ল্যাংটাং ডায়েরি

[উপর থেকে দেখা ল্যাংটাং লিরাং গ্লেসিয়ার]


কখনো যে পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে বেড়াবো, এটা কখনো মাথায় আসেনি। পাহাড়ে আবার ঘুরা যায় কি করে? কিন্তু ভালবাসার ব্যাপারটা অন্য রকম, মনের অজান্তেই ঘটে। প্রথমবার যখন বান্দরবান গিয়েছিলাম তখন নীলগিরি থেকে পাহাড় আর মেঘের খেলায় মুগ্ধ হয়ে যাই। তারপর কেওক্রাডং থেকে সাকা হাফং ঘুরে বেড়াই সবুজের বুকে প্রাণ ভরে। আর এভাবেই পাহাড়ের প্রতি ভালবাসাটা তৈরি হয়ে গেল। নিজের চোখে সাদা পাহাড় দেখব সে ইচ্ছেটার জন্ম সেখান থেকেই, সবুজ পাহাড় দেখতে দেখতে সাদার প্রতি অন্য একটা মোহ জন্ম নিয়েছিল মনের অজান্তেই।

পাহাড় জয় করার কিছু নেই, তাই পাহাড়ে যতদিন যাব তাকে ভালবেসেই যাব।

পরিকল্পনা

এটা অনেক দিনের প্ল্যান, হিমালয়কে খুব কাছ থেকে দেখব। প্রায় ৬-৭ মাস ধরে পরিকল্পনা করছি কোথায় যাওয়া যায়। শুরুতেই মাথায় আসে মারদি হিমালের (৫৫৮৭ মিটার ) নাম। ক্লাব কোয়েস্টের কারণে মারদি হিমাল নিয়ে একটা পরিকল্পনা করেছিলাম, ইচ্ছা ছিল সেই দিকেই যাবার। কিন্তু হিমালয় সম্পর্কে পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকার কারণে মারদি হিমালের পরিকল্পনাটা মানানসই মনে হল না। মাঝে একবার শুনেছিলাম রিয়াদ ভাইয়ের হিমালয়ে যাওয়ার ইচ্ছা আছে। তাই একদিন সময় করে তার সাথে কথা বললাম, সে অন্নপূর্ণা বেইজ ক্যাম্প ট্রেক করার কথা বলল। তার কথা মনে না ধরলেও কেন জানি রাজি হয়ে গেলাম, যেহেতু দুই জনের অফিসের ছুটাছাটা একই সময়ে, এমন কি আমরা একসাথে অনেক ট্রেকিং করেছি। তাই রিয়াদ ভাই আমার সেরা টিমমেট হতে পারে এই ভেবে রাজি হয়ে গেলাম। শুরু করে দিলাম অন্নপূর্ণা বেইজ ক্যাম্প নিয়ে ইন্টারনেটে ঘাঁটাঘাঁটি। যখনই আমি কিছু জানতাম তা রিয়াদ ভাইকে জানাতাম। আমরা দুজনেই একটা ব্যাপার মাথায় রাখতাম, ট্রিপে যাবার আগের প্রস্তুতিটাই মুখ্য বিষয়। একটি ভাল প্রস্তুতির উপর নির্ভর করে একটা টিমের সাফল্য।

প্ল্যান তো করে ফেললাম প্রায় ১৪ দিনের, কিন্তু ছুটি কি করে নিব সেটা নিয়ে বিপাকে পড়ে গেলাম। যেহেতু ঈদে যাবার প্ল্যান করেছি সেহেতু আমরা ঈদের ছুটি পাব ৮ দিন, আমাদের আরো ৭ দিনের ছুটি নিতে হবে। এই ভেবেই ক্লান্ত হয়ে পরতাম ঈদের ছুটির সাথে আরো ৭ দিন ছুটির কথা কি করে বলি।

সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে একদিন বসের কাছে বলেই ফেললাম আমার ইচ্ছার কথা, খুব সহজেই রাজি হয়ে গেল বস। ছুটি দিবে বলে প্রতিশ্রুতিও দিলেন।  বসের অনুমতি পেয়ে বিমান টিকিট করার সাহস ফিরে পেলাম। অন্যদিকে রিয়াদ ভাইও সব ম্যানেজ করে ফেলেছেন। তখন বুঝলাম ইচ্ছা থাকলেই উপায় হয়, কথাটা কতটা তাৎপর্যপূর্ণ।

আমরা ট্রিপে যাবার প্রায় মাসখানেক আগে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে টিকেট কাটি এক বড় ভাইয়ের (সাব্বির ভাই) কল্যাণে। সাব্বির ভাই ট্র্যাভেল এজেন্সিতে জব করে, সেই সুবাদে বিশাল একটা সু্যোগ পেলাম, ট্রিপে থেকে ফেরার পর বিমানের টিকেটের টাকা দিলেও নাকি চলবে। যেহেতু বিমানের টিকেট কাটা শেষ, তাই এবার মনে একটা অন্য রকম ভাল লাগা কাজ করছে, স্বচক্ষে দেখব সাদা বরফে আচ্ছাদিত হিমালয়। একদিন দুপুরের দিকে রিয়াদ ভাই ফোন দিল, কথা যা হল তা অনেকটা এরকম-

– সজীব, আছ কিরাম?
– ভাই আছি প্যারার উপরে।
– তুমি থাকো তোমার প্যারা নিয়ে, কাজের কথা কই।
~ জি, ভাই বলেন।
– আমি তো প্ল্যান পরিবর্তন করতে চাই আমাদের ট্রিপের, তুমি কি বল?
– প্ল্যান পরিবর্তন করে যাবেনটা কই?
– ল্যাংটাং আর গোসাইকুণ্ড।
– ভাই এই প্ল্যানটা আমার মনে ধরেছে, আমি রাজি।
– তাহলে সব বাদ দিয়ে এখন এই সব নিয়েই ঘাঁটাঘাঁটি কর। প্ল্যান এটাই ফিক্সড।
– ওকে ভাই, আর ধন্যবাদ ভাল একটা সিদ্ধান্তের জন্য।

এই বলে আমাদের কথা শেষ হয়, আমি বেশ খুশি প্ল্যান পরিবর্তন হওয়াতে, হাতে সময় ২৪-২৫ দিনের মত আছে, ল্যাংটাং আর গোসাইকুন্ড ট্রেক নিয়ে নেটে যা পেলাম সব নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করে দিলাম। ঈদের ছুটি মিলল ১০ সেপ্টেম্বর  থেকে, আমাদের যাত্রা শুরু হবে ১১ তারিখ। হাতে একদিন সময় পাওয়া গেল একটু নিজেকে তৈরি করার জন্য।

বার বার ব্যাগ গুছাই, আবার খুলে দেখি সব ঠিক তো! এভাবেই কাটতে থাকে আগের রাতটা। অনেক দেরি করে ঘুমাতে গেলাম সেদিন। উত্তেজনায় কেন জানি ঘুম আসছিল না। খুব ভোরে উঠে গেলাম। সব কিছুই রাতে গুছিয়ে রেখেছিলাম তাই ঝটপট তৈরি হয়ে ব্যাগ কাঁধে তুলে বের হয়ে গেলাম। আমাদের এগিয়ে দেয়ার জন্য মুসা যাচ্ছে আমাদের সাথে। ৭ টায় নারায়ণগঞ্জ থেকে রওনা দিয়ে এয়ারপোর্ট চলে গেলাম ৮:১০ মিনিটের দিকে। হালকা নাস্তা করে নিলাম এয়ারপোর্টের বাইরের একটা হোটেল থেকে। ৮:৫০ মিনিটের দিকে মুসা আমাদের বিদায় দিয়ে চলে গেল। আমরা এয়ারপোর্টে ঢুকে যাই। চেক ইন করার জন্য বিমান বাংলাদেশের কাউন্টারে লাইনে দাঁড়িয়ে গেলাম। লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেই ইমিগ্রেশন ফরম পূরণ করে নিলাম।

আমাদের ব্যাগগুলো ওজন মেশিনে তোলা হল,  আমারটা ১৭ কেজি আর রিয়াদ ভাইয়ের ব্যাগ ১৯ কেজি। ব্যাগ চলে গেলো তার গন্তব্যে। আমাদের বোর্ডিং পাস দেওয়া হল। বোর্ডিং পাস নিয়ে ইমিগ্রেশনে ঢুকে পরলাম। ইমিগ্রেশন শেষ করতেই মুন্না ডং ভাইয়ের সাথে দেখা। তিনি এয়ারপোর্টে জব করেন। মুন্না ভাই আমাদের এক কফি শপে নিয়ে গেলেন। কফি পান করতে করতে কিছু সময়ের আড্ডা হয়ে গেল।

আমাদের বিমানে উঠার জন্য ডাক আসল, আমরা  চলে গেলাম চেক পয়েন্টে। সেখান থেকে পুনরায় তল্লাসি শেষে আমরা ছোট এক গাড়িতে করে বিমানের সামনে পৌঁছাই। আমরা আমাদের সিট প্ল্যান অনুযায়ী বসি। রিয়াদ ভাই জানালার পাশে আর তার পাশেই আমার সিট। জীবনে প্রথম বিমানে চড়তে যাচ্ছি। হালকা ভয় ভয় লাগছিল সাথে উত্তেজনাও। বিমানে নাকি উপরের দিকে উঠার সময় কেমন এক ঝাঁকুনি দেয়।


যাত্রার শুরুতেই বৃষ্টির দেখা , ঢাকা বিমান বন্দর


সকাল ১১:৪৩ মিনিটের দিকে সব নির্দেশনা শেষ করে বিমান রানওয়েতে ছুটতে শুরু করল। বেশ কিছুক্ষণ বিমান রানওয়েতে ছুটাছুটির পর উড়তে শুরু করল, এক ধাক্কায়  সোজা আমরা মেঘের মধ্যে ঢুকে গেলাম। মেঘের সাথে যখন বিমান ধাক্কা খাচ্ছিল ভেতরটা কেমন জানি কামড় দিয়ে উঠছিল। কিছুক্ষণ বাদে ব্যাপারটা সাবলীল হয়ে গেল। বেশ উপভোগ করতে লাগলাম প্রথম বিমান ভ্রমণ।

বিমান থেকে নামার কিছুক্ষণ আগে একটা ফর্ম দেয়া হয়, সেটা পূরণ করে ফেললাম বিমানে বসেই। তাতে করে ইমিগ্রেশনের কাজটা দ্রুত হয়ে যাবে। ১ ঘণ্টা ১০ মিনিটের মধ্যে আমরা শাহাজালাল বিমান বন্দর থেকে ত্রিভুবন বিমানবন্দর চলে আসলাম। বিমানবন্দরের যাবতীয় ফরমালিটিস শেষ করে আমরা ১০০ ডলার সেখান থেকে নেপালি রুপি করে একটা ট্যাক্সিতে করে চলে যাই নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডে। এয়ারপোর্ট থেকে আমাদের সময় লাগল ২০-২৫ মিনিটের মত যেতে।


বিমান থেকে নেপাল শহর


লালচে পুরাতন ভবনটি দেখতে বেশ সুন্দর, বেশ ঝকঝকে আর পরিচ্ছন্ন। বিশাল ফটক দিয়ে ঢুকেই হাতের বাম পাশে একটা বুথ সেখানে গিয়ে আমরা যেই রুটে ট্রেক করব তার নাম বললাম। বুথে ছিলেন একজন ভদ্র মহিলা। সে আমাদের সকল ধরনের তথ্য দিয়ে সাহায্য করল। সার্কভুক্ত দেশের বাসিন্দা হওয়াতে আমাদের পারমিট ফি ৬০০ রুপি। আমরা ট্রেকিং পারমিট পেয়ে গেলাম, কিন্তু ল্যাংটাং ট্রেক করার জন্য আমাদের সেই অঞ্চলের একটা নির্দিষ্ট ফি প্রদান করতে হবে। কিন্তু যেই বুথ থেকে ল্যাংটাংয়ের পারমিশন নিব সেটা দুইটার মধ্যে বন্ধ হয়ে যাবার কারণে পারমিশন নেওয়া গেল না। কিন্তু যার কাছ থেকে আমরা ট্রেকিং পারমিট নিয়েছিলাম, তিনি বললেন আমাদের হতাশ হবার কিছু নেই। আমরা ল্যাংটাং যাবার পথেই আর্মি চেক পয়েন্ট থেকে পারমিশন নিতে পারব। এ জন্য আমাদের খরচ হবে জন প্রতি ১৮০০ নেপালি রুপি। ট্রেকিং পারমিট নিয়ে আমরা আরেকটা ট্যাক্সিতে করে থামেল চলে যাই।

