প্রতিক্রিয়া: মৃদুলার এভারেস্ট অভিযান


বাংলাদেশি একজন মেয়ে ( আমাতুন নুর (মৃদুলা)) এবার প্রি-মনসুন মৌসুমে এভারেস্ট অভিযানে যাচ্ছে- অদ্রিতে এমন একটা খবর যখন প্রকাশিত হল তখন আমি কাপ্তাইয়ে। এবছর এমন কিছু হবে আগে থেকে আভাস থাকায় খবরটা পড়ে খুব বেশি অবাক হইনি। কয়েকমাস আগে এক টেলিকম কোম্পানীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছ থেকে জেনেছিলাম মৃদুলা এভারেস্ট যাবার জন্য প্রাণপণ স্পন্সর খুঁজছে। শেষ পর্যন্ত শুধু স্পন্সরই নয়, এত অল্প সময়ে এভারেস্ট অভিযানের মত এত বিরাট একটা পরিকল্পনা গুছিয়ে মাঠে নেমে পড়া চাট্টিখানি কথা নয়। তাই সব মিলিয়ে মৃদুলার এভারেস্ট অভিযানের খবরটা পড়ে একপ্রকার মুগ্ধই হয়েছি বলা চলে। মৃদুলাকে শুভকামনা জানিয়ে অদ্রির খবরটা শেয়ার করে দিলাম। এই ছিল আমার তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়া।

এরপরই এই অভিযানের সামগ্রিকতা বিচার করে নানা রকম ভাবনা মাথায় ভিড় জমাতে লাগল। এটা কি ঠিক হচ্ছে, ও কি এমন অভিযানের জন্য প্রস্তুত, পরিকল্পনা কি ঠিক আছে, ওর কি এর জন্য যথেষ্ট অভিজ্ঞতা আছে? এমন দীর্ঘ আর ক্লান্তিকর অভিযানের ধকল সহ্য করার মানসিকতা আছে কি তার? একই সাথে তার শেরপা গাইড, ক্যাম্প থেকে ক্যাম্পের এক্লিমাটাইজেশন রোটেশন প্ল্যান, তার অক্সিজেন ব্যবহারের খুঁটিনাটি ইত্যাদি হাবিজাবি চিন্তা মাথায় আসতে লাগল।


মৃদুলাকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি না। এমনকি তার সাথে আমার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও কোন রকম যোগাযোগ হয়নি। প্রথমবার তার নাম জানতে পারি অবশ্য ফেসবুকের মাধ্যমেই। গত বছর নভেম্বর-ডিসেম্বরের দিকে বোধ হয় তার বেসিক কোর্স শেষ করার সুবাদে কোন একটা পত্রিকায় খবর বেড়িয়েছিল। পত্রিকায় উল্লেখ করা হয়েছিল মৃদুলা ১৫ হাজার ৫০০ ফুট উচ্চতার শীতিধার চূড়ায় আরোহণ করেছে, যেখানে শীতিধার চূড়ার উচ্চতা ৫২৫০ মিটার বা প্রায় ১৭ হাজার ২০০ ফুট। হয়ত সাংবাদিকদের ভুল তথ্য সরবরাহ করা হয়েছিল কিংবা সে হয়ত ১৫,৫০০ ফুট পর্যন্তই আরোহণ করেছিল যেটা সংবাদ প্রকাশক ঠিকঠাকভাবে বুঝে উঠতে পারেননি। যেটাই হোক না কেন পুরোপুরি সত্যটা খবরে প্রতিফলিত হয়নি। (দুঃখের বিষয় অদ্রিও খবর প্রকাশের সময় কোনরকম যাচাই না করেই অবলীলায় শীতিধার চূড়াকে ১৫,৫০০ ফুট বানিয়ে দিয়েছে।) পেপার কাটিংয়ের এই বিষয়বস্তু নিয়েই সেই সময় বেশ আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছিল। তখনই জানতে পারি মৃদুলা নামে একজন মানালীর মাউন্টেনিয়ারিং ইন্সটিটিউট থেকে বেসিক কোর্স করে এসেছে।

তারপর এই কয়েক মাসের ব্যবধানেই মৃদুলা এবছর এভারেস্ট অভিযানে যাচ্ছে। পর্বত-পর্বতারোহণ বিষয়ে খোঁজখবর রাখেন এমন যে কেউ এই বেসিক কোর্স থেকে এভারেস্টে লাফ দেওয়াটাকে একটু ভিন্ন চোখেই দেখবেন। প্রচলিত অর্থে এই অভিযানের খবরটা শুনে খটকা লাগাই স্বাভাবিক। আমিও এর ব্যতিক্রম না। সাধারণত কেউ কোন পর্বত অভিযানে গেলে আমি খুব খুশি হই, নিজে না গেলেও অন্যদের যাওয়ার ব্যাপারে প্রচন্ড রকমের উৎসাহী থাকি, পর্বতাভিযানের পরিকল্পনা ও গল্প আমার কাছে আত্মিক চাহিদার মত। কিন্তু এই অভিযানটা নিয়ে আমি একই রকম উৎসাহ দেখাতে পারছি না। উৎসাহের চাইতে এই অভিযানকে ঘিরে আমার মনে তৈরি হচ্ছে শংকা। আমার এই মন্তব্যের পেছনে বেশ কয়েকটা কারণ রয়েছে। যা ধীরে ধীরে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব। তার আগে আমার চোখে দেখা বাংলাদেশের পর্বতারোহণ সমাজের পটভূমিটা তুলে ধরা দরকার বলে মনে করছি।


‘এভারেস্টে শুধুমাত্র চৌকশ পর্বতারোহীরাই যেতে পারবে এমন তো কোন বাধ্যবাধকতা নেই।’


