অভিযান বিবরণী: মিশন মাউন্টেইন ক্রেস্ট

মেন্টক কাংড়ি

ভূমিকা
দেশে কিছুটা ট্রেকিং করলেও দেশের বাইরে পর্বতারোহণ করা হয়নি কখনো। আর প্রত্যেক ট্রেকারেরই স্বপ্ন থাকে পর্বতারোহণের। সেই স্বপ্ন থেকেই আমাদের অনেক দিনের পরিকল্পনা; যার জন্য প্রয়োজন অর্থ, সময় ও শারীরিক সক্ষমতা। আমাদের ইচ্ছা ভারতের জম্মু ও কাশ্মীর প্রদেশে অবস্থিত বিশ হাজার ফুট উচ্চতার কোন পর্বত এবং প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে সেটাতে আরোহণ করা। সেই হিসেবে আমরা লেহর চ্যামসার কাংড়ি, লুমসার কাংড়ি, মেন্টক কাংড়ি এবং ডোজো জংগোকে তালিকায় রাখি। মূলত আমার সঙ্গী মনিরের মূল দায়িত্ব ছিল পর্বত নির্ধারণ করা। আমাদের প্রথম পছন্দ ছিল চেমসার ও লুমসার কাংড়ি। কিন্তু ভারত ও তিব্বত সীমান্তে এর অবস্থান হবার কারণে ২০১৪ সাল থেকে সেখানে সব ধরনের এক্সপিডিশন নিষিদ্ধ করা হয়। এখানে যেতে হয় সো-মোরিরি লেকের পাশে অবস্থিত কার্যক ভিলেজ থেকে। মনির ই-মেইলের মাধ্যমে কার্যক ভিলেজের এক লোকের সাথে যোগাযোগ করে এবং উনি মনিরকে আশ্বস্ত করেন চ্যামসার ও লুমসার কাংড়ির ব্যাপারে সাহায্য করবেন। এই এক্সপিডিশনের জন্য আমরা পাঁচ জনের একটি গ্রুপ করি। নাম নির্ধারণ করি “মিশন মাউন্টেইন ক্রেস্ট, টিম বাংলার ট্রেকার”।

হাওড়া স্টেশন থেকে দিল্লী যাবার সময়। মূল এক্সপিডিশন শুরুর পূর্বে আমাদের পাঁচ সদস্যের দল।

যাত্রা শুরু
৮ জুলাই ২০১৬ অর্থাৎ রোজার ঈদের পরদিন রাতে আমি, মনির ও শান্তনু ঢাকা থেকে কলকাতার উদ্দেশে রওনা দেই এবং আমাদের অপর দুই সঙ্গি লনী ও মিথুন পাবনা থেকে রওনা দিয়ে আমাদের সাথে কলকাতায় যোগ দেয়। সবাই নিরাপদে কলকাতায় পৌঁছে রাতটা কলকাতাতেই কাটিয়ে দেই। ঈদের ছুটির চাপ থাকার কারণে দিল্লি যাবার প্লেন ও ট্রেনের ভাড়া কয়েক গুণ বেড়ে গিয়েছিল। স্টেশনে গিয়ে টিকিট না পাওয়ায় রাতে এক এজেন্টের মাধ্যমে দিল্লী যাবার জন্য ৬৫০০ রুপী করে রাজধানী এক্সপ্রেসের টিকেট কাটতে বাধ্য হই। উচ্চ মূল্যে টিকেট কাটার কারণ একটাই, সময় নষ্ট না করা।

দুপুর ২ টায় হাওড়া ষ্টেশন থেকে রওনা দিয়ে আমরা পরদিন সকাল ১০ টা নাগাদ দিল্লী পৌঁছে যাই। দিল্লীর পাহাড়গঞ্জে একটি আবাসিক হোটেলে কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে বিকালে মানালীর উদ্দেশে রওনা দিয়ে দেই এবং পরদিন ১২ জুলাই বেলা ১১ টার দিকে মানালী পৌঁছাই। খাওয়া দাওয়া ও কিছু কেনাকাটা করে সন্ধ্যা ৬ টার দিকে ১৪,০০০ রুপিতে ভাড়া করা একটি যাইলো জীপে করে লেহর উদ্দেশে রওনা হই।

মানালী থেকে লেহর পথে।

 