থামেল কাহিনী

আমরা বিকেলের দিকে থামেল পৌঁছাই, আমাদের ট্যাক্সি ড্রাইভার আমাদের মোটামুটি বাজেটের মধ্যে একটা হোটেল ঠিক করে দেন। এক রাত থাকার জন্য আমরা ১২০০ রুপি দিলাম। সবাই গাড়ি থেকে ব্যাগ নিয়ে নেমে সরাসরি রুমে চলে যাই। দ্রুত ফ্রেশ হয়ে আমরা আবার বের হয়ে পড়ি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার জন্য।

নেপালের আকাশ তখন কেমন জানি মেঘাচ্ছন্ন, অল্প অল্প বৃষ্টি হচ্ছে কিন্তু খুব বেশি না। আস্তে আস্তে সন্ধ্যা নেমে এলো থামেলের আকাশে, কিছুক্ষণ আগের অল্প বৃষ্টি এখন যেন মুষলধারে ঝরছে। মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল। নেপালে এসে বৃষ্টি দেখতে হবে মনটা কেন জানি কোনভাবেই মেনে নিতে পারছে না। একটা দোকানের ছাউনির নিচেই কেটে গেল প্রায় এক ঘণ্টা, বৃষ্টি থামার কোন লক্ষণ না দেখে রেইন সেল্টার আর ছাতা কিনে আমি আর রিয়াদ ভাই বেড় হয়ে গেলাম থামেল শহরটা দেখার জন্য।

রাস্তার দু-পাশেই হরেক রকমের দোকান, তবে বেশির ভাগ দোকানগুলোই ট্রেকিং গিয়ার শপ। আমরা দুজনের জন্য ট্রেকিং পোল নিয়ে নিলাম দুই জোড়া, আরো টুকিটাকি কিছু কেনাকাটা করে একটা রেষ্টুরেন্টে ডিনার সেরে রুমে ফিরে আসলাম। কাল সকালেই আমরা ল্যাংটাংয়ের উদ্দেশে রওনা দিব, এ জন্য সায়াফ্রুবেসি যাবার বাসের টিকিট করতে হবে, তাই আমরা একটা ট্র্যাভেলিং এজেন্সির কাছে থেকে দুইটা টিকিট সংগ্রহ করি ডিলাক্স বাসের, যার ভাড়া ৮০০ করে পড়ল। আগামীকাল সকাল ৮ টায় আমাদের বাস। তাই রাতে শুতে যাবার আগে ব্যাগ গুছিয়ে রাখলাম, যেন সকালে ঘুম ভাঙ্গতেই আমরা বের হয়ে যেতে পারি। খুব সকালেই ঘুম থেকে উঠে পড়লাম।

একটা ট্যাক্সিতে করে মাছাপোখারি বাস স্ট্যান্ডে চলে আসলাম, মাছাপোখারি থেকেই স্যাফ্রুবেসির বাস ছাড়বে। আমরা বাস কাউন্টারে এসেছি প্রায় এক ঘণ্টা আগে। খুবই ঘিঞ্জি একটা জায়গায় বাস কাউন্টার, তার পাসেই কাঁচা বাজার। সকাল বেলাতেই এখানে অনেক লোকের ভিড়। সবাই অনেক ব্যস্ত, কেউ পূজা দেবার জন্য ফুল কিনে নিয়ে যাচ্ছে, কেওবা নিত্যদিনের খাবার। হাঁটাহাঁটি শেষ করে আমি আর রিয়াদ ভাই একটা চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থেকেই চা পান করলাম। পঁচিশ রুপি ছিল প্রতি কাপ চায়ের মূল্য। চা শেষ করেই বাসে উঠি। বলে রাখা ভাল, গতকাল আমাদের অগ্রিম টিকিট কেনার কোন দরকার ছিল না। আমরা সাধারণ দামের থেকে দুইশত রুপি বেশি দিয়ে এজেন্সির মাধম্যে টিকিট কাটি। এখানে তিন ধরনের বাস সার্ভিস রয়েছে ১) ডিলাক্স, ২) সুপার, ৩) লোকাল।  ডিলাক্স বাসগুলো ভাল সার্ভিস দিয়ে থাকে, তারা সাধারণত বিরতিহীন সার্ভিস দেয়, পথে একটা যাত্রা বিরতি দেওয়া হয়। বাসের মধ্যে ওয়াইফাই ব্যবস্থা আছে, ভাড়া ৬০০ রুপি। সুপার বাসগুলো সেমি লোকাল সার্ভিস দিয়ে থাকে, যাত্রি সেবা খুব একটা সুখকর না। এ সার্ভিসে যেতে হলে ভাড়া পড়বে ৪০০ রুপি। লোকাল বাসের কথা না বলাই ভাল কেউ যদি ট্রেকিং করতে যান তবে ভুলেও সেদিকে নজর না দেওয়া ভাল। তাই লোকাল বাস নিয়ে কিছু বললাম না। ২৫০ রুপি ভাড়া পড়বে কিন্তু কখন যে তার গন্তব্য শেষ হবে তা জানা বড়ই দুষ্কর।

যাত্রা শুরু

সকাল ৮ টায় বাস ছাড়ল। আমাদের সাথে আরো দুই একটা বিদেশি গ্রুপ আছে। গোসাইকুন্ড যাবে একটা গ্রুপ, আরেক গ্রুপ ল্যাংটাং। রাস্তার বেহাল অবস্থা শরীরের বারোটা বাজিয়ে দিল। সামনের সিটে বসার কারণে কিছুটা রেহায় মিলেছিল। আর নেপালি গান বাজিয়ে গিয়েছিল গোটা রাস্তাটা কানের অবস্থাও খারাপ হয়ে গেছে। আমাদের পৌঁছানোর কথা ৩/৪ টার দিকে কিন্তু আমরা সায়াফ্রুবেসি পৌঁছাই সন্ধ্যার একটু আগে। সায়াফ্রুবেসি পৌঁছানোর আগে ধুনচেতে আমরা আমাদের ট্রেকিং পারমিট নেই আর্মিদের কাছ থেকে ১৮০০ টাকায়। সায়াফ্রুবেসি নেমেই আমরা রাতে থাকার জন্য একটা গেস্ট হাউজে উঠি।

ট্রেকিং পর্ব ল্যাংটাং

ঈদের দিন সকাল, যেখানে নিজ দেশের সবাই কোরবানি নিয়ে ব্যস্ত, আমরা তখন আমাদের ট্রিপের প্রথম দিনের ট্রেকিং শুরু করব। আগের দিন প্রায় সাড়ে নয় ঘণ্টা বাস ভ্রমণ করে আমরা সায়াফ্রুবেসি আসি। বাস থেকে নেমেই রাতে থাকার জন্য একটা রুম ঠিক করি। সকাল ৮ টায় বেড়িয়ে পড়ি ট্রেকিং করার জন্য। আমাদের মূল প্ল্যান ছিল আগে ল্যাংটাং, পরে গোসাইকুন্ডের দিকে। সেই হিসাবেই আমরা ল্যাংটাংয়ের  দিকে রওনা দেই।



পাহাড়ের সংযোগ সেতু , কাইঞ্জিং গোম্বা ভিলেজ



প্রথমে আমরা পুলিশ চেকপোস্টে এন্ট্রি করিয়ে সামনের দিকে হাঁটা শুরু করলাম। কিছুদূর যাবার পর আমরা ত্রিশুলি নদীর উপর ঝুলন্ত সেতু পার হলাম। হেলতে দুলতে আমরা ব্রিজ পার হয়ে ডানে চলে গেলাম। ডানের রাস্তা ধরে কিছুদূর সামনে এগিয়ে আরো একটা ব্রিজ পাই, তার সামনে লেখা বা-দিকে ল্যাংটাং আর ডানে থুলু সায়াব্রু। আমরা ল্যাংটাংয়ের দিকে যেতে থাকি। একজন আমাদের জানাল ভূমিকম্প আর পাহাড় ধ্বসে এই পথ এখন আর ব্যবহার করা যায় না। আমাদের নাকি ল্যাংটাং যেতে হলে থুলু সায়াব্রু হয়ে যেতে হবে। আমরা সেই কথা বিশ্বাস করে জিপিএসের দিকে না তাকিয়ে থুলু সায়াব্রুর পথে হাঁটা দেই। প্রায় তিন ঘণ্টা হাঁটার পর আমাদের সামনে একটা গাইড আর স্প্যানিস টিম দেখতে পাই। তারা গোসাইকুন্ডের দিকে যাবে। তারা আমাদের কথা শুনে বলে উঠল আমরা ভুল রাস্তায় চলে আসছি।  তাদের মুখে যখন শুনলাম আমরা ভুল রাস্তায়, ক্ষণিকের জন্য যেন অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম, কিন্তু বিচলিত হলাম না। পিছনে ফিরে গেলে সারা দিন শেষ। আমি আর রিয়াদ ভাই চিন্তা করে ঠিক করলাম যা হবার হবে সামনেই আগাব। যেই গ্রাম পাব সামনে সেখানে গিয়েই ঠিক করব কি করা যায়। প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা পর আমরা থুলু সায়াব্রুতে পৌঁছে যাই। সেখানে গিয়ে ছোট একটা ঘরে বিশ্রাম নেই। আর চিন্তা করলাম আমরা যেই রাস্তার ম্যাপ করে নিয়ে এসেছি তা হল দুই বছর আগের যার সাথে বর্তমান রুটের মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ হল ভূমিকম্প আর ল্যান্ড স্লাইডের জন্য আগের রাস্তা ভেঙ্গে যাওয়াতে এখন ল্যাংটাংয়ের জন্য পাহাড়ের উপর দিয়ে নতুন রাস্তা করা হয়েছে। আর আমরা এগুচ্ছিলাম ত্রিশুলি নদী ধরে, যা কিনা ল্যাংটাং যাবার পূর্বের রাস্তা ছিল।

আমরা দুজন অল্প সময়ের জন্য কথা বললাম, নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া ভাল থাকার কারণে খুব দ্রুত আমরা একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম। যেহেতু পাহাড়ি পথ তাই কোন উপায় হয়তো পেয়ে যাব সঠিক রাস্তায় চলে যাবার। তাই আমাদের প্ল্যানে আজ যেই পথটুকু যাবার কথা সেই টুকুই যাব সেটা যে করেই হোক, হতে পারে সেটা কারো সাহায্য নিয়ে।


পথ হাড়িয়ে ম্যাপ দেখা, থুলু সায়াব্রুবেসি


মনের মধ্যে অজানা এক আশঙ্কা নিয়ে হাঁটছি, কখন কি করে সঠিক পথ খুঁজে পেতে পারি। এভাবেই চলতে থাকি, একবার ব্যাগ থেকে ম্যাপ বের করে দেখি আমাদের সামনে কোন গ্রাম আছে কিনা। ম্যাপ থেকে খুঁজে পেলাম থুলু সায়াফ্রুবেসির নাম, তখন আবার জিপিএস বের করি আমাদের অবস্থান থেকে থুলুসায়াফ্রুবেসির দূরুত্ব দেখার জন্য। অবস্থান বলছে আরো ১ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিলেই চলে যাব থুলুসায়াফ্রুবেসি। তাই আর বিশ্রাম না নিয়ে তাড়াতাড়ি করে সামনে এগিয়ে যাচ্ছি। অনেকক্ষণ পর কিছু লোক জনকে উপর থেকে নিচের দিকে নেমে আসতে দেখে বুঝে গেলাম গ্রামটা হয়তো কাছেই, তাদের দেখেই বললাম, ‘দাদা নামাস্তে, ইহা সে থুলু কিতনা দূর হে?’ উত্তর দিল ‘দু-তিন মিনিট লাগেগি।’ আরো মিনিট দশেক হাঁটার পর দেখা মিলল থুলু সায়াফ্রুবেসি। আমরা ছোট একটি দোকানে গিয়ে বসলাম, একজন চল্লিশোর্ধ বয়সের ছিপছিপে গড়নের লোক বসা ছিল দোকানে, সে আমরা বসার সাথে সাথেই পানি দিলেন, আমরা সেই পানি পান করতে করতেই তাকে আমাদের সমস্যার কথা জানালাম। তাকে বললাম জানাশোনা এমন কেউ থাকলে যেন আজকের পথটুকু সাহায্যের জন্য কাউকে আমাদের সাথে দেওয়া হয়। যার সাথে কথা হচ্ছিলো তার নাম পিসাং। তিনি তার দোকান চালায় আর মাঝে মাঝে গাইডের কাজ করে। যখন শুনলাম সে গাইডের পেশায় কাজ করেছে তখন তাকেই বললাম আমাদের সাথে যাবে কিনা, সে কোন কথা ছাড়াই যেতে রাজি হয়ে গেল। অতঃপর একজন পথ নির্দেশক ঠিক করলাম। সে বলল আমাদের আজকের গন্তব্যে যেতে প্রায় ছয় ঘণ্টা সময় লাগবে। আমরা তাতেই রাজি হয়ে তাড়াতাড়ি হাঁটা শুরু করলাম, তখন সময় দুপুর ১:৪০।