এই অভিযান বিষয়ে আমার প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়ায় প্রথমেই আমি নিজেই বেশ কিছু প্রশ্নের সামনে পড়ে গিয়েছি? আমি কি এই বিষয়ে আসলেই নিজের মতামত দিতে পারি? আমার নিজের কি বা অভিজ্ঞতা আছে যার আলোকে আমি এই পুরো বিষয় সম্পর্কে কোন রকম বিচার করতে পারি? তার উপর ব্যক্তিগতভাবে অভিযাত্রী মেয়েটিকে চিনি না। তার শারীরিক-মানসিক দক্ষতা কোন বিষয় সম্পর্কেই আমার কোন রকম ধারণা নেই। তাই কিভাবে আসলে তার এই অভিযানের সক্ষমতার বিষয়ে কোন রকম মন্তব্য করতে পারি? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন আদৌ কেউ এই বিষয়ে কোন রকম প্রশ্ন তুলতে পারে কিনা?

আমার মতে পর্বতারোহণ পুরোটাই দর্শনের ব্যাপার। এখানে কে কি করবে না করবে, কার কেমন পরিকল্পনা, কে কিভাবে পর্বত বিষয়ে এগুবে সেটা একান্তই তার ব্যক্তিগত দর্শনের প্রতিফলন। একেকজনের দর্শন, ঝোঁক, আনন্দের জায়গা একেক রকম। তাই পর্বতারোহণকে মোটা দাগে প্রকাশ করার কোন রকম সুযোগ নেই।

কেউ চায় শত বছর আগের মত ভাড়া করা সৈন্য-সামন্ত দিয়ে কোন এক যুদ্ধক্ষেত্রের মতই আর্মি স্টাইলে কোন পর্বতে এগুতে। আবার কেউ বা মনে করে যদি আমার নিজের শারীরিক ও মানসিক শক্তি থাকে এবং নিজের সক্ষমতা দিয়ে আমার পক্ষে পর্বতে অভিযানে যাওয়া সম্ভব তখনই কেবল আমি পর্বতে যাব, নচেৎ নয়। আবার কেউ অন্য দশটা জায়গার মতই পর্বত অভিযানে যায় ঘুরতে, অভিযানের অভিজ্ঞতা নিতে।

এখানে প্রশ্ন উঠে ঝোঁকটা কোন দিকে। পর্বতে যাবার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমার মতে পর্বতাভিযানগুলোকে সাধারণত দুইভাগে ভাগ করা যায়,

[১] পর্বতারোহণ; অতি উচ্চতার পর্যটন

[২] পর্বতারোহণ, অতি উচ্চতার ক্রীড়া

কেউ যদি এখন বলে আমি হেলিকপ্টারের সহায়তা নিয়ে এভারেস্টে যেতে চাই, যেভাবেই হোক, যত খরচই হোক; তাকে নিষেধ করার কোন রকম যৌক্তিক কারণ কি আছে? কেউ বলতেই পারে যত টাকা লাগে লাগুক, আমি পাল্কিতে বসে এভারেস্ট যাব; তাকেও আসলে নিষেধ করার উপায় নেই। কেউ টাকা দিয়ে যদি এমন কোন সার্ভিস পায় তাহলে খারাপ কি? এভারেস্টে শুধুমাত্র চৌকশ পর্বতারোহীরাই যেতে পারবে এমন তো কোন বাধ্যবাধকতা নেই। বরং বাণিজ্যিক এক্সপিডিশনের এই রমরমা যুগে মৌসুমি পর্বতারোহীদেরই চাপটা বেশি থাকে। তাদের ইচ্ছা আছে কিন্তু সময় নেই, টাকা আছে কিন্তু উপায় নেই।

এমনদের জন্যই বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো রয়েছে। আপনি অর্থ দেবেন আর তারা আপনার সুবিধা মত প্যাকেজ বানিয়ে দিবে। প্যাকেজের আওতায় তারা আপনাকে বরফ খুঁড়ে সিড়ি বানিয়ে দেবে, পায়ে জুতো গলিয়ে দিবে, চা বানিয়ে খাওয়াবে, আপনাকে ধরে ধরে উপরে নিয়ে যাবে আর ধরে ধরে নিচে নামিয়ে নিয়ে আসবে। তারপরেও আপনাকে চরম ঠাণ্ডা, অতি উচ্চতায় শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা, অক্সিজেনের অভাব, সীমাহীন ক্লান্তির মত পরিস্থিতির সাথে মোকাবেলা করে টিকে থাকবে হবে। এই অভিজ্ঞতাগুলোই অতি উচ্চতায় পর্যটনের মজা। অনেকেই এই অ্যাডভেঞ্চারের মজা নেয়ার জন্য কাড়ি কাড়ি টাকা খরচ করেন।

একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে, যে দেশ ও জাতির সর্বসাধরণের মধ্যে পর্বতারোহণ বিষয়ে কোন সম্যক ধারণা নেই সেই জায়গাগুলোতে পর্বতারোহণের মত বিষয়টিকে খুবই গৌরবান্বিত করার চেষ্টা করা হয়। যারা পর্বত অভিযানে যায় তাদের অতিমানব বানিয়ে নায়কখোচিত উপাধি দেবার চেষ্টা করা হয়। এমন দেশগুলো থেকে অনেকেই আছেন যারা সর্বসাধারণের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে নাম-যশ-খ্যাতির জন্য এমন পর্যটনের শরণাপন্ন হন।


‘আমাদের এই উঠতি কমিউনিটির মধ্যে এই অভিযানের খবরটা অনেকেই সহজভাবে নেয়নি।’