লাচুংলা পাস।

সারচুতে হোঁচট
পাহাড়ি আঁকাবাকা ভয়ংকর রাস্তায় আমাদের গাড়ি চলতে থাকে। রোহটাং পাসে নেমে কিছু ছবি তুলে আবার দেই রওনা। কোকসার, শিশু, টান্ডি, কেলং, জেসপা হয়ে রাত ১১.৩০ টায় আমরা সারচু পৌঁছাই। পথিমধ্যে দলের ২ জন সদস্য অসুস্থ হয়ে যাবার কারণে আমরা রাতটা সারচুতে থাকার সিদ্ধান্ত নেই। একটা ধাবাতে রাতের খাবার খেয়ে পাশের একটি ঘরে থাকার জন্য যাচ্ছিলাম। আমাদের টর্চ লাইটগুলো গাড়ীর ছাদে বাঁধা ব্যাগের ভেতর থেকে যাওয়ায় রাতের অন্ধকারে পাথরের সঙ্গে হোঁচট খেয়ে পড়ে যাই। এতে আমার কপালের বাম পাশে গভীর গর্ত সৃষ্টি হয় এবং সেখান থেকে প্রচুর রক্ত ক্ষরণ হতে থাকে। টিস্যু দিয়ে চেপে রেখে ঘুমানোর চেষ্টা করি, প্রচণ্ড ব্যথা সত্ত্বেও একটানা লম্বা ভ্রমণের ক্লান্তির ফলে ঘুমিয়ে পড়ি।

অবশেষে লেহ
পরদিন সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে লেহর উদ্দেশে রওনা দিয়ে ১০টার দিকে পাংয়ে পৌঁছে সেখানকার সেনা ক্যাম্প থেকে ফার্স্ট এইড নিয়ে নেই। সেনাবাহিনীর সদস্যদের ব্যবহার আমাদের মুগ্ধ করে। চিকিৎসার পাশাপাশি উনারা আমাদের গরম পানি খেতে দেন এবং পথে খাওয়ার জন্য সাথে করে দিয়ে দেন। পাশে একটি দোকানে নাস্তা সেরে আমরা আবার যাত্রা শুরু করি এবং টাংলাংলা পাস ও উপচি হয়ে অবশেষে আমরা বেলা সাড়ে তিনটায় লেহ পৌঁছাই। অনেক খোঁজাখুজি শেষে মঙ্গল চাঁদ নামে একটি গেস্ট হাউজে উঠে পড়ি। এই এলাকার গেস্ট হাউজগুলো অনেক সুন্দর। প্রতিটি গেস্ট হাউজেই আছে ফুল ও সবজির বাগান। বাড়ির মালিক পাশাপাশি কয়েকটি রুম ভাড়া দেন। আমাদের ঘরটি দিনপ্রতি ১৫০০ রুপি ভাড়া হলেও আমরা পাঁচজন থাকায় দুটি অতিরিক্ত বিছানাসহ মোট ২০০০ রুপি দিতে হয়। ব্যাগ রেখে আমি লেহর সরকারী হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য চলে যাই। ইতোমধ্যে আমার বাম চোখ পুরো ফুলে যায় এবং প্রচণ্ড ব্যথায় জ্বর চলে আসে।

লক্ষ্য চূড়ান্তকরণ ও শেষ সময়ের প্রস্তুতি
ডাক্তার দেখিয়ে সন্ধ্যার দিকে মনির ও আমি আমাদের অভিযানের জন্য অনেকগুলো এজেন্টের কাছে যাই। কিন্তু চ্যামসার ও লুমসার কাংড়ি নিষিদ্ধ হওয়ার কারণে কেউ আগ্রহ প্রকাশ করল না, তাই আমরা মেন্টক কাংড়ি নিয়ে কথা বলি। যার মূল চূড়ার উচ্চতা ৬২৫০ মিটার বা ২০,৫০০ ফুট এবং অবস্থান লাদাখের রূপসু উপত্যকায়। প্রাকৃতিক লেক সো-মোরিরির পাশে অবস্থিত কার্যক ভিলেজ থেকে যেতে হবে সেখানে।