থুলো সায়াফ্রুবেসি গ্রাম


থুলু সায়াব্রুর উচ্চতা প্রায় ২২১৯ মিটার, আমরা ১৪৬০ মিটার উচ্চতার সায়াব্রুবেসি থেকে দিনের ট্রেকিং শুরু করি। আর আমাদের লক্ষ্য ছিল লামাতে (২৫২০ মিটার) পৌঁছানো। আমরা থুলু সায়াব্রু থেকে হাঁটা শুরু করলাম। সাথে এবার একজন গাইড পাওয়াতে কিছুটা শান্তি লাগছে এবার। ঘন জংগল আর কর্দমাক্ত উঁচু নিচু পথ বেয়ে ছুটে চলেছি গন্তব্যের দিকে। কিছুক্ষণ পর চোখের সামনে পড়ল আরো একটা নদী নাম তার ধুপচে খোলা। এবার আমরা ধুপচে খোলার উপরের ঝুলন্ত ব্রীজ পার হয়ে কিছুদূর এগিয়ে বিশ্রাম নেয়ার জন্য বসে পড়লাম। মিনিট পাঁচেক বিশ্রামের পর আবার হাঁটা শুরু, কাঁধে আছে ২০ কেজি ওজনের ব্যাকপ্যাক। সারা দিন হাঁটতে হাঁটতে অনেকটাই ক্লান্ত, মন বলে আর কত! কিন্তু শরীর আর মনকে বোকা বানিয়ে এক দিকেই এগিয়ে নেওয়ার জন্য বারবার মনোনিবেশ করতে থাকি। বিকাল ৫:৪০ মিনিটের দিকে ব্যাম্বুতে (১৯৮০ মিটার) পৌঁছে যাই। পাহাড় ধ্বস আর ভূমিকম্পের পর মানুষের যাতায়াত না থাকায় এই রুটের অনেক লজ আর হোটেলগুলো এখন বন্ধ অবস্থায় পরে আছে। তাই আমরা চাইলেই যে কোন জায়গাতে নিজেদের থাকার অবস্থান ঠিক করতে পারছি না। এ দিকে আবার দিনের আলো নিভে আসছে। কনকনে শীতে শরীর আস্তে আস্তে নিস্তেজ হতে চলছে। কি করব বুঝতে পারছি না।

রিয়াদ ভাই, আমি আর পিসাং ঠিক করলাম আমাদের দিনের আলো থাকতে থাকতে খুব দ্রুত এগিয়ে যেতে হবে। আমাদের যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আপার রিমচে যেতে হবে। আর রিমচে যাবার রাস্তা আরো ভয়াবহ। পাহাড় ধ্বসের কারণে রাস্তাগুলো প্রায় ৪৫-৫০ ডিগ্রি বেঁকে আছে। যা পার হওয়াটা সত্যিকার অর্থেই আমাদের জন্য একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ। আমরা ব্যাম্বু থেকে সবাই তাড়াতাড়ি ছুটছি। এই তাড়াতাড়ি ছোটার ফলে আমরা রিয়াদ ভাইকে অনেক পেছনে ফেলে আসি। আমি আর পিসাং প্রায় ১০ মিনিট অপেক্ষা করি। ততক্ষণে ঘন জঙ্গলে শুনশান নিরবতা চলে আসছে আর শীতে শরীর থরথর করে কাঁপুনি দিয়ে উঠছে। যখন প্রায় ২০ মিনিট হয়ে গেল রিয়াদ ভাই এর খবর পাচ্ছি না, তখন আমরা আবিষ্কার করলাম আমরা তাকে হারিয়ে ফেলেছি। এটা ভেবে চিৎকার শুরু করে দিলাম রিয়াদ ভাই বলে। কোন সাড়া পাওয়া গেল না। ভয়ে গলা বুক শুকিয়ে আসছে। সাথে সাথে পিসাংকে খোঁজার জন্য পাঠাই আর ব্যাগগুলো সামনে নিয়ে বসে থাকি। অনবরত চিৎকার করেই যাচ্ছি। পুরো জংগল এবার ঘন অন্ধকারে ঢেকে গেল। অতপর প্রায় ৫০ মিনিট পর রিয়াদ ভাইসহ পিসাংকে দেখে মনে হল তখনি কিছু জয় করে ফেললাম। রিয়াদ ভাই খুবই বিরক্ত হলেন আমাদের উপর। তখন তার কথার উপর কিছু না বলাটাই ভাল। এ জন্য চুপ মেরে গেলাম। এবার সবাই ব্যাগ থেকে টর্চ যুক্ত ম্যাচ লাইট বের করলাম। সবাই সেই লাইটের আলোতে এগিয়ে যাচ্ছি। আর সেই সব রাস্তা যার কথা পিসাং শুরুতেই বলেছিল তার ভয়াবহতা দেখে চোখ আকাশে উঠার উপক্রম। যাই হোক এখন আর এতো কিছু ভাবার সময় নেই। আমাদের সামান্য ক্ষমতা ব্যবহার করেই অসামান্য কিছু করতে হবে। আমরা কিছুক্ষণ পরপর এমন সব পথ অতিক্রম করে যাচ্ছি যার ভয়াবহতা দেখে আর আল্লাহর নাম স্মরণ করতে থাকি। রিয়াদ ভাইয়ের শরীর আর এগুচ্ছে না, এমন কি আমিও আর শরীরের সাথে যুদ্ধ করে পেরে উঠছি না। আমরা দুই এক মিনিটের বিশ্রাম নিলাম। সেই দুই এক মিনিটেই রিয়াদ ভাই ঘুমের ঘোরে চলে গেছে। এই ব্যাপারটা আমাকে আরো চিন্তিত করে তুলল। আমি এবার পিসাংকে বলি আর কতক্ষণ? ও বলল স্লোলি স্লোলি ওয়াক ২০ মিনিট পসিবল। আমরা আরো প্রায় ১৫ মিনিট হাঁটার পর গন্তব্যে চলে আসি (আপার রিমচে ২৪৫০ মিটার)। রাত তখন প্রায় ৯:৪০ মিনিট।

আমরা আপার রিমচে লজে গিয়ে দেখি সবগুলা দরজা বন্ধ। অনেক ডাকাডাকি করার পর ঘরের দরজা খুলছে না। প্রায় ৫-৭ মিনিট পর দরজা খুলে লজের মালিক চমকে গেলেন, আমাদের এই অবস্থা দেখে, আমাদের পানি পান করতে দিলেন। আমাদের দেখে আতকে উঠার কারণ এতো রাতে সে আর কোন ট্রেকিং টিমকে কখনো লজে আসতে দেখে নাই। আমাদের সাথে সাথে একটা কামরার চাবি দিয়ে দেওয়া হল। কনকনে শীতে জমে যাবার মত অবস্থা, সেই অবস্থায় চোখে মুখে পানির ঝাপটা দিয়ে রুমে গিয়ে কম্বল পেঁচিয়ে শুয়ে পরলাম। এভাবেই এক ভয়াবহ দিন আর রাত পার করে অবশেষে ক্লান্তিময় শরীরটাকে বিছানায় বালিশের সাথে আলিঙ্গন করে নিলাম। শেষ কবে এমন ঘুমিয়েছি ভুলেই গিয়েছিলাম। লোকালয়ের কোলাহল থেকে দূরে বহু দূরে ঘন জঙ্গলের মাঝে একটা ঘরের বিছানায় শুয়ে, জীবনের সবচাইতে এক উপভোগ্য রাত কাটালাম। যখন সারা দিন হাঁটতে হাঁটতে রাত নেমে আসল, তখনও খুঁজে পেলাম আশ্রয় নেবার ঠিকানা। সেই রাতে একবারও ঘুম ভাঙ্গেনি।


সবুজের মেঘ, আপার রিমচের একটি সকাল


পাহাড়ে খুব তাড়াতাড়ি সন্ধ্যা নেমে আসে, ঠিক তেমনি এখানে ভোর হয় আরো মিষ্টি আমেজে। পাখির কিচির মিচির, কচি পাতার আদর সোহাগ মাখা চেহারা। সব মিলিয়ে এক মায়াবি সকাল উপহার হিসেবে হাজির থাকবে। পাহাড়ে চাইলেও অনেক বেলা পর্যন্ত ঘুমানো সম্ভব হয় না। কি যেন এক মায়াবি টানে মনের সাথে গেথে থাকে। কাল রাতে হালকা বৃষ্টি হয়েছিল সকাল বেলাতেও তার আমেজ রয়েছে যা এখনো কাটেনি। ঘুম ভেঙ্গে দেখি পাহাড়গুলো আধো আধো কুয়াশার চাদরে ঢাকা পরে আছে, দূরে বহু দূরে কোন এক পাহাড়ের কোণে সূর্য উঁকি দিয়ে আছে। এমন সব দৃশ্যাবলী চোখের সামনে দেখে বুঝতে আর বাকি রইল না আজকের দিনটা হয়ত আমাদের ভাল যাবে। ঝটপট তৈরি হয়ে নিলাম, দ্বিতীয় দিনের ট্রেক শুরু করতে হবে। আজ গন্তব্যে ঠিক করলাম অনেকটা এরকম,

আপার রিমচে (২৪৮৯)- লামা (২৪৮০)- রিভার সাইড (২৭৭২)- উডল্যান্ড (২৭৮৮)- থাংসিয়াপ (৩১৯৫)- ঘোরাতাবেলা (৩০২০)- চামকি (৩২৫০)- গোম্বা-ল্যাংটাং।

ব্যাকপ্যাক কাঁধে নিয়ে শুরু হল দিনের প্রথম প্রহরের মত পথ চলা। পাশে বয়ে চলছে কলকল করে ত্রিশুলী নদীর পানি, আর আমরা ছুটে চলছি আমাদের গন্তব্যের দিকে। মৃদু বাতাস শরীরে এক অন্যরকম ভাল লাগার অনূভুতির যোগান দিচ্ছে। এই রকম পরিবেশে চিৎকার দিয়ে বলতে ইচ্ছে করে ‘বিশ্ব জোড়া পাঠশালা মোর সবার আমি ছাত্র।’ এই কথাটার মানে শুধু তারাই বুঝবে যারা নতুন কোন শহরে অচেনা পরিবেশে রাত কাটিয়ে দিব্বি বলে দিবে ‘এইতো আমার বিশ্ব, এটাই আমার শহর।’ আসলে অচেনা মানুষ আর অপরিচিত পরিবেশটাকে নিজের করে পাওয়ার মাঝেই অনেক গভীর সুখ লুকিয়ে থাকে।


ঘোরাতাবেলা গ্রাম


অনেকটা সময় চলে গেছে, আমরা প্রায় ৫-৬ ঘণ্টা ট্রেকিং করে অনেকটাই ক্লান্ত, তাই ঘোরাতাবেলাতে দুপুরে খাব বলে স্থির করলাম। দুপুরে আমাদের জন্য ছিল হালকা গরম ভাত, একটু তেলে ভেজে নিয়ে আসা হলো। রিয়াদ ভাই আর আমি দুই জনে মিলে তাতেই দুপুরের আহার শেষ করলাম। আমরা আরো মিনিট পাঁচেক বিশ্রাম নিয়ে আবার সম্মুখের দিকে অগ্রসর হলাম। কিছু পথ হাঁটতেই নিজেকে পুরো পথের রাজা ভাবা শুরু করে দিলাম। এক অসম্ভব ভালা লাগা কাজ করছে এই পথটুকুতে। মন মোর মেঘের সঙ্গী, উড়ে চলে দিগন্তের পথে। বারবার কোন অজানায় হারিয়ে যাচ্ছি।


পুরো পথটা কেমন জানি মায়াবী, একপাশে ঢালু মাঠ যেখানে ইয়াক আর ঘোড়ার দল এক সাথে খেলা করে, ঘোরাতাবেলা


সামনে যতই এগুচ্ছি ভাল লাগার মাত্রা ততই বাড়ছে। মাঝে মাঝে ক্যামেরার লেন্সে ধরে রাখছি সেই সব স্মৃতি। রিয়াদ ভাইকে ক্যামেরার ভিউফাইন্ডারে মাঝে মাঝেই আবিষ্কার করি। কখনো ছোট রিয়াদ ভাই, আবার জুম করে বড় থেকে ক্ষুদ্র রিয়াদ ভাই। যখনি পেরেছি তার বিশেষ মূহূর্তগুলো ধরে রাখার চেষ্টা করেছি। যদি কোন মানুষকে চিনতে হয় তবে তার সাথে ট্রিপ দেওয়া উচিত। তবেই তার আসল রূপটা দেখা যায়। তবে রিয়াদ ভাইয়ের মানুষিক শক্তি আর আমার উপর তার আস্থা আমাকে তার সাথে ট্রিপে থাকার জন্য হয়তো বারবার একত্রিত করবে। এভাবেই একটি দিনের শেষ ভাগে চলে আসলাম আমরা। সন্ধ্যা ৬ টার কিছু পরে আমরা ল্যাংটাং পৌঁছে গেলাম।