আমার মতে ঠোকাঠুকিটা লাগে তখনই। যারা প্রকৃত পর্বতারোহী, দিন-রাত পর্বত নিয়েই পড়ে থাকেন, রাত জেগে পর্বত নিয়ে পড়ালেখা করেন, ম্যাপ নিয়ে বসে থাকেন, যাদের ধ্যান-জ্ঞান সবই পর্বত, শুধুমাত্র আর্থিক কারণে এই ক্ষেত্রে বিশাল কিছু করতে পারছেন না এটা কিছুতেই মানতে পারেন না। তাদের কাছে মনে হয় পাহাড় সম্পর্কে প্রচণ্ড আগ্রহী না, এমন কেউ শুধুমাত্র টাকা আছে বলেই পর্বতাভিযানে চলে যাবে, শুধু তাই নয় তারা আবার জাতীয় বীরের মর্যাদাও পাবে; বিষয়টাকে ক্রীড়াসুলভভাবে নিতে পারেন না।

এর অবশ্য কারণও আছে। আমাদের দেশে পর্বতারোহণ বিষয়টা এখনো সর্বসাধারণের কাছে স্পষ্ট না। পর্বতারোহণও যে ক্রিকেট-ফুটবলের মত একটা স্পোর্টস এই ব্যাপারেও সর্বমহলে তেমন ধারণা নেই। এমনকি আমাদের গণমাধ্যম এখন সেটা প্রিন্ট হোক বা ইলেকট্রনিক তাদেরও আসলে এই ব্যাপারে জ্ঞান নগণ্য। তারা বরফের ঢাকা সান্দাকফু আর কালো পাথরের কে-টু এর মধ্যকার পার্থক্যটা তেমনভাবে উপলব্ধি করতে পারেন না। অ্যাল্পাইনিজম, নতুন রুট, স্পিড ক্লাইম্বের মত জটিল টার্মগুলোর কথা না হয় বাদই দিলাম।

তাই পর্বতারোহণের ঝোঁক আছে, কোথায় কি হচ্ছে এই নিয়ে খোঁজ-খবর রাখেন, এই বিষয়ে নিয়মিত পড়াশোনা করেন, সামর্থ অনুযায়ী অল্প বিস্তর অভিযানেও যান; সব মিলিয়ে আমাদের এই উঠতি কমিউনিটির মধ্যে এই অভিযানের খবরটা অনেকেই সহজভাবে নেয়নি। না মেনে নেওয়ার মূল কারণ আমার মতে, পর্বতারোহণকে দীর্ঘ সময় ধরে সাধনা না করেও কাঙ্খিত মুকুট হিসেবে ‘এভারেস্ট’ চাইলেই চলে যাওয়া যায়- এই অভিযান থেকে এই বক্তব্যটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা।

আগেও লিখেছি মৃদুলার সাথে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় নেই। তাই তার সম্পর্কে যাই লিখব না কেন সবই আমার ধারণা মাত্র। এর বেশির ভাগই আমার চারপাশে থাকা পর্বতারোহণ কমিউনিটি ও নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে লেখা। এর মাঝে আমার বেশ কিছু আশংকাও আছে। যা আমি মনে প্রাণে চাই যেন না ঘটুক।

মৃদুলা পর্বতে এক দুইবার গিয়েই পর্বতারোহণের মত অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টেসের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। শুধু আগ্রহী শব্দটা বোধ হয় ঠিক খাপ খাচ্ছে না। ২০১৬ সালে পর্বতারোহণের উপর বেসিক কোর্স নিয়ে পরে সে কোন অতি উচ্চতায় ট্রেকিং বা ছয়/সাত হাজার মিটারের কোন চূড়ায় অভিযান পরিচালনা করেছে বলে খবর থেকে এমনটা জানা যায়নি। এ থেকে আর কিছু বুঝা যাক বা না যাক সে যে তীব্রভাবে এভারেস্ট দ্বারা মোহাবিষ্ট হয়েছেন সেটা বেশ ভালভাবেই বুঝা যাচ্ছে।

এখন এটা ভালো না খারাপ? এভারেস্টে যাওয়ার জন্য কি এর পূর্বে অন্য কোন চূড়ায় অভিযান পরিচালনা করাটা আবশ্যিক? জীবনের প্রথম পর্বতাভিযানের জন্য কেউ কি আসলেই এভারেস্টকে পছন্দ করতে পারে না? নাকি ব্যাপারটা আত্মঘাতী? আর এই অভিযানের ফলে আমি বা আমার এই কমিউনিটির উপরই বা কি প্রভাব পড়বে বলে আমি মনে করছি?

ব্যক্তিগতভাবে মনে করি না জীবনে প্রথমবারের মত পর্বতারোহণের জন্য এভারেস্টকে লক্ষ্য হিসেবে স্থির করা বা না করায় কোন রকম বাধ্যবাধকতা আছে। এটাও আমার মতে সম্পূর্ণভাবে ব্যক্তি ইচ্ছার উপর নির্ভর করে। সে যদি মনে করে এভারেস্ট আমার পছন্দ; আমি এভারেস্টেই যাব- এই সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার যেকোন ব্যক্তির আছে। এখন এভারেস্টের জায়গায় সেটা যেকোন লক্ষ্যই হতে পারে। আমি পারব কি পারব না সেটা পরের ব্যাপার, কিন্তু আমি চেষ্টা করতে পারব না আর এই সিদ্ধান্ত আমার হয়ে অন্য কেউ নিবে সেটা আমি মেনে নিতে পারব না।

