বহুরূপী হিমালয়

ভোজবাসার দুই কিলোমিটার সামনে থেকে শিবলিং দর্শন। [ছবি] শাহাদাত হোসাইন সরকার


ভারতবর্ষের মাথার মুকুট হয়ে উত্তর দিক জুড়ে অবস্থান করছে হিমালয়। যুগের পর যুগ ধরে সারা পৃথিবীর অভিযাত্রীদের কোন এক মহাজাগতিক আকর্ষণে নিজের কাছে টেনে আনছে হিমালয়। আল্পস হোক বা আন্দিজ, সাহারা মরুভূমি হোক বা অ্যান্টার্কটিকা, ব্রাজিলের আমাজন হোক বা মঙ্গোলিয়ার তাকলা মাকান, যেখানে যতই অ্যাডভেঞ্চার করে আসুন না কেন, হিমালয়ে না এলে বিশ্বের দরবারে অভিযাত্রী হিসেবে কৌলীন্য অর্জন করা কোন মতেই সম্ভব নয়। আপনি প্রশ্ন করবেন কলম্বাস, মার্কোপোলো, ক্যাপ্টেন স্কট, ক্যাপ্টেন কুক, আমুণ্ডসেনের মতো জাঁদরেল অভিযাত্রীরা জীবনে হিমালয়ে আসেননি। তা সত্ত্বেও তো তাঁরা পৃথিবীর সর্বকালের সর্বযুগের সেরা অভিযাত্রী হিসেবে বিবেচনা করা হয়?

আমার উত্তর, প্রধানত সেই অভিযানগুলো ছিল নৌপথে, পর্বতের অন্দরমহলে লুকিয়ে থাকা চ্যালেঞ্জ ও সৌন্দর্য তাঁদের নজরে আসেনি। তাঁদের ছিলো ভূখণ্ড আবিস্কারের নেশা। আর হিমালয়ের অভিযাত্রীদের আছে নিজের ক্ষমতাকে অতিক্রম করার নেশা, যা পরাধীন ভারতের শাসক বৃটিশরা অনুধাবন করেছিলো। অবশ্য তার কয়েক হাজার বছর আগেই হিমালয়ে অভিযান চালিয়েছেন ভারতীয় সাধু সন্যাসীরা, ভারত থেকে তিব্বত ও পাকিস্তান হয়ে মধ্য ও পশ্চিম এশিয়ায় ব্যবসা করতে যাওয়া ব্যবসায়ীরা ও বিদেশী আক্রমণকারীরা।

সময়ে সময়ে আবিস্কৃত হয়েছে একের পর এক গিরিপথ। সেজন্য খেয়াল করবেন ভারতের বিখ্যাত তীর্থস্থানগুলির অবস্থান হিমালয়ের বিপদসংকুল স্থানে- অমরনাথ, কেদারনাথ, বদ্রীনাথ, গঙ্গোত্রী, যমুনোত্রী, রুদ্রনাথ, তুঙ্গনাথ, মদমহেশ্বর, কিন্নর কৈলাস, কল্পেশ্বর থেকে নেপালের মুক্তিনাথসহ আরো কত শত। হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে সেগুলি অবস্থান করছে, কয়েকটি অবশ্য কয়েকশ বছরের পুরোনো। এখন পিচ ঢালা রাস্তা হিমালয়ের দিকে অনেকটা এগিয়ে গেলেও, বাকিটা এগুতে দেয়নি স্বয়ং হিমালয়। প্রতিকূলতা সৃষ্টি করে ঘাড় ধরে থামিয়ে দিয়েছে মানুষের আগ্রাসন। তাই আজও হিমালয় আছে হিমালয়ই।

হিমালয়ের গঙ্গোত্রী অঞ্চলটা সবসময় আমাকে আকর্ষণ করে। ধর্মীয় কারণে নয়, চোখের সুখের জন্য। ভয়ংকরের মধ্যেও যে সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে, তা বুঝি এখানে এলেই বোঝা যায়। দুজন কিংবদন্তী মাউন্টেনিয়ার এই অঞ্চলে এসে এই অঞ্চলের আকর্ষণ আরও বাড়িয়ে দিয়ে গেছেন। বিশ্বখ্যাত পর্বতারোহী এরিক শিপটন ও বিল টিলম্যান। তাঁরা সফলভাবে পুরো গঙ্গোত্রী হিমবাহ ট্র্যাভার্স করেছেন এবং কেদারনাথ ও গঙ্গোত্রীর সঙ্গে বদ্রীনাথকে সংযুক্ত করেছেন কালিন্দী খাল (৫৯৬০মি) আর সতপন্থ কোল আবিস্কার করে। যা এই অঞ্চলে সত্যিকারের অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় অভিযাত্রীদের রোমাঞ্চের ইন্ধন যুগিয়েছে।

