বাংলাদেশে পর্বতারোহণ যুগের সূচনা (পর্ব ৩)

বাংলাদেশে পর্বতারোহণ যুগের সূচনা (পর্ব ১)

পড়ুন পর্ব ২


সম্পাদকের কথা

‘হিমালয়, এভারেস্ট ও বাংলাদেশ’ ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে শ্রাবণ প্রকাশনী হতে প্রকাশিত মীর শামছুল আলম বাবুর রচিত একটি সম্পূর্ণ গ্রন্থ।আমাদের এই লেখনীর শিরোনামটি অর্থাৎ ‘বাংলাদেশে পর্বতারোহণ যুগের সূচনা’ সেই গ্রন্থেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। অধ্যায়টির তাৎপর্য বিবেচনায় সেটিই লেখকের অনুমতিক্রমে পর্ব আকারে অদ্রিতে প্রকাশিত হচ্ছে।
সম্পাদনায় সীমিত শাব্দিক/ ভাষাগত পরিমার্জন ব্যতীত মূল গ্রন্থের তথ্য ও ঘটনাপ্রবাহ অবিকৃত রাখা হয়েছে। এই পুনঃপ্রকাশকালে লেখকও অধ্যায়টির পরিমার্জনে একই নীতি অনুসরণ করেছেন। একটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়, গ্রন্থটি দশ বছর পূর্বের বাংলাদেশে অর্থাৎ পর্বতারোহণ যুগের সূচনালগ্নের একটি সময়ে বসে রচিত ও প্রকাশিত, তাই এটি পঠনের সময় পাঠকদের তৎকালীন প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এনে পাঠ করাটাই কাম্য হবে। বইটি প্রকাশের পরে বাংলাদেশের পর্বতারোহণের ইতিহাসে আরও নতুন নতুন পালক যুক্ত হয়েছে। সেসব বিবেচনায় রেখেও, এই লেখনীটি এখনও কতখানি প্রাসঙ্গিক, তার বিচারের ভার পাঠকদের হাতেই রইল। পরিশেষে, ধন্যবাদ জানাই লেখককে, গ্রন্থটির একটি কপি তিনি অদ্রি পাঠাগারে প্রদান করে আমাদেরকে কৃতজ্ঞ করেছেন।


পাওয়া যাচ্ছে অদ্রিতে। যোগাযোগ: ০১৯৬৬৭৮৪১৮১


১৭ সেপ্টেম্বর ইনাম-আল-হকের বাসায় এক বিশেষ সভায় বাংলাদেশ এভারেস্ট টিম গঠনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয় এবং ২০ সেপ্টেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বাংলাদেশ এভারেস্ট টিম-১ গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়। সে সময় যারা দলে নাম লেখান তারা হলেন ইনাম-আল-হক, মুসা ইব্রাহীম, রিফাত হাসান, মুনতাসির মামুন ইমরান, সজল খালেদ, সিরাজুল হক সাগর, মশহুরুল আমিন মিলন ও সাদিয়া সুলতানা সম্পা। এছাড়া এম. ওয়াহিদ ও শরীফ সরকারের নাম ঘোষণা করা হয়। এই দল গঠনের পর বাংলাদেশে পর্বতারোহণ প্রক্রিয়া কিছুটা আনুষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।


জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বাংলাদেশ এভারেস্ট টিম-১ গঠনের ঘোষণা; সৌজন্যে -বাবু সংগ্রহ


একই বছর ৯ অক্টোবর মুনতাসির মামুন ইমরান নেহেরু ইনস্টিটিউট অব মাউন্টেনিয়ারিং-এ প্রাথমিক পর্বতারোহণ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে ভারতের উত্তর কাশির উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন। ইনাম-আল-হক, ইয়াহিয়া খান, এনাম তালুকদার ও আরও কয়েকজনের আর্থিক সাহায্যে মুনতাসির মামুন ইমরান তার ঐকান্তিক ইচ্ছা, সুদৃঢ় মনোবল আর প্রচণ্ড আগ্রহকে বাস্তবে রূপ দিয়ে পর্বতারোহণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশী তরুণদের পথ প্রদর্শকে পরিণত হন। যদিও এর আগে ধ্রুব জ্যোতি ঘোষ, ইন্তেসার হায়দার ও সুমন বণিক নামের তিন জনের পর্বতারোহণ প্রশিক্ষণ, সজল খালেদের ট্রেকিং প্রশিক্ষণ এবং সালমান সাঈদের অ্যাডভেঞ্চার কোর্স সমাপ্তকরণের কথা জানা যায়।

ইমরানের বাংলাদেশ ত্যাগের পর মীর শামছুল আলম বাবু ও সাদিয়া সুলতানা সম্পা পর্বতারোহণ বিষয়ে ব্যাপক খোঁজখবর নেয়া শুরু করেন, ইন্টারনেট ঘেটে তথ্যাদি সংগ্রহ করেন। এসময় তাদের সাথে যোগ দেন মুসা ইব্রাহীম ও সিরাজুল হক সাগর। বাংলাদেশ থেকে পর্বতারোহণ প্রশিক্ষণের জন্য প্রথম দল পাঠানোর সক্রিয় চিন্তাভাবনা চলতে থাকে।  প্রশিক্ষণ গ্রহণে আগ্রহী সদস্যদের জন্য টাকা সংগ্রহের কাজ শুরু হয়। ইমরানের জন্য চাঁদা তুলে অর্থনৈতিক সাহায্য করলেও দলগত প্রশিক্ষণ এবং পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য প্রচুর অর্থ দরকার এই ভাবনা থেকে স্পন্সর খোঁজা শুরু হয়।