ল্যাংটাং গ্রামটি হচ্ছে নেপালের গতবার ভূমিকম্পের সবচাইতে ক্ষতিগ্রস্ত একটি গ্রাম। ধ্বংসযজ্ঞের পর তারা যেন তাদের আবার তৈরি করেছে নতুন করে অতিথিদের স্বাগত জানানোর জন্য। আমরা গ্রামে পৌঁছাতেই সবাই মুখ বাড়িয়ে ডাকছেন, আমার ঘরে এসো। খুবই অল্প রুপিতে এখানে থাকা যায়, কিন্তু খাবারের দাম অনেক বেশি। বেশি হবার কারণ হচ্ছে ভাল যাতায়াত ব্যবস্থা না থাকা, অতিথিদের জন্য খাবার নিজেরাই কাঁধে করে বহন করে নিয়ে আসে। অতিথিদের যেন কোন অযত্ন না হয় সে দিকে তারা অনেক বেশি খেয়ালি। তাদের দেখে বোঝার উপায় নেই তাদের হাসি চোখের আড়ালে লুকিয়ে আছে যন্ত্রণা, যেন কোথাও তাদের কিছুই হয়নি, তারা যেন কিছুই হারায়নি। আমি তাদের দেখছিলাম আর শিখছিলাম কি করে ভালবাসতে হয়, কতটা মায়া থাকলে মানুষ পারে এমন একটা ধ্বংসস্তূপকে ভালবাসতে।


ল্যাংটাংয়ে ভূমিকম্প তাণ্ডবের পরেও সবুজ পাহাড়গুলো দাড়িয়ে ছিল ঠিক যেন অভিভাবকের মত


আমি তখন ভাবছিলাম আমাকে দিয়ে কি এমন ভালবাসা সম্ভব? আমি তো শিখেছি, না পোষালে কাটিয়ে দিতে, কোথাও চিড় ধরলে তা ফেলে দিতে। শিখেছি, সম্পর্কে ভেঙ্গে গেলে তা অস্বীকার করতে। সব হারিয়ে, সব শেষ করে, সব যন্ত্রণা পার করে ভালবাসতে তো শিখিনি কখনও!

গতকাল প্রায় ১১ ঘণ্টা ট্রেকিং করেছিলাম। স্বপ্নিল এক রাজ্যের রাজা হয়ে মেঘের দলবল আর ঘোড়ার পিঠে (ব্যাপারটা কিন্তু কল্পনাতে) চষে বেড়িয়েছিলাম আপার রিমচে থেকে ল্যাংটাং গ্রাম। রাতে বেশ ভাল একটা ঘুম হয়েছিল, যার রেশ চায়ের কাপ অবধি ছিল। রাতেই বসে বসে প্ল্যান করে নিয়েছি আজ কি করব। সেই মোতাবেক আজ আমাদের সব কিছু করতে পারলেই হল। যথারীতি নাস্তা সেরে ব্যাগ গুছিয়ে সকাল ৮ টার দিকে বের হয়ে গেলাম। রাতে রিয়াদ ভাই ভাবির সাথে স্যাটেলাইট ফোনে কথা বলছে, তাই সে এখন ফুরফরা। আমাদের প্রতিটা মানুষের হোম সিকনেস আছে, কারো কম, কারো বেশি। কম হোম সিক মানুষগুলাই পর্বতে বেশি সাফল্য বয়ে আনে বলে আমার ধারণা।  নেপালে গিয়ে যেখানেই রাত কাটাতাম সেখানে সবার সাথে একটা ভাল সম্পর্ক তৈরি হয়ে যেত। সবার আন্তরিকতা আর মায়াবী হাসিমুখগুলোই যেন বিদায় বেলাতেও তাদের কথা স্মরণ করিয়ে দিত।


মেঘের ভিতর থেকে ল্যাংটাং লিরাং (৭২৭২ মিটার)


এখন আমাদের যেতে হবে, তাই লজের সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে শুরু করলাম হাঁটা। আজ আমরা সিন্ডাম (৩৫৫৪)- কাইঞ্জিং গোম্বা (৩৮৭০) – কাইঞ্জি রি (৪৭৭৩) সামিট করে রাতে কাইঞ্জিং গোম্বাতে থাকব, পরিকল্পনা অনেকটা এরকম।

ল্যাংটাং থেকে কিছুদূর এগিয়ে যেতেই দেখি আকাশে সূর্যের আনাগোনা, কিন্তু বেশির ভাগ সময় সূর্য মেঘের চাদরে ঢাকা থাকে। যার কারণে আমরা সাদা পাহাড় দেখার যেই আশা নিয়ে এসেছিলাম তা অনেকটাই ব্যাহত হচ্ছে। হঠাৎ করেই কিছুক্ষণ পর মেঘের ভিতর থেকে ল্যাংটাং লিরাং (৭২৭২ মিটার) দেখতে পেলাম। প্রথম সাদা পাহাড় দেখার অনুভূতিটা একটু অন্যরকম। কেমন জানি নতুন করে কিছু ফিরে পাওয়ার মত ভাল লাগা কাজ করছিল। সাদা শুভ্র পর্বত আর মেঘের খেলা দেখতে দেখতে আমরা ছুটে চলছি আমাদের গন্তব্যে, ল্যাংটাং গ্রাম থেকে প্রায় ঘণ্টাখানেক হাঁটার পর পৌঁছে গেলাম সিন্ডাম গ্রামে, যার উচ্চতা সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ৩৫৫৫ মিটার। সিন্ডামে দুই-একটি ঘর, এখন ট্যুরিস্ট সিজন না হওয়ায় লজগুলো বন্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। ল্যাংটাং (৩৫৪১) থেকে কাইঞ্জিং গোম্বা গ্রামে পৌঁছাতে আমাদের প্রায় চার ঘণ্টার মত সময় লাগে।


সাদা আর সবুজের পর্বত , কাইঞ্জিং গোম্বা  ভিলেজের প্রবেশ পথ


পাহাড়ি পথের উপাসনালয় , কাইঞ্জিং গোম্বা


এই চার ঘণ্টার পথে ছিল ইয়াকের দল, মায়াবী শান্ত ঘোড়ার পাল, পাহাড় থেকে নেমে আশা ঝর্ণাধারার বরফ শীতল পানি আর সার্বক্ষণিক সঙ্গ দিয়ে যাচ্ছিল কাইঞ্জিং পর্বত আর ল্যাংটাং লিরাং হতে সৃষ্ট জলরাশি দ্বারা প্রবাহিত নদী। নদীর দুই পাশে উঁচু উঁচু পর্বতের পাদদেশে যেন দুপা প্রসারিত করে বসে আছে পর্বতগুলো, মাঝেমধ্যে সাদা মেঘের দলবল সেই পাহাড়ে সুড়সুড়ি দিয়ে যাচ্ছে। মেঘ, পাহাড় আর নদীর লুকোচুরি খেলা বেশ জমে উঠেছে। এমন সব মুহূর্ত বসে বসে উপভোগ না করেলই নয়, তাই সাথে সাথে কাঁধ হতে ব্যাগ নামিয়ে ত্রি-বন্ধনীয় খেলা উপভোগ করতে থাকলাম।

স্বর্গ থেকে কিছু ছিঁড়ে এইখানে পড়েছে বলে মনে হচ্ছে। স্বর্গছেঁড়া কথাটা কোন এক ব্লগে পড়েছিলাম, তাই এমন পরিবেশ দেখে একে স্বর্গছেঁড়া বললেই যথার্থ হবে।


অলস ঘোড়াদের ছুটাছুটি, নুশাপালি গ্রাম ( ঘোরাতাবেলা আর ল্যাংটাং এর মাঝে কোন  এক গ্রাম এটি)


কাইঞ্জিং গোম্বা ভিলেজ


আমরা কাইঞ্জিং গোম্বা গ্রামে পৌঁছে গেলাম তখন ঘড়িতে বাজে প্রায় সকাল ১১:৫০ মিনিট, রাতে থাকার একটা ব্যাবস্থা করা লাগবে তাই আমাদের গাইড চলে গেলেন রাতে থাকার ব্যাবস্থা করতে। আর আমরা তখন পুরো গ্রামটার মনোরম পরিবেশ উপভোগ করতে থাকলাম, কাঁচা পাকা অনেক লজ আছে এখানে, একেকটা লজের সৌন্দর্য যেন আরেকটাকে ছাড়িয়ে যায়। নানা রঙের সাজে ঘরগুলো সত্যিই অনেক অসাধারণ। এই গ্রামে অনেকগুলো ইয়াক চিজ তৈরির কারখানা রয়েছে। টুরিস্ট সিজনে যার চাহিদা ব্যাপক। গ্রামটাটা ঘুরে দেখলাম,  ছবির মত এক গ্রাম। যার পাশেই রয়েছে ল্যাংটাং গ্লেসিয়ার আর অন্য পাশে কাইঞ্জিন-রি পর্বত (৪৭৭৯ মিটার)। আমাদের থাকার ব্যাবস্থা হয়ে গিয়েছে, তাই আমি আর রিয়াদ ভাই রুমে চলে গেলাম, প্রায় মিনিক দশেক বিশ্রাম নিয়ে ছোট একটা ডে প্যাক কাঁধে ঝুলিয়ে বের হয়ে পড়লাম কাইঞ্জিন-রি’র পথে। সাথে কিছু চকলেট আর শুকনো খাবার নিয়ে নিলাম। আমরা যখন কাইঞ্জি-রি’র উদ্দেশে হাঁটা শুরু করি তখন বাজে প্রায় ১২:২০। আস্তে আস্তে সামনে এগুচ্ছি, যতই উপরের দিকে যেতে থাকি ততই গ্রামটা ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্র হতে থাকে। উপরের দিকে উঠার সময় কিছু সময় পর পর গ্রামটা দেখছিলাম, মাঝে মাঝে মেঘ এসে পুরো গ্রামটাকে ঢেকে দিয়ে যায়। ৪০০০ মিটার উঠার পরে মাথায় হালকা ব্যথা অনুভব করি, আর আবহাওয়া ক্রমশ খারাপ হতে থাকে। কিন্তু তেমন পাত্তা না দিয়ে সামনে অগ্রসর হতে থাকলাম।



কাইঞ্জি-রি সামিটে যাবার সময় , পথে কোন এক নাম না জানা চূড়ার ছবি


চারদিক মেঘের চাদরে ঢাকা, ঠিক মত সামিট পয়েন্ট দেখতে পারছি না। এমন কি আশেপাশের কোন পর্বত চূড়ারও দেখা মিলছে না। ৪১০০ মিটার উঠার পর সামিট ফ্লাগ দেখতে পেলাম। মনে তখন আরো শক্তি ফিরে পেলাম, তাড়াতাড়ি উপরের দিকে ছুটে চলাম। সামিটে পৌঁছে পকেট থেকে জিপিএস বের করে দেখি আমি তখন কেবল ৪৩৪৪ মিটার উপর। এবার ম্যাপ দেখি মোবাইলে, আমরা তখন লোয়ার সামিটে দাঁড়িয়ে। কয়েকজনকে এখান থেকে ফিরতে দেখলাম। তারা মেইন সামিটে যাবে না আবহাওয়া জনিত সমস্যার কারণে। ওদের নিচে নামতে দেখে, শরীরের আর বিন্দুমাত্র শক্তি ছিল না সামনে আগানোর। যাই হোক আসছি যেহেতু নিজের সেরা চেষ্টা করতে দোষের কি! সময় তখন দুপুর ২:৪৬; আবার শুরু করলাম মেইন সামিট পয়েন্টের দিকে হাঁটা। লোয়ার সামিট থেকে একটু এগিয়ে সোজা একটা রিজ লাইন উপরের দিকে চিলে গেছে। এই পথটুকু যেন শেষ হয়েও হচ্ছে না। তার উপরে বাজে আবহাওয়া, তখন প্রায় দুপুর ৩:৪৫ আমি পৌঁছে গেলাম কাইঞ্জি-রির মূল চূড়াতে। লোয়ার সামিট থেকে মেইন সামিট পুরো পথটাই বেশ বাজে রকমের বিরক্ত লাগে, কারণ শুধুই একটা সাফল্যের জন্য মন সায় না দেয়া সত্ত্বেও আমি উপরের দিকে অগ্রসর হয়ে ছিলাম। সামিটে পৌঁছে মনের মধ্যে এক অন্যরকম ভালা লাগা কাজ করল। তখন বুঝতে পারলাম নিজেই যদি নিজের সাথে জয়ী হই তবে তার সুখ অন্য যেকোন কিছু জয়ের চেয়ে আলাদা। সত্যি কথা বলতে গেলে পর্বত জয় করার কিছু নাই, এটা শুধু নিজেকে একটা লক্ষ্যে পৌঁছে নেওয়া। আর এই অনুভূতিটা আসলে এক অন্যরকম ভাল লাগার, সেই সময়ের বাস্তবতা আমার পক্ষে লিখে কখনই বুঝানো সম্ভব হবে না।

