ব্যর্থ অভিযানের ডায়রি


অভিযান সময়কাল
নভেম্বর, ২০১৭

দলের সদস্য
আরিফুর রহমান, আশরাফুল হক, শাহিন গাফফার

লক্ষ্য
চুলু ইস্ট (৬৫৮৪ মিটার)/ চুলু ফার ইস্ট (৬০৫৯ মিটার)


মূল রিজলাইনের ঠিক নিচে যখন পৌঁছেছি ঘড়িতে তখন দুপুর ১২ টা পেরিয়েছে। ব্যাকপ্যাকটা রেখে ওখানেই বসে পড়লাম, খুব হতাশ লাগছে। গত ২৭ ঘণ্টায় প্রায় ১৪০০ মিটারের মত হাইট গেইন করেছি, ৩৯৮৫ মিটার থেকে এখন ৫৩৩৯ মিটারে। এখনও ৭০০ মিটারের মত বাকি, মেঘ আসতে শুরু করেছে, বাতাসের গতি বাড়ছে। এই উচ্চতায় আমি যদি খুব ফাষ্ট মুভ করি, তবুও এই ৭০০ মিটারের মত আইসি স্লোপ নেগোশিয়েট করতে কমপক্ষে ৩-৪ ঘণ্টা লাগবে। শরীর ঠিকঠাক কাজ করলেও হাত দুটো জমে আছে, কোন অনুভূতি পাচ্ছিনা। গতরাতে তাপমাত্রা মাইনাস বিশের নিচে নেমেছিল। আবার গত দিন থেকে পুরো একা। এই জমে যাওয়া বিরাণভূমিতে থাকতেও কেমন ভয় ভয় করছে। যতটা জেনেছি, বুঝেছি তাতে দুপুরের পর হিমালয়ের চূড়া থেকে ফিরে আসাটা খুব ঝুঁকি হয়ে যায়। বার বার রিজলাইনটা দেখছি, শুধু মনে হচ্ছে ইশ্ আর একটা দিন যদি এখানে থাকতে পারতাম অথবা এখন কেউ একজন যদি সাথে থাকতো! অনেক ভেবেচিন্তে, গ্লাভস খুলে জমে যাওয়া হাত দিয়ে জিপিএসে ওয়েপয়েন্ট মার্ক করলাম ‘the end’।

২০ নভেম্বর, ২০১৭

হুমদে (৩৩০০ মিটার) থেকে দ্বিতীয় বারের মত লোড ফেরি করে ইয়াক খারকা (৩৯৮৫ মিটার) পৌঁছালাম। গতদিনের মত আজ আর পথ ভুল হয়নি। এখানে একটা শেলটার আছে, সামনে তাঁবু পিচ করার মত বেশ জায়গাও আছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সন্ধ্যা হয়ে আসলো। আমরা কাল সামনে রওনা হব, বেইজ ক্যাম্পের দিকে। কিন্তু এখানে আসতেই আশরাফের বেশ মাথা ব্যাথা শুরু হয়েছে। টিমের অন্য মেম্বার রাতুল ভাইও ভাল বোধ করছেন না। বেশি ঠাণ্ডার জন্য এমন হচ্ছে। তাপমাত্রা মাইনাস ১৫, রাত বাড়ছে সাথে তাপমাত্রা আরও নামছে।

২১ নভেম্বর, ২০১৭

রাতে তেমন ঘুম হয়নি। আশরাফের অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। আজ উপরে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। ভাবলাম আরও একটা দিন দেখা যাক।

২২ নভেম্বর, ২০১৭

আজ আশরাফের অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। রাতে একফোটা ঘুম হয়নি। ওর সারা শরীর ব্যথা সাথে প্রচণ্ড মাথাব্যথা। এত উচ্চতায় এই প্রথম এসেছে সে। কোন সন্দেহ নেই তার অল্টিচিউড সিকনেস হয়েছে। রাতুল ভাইয়ের সাথে আলোচনা করে আশরাফকেও এখানে রেখে যাওয়া ঠিক মনে হল। আমি ২ দিনের জন্য ব্যাকপ্যাক নিয়ে বের হলাম। আমার সাথে আছে সুজান। সে ইয়াক খারকার একটি লজের মালিক। আমার সাথে কিছু লোড ফেরি করবে বেইজ ক্যাম্প পর্যন্ত। ইয়াক খারকা থেকে বেইজ ক্যাম্প ৯০০ মিটারের মত উপরে। এই পথের মাঝে ৬ টার মত ছোট ছোট রিজ পড়ে। পুরো পথে কোন পানি নেই। ৪ ঘণ্টার মধ্যেই আমরা বেইজক্যাম্পে পৌঁছে গেলাম। রাশিয়ান-জার্মান একটি এক্সপিডিশন টিম তাদের জিনিসপত্র প্যাক করছে। ওদের শেরপা এসে বলল, ঠাণ্ডা বেড়ে যাওয়ায় তারা আজ নিচে নেমে যাচ্ছে । আমি তখন তাঁবু পিচ করতে গিয়ে পেরেশান হয়ে যাচ্ছি। হিমালয়ে দুপুর হতেই বাতাস বাড়তে থাকে আর এই উচ্চতায় একা তাঁবু পিচ করাটা বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার। খেয়াল করলাম ওই টিমের লোকজন আমাকে পাকিস্তানি ভেবে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছে । তাঁবুতে ঢুকে যেতেই ওদের শেরপা আসলো। কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই বললাম, বাংলাদেশ থেকে এসেছি, দুদিন থাকবো ছবি তুলবো। শেরপা হাসছে! সে আইস এক্স, ক্রাম্পন দেখলো। কিছু পরামর্শ দিয়ে বললো, ঠাণ্ডা বাড়ছে। স্লিপিং ব্যাগটাতেও বরফ জমবে তাই তাঁবুর ভেন্টিলেশন যেন খুলে রাখি।

