আমার মিশন হিমালায়ার অভিজ্ঞতা


রোপ ফোর* আয়োজিত ‘মিশন হিমালয় ২০১৮’ প্রজেক্টটি ছিল তিন পর্বে সাজানো। প্রথমে ৩ টি ওয়ার্কশপ থেকে বাছাই পর্বের মধ্যে দিয়ে ২৫ জন অংশগ্রহণকারী স্থান পায় ট্রেনিং ক্যাম্পে। তারপর ট্রেনিং ক্যাম্পের উপর ভিত্তি করে ৩ জন বিজয়ী নির্বাচন করা হয় এক্সপিডিশনের জন্য। এক্সপিডিশনটি শুরু হবে ২০ অক্টোবর, ২০১৮ থেকে।

*রোপ ফোর একটি অ্যাডভেঞ্চার এবং আউটডোর শিক্ষামূলক কেন্দ্র

কেমন ছিল মিশন হিমালায়া, সেটার অভিজ্ঞতা শেয়ার করছি সবার সঙ্গে। যেহেতু ৩টা ওয়ার্কশপ হয়, আমি কোন ওয়ার্কশপ থেকে চান্স পেয়েছি, এটাই ছিল আমার কাছে সবার প্রশ্ন। প্রথম, মানে একদম প্রথম ওয়ার্কশপ থেকে যাওয়া একজন ছিলাম আমি। সেটা ছিল রোপ ফোরের শুরু। অনেক স্বপ্ন একটা ছোট্ট রোপে গেরো দিয়ে বেঁধে হাঁটতে থাকা রোপ ফোর, যার রানিং অ্যান্ড মাহি ভাইয়ের হাতে আর স্ট্যাটিক অ্যান্ড এ্যাঙ্কর করা মারুফা আপুর হাতে। সেই ছোট্ট রোপ এখন অনেক পথ পাড়ি দিয়ে পাহাড়ি পথ চিনে নিয়েছে। আর চলার পথে ক্যারাবিনারে বেঁধে নিয়েছে অনেক সম্ভাবনাময় কিছু মানুষকে। যারা সবাই হেঁটে চলেছে ফিক্সড রোপ মিশন হিমালায়া প্রজেক্টে।


পড়ুন[যাত্রা শুরু করল রোপ ফোর]



২৩-২৫ মার্চ আড়াই দিনের ট্রেনিং ক্যাম্পটি ছিল ‘মিশন হিমালয়ার’ দ্বিতীয় ধাপ, ওয়ার্কশপ থেকে চান্স পাওয়া ২৩ জনকে নিয়েই ছিল সম্পূর্ণ আয়োজন । শুরুর দিনটি দৌড়ের মাধ্যমে সবার স্ট্রেন্থ বুঝে নিয়ে কম, বেশি বা মাঝারি স্ট্রেন্থের সদস্যদের মিশেলে খুব সুন্দরভাবে টিম তৈরি করা হয়, ক্যাপ্টেন বানানো হয়। এরপর এই ৪ টা টিম নানা রকম টিম বিল্ডিং এক্টিভিটিতে অংশগ্রহণ করি। অনেক মজার ও একই সঙ্গে শিক্ষণীয় ছিল সবগুলো এক্টিভিটি। এর মাঝেই ক্যাম্প সেট আপ করি আমরা। এক্টিভিটিগুলোতে টিম অনুযায়ী নম্বর বণ্টন করা হয়। বেশ কিছু এক্টিভিটির পর খাবারের বিরতী পেলাম। যাত্রা করে ক্যাম্প সাইটে যাবার পর কোন বিরতি ছাড়াই চলতে থাকে অ্যাক্টিভিটি। পেট পূজোর পর আমাদের বিলে দেওয়া শেখানো হয়। বিলে শিখতে শিখতে সন্ধ্যা হয়ে আসে।



সন্ধ্যায় ফ্রেশ হবার জন্য বিরতি পাই সবাই। এই সময় ফ্রেশ হয়ে কেউ গা এলিয়ে নেয় তাঁবুতে বা হ্যামকে, কেউ গান ধরে,গল্প করে। জমে উঠে আসর। সময় গড়িয়ে সন্ধ্যা ৭টায় শুরু হয় প্রথম দিনের ইভালুয়েশন। এখানে অংশগ্রহণকারীরা সারাদিনের এক্টিভিটির উপর ভিত্তি করে নিজেরা নিজেদের ভোট দেয়। ভোটে এগিয়ে থাকা ৩ জন সদস্য উপহার পায় মজার কিছু জিনিস যেমন চকলেট, টুথব্রাশ ইত্যাদি। এগুলোই আসলে ক্যাম্পকে উপভোগ্য করে রেখেছিল। এভাবে অনেক ভিন্ন কিছু অনুভূতির মধ্য দিয়ে শেষ হয় প্রথম দিন।