যাঁরা ভারতীয় হিমালয়ে বহু বছর ধরে আসছেন তাঁদের কেবল একটি কথা জিজ্ঞস করবেন, কালিন্দী খাল গেছেন কিনা। বেশিরভাগই কপালে হাত ঠেকাবেন। এই অভিযানে শৃঙ্গ আরোহণ করতে হয় না, কিন্তু এই ট্রেক অনেক শৃঙ্গ আরোহণের চেয়েও অনেক কঠিন, অনেক বিপজ্জনক ও টেকনিক্যাল। ভারতের উত্তরাখণ্ডের এই কালিন্দী খাল (৫৯৬০মি) সম্ভবত পৃথিবীর সর্বোচ্চ গিরিপথ। বহু অভিযাত্রীর প্রাণ কেড়ে নিয়েছে এই গিরিপথ। এই গিরিপথ গঙ্গোত্রী উপত্যকা ও বদ্রীনাথ উপত্যকাকে পৃথক করে রেখেছে তার জটিল ও ভয়াবহ অবস্থান নিয়ে। পৃথিবীর সেরা অভিযানগুলির মধ্যে এটাও একটা। কালিন্দী খাল অভিযান কুখ্যাত তার বীভৎস সব ক্রিভাস ও তার ক্ষণে ক্ষণে পরিবর্তণ হওয়া মৃত্যুশীতল আবহাওয়ার জন্য।

সালটা ১৯৯২, উত্তরকাশীতে আলাপ হল মু্ম্বাইয়ের একটি অভিযাত্রী দলের সঙ্গে। তারা যাবে কালিন্দি খাল। আমি একা মানুষ, যাবো গোমূখ (গঙ্গার উৎসমুখ) হয়ে তপবন, নন্দনবন হয়ে বাসুকি তাল। বাসুকি তাল পর্যন্ত পথ আমাদের এক সঙ্গে হাঁটতে হবে। তাই ভিড়ে গিয়েছিলাম তাদের সঙ্গে। মুম্বাইয়ের টিমটি চৌদ্দ জনের। সঙ্গে কামেট ও ভাগীরথী শৃঙ্গ আরোহণ করা গাইড। রীতিমতো বড়সড় একটা এক্সপিডিশনের প্রস্তুতি নিয়ে এসেছেন। সব ধরণের সরঞ্জাম সঙ্গে আছে। শুনলাম টিমটা আগের বছরও এসেছিলো। প্রতিকূল আবহাওয়া ফিরিয়ে দিয়েছিল তাদেরকে। তাই এবার রীতিমত যুদ্ধংদেহী মনোভাব নিয়ে এসেছেন। ঠিক করেই এসেছেন, কালিন্দী খাল অভিযান সফল করবেনই। আমাকে সঙ্গী হতে বললেন ওঁদের লিডার রণবিজয় সোনি। কিন্তু আমি অতটা প্রস্তুত হয়ে আসিনি, পোশাকের দিক থেকে ও আর্থিক দিক থেকে। তাই সবিনয়ে না বললাম, তবে বাসুকি তাল পর্যন্ত যাবো কথা দিলাম। ঋষিকেশের পান্ডেজি, আমার আর আমার গাইড কাম কুকের জন্য রেশন কিনে প্যাক করে রেখেছিলেন। ওর নতুন কেনা তাঁবুটাও পরখ করতে চাপিয়ে দিয়েছিলেন গাড়ির ডিকিতে।