আলোচনা হতে পারে তার ঝোঁক নিয়ে, তার প্রস্তুতি নিয়ে। আমি খুব আশা করব সে যেন পর্বতারোহণের কঠিন কঠিন লক্ষ্যগুলোর কাছে যাওয়ার জন্যই শুধুমাত্র এভারেস্টকে অবলম্বন করেন। এভারেস্ট সাফল্যের সাথে আরোহণ করতে পারলে তা থেকে যে নাম-যশ-খ্যাতি আসবে সেটা দিয়ে সে তখন খুব সহজেই পর্বতারোহণের অনুসন্ধানী (যেখানে আগে কেউ যায়নি, সম্পূর্ণ অচেনা-অজানা) অভিযান পরিচলনা করার জন্য সহযোগিতা পাবেন, যা সচরাচর পাওয়া সম্ভব হয় না। আবার ‘এভারেস্ট জয়ী’ খেতাব পেয়ে পর্বতারোহণের ভূত মাথা থেকে নেমে গেলে আমি ব্যক্তিগতভাবে খুব কষ্ট পাব।

এখন একটু পর্যালোচনা করা যাক এভারেস্ট আরোহণ আসলেই কতটা কঠিন ও বিপদজ্জনক। প্রতি বছর যে এত এত মানুষ এভারেস্ট আরোহণ করেন তারা প্রত্যেকেই কি যথেষ্ট অভিজ্ঞতা নিয়েই বেইজ ক্যাম্প থেকে আরোহণ শুরু করেন?

পর্বতারোহণের বিবর্তন আর তার মূল ভাবের কথা মাথায় রেখে উত্তর দিতে গেলে আমার প্রথম প্রশ্নের উত্তর অনেকেরই পছন্দ হবে না। বাণিজ্যিক এক্সপিডিশনের সাহায্যে পৃথিবীর শীর্ষ বিন্দুতে পৌঁছানো পর্বতারোহণের মাপকাঠিতে চ্যালেঞ্জিং হলেও তেমন কঠিন কাজ না। এই রকম আরোহণের জন্য তেমন কোন টেকনিক্যাল ব্যাপারে দক্ষতা অর্জনের দরকার হয় না, এক কথায় বলতে গেলে তাকে পর্বতারোহী হতে হয় না।

একগুয়ে, দৃঢ় মনোবলের অধিকারী, দুর্দান্ত রকমের শারীরিক ও মানসিক স্থিরতা থাকা যে কেউই আমার মতে এভারেস্ট আরোহণ করতে সক্ষম। এর জন্য কাউকে পর্বতারোহণ জানার কোন দরকার আছে বলে মনে করি না। এভারেস্ট আরোহণের জন্য যতটুকু জানা প্রয়োজন যেমন, কিভাবে ক্রাম্পন পায়ে দিয়ে হাঁটতে হয়, কিভাবে একটা ক্যারাবিনার লক করার পর আরেকটা ক্যারাবিনার খুলে জুমার ঠেলে ঠেলে ঢাল বেয়ে উঠতে হয় ইত্যাদি টুকটাক ব্যাপারগুলো এক্লিমাটাইজেশন হাইকের সময়ই ক্লায়েন্টকে শিখিয়ে পড়িয়ে নেওয়া যায়। বিশ্বাস করুন এটা এমন কোন রকেট সায়েন্স না।

আমাদের দেশের জন্য হয়ত এটা নতুন ব্যাপার কিন্তু এভারেস্টের এই বানিজ্যিক আরোহণ শুরু হবারও প্রায় দুই যুগ হয়ে গেল। প্রায় ২০ বছর আগের একটা ঘটনাকেই উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করলে ভালো হবে। ১৯৯৬ সালে এভারেস্ট আরোহণ করে এসে জন ক্র্যাকায়ারের লেখা ‘ইন টু থিন এয়ার’ বইটা যারা পড়েছেন তাদের কাছে এই চিত্রটা খুব পরিচিত লাগার কথা। জন ক্র্যাকায়ারের সঙ্গীদের প্রায় কারোই পর্বতারোহণের উপর কোন রকম পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না, পর্বতারোহণের মাপকাঠিতে তারা কেউই অভিজ্ঞ ছিলেন না। কারোরই এ ব্যাপারে প্রশিক্ষণও ছিল না। সেই ঘটনার ২১ বছর পরেও অবস্থার খুব একটা পরিবর্তন হয়নি বরং প্রতি বছরই এভারেস্টে ক্লায়েন্টের ভিড় বেড়েই চলেছে।

পর্বতারোহণের জন্য মূলত যে দক্ষতাগুলো লাগে এভারেস্টে সেগুলার কিছুই দরকার পড়ে না। এর কারণ হচ্ছে-

[১] শুরু থেকে একেবারে শীর্ষ পর্যন্ত ফিক্সড রোপ লাগানো থাকে। সেই উচ্চতায় হাঁটার মত সক্ষমতা থাকলেই আপনি জুমার ঠেলে ঠেলে উপরে উঠে যেতে পারবেন। এভারেস্ট মানেই হচ্ছে সামিট সফলতা হারের হিসাব, কোন কোম্পানি কতজনকে সামিটে উঠাতে পারল। তাই তারা সবাই মিলে এই নিরাপদ আর নিশ্চিত রুট বানিয়ে নিয়েছে। অন্যান্য পর্বতে যেখানে এই কাজটি পর্বতারোহীদেরই করতে হয়, এভারেস্টের জন্য থাকেন সকলের শ্রদ্ধার পাত্র ‘আইসফল ডক্টর্স’। পর্দার আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই অসম্ভব পরিশ্রমী, দূর্দান্ত সাহসী, আর তুখোড় পর্বতারোহীর দল সবাই বেইজ ক্যাম্পে পৌঁছানোর আগেই তাদের দক্ষতা আর পরিশ্রম দিয়ে সকলের জন্য এই রাস্তা বানানোর কাজটা সেরে ফেলেন। শুধু তাই না, কোথাও কোন গড়বড় হলেই সেটাকে ঠিকঠাক করতে ছুটে যান। বাদবাকিরা শুধু এই রুট অনুসরণ করে উঠে যায়। তুষারে ঢাকা অতল গহ্বরের ক্রেভাস এড়িয়ে রুট ফাইন্ডিং, ল্যাডার স্থাপন, রোপ ফিক্সিংয়ের মত কাজগুলো কিছু ক্লায়েন্টদের করতে হয় না।

