আমার রক ক্লাইম্বিংয়ে হাতেখড়ি


রক ক্লাইম্বিং, ফ্রি সলো এসব সম্পর্কে জেনেছি সম্ভবত এক বছর হল। ২০১৭ সালের মাঝের দিকে প্রফেশনাল রক ক্লাইম্বার অ্যালেক্স হনোল্ড যখন প্রায় ৩০০০ ফিট উঁচু রকওয়াল ‘এল ক্যাপিতান’ ক্লাইম্ব করলেন কোন রকম রোপ এবং সেফটি গিয়ার ছাড়া (ফ্রি সলো), সেটা দেখে তাকে আমার একটা বদ্ধ পাগল মনে হয়েছিল। রক ক্লাইম্বিং স্পোর্টসটাকেই আমার বড্ড রিস্কি মনে হতো। অদ্রি পাঠশালার রক ক্লাইম্বিংয়ের উপর একটা বেসিক কোর্সের ইভেন্ট দেখে ভাবলাম করেই ফেলি, যেহেতু বেসিক কোর্স আর যাই হোক হনোল্ডের মতো পাগলামী তো আর করাবে না । যেহেতু ট্রেকিং আমার বেশ পছন্দের, ট্রেকিংয়ের কঠিন দিকগুলো সেকশনগুলো হয়তো এই কোর্সের পর কম কঠিন লাগবে এই ভাবনাটাও মাথায় ছিল।

কোর্সের প্রথম দিন শুরু হলো ওয়ার্ম আপ হাইকিংয়ের মধ্য দিয়ে। আমাদের সবাইকে একটা বোল্ডারের সামনে বসিয়ে আমাদের ট্রেইনার সুদীপ্তদা রক ক্লাইম্বিংয়ের বেসিক নিয়ম-কানুন সম্পর্কে হালকা ধারণা দিলেন। পরিচিত হলাম বিভিন্ন রকম হোল্ডের সাথে। প্রাথমিকভাবে একটা তাত্ত্বিক ক্লাস শেষে আমাদের সামনে থাকা বোল্ডারেই শুরু হলো ব্যবহারিক ক্লাস। শুশুনিয়া পাহাড়ের বিভিন্ন রকফেস- ‘আনকামি’, ‘মানিকদা’, ‘চিমনি’র পাশে নাম না জানা দুইটি রকফেইসে আমাদের ক্লাইম্বিং মহড়া চলল। অনেকের কাছে সবচেয়ে সহজ আর মজার ছিল সম্ভবত চিমনি ক্লাইম্বিং। ‘শকুনি’ নামের বেশ কঠিন একটা রকফেসের পাশেই ছিল আরো একটা রক ফেইস। সেখানেও আমরা ক্লাইম্ব করলাম। শকুনি নামের ওভারহ্যাং রকফেসেও আমাদের কয়েকজন ক্লাইম্ব করার চেষ্টা করলো।

আমাদের দেশে ক্লাইম্বিং বলতেই আমরা বুঝি র‍্যাপ্লিং আর জুমারিং। এর পেছনে বাংলাদেশে তেমন রকফেসের অনুপস্থিতিও দায়ী। শুশুনিয়ায় আমরা দেশে শেখা ফিগার অফ এইট আর এসসেন্ডার দিয়ে র‍্যাপ্লিং-জুমারিংয়ের বাইরেও বিভিন্ন রকম র‍্যাপ্লিং ও জুমারিং করলাম। এর মাঝেই ফাঁকে ফাঁকে চলছিল তাত্ত্বিক ক্লাস এবং বিভিন্ন ক্লাইম্বিং গিয়ারের পরিচিতি। বিভিন্ন ক্লাইম্বিং গিয়ারের নাম ও ব্যবহার শিখলাম। তারমধ্যে বেশ কিছু মজার নাম ছিল- গ্রিগ্রি, ফ্রেন্ডস, চোক নাটস, পিটন ইত্যাদি।