দ্বিতীয় দিন ছিল সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং। সকালটা শুরু হয় দৌড় আর শরীর চর্চা দিয়ে। সকালের স্নিগ্ধ পরিবেশে ব্যস্ত জীবনের সকালগুলো থেকে ভিন্নভাবে দিনের শুরু করি আমরা। প্রথমে দৌড় তারপর ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ। এরপর বনের ভিতর ঢুকে ট্রেইল রানিং এবং শরীর চর্চা। সব শেষে ক্যাম্প এরিয়াতে এসে পাখির ডাক আর কুয়াশায় ঘিরে থাকা গাছগাছালির মাঝে বসে অল্প কিছুক্ষণের মেডিটেশন শরীর আর মনকে প্রস্তুত করে দিয়েছিল সারাদিনের জন্য।

নাস্তা করার পর থেকে শুরু হয় র‍্যাপ্লিং, জুমারিং, ট্রি এক্টিভিটি। শুরুর দিন থেকেই গাছের সাথে সেট করা তক্তা, টায়ার এগুলো দেখছিলাম আর ভাবছিলাম আরে এগুলো আর এমন কি! তিড়িং বিড়িং করে পার হয়ে যাব। আসলে দেখতে অনেক সহজ কিন্তু করতে গেলে বুঝা যায়। নিজেদের সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে টিকে থাকা এবং নিজের দুর্বল ও সবল দিকগুলো খুঁজে নেয়ার এত ভাল প্রচেস্টা আর হয় না। ট্রি এক্টিভিটিতে ২ ধাপ পার করার পর হাতের জোর কমে আসছিল আমার কিন্তু মনে মনে বারবার বলছিলাম নিজেকে ‘আমাকে পারতে হবে’। এটা ট্রেনিং ক্যাম্প, না পারলে উইনার হওয়া যাবে না সে জন্য নয়। আসলে নিজের কাছে নিজের চ্যালেঞ্জ ছিল শেষ করতে পারাটা। ক্যাম্পের সবার মধ্যেই এমন ইচ্ছা শক্তি ছিল। হাতের জোর ফুরিয়ে গেছে, ঝুলে পড়েছে অনেকে কিন্তু আবার উঠে শেষ করেছে। সবাই ৪টা ধাপ শেষ করেছিল। ৪ টা টিম পালাক্রমে সব এক্টিভিটিগুলো শেষ করি।

এর মাঝেই দুপুরের খাবার খেয়ে নেই। সন্ধ্যা নেমে আসে ধীরে ধীরে, এক ফালি চাঁদের আলোয় সবাই ফ্রেশ হয়ে একটু বিশ্রাম নেই। কিন্তু এরপরই যে চমক অপেক্ষা করছিল আমাদের জন্য সেটা বুঝতেই পারিনি কেউ। আমাদের ফল ইন করতে বলা হয় আর ইন্সট্রাকশন দেয়া হয় ৫ মিনিটের মাঝে প্যাক আপ করে তাঁবু এরিয়া ছাড়তে হবে। কারণ সেদিন রাতে নাকি অন্য লোকেশানে থাকা লাগবে আমাদের। হুড়াহুড়ি পড়ে গেল আমাদের মাঝে, আমরা রেডি হলাম, আর ব্যাগ নিয়ে হাঁটা শুরু করতে বলা হল। তারা ভরা আকাশের নিচে হেঁটে চলেছি সবাই। ক্লান্ত শরীর সবার তবুও খুব ভাল লাগছিল হাঁটতে। একটা ধান খেতের আইলের উপর গিয়ে বসতে বলা হল আমাদের। সেখানে বসে তারা দেখে পথ চেনার উপায়গুলো শিখানো হল। অনেকবার আকাশের তারা দেখেছি কিন্তু এভাবে আগে কখনো তারা দেখে পথ চেনার উপায় জানা ছিল না। এরপর অবশ্য আগের তাঁবু এরিয়াতেই ফিরে যাই আমরা। হুট করে বের হয়ে আসতে বলা হয় আসলে আমাদের তাঁবু ইন্সপেকশন করার জন্য আর নূন্যতম সময়ে প্যাক আপ করতে পারি কিনা তা দেখার জন্য। সেদিন রাতেও ইভালুয়েশন হয় আগের রাতের মত। প্যাক আপ ইভালুয়েশনের পর আমরা নিজেরা বারবিকিউ করি আর রাতের খাবারটা উপভোগ করি একসাথে। এভাবেই ক্যাম্পের রাতগুলো শেষ হয়। ভীষণ ক্লান্তি নিয়ে সেদিন স্লিপিং ব্যাগে ঢুকে কখন যে ঘুমিয়ে পড়ি টেরই পাইনি।