আমি সামিটে পৌঁছে রিয়াদ ভাইয়ের জন্য অপেক্ষা করতে থাকি, এদিক সেদিক তাকিয়ে রিয়াদ ভাইকে দেখার চেষ্টা করি, কিন্তু কোথাও তার দেখা না পেয়ে নিচে নেমে আসার চিন্তা করতে থাকি। কিন্তু আমি জানি কি কষ্ট করে এতটা উপরে এসেছি, রিয়াদ ভাই যদি আমার জন্য সামিট করতে না পারে, ব্যাপারটাই আমাকে অনেক বেশি কষ্ট দিবে। কারণ ট্রিপমেট হিসাবে আমারো কিছু দায়িত্ব আছে তার প্রতি। আমি শরীর গরম রাখার জন্য উপরে পায়চারি করতে থাকি আর রিয়াদ ভাইকে কোথাও দেখা যায় কিনা সেটা দেখার চেষ্টা করি। অনেক দূরে রিয়াদ ভাইকে অবিষ্কার করলাম। অবশেষে অনেক চড়াই উতরাই পেড়িয়ে রিয়াদ ভাই আসলো। আমাদের দুই ভাইয়ের সামিট হল। আমরা প্রায় ৬ টার দিকে কাইঞ্জি-রি’র উপর থেকে নিচে নেমে আসি।


কাইঞ্জি-রি সামিটে


সবার আগে আমাদের গাইড নেমে যায়, তার প্রায় ৩০ মিনিট পর আমি; আর রিয়াদ ভাই আসে আরো ২৫ মিনিট পর। সবাই এতটাই ক্লান্ত ছিলাম কেউ কারো সাথে ঠিক মত কথাও বলি নাই। রুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে রিয়াদ ভাই ঘুমিয়ে পড়ল। আমি চলে গেলাম আমাদের চার তলা বিশিষ্ট হোটেলের ডাইনিং রুমে। সেখানে বিভিন্ন দেশ থেকে আগত ট্রেকাররা সবাই আড্ডা দিচ্ছে। আমি জাপানিজ আর স্প্যানিশ ট্রেকার টিমের সাথে কিছুক্ষণ গল্প-গুজব করলাম আর তাদের কাছ থেকে আমার দেশ সম্পর্কে কি ধারণা সেটা জানতে চাইলাম। তাদের সাথে গল্প করে সত্যিই অনেক ভাল লাগল এই ভেবে যে তারা আমার দেশ সম্পর্কে অনেক কিছু জানেন। তাদের আমন্ত্রণ জানালাম তারা যেন আমাদের দেশটা ঘুরে যায়, আমি তাদের নিয়ে ঘুরিয়ে দেখাব আমাদের দেশ।

সবার সাথে আড্ডা শেষ করে রিয়াদ ভাইয়ের জন্য নুডুল্যস নিয়ে আসি, আগের দিন সে তেমন কিছু খায়নি। এভাবে না খেয়ে থাকলে আগামীকাল আরেকটা সামিট পুশ তার পক্ষে দেওয়া সম্ভব হবে না। রুমে এসে দেখি তার গায়ে হালকা জ্বর। অল্প একটু নুডুল্যস খাওয়ানোর পরে জ্বর কমানোর জন্য ওষুধ দেই। সেটা খেয়ে সে শুয়ে পড়ে। আমি বাকি নুডুল্যস খেয়ে শুয়ে পরলাম।

উচ্চতাজনিত কারণে কেন জানি শান্তি মত ঘুমাতে পারছিলাম না। রাত ৯ টায় ঘুমাতে গেলাম। এদিক ওদিক করতে করতে ঘুমিয়ে পরলাম। হঠাৎ রাতে ঘুম ভেঙ্গে গেল ঘড়িতে তখন রাত ১২ টা বাজে। আবার ঘুমানোর চেষ্টা চলছে। এভাবে করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পরলাম টের পেলাম না। এবার ঘুম ভাঙল ভোর ৬ টার কিছু পর। আজ আমরা যেহেতু সারগো রি সামিটে যাব তাই ঘুমাতে গেলাম না। আমি বিছানা ছেড়ে জানালার সামনে পর্দা সরিয়ে মাথাটা জানালার বাহিরে দিয়ে তাকিয়ে আছি। আর মেঘে ঢাকা পর্বতগুলো দেখছি। চারদিকে মেঘ আর সেই মেঘের ফাঁক গলেই মাঝে মধ্যেই উকি দিচ্ছে সাদা শুভ্র কাইঞ্জিং পর্বতের চূড়াগুলো।

রিয়াদ ভাইকে ডেকে তুলি। তার শরীর আগের থেকে অনেক ভাল, এখন শরীরে জ্বর নেই। তাকে তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হতে বললাম আমিও ফ্রেশ হয়ে নিলাম। সকাল ৭:২০ মিনিটের দিকে আমরা সারগো রি’র (৪৯৮৪ মিটার) জন্য প্রস্তুত করে নিলাম নিজেদের।


ইয়াক হাউজ , সারগোরি  চূড়ায় উঠার সময়


গত দিনের মত আজও কিছু শুকনো খাবার আর আধা লিটার পানি দুইজনের ডে-প্যাকে নিয়ে নিলাম। সব প্রস্তুতি শেষ করে একটু জানালা দিয়ে বাহিরে তাকাতেই দেখি গুড়িগুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। কপাল তখন আকাশে উঠার মত অবস্থা। আবহাওয়া এমন থাকলে কোন ভাবেই সামিট পুশ দিতে পারব না।

সকাল ৭:৩০ থেকে ৮:৩০ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে থাকি বৃষ্টি না থামা পর্যন্ত আমরা বের না হওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। ৮:৫০ দিকে বৃষ্টি কমার পর আমরা ঘর থেকে বের হই। তখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল সামিটে বের হওয়ার জন্য। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম যতটুকু পারি এগিয়ে যাই, না পারলে ফিরে আসব। এই বলে ৯ টার দিকে হাঁটা শুরু করি সারগো রির দিকে। প্রতিকূল পরিবেশে কথা মাথায় রেখেই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি, কিছুদূর যাবার পর আস্তে আস্তে করেই গুড়িগুড়ি বৃষ্টি পড়া বন্ধ হয়ে গেল। আকাশে এখন বৃষ্টি নেই কিন্তু এর আভাস এখনো বিদ্যমান। চারিদিকে এক সুনসান নিরবতা, আবহাওয়া খারাপ থাকায় আজ সকালে একটি ট্রেকিং টিমও কাইঞ্জিং গোম্বা ভিলেজ থেকে সারগোরি সামিট উদ্দেশে বের হয়নি, এজন্য কিছুটা দুশ্চিন্তার ভাজ কপালে পড়ল। আসলেই কি আমরা সঠিক সিদ্ধান্ত নিলাম কি না তা নিয়ে মনের মধ্যে নানা প্রশ্নের তৈরি হচ্ছে।

প্রায় ৩০ মিনিট হাঁটার পর আমরা একটা গ্লেসিয়ারের সামনে চলে আসি, এই গ্লেসিয়ারটির নাম ল্যাংটাং লিরাং গ্লেসিয়ার। আমরা গ্লেসিয়ার পার হয়ে সামিটের দিকে উঠা শুরু করি। চোখের সামনে যেই পথটুকু আছে পুরোটাই সোজা উপরের দিকে চলে গেছে। এখন শুধুই উপরের দিকে ছুটতে হবে। যতই উপরের দিকে উঠতে লাগলাম ক্লান্তি যেন ধীরে ধীরে আমাদের উপর চেপে বসতে থাকে। কিছুদূর উঠার পর বজ্রপাতের শব্দ কানে আসল, আমি আর আমাদের গাইড পিসাং আতকে উঠলাম। কিছুক্ষণের জন্য থমকে দাঁড়ালাম। দুই তিন বার এমন শব্দ কানে আসল, তখন আমরা প্রায় অর্ধেকের বেশি পথ উঠে গিয়েছি। ঠিক এই সময় এখন আমাদের কি করা দরকার তাও বুঝতে পারছিলাম না। এর মধ্যেই আবার শুরু হয়ে গেলে হালকা হালকা বৃষ্টি। এবার আমি ধরে নিলাম আমাদের এখন থেমে যাওয়া উচিত। আমি ব্যাগ থেকে পঞ্চ বের করে পরে নিলাম, হালকা বাতাস আর বৃষ্টির কারণে উপরের তাপমাত্রা ক্রমশ কমতে শুরু করেছে। হাতগুলোও জমে যাচ্ছে। এর মধ্যে রিয়াদ ভাই অনেক পিছনে রয়েছে, অনেকক্ষণ হয়ে গেল তার দেখাও পাচ্ছি না। চারদিক মেঘের চাদরে ঢেকে গিয়েছে, আমি আমার দুই তিন হাত সামনের কিছুও দেখতে পাচ্ছি না। মাঝে মধ্যেই মেঘ সরে গেলে সামিটের চূড়ার দেখা মিলছে আবার নিমিষেই কোথায় জানি হারিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে আমি আর সামনে না এগিয়ে রিয়াদ ভাইয়ের জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম। পিসাং সাথে করে চা নিয়ে এসেছে, আমি পিসাংকে চা দিতে বলি আর রিয়াদ ভাইকে কোথাও দেখা যায় কিনা লক্ষ্য রাখি। অনেক দূরে লাল বিন্দুর মত পিঁপড়া সাইজের কাউকে দেখতে পেলাম। তার আসতে আরো ২০-২৫ মিনিটের মত লাগবে। সামনের দিকে তাকিয়ে দেখলাম সামিটের দিকে যেতে হলে আমাদের উঁচু উঁচু পাথরে স্তূপ পাড়ি দিতে হবে।


ল্যাংটাং লিরাং গ্লেসিয়ার থেকে বয়ে চলা নদী



চারিদিক নিরবতার মাঝে সেখানে দেখতে পেলাম ইয়াকের দল। জনমানব শূন্য স্থানে তখন আমার মনে হচ্ছিল ইয়াকের পাল যেন আমার বহুকাল আগের চেনা কিছু। খুব বেশি আপন মনে হচ্ছিল। ইয়াক শান্ত পরিবেশে থাকে বলেই হয়তো তারা স্বভাবেও একটু বেশি শান্ত। একটু ধমকের স্বরে কথা বললেও যেন তারা দৌড়ে পালায়। তাই আমি যতক্ষণ পারছিলাম তাদের দেখেই যাচ্ছিলাম, আর চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিলাম। একপাশে সবুজে ছড়াছড়ি, অন্য পাশে পাথরে বিশাল ধ্বংসযজ্ঞ। কোথাও কোথাও নানা বর্ণের ফুলের দেখা মিলল। ততক্ষণে রিয়াদ ভাই চলে আসল আর বৃষ্টিও থেমে গেল। মনের মধ্য জমা হওয়া আশঙ্কা দূর হয়ে গেল। আমরা সামনেই এগুচ্ছি এটা অনেকটা নিশ্চিত হয়ে গেল বৃষ্টি থামার ফলে। রিয়াদ ভাই আসার সাথে সাথে চা আর শুকনো খাবার দিলাম তাকে। সে আসার পর আমরা প্রায় দশ মিনিটের মত বিশ্রাম নিলাম। বিশ্রামের সময় তার শুধু খোঁজ খবর নিলাম সে ঠিক আছে কি না। সামনে সে এগুতে পারবে নাকি? তার কথা শুনে মনে হল সে অনেক আত্মবিশ্বাসী; তাই আমিও আরো সাহস পেলাম। আর অল্প কিছু দূর গেলেই আমরা সামিটে পৌঁছে যাব ব্যাপারটা তখন এমন মনে হচ্ছিল। কিন্তু এক ঘণ্টা হাঁটার পর নিচের দিকে তাকিয়ে যখন দেখলাম, আরো ২ ঘণ্টায়ও হয়তো পৌঁছানো সম্ভব না। কারণ সামনে বড় বড় পাথরের ধ্বংসস্তূপ। এই পথে খুব সাবধানে যেতে হবে, তা না হলে বিপদ ঘটতে খুব বেশি সময় লাগবে না। বিশ্রাম নেওয়ার পর থেকে প্রায় তিন ঘণ্টা পর দুপুর দুইটার দিকে আমি আর পিসাং সারগো রি’র চূড়ায় পৌঁছাই। উপরে তখন অনেক বাতাস আর আশেপাশের কোন ভিউ দেখতে পাচ্ছি না। তার মধ্যে রিয়াদ ভাই আমার অনেক পিছনে ছিল। তার আসতে আরো কম করে হলেও ত্রিশ মিনিট সময় লাগবে। এই ত্রিশ মিনিট অপেক্ষা করা আমার জন্য একটু কষ্টসাধ্য ব্যপার হয়ে দাঁড়ালো। তবুও আমি আর পিসাং তার জন্য এইটুকু কষ্ট করতে রাজি। কারণ সে প্রায় অনেকটা পথ চলে এসছে। সেই ফাঁকে সামিট পয়েন্টের জিপিএস রিডিং নিয়ে রাখলাম। পেলাম ৪৯৯৪ থেকে ৫০০৩ মিটার। রিডিং নেওয়া শেষে একটা ৩৬০ ডিগ্রি ভিডিও নিয়ে রাখি। চারদিকের মেঘে ডাকা সামনের চূড়াগুলোর কোন ভিউ পাচ্ছি না। তখন সারগো রি সামিটের আনন্দ যেমন ছিল, ঠিক তেমনি কোন ভিউ না পাওয়ার কষ্টটাও কম ছিল না।