[২] এভারেস্টের অন্যতম একটা কঠিন অংশের নাম হল হিলারি স্টেপ। এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছানোর সর্বশেষ আর অনেকের মতে সবচেয়ে কঠিন বাধা। জায়গাটা এতটাই সরু আর চাপা যে একসাথে অনেকে পার হতে পারেন না। আর তাই আরোহীদের দীর্ঘ ট্রাফিক জ্যাম লেগে যেত। বছর খানেক আগের ভূমিকম্পে এই হিলারি স্টেপটি ভেঙে পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও ভেঙ্গে পড়ার বিষয়টি নিয়ে আরোহীরা নিশ্চিত না হলেও, কিন্তু দৃশ্যমান একটা বড় পরিবর্তন অবশ্যই হয়েছে। গত প্রি-মনসুন আরোহণ মৌসুমে অংশটি ঢাকা ছিল গভীর তুষারে যা আরোহীদের জন্য অপেক্ষাকৃত সহজ করে দিয়েছিল হিলারি স্টেপ পার হওয়াটা।

[৩] বাণিজ্যিক এভারেস্টে আপনাকে থাকা-খাওয়ার বিন্দুমাত্র চিন্তা করতে হয় না। আপনি উপরে উঠার আগেই আপনার থাকার জায়গা প্রস্তুত থাকবে। আপনার তৃষ্ণা নিবারণের জন্য গরম চা, কফি বা জুস চলে আসবে। একটু পর খাবার-দাবারও রেডি হয়ে যাবে। আপনার যত্নের কোন অভাবই হবে না। এমনকি টুকটাক জিনিস ছাড়া তেমন কিছুই নিজেকে বইতে হয় না।

এর মানে কি এভারেস্টে আরোহণ ডাল-ভাতের মত ব্যাপার?

মোটেও না। এই সবকিছুর উপরে একটি জিনিস প্রত্যেকের প্রয়োজন, তা সে হাই অল্টিটিউড পর্যটকই হোক বা পর্বতারোহীই হোক। সেটা হল সহনশীলতা। কারো মধ্যে এই গুনটি না থাকলে এভারেস্ট আরোহণ সম্ভব নয়। নিয়মিত ব্যায়াম, অতি উচ্চতায় নিয়মিত ট্রেকিং বা আরোহণ, ওজন নিয়ে হাঁটাহাটি, নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করলেই সহনশীলতা আয়ত্ত্বে আনা সম্ভব। এর জন্য দরকার হয় শুধু সময় আর অধ্যবসায়। আর এটা এক দিন বা দুই দিনে হয়ে উঠে না।

আর আমি ভয়টা পাচ্ছি এখানেই। কারণ আমাদের সামনে পর্বতারোহণে অনভিজ্ঞ এভারেস্ট আরোহণের ভুরি ভুরি উদাহরণ যেমন আছে, একইভাবে এই ফাঁদে পা দিয়ে জীবন হারানোর মর্মান্তিক সব গল্পও আছে।

‘ইন টু থিন এয়ারে’র উদাহরণ দিয়েছিলাম। সেই অভিযান থেকেই একটা গল্প বলি। গল্পটা এক পোস্টাল ক্লার্কের। নাম তার ডগ হ্যানসেন। এভারেস্ট বিষয়ে সে এতটাই পাগল ছিল যে দিনরাত পরিশ্রম করে এর জন্য টাকা জমাতেন। টাকা জোগাড়ের নেশায় এতটাই নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছিলেন যে তাকে ভিন্ন শিফটে আরেকটি খণ্ডকালীন কাজ নিতে হয়। তার এই পাগলামীর কারণে স্ত্রীর সঙ্গে তার ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়, সন্তানকেও তিনি সময় দিতে পারতেন না। দিন-রাত এভারেস্টে যাবার টাকা জোগাড়ে লিপ্ত থাকায় নিজেকে তার জন্য প্রস্তুত করার সময়টুকু তিনি পেতেন না।

প্রথম বছর চূড়া থেকে অল্প একটু নিচে থেকে শারীরিক কারণে তাকে বাধ্য হয়ে ফিরে আসতে হয়। পরের বছর ১৯৯৬ সালে আবারো সব কিছু বাজি রেখে এভারেস্টে চলে আসেন। আর কখনোই সে ফিরে যেতে পারেনি। এভারেস্ট আরোহণের প্রতি তার ইচ্ছাশক্তি নিয়ে কোন প্রশ্ন ছিল না, তবে সবাই জানত এভারেস্টে যাওয়ার মত তাঁর যথেষ্ট প্রস্তুতি কখনোই ছিল না।


‘চরম পরিস্থিতিতে মাথা সুস্থির রেখে যথোপযুক্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারাই পর্বতারোহণের অন্যতম চ্যালেঞ্জ। আর এর জন্য দরকার পড়ে অভিজ্ঞতা।’


