সমতলের শেরপা


খুলনার থেকে সমতল শহর আর হয় না। শহীদ হাদিস পার্কের কৃত্রিম পাহাড়টাই এখানকার সবচাইতে উঁচু পাহাড়। এর ৩০ ধাপ সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠতেই আমি হাঁপিয়ে যাই। খানিকক্ষণ বসে থেকে বিশ্রাম নিতে হয়, কিন্তু নিজেকে তেনজিং নোরগে মনে হয়। হাত ছড়িয়ে দিলেই ‘I am flying’ বা ‘ I’m the king’ টাইপের আনন্দ হয়। কিন্তু বেশিক্ষণ বসা যায় না। স্কুল পালানো ছেলে-মেয়েরাও একেকটা তেনজিং নোরগে! তাদের মনে আমার থেকেও বেশি আনন্দ।

ঘরে বসে ইবিসি, এবিসি, মোদক মুয়াল, তাজিং ডংয়ের রুট প্ল্যানগুলো ভেজে পুড়িয়ে ফেলি, কিন্তু যাওয়ার সুযোগ আর হয় না। আর ছোট ট্রেইলগুলো হেঁটে বড় বড় অভিজ্ঞতা জোগাড় করি। এগুলোর প্রত্যেকটাই আমার কাছে একেকটা আলাদা গল্প।

ফ্যামিলি ট্যুরে নেপালে যাওয়ার সময় আমরা আর মুহিত-নিশাত একই ফ্লাইটে গিয়েছিলাম। সংকোচে কোন কথা বলিনি শুধু দূর থেকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে ছিলাম। ওদের আমি কাস্টমসের লাইনটা দেখিয়ে বলি ‘আমাদের এই দিকে’ এতেই নিজেকে ওদের এভারেস্ট জয়ের অংশীদার মনে হয়। আমরা ৫ দিন খাঁটি ট্যুরিস্টের মত খাইদাই করে, বিভিন্ন পয়েন্ট ঘুরে, সারাংকোট চূড়া জয়(!) করে (আমার সাত বছরের ভাগ্নেও ওটা ‘সামিট’ করেছে!) দেশে ফিরে মাসখানেক পরে শুনি নিশাত আর মুহিত এভারেস্ট সামিট করেছে। একই যাত্রার কী ভিন্ন ফল!

পাহাড় এক অদ্ভুত জায়গা। এখানে মন ভালো থাকলেও যাওয়া যায়, মন খারাপ থাকলেও যাওয়া যায়। পাহাড় সবাইকে আপন করে নেয়। আমার ধারণা পাহাড় খুব লো ফ্রিকোয়েন্সিতে ডাকতে থাকে। হাজার মাইল দূরে বসে নিজের জীবনযাপনের মাঝে হঠাৎ হঠাৎ সেই ডাক শুনতে পাওয়া যায়। জীবনানন্দের বিপন্ন বিস্ময় তখন আমাদের রক্তে খেলা করে। রেকর্ড নয়, সবার আগে যাওয়া নয়, ভ্রমণ পোর্টফলিও ভারী করা নয়, কেউ বলেছে পারব না- তাকে দেখিয়ে দেবার উদ্দেশে  নয়, অন্য সবার থেকে বেশি বুঝি- তাও নয়, এমনি এমনি পাহাড়ের কাছে যেতে ইচ্ছে করে। নিজের অজান্তেই শরীর ফিট করতে ভোরবেলা জগিংয়ে বেরিয়ে যেতে হয়, মনে মনে খরচটা আলাদা করতে হয়, দুই-চার জন বন্ধুকে উসকে দিতে হয়… যত যা-ই হোক না কেন, একদিন নির্লিপ্ত ভাবে বেরিয়েও পড়তে হয়। ক্যামেরা থাকলে ভালো, না থাকলেও কিছু যায় আসে না। কারণ, জানা আছে যা দেখা যাবে তার কিছুই আলোকচিত্রে আসবে না।

হাঁটা শুরু করার সময় সবাই খুব উত্তেজিত থাকে। আস্তে আস্তে পাহাড়ের পথে হাঁটতে হাঁটতে একসময় সবাই যখন চুপ করে যায়, তখন নিজের ধুকপুকুনি, নিঃশ্বাসের শব্দ আর জুতার খসখস শুনতে পাওয়া যায়। পাখির ডানা ঝাপটানি বা বাতাসের শব্দও শুনতে পাওয়া যায়। যারা শুনেছে তারা বুঝতে পারে এমন করে এগুলো আগে কখনো শোনেনি সে।

হেঁটে ক্লান্ত হতে হতে হঠাৎ করে কোন এক বিশেষ মুহূর্তে পাহাড় তার শুদ্ধতম রূপটি আমাদের দেখিয়ে দেয়। এত ক্লান্তির মাঝেও সেই রূপটি না দেখে আমাদের উপায় থাকে না। নির্লজ্জের মতো হা করে তাকিয়ে থাকতে হয়। আমি যে তার ডাকটা শুনতে পেয়ে সব অডসগুলো ঠিক করে তাকে দেখতে এসেছি, এই মুহূর্তটাই তার রিওয়ার্ড হিসেবে পাহাড় ফিরিয়ে দেয়। যারা পায়ে হেঁটে পাহাড় দেখতে শিখেছে তারা জানে, পাহাড়কে যারা ভালবাসে, তাদের জন্যই পাহাড় তার সেরা সাজটি গোপন রাখে।


(Visited 1 times, 1 visits today)

মন্তব্য করুন

*Please Be Cool About Captcha. It's Fun! :)