ইন্টারনেটে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী ভারতের পবর্তারোহণ প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানসমূহে বিদেশীদের জন্য প্রশিক্ষণ কি ৫০০ মার্কিন ডলার। এ তথ্য জানার পর সম্পা ও বাবুর মধ্যে আলোচনাক্রমে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মীর শামছুল আলম বাবু ১১ থেকে ১৪ নভেম্বর দার্জিলিং ভ্রমণ করেন। স্বশরীরে ভারতের সর্বপ্রাচীন পবর্তারোহণ প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট গমন এবং তৎকালীন উপ অধ্যক্ষ (ভাইস প্রিন্সিপাল) মেজর কুলওয়াৎ সিং ধামীর সাথে কোর্স ফি বিষয়ে আলাপ করেন। কর্তৃপক্ষের সাথে সফল আলোচনার পর বাংলাদেশীদের জন্য প্রশিক্ষণ ফি ধার্য্য হয় ৮,০০০ ভারতীয় রূপী (ভারতীয়দের দ্বিগুণ)।

বাবুর ফেরত আসার পর সার্ক দেশসমূহের জন্য নির্ধারিত কোটায় ধার্য্য এই প্রশিক্ষণের জন্য একটি দল পাঠানোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১৭ ডিসেম্বর (২০০৩) ইনাম-আল-হকের বাসায় বাংলাদেশ থেকে প্রথম দলটির প্রাথমিক পর্বতারোহণ প্রশিক্ষণের জন্য মার্চ মাসটা নির্ধারণ করা হয়। কোর্স সমাপ্ত করে আসা ইমরান এবং দার্জিলিং ভ্রমণ করে আসা বাবু সদস্যদের প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা করেন। পরদিন ভোর থেকে সদস্যদের ব্যক্তিগত শরীর চর্চা শুরু হয়। মুসা ইব্রাহীম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মাঠে, সিরাজুল হক সাগর ব্যক্তিগতভাবে নিজ গৃহে এবং মীর শামছুল আলম বাবু ও সাদিয়া সুলতানা সম্পা রমনা পার্কে শরীর চর্চাসহ নানা প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকেন।

ইতিমধ্যে ইনাম-আল-হকের সাথে সফল আলোচনার পর ট্রান্সকম বেভারেজ কোম্পানির ‘মাউন্টেন ডিউ’ কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ থেকে পর্বতারোহণ বিষয়ে আগ্রহীদের সহায়তা করতে এগিয়ে আসে। ইনাম-আল-হকের নেতৃত্বে গঠিত বাংলাদেশ এভারেস্ট টিম-১ এর পাশাপাশি বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল এসোসিয়েশনের পত্রিকা ‘দলছুট’-এর প্রকল্প ‘মাউন্টেন ডিউ টিম এক্সটিম’ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে আগ্রহীদের নির্বাচিত করার কাজে আর্থিক অনুদান প্রদান করে। ট্রান্সকম বেভারেজ-এর নিযুক্ত বিজ্ঞাপনী সংস্থা এশিয়াটিক-এর মাধ্যমে প্রদত্ত আর্থিক অনুদানের প্রায় পুরোটাই ‘মাউন্টেন ডিউ টিম এক্সটিম’-এর প্রতিযোগিতায় ব্যয় হয়। অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল এসোসিয়েশনের প্রধান ব্যক্তি মশহুরুল আমিন মিলন টিম এক্সটিম বাছাইয়ে সহযোগিতা চাইলে ইমরান, রিফাত, বাবু ও সম্পা সাহায্য করতে এগিয়ে আসে। কিন্তু এক পর্যায়ে তাদের সহযোগিতা আর নেওয়া হয়নি। পাশাপাশি চলতে থাকে মুসা-সাগর-বাবু-সম্পার প্রস্তুতি আর ‘মাউন্টেন ডিউ টিম এক্সটিম’ প্রতিযোগিতার বাছাইপর্ব।

১৫ ফেব্রুয়ারি (২০০৪) ভারতের দার্জিলিং-এ হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে স্বশরীরে গিয়ে মুসা, সাগর, বাবু ও সম্পার প্রশিক্ষণ ফি প্রদান এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পাদন করে আসেন রুপেস চাকমা। ভারতীয় দূতাবাসের দুই মাসের ভিসা পাবার ক্ষেত্রে সাহায্য করেন অভিনেত্রী কবরী সারোয়ার। ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে শ্রীমঙ্গলের ধোলবাড়ীতে অনুষ্ঠিত হয় ‘মাউন্টেন ডিউ টিম এক্সটিম’-এর চূড়ান্ত বাছাই। ওই প্রতিযোগিতায় বাছাই করা হয় ঢাকার বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত তিন তরুণ আব্দুল্লাহ-আল-মুঈদ, আশরাফুল হক তানিম ও আয়নাল হক মাসুদকে। অন্যদিকে ২৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় প্রেসক্লাবে ভি.আই.পি লাউঞ্জে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ থেকে প্রথমবারের মতো পর্বতারোহণ প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য একটি দল পাঠানোর ঘোষণা দেয়া হয়। মীর শামছুল আলম বাবু, সাদিয়া সুলতানা সম্পা, সিরাজুল হক সাগর ও মুসা ইব্রাহীম এই চার তরুণের নাম ঘোষণা করেন বাংলাদেশ এভারেস্ট টিমের সমন্বয়কারী আ. ব. ম. সালাউদ্দিন। এই ঘোষণার মাধ্যমে বাংলাদেশে পর্বতারোহণ যুগ শুরু হয়।


হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে সাদিয়া সুলতানা সম্পা, সিরাজুল হক সাগর, মীর শামছুল আলম বাবু ও মুসা ইব্রাহীম; আলোকচিত্র/মীর শামছুল আলম বাবু (সেলফ টাইমার)


২৮ ফেব্রুয়ারি ২০০৪ মীর শামছুল আলম বাবু ও সাদিয়া সুলতানা সম্পা এবং ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ২৪০ নং প্রাথমিক পর্বতারোহণ প্রশিক্ষণ কোর্সের দিন সদস্য মুসা ইব্রাহিম ও সিরাজুল হক সাগর হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে পৌঁছান। ৯ জন মেয়ে সহ মোট ৫৭ জন প্রশিক্ষণার্থী নিয়ে শুরু হওয়া কোর্সটি ২৯ মার্চ পর্যন্ত চলে। ৭ হাজার ফুট উঁচু দার্জিলিংস্থ জাওয়াল পর্বতে অবস্থিত ক্যাম্পাসে তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি জগিং, পর্বতারোহণ যন্ত্রপাতি পরিচিতি, নিয়ম-শৃঙ্খলা, পর্বতমালার গঠন, মাউন্টেন সিকনেস, ম্যাপ রিডিং, রক ক্লাইম্বিং (প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম), টাইগার হিল ট্রেকিং এবং দার্জিলিং থেকে প্রায় ২০০ মাইল দূরে পশ্চিম সিকিমের চৌরিখাংস্থ এইচ. এস. আই বেসক্যাম্পের ১৪,৬০০ ফুট গড় উচ্চতায় আইস ক্লাইম্বিং, আইস ক্রাফটিং, সেলফ রেসকিউ, ক্রাফটিং প্রভৃতি ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়। ভারতীয় সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে প্রিন্সিপাল কর্নেল বিজয় সিং, ভাইস প্রিন্সিপাল মেজর কে. এস. ধামী এবং এভারেস্ট বিজয়ী নিমা নরবু শেরপা, টি.বি. বুদ্ধথাকিসহ কতিপয় প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণে বাংলাদেশের প্রথম দলটি সফলভাবে প্রশিক্ষণ সমাপ্ত করে। ভারতে অবস্থানকালীন সময়ে ভারতীয় টেলিভিশন এবং পত্রপত্রিকাতে গুরুত্বসহকারে বাংলাদেশের দলটির খবরাখবর প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়েছিল। দলটি দেশে ফেরত আসার পর ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। পত্র পত্রিকা ও বৈদ্যুতিক গণমাধ্যম দলটির কার্যক্রম ব্যাপকভাবে প্রচার করে। বাংলাদেশের পর্বতারোহণ যুগের সূচনায় পত্রপত্রিকা ও প্রচার মাধ্যমের ভূমিকা সব সময় ছিল ইতিবাচক।

ইতিমধ্যে ব্যাপক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে বাছাইকৃত মাউন্টেন ডিউ টিম এক্সটিমের প্রথম দলের তিনজন মুঈদ, তানিম ও মাসুদসহ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল এসোসিয়েশনের প্রধান ব্যক্তি মিলন এবং তার সহযোগী নূর মোহম্মদ মিলে ৫ জনের একটি দল তৈরি হয়। বাংলাদেশের প্রথম দলের সদস্য বাবু, সম্পা, মুসা, সাগরের সফল প্রত্যাবর্তনের দুই দিন পর এই দলটি ২৪১ নম্বর প্রশিক্ষণ কোর্সটিতে অংশগ্রহণ করতে যায়। ৫ জনের মধ্যে আব্দুল্লাহ-আল-মুঈদ ও নূর মোহম্মদ ছাড়া বাকি তিনজন কোর্স শেষ করার আগেই বিভিন্ন কারণে ফেরত আসেন। ফলে ট্রান্সকম বেভারেজের ব্যাপক অর্থ ট্রান্সকমের প্রসার ও প্রচারের কাজে লাগলেও বাংলাদেশের পর্বতারোহণের ক্ষেত্রে তেমন ভূমিকা রাখতে পারেনি। অপরদিকে একই কোম্পানির কাছ থেকে স্বল্প অর্থ পাওয়া বাংলাদেশ এভারেস্ট টিম পরবর্তীতে পর্বতারোহনের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা রেখেছে, এখনও রাখছে।

১২ মার্চ ইনাম-আল-হক ও মুনতাসির মামুন ইমরানের পর্বতারোহণ বিষয়ে ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে অবহিত হতে ভারত ভ্রমণের পর ১৪ এপ্রিল ২০০৪ বাংলা নববর্ষের দিনে (১লা বৈশাখে) ইনাম আল-হকের পুরাতন ডি. ও. এইচ. এস এর বাসভবনে একটি বিশেষ সভা ও ভোজ অনুষ্ঠিত হয়। সদ্য পর্বতারোহণ প্রশিক্ষণ সমাপ্ত করা মীর শামছুল আলম বাবু, সাদিয়া সুলতানা সম্পা, মুসা ইব্রাহীম ও সিরাজুল হক সাগরের সাথে ইনাম-আল-হকের আলোচনার পর কতিপয় সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একটি মাউন্টেনিয়ারিং ক্লাব গঠনের পরিকল্পনা করা হয়। ‘বাংলা মাউন্টেনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাব’ নামে এই ক্লাবের ব্যানারে পরবর্তী সকল পর্বতারোহণ কর্মকাণ্ড পরিচালিত হবে। ক্লাবের মুখপত্র হিসাবে ‘শিখর পেরিয়ে’ নামে একটি দুই পাতার মাসিক বুলেটিন প্রকাশিত হবে এবং আগামী মে মাসে বাংলাদেশ থেকে সাংগঠনিকভাবে প্রথম দলগত এভারেস্ট বেসক্যাম্প ট্রেকিং অনুষ্ঠিত হবে বলে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়।