আমি সবচেয়ে বেশি আশংকা করছি মৃদুলার ক্লান্তি নিয়ে। আর এই ব্যাপারটাই এভারেস্টের সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার। এভারেস্ট চূড়া আট হাজার মিটার উপরের ডেথ জোনে অবস্থিত। এখানে অক্সিজেনের মাত্রা সমতলের তিন ভাগের এক ভাগ। স্বাভাবিক অবস্থায় এখানে কয়েক ঘন্টার বেশি বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। তার উপর এত উচ্চতায় একিউট মাউন্টেনিয়ারিং সিকনেস থেকে পালমোনারি এডিমা আর পরবর্তীতে সেরিব্রাল এডিমার মত মরণঘাতী সমস্যা যে কারো যে কোন মুহূর্ত হতে পারে। এর জন্য শরীরকে যথাযথভাবে মানিয়ে নিতে হয়। পর্বতে বারবার উপরে উঠে আবার নীচে চলে আসতে হয়, যাকে পর্বতারোহণের পরিভাষায় বলে এক্লিমাটাইজেশন।

এভারেস্টের ক্ষেত্রে এই এক্লিমাটাইজেশন রোটেশনটা খুবই দীর্ঘ হয়ে থাকে। বেইজ ক্যাম্প থেকে খুম্বু আইস ফল অতিক্রম করে ক্যাম্প-১। ক্যাম্প-১ থেকে দুই তিন করে আবার বেইজ ক্যাম্পে চলে আসতে হয়। যে ক্লায়েন্টদের যথাযথভাবে প্রস্তুতি থাকে না তাদের বেশিরভাগ এই এক্লিমাটাইজেশন রোটেশনের সময়ই তাদের সর্বোচ্চ শক্তি খরচ করে ফেলেন। তাদের পেশি ক্ষয় হতে হতে একেবারে জরুরি দশায় পৌঁছে যায়। এরপর যখন চূড়ান্তভাবে সামিটের উদ্দেশে রওনা হন তখন ‘সামিট জ্বর’কে প্রশমিত করার জন্য জমিয়ে রাখা সর্বশেষ শারীরিক ও মানসিক শক্তিটা ঢেলে দেন। সামিটে পৌঁছানোটা যে পথের মাত্র অর্ধেক এটা তাদের মাথায় থাকে না। ফেরার পথে শরীর একসময় পরিশ্রান্ত হয়ে পড়ে, আর তখনই ঘটে যাবতীয় দূর্ঘটনা। গত বছর পশ্চিমবঙ্গের পর্বতারোহীদের সাথে ঘটে যাওয়া দূর্ঘটনার অন্যান্য কারণগুলোর সঙ্গে এই ক্লান্তিটাকেও আমার অন্যতম কারণ বলে মনে হয়েছে।

একই সঙ্গে সামিটে পৌঁছানোর এতো চাপ মাথায় থাকে যা বলার মত না। নিজের এত দিনের স্বপ্ন, প্রস্তুতি, পরিবারের চাওয়া, স্পন্সরদের চাপ প্রভৃতি মিলে মাথায় তখন সামিট ছাড়া আর কিছু কাজ করে না। তার উপর অক্সিজেনের অভাবে অনেকেরই একধরনের হ্যালুসিনেশন হয়। তাই নিজের সীমারেখা সম্পর্কে তারা ভালভাবে বুঝে উঠতে ব্যর্থ হন। ঠিক কোথা থেকে ফিরে আসতে হবে সেই সিদ্ধান্তটি নিতে পারেন না। শেরপা গাইডদের কথা শুনতে চান না, গোয়ার্তুমি করেন।

গত বছর পশ্চিমবঙ্গের পর্বতারোহী রাজীব ভট্টাচার্য ধবলগিরি অভিযানে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর খবরটি আমরা মারফায় বসে শুনেছিলাম। তার কয়েকদিন পরেই ধবলগিরি বেইজ ক্যাম্পের উপর দিয়ে যাওয়ার সময় খুব অদ্ভুত কারণে তার কথা আমার খুব মনে পড়ছিল। তিনিও শরীর খারাপকে উপেক্ষা করে সামনে এগিয়ে যেতে চেয়েছিলেন।

এই রকম চরম পরিস্থিতিতে মাথা সুস্থির রেখে যথোপযুক্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারাই পর্বতারোহণের অন্যতম চ্যালেঞ্জ। আর এর জন্য দরকার পড়ে অভিজ্ঞতা। এর জন্যই বলা হয় প্রথমে কয়েকটি ছয় হাজারি বা সাত হাজারি মিটার চূড়ায় অভিযান পরিচালনা করে তারপর যেন এভারেস্টের মত আট হাজারি চূড়াগুলোয় অভিযান করা হয়।

এভারেস্টের চূড়া পর্যন্ত ফিক্সড রোপে জুমার করা শুনতে যতটাই সহজ মনে হোক আদতে বিষয়টা মোটেও এমন না। যতই শেরপা সহায়তা থাকুক আর খাবার-দাবারের ব্যবস্থা থাকুক প্রায় দুই মাস ধরে পর্বতের এমন জায়গায় নিজেকের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখা চাট্টিখানি কথা নয়; চরম ঠাণ্ডা, তীব্র ঝড়ো বাতাস, তুষারপাত, অরুচি ইত্যাদি বিষয়গুলো সয়ে নেওয়া মোটেও সহজ কাজ নয়।

এরপরই আসে আপদকালীন অবস্থার ব্যাপারগুলো। পর্বতে আবহাওয়া ক্ষণে ক্ষণে পাল্টায়। সবসময়ই যে গাইডরা পুরোপুরি বেষ্টন করে আমাকে নিরাপদ বলয়ের মধ্যে আগলে রাখবে এমন ভাবাও মোটেও ঠিক হবে না। গত বছর পশ্চিমবঙ্গের পর্বতারোহী সুনীতা হাজরাকেও এমন পরিস্থিতির জন্য চরম মূল্য দিতে হয়েছিল। তার শেরপারা তাকে সাহায্য করেন নি। ব্রিটিশ আরোহী লেসলি বিনস সেদিন নিজের এভারেস্ট স্বপ্নকে ত্যাগ করে সুনীতা হাজরাকে বাঁচিয়েছিলেন। তাই কখন কোন পরিস্থিতি সামনে চলে আসে কিছুই বলা যায় না। সে জন্যই সকল পরিস্থিতির জন্য নিজেকে প্রস্তুত থাকতে হয়। আর এর জন্যই দরকার পর্বতারোহণ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান।