আমি রাতের ব্যাকপ্যাক গোছানো শুরু করলাম। রাত ১ টায় বের হব ভেবে এলার্ম দিয়ে তাঁবু থেকে বের হলাম পানির জন্য। বার কয়েক চেষ্টার পর স্টোভ জ্বালাতে পারলাম। পানি গরম করে একটু স্যুপ বানিয়ে খাওয়ার চেষ্টা করলাম। খেতে ইচ্ছে হলনা। ততক্ষণে অন্ধকার নেমেছে, অর্ধেকটা স্নিকারস খেয়ে স্লিপিং ব্যাগে ঢুকে পড়লাম।

২৩ নভেম্বর, ২০১৭

মাইনাস ৩০ রেটিংয়ের স্লিপিং ব্যাগ নিয়েছি এবার। শরীরের লেয়ারগুলোও ঠিকঠাক পড়েছি। থারমাল ইনার তার নিচে আরও একটা ইনার, এরপর ফ্লিস, তার উপরে উইন্ড ব্রেকার। দু জোড়া মোজা পড়েছি, হাতে তিন লেয়ারের গ্লাভস। তবুও হাত-পা জমে আসছে। ঘুম আসছে না, চুপ করে শুয়ে আছি। কোথাও একটু শব্দ পেলেই কেমন যেন লাগছে, শব্দের উৎস বোঝার চেষ্টা করছি অজান্তেই। যখনই একটু চোখ বুজে আসছিল, এলার্মের শব্দে উঠে পড়লাম।

স্লিপিং ব্যাগের মুখের দিকটায় গুড়ি গুড়ি বরফ জমে গেছে। পানির একটা বোতল, আধ খাওয়া বাকি স্যুপ টুকু যা ছিল সব জমে গেছে। স্টোভ জ্বালাতে গিয়ে পারলাম না, মনে হচ্ছে আঙ্গুলগুলো ছিড়ে যাচ্ছে। আইস বুট পরে যখন বের হলাম ঘড়িতে তখন ১:৩০। বের হতেই বড় একটা ধাক্কা খেলাম। ডাবল বুটের মাঝেও পায়ের আঙ্গুলগুলো অবশ হয়ে যাচ্ছে, হাতের অবস্থা আরও ভয়াবহ!

ঘণ্টাখানেক আগানোর পর পানি খাওয়ার জন্য থামলাম। ফ্লাস্ক খুলছে না। গ্লাভস খুলেও চেষ্টা করলাম, হল না। এখন যেখানে আছি তা থেকে পানি আরও ৩০০ মিটারের মত উপরে হওয়ার কথা। অতটা সময় পানি ছাড়া টিকতে পারব বলে ভরসা পাচ্ছিনা। প্রতিবার ঠাণ্ডা বাতাস যখন ভেতরে ঢুকছে সব কিছু কেমন যেন শুকিয়ে সব ফাঁকা করে দিচ্ছে। এভাবে আগানো সম্ভব হচ্ছেনা। আবার তাঁবুতে ফেরত এলাম। আলো ফুটলে বের হব ঠিক করে স্লিপিং ব্যাগে ঢুকে পড়লাম।

ঘুম হয়নি কিছু। উঠে পানি গরম করে বের হতে হতে ৭ টা বেজে গেলো। ট্রেইল খুঁজে ধীরে ধীরে এগুচ্ছি। ভোরের আলোয় অন্নপূর্না রেঞ্জটা কমলা রং ধারন করেছে। প্রতিটা অংশ দেখা যাচ্ছে, অবাক হয়ে দেখছি। ৫২০০ মিটারে যখন পৌঁছাই তখন ঘড়িতে সাড়ে ১০ টা। পানির শেষ চুমুকটুকু খেয়ে ফেললাম। শুনেছি এখানে আসে পাশেই কোথাও পানি পাওয়া যাবে। এদিক সেদিক খুঁজছি। কিন্তু কোথাও পানির দেখা নেই। সব খাঁজগুলো শুকনো খটখটা। এই প্রথম টেনশন হচ্ছে!