বাংলা মাউন্টেনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাবের উপদেষ্টা নির্বাচিত হন জনাব ফওজুল করিম তারা, সমন্বয়কারী আ. ব. ম. সালাউদ্দিন, সহসমন্বয়কারী এম. আব্দুল মুহিত। ক্লাব গঠনের পর এখনও আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন না হলেও ক্লাবের সদস্য সংখ্যা প্রতিনিয়তই বাড়ছে। প্রতিমাসের তৃতীয় বুধবার ইনাম আল হকের বাসায় নিয়মিত ক্লাবের আড্ডা হয়। ঐ আড্ডার দিনই মুসা ইব্রাহীমের সম্পাদনায় বুলেটিন ‘শিখর পেরিয়ে’ প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশে পর্বতারোহণ সূচনা করা এই ক্লাবের মাধ্যমে পরবর্তীতে অনেক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়েছে।



 এভারেস্ট বেস্ক্যাম্প ট্রেকিং দল; আলোকচিত্র /মীর শামছুল আলম বাবু


মে মাসে ‘মাউন্টেন ডিউ’ ও কোরিয়ান প্রতিষ্ঠান ‘ইয়াং ওয়ান’-এর সহযোগিতায় সংগঠিত হয় বাংলাদেশের প্রথম দলগত এভারেস্ট বেইজ ক্যাম্প ট্রেকিং। ১০ মে লুকলা থেকে শুরু হওয়া এই দলে ইনাম-আল-হকের নেতৃত্বে অংশ নিয়েছেন মুসা ইব্রাহীম, কাজী শামসুজ্জামান মৌ, এম. আব্দুল মুহিত, চিত্রকর কালিদাস কর্মকার, ট্রান্সকম বেভারেজের নির্বাহী পরিচালক গোলাম কুদ্দুস চৌধুরী,ডা. রোনাল্ড হালদার ও সাদিয়া সুলতানা সম্পা। শিল্পী কালিদাস কর্মকার ও ডা. রোনাল্ড হালদার ছাড়া বাকি সবাই লুকলা-মানজো-নামচে বাজার-থ্যাংবোচে- পেরিচে-দুগলা-লেবুচে-গোরকশেপ-কালাপাথর রুটে ট্রেকিং সমাপ্ত করেন।

জুন মাসের ২৪ তারিখে ঢাকার চারুকলা ইনস্টিটিউটের জয়নুল গ্যালারিতে অনুষ্ঠিত হয় মীর শামছুল আলম বাবুর পর্বত ও পর্বতারোহণ বিষয়ক একক আলোকচিত্র প্রদর্শণী। মার্চ মাসে বেসিক মাউন্টেরিয়ারিং কোর্স করার সময় বাবু যে সব আলোকচিত্র গ্রহণ করেছেন তার মধ্য থেকে বাছাই করা ৩৫টি আলোকচিত্র দিয়ে ৭দিন ব্যাপী এই ব্যতিক্রমধর্মী আলোকচিত্র প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন প্রখ্যাত চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব এম. আব্দুস সামাদ। বিশেষ অতিথি ছিলেন আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুন ও বাংলাদেশ এভারেস্ট টিম-১-এর দলনেতা প্রকৃতিপ্রেমী ইনাম-আল-হক। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন বাবুর পিতা মীর আব্দুস সামাদ ও পর্বতারোহণ সঙ্গী সাদিয়া সুলতানা সম্পা। প্রদর্শনীটিকে কেন্দ্র করে প্রতিদিন চারুকলা চত্ত্বরে বসতো বাংলাদেশ থেকে পর্বতারোহণ প্রশিক্ষণ সমাপ্তকারীদের জমপেশ আড্ডা। এছাড়া আজিমপুরের ভ্রমণ বাংলাদেশে’র সদস্যরা নিয়মিত আসতেন। শুধু অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয়রা নয় সর্বস্তরের বিপুল দর্শক প্রতিদিন উপভোগ করেছেন এই আলোকচিত্র প্রদর্শনী।


বাবুর প্রদর্শণী উদ্বোধন করছেন বাবু’র পিতা মীর আব্দুস সামাদ। আলোকচিত্র/দিদারুল ইসলাম সুজন


বাবুর প্রদর্শনীর সফলতার পর আগস্ট মাসের ২৮ তারিখ থেকে ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঢাকার দৃক গ্যালারিতে অনুষ্ঠিত হয় ‘হিমালয়ের মনোহর মুখ’ শীর্ষক আরো একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনী। বাংলা মাউন্টেনিয়ারিং অ্যন্ড ট্রেকিং ক্লাবের পৃষ্ঠপোষকতায় এই আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেন ইনাম-আল-হক, এম. আব্দুল মহিত, মুসা ইব্রাহীম ও সাদিয়া সুলতানা সম্পা। আলোকচিত্র প্রদর্শনীর বিষয়বস্তু ছিল হিমালয় এবং এর পরিবেশ ও মানুষজনের জীবনযাত্রা। মুসা, মুহিত ও সম্পার এটিই ছিল প্রথম আলোকচিত্র প্রদর্শনী। এই তিনজন নবীন আলোকচিত্র শিল্পীর সাথে প্রবীণ ইনাম-আল-হকের তোলা হিমালয়ের উত্তুঙ্গ পর্বত শিখর, দুর্গম গিরিপথ আর নিভৃত উপত্যকায় বহমান শেরপা জীবনের প্রতিচ্ছবি বহু দর্শককে আকৃষ্ট করেছে।