মেন্টক কাংড়ির জন্য এজেন্টগুলো জনপ্রতি ৪০ থেকে ৪১ হাজার রুপি দাবী করে, যদি গ্রুপ সদস্য চার জন হয়। হোটেলে ফিরে এসে আমরা নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করলাম। আমার কাছে একটি এজেন্টকে খুব প্রফেশনাল মনে হয়েছে কিন্তু তার প্রতিষ্ঠানের নাম এখন ঠিক মনে করতে পারছি না; তবে আমাদের ওয়াসফিয়া নাজরীনও নাকি তার মাধ্যমে ঐ এলাকায় একটি এক্সপিডিশন করেছিল। কিন্তু মনিরের ইচ্ছে বাংলাদেশ থেকে কার্যক ভিলেজের যে লোকের সাথে কথা হয়েছে তার মাধ্যমে এক্সপিডিশন করার। ওর অতি আগ্রহের কারণে আমিও রাজি হয়ে যাই। আমরা সিদ্ধান্ত নেই আমরা তিনজন সামিটে যাব আর বাকি দুইজন কার্যক ভিলেজ পর্যন্ত যাবে। সেই হিসেবে মনিরের পছন্দের লোকের সঙ্গে আমাদের এক লাখ ত্রিশ হাজার রুপিতে চুক্তি হয়; যার মধ্যে ছিল ডিসি অফিস থেকে আমাদের পাঁচ জনের কার্যক ভিলেজের অনুমতি নেওয়া, লেহ থেকে কার্যক যাওয়া-আসার রিজার্ভ জিপ ভাড়া, তিন জনের এক্সপিডিশন বাবদ সকল খরচ ও বাকি দুই জনের কার্যকে এক দিন থাকা-খাওয়ার খরচ।

আমাদের প্রয়োজনীয় সব সরঞ্জামের একটি তালিকা করে দেই আমরা। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে পরদিন আমাদের যেতে হবে সো-মোরিরি লেক। আমি তখন প্রচণ্ড জ্বর ও ব্যথায় বিছানায় ছিলাম। কপালের ক্ষতের জন্য উচ্চ মাত্রার এন্টিবায়োটিক ও ব্যথানাশক খেয়ে এমনিতেই শরীর অনেক দুর্বল হয়ে গিয়েছিল আবার সাথে উচ্চতাজনিত সমস্যা তো ছিলই। আবার এতোগুলো টাকার কথাও ভাবছিলাম। শেষ পর্যন্ত যদি যেতেই না পারি তাহলে এতগুলো টাকা জলে যাবে। আর যদি ফিরে চলে যাই তাহলে আবার কবে সময় হবে? তাই যাবার সিদ্ধান্তই নিলাম।

সো-মোরিরি লেক

পরদিন সকালে আমরা সো-মোরিরির লেকের উদ্দেশে রওনা দেই এবং অন্য গাড়িতে আমাদের সরঞ্জামাদি যায়। প্রায় ৮ ঘণ্টা পর আমরা কার্যক ভিলেজ পৌঁছালে স্কার্মা নামের একজন আমাদের রিসিভ করে। রাতের খাবার খেয়ে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নিজেদের মাঝে আলোচনা করে এজেন্টের তাঁবুতে গিয়ে ঘুমাতে ঘুমাতে প্রায় দুইটা বেজে যায়।

সো-মিরিরি লেকের পাশে কার্জক ভিলেজ। বেইজ ক্যাম্পের উদ্দেশে রওনা হবার আগে।


বেইজ ক্যাম্পে সঙ্গীর অসুস্থতা
১৭ জুলাই সকাল ১০ টায় অসুস্থ শরীরে আল্লাহর নাম নিয়ে বেইজ ক্যাম্পের উদ্দেশে আমি, মনির ও শান্তনু হাঁটা শুরু করি। বিকাল ৫ টার দিকে আমরা ১৭৬০০ ফুট উচ্চতার বেইজ ক্যাম্পে পৌঁছাই। শরীর খুবই খারাপ লাগছিল আমার, তাই সাথে সাথেই ঘুমিয়ে পড়ি। কিন্তু কিছুক্ষণ পর পর আমার গাইড এসে ডাকাডাকি শুরু করে। একবার স্যুপ নিয়ে আসে, একবার কফি, আবার এসে হট ব্যাগ দেয় আর অতিরিক্ত একটি স্লিপিং ব্যাগ পড়ায়। আমার ঘুম ভাঙ্গানোর ফলে আমি খুব বিরক্ত হয়ে এর কারণ জানতে চাই। তখন সে জানায় আমাদের অপর সঙ্গী শান্তনুর শারীরিক অবস্থা খুব খারাপ। আমি ঘুমিয়ে পড়ার কারণে সে আমাকে নিয়েও ভয় পাচ্ছিল, তাই এমনটি করছিল। আমি উঠে কিচেন টেন্টে যাই। গিয়ে দেখি শান্তনুর বুকে ও পায়ে সরাসরি হট ব্যাগ দেওয়া। কিন্তু তাতেও তার কোন অনুভূতি দেখা যাচ্ছিল না। অনেক ডাকাডাকির পরেও চোখ মেলছে না বলে আমি ভয় পেয়ে যাই এবং খারাপ কিছু ঘটেছে বলে মনে করি। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ শান্তনু চোখ মেলে ওঠে, আমি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলি। হাইপোথার্মিয়ায় ও উচ্চতাজনিত কারণে ওর এমনটা হয়েছিল। আমি শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম। আসলে কঠিন পরিস্থিতি সবাইকে কেমন যেন বানিয়ে দেয়। আমাদের গাইডরা সারারাত কিচেন টেন্টে চুলা জ্বালিয়ে রাখে এবং শান্তনুর দিকে খেয়াল রাখে।