পরের দিন সবাই মিলে গঙ্গোত্রী (৩০৪৮মি) থেকে সকল সকাল বেরিয়ে পড়লাম গোমুখের উদ্দেশে। পারমিটের এতো ঝামেলা তখন ছিল না। পাঁচ মিনিটে পাওয়া যেত। আমার সঙ্গে হাঁটছে আমার গাইড বিকাশ নেগি। মুম্বাইয়ের টিমের সবাই ওয়াকিং স্টিক নিয়ে হাঁটছে। হাঁটুকে একটু বিশ্রাম দিতে চাইছে। স্রোতস্বিনী গঙ্গাকে ডানহাতে রেখে চলার পথ। গঙ্গোত্রী ন্যাশনাল পার্কের চেকপোস্ট পেরিয়ে আদি অকৃত্রিম জংলী সৌন্দর্য দুচোখ ভোরে গিলতে গিলতে এগোচ্ছি। বেশ অনেকটা যাওয়ার পর আমাদের ঘাড় বাড়িয়ে দেখতে শুরু করলো কয়েকটি শৃঙ্গ। ওরা হলো ভাগীরথী গ্রুপ। তারা সকালের মিঠে রোদে গল্প করছিলো। বড়সড় টিমটি আসতে দেখে একটু অবাক হলো যেন। এবার দেখছি ভালোই ট্রেকারের ভিড় আছে গোমুখ-তপবন রুটে। হাই হ্যালো করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছিলাম মনের ফুর্তিতে। পেরোলাম চিরবাসা (৩৬০০মি), তারও দেড় ঘণ্টা পর এলাম ভূজবাসা (৩৭৬৯মি)। পাউরুটি, মাখ্‌ ডিমসেদ্ধ আর একমুঠো কাজু-কিসমিস আর কফি দিয়ে নাস্তা হল। মুম্বাইয়ের টিমটি গোমুখে রাত কাটাবে। এক সঙ্গে যাবার কথা হয়েছে, তাই আমারও আজ গোমুখে থেকে যাব।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর তাঁবু পড়েছে একটু দূরে। সেনাবাহিনীর জওয়ানরা ভাগীরথী শৃঙ্গ ক্লাইম্ব করতে এসেছেন। আলাপ হলো মেজর সিমহার সঙ্গে । তাঁবুতে বসিয়ে কফি ও কেক খেতে দিলেন। কত যে গল্প করলেন। উড়িষ্যার বালেশ্বরে তাঁর বাড়ি। বাংলা ভাষাটা খু্ব ভালো জানেন । কবে ফিরবো জানতে চাইলেন। কোনও কিছুর সাহায্য লাগলে বলতে বললেন। উনি এখানেই থাকবেন, ফেরার সময় আমি যেন অবশ্যই দেখা করে যাই, বার বার করে বলে দিলেন। আমাকে নিয়ে গেলেন গোমুখ নামক গ্লেসিয়ার স্নাউটের কাছে। যতবারই গোমুখকে দেখি গা কেমন যেন শিউরে ওঠে, এই ছোট্ট গুহামতো জায়গা থেকেই বেরিয়ে আসছে ইতিহাস ও পূরাণ প্রসিদ্ধ পবিত্র গঙ্গা। হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে বঙ্গোপসাগরে।

গোমুখ থেকেই এ পথের আসল ট্রেক শুরু হয়। আজকের পথটুকু বিভৎস ক্রিভাস ছড়ানো গ্লেসিয়ার, পাথর কাদা মিশিয়ে এক অতীব ক্লান্তিকর। তারচেয়েও কষ্টদায়ক হলো গ্লেসিয়ারকে চুম্বন করে আসা হাড় কাঁপানো বাতাস। পথের প্রথমে পড়বে বিস্তীর্ণ মোরেন অঞ্চল, প্রচুর বোল্ডার চারদিকে। যার ভেতর দিয়ে হাঁটায় আনন্দ বিন্দুমাত্র নেই, কেবল ক্লান্তি আছে। নজর সবসময় পায়ের দিকে, কারণ গোড়ালি মচকে যাওয়ার বিপুল সম্ভবনা। পথের দ্বিতীয় অংশ আরো বিপজ্জনক। ধূলিধূসরিত ফুটিফাটা গ্লেসিয়ার পেরিয়ে পথ উঠেছে নন্দনবনে। এক মুহূর্তের ভুলে তুষার ফাটল গিলে নেবে, হিমালয়ের ফ্রিজে জমে কাঠ হয়ে যাওয়া মাছের মতো রয়ে যেতে হবে যুগের পর যুগ।