সেপ্টেম্বর মাসে মীর শামছুল আলম বাবু ও সাদিয়া সুলতানা সম্পা অংশগ্রহণ করেন উচ্চতর পর্বতারোহণ প্রশিক্ষণ (অ্যাডভান্স মাউন্টেনিয়ারিং) কোর্সে। একই সময় এম. আব্দুল মুহিত, রূপেস চাকমা, মারুফ উল গনি জুয়েল ও আহম্মেদ নূর ফয়সাল অংশগ্রহণ করেছেন বেসিক মাউন্টেনিয়ারিং কোর্সে। সম্পা, মুহিত ও রুপেশের খরচ বহন করে বাংলা মাউন্টেনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাব। ওই সেপ্টেম্বর মাসেই ইনাম-আল-হক আবারও এভারেস্ট বেসক্যাম্প ট্রেইলে ট্রেকিং এবং ইমজাৎসে (আইল্যান্ড পিক, উচ্চতা ২০,২০৫ ফুট/৬,১৬০ মিটার) পর্বতে অভিযানের সম্ভাব্যতা যাচাই করতে নেপাল ভ্রমণ করেন। এছাড়া সিরাজুল হক সাগর একই সময়ে এভারেস্ট বেসক্যাম্প ট্রেইল এবং গোকিও ট্রেকিং সম্পন্ন করেন। অপর দিকে মুনতাসির মামুন ইমরান ও রিফাত হাসান সম্পন্ন করেন স্টোক কাংড়ি অভিযান। এই অভিযানে ২৬ অক্টোবরে রিফাত হাসান জয় করেন কারাকোরাম হিমালয়ের ২০,০৭৭ ফুট (৬,১২১ মিটার) উচ্চতা বিশিষ্ট স্টোক কাংড়ি পর্বত চূড়া।

ডিসেম্বর মাসে মীর শামছুল আলম বাবু দার্জিলিং ও কোলকাতা ভ্রমণ করে পর্বতারোহণ বিষয়ক বহু সরঞ্জাম ক্রয় এবং বাংলাদেশের প্রথম কৃত্রিম রক ক্লাইম্বিং ওয়াল স্থাপনের সকল বিষয় চূড়ান্ত করেন। নেপচুন অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টস কর্তৃক অর্থায়নকৃত এই কৃত্রিম রক ক্লাইম্বিং ওয়ালটি স্থাপন করা হয় নেপচুন মোবাইল পার্কের মাঠে। বাণিজ্যিক বিনোদনমূলক কাজের জন্য ব্যবহার এই রক ওয়াল স্থাপনের মূল উদ্দেশ্য হলেও ওয়ালটি বাংলাদেশের পর্বতারোহীরা অনুশীলনের কাজে ব্যবহার করেছে।

২০০৫ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে ১২ তারিখে  বাংলাদেশ এভারেস্ট টিম-১ এবং বাংলা মাউন্টেনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাবের একমাত্র মহিলা সদস্য সাদিয়া সুলতানা সম্পা “অনন্যা শীর্ষ দশ- ২০০৪” সম্মাননায় ভূষিত হন। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সমাজ সেবা পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণের স্বীকৃতি স্বরূপ মহিলাদের পত্রিকা ‘পাক্ষিক অনন্যা’ কর্তৃক প্রতি বছর বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য ১০ জন শ্রেষ্ঠ নারীকে এই পুরস্কারে ভূষিত করে থাকে। ২০০৪ খ্রিস্টাব্দের জন্য অন্য নয়জন নারীর সাথে পর্বতারোহণের মাধ্যমে রোমাঞ্চকর জগতে নারীদের অভিষেক ঘটানোর জন্য পুরষ্কৃত হন সাদিয়া সুলতানা সম্পা।


হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে কোর্সমেটদের সঙ্গে সাদিয়া সুলতানা সম্পা; আলোকচিত্র/মীর শামছুল আলম বাবু


২০০৫ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে বাংলা মাউন্টেনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাবের ব্যানারে ‘মাউন্টেনডিউ’ এবং ‘ইয়াং ওয়ান’-এর আংশিক অর্থ ও কারিগরি সহায়তায় অনুষ্ঠিত হয় দেশের প্রথম দলগত পর্বতারোহণ অভিযান। নেপালের সলোখুম্বু এলাকায় অবস্থিত মেরা পিকে অনুষ্ঠিত এই অভিযানে অংশ নেন ইনাম-আল-হক, এনাম তালুকদার, রিফাত হাসান, মুসা ইব্রাহীম, সিরাজুল হক সাগর, মীর শামছুল আলম বাবু ও সাদিয়া সুলতানা সম্পা। ২১,৮২৫ ফুট (৬,৬৫৪ মিটার) উচ্চতা বিশিষ্ট এই পর্বতে বাংলাদেশের প্রথম অনুষ্ঠানিক পর্বত অভিযানের মূল নেতা ছিলেন ইনাম-আল-হক। পর্বতারোহণ নেতা (ক্লাইম্বিং লিডার) ছিলেন সিরাজুল হক সাগর ও উপনেতা রিফাত হাসান। ‘দি নর্থ ফেস নেপাল’-এর স্বত্বাধিকারী দিপ লামার সহযোগিতায় ‘নি কো ট্রেক অ্যান্ড ট্যুরস’ প্রতিষ্ঠানের গাইড আং দাওয়া শেরপা ও ক্লাইম্বিং গাইড ৫ বার এভারেস্ট বিজয়ী আং কামি শেরপাকে নেয়া হল অভিযানের সার্বিক সহযোগী হিসাবে। অভিযাত্রী দলকে শুভেচ্ছা জানাতে ঢাকা থেকে কাঠমুণ্ডু পর্যন্ত গিয়েছিলেন ট্রান্সকম বেভারেজের গোলাম কুদ্দুস চৌধুরী এবং শিল্পী কালিদাস কর্মকার।

