক্ত গাইড নিতে হবে, যা বাধ্যতামূলক।

উপরে উল্লিখিত ট্রেকের দিন ওয়ারি পরিকল্পনাটি যে কেউ তার নিজেদের পছন্দ ও প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করে নিতে পারবেন। যেমন, কারো হাতে সময় কম থাকলে সান্দাকফু থেকে ফালুট গিয়ে সরাসরি শ্রীখোলা (গোরখে অবস্থান না করে) চলে আসতে পারে।

বেশ কিছু কারণে বছরের জুন মাসের ১৫ তারিখ থেকে সেপ্টেম্বরের ১৫ তারিখ পর্যন্ত সিঙ্গালিলা রেঞ্জের ভিতরে কোন পর্যটক প্রবেশ নিষিদ্ধ। বছরে মূলত দুটি মৌসুম চলে এই ট্রেইলে।


মৌসুম

  • মার্চ-এপ্রিল-মে

এই মৌসুমে রাস্তায় প্রচুর রডোডেনড্রন ফুল পাবেন এবং এই লাল ফুল দেখতে দেখতে পাহাড়কেও ভুলে যেতে পারেন। এ সময় কুয়াশা-বৃষ্টি দুটোই থাকতে পারে তবে বৃষ্টির সম্ভাবনা বেশি মে মাসের শেষের দিকে। পূর্ব প্রস্তুতি হচ্ছে, এই সময় ঐ এলাকায় দিনগুলো কয় ঘণ্টার এবং ইন্টারনেটে আবহাওয়ার পূর্বাভাস কি ইত্যাদি জেনে যাওয়া।

আপনি এই মৌসুমে সান্দাকফু থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা ও এভারেস্ট খুব স্পস্ট নাও দেখতে পারেন।

  • অক্টোবর-নভেম্বর

সিঙ্গালিলা এলাকা ট্রেকিং করার জন্য এটা সবচেয়ে ভালো সময়। সান্দাকফু পর্যন্তও যেতে হবে না, খোদ চিত্রে থেকেই কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার সৌভাগ্য হবে। তবে এই সময়টা ট্যুরিস্ট/ট্রেকারদের চাপ থাকে অত্যধিক; কারণ তখন পুজোর ছুটি থাকে। কাজেই থাকার একটু সমস্যা হলেও হতে পারে। তবে এখন অনেক নতুন নতুন ট্যুরিস্ট লজ হচ্ছে, কাজেই চিন্তার কোন কারণ নেই।


তাপমাত্রা

সান্দাকফু ট্রেকে মৌসুমভেদে তাপমাত্রা দিনের বেলা ১২-২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং রাতের বেলা মাইনাস ৫ থেকে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত হতে পারে। তাপমাত্রার সাথে সাথে প্রচণ্ড বাতাসের কারণে উইন্ড চিল ফ্যাক্টর এই ট্রেকের আরেকটি চ্যালেঞ্জ। তাই জামা কাপড়ের দিক দিয়ে খুব ভালভাবে প্রস্তুতি নিয়ে যাওয়া উচিত।


ঠাণ্ডার জামাকাপড়

উপযুক্ত পোষাক থাকলে আর সেগুলোর যথাযথ ব্যবহার করলে যে কোন অতি উচ্চতার ট্রেকিংয়ে গিয়ে ঠাণ্ডায় মোটেও কষ্ট পাবেন না। আর এই উপায়টির নাম হচ্ছে লেয়ার ক্লোদিং। পরীক্ষা করে দেখা গেছে , একটি মোটা কাপড়ের গরম জামা না পরে, পাতলা পাতলা দুটি জামা পড়লে ঠাণ্ডা কম লাগে। এই তত্ত্বের উপর ভিত্তি করেই এই লেয়ার সিস্টেম। এমন চরম পরিবেশের জন্য নিচে উল্লেখিত লেয়ার ব্যবহার করা যেতে পারে:

  • উপরের অংশ

১. প্রথমেই থার্মাল সিন্থেটিক ইনার।

২. তার উপর একটি ফুল হাতা সিন্থেটিক টি-শার্ট।

৩. এর উপর একটি সুতি টি-শার্ট (ফুল/হাফ)

৪. ফ্লিসের পাতলা সোয়েটার

৫. ডাউনের জ্যাকেট (ঐচ্ছিক)/ এই ট্রেকের জন্য ভালমানের একটা উষ্ণ জ্যাকেট হলেও হবে।

৬. উইন্ড চিটার/ব্রেকার

৭. গ্লাভস: এটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ। চরম ঠাণ্ডায় আপনার হাত, পা আর নাক সবার আগে জমতে শুরু করবে, বিশেষ করে হাতের আঙুল। যেহেতু হাত সবচেয়ে বেশি খোলামেলা থাকবে তাই আপনার হাতের গ্লাভসটা খুবই ভালো হতে হবে।

সাধারণত দিনের বেলা ট্রেক করার সময় শরীর গরম থাকে। আর তাপমাত্রাও খানিকটা বেশি থাকে, তাই হাঁটার সময় ডাউনের জ্যাকেট লাগে না। উইন্ড চিটার পরেই দিনের বেলা আরামে হাঁটা যায়। ট্রেক শেষে ক্যাম্প সাইটে যাওয়ার পর ডাউন জ্যাকেটটা পরে তার উপর উইন্ড চিটার পরলে গায়ে বাতাস লাগবে না।

  • নীচের অংশ

আমাদের দেহের নিচের অংশে ঠাণ্ডা অপেক্ষাকৃত কম লাগে। তাই মোটামোটি তিনটি লেয়ারই নিচের জন্য যথেষ্ট। একটি থার্মাল ইনার, তার উপরে একটি সুতি টি-শার্ট কাপড়ের ট্রাউজার, আর তার উপর ট্রেকিং ট্রাউজার পরে ক্যাম্প সাইটে আরাম করে ঘুমানো যাবে। আর দিনের বেলা ট্রেকিংয়ের সময় মাঝের লেয়ার না পরলেও চলবে।

** তবে এগুলো পুরোটাই নির্ভর করে নিজের উপর। আপনার সহ্য ক্ষমতার সাথে মিলিয়ে আপনি আপনার মত লেয়ার ঠিক করে নিন। একেক জনের জন্য এক বা একাধিক লেয়ার কম-বেশি হতে পারে।


প্রয়োজনীয় সাজ-সরঞ্জাম

১. ট্রেকিং বুট: ভালো গ্রিপের একটি ট্রেকিং বুট খুবই দরকারি। ৭ দিন পাথরের টেরেইনের মধ্যে এবং বস্তুত উঁচু-নিচু পাথরের রাস্তায় ট্রেক করতে হবে তাই পায়ের জুতাটি আরামদায়ক হওয়া বাধ্যতামূলক। পায়ের বুট গিরার উপর পর্যন্ত উঁচু হওয়া উত্তম। একদম নতুন বুট পড়ে ট্রেক করবেন না। ট্রেকের পূর্বে পাঁচ-ছয় দিন বুট পরে ঘুরবেন।
২. ব্যাকপ্যাক: ভাল মানের একটি ব্যাকপ্যাক আরামদায়ক ট্রেকের জন্য গুরুত্বপূর্ন। ভালো ব্যাক সিস্টেম, কাঁধে আর কোমড়ে সমানভাবে ওজন নেয়, কাঁধে চাপ পড়ে না, এমন ব্যাকপ্যাক ব্যবহার করা ভালো। এই ট্রেকের জন্য ৪০-৫০ লিটার ব্যাকপ্যাক হলেই যথেষ্ট।