পেরোবার সময়ও মনে হচ্ছিল কোন ক্রিভাসে কে ঢুকে আছে কে জানে। মৃত্যুর খবর তো প্রায়ই শুনি। এভারেস্টের খুন্বু আইসফল পেরোতে সাহায্য করে আইসফল ডক্টর নামে কিছু অভিজ্ঞ শেরপা। কিন্তু এখানে গঙ্গোত্রী গ্লেসিয়ার, চতুরঙ্গী গ্লেসিয়ার, আরওয়া গ্লেসিয়ার, অন্দরদীপ গ্লেসিয়ার, ওয়েস্ট কামেট গ্লেসিয়ারে সেরকম কিছুর ব্যবস্থা নেই। নেই বলেই হয়তো বিপদের সঙ্গে সঙ্গে এপথের আকর্ষণও কয়েক গুণ বেশি।

তপোবন (৪৪৬০মি) পেরিয়ে প্রশস্ত সমতল ক্ষেত্র নন্দনবনে (৪৩৩৭মি) এসে গেছি। এখানে মাউন্ট শিবলিং আকাশ জুড়ে দাঁড়িয়ে, একটু হাসলো, যেন বললো, ‘কিরে আবার এলি?’ এছাড়া সারা পথে লুকোচুরি খেলেছে ভাগীরথী, মেরু, থেলুরা।

সারি সারি তাঁবু পড়ে গেল। দুপুর গড়িয়ে বিকেল, পড়ন্ত সূর্যের বরফ ঠিকরানো আলোতে অনবদ্য লাগছে চারপাশ। ইতস্তত প্রস্তরখণ্ড ছড়ানো প্রশস্ত উপত্যকা, বরফ আছে বেশ। কদিন ধরে তুষারপাত হচ্ছে নাকি রাতের দিকে। আমার যাত্রাপথ প্রায় শেষ, বাকি আছে বাসুকি তাল (৪৮৯৮মি )। মুম্বাই টিমটা বাসুকি তাল-খাড়া পাথর-কালিন্দী বেস হয়ে দূর্গম কালিন্দী খাল পেরোবে। তারপর জঙ্গল ক্যাম্প-আরওয়া তাল-আরওয়া নালা পেরিয়ে জনপদ ঘাসতলিতে নামবে। সেখান থেকে বিখ্যাত মানা গ্রাম পেরিয়ে যাবে বদ্রীনাথ। এই অঞ্চলটি পর্বতারোহণের জন্য আদর্শ। ছড়িয়ে ছিটিয়ে আকাশ ভাগাভাগি করে নিয়েছে ভৃগুপন্থ (৬৬৭২মি ), শিবলিং (৬৫৪৩ মি.), মেরু (৬৬৭৩ মি.), কেদারনাথ (৬৯৪০ মি.), ভাগীরথী-১ (৬৮৫৬ মি.), ভাগীরথী-২ (৬৫১২ মি.), ভাগীরথী-৩ (৬৪৫৪ মি.), বাসুকি পর্বত (৬৭৯২ মি.), সতপন্থ (৭০৭১ মি.), চৌখাম্বা-১ (৭১৪০ মি.), চৌখাম্বা-২ (৭০৭০ মি.), চৌখাম্বা-৩ (৬৯৭০ মি.), চৌখাম্বা-৪ (৬৮৫০ মি.)।

মুম্বাই টিম আজ চারদিন হলো আমাদের দুজনকে বিদায় জানিয়ে এগিয়ে গেছে কালিন্দী খালের পথে। আমি নন্দনবন থেকে বরফ ভাসতে থাকা বাসুকি তাল ঘুরে এসেছি এরই মধ্যে। আদর করে এসেছি ভাগীরথী-২ শৃঙ্গের নিচে চতুরঙ্গী হিমবাহকেও। সব কিছু ভালোয় ভালোয় হয়েছে। দুজনের শরীরও ভালো আছে, এবার ফেরার পালা। সব গুছিয়ে নেগি আর আমি নামছি গোমুখের দিকে। আজ বেরোবো না বেরোবো না করেও বেরিয়েছি। কারণ গতকাল মাঝরাত থেকেই আবহাওয়া খু্ব খারাপ।