‘পর্বতারোহণের এই গভীরতায় বিরাজ করে পৃষ্ঠপোষক পাওয়া, তাদেরকে পর্বতারোহণের মর্ম বুঝানো খুবই কঠিন কাজ।’


অন্যদিকে আমার মত যারা মনে করেন পর্বতারোহণ মানেই এভারেস্টে আরোহণ করা বুঝায় না, যারা কোন পর্বতের সামিটে পৌঁছানোর চাইতে কিভাবে পৌঁছালাম এই দিকে বেশি নজর দেন, যাদের কাছে পর্বতারোহণ মানেই হচ্ছে আমি কিভাবে সেখানে যাব সেটা নিজের মত খুঁজে বের করা, বিপদগুলো সম্পর্কে জানা ও কি কি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার সেটা বের করাটা বুঝেন তাদের এই অভিযানের খবরে হতাশ হবার কোন কারণ আমি দেখি না।

যারা পর্বতারোহণকে নিজের মধ্যে ধারণ করেন আমার মনে হয় তারা নাম-যশ-খ্যাতির চিন্তা না করেই এই অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসকে ভালোবাসেন। পত্রিকায় ছবি আর ফেসবুক লাইক পাবার আশায় কেউ পর্বতারোহণ করে বলে আমার মনে হয় না। পর্বতারোহণে গেলে কোন দর্শক থাকে না যে আপনাকে বাহবা বা হাততালি দিবে। পর্বতারোহণ সম্পূর্ণভাবে ব্যক্তিগত এক উপলব্ধি। এর সাথে দেশ-জাতি-পরিবার-সমাজের কোন রকম সম্পর্ক আছে বলে আমি মনে করি না।

পর্বতারোহণ একটা স্পোর্টস বিধায় এর মধ্যেও প্রতিযোগিতা আছে। কিন্তু এই প্রতিযোগিতাকে এভারেস্ট বা অন্য কোন পিক সামিট করতে পারল কি পারল না তার উপর কখনই নির্ভর করে না। এটা নির্ভর করে শুদ্ধ ও ইউনিক চিন্তার উপর। কে কতটা শুদ্ধ, দূর্গম ও বৈচিত্রময় অভিযান পরিকল্পনা করছে। এই ব্যাপারে উদাহরণ টানতে গেলে অবশ্যই ক্রিস বনিংটন-ডগ স্কটের কথাই ঘুরে ফিরে আসবে। ১৯৭৫ সালে এরা এমন একটি পথে এভারেস্টে যাবার পরিকল্পনা করেছিল যেটাকে সবাই একসময় অসম্ভব মনে করত। এরপরও তারা কঠিন, দূর্গম আর ভয়ানক এই পথ দিয়ে এভারেস্ট চূড়ায় পৌঁছেছিলেন। তারপর যখন ক্রিসকে প্রশ্ন করা হয় আপনার জীবনের সেরা পর্বতাভিযান কোনটি, তিনি সেখানে এভারেস্টকে রাখেননি। তার কাছে পাকিস্থানের ওগর বা বাইন্থা ব্রাক আরোহণকেই তার শ্রেষ্ঠ অভিযান বলেছেন। কারাকোরামের বাইন্থা ব্রাকের উচ্চতা এভারেস্টের তুলনায় বেশ কম, ৭২৮৫ মিটার।

পর্বতারোহণের এই গভীরতায় বিরাজ করে পৃষ্ঠপোষক পাওয়া, তাদেরকে পর্বতারোহণের মর্ম বুঝানো খুবই কঠিন কাজ। তাই সবার আগে আমাদের পর্বতারোহণের এই সুগভীর নান্দনিক ব্যাপারটা আমাদের নিজেদের উপলব্ধি করতে হবে। আমাদের মধ্যে এটারই সবচেয়ে বেশী অভাব আছে। সেই সঙ্গে আশেপাশের সবাইকে নিজেদের উপলব্ধিগুলোকে ভালোভাবে সকলের মাঝে তুলে ধরতে হবে। হাই অল্টিটিউড পর্যটন এক জিনিস আর পর্বতারোহণ যে আরেক জিনিস সেটা এখন থেকে বলিষ্ঠভাবে প্রকাশ করতে হবে। নইলে আমরা এই বৃত্ত থেকে কখনোই বের হতে পারব না।

আমি বিশ্বাস করি এই পরিস্থিতি অচিরেই পাল্টে যাবে। তাই অন্যরা কি করছে সেটা ভেবে হতাশ না হয়ে নিজের মত প্রস্তুতি নিতে থাকুন। পর্বতারোহণের জন্য পৃষ্ঠপোষকের খুব যে দরকার আছে আমি এটা বিশ্বাস করি না। পর্বতারোহণের জন্য অদম্য ইচ্ছা আর চূড়ান্ত রকমের লেগে থাকা ছাড়া আর কিছু দরকার বলে আমার কখনো মনে হয় না। যার যার সাধ্য সামর্থ্য অনুযায়ী যে কেউ এর স্বাদ নিতে পারে। শুধু সাধনাটুকু থাকতে হবে।