৩. মাংকি ক্যাপ/বালাক্লাভা: বালাক্লাভা ওজনে হালকা, ফানেল আকারের এক টুকরো কাপড়। এটা দিয়েই মাংকি ক্যাপ, মাথা ঢাকা, কান ঢাকা, প্রয়োজনের সময় এটা দিয়েই গলা ঢাকা যায়। সান্দাকফু এবং সান্দাকফু থেকে ফালুট যাবার পথে প্রচন্ড বাতাসের তোপে এটা থাকা খুবই জরুরি।

৪. পলিব্যাগ: আপনার জিনিসপত্র পানি থেকে বাঁচাতে সব কিছু আলাদাভাবে পলিতে প্যাক করে নিবেন। সাথে করে অতিরিক্ত কয়েকটি জিপ লক/সাধারণ পলিথিন নিয়ে যাবেন। বিশেষ করে এপ্রিল-মে’র শেষের দিকে বৃষ্টির আশংকা সব সময়ই থাকে।

৫. হেড ল্যাম্প/টর্চ; সাথে অতিরিক্ত ব্যাটারি। ঠাণ্ডায় ব্যাটারীর চার্জ অল্পতেই শেষ হয়ে যায় এই বিষয়টা সবসময় মাথায় রাখবেন। ট্রেক করতে গিয়ে রাত হয়ে গেলে অথবা রাতে টয়লেটে যেতে হলে এটার বেশ প্রয়োজন হতে পারে, তাই আকৃতিতে ছোট হলে ভালো।

৬. রোদ চশমা: বরফের মধ্যে সূর্যের আলো পড়ে কয়েক গুন বৃদ্ধি পেয়ে আমাদের চোখে পড়ে। খালি চোখে তাই ট্রেক করা বিপদজনক। তুষার অন্ধত্ব হতে পারে। তাই ভালো দেখে একটি ‘পোলারাইজড’ রোদ চশমা নিয়ে যেতে হবে। জানুয়ারির দিকে সান্দাকফু গেলেই এটার প্রয়োজন হবে কারণ তখনি সেখানে বরফ পড়ে।

৭. প্রয়োজনীয় ঔষধ: প্রাথমিক ফার্স্ট এইড কিটের ঔষধসমূহ। সাথে কিছু তুলা, গজ-ব্যান্ডেজ, পভিডন আয়োডিন, স্যাভলন, ব্যান্ড এইড।

৮. ক্যামেরা, মেমরি কার্ড, পাওয়ার ব্যাংক- ট্রেইলের অধিকাংশ অংশে বিদ্যুৎ সরবরাহ নেই।

৯. ট্রেকিং পোল/ওয়াকিং স্টিক- দুইটি পোল নেওয়ার জন্য পরামর্শ দেব আমি। নিদেনপক্ষে একটা। ট্রেকিং পোল ব্যবহার করলে শরীরের উপর চাপটা অনেক কম পড়ে।

১০. ট্রেক কিট: সুঁই, সুতা, সেফটি পিন, ১০০ ফিটের প্যারাকর্ড। কখন কি কাজে লেগে যায় বলা তো যায় না। এই জিনিসগুলো সব সময় কাজে লাগে।

১১. ট্রেইল মিক্স/চকলেট/লজেন্স: এমনিতে পুরো ট্রেইল জুড়েই কিছুদূর পর পর গ্রাম পড়বে যেখানে হালকা চা-নাস্তার ব্যবস্থা আছে। তারপরেও পথিমধ্যে মুখের স্বাদ পরিবর্তনের জন্য কিছু নিয়ে যেতে পারেন।

১২. পানির বোতল।


প্রয়োজনীয় কাগজ পত্র

[১] সিঙ্গালিলা পার্কের এন্ট্রি টিকেট (মানেভাঞ্জান থেকে নিতে হয় তবে ট্রেকে মেঘমা’র পরে আরেকটা চেকপোস্ট থেকেও নেয়া যায়)

[২] পাসপোর্টের ফটোকপি: ২-৩ কপি (ভিসার পাতাসহ)

[৩] পাসপোর্ট সাইজের ছবি: ৪ কপি সাথে রাখবেন। (সাথে দুই কপি স্ট্যাম্প সাইজ ছবি হলে আরো ভাল, তাতে মোবাইলের সিম নিতে সুবিধা হবে) 


ট্রেক বিবরণী

সান্দাকফু-ফালুট ট্রেকটা শুরু হয় মানেভাঞ্জন থেকে। মানেভাঞ্জন পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের জন্য সবচেয়ে কাছের শহর শিলিগুড়ি। শিলিগুড়ি ভারতের যেকোন জায়গা থেকেই পৌঁছানো সম্ভব। সবচেয়ে কাছের রেলওয়ে স্টেশন হচ্ছে নিউ জলপাইগুড়ি।

বাংলাদেশ থেকে ভারতের যতগুলো পোর্ট আছে সবগুলো দিয়েই শিলিগুড়ি যাওয়া যায় তবে কাছাকাছি হচ্ছে বাংলাবান্ধা ও বুড়িমাড়ি পোর্ট। বাংলাবান্ধা পোর্ট পর্যন্ত সরাসরি বাস নেই, কিছু রাস্তা আপনাকে অটো দিয়ে যেতে হবে আর বুড়িমাড়ি পোর্ট পর্যন্ত সরাসরি বাস যায়। আসলে ব্যাপারটা এখন এমন দাড়িয়েছে যে আপনি যদি সড়ক পথে ভুটান যেতে চান তাহলে আপনাকে বুড়িমাড়ি পোর্ট ব্যবহার করলে সহজ ও কাছে হবে। অন্যদিকে শিলিগুড়ি যেতে চাইলে বাংলাবান্ধা একদম কাছে। অনেকেই আবার কলকাতা বা গৌহাটি দিয়েও শিলিগুড়ি আসেন কারণ তাদের ভিসার পোর্ট বেনাপোল অথবা ডাউকি।

যেহেতু এই পোর্টটাই কাছের এবং এখন থেকে সবাই এই রুটটাই ব্যবহার করবে তাই এটা নিয়েই লিখলাম। রাতে ঢাকা থেকে পঞ্চগড়ের বাসে চেপে আপনি ভোরে পৌঁছাবেন। বাস স্ট্যান্ড থেকে অটো দিয়ে সোজা পোর্টে ৮টার আগেই চলে যেতে পারেন এবং সেখানে দালাল ধরেন আর না ধরেন, ধরে রাখুন পুরো প্রক্রিয়া শেষ করে বের হতে এক ঘণ্টা লাগবেই। ইমিগ্রেশন শেষ করে ঐপাড়ে বের হয়েই দেখবেন অনেক শেয়ারড টেম্পো আছে যা আপনাকে শিলিগুড়ি নিয়ে যাবে স্রেফ ১০/২০ মিনিটে অর্থাৎ রাতে যেখানেই খান সকালে নাস্তা করতে পারবেন শিলিগুড়িতে।