লুকলা থেকে শুরু হওয়া মূল অভিযানে চুতেঙ্গা-ছাত্রালা পাস হয়ে তুলি খারকা পর্যন্ত যেতে তিন দিন লাগলো। ছাত্রালা পাসে বাবুর উচ্চতাজনিত সমস্যা হলেও সকলে সফলভাবে তুলি খারকা পৌঁছালো। তুলি খারকাতেই ডায়রিয়া ও হাঁটু ব্যথার জন্য রয়ে গেলেন ইনাম-আল-হক। তারপর থাকনাক-খারে হয়ে মেরা পিক বেসক্যাম্প। বেসক্যাম্প থেকে হাই ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে রওনা দেবার মুহূর্তে সমস্যা হল সাদিয়া সুলতানা সম্পার। ফলে সম্পা রয়ে গেল বেসক্যাম্পে। হাই ক্যাম্পের পথে সারাদিনের গ্লেসিয়ার যাত্রায় ভীষণভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লো কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা এনাম তালুকদার। পরদিন মেরা পিক চূড়ায় আরোহণের কথা। রাত ২টায় যখন আরোহণের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হল তখন দেখা গেল সবাই কমবেশি অসুস্থ। এর মধ্যে এনাম তালুকদার সবচেয়ে বেশি অসুস্থ। সঙ্গে আসা শেরপা গাইড দুজনের অবস্থাও বেশি ভালো না। রিফাত ও বাবু চূড়ান্ত আরোহণের জন্য প্রস্তুত হলেও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করার পর সবমিলিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হল এখানেই অভিযান সমাপ্ত করার এবং ফেরত যাবার। বাংলাদেশের প্রথম পর্বতারোহণ অভিযান সমাপ্ত হয় অসফলভাবেই। একই বছর (২০০৫) মে মাসেই সালমান সাঈদ গিয়েছিলেন ভারতের হরিদ্বারে গাড়োয়াল হিমালয়ের দেওবান পর্বত অভিযানে। কিন্তু সালমানের সেই অভিযানও ব্যর্থ হয়।

সেপ্টেম্বর-অক্টোবর সেশনে মীর শামছুল আলম বাবু ও মুসা ইব্রাহীম ব্যক্তিগত অর্থব্যয়ে গমন করেন হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে। মুসা ইব্রাহীম উচ্চতর পর্বতারোহণ কোর্স সমাপ্ত করেন আর মীর শামছুল আলম বাবু সমাপ্ত করেন মেথোড অব ইনস্ট্রাকশন কোর্স। বাংলাদেশীদের মধ্যে মীর শামছুল আলম বাবুই প্রথম ব্যক্তি যিনি পর্বতারোহণ প্রশিক্ষণের প্রশিক্ষক হবার যোগ্যতা অর্জন করেছেন।

৫ নভেম্বর ঈদ-উল-ফিতরের পরদিন আজিমপুরের ভ্রমণ বাংলাদেশের ১৫ জনের একটি দল বান্দরবানের  কেউক্রাডং ভ্রমণে গিয়ে দেশের প্রথম প্রাকৃতিক রক ক্লাইম্বিং করে আসেন। পুরো ভ্রমণ দলে ছিলেন সৈয়দ গোলাম কিবরিয়া দিপু, আরশাদ হোসেন টুটুল, মোহাম্মদ বাহার উল্লাহ, নাসিমুল হক মার্টিন, ইসরাফিল খোকন, মো. মানিক মিয়া, মাসুদ আনন্দ, কাজী জুয়েল আব্বাস, সারোয়ার খান লোদী, রিমন খান, কাসেদ আলী নয়ন, সালমা বেগম, বদরুন্নেসা রুমা, সাদিয়া সুলতানা সম্পা ও মীর শামছুল আলম বাবু। পরবর্তীতে অন্য একটি দল থেকে যোগ দেন সালমান সাঈদ। মোট ১৬ জনের দলটি বগালেক-কেউক্রাডং হয়ে ১০ নভেম্বর সাইকত পাড়ায় পৌঁছায়। ১১ নভেম্বর দুপুরে সারোয়ার খান লোদী, মাসুদ আনন্দ, নাসিমুল হক মার্টিন ও সালমান সাঈদকে নিয়ে মীর শামছুল আলম বাবু পাশ্ববর্তী একটি স্থানে যান রক ক্লাইম্বিং করার প্রচেষ্টায়। বাবু ঢাকা থেকেই পূর্ব পরিকল্পনা করে তার রক ক্লাইম্বিং যন্ত্রপাতি বহন করছিলেন। বেশ খোঁজাখুজির পর একটি স্থানকে তারা রক ক্লাইম্বিং করার উপযুক্ত মনে করেন এবং সেখানে কিছুক্ষণ ক্লাইম্বিং করেন। মীর শামছুল আলম বাবুর পরিকল্পনা ও নেতৃত্বে প্রথমে রুট ওপেনার হিসাবে চেষ্টা করেন  বেসিক মাউন্টেনিয়ারিং কোর্স সম্পন্ন করা সালমান সাঈদ। কিন্তু সে পুরোটা করতে ব্যর্থ হওয়ায় রেড ক্রিসেন্টের স্বেচ্ছাসেবক নাসিমুল হক মার্টিন পুরোটা নেমে তারপর ক্লাইম্বিং করে উঠে আসেন। এজন্য সালমান সাঈদ তৎক্ষণাৎ এই রক ফেসটার নামকরণ করেন ‘মার্টিন রক’ নামে। মার্টিনের পর সারোয়ার খান লোদী এবং তারপর বাবু পুরোটা ক্লাইম্বিং করেন। প্রাথমিকভাবে অগোছালো এবং পুরোপুরি পাথুরে শক্ত ফেস না হলেও ন্যাচারাল রক ক্লাইম্বিং বলতে যা বোঝায় তা বাংলাদেশে এটাই প্রথমবারের মতো সম্পন্ন হল।