অনেকক্ষণ বাদে রিয়াদ ভাই আসার পর তাকে দেখে আনন্দের মাত্রা আরো বেড়ে গেল। রিয়াদ ভাই আসার পর আমরা দুই জন দেশের পতাকা নিয়ে ছবি তুলি। তারপর সেখানেই বসে হালকা শুকনো খাবার আর চা পান করি। দিনের আলো পাবো আর প্রায় দেড় ঘণ্টার মত। এই সময়ের মধ্যেই আমাদের পাথুরে ধ্বংসস্তূপগুলো পারি দিতে হবে। এ জন্য আমরা খুব দ্রুত নেমে যেতে থাকি। আমাদের সারগো রি’র চূড়া থেকে নিচে নেমে আসতে আসতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে যায়, তখন ঘড়ির কাটা বলে পাঁচটা বেজে চল্লিশ মিনিট। নিচে নেমে আমরা গ্লেসিয়ারের পাশেই অনেক্ষণ বসে সারগো রি’র দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম। নানা বাঁধা বিপত্তির পর অনেক চড়াই উতরাই করে আমাদের পৌঁছাতে হয়েছিল সেখানে।

যখন সন্ধ্যার পর আমরা লজে ফিরলাম অনেকে হা করে তাকিয়ে ছিল, কারণ এমন আবহাওয়ার মধ্যে আমাদের যাওয়াটা তারা স্বাভাবিকভাবে নিতে পারছিলেন না। কিন্তু আমরা মনোবল হারাইনি, হেরে যাবার আগেই হারিনি। ক্লান্তিবোধ করেছিলাম ঠিকই কিন্তু অসুস্থতার মত কোন অবস্থায় পড়িনি, তাই এগিয়ে গিয়েছিলাম মনোবলকে সঙ্গী করে।

সামিট শেষে রাত ও রাতের আড্ডা

গত দুইদিন আমাদের অনেক ধকল গিয়েছিল, কোন প্রকার বিশ্রাম ছাড়াই আমরা দুইটি পর্বতের চূড়ায় উঠেছি। তাই আজ শরীর কেন জানি বিছানায় ঢলে পড়ছে, এই ফাঁকে রিয়াদ ভাই বলে উঠলো সে আর এই আবহাওয়ার মধ্যে এতো কষ্ট করতে পারবে না। তার এই কথা শুনে আমারও ঘুম চলে গেল। আমি ভাইকে বলি কি হয়েছে বলেন তো, আমাদের তো কাল গোসাইকুন্ডের দিকে যাবার কথা। সে বলে দেখ কোন ভিউ পাই না, এর মধ্যে আমরা একদিন বিশ্রাম না নিয়েই দুই দুইটা পাহাড়ের চূড়ায় উঠেছি, এখন যদি একই আবহাওয়াতে আমরা সামনে এগিয়ে যাই তবে এটা বোকামি হবে। সে যাবে না, তাই আমিও যাব না তাকে জানিয়ে দিলাম। যেহেতু একসাথে আসছি যাবও একসাথে; বেঁচে থাকলে অনেকবার আসতে পারব। রিয়াদ ভাই তার পরেও আমাকে আমাদের প্ল্যান মত ট্রিপ শেষ করার জন্য বললেন। কিন্তু আমি তার সাথেই যাব। এ জন্য আমাদের ট্রিপ এখানেই শেষ বলা যেতে পারে। কারণ এখন আমরা শুধু বাড়ি ফিরে যাবার জন্যই আগাব। আমাদের আর অন্য কোন গন্তব্য নেই। এই বলেই আমাদের রাতের কথোপকথন শেষ হল।

রিয়াদ ভাই ঘুমিয়ে পড়ল, আর আমি চলে গেলাম ডাইনিংয়ে যেখানে গেলে বিভিন্ন ট্রেকারদের সাথে গল্প হয়, আমি  বলতে পারি আমার দেশের কথা, আমি শুনি তাদের দেশ নিয়ে তারা কি ভাবে। এ যেন এক বর্ডারলেস বন্ধুত্ব। সবার সাথে আড্ডা শেষ করে আমি রাতের জন্য হালকা একটা খাবার নিয়ে রুমে চলে আসি। রিয়াদ ভাই দুইদিন হয় তেমন কিছু খায়নি, তাই ভাবলাম নুডুলস টাইপ কিছু নিয়ে যাই যেন খেতে পারে। কিন্তু রুমে গিয়ে দেখি সে ঘুমিয়ে পড়েছে, তাকে ঘুম থেকে তুলতে না পেরে নিজেই খেয়ে শুয়ে পড়লাম।

ফেরার পালা

আজ আমাদের গন্তব্য হচ্ছে, কাইঞ্জিং গোম্বা হয়ে লামা। সকাল আটটা ত্রিশের দিকে লজের সকল পাওনা বুঝিয়ে দিয়ে রওনা দেই। কাইজিন হয়ে সিন্ডাম পথ ধরে আমরা ল্যাংটাং ভিলেজে চলে আসি; তখন সকাল দশটা বেজে পঞ্চাশ মিনিট। ল্যাংটাং গ্রামের কিছু কথা না বললেই নয়- ২০১৫ সালের ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাম এটি। বড় বড় পাথরের নিচে এখনো চাপা পরে আছে অনেক ঘরবাড়ি। ক্ষতবিক্ষত রূপ যেন এখনো বিদ্যমান। এই গ্রামেই মারা গিয়েছেন বিদেশি পর্যটক সহ প্রায় ৪০০ মানুষ। ভাবতেই গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায়। সামনেই আসছে পর্যটক সিজন; তাই এই ট্রেইলের সর্বত্রই দেখলাম কর্ম ব্যস্ততা, তারা আবার নতুন করে নিজেদের গড়ে তুলছে। নতুন অতিথিদের স্বাগত জানানোর জন্য।

আজ হাঁটার মধ্যে যেন আর কোন তাড়া নেই, কারণ আজ আমরা জানি আমাদের গন্তব্য। চারপাশে যা-ই দেখছি সবই যেন স্মৃতির ফ্রেমে ধরে রাখতে পারি তারই চেষ্টা করে যাচ্ছি। পুরো পথটা কেমন জানি মায়াবী, একপাশে ঢালু মাঠ সেখানে ইয়াক আর ঘোড়ার দল এক সাথে খেলা করে, ইয়াক আর ঘোড়াগুলো বেশিই বুড়ো কিনা তাই আমি তাদের সাথে খেলায় মেতে উঠতে পারলাম না, ওদের যতই কাছে যাই ওরা যেন আরো দূরে চলে যায়। অন্য পাশে পাহাড়ের বুক চিরে ঝর্ণা ধারা বয়ে চলছে, এই ঝর্ণার জলরাশি ল্যাংটাং গ্লেসিয়ার থেকে সৃষ্ট নদের সাথে মিশে যেন ছুটে চলছে তার আপন ঠিকানায়। অনেক দূর থেকে আসা মেঘের দল ক্ষণেক্ষণে তার চাদরে পরম আদরে সব কিছু আগলে নিচ্ছে। নেহাতই আমাদের সাথে একটু খুনসুটি করে হয়তো এমন করছে। মেঘের চাদরে মাঝে মাঝে আমরাও ঢাকা পড়ে যাচ্ছি। এই সব মুহূর্তগুলো দুই হাতে দিয়ে স্পর্শ করা সম্ভব নয় বলেই, মনের দুই হাত বাড়িয়ে উপভোগ করতে থাকলাম।


সেঞ্চুরি পাতার বন, লামা


দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে লাগল। আমরাও আমাদের নির্ধারিত ট্রেইলের প্রায় শেষভাগে, ঘন জঙ্গল আর সেঞ্চুরি বনের ভিতর দিয়ে হেঁটেই আমরা লামা পৌঁছে গেলাম। যখন লামা পৌঁছাই তখন প্রায় সন্ধ্যা, ঘড়িতে পাঁচটা বেজে ত্রিশ মিনিট। লামা পৌঁছে রাতের থাকার জন্য আমরা ফ্রেন্ডলি গেস্ট হাউজে উঠলাম, লজের মালিকের ব্যবহার অসাধারণ। আমরা বেশ কয়েক দিন হয় মুখরোচক কিছু খাইনি, তাই রাতের জন্য ফ্রেঞ্চ ফ্রাই আর ডিম সিদ্ধ দিতে বলা হল, অর্ডার করার ৩০ মিনিটের মধ্যেই খাবার চলে এল। খাবারের স্বাদ কি আর বলব এক কথায় অমৃত। মনে হচ্ছিল কয় যুগ যেন আমরা অভুক্ত ছিলাম। দ্বিতীয় বারের মত আবার ফ্রেঞ্চ ফ্রাই দিতে বললাম।

খাওয়ার পর্ব শেষ করে ঘুমানোর জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলাম। আমরা ৮ টার দিকেই শুয়ে পড়ি।

ঘুম ভেঙ্গে গেল ঘড়িতে তখন সময় রাত ১২:১০। চারিদিকে কেমন জানি সুনসান নীরবতা, ঘরের পাশে বয়ে যাওয়া নদীর কলকল শব্দ কানে ভেসে আসছে। একবার রিয়াদ ভাইয়ের দিকেও তাকালাম। সে দিব্বি ঘুমিয়ে যাচ্ছে। আমি আস্তে করে মাথার সামনেই একটা জানালা ছিল, যেটা দিয়ে বয়ে চলা নদীটাকে দেখছিলাম। গভীর রাতে তার রূপটা কেমন তা দেখার চেষ্টা করলাম। কিন্তু এই গভীর রাতে কি আর দেখা সম্ভব! হল না দেখা তারে! ভাবলাম আজ কেন পূর্ণিমা হল না, জোছনার আলো কেন পড়ল না সেই পানিতে। নিজে নিজে পাগলের মত প্রলাপ পারতে থাকি আর এক দৃষ্টিতে সামনের দিকে জানালের ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে থাকি। কাল অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে; তাই জানালাটা বন্ধ করে আবার কম্বল পেঁচিয়ে শুয়ে পরলাম।

সকাল ৬:৩০ মিনিটের দিকে ঘুম ভাঙ্গলো বৃষ্টির টুপটাপ শব্দে, জানালা ঘুলে রাতের চিন্তাগুলো একটু মনে করার চিন্তা করছিলাম। বয়ে চলা নদীর দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর আমার মনে হল অবচেতন মনেই, আমি যেন শান্তির পরশ পেলাম। বাইরে হালকা ফোটায় ফোটায় বৃষ্টি হচ্ছে, আজ ভেবেছিলাম একটু তাড়াতাড়ি বের হয়ে পড়ব, কিন্তু তা আর হল না। আমাদের গাইড পিসাং আমাদের ডাকার জন্য আসল হাতে খাবারের মেন্যু, ততক্ষণে আমরা উঠে বসে আছি। আমরা পিসাংকে খাবারের মেন্যু থেকে পিৎজা আনতে বললাম। যেহেতু কাল খাবার ভাল ছিল তাই ওদের প্রতি আত্মবিশ্বাস জন্মে গিয়েছিল। ওরা যাই খেতে দিবে সেটাই হইতো আমাদের ভাল লাগবে। যথা সময়ে খাবার চলে এল, স্বাদ হতাশ করল না। যদিও পিৎজা খেলাম বলে মনে হল না কিন্তু খেতে ছিল দারুন।