শিলিগুড়ি মহানন্দা ব্রিজের কাছে একটি জিপ স্ট্যান্ড আছে, যেখান থেকে মাহিন্দ্রা/ বলেরো ধরনের ওয়াগনগুলো যাত্রী নিয়ে দার্জিলিং এবং এর আশেপাশের স্থানগুলোতে যায়। মূলত পর্যটক এবং স্থানীয়রা মিলেমিশেই যায় এসব গাড়িতে। এখানে গিয়ে মানেভাঞ্জানের জিপ খুঁজবেন অথবা ড্রাভারদের জিজ্ঞেস করলে তারা দেখিয়ে দিবে। মানেভাঞ্জান পর্যন্ত ভাড়া ১২০/১৩০/১৪০ রুপি নিতে পারে।


জিপ যখনই ছাড়ুক, নুন্যতম ৫ ঘণ্টা লাগবে মানেভাঞ্জান যেতে। এর মাঝে অনেক যায়গাতেই জিপ থামে, কোথাও যাত্রী উঠানো অথবা নামানোর জন্য অথবা স্রেফ চা খাবার জন্য। মনে রাখবেন যদি তলপেটে চাপ থাকে তাহলে ড্রাইভারকে নিঃসঙ্কোচে বলবেন, কারণ এরা মনে হয় সুযোগ পেলেই থামতে চায়। শিলিগুড়ি থেকে জিপ মিরিক ও শুকিয়া পোখারি হয়ে মানেভাঞ্জান যায়।


শিলিগুড়ির ক্যান্টনমেন্ট এলাকা পার হলেই পাহাড়ি রাস্তা শুরু হয়ে যায়। এখানে আমার একটি ব্যক্তিগত অনুরোধ, ভুলেও গাড়িতে উঠার আগে মাথা ব্যথা বা বমির কোন ঔষধ খাবেন না, কারণ এগুলো খেলে আসলে বোঝা যাবে না উচ্চতার কারণে আপনার আসলে সমস্যা হচ্ছে কি, হচ্ছে না। হ্যাঁ, পাহাড়ী রাস্তায় ক্রমাগত এদিক ওদিক করে গাড়ি চললে একটু মাথা ঘুরবেই। সে ক্ষেত্রে আমি আপনাকে আমার প্যারাগ্লাইডিং অভিজ্ঞতা থেকে একটা উপদেশ দিতে পারি – এমন কোন কিছুর দিকে তাকাবেন না যেটি নড়ছে বা চলছে, মনযোগ দিয়ে গাড়ীর ড্যাসবোর্ড অথবা সিট অথবা ভিতরের স্থির কিছুর দিকে চেয়ে থাকুন।

এখানে আপনি যেই উদ্দেশ্যেই আসেন না কেন- জিপ সাফারি কিংবা ট্রেকিং, আপনাকে অবশ্যই ট্যুরিস্ট এন্ট্রি পয়েন্টে পাসপোর্ট এন্ট্রি করাতে হবে। ট্যুরিস্ট পাসপোর্ট এন্ট্রি কোথায়, তা যে কাউকে জিজ্ঞেস করলেই দেখিয়ে দিবে। এরপর সিঙ্গালিলা পার্কে প্রবেশের টিকিট কাটতে হবে। ট্যুরিস্ট পাসপোর্ট এন্ট্রি পয়েন্ট হচ্ছে শহরের শুরুতে আর সিঙ্গালিলা চেকপোস্ট হচ্ছে আরেক মাথায়, যেখান থেকে ট্রেকিং শুরু হয়। সার্ক দেশ হিসেবে আমাদের জনপ্রতি ২০০ রুপি দিতে হবে আর ডিএসএলআর ক্যামেরা প্রতি ৫০ রুপি।


মানেভাঞ্জানের ফুটবল মাঠ। এটাতে ভুটান থেকেও ফুটবল ক্লাব আসে খেলতে।

শিলিগুড়িতে বাংলায় কথা বলতে পারবেন কিন্তু মানেভাঞ্জানে দরকার পড়বে হিন্দি এবং ইংরেজির। এখানে একটা ভালো ফার্মেসি আছে, আপনার কোন সমস্যা বুঝিয়ে বলতে পারলে উনি ঔষধ দিয়ে দিবেন।


রাতে থাকার ক্ষেত্রে অনেক গেস্ট হাউজ আছে, তবে সবচাইতে ভালো হয় জীবন চিত্রের ‘হোটেল এক্সোটিকা’।

উচ্চতা ২১৫০ মিটার থেকে ৩০৮৭ মিটার | সময়: ৭-৮ ঘণ্টা, ১৪ কিলোমিটার


সকাল সকাল নাস্তা করে মানেভাঞ্জন থেকে রওনা দিয়ে দেড় থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যে তিন কিলোমিটার দূরের চিত্রে (২৫৩০মিটার) পৌঁছে যাবেন। চিত্রে একটি ছোট্ট বৌদ্ধ গ্রাম। এখানে খুব সুন্দর একটি বৌদ্ধ মন্দির আছে। আবহাওয়া ভাল থাকলে ট্রেইল থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা রেঞ্জের চমৎকার ভিউ পাওয়া যায়। মানেভাঞ্জন থেকে চিত্রে উঠার ট্রেইলটি একটু খাড়া হলেও পথের চিরসবুজ পাইন, ফার, বার্চ বন শরীরকে ক্লান্ত হতে দেয় না। এখানে হালকা নাস্তা, চা ও পানির ব্যবস্থা আছে।


চিত্রে বৌদ্ধ মনেস্ট্রি 

চিত্রে থেকে আরো তিন কিলোমিটার পরে পড়বে মাত্র পাঁচটি তিব্বতি পরিবারের গ্রাম লামেয়ধুরা। চিত্রে থেকে লামেয়ধুরার ট্রেইলটি চড়াই-উৎড়াই নেই বলে আরাম করে এক ঘণ্টায় পৌঁছে যাওয়া যায়। এখানেও চা, বিষ্কুট ও ন্যুডলসের মত হালকা নাস্তা করার ব্যবস্থা রয়েছে।


লামেয়ধুরা; এখানে রেস্টুরেন্ট ও টয়লেট আছে। তবে কেউ এখানে সাধারণত থাকে না তাই এখানে কোন কটেজ বা লজ নেই।

লামেয়ধুরা হতে এক থেকে দেড় ঘণ্টা আরামদায়ক হালকা চড়াই পথ ধরে ট্রেইল চলে যায় ভারত-নেপাল সীমান্তে অবস্থিত ছোট্ট গ্রাম মেঘমায়। যাত্রা পথে চোখে পড়বে ম্যাগনোলিয়ার গাছ। ভাগ্য ভালো থাকলে ও তুখোড় দৃষ্টিতে তাকালে আপনি রেড পাণ্ডা দেখেও ফেলতে পারেন। এখানে একটি এসএসবি চেক পোস্ট আছে। আপনার পাসপোর্ট, আইডি কার্ড ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এখানে চেক করে নাম এন্ট্রি করাতে হবে।