সবকিছুই হচ্ছিল কিন্তু কোথায় যেন কিছু একটার অনুপস্থিতি অনুভব করছিলাম। নতুন কোন রক ফেইস দেখলেই কেমন যেন গলা শুকিয়ে আসতো। ঠিক যেন রক ক্লাইম্বিংয়ের ছন্দটা ধরতে পারছিলাম না। আমার সমস্যাটা প্রশিক্ষক সুদীপ্তদার চোখ এড়ায়নি। আমি রক ফেইসে বড্ড তাড়াহুড়ো করছিলাম, যে কারণে খুব সহজেই পেশিগুলো ফ্যাটিগ হয়ে যাচ্ছিলো।

কোর্সের চতুর্থ এবং শেষ দিন। হারনেস পরে ক্যারাবিনারের সাথে সেফটি রোপের ফিগার অফ এইট জুড়ে দিয়ে যখন বললাম ‘ক্লাইম্বিং’, প্রতিবারের মতো চারপাশের সব কিছু স্তব্ধ হয়ে গেল। আমার সামনে শুধু একটা রকফেইস। দাদার কথা অনুযায়ী মাথা থেকে, ‘উপরে উঠতেই হবে’ এ জাতীয় চিন্তা দূর করে দিলাম। প্রতিবার হোল্ড ধরে বডিটাকে একটু করে উপরে তুলছিলাম আর ঐ অবস্থানেই নিজেকে কম্ফোর্টেবল করে নিচ্ছিলাম। তাড়াহুড়ো বাদ দিয়ে যখনি ভাল ফুটহোল্ড পাচ্ছিলাম, তখনি একটু জিড়িয়ে নিচ্ছিলাম। আস্তে আস্তে রকফেসে ঝুলে থাকাটা অনুভব করা শুরু করলাম। টের পাচ্ছিলাম ভেতরের অ্যাড্রেনালিন রাশ। হোল্ডটা আঁকড়ে ধরেও ক্লান্তিজনিত কারণে আর ক্যারাবিনার স্পর্শ করতে পারলাম না। কিন্তু একটুও খারাপ লাগছিলো না আমার। কারণ সেই শেষদিনের ক্লাইম্বেই আমি রক ক্লাইম্বিং এর ছন্দটা অনুভব করেছিলাম। যখন আমাকে বিলেয়ার নামাচ্ছিলো নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে দেখি উত্তেজনায় লোমগুলো দাঁড়িয়ে গেছে।

রক ক্লাইম্বিং কি সেটা চারদিনের কোর্সে বোঝাটা অনেকটাই অসম্ভব বলে মনে হয় আমার কাছে। পুরো বিষয়টা এক বিশাল সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে পা ভেজানোর মতো। এখনো এর আরো অনেক রুপ দেখা বাকি। ছোটবেলায় যখন বাসার সামনে বিকেলে ক্রিকেট খেলে সন্ধ্যায় পড়তে বসতাম, মনের অজান্তেই বলটা নিয়ে কখনো ব্রেট লি, কখনো বা নাথান ব্রেকেন আবার কখনো শেন ওয়ার্নের মতো হাত ঘুরাতাম। জীবনে একটাও বৈধ ডেলিভারি করতে পেরেছিলাম কিনা সন্দেহ আছে। কিন্তু তারপরও মনের আনন্দে হাত ঘুরাতাম। ঠিক তেমনিভাবে এই কোর্সের পর আনমনেই কখনো শূন্যে জাগ হোল্ড, আন্ডার কাট, সাইড কাট ধরছিলাম এবং এখনো ধরি। এখানেই হয়তো স্পোর্টসের রহস্য লুকিয়ে আছে।

ধন্যবাদ অদ্রি পাঠশালাকে এমন একটা স্পোর্টসের সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্যে। একসময়ের মনে হওয়া বড্ড ঝুঁকিপূর্ণ এই স্পোর্টসের স্বাদ আবার গ্রহণ করবো।


লেখক অদ্রি পাঠশালার বেসিক রক ক্লাইম্বিং কোর্সের ২য় ব্যাচের প্রশিক্ষণার্থী।

(Visited 1 times, 1 visits today)

মন্তব্য করুন

*Please Be Cool About Captcha. It's Fun! :)