বাংলা মাউন্টেনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাবের পক্ষ থেকে ১১ ডিসেম্বর বিশ্ব পর্বত দিবস পালন করা হয়। ৯ ডিসেম্বর থেকে তিনদিন ব্যাপী এই কর্মসূচি শুরু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠে পর্বতারোহণ ক্যাম্প ও আলোকচিত্র প্রদর্শনী, মানিকগঞ্জ থেকে ঢাকা অভিমুখে দুইদিন ব্যাপী ট্রেকিং, চারুকলা ইনস্টিটিউটে স্লাইড ও ভিডিও প্রদর্শনী এবং টি. এস. সি চত্বরে আলোকচিত্র প্রদর্শনী প্রভৃতি কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেশে প্রথম বারের মতো বিশ্ব পর্বত দিবস পালন করা হয়। ইনাম-আল-হকের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং মুসা ইব্রাহীমের তত্ত্বাবধানে এসব কর্মকাণ্ডে পর্বতারোহণে আগ্রহী অনেকে অংশ গ্রহণ করেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ ট্যুরিজম এক্সপানসন ফোরাম মুনতাসির মামুন ইমরানের নেতৃত্বে দিবসটি পালন করে।

১৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৬ একুশে বই মেলায় প্রকাশিত হয় এভারেস্ট হাইওয়ে ট্রেকিং নিয়ে লিখিত মুনতাসির মামুন ইমরানের ভ্রমণ কাহিনী- ‘এভারেস্ট’। এই বইটিতে ইমরান ২০০৩ খ্রিস্টাব্দে রিফাত হাসানসহ সম্পন্ন করা এভারেস্ট হাইওয়ে ট্রেকিং-এর কাহিনী বর্ণনার পাশাপাশি এভারেস্ট অভিযানের ইতিহাস বর্ণনা করেছেন। কিছু তথ্যগত ভুল থাকলেও বইটি সুলিখিত ও সুপাঠ্য।

মার্চ মাসে বিশ্ব নারী দিবসকে কেন্দ্র করে বাংলা মাউন্টেনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাবের আয়োজনে এবং যুবক ফোনের পৃষ্ঠপোষকতায় সাদিয়া সুলতানা সম্পার নেতৃত্বে বাংলাদেশের প্রথম শুধুমাত্র নারীদের নিয়ে কেউক্রাডং ট্রেকিং অনুষ্ঠিত হয়। ৩ মার্চ থেকে অনুষ্ঠিত ওই ট্রেকিং-এ অংশ নেন আফরিন খান দীপা, বদরুন্নেসা রুমা, নাতাশা শের, সাজিয়া সুলতানা বুবলি, নিশাত মজুমদার নিশো, মানিফা ইসলাম কানিজা, তালবিদা আলী মীম। ৮ মার্চ তারা কেউক্রাডং চূড়ায় পদার্পন করেন।


 

(Visited 1 times, 1 visits today)
মীর শামছুল আলম বাবু
মীর শামছুল আলম বাবু
একাধারে আলোকচিত্রী, চলচ্চিত্র গবেষক, পর্বতারোহণ প্রশিক্ষক। পাহাড়ের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন ১৯৯৬ সালে। ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে বান্দরবানের কেওক্রাডংয়ে সফল অভিযানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তার ট্রেকিং ও পর্বতারোহণ জীবনে পদার্পণ।

৮ thoughts on “বাংলাদেশে পর্বতারোহণ যুগের সূচনা (পর্ব ৩)

  1. লেখক কে ধন্যবাদ।
    < এই প্যরার সাথে কিছু যুক্ত করতে চাই —
    .
    .
    ইতিমধ্যে ব্যাপক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে বাছাইকৃত মাউন্টেন ডিউ টিম এক্সটিমের প্রথম দলের তিনজন মুঈদ, তানিম ও মাসুদসহ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল এসোসিয়েশনের প্রধান ব্যক্তি মিলন এবং তার সহযোগী নূর মোহম্মদ মিলে ৫ জনের একটি দল তৈরি হয়। বাংলাদেশের প্রথম দলের সদস্য বাবু, সম্পা, মুসা, সাগরের সফল প্রত্যাবর্তনের দুই দিন পর এই দলটি ২৪১ নম্বর প্রশিক্ষণ কোর্সটিতে অংশগ্রহণ করতে যায়। ৫ জনের মধ্যে আব্দুল্লাহ-আল-মুঈদ ও নূর মোহম্মদ ছাড়া বাকি তিনজন কোর্স শেষ করার আগেই বিভিন্ন কারণে ফেরত আসেন। ফলে ট্রান্সকম বেভারেজের ব্যাপক অর্থ ট্রান্সকমের প্রসার ও প্রচারের কাজে লাগলেও বাংলাদেশের পর্বতারোহণের ক্ষেত্রে তেমন ভূমিকা রাখতে পারেনি। অপরদিকে একই কোম্পানির কাছ থেকে স্বল্প অর্থ পাওয়া বাংলাদেশ এভারেস্ট টিম পরবর্তীতে পর্বতারোহনের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা রেখেছে, এখনও রাখছে।
    .
    .
    মিলন ট্রেনিং চলাকালিন সময়ে পা মচঁকে ফেরৎ আসে। সঙ্গে ব্যক্তিগতকারণে মাসুদ চলে আসে।
    .
    ,
    মুঈদ, তানিম এবং নূর মোহাম্মদ – এই তিনজন সেই ট্রেনিং শেষ করেছিলো।
    .
    ,
    বাংলাদেশের সব বিভাগীয় শহরে এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল এসোসিয়েশন এর যে দল এর জন্য কাজ করেছে- মিলন, নূর মোহাম্মদ(পবর্ত আরোহী), ফরিদ উদ্দিন, মেহেদী হক (কার্টুনিস্ট), নিশাত মজুমদার (পবর্ত আরোহী), অর্নব ….
    .