কিছুদূর এগিয়ে গেলে হাতের বামে একটি বৌদ্ধ মন্দির পড়ে। এখান থেকে ৪-৫ মিনিট হাঁটলেই একটি বাঁক পড়বে। ডানের রাস্তা ধরে বেশ পেচিয়ে খাড়া উপরে উঠে গেলে পড়বে তংলু যার উচ্চতা সান্দাকফুর প্রায় কাছাকাছি এবং আবহাওয়া ভালো থাকলে এখান থেকে সান্দাকফুর মতই ভিউ পাওয়া যায়, অর্থাৎ কাঞ্চনজঙ্ঘা ও এভারেস্ট রেঞ্জ দেখতে পাওয়া যায়। কাজেই অনেকেই সান্দাকফু না গিয়ে দার্জিলিং থেকে তংলু পর্যন্ত আবহাওয়া ভেদে সংক্ষিপ্ত ভ্রমণও করে। তংলু থেকে প্রায় ২০০ মিটার নিচে আরো ২ কিলোমিটার দূরে তুমলিং গ্রামটি অবস্থিত। এখান থেকে ভোর বেলা কাঞ্চনজঙ্ঘাকে দেখার অভিজ্ঞতা চিরদিন মনে গেঁথে যাবে। এখানে বেশ কিছু হোম স্টে ও প্রাইভেট লজ আছে। সিঙ্গেল, ডাবল ও ডর্ম রুমের ব্যবস্থা আছে।

উচ্চতা: ৩০৮৭ মিটার থেকে ৩১৭০ মিটার | সময়: ৬-৭ ঘণ্টা, ১১ কিলোমিটার


তুমলিং গ্রামের সামনের খোলা সবুজ প্রান্ত থেকে সূর্যোদয়ের মুহূর্তে পুরো কাঞ্চনজঙ্ঘা পরিবারকে দেখার রোমাঞ্চ, অন্যরকম এক অভিজ্ঞতা। এই পরিবারের একদম ডান দিকের চূড়াটি হল কুম্ভকর্ণ। এরপর কাঞ্চনজঙ্ঘা আর সিমভো একদম পিছনে দেয়ালের মত দাঁড়িয়ে আছে। কাঞ্চনজঙ্ঘার নিচে কোকতাং, রাথোং, ফ্রে, সাউথ কাবরু, নর্থ কাবরু, গোয়েচা আর পান্দিমের গিরিশিরা দেখা যায়। গোয়েচা আর পান্দিমের মধ্যবর্তী স্যাডেলটাই হচ্ছে ঐতিহাসিক গোয়েচা লা পাস।


এখান থেকে একটি গাড়ির রাস্তা আরেকটি পায়ে হাঁটার পথ সামনে এগিয়ে গেছে। পায়ে হাঁটার ট্রেইলটি জাউবাড়ি হয়ে গাইরিবাস এবং গাড়ির রাস্তাটি সরাসরি গাইরিবাস পর্যন্ত গিয়েছে। পায়ে হাঁটার ট্রেইলটি চলে গিয়েছে ঘন জঙলের আর সবুজ খোলা প্রান্তরের মধ্য দিয়ে। তুমলিং থেকে নেপালি গ্রাম গাইরিবাসে পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় তিন ঘণ্টার মত।


প্রায় দেড় কিলোমিটারের খাড়া চড়াই ভাঙ্গার পর পড়বে কাইয়াকাটা। এখানে ট্রেকারদের জন্য সিড়ি বানানো আছে। এখানে এসএসবি ক্যাম্প ও সিঙ্গালিলা জাতীয় উদ্যানে প্রবেশ পথের শুরু হয়। কাইয়াকাটাতে দুপুরের খাবার খাওয়ার ব্যবস্থা আছে।
কালাপোখারি

কাইয়াকাটা থেকে কালাপোখরি প্রায় ৪ কিলোমিটার পথ। প্রায় সমান গাড়ি চলার পাথুরে রাস্তা। চমৎকার এই রাস্তায় প্রচুর পাখি দেখতে পাওয়া যায়। দেড় থেকে দুই ঘণ্টা ট্রেক করার পর শিমের বিচি আকারের কালো রঙের একটি হ্রদ সামনে পড়বে। এটিই সেই কালাপোখরি হ্রদ। এর চারপাশটা রঙিন প্রেয়ার ফ্ল্যাগ দিয়ে সাজানো। সামনেই একটি বৌদ্ধ মন্দির পড়বে। এই জায়গাটিও ভারত নেপাল সীমান্তে পড়েছে। পাঁচ দশ মিনিট হাঁটলেই এখানে রাতে থাকা খাওয়ার জন্য লজ পাওয়া যাবে।

উচ্চতা ৩১৭০ মিটার থেকে ৩৬৩৬ মিটার | সময়: ৩ ঘণ্টা, ৬ কিলোমিটার


আজকের ট্রেকটি তুলনামূলক সহজ ও আরামদায়ক। কালাপোখরি থেকে ট্রেক শুরু করে একটি খাড়া উৎড়াই পথ ধরে নামতে থাকলে ৩০-৪০ মিনিটের মাঝেই আপনি ভাগসা হয়ে বিখেভাঞ্জন নামক একটি জায়গায় পৌঁছে যাবেন। বিখেভাঞ্জন অর্থ বিষাক্ত উপত্যকা, এখানেই বিষাক্ত একোনাইট উদ্ভিদ জন্মায়। এখানে চা পানের বিরতি নিয়ে পানির বোতলগুলো পুনরায় পূর্ণ করে নিতে পারেন। কারণ এরপর খাড়া চড়াই পথ একটানা উঠে যেতে হবে একেবারে সান্দাকফু পর্যন্ত। খুব খারাপ আবহাওয়া থাকলে এখানে কোন দোকান খোলা নাও পেতে পারেন তাই অতিরিক্ত পানি কালাপোখারি থেকেই নেওয়া ভাল।


কালাপোখারি থেকে দেখা সান্দাকফু; সান্দাকফুর উপরে শেরপা শ্যালে কাঠের হোটেল।

বিখেভাঞ্জন থেকে মাথা তুলে তাকালেই সামনে সান্দাকফুর ঘরবাড়িগুলো দেখা যায়। প্রথম দেখায় এত খাড়া রাস্তা দেখে মন দমে যেতে পারে, তবে চিন্তার কিছু নেই। এখান থেকে মূলত দুটি পথ সান্দাকফু গিয়েছে। একটি নেপাল হয়ে, এই পথটি তুলনামূলক লম্বা কিন্তু কম খাড়া। অন্যদিকে ভারতের মধ্য দিয়ে যেই পথটি গেছে সেটি রাস্তা কম হলেও জিগ জ্যাগ করে একেবারে খাড়া ঢাল উপরে উঠে গেছে।


চেষ্টা করবেন যেন বিকালের আগেই সান্দাকফু পৌঁছে যাওয়া যায়। শেষ বিকালের আলোতে চোখের সামনে হিমালয়কে অপূর্ব লাগে। পরদিন সূর্য উঠার আগেই ভিউ পয়েন্টে চলে যাবেন। সান্দাকফুতে অনেক ধরনের কটেজ আছে তবে সরকারি ডরমেটরিগুলোই ভালো। এদের কিচেনের রান্না অন্য কটেজগুলোর তুলনায় বেশ ভাল। তবে আপনি শেরপা শ্যালেট (কালাপোখারি থেকে যেটি দেখা যায়। একটা নীল রঙের চার তলা কাঠের বাড়ি) থাকতে পারেন আর খাবার সময় নিচে নেমে ডরমেটরিগুলোর যেকোন একটি চালু কিচেনে গিয়ে নগদ টাকা দিয়ে খেয়ে নিতে পারেন।