বের হতে অনেক দেরি হয়ে গেল নেগির সঙ্গে কথা কাটাকাটি করতে করতে। গাইড নেগিকে বলেছিলাম আজ নামবো না। আগামীকাল নামবো। কিন্তু ওর অন্য টিম ধরা আছে, ওরা গাঙোত্রী এসে যাবে আগামী পরশু। তাই নেগি শোনেনি, দুদিনের পড়াও দিয়ে দেবো বলেছি। তাও রাজি হয়নি। দিনের খাবার বলতে গোটা দশেক আলুসেদ্ধ ও গোটা দশেক পরোটা আর শুকনো লঙ্কা আর নিউট্রেলা দিয়ে বানানো চচ্চরি। গঙোত্রী হিমবাহের ওপর দিয়ে সন্তর্পণে নেমে আসছি ক্রিভাস এড়িয়ে। হিমালয়ের আকাশ নেগির মতোই বিচ্ছিরি রকমের ব্যবহার করছে।

মাঝপথে এসেছি, এমন সময় জোরে জোরে হওয়া বইতে লাগলো! বরফ ছেড়ে স্কি জোনে সরে এলাম। কারণ কখন ধাক্কায় ক্রেভাসে ফেলে দেবে কে জানে। দেখতে দেখতে হোয়াইট আউট হয়ে গেলো। নেগি আর আমি দুটো বড়ো বোল্ডারের মাঝের ফাঁকে কোনও মতে ঢুকে গেলাম। আর কিছু করার নেই। শুরু হলো তুষারপাত। নেগি প্ল্যাস্টিক শিট বের করলো। তলায় ঢুকলাম দুজনে। বোল্ডারগুলোর পিছনে বুঝতে পারছি পাথুরে স্ল্যাব আছে, কিন্তু কতো উঁচু ও তার ওপরে কি আছে ঠাহর হচ্ছেনা। আমার ভয় লাগছে প্রায় দৃষ্টিহীনের মতো কুড়ি পঁচিশ মিনিট হাতড়ে হাতড়ে এসে ঢুকেছি। কোনদিকে এলাম কে জানে। যা বরফ পড়ছে, ওপর থেকে যদি একটা ছোটখাটো তুষার ধ্বস নেমে আসে তাহলে আজ এই হিমালয়ের কোলেই দুজনের তুষার সমাধি অনিবার্য।

ইতোমধ্যে সন্ধ্যা হয়ে এলো। হিমালয়ে এমন পরিস্থিতিতে যিনি পড়েছেন একমাত্র তিনি বুঝতে পারবেন পরিস্থিতির ভয়াবহতা। আমি মিনিটে মিনিটে টর্চ জ্বেলে দেখছি পাথর গড়িয়ে পাউডার স্নো নামছে কিনা। পাউডার-স্নো অ্যাভালাঞ্জ নামার পুরো পরিবেশ সমাগত। দমবন্ধ হয়ে মরতে হবে। হাওয়ার গতিবেগ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। টুকরো টাকরা বরফ এবার উড়তে শুরু করেছে। শিলাবৃষ্টির সময় কুড়িগ্রামের শীলের আঘাতে মানুষের মাথা ফেটে যায়। আর এই টুকরোগুলো যথেষ্ট বড়। দুজনে যে যার রুকস্যাক মুখের কাছে ধরে বসে আছি।

ঘড়িতে কটা বাজে জানিনা। এর মধ্যে নেগি বললো, ‘কুছ খাওগে সাব।’ আমি ওকে যা বললাম, সেটা ভদ্রলোকেদের সামনে বলা যাবেনা। এর মধ্যে নেগি ঘোষণা করলো, যেখানে এসে ঝড়ের কবলে পড়েছি খাবারের কিটটা ওখানেই কোথাও স্যাকের ওপর থেকে খুলে পড়ে গেছে। কিভাবে এটা সম্ভব হলো ওপরওয়ালা জানেন। কোনও খাবার নেই আমাদের সঙ্গে। বোল্ডার দুটোর ফাঁকে তিনফুট জায়গার মধ্যে দুজনে কুঁকড়ে বসে আছি। প্রচুর বরফ পড়ছে। মাথার ওপর কেউ যেন বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে । ক্রমাগত হেড করার ভঙ্গিতে মাথার ওপরের প্ল্যাস্টিক শীটে জমা বরফ সামনে ফেলছি। জানিনা নিজেদের নিজেরাই কবর দিতে চলেছি কিনা।