মেন্টক বেইজ ক্যাম্পের কিচেন টেন্ট


ঝুঁকিতে সামিট পুশ
পরদিন সকাল ১০ টায় একজন গাইডের মাধ্যমে শান্তনুকে কার্যক ভিলেজে পাঠিয়ে দেওয়া হল। এ কারণে সেদিন আমরা আর সামিট পুশ দিতে পারলাম না, সারাদিন বেইজ ক্যাম্পে শুয়ে বসে কাটাতে হল। দুপুরের দিকে বৃষ্টি  শুরু হয় আর বাতাস তো আগে থেকেই ছিল। সিদ্ধান্ত হল আমরা রাত ২.৩০ এর দিকে সামিট পুশ দিব।

রাতে বাতাসের কারণে আমাদের কিচেন টেন্টের এক পাশ ওঠে যায়। যথা সময়ে ঘুম থেকে উঠলেও বাতাসের কারণে নির্ধারিত সময়ে বের হতে পারলাম না। প্রস্তুত হতে গিয়ে দেখি আমাদের ক্যারাবিনার, হারনেস, জুমার, আইস স্ক্রু, বৃষ্টি প্রতিরোধক ও পথে আগুন জ্বালানোর জন্য তেমন কিছুই নেই। এসব ছাড়া সামিটের জন্য বের হওয়া খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এসব ভেবে মাথা খারাপ হয়ে যায় এবং নিজের উপর খুব রাগ হয়। কেন আমি মনিরের কথায় সিদ্ধান্ত নিলাম এবং কেন আমি আমার পছন্দের এজেন্টের কাছে গেলাম না! এখন কি করব? এমনিতে একদিন নষ্ট হয়ে গেছে, লেহ থেকে আনতে হলে কয়েক দিন লেগে যাবে। হয় ফিরে যেতে হবে না হয় মেঘলা আকাশের মধ্যে এসব ছাড়াই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পুশ দিতে হবে। পরে সিদ্ধান্ত নিলাম যা হবার হবে! এত বিপদ যখন পার করে এসেছি, সামিট পুশ দিবই।

রিজে উঠার ছবি।
রিজে উঠার ছবি।

 

মেন্টক কাংড়ি সামিটের মূল রিজে উঠার সময়।


কঠিন সিদ্ধান্তের সম্মুখে
প্রস্তুত হয়ে বের হতে হতে ভোর সাড়ে পাঁচটা বেজে গেল। আমার কিছুটা ধীরগতির কারণে মনির আমার থেকে অনেকদূর এগিয়ে যায়। পাথরের উপর দিয়ে ট্রেক শেষ হয়ে স্নোতে ট্রেক শুরু হয়। তখন আমরা স্নো বুট ও ক্রাম্পন পড়ে হাঁটা শুরু করি। কিছু কিছু জায়গায় স্নোতে হাঁটু পর্যন্ত ডেবে যাচ্ছিল; খুব কষ্ট হচ্ছিল এভাবে। এক পর্যায়ে আমরা রিজে উঠার ঢালে এসে পড়ি। ঢালটা কিছুটা খাড়া ছিল। মনির উপরে উঠতে থাকে, আমি ওর পিছনে পিছনে। হঠাৎ পিছনের দিকে তাকিয়ে ভয় পেয়ে দাড়িয়ে যাই, কারণ আমি দড়ি ছাড়া অনেকটা পথ উঠে গেছি। আমাদের এক গাইড উপরে উঠে দড়ি ফেললে মনির তা দিয়ে উপরে উঠে যায় এবং আমি নিচে দাঁড়িয়ে দড়ির জন্য অপেক্ষা করি। পরে গাইড দড়ি নিয়ে ফেরত আসলে আমি বাকিটুকু উঠি।