উচ্চতা ৩৬৩৬ মিটার থেকে ৩৫৯৯ মিটার | সময়: ৬-৭ ঘণ্টা, ২১ কিলোমিটার


সান্দাকফুতে খুব ভোরে উঠতে হবে, পুরো ট্রেকের সৌন্দর্য এই সময়ের ভিতরে লুকিয়ে আছে। ঘুমিয়ে থাকলেন বা দেরি করে উঠলেন তো পুরো ট্রেকের পুরষ্কার হাতছাড়া হয়ে যাবে। চোখের পলক ফেলতে ফেলতেই এই স্মরণীয় মুহূর্তটি চলে যাবে। তাই আলসেমী ভেঙ্গে সূর্যোদয়ের ৩০ মিনিট আগে থেকে উঠে ভিউ পয়েন্টগুলোতে অবস্থান নিবেন।


সান্দাকফু থেকে দেখা এভারেস্ট বেল্ট।

ভোরের সূর্য যখন দূরের শ্বেত শুভ্র চূড়াগুলোর উপর সোনালী আলো ফেলে তখন আপনার চোখের সামনে ভেসে উঠবে হিমালয়ের এক আশ্চর্য প্যানারোমিক ভিউ। মাকালু, লোৎসে, এভারেস্ট, তুপৎসে, বারুনৎসে, চামলিং, চোমোলনজো, মাচ্ছাপুচ্ছেরেসহ পশ্চিম আকাশে অন্নপূর্ণা হিমালয়ের আরো অসংখ্য চূড়া। সেই সাথে দেখা দিবে থ্রি সিস্টার্স আর কাঞ্চনজঙ্ঘা পরিবার, যাদের দূর থেকে দেখে মনে হয় বুদ্ধ শুয়ে রয়েছেন। পূব আকাশে মেঘের চাদরের উপর দিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা চমোলহারিকে দেখা যাবে।


সান্দাকফু থেকে ফালুট যাবার পথে অবারিত তৃণভূমি।

সকাল সাতটা/আটটা নাগাদ ফালুটের ট্রেইল ধরবেন এবং সাথে অবশ্যই সবাই কমপক্ষে ২ লিটার পানি রাখবেন। কারণ পুরো ২১ কিলোমিটার রাস্তায় কোথাও পানি পাবেন না। তবে এসএসবি চেকপোস্টগুলোতে চাইলে পেতে পারেন কিন্তু তারা মানা করে দিলে কিছু করার থাকবে না।


ফালুটের রাস্তায় ১৪ কিলোমিটার পরে একটা যায়গা আছে সাবারগ্রাম, ভুলেও এখানে চা ছাড়া অন্যকিছু খেতে যাবেন না – স্রেফ আপনার সময়টা নষ্ট হবে কারণ সন্ধ্যার আগে যদি ফালুট পৌঁছাতে পারেন তাহলে সূর্যের লালিমাতে খুব কাছে থেকে কাঞ্চনঝঙ্গাকে দেখতে পাবেন।


ফালুটে দুটো কটেজ আছে, একটা সরকারি আরেকটি প্রাইভেট। সুযোগ সুবিধা প্রায় একইরকম খালি সরকারিটা পাথরে তৈরি আর অন্যটি টিনের।


ফালুটে যেখানে কটেজগুলো থাকে সেখান থেকে একটু উপরে উঠে গেলেই চোখের সামনে কাঞ্চনজঙ্ঘা ঝাপ দিয়ে সামনে চলে আসবে। এখানে একটা সীমান্ত পিলার আছে যা ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, সিকিম আর নেপালকে ভাগ করেছে। একটা ট্রেকিং রুটও আছে সামনের দিকে, এই পথটায় গাইডরা যেতে দেয় না এবং এটা দিয়ে চ্যাংথাফু নামক জায়গায় যাওয়া যায়, যা নেপালের ভেতরে। সেখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘাকে আরো কাছে এবং ভালো ভাবে দেখা যায়। এই রুটটা অবশ্য দার্জিলিংয়ের এজেন্সিগুলো ব্যবহার করে।


উচ্চতা ৩৫৯৯ মিটার থেকে ২১০২ মিটার | সময়: ৮-১০ ঘণ্টা, দূরত্ব ২৪ কিলোমিটার


ফালুটের সকালের ভিউ দেখে নাস্তা করে সিঙ্গালিলা বনের ভিতর দিয়ে গোরখে নেমে যাওয়া। নামার রাস্তাটা এতটাই আকর্ষণীয় যে আপনি যদি সাইক্লিস্ট হন তাহলে আপনার হাত নিশপিশ করবে একটা মাউন্টেইন বাইকের জন্য। এক রত্তি প্যাডেলও দিতে হবে না কারণ ট্রেকটা একদম জিক জ্যাক হয়ে ধীরে ধীরে নেমে গিয়েছে। আর চারিদিক থেকে চেপে আসা জঙ্গলের সাথে নানা রকম পাখির কিচিরমিচির তো আছেই। ভুলেও ওখানে কোন রকম হৈচৈ করবেন না বা কানে হেডফোন গুজে গানও শুনবেন না। কারণ এখানে পাখিদের কনসার্ট চলে হরদম। আর জঙ্গলের ভিতর দিয়ে শো শো করে বয়ে চলা বাতাসের বাঁশির সুর আপনাকে এনে দেবে এক অপার্থিব অনুভূতি।


গোরখে উপত্যকার পাশ দিয়ে চলে গেছে একটি পাহাড়ি নদী, যাকে গোরখে স্ট্রিম বলে। এর উৎপত্তি শ্রীখোলা থেকে উপরে কোথাও। সময় থাকলে একদিন চলে যেতে পারেন এর উৎসের খোঁজে। স্থানীয়দের জুম চাষ করা পুরো উপত্যকাটা যেন একটি ছবির মত সুন্দর। গোরখে উপত্যকায় অনেক কটেজ আছে। এখানের কোন কটেজে থেকে যেতে পারেন অথবা বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে রামাম চলে যেতে পারেন।


গোরখে; পাইন গাছের আড়ে এক অন্যরকম উপত্যকা। সময় থাকলে অবশ্যই একদিন থেকে যাবেন।

গোরখে থেকে পরের স্টপেজ রামাম কিন্ত কৌশলগত কারণে এখানে না থেকে শ্রীখোলা থাকা ভালো। হয় গোরখে থাকুন অথবা শ্রীখোলা। তবে উপায় না থাকলে আর কি করা। গোরখে থেকে রামাম হয়ে শ্রীখোলা হচ্ছে রুট, আর যদি সময়ের সল্পতা থাকে তাহলে শ্রীখোলা বাইপাস করে সিপ্পি দিয়ে রিম্বিক চলে যেতে পারেন।