    1. তানিম পরের বছর, ২০০৫ সালে ব্যক্তিগত খরচে বেসিক ট্রেনিং সফলভাবে সমাপ্ত করেন। এসময় তিনি “রিনক” সামিট করেন। ২০০৪ এ ভয়াবহ জন্ডিস নিয়ে (বিলিরুবিন ১৩) কোর্স শেষ হবার মাত্র দুদিন আগে বেইস ক্যাম্প থেকে চলে আসেন। যতদূর মনে পড়ে বাবুর বইয়ে এই তথ্যগুলো ছিল। এখানে না থাকার কারণ কী?

      1. বইটার একটি বিশেষ অধ্যায় এখানে ছাপা হচ্ছে – সেখানে সংক্ষিপ্তকারে সব কিছু বলা আছে। আর মুল বইটাতে প্রকাশের সময় (ফেব্রুয়ারি ২০০৭) পর্যন্ত সকল পর্বতারোহী’র মত ‘তানিম’ (মোঃ আশরাফুল হক তানিম) সম্পর্কে ছবি ও পরিচিতি সহ দুই পাতায় বিস্তারিত ছাপা আছে। সেখানে কবে, কখন, কেন, কোন কোর্স – ইত্যাদি সব আছে। আপনি হয়তো সেটার কথা বলছেন।

    2. মন্তব্য করার জন্য আপনাকেও ধন্যবাদ মিলন ভাই, আপনি লেখা আপলোড হবার পর আমার আগেই পরেন দেখে খুশী হলাম। মন্তব্যে আপনি যা যা লিখেছেন আমিও তাই বলেছি, শুধু একটু আমার মত করে। আর ‘তানিম আশরাফ’ জন্ডিস হবার কারনে কোর্সের শেষ পর্যায়ে ফেরত আসেন এবং পরের বছর ২০০৫ এর এপ্রিলে আবার গিয়ে বেসিক কোর্স শেষ করেন।

  2. অ্যাস্ট্রোনমির লোক নূর আর নিশাত এর পাহাড়ে যুক্ত হওয়াটায় এই উদ্যোগের কোন ভূমিকা নেই?

    1. মিলন ভাই, নুর মোহাম্মাদের কথা যথাস্থানেই আছে, আর এই পর্বে যে সময় (মার্চ ২০০৬) পর্যন্ত লেখা আছে সেই সময়ে নিশু সরাসরি পর্বতারোহণে যুক্ত হয়নি – তবে সাদিয়া সম্পার নেতৃত্বে ‘বাংলাদেশের প্রথম শুধুমাত্র নারীদের কেউক্রাডং ট্রেকিং’-এ গিয়েছেন তা কিন্তু শেষ প্যারাতেই আছে। একটু দেইখেন ভাই।

  3. টিম এক্সট্রিম কম্পিটিশন দলছুটের উদ্যোগ হলে বাবু ভাইয়ের এখনকার ক্লাবের নাম টিম এক্সট্রিম হল কিভাবে?

    1. ধন্যবাদ, ‘মাউন্টেন ডিউ টিম এক্সটিম’ ছিল ‘বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল এসোসিয়েশনের পত্রিকা ‘দলছুট’-এর প্রতিযোগিতা’র নাম। যা ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শেষ হয় এবং এরপর বিজয়ী দলের তিনজন (মুঈদ, তানিম, মাসুদ) এবং আয়োজক ‘মশহুরুর আমিন মিলন ও নুর মোহাম্মাদ’ HMI তে বেসিক কোর্স করতে যায় – কিন্তু বিজয়ী দলের একজন (আব্দুল্লাহ আল মুঈদ) ছাড়া বাকীরা কোর্স শেষ করতে ব্যর্থ হয় দেখে ঐ প্রতিযোগীতা ও টিম সেখানেই সমাপ্ত হয়ে যায় এবং পরবর্তী মে ২০০৫ এর প্রতিশ্রুত ব্যয়বহুল ‘এভারেস্ট বেইস ক্যাম্প ট্রেকিং’ও পরিত্যক্ত হয়। এর অনেক পরে ২০০৭ এ আমি ‘সংগঠন’ করার সময় প্রয়োজন না হওয়া স্বত্বেও মিলন ভাইয়ের সাথে আলোচনা করে “টিম এক্সট্রিম” নাম দেই – যার প্রথম ইভেন্টেই নুর মোহাম্মাদ ‘প্রধান ভলেন্টিয়ার’ হিসেবে যুক্ত ছিলেন।

মন্তব্য করুন

*Please Be Cool About Captcha. It's Fun! :)