মেঘলা আকাশ। আবহাওয়া ছিল খারাপ।

আমরা যখন মূল রিজে উঠি তখন দুপুর ২:১৩ বাজে। এর মধ্যে বাতাস শুরু হয়। তাদের ভাষ্য মতে তখনো আরো প্রায় দুই ঘণ্টার পথ বাকি। এই অবস্থায় এই বাতাসের মধ্যে গিয়ে সামিট করতে পারলেও ফিরে আসাটা ঝুঁকিপূর্ণ হবে। তাই গাইডরা আর সামনে এগোতে অপারগতা প্রকাশ করে। এক পর্যায়ে মনিরও যাবে না বলে সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু আমি কিছুতেই ফিরে আসতে চাচ্ছিলাম না। পরবর্তীতে সবার সুরক্ষার কথা ভেবে ফিরে আসার সিদ্বান্ত নেই অনেক কষ্ট হওয়া সত্ত্বেও। কারণ আমরা মূল রিজে উঠে গিয়েছিলাম তখন, বাকি পথটুকু রিজ ধরে যেতে হলেও তেমন খাড়া বা ঝুঁকির ছিল না। কিছু ছবি তুলি এবং জিপিএস রিডিং নিয়ে নেই; ১৯,৭৪১ ফুট পর্যন্ত উচ্চতা পাই।

 

জিপিএস রিডিং

 

মূল রিজের উপরে। আর কিছু পরেই সামিট। কিন্তু বাতাসের কারণে ও দুপুর ২.১৩ হওয়ায় এই স্থান থেকে ফিরে আসি। এটা আমার ট্রেকিং করা সর্বোচ্চ হাইট গেইন। ১৯,৭৩৩-৪১ ফুট পর্যন্ত পেয়েছি।
মূল রিজের উপরে। আর কিছু পরেই সামিট। কিন্তু বাতাসের কারণে ও দুপুর ২.১৩ হওয়ায় এই স্থান থেকে ফিরে আসি। এটা আমার ট্রেকিং করা সর্বোচ্চ হাইট গেইন। ১৯,৭৩৩-৪১ ফুট পর্যন্ত পেয়েছি।
আমাদের মূল গাইড পিছলে যাবার পর আমরা নিচে পড়ে গেলে আমি সেল্ফ এরেস্ট করি।
আমাদের মূল গাইড পিছলে যাবার পর আমরা নিচে পড়ে গেলে আমি সেল্ফ এরেস্ট করি।

অবরোহণে আপাতন
বেলা ৩ টা, হালকা নাস্তা করে রিজের ঢাল দিয়ে নামা শুরু করি। যেহেতু ঢাল বেয়ে নামাটা একটু ঝুঁকির, আর আমাদের সাথে হারনেস, ক্যারাবিনার কিছুই নেই তাই চার জন কোমরে দড়ি বাঁধি। সবার উপরে আমাদের মূল গাইড, তারপর মনির, এরপর আমি এবং শেষে আমাদের সহকারী গাইড। বরফের গুড়ি–গুড়ি মোটা আস্তরণে ক্রাম্পন দিয়ে জোড়ে জোড়ে আঘাত করে পা আটকাতে হচ্ছিল। এভাবে আমরা অল্প কিছু সময় নামার পর হঠাৎ আমাদের মূল গাইড পিছলে গিয়ে নিচের দিকে দ্রুত পড়ে যেতে থাকে। আমি চিৎকার দিয়ে মনিরকে আইস অ্যাক্স আটকাতে বলি। কিছুক্ষণের মধ্যে গাইড ও মনির আমার দিকে ধেয়ে আসে! কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুজনের টানে আমিও খুব জোড়ে পড়ে যাই।