শ্রীখোলা; একটি রাত এই পাথুরে নদীর পাশে আপনাকে থাকতেই হবে।

শ্রীখোলাতেও একদিন থাকা বাঞ্ছনীয় কারণ ঠিক পাহাড়ি নদীর পাশে কটেজগুলোতে থাকাটা কেমন হতে পারে সেই অপার্থিব অনুভূতিটা আসলে লিখে বর্ণনা করা সম্ভব না। এর পরে রিম্বিক। খুব কাছে শ্রীখোলা থেকে আসা যায়। আবার শ্রীখোলা এড়িয়ে রামাম থেকেও চলে আসা যায়। রিম্বিক থেকে দুটো শেয়ারড জিপ যায় দার্জিলিং – একটা ১১:৩০টায় আরেকটা ১২:৩০ টায়। ইচ্ছে করলে দার্জিলিং চলে যেতে পারেন অথবা মানেভাঞ্জান নেমে পরের দিন শিলিগুড়ি হয়ে বর্ডার ক্রস করে ফেলতে পারেন।



খরচ

ঢাকা থেকে পঞ্চগড় হানিফ/বাবুল পরিবহন: ৪০০-৫০০ টাকা (নন-এসি)

তেতুলিয়া বাজার থেকে বাংলাবান্ধা লোকাল বাস ভাড়া: ২০ টাকা

সীমান্ত থেকে শিলিগুড়ি টেম্পো ভাড়া: ১০/২০ রুপি

শিলিগুড়ি থেকে মানেভাঞ্জান শেয়ারড জিপ: ১২০/১৩০ রুপি

শিলিগুড়ি থেকে মানেভাঞ্জান রিজার্ভ জিপ: ২৮০০-৩০০০ রুপি

মানেভাঞ্জান এ রাতে থাকা ডাবল বেড: ৪০০/৫০০ রুপি, সিঙেল বেড- ২০০-৩০০ রুপি, ডরমেটরি- ১০০-১৫০ রুপি।

এর পরে ট্রেকের সব কটেজেই ডরমেটরিগুলোর সিট ভাড়া: ২৫০ রুপি, ডাবল বেড রুম ৫০০ রুপি

খাবার প্রতি বেলা জন প্রতি: ২০০/৩০০ রুপি; কোন মেনু খাচ্ছেন তার উপরে নির্ভর করছে।

সান্দাকফুতে শেরপা শ্যালে হোটেলে ডাবল বেড: ৮০০/১০০০/১২০০ রুপি; ট্যুরিস্ট সিজনের উপরে দাম কমে বাড়ে, আর নিচে ডরমেটরিতে সিট ২৫০ রুপি করেই।

গাইড: ২০১৬ সালের তথ্যানুযায়ী দিনপ্রতি ৬০০/৭০০ রুপি, থাকার খাওয়ার জন্য এদের আলাদা কোন খরচ দিতে হয় না।

রিম্বিক থেকে দার্জিলিং শেয়ারড জিপ ভাড়া:  ১৪০/১৫০ রুপি।


সাবধানতা

[১] সান্দাকফু-ফালুট ট্রেকটি এমনিতে মোটামোটি সহজ হলেও খুব দ্রুত অতি উচ্চতায় আরোহণ করতে গেলে অনেকেই একিউট মাউন্টেইন সিকনেস বা এ.এম.এসের স্বীকার হতে পারেন। তাই যেকোন ধরনের মাথা ব্যথা, পেট ব্যথা, পেট গোলানো, মাথা ঝিম ঝিম করা, ঘুম ঘুম ভাব বা অস্বাভাবিক ঝিমুনী, গা গোলানো, বমি বমি ভাব, খাদ্যে অরুচি ইত্যাদি লক্ষণ দেখা দিলে সাথে সাথে নীচে নেমে আসতে হবে।

[২] গাইডের সাথে কথা বলে, আপদকালীন অবস্থায় কোন পথে দ্রুত নিচে নেমে শহরে পৌঁছানো সম্ভব সেই পরিকল্পনা আগেই করে রাখবেন।

[৩] ট্রেইলের সব জায়গায় পানি পাওয়া যায় না। তাই সেইভাবে পুরো পরিকল্পনাটা সাজাবেন। সেই সাথে সুযোগ পেলেই পানি বোতল ভরে রাখবেন।

[৪] প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে গাইড না নিয়ে, সিঙ্গালিলা রেঞ্জের টিকিট ফাঁকি দিয়ে নিজের পরিচয় লুকিয়ে বা ভিন্ন পরিচয় দিয়ে এই ট্রেকটি করার চিন্তা করবেন না। এটা একদিকে যেমন জঘন্য রকমের অপরাধ অন্যদিকে আপনার এই ধরনের কর্মকাণ্ড দেশকে অপমান করার সামিল।

[৫] টি-হাউস ট্রেক হওয়ায় এখানে অ্যালকোহলের প্রাপ্তি বেশ সুবিধাজনক। কিন্তু মনে রাখবেন, অতি উচ্চতায় অ্যালকোহল পান আপনার অতি উচ্চতাজনিত অসুস্থতা বৃদ্ধিই করবে। আপনি ট্রেকে দ্রুত অসুস্থ হয়ে যেতে পারেন, এমনকি আপনার জীবন সংশয়ে পড়তে পারে।


টোটকা

[১] ভারতীয় ভিসার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র যদি সান্দাকফু ট্রেকিং/দার্জিলিংই যদি উদ্দেশ্য হয় তাহলে বাংলাবান্ধা-ফুলবাড়ি পোর্ট দিয়ে ভিসা নেওয়াই উত্তম।

[২] সীমান্ত পারাপার করার সময় ট্র্যাভেল ট্যাক্সের ৫২০ টাকার সাথে অবশ্যই খুচরো কিছু টাকা রাখবেন।

[৩] নেমেই বাস কাউন্টারের নম্বরটা টুকে রাখবেন। যেন মানেভাঞ্জন থাকেই বাসের টিকেট বুকিং বা সিট রাখার কথা বলে রাখতে পারেন।

[৪] মোবাইল সিম নিতে চাইলে কয়েকটি পন্থা আছে। সীমান্ত পার করার সময় দালাল অথবা মানি এক্সচেঞ্জার থেকে বলে তাদের একটা সিম নিয়ে নেবেন, ইচ্ছেমত লোড করে ব্যবহার করে আবার ফেরার সময় ফেরত দিয়ে যাবেন।

শিলিগুড়ি থেকে পাসপোর্টের ফটোকপি আর ছবি দিয়ে সিম কিনে নিতে পারেন। ভারতে জোনাল ইস্যু আছে অর্থাৎ অন্য জোনের সিম হলে স্রেফ পাঁচ মিনিট ব্রাউজ আর কয়েকটা কলে আপনার পুরো ৪/৫০০ রুপি হাপিশ হয়ে যেতে পারে তাই সিম কিনার সময় দার্জিলিং জোনের কিনা জেনে নেবেন। মানেভাঞ্জান থেকে পুরো ট্রেকেই আপনি কোথাও নিরবিচ্ছিন্ন মোবাইল নেটওয়ার্ক পাবেন না আর ট্রেক করতে করতে সব সময় মোবাইলের টাওয়ার পাবেন কি পাবেন না এই চিন্তায় নিজেকে ব্যস্ত রেখে ট্রেকের মজা নষ্ট করবেন না। গাইডকে বলবেন কোথায় দাড়ালে নেটওয়ার্ক পাবো,  সেই দেখবেন বলে দিবে। আর যারা সিম কেনার ঝামেলায় যেতে চান না, তারা গাইডের মোবাইলে মানেভাঞ্জান থেকে লোড করে নিতে পারেন এবং সেটা নিজেরা ব্যবহার করলেন কল করে।