গত কয়েক মাসে মৃদুলা নিজেকে কিভাবে প্রস্তুত করেছে আমি জানি না। যেহেতু জানি না, তাই এই ব্যাপারগুলোতে কোন মন্তব্য করতে চাচ্ছি না। শুধু আশা করব এভারেস্ট কি আর কিভাবে সেটা আরোহণ করা যায় সেটা সে ভালোভাবেই জানে। আর সে নিজেকে সেভাবেই প্রস্তুত করে তবেই অভিযানে নেমেছে। তাই তার জন্য আমার পক্ষ থেকে রইল অনেক শুভ কামনা। আমি আশা করব সে সুস্থ-সবলভাবে এভারেস্ট সামিট করে আসতে পারবে। যেহেতু সে পর্বতারোহণ প্রশিক্ষণ নিয়েছে তাই ধারণা করতেই পারি পর্বতারোহণের প্রতি তার আগ্রহ আছে; তাই যেকোনভাবে শুধুমাত্র সামিটের জন্য সে হন্যে হয়ে উঠবে-এটা আমার জন্য মেনে নেওয়া কষ্টকর। প্রত্যাশা করি সে পর্বতারোহণকে গভীরভাবে জানবে, বুঝবে আর সামিটের চিন্তা না করে সত্যিকার অর্থে পর্বতারোহণকে ধারণ করে সাধনা আর চর্চা করে যাবে।


 

(Visited 1 times, 1 visits today)
সালেহীন আরশাদী
সালেহীন আরশাদী
সারাদিন শুয়ে শুয়ে বই পড়া তার শখ। পাহাড়ে যাওয়াটাকে জীবন দর্শন মনে করেন। প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা পাহাড়ের ঔষধশাস্ত্র নিয়ে গবেষণা করা তার স্বপ্ন।

২১ thoughts on “প্রতিক্রিয়া: মৃদুলার এভারেস্ট অভিযান

  1. অসাধারন বিশ্লেষণ ধর্মী লিখা,এমন একটি ইনফরমেটিভ স্টোরি আশা করেছিলাম আপনার কাছ থেকে,অনেক কিছু জানতে পারলাম,আর অনেক ধারনাও পালটে গেছে।
    ধন্যবাদ অপুর্ব এই লিখাটির জন্য,অদ্রির জ্ঞান বিস্তার যাত্রা সুফল হোক😍

  2. অনেক কিসু জানলাম এবং শিখলাম. অনেক তথ্যসম্বলিত লিখা.
    জীবনে প্রথম মনে হয় এত্ত বড় লিখা পরলাম এবং মনোযোগ সহকারে.

  3. অনেক সুন্দর লিখা।
    ভালো লাগলো লিখাটি পড়ে।
    কিন্তু পুরো লিখায় এতবার ওই মেয়েটা সম্পর্কে কিছু জানি না, কিছু জানিনা বলাটা দরকার ছিলো না। জানি না জানি না বলে ও আপনি ধারনা করে তার ব্যাপারে অনেক কিছু বলেছেন।
    তার মানে হয় আপনি জানেন, না হলে না জেনেই ধারনা করেছেন।
    😁😂
    দুইটার কোনটাই কাম্য নয়।

    জানি না জানি না ইস্যু ছাড়া লিখাটি ইনফরমেটিভ

  4. মৃদুলার প্রস্তুতি নিয়ে শঙ্কিত হবার উপযুক্ত কারণ রয়েছে। আশা করি নেমে আসার মত পরিস্থিতি তৈরি হলে সে বুঝতে পারবে। অবশ্য স্পন্সরের একটা চাপ আছে। একবার ব্যর্থ হলে পরে স্পন্সর পাবার সুযোগ কমে যেতেই পারে। আর বাজি জিতে গেলে তো কথাই নেই। (এই অভিযানকে বিপজ্জনক বাজি মনে করারও উপযুক্ত কারণ রয়েছে।)

  5. যে কোন আকারের লেখ পড়ার অভ্যাস আমার আছে, তাই পড়তে কোন সমস্যা হয়নি। ভালো লেগেছে।

  6. লেখাটি খুবই ভালো লেগেছে। নতুন অনেক কিছুই জানলাম। অনেক ধারনার পরিবর্তন হয়েছে। মৃদুলার জন্য শুভকামনা। সামিট করতে পারুক বা না পারুক আশা করি সে ভালোভাবে ফিরে আসবে। 🙂

  7. ধন্যবাদ সুন্দর এই লেখাটির জন্য। আপনি পর্বতারোহনের বিষয়ে গুরুত্বপুর্ন বেশ কয়েকটা ব্যাপার চোখে আংগুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। আশা করি ভবষ্যত পর্বতারোহিদের জন্য এই লেখাটি কাজে আসবে। মৃদুলার সুস্থতা ও সফলতা কামনা করসি।

  8. অসাধারন লেখনী আর চমৎকার ধারাবাহিকতা। সুক্ষ সুক্ষ অনেক কিছু উঠে এসেছে লিখাটায় যা পর্বতারোহীদের বিন্দুমাত্র হলেও কাজে দিবে এমন কি মৃদুলারও (যদি সে পড়ে থাকে)

  9. “পর্বতারোহণের জন্য পৃষ্ঠপোষকের খুব যে দরকার আছে আমি এটা বিশ্বাস করি না। পর্বতারোহণের জন্য অদম্য ইচ্ছা আর চূড়ান্ত রকমের লেগে থাকা ছাড়া আর কিছু দরকার বলে আমার কখনো মনে হয় না। যার যার সাধ্য সামর্থ্য অনুযায়ী যে কেউ এর স্বাদ নিতে পারে। শুধু সাধনাটুকু থাকতে হবে।” – এই সাধনাটুকু সত্যি জরুরী জিনিস। ভাল লিখা মনকে প্রফুল্ল করে। শুভ কামনা।

মন্তব্য করুন

*Please Be Cool About Captcha. It's Fun! :)