যতটুকু বুঝতে পারি আমি উপুড় হয়ে পড়ি এবং আমার মাথা নিচে এবং পা উপরের দিকে ছিল। আমি নাকে আঘাত পাই। নিচের দিকে পড়তেই থাকি। অনেক চেষ্টার পর আমি মাথা উপরের দিকে উঠাতে সক্ষম হই এবং আইস অ্যাক্সটি বরফের মধ্যে সজোরে চেপে ধরে সেল্ফ এরেস্ট করতে সক্ষম হই। একটু পরেই মনিরের ডান পায়ের সাথে আমার মাথা সজোরে ধাক্কা খায় এবং মনির আমার বাম কাঁধের উপর বসে পড়ে। আমি ওর আইস অ্যাক্সটি ভালভাবে বরফে আটকাতে বলি। ভাগ্য ভালো মনিরের ডান পায়ের স্নো বুট আগেই ক্রাম্পনসহ খুলে গিয়েছিল। তা না হলে ওর ক্রাম্পনের কারণে আমি মাথায় আঘাত পেতে পারতাম। পরে দেখি আমার বাম হাতের ট্রেকিং পোলটি নেই, মাথার গ্লাস নেই । আমরা প্রায় ১৫০ ফুটের মত নিচে পড়েছি। পরে আস্তে আস্তে বেইজ ক্যাম্পে ফিরে আসি। রাতে বেইজ ক্যাম্প থেকে পরের দিন কার্যক ভিলেজের উদ্দেশে রওনা হয় এবং পরবর্তীতে লেহ মানালি হয়ে ২৫শে জুলাই দেশে ফিরে আসি।

 


উপসংহার
জীবনের প্রথম পর্বতারোহণে এরকম তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে আমাদের দেশে ফিরে আসতে হয়। মহান আল্লাহর দরবারে লাখো শুকরিয়া এত কিছুর পরও সবাই সুস্থভাবে ফিরে আসতে পেরেছি। তারপরও প্রাপ্তি অনেক; এত উচ্চতায় নিজেকে মানিয়ে নিতে পেরেছি, উপভোগ করতে পেরেছি প্রকৃতির নয়নাভিরাম সৌর্ন্দয্য।


পরামর্শ
স্বল্প অভিজ্ঞতা থেকে এক নজরে আমাদের এ অভিযানে যা যা ভুল ছিল এবং কিছু পরামর্শ এখানে উল্লেখ করা হল। হয়তো আপনাদের কাজে লাগতে পারে:

[১] যদি ঈদ বা কোন বড় ছুটিতে যান তবে অবশ্যই যাওয়ার আগে আগাম টিকেট কেটে রাখবেন। আমাদের এক জনের ভিসা পেতে বেশি সময় লাগায় আমরা আগাম টিকেট কাটতে পারিনি। পরবর্তীতে অনেক উচ্চমূল্যে কিনতে হয়েছে।

[২] অবশ্যই সময় বাড়িয়ে পরিকল্পনা করবেন আর বিশ্রাম নিয়ে নিয়ে যাবেন। আমাদের সময় কম থাকার কারণে আমরা ঢাকা থেকে লম্বা ভ্রমণ করে লেহ কোন বিশ্রাম না নিয়েই পৌঁছেছি।

[৩] অবশ্যই দলের সদস্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে আগে এক সাথে ভ্রমণ করেছেন এমন সদস্য নিবেন। তাহলে তার শারীরিক ও মানসিক সামর্থ্যের বিষয়ে অবগত থাকবেন। তা না হলে অযথা সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। অবশ্যই চূড়ান্ত পরিকল্পনাটা গ্রুপের অন্তত দুই জন মিলে করবেন। এক জনের উপর নির্ভর করলে তার ভুল হতে পারে যা পরবর্তীতে পুরো অভিযানটাই নষ্ট হবার পেছনে কারণ হতে পারে।

[৪] যদি কারো পরিচিত এজেন্টের রেফারেন্স থাকে তাহলে আলাদা বিষয়; তা না হলে আগে থেকে অনলাইনে না করে, স্বশরীরে গিয়ে কয়েকজনের সাথে কথা বলে তারপর চূড়ান্ত করবেন। আমরা ই-মেইল ও ফোনের মাধ্যমে যার সাথে মোটামুটি কথা চূড়ান্ত করে গিয়েছিলাম যাওয়ার পর দেখি তার কোন অফিসই নেই।

[৫] প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি অবশ্যই নিজে চেক করে নিবেন। যদি একটিও কম থাকে তাহলে লক্ষ্য অর্জনে ঝুঁকি থেকে যাবে। গাইডদের সরঞ্জামাদিও ঠিক আছে কিনা তা দেখে নিবেন। আমাদের যেমন হয়েছিল, আমাদের গাইডেরা দুজনে একটি করে ক্রাম্পন পড়েছিল আর এ কারণেই তারা পিছলে যায়।