বৃষ্টি যেন আজ আর শেষ হবে না বলে পন করেছে। তাই ভাবলাম আর বসে থাকলে আমাদের আর সায়াফ্রুবেসি যাওয়া হবে না, বৃষ্টি উপেক্ষা করেই আমরা সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সামনে এগুলাম। আজ আমরা লামা থেকে সেরপাগাও হয়ে কাইজিং দিয়ে সায়াফ্রুবেসি পৌঁছাব। সবার  কাছেই শুনেছিলাম আজ শুধুই আমাদের নামা পথ, আমরা লামা (২৪৮০ মিটার) থেকে সায়াব্রুবেসি (১৪৫০ মিটার) নেমে যাব। যতই সময় গড়াচ্ছিল আমরা শুধু নিচের দিকে নেমেই যাচ্ছিলাম, একটা সময় বিরক্ত চলে আসল, ক্রমাগত নেমেই যাচ্ছি। পায়ের আঙ্গুলগুলো যেন আর আমার ওজন বহন করতে চাইছে না। অন্যদিকে সূর্যের প্রখর রোদটাও পাগলা হয়ে উঠছে। পানির তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে আসছে, বোতলে হাত দিয়ে দেখি পানি নেই। এখন আর পানির কথা ভেবে লাভ নাই পাহাড়ের গাছগুলোর ফাঁকফোকর দিয়েই সায়াফ্রুবেসি দেখা যাচ্ছে, কিছুদূর সামনে এগুতেই একটা ছোট ঘর দেখতে পেলাম, একটু সামনে এগুতে দেখলাম সেখানে কিছু ট্রেকার বিশ্রাম নিচ্ছে। তাদের সাথে কথা বলে জানলাম তারা ইন্ডিয়ান ট্রেকার, মাউণ্টেন এক্সপিডিশনে আসছে। কিভাবে ৫০০০ মিটার উচ্চতায় নিজেদের মানিয়ে নেয়া যায় সেই প্রস্তুতি নিতে ২০ দিনের জন্য তারা ল্যাংটাং আসে পাঁচ সদস্যের দল নিয়ে। তাদের সাথে কথা শেষ করে আমরা পাহাড়ি ঝর্ণার পানির একটা পাইপ লাইন ছিল সেখানে গিয়ে পানি পান করি। এবার আর খালি বোতলগুলো পানিপূর্ণ করার প্রয়োজন মনে করলাম না। চোখের সামনেই যেহেতু সায়াফ্রুবেসি তাই আর পানি নেয়ার প্রয়োজন মনে হল না। আবার হাঁটা শুরু করলাম। একি পথ শুধু নামতেই হবে। বেশ কিছুক্ষণ নামার পর সায়াব্রুবেসি আরো কাছে মনে হতে থাকল, কিন্তু সায়াফ্রুবেসি যতই কাছে দেখছি পথ যেন আরো বেশি যন্ত্রণাদায়ক হয়ে উঠছে। এভাবেই ক্লান্ত শরীরটাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছি গন্তব্যের দিকে। আমরা বিকাল ৫টার দিকে সায়াব্রুবেসি পৌঁছে যাই। যেখান থেকে ট্রেকিং শুরু করেছিলাম আজ যেন সেই ট্রেকিং রোড এখানে এসে শেষ হল।

আমাদের গাইড আগেই চলে আসে। ও আমাদের জন্য থাকার ব্যবস্থা করে রাখে, আমরা সেই রুমেই উঠে পড়ি। আমাদের রুমটা ছিল মাটির নিচে (আন্ডার গ্রাউন্ডে), সাথে ছিল একটা বারান্দা যার পাশ দিয়েই বয়ে চলছে ত্রিশুলি নদী। রাতের খাবার খেয়ে বের হয়ে গেলাম কালকের বাস টিকিটের জন্য, সায়াব্রুবেসি থেকে আমাদের ফিরতে হবে কাঠমুন্ডু। হোটেল থেকে বের হয়ে মিনিক পাঁচেক হাঁটাহাঁটি করেই আমরা টিকিটের ব্যবস্থা করে ফেললাম। ১২০০ নেপালি রুপিতে আমরা সকাল ৭:৩০ মিনিটের দুইটা টিকিট করে ফেলি।

আজ অনেকটা দিন পর মন খুলে দুই ভাই কথা বললাম, হাসাহাসি করলাম। হালকা  মৃদু বাতাস আর কনকনে শীতে বেশ ভালই আড্ডা দিচ্ছিলাম, আমাদের পাশেই বসে ড্রিঙ্কস করছিল একটা ৫ সদস্যের স্প্যানিশ টিম। তারা হয়তো কাল ট্রেকিং শুরু করবে। আমাদের যেহেতু সকালে বাস তাই আমরা রুমে চলে গেলাম। ব্যাগগুলো এলোমেলো অবস্থায় পড়ে আছে, রুমে ঢুকেই আগে ব্যাগ গোছাবো তার পর ঘুম। যেই  বলা সেই কাজ। ব্যাগ গুছিয়ে সব প্রস্ততি নিয়ে রাখলাম। যেন সকালে ঘুম থেকে উঠে আর ঝামেলা করতে না হয়। প্রয়োজনীয় কাগজগুলো ডে প্যাকটাতে নিয়ে  নিয়ে নিলাম।

সকাল ৬:০০ টায় ঘুম থেকে উঠে রেডি হয়ে নিলাম একে একে। হোটেলের সমস্ত বিল পরিশোধ করে বাস কাউন্টারে চলে যাই ৭:০০ দিকে। বাস কাউন্টারের যাবার আগে আমরা আর্মি চেক পয়েন্ট থেকে চেক আউট করি। বাস যথা সময়ে ছেড়ে দিল। আমরা বাসের বা দিকের সামনের সিট দুইটা নিয়েছিলাম পা রাখার সুবিধার জন্য। ভাল বাসে টিকিট কাটলাম একটু শান্তিতে যাব বলে, কিন্তু একটু পরপর লোকাল বাসের মত যাত্রী তুলছিল। খুবই মেজাজ খারাপ হচ্ছিল তখন। বাস যেন আজ আর আগায় না। বিকাল ৪:০০ দিকে আমরা মাছাপুখারি বাস স্ট্যান্ডের সামনে নামি, সেখান থেকে আমরা যাব এখন বিমান বাংলাদেশের অফিসে, ত্রিভুবন এয়ারপোর্ট। বাস থেকে নামতে দেড়ি কিন্তু টেক্সি চালকরা আমাদের ঘিরে ধরল। এ বলে আমারটায়, সে বলে আমারটায়। আমরা যে বাংলাদেশ থেকে আসছি বেটা কি সেটা জানে, বললাম ভাড়া কত কেউ চায় ১০০০ রুপি, কেউ ৯০০ রুপি। আমরা জানতাম মাত্র ২ কিমি রাস্তা, তাই বলি এতো ভাড়া কেন! আমরা ৩০০ রুপি দিব। এটা শুনে কেউ আর আগ্রহ দেখালো না। আমরাও একটু সামনে গিয়ে ৫০০ রুপি দিয়ে এয়ারপোর্ট চলে যাই।

আমাদের বিমান টিকিট করা ছিল ২৪ তারিখের। কিন্তু সেদিন ছিল ১৯শে সেপ্টেম্বর। তাই টিকিট পরিবর্তণ করা জরুরি হয়ে পড়ল। কিন্তু আমরা যখন এয়ারপোর্ট পৌঁছে বিমানের অফিসে গেলাম ততক্ষণে তার রুমে তালা ঝুলছে। সেখান থেকে তাড়াতাড়ি চলে আসলাম নাগপোখারি বিমান বাংলাদেশের আরেক অফিস। সেটাও বন্ধ। এখন আর কিছুই করার নাই বুঝে গেলাম। আবার থামেল চলে গেলাম। হোটেল ঠিক করে আজ রাত থাকি তার পর দেখা যাবে কি হয়। থামেল এসে একটা হোটেল নিলাম, সারাদিনের ধকলে শরীরে জ্বর চলে আসছে।

রাতে আমি আর রিয়াদ ভাই বের হলাম স্ট্রিট ফুড যা পাব চোখের সামনে তাই সাবাড় করে দিব। ঝালমুড়ি, পানি পুড়ি, হরেক রকমের ভাজা পোড়া। আজ আর পেটে যায়গা নাই এবার ইস্তফা দিইয়ে রুমে চলে আসলাম। রুমে এসে মাহমুদ হাসান রাজিব ভাইকে নক দিলাম, কথাবার্তার এক পর্যায়ে তাকে বললাম আমাদের টিকিট নিয়ে সমস্যার কথা, সে বলল লিটন ভাইয়ের সাথে কথা বলতে সে নাকি বিমান বাংলাদেশে কাজ করেন। এটা শুনে আর দেরি না করে লিটন ভাইকে দিলাম ফোন সে বলল সকাল ৯ টায় একটা ফোন দিতে। অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে সাব্বির ভাইয়ের সাথে কথা হচ্ছে সে আমাদের ক্লাসের টিকিট ম্যানেজ করতে পারে নাই, কিন্তু অন্য ক্লাসে টিকিট আছে সেটা ব্যবস্থা করে দিতে পারবে। এ জন্য আমাদের টিকেট প্রতি আরো ৮-৯ হাজার টাকা বেশি গুনতে হবে। রিয়াদ ভাই তাতেই রাজি। সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করা লাগবে এর কোন বিকল্প আপাতত নাই। আমার শরীরে প্রচণ্ড জ্বর, তাই আমি শুয়ে আছি আর রিয়াদ ভাই দিব্বি আরামে মুভি দেখছে।

সকাল ৯ টায় লিটন ভাইকে ফোন করলাম, সে ১০ মিনিট সময় নিল, তার কিছুক্ষণ পরেই সে আমাদের জন্য ২১ তারিখের ২ টা টিকিট ম্যানেজ করে দিল। প্রতি টিকিটে  জরিমানা স্বরূপ আমাদের প্রায় ১০ ডলার দিতে হবে। লিটন ভাই নিজ পকেট থেকেই এই সব করল। আর আমাদের টিকিট মেইল করে দিল।

লিটন ভাইয়ের কথা কেন আগে জানলাম না, তা হলে আমাকে হয়তো এই জ্বর নিয়ে ঘরে শুয়ে থাকতে হত না। কারণ সে দিনের টিকিট নিয়ে যে ধকল গেছে তার ফল হিসাবেই এই জ্বর। আমরা যেখানে সায়াব্রুবেসিতে তাপমাত্রা পাই ৭-৮ ডিগ্রী অন্য দিকে থাকেলে ছিল ২৩-২৪ ডিগ্রী। এই তাপমাত্রার তারতম্যে আমার শরীর মানিয়ে নিতে পারেনি। আমাদের হাতে একদিন সময় আছে, আমরা থামেলে অলি গলি ঘুরব। রিয়াদ ভাইসহ ক্যামেরা নিয়ে বেড় হয়ে পরি, অলি গলির ছবি তোলার জন্য, কিন্তু শরীর খারাপ থাকায় আমি রুমে চলে আসি। সে রাতটাও কেটে গেল শরীর খারাপ নিয়ে। রাতে ব্যাগ গুছিয়ে রাখলাম সকাল হলেই বের হয়ে যাব।

খুব সকালে ঘুম ভেঙ্গে গেলো, শরীরটা এখন অনেক ভালো বোধ করছি, তাই রিয়াদ ভাইকে বললাম ভাই আজ যেহেতু চলে যাব কিছুক্ষণ বাদে। চলেন একটা ঢু মেরে আসি আর সকালের নাস্তাটাও সেরে নিব। রুম ছেড়ে বের হতেই পড়লাম বৃষ্টির কবলে, যেহেতু বলেছি বের হব তখন বের হবই। বৃষ্টি উপেক্ষা করেই বের হয়ে গেলাম। ঘণ্টা খানিক বাহিরে কাটানোর পরে রুমে চলে আসলাম। সকাল ১০:২০ মিনিটের দিকে আমরা রুম চেক আউট করে একটা ট্যাক্সি নিয়ে ত্রিভুবন এয়ারপোর্ট চলে আসি। আমাদের ফ্লাইট ১:৪৫ মিনিটে, আমরা এয়ারপোর্ট চলে গেলাম ১২ টার দিকে। বিমান বাংলাদেশের বিমানে চড়ে চলে আসলাম নিজ দেশের মাটিতে, অনেকটা দিন পর আজ বাসার মানুষগুলোকে দেখবো, সবার জন্য মনটা কেমন হাঁসফাঁস করছে।

আর এভাবেই একে অন্যের উপর ভরসা করে আমরা আমাদের অভিযানের শেষ করতে সক্ষম হই। লেখা যদি শেষ করতেই হয় তবে কিছু কথা বলে শেষ করতে চাই,