বাইরে যেন প্রলয় লেগেছে, কিছুতেই কমছে না হিমালয়ের রাগ। অবশেষে রাত তিনটে নাগাদ শান্ত হলেন হিমালয়। পাশে নেগি চোখ বুজে ঘুমোচ্ছে মনে হয়। বরফ পড়া বন্ধ হতে ঠাণ্ডার দাপট বেড়ে গেছে কয়েক গুণ। নাক দিয়ে বেরোনো জল বরফ হচ্ছে বুঝতে পারছি। আধো ঘুম, আধো জাগরণ, ক্লান্তি, ক্ষিদে, তেষ্টা সব মিলে মিশে এক কিম্ভুতকিমাকার অবস্থায় আছি। আসতে আসতে ভোর হয়ে আসছে, ভালো মতো ঘুমের ঘোর আসছে আমার, হয়তো ভোরের ভরসায়, নাকি কমে আসছে জীবনীশক্তি। ধুর! এর চেয়ে কতো বিপদ থেকে বেঁচে ফিরেছি। নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়লাম হাঁটু মুড়ে এক ভাবে বসে বসেই।

সাড়ে সাতটা নাগাদ ঘুম ভাঙলো, ওকি নেগি এখনও ওভাবেই শুয়ে আছে। সর্বনাশ মরে গেলো নাকি। এতক্ষণ মড়ার পাশে বসে আছি! ভয় ডর আমার ভীষণ কম, কারণ প্রচুর মৃতদেহ সৎকার করেছি, আর পাহাড়ে বেশ কিছু মৃতদেহ দেখবার দূর্ভাগ্য হয়েছে। হাত বের করে ধাক্কা দিলাম, নেগি চোখ খুলল। যাক বেঁচে আছে। বললাম চলো দেখি কিভাবে নামা যায়। নেগি বললো একটু পড়ে, বলে আবার চোখ বুজলো। হাই অলটিচিউড সিকনেসের কোনও উপসর্গ নেই। ব্যাটার হলো কি? আমি বোল্ডারের শেল্টার ছেড়ে বেড়োতেই বুঝা গেলো ব্যাপারটা কি। আমার পায়ের ধাক্কায় ছিটকে বেরোলো রামের খালি পাঁইট। মুহূর্তেই সব ক্লিয়ার, আমি বৃথাই মরছিলাম ভয়ে। দুর্যোগের ফাঁকে অন্ধকারে পাশে বসে রামের বোতল শেষ করেছে বুঝতেই পারিনি, হয়তো নাক বন্ধ থাকায়। বা হয়তো কখন তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে গেছি সেই সুযোগে।

এখন আকাশ নীল, হিমালয় যেন ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানে না। যেন গতরাতে কিছুই হয়নি। চারদিক ভালো করে নিরীক্ষণ করে বুঝতে পারলাম আমরা ওপরওয়ালার কৃপায় ঠিক জায়গায় শেল্টারটা পেয়েছিলাম। বোল্ডার দুটোর পিছনে একটা ফুট দশেকের পাথর ছিলো। তুষার ধ্বসের ভয় তো ছিলই না বরং কিছু হলে বাঁচিয়ে দিতো বিশাল চট্টানটা।
কিন্তু এখন পুরো এলাকা কাল রাতে পড়া বরফে ভরতি। ধার ঘেঁসে নামতে হবে। অনেক ক্রিভাসের হাঁ করা মুখ বুজে গেছে। সেটা আরও ভয়ংকর। সাতপাঁচ ভাবছি। বেলা দশটা নাগাদ উঠে দাঁড়ালো নেগি। কাঁচু মাঁচু মুখে বললো, ‘মাপ করদো সাব, মেরা কসুর, কাল উধার রুখনাহি ঠিক থা।’