আরও একশ মিটারের মত উপরে উঠে একটা ছোট্ট পুকুরের মত দেখতে পেলাম। কাছে গিয়ে দেখি পানি সব জমে আছে। পাশে পড়ে থাকা পাথর দিয়ে চেষ্টা করলাম প্রলেপটা ভাঙ্গার কিন্তু হল না। বরফের স্তরটা বেশ মোটা। আইস এক্স দিয়ে বেশ জোরে ধাক্কা দিতে পানি পেলাম। পাঁচ মিনিটের মাঝেই রওনা হলাম আবার। এবার অনেকটা সমতলের মত পথ। কিন্তু মানুষের চলাচলের কোন চিহ্ন নেই। এখানে ট্রেইল খুঁজতে সময় লাগছে। একটা সময় চুলু ইষ্ট আর ফার ইষ্টের কানেক্টিং রিজের ঠিক গোড়ায় এসে পৌঁছালাম। কোন দিকে যাব ভাবছি।

একসময় মনে হল সময়টা দেখা দরকার। মোবাইল বের করলাম। দেখি প্রায় ১২ টা বেজে গেছে। ব্যাকপ্যাকটা নামিয়ে বসে পড়েছি। নিজের অজান্তেই সময়ের হিসাব করা শুরু করে দিলাম। চুলু ইষ্ট থেকে ফার ইষ্ট ৫০০ মিটারের মত নিচু। সময়ে কুলাতে পারব ভেবে তাই আবার ব্যাকপ্যাকটা নিয়ে চুলু ফার ইষ্টের দিকে এগিয়ে গেলাম। ঠিক মেইন রিজের নিচে যখন, বাম পাশ থেকে মেঘ আসতে দেখলাম। ঘড়িতে দেখলাম ১২ টা পার হয়ে গেছে। খুব হতাশ লাগছে, একসাথে অনেক কিছু ভাবতছি। মন বলছে সামনে যা কিন্তু লজিক বলছে ‘না’। আমি খুব পরিষ্কারভাবে চিন্তা করতে পারছি। এই রকম পরিস্থিতির বিভিন্ন ডকুর সিন চোখে ভাসছে।

অনেকক্ষণ চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিলাম—থাক এবারের মত। ১০-১৫ মিনিট পর ফিরতি পথ ধরলাম। ৩টার দিকে আবার টেন্টে ফেরত এলাম। পরের দিন এত ওজন নিয়ে, দুটো ব্যাকপ্যাক নিয়ে কিভাবে নামবো এটা যত না চিন্তার ছিল তার চেয়ে একা একা ওই রাতটা কাটানো কঠিন ছিল।

২৪ নভেম্বর, ২০১৭

শেষ রাতে বেশ ঘুম হল। ৮ টায় উঠে ব্যাকপ্যাক সব নিয়ে দুপুরের আগেই ইয়াক খারকা পৌঁছালাম। শীতকালের হিমালয় কেমন হয়, সে কতটা কঠিন হতে পারে সেটার অভিজ্ঞতা নেয়ার ইচ্ছে ছিল বেশ কিছুদিন থেকে। পুরোপুরি শীতকাল না হলেও নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে পরীক্ষামূলক এই অভিযানের চেষ্টা করেছিলাম। কিছু নতুন ব্যাপারে একেবারে হাতে কলমে অভিজ্ঞতা হয়ে গেল। কিন্তু যে উদ্দেশ্য নিয়ে গিয়েছিলাম তা হলনা। কিছু আক্ষেপ, কিছু ব্যর্থতা নিয়ে ফিরতে হল।

 

(Visited 1 times, 1 visits today)
আরিফুর রহমান
আরিফুর রহমান
পাহাড়ে ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসেন। পাহাড়-পর্বতে চলার মুহুর্ত গুলোকে চিরদিনের মত ধরে রাখার জন্য ছবি তোলা তার অন্যতম শখ।

৫ thoughts on “ব্যর্থ অভিযানের ডায়রি

  1. আরিফ ভাই ব্যর্থতা? কিসের, প্রতিটা সাফল্য ব্যর্থতার বুনিয়াদে প্রতিষ্ঠিত।
    ছবি দেখাইয়েন এবারের।

  2. পাহাড় আমারও ভাল লাগার জায়গা।তবে পাহাড়ে চড়া বলতে শুধু মাত্র কেওকারাডং এ উঠার অভিজ্ঞতা হয়েছে।
    আপনাদের ঘটনাগুলো যখন পড়ি তখন খুব ভাল লাগে।ইচ্ছা আছে আরো বড় বড় পাহাড়ে উঠবো।তবে কিভাবে নিজেকে প্রস্তুত করবো তা জানি না।আপনারা যদি কিছু পরামর্শ দিতেন,তাহলে খুব ভাল হতো।

মন্তব্য করুন

*Please Be Cool About Captcha. It's Fun! :)