পরদিন ভোরবেলা উঠে আবার সেই দৌড়। শেষ দিন অনেকগুলো অ্যাক্টিভিটি বাকি তাই বেশি এক্সসারসাইজ করানো হল না সেদিন। নাস্তার পর আমরা চলে যাই ট্রেইলের ভিতরে, সেখানে র‍্যাপেলিং, জুমারিং করি এবং রোপ ওয়াকের সময় কেউ ক্রেভাসে পড়ে গেলে তাকে কিভাবে উদ্ধার করতে হয় সেটা প্র‍্যাক্টিক্যালি দেখি। দুপুর নাগাদ ট্রেনিং ক্যাম্পের এক্টিভিটি শেষ হয়। ফ্রেশ হয়ে লাঞ্চ করার পর ক্যাম্পের সমাপ্তি হয়। এই শেষ মুহূর্তটায় তিন দিনে গড়ে উঠা সম্পর্কের টান অনুভব করছিল সবাই। আনন্দ, অ্যাডভেঞ্চারের স্বাদ, ক্যাম্প ছাড়ার মন খারাপ সব অনূভুতি কেমন যেন এক সাথে জড়ো হচ্ছিল মাথার ভেতর। ক্যাম্প কেমন ছিল এই সম্পর্কে আমরা মতামত দেই। তারপর সেরা ক্যাম্পার ঘোষণা করা হয় তাসকিন ভাইকে। আরও কিছু ক্যাটাগরিতে পুরস্কার দেয়া হয় সবাইকে। আপু আর ভাইয়া যেন স্যান্টাক্লজের থলে নিয়ে বসেছিল। টুকটাক করে খালি গিফট বের হচ্ছিল সেখান থেকে।

সন্ধ্যা নেমে আসে। মৃদু আলোয় মায়া যেন আরও বেড়ে যায় প্রকৃতির প্রতিটি কোনে। প্রথম দিনের সেই চাঁদের আলো আজকে যেন আরও দ্যুতি ছড়ালো আমাদের বিদায় দিবে বলে। কেমন একটা মোহাচ্ছন্ন হয়ে রওনা হলাম ঢাকার পানে। এই ৩ দিনে শুধু এক্টিভিটিগুলা উপভোগ করেছি তা নয়, অনেক কিছু শিখেছি, মজা করেছি সবার সাথে। কিন্তু এখান থেকে জিততে হবে, সেরা তিনে থাকতে হবে-সেটা মাথায় ছিল না একবারও। এমন ভিন্নধর্মী ক্যাম্পে থাকতে  পারাই ছিল বড় প্রাপ্তি। ঢাকায় ফিরে কর্মব্যস্ততার মাঝে তাই এগুলো ভুলতে বসি। পরদিন পরীক্ষা থাকা সত্ত্বেও মিশন হিমালয়ের রেজাল্টের দিনটায় না গিয়ে থাকতে পারিনি। সেদিন নিজের নামটা ঘোষণা করতে শুনে মনে হয়েছিল ভুতের রাজা যেন বর দিল।

এখনো বাকি র‍য়ে গেছে এই আয়োজনের আসল ধাপ, এক্সপিডিশন। তাই এখন শুধু প্রস্তুতি আর অপেক্ষা সেই শুভ্র পাহাড়ের দিন রাত্রি দেখার, রোপ ফোরের এই যাত্রাকে সফল করার।


(Visited 1 times, 1 visits today)

মন্তব্য করুন

*Please Be Cool About Captcha. It's Fun! :)