এয়ারটেল/ভোডাফোন/ ইউনিনর যেকোন জোনাল সিম কিনতে পারেন যেটা আসলে আপনার শিলিগুড়ি আর দার্জিলিংয়ে কাজে দিবে। সবচাইতে ভালো হচ্ছে আপনি যেই সিমই নেন না কেন গাইডের যদি দুটি সিম থাকে; সাধারণত থাকে একটা ভারতীয়, আরেকটি নেপালি এনসেল, ঐ দুইটি সিমেই কিছু টাকা লোড করে ট্রেকের শুরুতে ঐ নাম্বার থেকে বাংলাদেশে কথা বলে জানিয়ে রাখলেন, জরুরি বিষয় হলে যেন ঐ নম্বরে কল করে। বাস্তব অভিজ্ঞতা হচ্ছে সিম থাকলেই অবচেতনভাবে আপনি নেটওয়ার্ক খুঁজবেন আর নেটওয়ার্ক পাওয়া না গেলে শুধু শুধু আপনি দুশ্চিন্তায় ভুগবেন। এই দুশ্চিন্তা গাইডের মোবাইলের উপরে ছেড়ে দিন আর একান্তই না চাইলে ট্রেকের পূর্ণ মজা মোবাইলের নেটওয়ার্কের টেনশনের সাথে ভাগ করে নিন। তবে এয়ারটেলের নেটওয়ার্কটাই ভালো।

[৫] নেপালি গাইডরা খুব একটা ভালো হিন্দি বা ইংরেজি বলতে পারেন না। তাই ট্রেকের সকল খুঁটিনাটি বিষয় সম্পর্কে আপনাদের সঙ্গে গাইডের কথায় মিল হচ্ছে কিনা সেটা নিশ্চিত হয়ে নিবেন।

[৬] মানেভাঞ্জান যদি সন্ধ্যার ২ ঘণ্টা আগেই পৌঁছাতে পারেন এবং ৩০ মিনিটের ভিতরে পাসপোর্ট এন্ট্রি করে গাইড এসোসিয়েশন থেকে গাইড ম্যানেজ করতে পারেন, তাহলে ট্রেকিং শুরু করে দিতে পারেন। সেক্ষেত্রে চিত্রে গিয়ে রাতে থাকতে পারেন। মাত্র ৩/৪ কিলো রাস্তা পার হতে গিয়ে ট্রেকিংয়ের শুরুটা ভালোই হবে কারণ পুরো রাস্তাটাই আপ হিল, তবে পিচ মোড়ানো রাস্তা। কিছু সংক্ষিপ্ত ট্রেইল আছে যেগুলো মূল রাস্তার কৈনিক দূরত্বকে এড়িয়ে খাড়া উপরে উঠে যায়, সেগুলোও ব্যবহার করতে পারেন।

[৭] মানেভাঞ্জন পৌঁছাতে সন্ধ্যা হয়ে গেলে সবার আগে খাবারের দোকানগুলোতে গিয়ে রাতের খাবারের ব্যবস্থা করে নিবেন। কেননা, এখানকার খাবারের রেস্তোঁরাগুলো সন্ধ্যার পর পরই ঝাঁপি লাগিয়ে দেয়।

[৮] সম্ভব হলে জীবন চিত্রে, যিনি এলাকায় মাস্টারদা নামে সুপরিচিত তার সাথে একবার দেখা করে নিবেন। উনার সাথে গল্প করতে পারা এই ট্রেকের একটি বাড়তি পাওনা।

[৯] ট্রেকে লজগুলোতে রাতের খাবার মেনু হিসেবে চোখ বন্ধ করে খিচুরী আর অমলেট বলে দিতে পারেন।

[১০] যখনই হাতে সময় পাবেন তখন স্থানীয় কটেজ মালিক, রান্না ঘরের লোক এবং গাইডদের সাথে কথা বলে পুরো অঞ্চলটা সম্পর্কে জানার চেষ্টা করবেন। এতে আপনার ট্রেকের উদ্দেশ্য পূর্ণতা পাবে। আর গল্প শুনলেই গল্প লেখা যায়, তাই ট্রেক করে লিখে ফেলতে পারেন আপনার অভিজ্ঞতাও।

[১১]  মানেভাঞ্জান যাওয়ার সময় মিরিকে থেমে পাতলা উলের গ্লাভস কিনে নিতে পারেন, কারণ এই প্রকার গ্লাভস বাংলাদেশে পাওয়া যায় না। পাতলা উলের গ্লাভস দুটি নেয়ার সুবিধা হচ্ছে একটি পরে মোবাইল আর ক্যামেরা অপারেট করা যায়, কিন্ত মোটাটা পড়লে সমস্যা হতে পারে। বেশী ঠান্ডায় পাতলা একটির উপরে আরেকটা পরে নেওয়া যেতে পারে।


ভিডিওচিত্র

(Visited 1 times, 1 visits today)
মাহমুদ ফারুক
মাহমুদ ফারুক
পেশায় ফ্রিল্যান্স ওয়েব ডেভেলপার। সময় সুযোগ মিলে গেলেই পরিবারসহ বেড়িয়ে পড়েন পাহাড়ে। ছবি তোলা ও ঘুরে এসে ব্লগ লেখা তার অন্যতম শখ।

২৬ thoughts on “পথ পরিক্রমা: সান্দাকফু ট্রেক

    1. ১২টা থেকে ১২ঃ৩০ এ শেষ জিপ ছাড়ে।
      এর পরে রিজার্ভ করে যেতে হবে ভাড়া ১৫০০/২০০০ রুপি নিবে তবে আগে ড্রাভার কে জিজ্ঞেস করে নিবেন মানেভাঞ্জান চেনে কিনা কারন অনেক স্থানীয় ড্রাইভার মানেভাঞ্জান শুনে বিহ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে পারে।

  1. ২০১৬ এর ডিসেম্বরের শেষে দ্বিতীয়বারের মত সান্দাকফু-ফালুট ঘুরে আসলাম। প্রথম গিয়েছিলাম ২০০৮ এ। তখন পুরো পথ গাড়ি ছিলনা। শুধু সান্দাকফু পর্যন্ত যেত। এত বেশী গাড়িও ছিলনা। খরচ বেড়েছে অনেক। এখন সান্দাকফুর পর নেপালের দিকে আল নামক আরেকটি জায়গা ওপেন হয়েছে। ওখান থেকে ভিউ সান্দাকফু থেকে অনেক অনেক বেটার। আলের একদম সর্বোচ্চ বিন্দুতে দাড়ালে চারপাশে পুরোপুরি ৩৬০ ডিগ্রী ভিউ পাওয়া যায়। এভারেষ্ট, মাকালু আর লোৎসের ও ভিউ সেরকম আসে। আসলে সান্দাকফু ট্রেকের আসল সৌন্দর্য সান্দাকফু থেকে ফালুটের রাস্তা। ফালুট পর্যন্ত না গেলে এই ট্রেকের আসল সৌন্দর্য দেখা যাবেনা। প্রকৃতির কাছে একরাত কাটানোর জন্য গোর্খে দারুন জায়গা। শিরিখোলা ও দারুন এক রাত কাটানোর জন্য। এই ঝর্নাতে শীতের দুপুরে গোসল করেছিলাম। আপনার লেখা চমৎকার হয়েছে। নতুন ট্রেকারদের বলছি সান্দাকফু-ফালুট তুলনামুলক ভাবে সহজ ট্রেক হলেও বিপদ আছে। কিছুদিন আগে কলকাতার এক ছেলে একিউট মাউন্টেন সিকনেসে মারা গেছে। আমার যাবার কিছু আগে কলকাতার এক মহিলা ও মারা গেছেন। সকালে তাকে সান্দাকফুর কোন একটি টি-হাউসে মৃত পাওয়া যায়। সুতরাং গাড়িতে করে মানেভঞ্জন থেকে কেউ সরাসরি সান্দাকফু যাবেননা। বিপদ ঘটার সমুহ সম্ভাবনা আছে।