[৬] প্রথম এক্সপিডিশন হয়ে থাকলে পর্বত নির্ধারণে অবশ্যই সহজ ট্রেকিং পিক বেছে নিবেন এবং উচ্চতা যাতে ১৯ হাজারের মধ্যে হয়। এতে আপনার সফলতার সম্ভাবনা বেশি থাকবে এবং আপনার আত্মবিশ্বাসের মাত্রা বেড়ে যাবে। সেই সাথে আপনার সামর্থ্য সম্পর্কেও জানতে পারবেন। আমরা তা করিনি। আমাদের নির্ধারিত পিকটি ট্রেকিং পিক হলেও কিছুটা টেকনিক্যালটি ছিল এবং এটাতে এক্সপিডিশন খুব কম হয়।

[৭] অবশ্যই আবহাওয়ার পূর্বাভাস নিয়ে যাবেন। আমাদের মূল এক্সপিডিশন জুলাইয়ের ১৬ তারিখ শুরু হলেও, গিয়ে আবহাওয়ার রির্পোটে দেখি ১৫ থেকে ৩০ তারিখ পর্যন্ত তা খারাপ থাকবে।

[৮] নিজেদের অবস্থা আগে দেখবেন, পাহাড় পাহাড়ের জায়গায় থাকবেই। আমি জ্বরাক্রান্ত শরীর নিয়ে কোন বিশ্রাম ছাড়াই মূল এক্সপিডিশন করি। যা ছিল আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। এত উচ্চতায় এরকম সিদ্ধান্ত আমার মৃত্যুর কারণও হতে পারত। এজেন্টের মাধ্যমে করলে অবশ্যই রিজার্ভ ডের ব্যাপারে চূড়ান্ত করবেন এবং প্রয়োজনে হাই ক্যাম্পের কথাও বলবেন। আমাদের একজন সদস্য বেইজ ক্যাম্পে অসুস্থ হয়ে পড়ায় পরদিন ওকে ফেরত পাঠাতে হয়। এ কারণে আমাদের এক দিন নষ্ট হয়ে যায়। আর সেদিন খারাপ আবহাওয়ার কারণে ফিরে আসার পরে পরবর্তী চেষ্টাটা করতে পারিনি। যদি হাই ক্যাম্পের জন্য একদিন বরাদ্দ থাকতো তাহলে খুব সহজেই আমাদের সামিট হয়ে যেত বলে মনে করি।

[৯] আবহাওয়া বা অন্য কোন কারণে বিশেষ করে সামিট পুশের দিন নির্দিষ্ট সময় যদি বের হতে না পারেন তা হলে সেদিন হাইক্যাম্প করবেন অথবা বেইজ ক্যাম্পেই থেকে যাবেন। বাতাসের কারণে আমরা নির্ধারিত সময়ের তিন ঘণ্টা পরে বের হই, ফলে আমরা সেদিন সামিটে যেতে পারি নাই।

 

(Visited 1 times, 1 visits today)
নিজাম উদ্দিন
নিজাম উদ্দিন
বাংলাদেশের পাহাড় ও জলপ্রপাতগুলোয় ঘুরে বেড়ানোর নেশায় মত্ত থাকেন নিজাম উদ্দিন। শুধু নিজেই ট্রেকিং করেন না, অন্যদের ট্রেকিংকেও সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করতে তিনি যেন এক উন্মুক্ত তথ্যভাণ্ডার।

৮ thoughts on “অভিযান বিবরণী: মিশন মাউন্টেইন ক্রেস্ট

  1. অনেক ভাল লাগল, আর ভুল গুলো নিয়ে লিখাতে সবাই আরো সাবধানি হয়ে পরিকল্পনা করবে বলি আশা রাকি । দারুন লেখনি নিজাম ভাই ।

  2. Good Read
    চূড়া বিজয়ের চেয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে সর্বোচ্চ লেভেল এ যাওয়াটা কেন জানি সার্থক মনে হয়।

  3. কেউ ট্রেকিংয়ে যাওয়ার আগে টিপস গুলো ফলো করলেই সাকসেস রেট অনেক বেড়ে যাবে বলে আমার মনে হয়।

মন্তব্য করুন

*Please Be Cool About Captcha. It's Fun! :)