সত্য বলতে জীবন মানে শুধু যে টাকা পয়সা ঠিক তা নয়, জীবনে টাকা পয়সা হয়তো

আজ থাকবে, কাল হয়তো নাও থাকতে পারে, কিন্তু জীবনের চলার পথে এইসব সুখের মুহূর্তগুলো কখনো হারাবে না হাজারো মন খারাপের ভীড়ে। আমাদের এই জীবনের প্রতিটা ক্ষণ আমাদের বিভোর করে স্বপ্নে। আর আমরা সেই স্বপ্নগুলো পূরণ করতে ছুটি।

খরচ


ঢাকা টু কাঠমান্ডু বিমান ভাড়া ১৯৬০০ টাকা (১ জন, বিমান বাংলাদেশ, রির্টান টিকিটসহ)

এয়ারপোর্ট থেকে থামেল ট্যাক্সি ভাড়া ৬০০ রুপি

দিন-১: থামেলে রাত্রি যাপন =১২০০ রুপি (৩টি বেড ছিল)

দিন-২: থামেল থেকে মাছাপুখারি বাসস্ট্যান্ডের ট্যাক্সি ভাড়া ৩০০ রুপি (২.৫ কিমি রাস্তা)

মাছাপুখারি থেকে সায়াফ্রুবেসি ডিলাক্স বাস ভাড়া ৮০০ রুপি (৬০০ রুপিতেও করা যাবে)

ধুনচেতে ল্যাংট্যাং রেঞ্জের জন্য ট্রেকিং ফি ১৮০০ রুপি (জন প্রতি)

সায়াফ্রুবেসি রাত থাকা ও খাবার ১২০০ রুপি (দুই জনের জন্য)

দিন-৩: রিমচে তে রাতে থাকা ও খাবার ৬০০ রুপি (দুই জনের জন্য)

দিন-৪: ঘোরাতাবেলা তে দুপুরের খাবার ৫০০ রুপি (দুই জনের জন্য)

ল্যাট্যাং রাত্রি যাপন ও খাবার ৫০০ + ৮৫০ = ১৩৫০ (দুই জনের জন্য)

স্যাটালাইট ফোনে বার্তা প্রেরন ৩০০ রুপি (২ মিনিট)

দিন- ৫ ও ৬: কাইঞ্জিং গোম্বাতে থাকা ও খাওয়া ২৮০০ রুপি

দিন- ৭: ঘোরাতাবেলাতে দুপুরের খাবার ৫০০ রুপি (দুই জনের জন্য)

লামা হোটেলে রাতে থাকা ও খাবার ২৪০০ রুপি

দিন-৮: সায়াফ্রুবেসি রাত্রিযাপন ও খাওয়া ১৪০০ রুপি

দিন-৯: সায়াফ্রুবেসি টু মাছাপুখারি বাস ভাড়া ১২০০ রুপি

মাছাপুখারি থেকে থামেল ৫০০ রুপি; থামেলে একটা হোটেল উঠা

দিন-১০: ৯ম দিন  আর ১০ তম দিনের রুম ভাড়া আর খাবার সব মিলিয়ে খরচ হয় ৮০০০ রুপি (এই দিন খরচ ইচ্ছে করেই অনেকটা বেশি করি)

দিন-১১: ট্যাক্সিতে করে থামেল থেকে ত্রিভুবন এয়ারপোর্ট, ভাড়া ৬০০ রুপি
মোটামুটি খরচ ৩৫-৪০ হাজার টাকার মধ্যে শেষ করা যাবে ল্যাংট্যাং রেঞ্জ ট্রেক।

আমাদের কিছু ভুল


[১] আমাদের সবচেয়ে বড় ভুলটা হয় একদিন রেষ্ট না নিয়ে সামিটে চলে যাওয়া। একদিনে প্রায় ১০০০-১১০০ মিটার হাইট গেইন করাও অনেক কষ্টসাধ্য ব্যাপার ছিল।

[২] একটা সামিটের পরের দিন আবার আরেক টা সামিট পুশ দেয়া, যা কিনা মোটেও ঠিক হয়নি।

[৩] আবহাওয়া খারাপ দেখা সত্ত্বেও নিজেকে বিপদের দিকে ঠেলে সামিটের জন্য রওনা দেওয়া।

[৪] পাহাড়ে তাড়াহুড়া করা

[৫] প্রয়োজনের বেশি জামা কাপড় বহন করা।

 অভিযান থেকে শিক্ষা


  • নিজের সামর্থ্য বোঝা
  • পাহাড়ে তাড়াহুড়া না করা
  • সামিটিই একমাত্র লক্ষ্য না হওয়া
  • একটা ট্রিপ প্ল্যানের সমস্ত রুট সম্পর্কে জেনে যাওয়া, যার ফলে যে কোন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার মানসিকতা অর্জন করা।
  • ট্রিপমেট কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা বুঝা
  • স্থানীয় মানুষের সাথে দ্রুত মিশে যাওয়ার ফলে সৃষ্ট আনন্দ
  • যে কোন মুহূর্তে পরিকল্পনা পরিবর্তণের মানসিকতা রাখা
  • কোন কিছু জয় করার চেয়ে সেটা উপভোগ করার উপলব্ধি জন্মানো
(Visited 1 times, 1 visits today)
তন্ময় সজীব
তন্ময় সজীব
তন্ময় সজীব পেশায় একজন বস্ত্র প্রকৌশলী। নিত্য নতুন ডেনিম জিন্সের ডিজাইন আর গবেষণা করাই অন্যতম কাজ। পেশার পাশাপাশি ভালবাসেন ক্রিকেট খেলতে আর পাহাড়ে ঘুরে বেড়াতে। আট হাজার মিটারের কোন পর্বতে সম্পূর্ণ নিজের সক্ষমতায় আরোহণ করা তার স্বপ্ন।

২৩ thoughts on “ল্যাংটাং ডায়েরি

  1. [সমালোচনার পার্ট]
    সামিটে পৌছানোটা যদি লক্ষ্য না হয়, তাহলে লক্ষ্য কি ছিল? ল্যাংটাং ডায়েরি থেকে ল্যাংটাং সম্পর্কে তেমন কিছুই জানতে পারলাম না, শুধু ভ্রমণ কাহিণী ছাড়া। ল্যাংটাং এর ইতিহাস, জীবন-আচার, সংস্কৃতি, ভাষা, পেশা, আর্থ-সামাজিক অবস্থা ইত্যাদি সম্পর্কে কোন প্রকার তথ্য পেলাম না।

    [নিজস্ব মতামত]
    এতবড়, সুন্দর আর গোছানো একটা লেখা লেখছ কেমনে! তোমার অনেক ধৈর্য আছে বলতে হবে। আগামীতে আরো লেখা চাই। 🙂

    1. ঠিক বলস অনিক, ইনফরমেশন এর অভাব আসে । আশা করে পরবর্তী কোন লিখায় এই সব বিষয় গুলো মাথায় থাকবে।
      ধন্যবাদ ………

  2. এই অঞ্চলে আমি প্রথম ট্রেকিং ও ‘লাংসিসা-রি’ পিক এক্সপিডিশন করি ২০০৮ সালে, এরপর ২০১২ তে উইন্টার (জানুয়ারি মাসে) এক্সপিডিশন করি ‘নয়া কাংগা’ পিক। এছাড়া আরো দুইবার এসেছিলাম শুধুই ট্রেকিং করতে – অবশ্য সবই ভূমিকম্পের আগে। ভূমিকম্প পরবর্তী অবস্থাটা তোমাদের বর্ণনায় পেলাম। ধন্যবাদ।

    1. ধন্যবাদ বাবু ভাই, চেষ্টা ছিল গুছিয়ে লিখার। কতটুকু পেরেছি জানি না।

  3. অসাধারণ,,,,,,মানুষ গুলো যেমন সোজা-সাপ্টা
    গল্প টাও তেমন সাবলীল, সুন্দর।
    শুভ হোক আগামী স্বপ্নিল চলা।।।
    জিন্সপ্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার আর রিয়াদ ভাই কে একবস্তা ভালবাসা।।।

  4. অনেক ভালো লাগলো পরে, দুজনকেই অভিনন্দন, তন্ময় ভাই আপনার ৮০০০ মিটার আরোহণ করা যেন সফল হয়,
    নেপালি ১ রুপি = বাংলা কয় টাকা ভাই আর গাইড কে ১ সপ্তাহ এর জন্য কত রুপি দিয়েছিলেন?

  5. সুন্দর বর্ণনা, পুরোটুকু পড়লাম, চোখে ভাসছিলো সবকিছু। শুভ কামনা রইলো পরবর্তী স্বপ্ন পূরণের 🙂

  6. পোস্ট দেখেছি অনেক আগেই। কিন্তু পড়া হল আজ। সত্যি বন্ধু খুব ভাল লিখেছিস। আর ছবিগুলার জন্য রিয়াদ ভাই কে অনেক ধন্যবাদ। নতুন এক্সপিডিশনের কাহিনীর অপেক্ষায় রইলাম 😉

  7. একটানে পড়লাম ডায়েরি। অসাধারণ লাগলো! আরো বিস্তারিত হলে ভালো হতো। কখনো যাওয়ার আশা রাখি। ধন্যবাদ ভাই! পড়ার সুযোগ করে দেয়ার জন্য। আপনার চোখ দিয়েই দেখে নিলাম ল্যাংটাং রেঞ্জ। শুভ কামনা রইলো। ভালো থাকুন!

  8. এটা সাহিত্যের ছাঁচে লিখা কোন মেলোড্রামা নয়।সজিব আর রিয়াদ ভাই ট্রেকিংয়ের ফাঁকে গল্প করছে।মুখপ্রকৃতির বিষন্নতায় ডুবে যাচ্ছে।এ যেন মনের সুখে ল্যাটানো আর খুনসুঁটির গল্প।কোন বিকার নাই।আপন খুশিতে কখনো বা চরম বিরক্তি নিয়েও হেটে যাচ্ছে।একদম জীবন্ত সত্য ঘটনা।পড়েও মজা পেয়েছি।

    অভিযোগ!রিয়াদ ভাইকে এমনে পেছনে রেখে চলে গেলা সজীব?হা হা হা(জোকিং করলাম)চমৎকার ট্রাভেম্যাট!আর বুঝা পড়াও চমৎকার।এই দুজনের মাঝে আমি নিজেরে কল্পনা করছিলাম।সামনে স্পিড বয় সজিব,মাঝে রিয়াদ ভাই আর পেছনে শরীরটাকে টেনে টেনে সামনে এগুচ্ছি আমি….

    সজিব!বিশাল লেখা।আর লেখার হতও চমৎকার।মানুষ চিনতে হলে তার সাথে কিদিন ঘুরে আস-ভেতরের মানুষটা বেড়িয়ে আসবে।এটা আমারো মনের কথা।তোমার হাতে এমন আরো গল্পের ফুলঝুরি দেখতে চাই।

  9. ব্যাক্তিগত ডিটেইল খুব বেশী মাত্রায় চলে এসেছে লেখায়। এইজন্য মাঝে মাঝে পড়তে মনযোগ ছুটে যায়। স্থানীয় বিষয় গুলো যেমন, মানুষ, তাদের জীবন জীবিকার বৈচিত্রতা, প্রকৃতি ও পরিবেশ, ট্রেইল, খাবার দাবার ইত্যাদি বিষয়ে বিস্তারিত থাকলে আরো ভালো হত।

    1. আশা রাখি আগামি দিন গুলোতে আরো ভাল কিছু লিখার ট্রাই করব। প্রথম কোন মাধ্যমে লিখা বলে কি লিখবো আর কি ভাবে শুরু করব বুঝে উঠতে পারি নাই সালেহন ভাই।
      আপনার গুরুত্বপূর্ন মতামতের জন্য ধন্যবাদ ।

  10. নেপালে ট্রেকিং করতে হলে প্রথমেই আপনাকে টিমস কার্ড () সংগ্রহ করতে হবে । এটা পাবেন নেপাল টুরিজম বোর্ড অফিসে । সার্কভুক্ত দেশের লোকদের জন্য নেপালী ছয়শ রূপী লাগে টিমস কার্ড করতে । মুলত এর মাধ্যমে আপনি নথী ভুক্ত হলেন নেপালের ট্রেকারস ইনফরমেশন সিস্টেম এ। মনে রাখবেন টিমস/ টিমস কার্ড কোন এলাকার ট্রেকিং এর পারমিট না । কোন এলাকায় যেমন এভারেষ্ট রিজিয়ন , অন্নপূর্ণা রিজিয়ন ল্যাংটাং এসব জায়গা ভ্রমণের জন্য আলাদা পারমিট সংগ্রহ করতে হয় । ল্যাংটাং এলাকায় ট্রেকিং এর জন্য পারমিট ফী সার্ক দেশগুলোর জন্য ১৫০০ রূপী + ১৩ % ভ্যাট = ১৬৯৫ নেপালী রূপী ।

মন্তব্য করুন

*Please Be Cool About Captcha. It's Fun! :)