    1. ধন্যবাদ রাজিব ভাই, আমরা আপনার আরো অভিজ্ঞতার কথা শুনতে চাই, দয়া করে শেয়ার করবেন।
      আল নামের জায়গাটা এখন ভিউ পয়েন্ট হিসেবেই দেখা হয়।
      অনেকেই মানেভাঞ্জান এ রাত না কাটিয়ে আরো উপরে উঠে যায় যাতে তাদের প্রপার এক্লেমাটাইজেশন হয় না আবার অনেকেই এই ট্রেক এ ফ্ল্যাট সার্ফেসের মত আচরন করে অর্থাৎ ছুটিতে গিয়ে বিয়ার এলকোহল এবং যেই ব্র্যান্ডের সিগারেট খেয়ে অভ্যাস নেই সেগুলো খেয়ে নিজের অবস্থা আরো সঙ্গিন করে ফেলেন।
      আমার মনে হয় মানেভাঞ্জানে এ বিষয়ে একটা নোটিশ দেয়া বা এন্ট্রি পয়েন্টে কাউকে রাখা যে এই ব্যাপারে ট্রেকার দের সতর্ক করে দিবে।
      AMS নিয়ে আমার একটা লিখা আছে
      https://goo.gl/hglLJQ

    1. শুধু মেয়ে রা না ৮৩ বছরের বৃদ্ধ থেকে ৯ বছরের বাচ্চা কে ট্রেকিং করতে দেখেছি। আর আমার নিজের ১.৫ বছরের বাচ্চা কে নিয়ে গাড়ি দিয়ে তার মা সান্দাকফু উঠেছে, কোন সমস্যা হয়নি।
      আপনার প্রশ্নটা যদি এমন হয় যে মেয়েদের কোন সমস্যা হবে কিনা তাহলে বলতে হয় যে আমি আমার স্ত্রী কে মানেভাঞ্জান রেখে ট্রেক করে সান্দাকফু ঘুরে এসেছি, কোন সমস্যা হয়নি। এগুলো আন্তর্জাতিক ট্যুরিস্ট প্লেস, প্রতিদিন অনেক ইউরোপিয়ান আমেরিকান রা আসছে ট্রেক করতে, কাজেই নিরাপত্তার ব্যাপারে আপনি ৯৯.৯৯% ভাগ নিশ্চিত থাকতে পারেন।

  2. খুবি সুন্দর লেখা। মানেভঞ্জন থেকে গাইড নিতে হবে, তাই না? আর ট্রেকে ক্যাম্পিং করা যায় কি?

    1. ধন্যবাদ।
      গাইড নেয়া বাধ্যতামুলক।
      ক্যাম্পিং করা যায় তবে সেটেলমেন্টের আশেপাশে করতে দিবে কারন আমি এই পর্যন্ত কাউকে লজের এলাকার বাইরে বিরান মাঠে কাউকে ক্যাম্পিং করতে দেখিনি, যদ্দুর জানি এখানে ওপেন ফায়ার নিষিদ্ধ তবে লজের জায়গা গুলো ছাড়া। লজের মালিক কে কিছু ধরিয়ে দিলে আশে পাশে ক্যাম্পিং করতে পারবেন। কিন্ত সেই একই কথা অর্থাৎ ওপেন ফায়ার করতে পারবেন না তাই লজে গিয়ে খেতে হবে আর তাহলে বাদ রইল কি?

      1. তার মানে, মানেভাঞ্জন থেকেই গাইড নিতে হবে মাস্ট। প্রোটেবল ওভেনেও ব্যাবহার করা যাব না?

        1. গাইড মানেভাঞ্জান থেকে নিতেই হবে।
          যাই ব্যবহার করুন, ওপেন ফায়ার করা যাবে না, তবে আমি দেখেছি দার্জিলিং থেকে বড় বড় ট্যুরিং এজেন্সি ক্যাম্পিং ফ্যাসিলিটি দিয়ে বিদেশীদের ট্রেক করায় কিন্ত খোদ তাদেরকেও দেখেছি লজের পাশে ক্যাম্প করতে।
          লজের টয়লেট এবং খাবার নিয়ে থাকা আরকি।
          একটি ছবি দিচ্ছে যেখানে এটা লিখা আছে
          https://goo.gl/4Jtz07

          1. ধন্যবাদ ভাই, ফাইলান আইটেনারি আপনাকে দিব সম্পাদন লাগলে করে দিয়েন। তাইলে থাকলাম তাবুতে, রান্না করবো গ্যাস স্টোভে, বলা আছে ফায়ার উড নিষেধ। থাকা খাওয়া হইল। গাইড শেয়ারে নিতে হবে কোন গ্রুপের সাথে কি বলেন ভাই? আর লজের সামনেই তাবু পাতবো, প্রোয়জনিয় জিনিস পত্র নিতে পারলাম, কথা বলে দাম ঠিক করে নিলাম। রিম্বিক থেকে দার্জিলিং এসে, রাতে দার্জেলিং থেকে পরের দিন দুপুরের বা বিকেলের জীপে এন,জি,পি এসে রাতের ট্রেনে কলকাতা। আচ্ছা ভাই, দার্জিলিং থেকে এন,জি,পির শেষ জীপ কখন আর কতক্ষন লাগে?

          2. গরিব মানুষ তার উপরে লেখাপড়া শেষ হয়নি। হিসাব টা একটু বেশিই করতে হয়।

  3. ভাই ৬ জনের জন্য কি একটা জীপ পাওয়া যাবে? ? আর ভাই ওই স্টিকগুলা কিনব কোথা থেকে?? আর কাপড় কয়টা কেমন নিন এটা জানতে চাচ্ছিলাম??

  4. বাহ … অসাধারণ একটি লেখা পড়লাম ।। যেখান থেকে অনেক কিছু শিখলাম ও জানলাম ।। ধন্যবাদ …মাহমুদ ফারুক ভাই

  5. এত তথ্যবহুল লেখার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। এই নিয়ে ৫-৬ বার পড়লাম। আর আগ্রহ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিছু প্রশ্নের উত্তর জানা প্রয়োজন। এপ্রিলের দিকে তাপমাত্রা কেমন থাকে? অর্থাৎ ঠাণ্ডার জন্য কেমন প্রস্তুতি নিতে হবে? আপনার ছবিগুলো কোন মাসে তোলা?

    অগ্রীম ধন্যবাদ।

মন্তব্য করুন

*Please Be Cool About Captcha. It's Fun! :)