কিছু না বলে স্যাক তুললাম, নেগিও। পাঁচ মিনিটের পথ যেতে আধঘণ্টা লাগছে। গতকাল ব্রেকফাস্টই শেষ খাওয়া। তাও প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা হতে চললো। খালি পেটে পাহাড়ে চলতে পারি না। আমার স্যাকে ঝাল ঝাল কচুর চিপস ছিলো। লঙ্কাগুঁড়ো ঠাসা, পাহাড়ে অরুচি কাটাতে আমার টোটকা। তাই বের করলাম। কয়েকটা খেয়েই চোখে জল চলে এলো। রেগে মেগে নেগিকেও দিলাম, আমাকে অবাক করে কুড়মুড়িয়ে খেলো না কেঁদে।

চোখটা ভিজে গেছে, দৃষ্টি ঝাপসা। তার ভেতরেই সাদা বরফে নীলচে কিছু দেখলাম অনেক দূরে। দৃষ্টি বিভ্রম? উচ্চ হিমালয়ে এটা আকছার ঘটে। কিন্তু নেগিও দেখতে পেয়েছে, ফিসফিস করে বললো, ‘ট্রেকার লোগ।’

কিন্তু আজকের দিনটা স্টাডি না করে ট্রেকার উঠবে ওপরে? কি জানি! হঠাৎ দূর থেকে হ্যান্ড মাইকে ভেসে এলো, ‘ওখানেই দাঁড়ান মিঃ গোস্বামী।’

আরে এতো মেজর সিমহার গলা। আধ ঘণ্টার মধ্যে আমাদের কাছে এসে গেলেন মেজর সিমহা, গলায় ঝোলানো পাওয়ারফুল বাইনোকুলার। সঙ্গে আরও পাঁচ জন সেনা জওয়ান। একজন পিঠের রুকস্যাক থেকে ফ্লাস্ক বের করে গরম কফি দিলেন। এক জওয়ান দিলেন চিকেন স্যান্ডউইচ। মেজর আমার পিঠে হাত দিয়ে বললেন, ‘আগে খেয়ে নিন।’

খেতে ইচ্ছে না করলেও খেলাম। গতকাল দুপুরে আমাদের ফেরার কথা ছিলো। মেজর সিমহা আন্দাজ করেছেন, আবহাওয়া খু্ব খারাপ। আমরা নিশ্চয়ই কোথাও আটকা পড়েছি। তাই জওয়ানদের নিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন আমাদের খোঁজে। কৃতজ্ঞতায় চোখে জল এসে গেল। ইতোমধ্যে জওয়ানেরা আমার আর নেগির স্যাক নিয়ে নিয়েছেন। আমাদের মাঝখানে রেখে বেশ জলদি নামছেন সবাই। এলাকাটা নেগির চেয়েও ভালো চেনেন দেখছি। মেজর সিমহার দামী ওয়াকি টকি ক্ষণে ক্ষণে কি সব বলে উঠছে। হ্যান্ড মাইকটা অন্য এক জওয়ানের কাছে। সে আবার মাঝে মধ্যে হিন্দি গান গাইছে মেজর সিমহার ফরমাইশ মত। দশাসই চেহারা কিন্তু কি মিষ্টি গলা।

টুকিটাকি খেতে খেতে বিকেল নাগাদ নেমে এলাম গোমুখ। মেডিক্যাল তাঁবুতে আর্মি ডাক্তার চেক আপ করলেন মেজর সিমহার নির্দেশে। খোলা আকাশের নিচে সাব-জিরো টেম্পারেচারে আমাদের কোনও ক্ষতি হলো কিনা জানতে। ডাক্তার প্রত্যাশা মাফিক ফিট ঘোষণা করলেন। মেজর বললেন আজ আমাদের তাঁবুতে থাকুন। দুটো তাঁবু ঝটপট পাতা হয়ে গেল। একটা আমার একটা নেগির। তাঁবুতে ঢুকে শরীরটা ধপাস করে ফেলেছি, জুতোও খুলিনি। তাঁবুর দরজায় মেজরের মুখ, হাতে একটা ঠিকানা লেখা প্যাকেট। হাঁ হয়ে জিজ্ঞেস করলাম কি এটা ?

জুতো খুলে মেজর তাঁবুতে ঢুকে আরাম করে বসে বললেন, ‘এর জন্যই তো আপনার খোঁজ করতে ওপরে উঠছিলাম আমি, আপনি ছাড়া এটা কে নিয়ে যাবে কলকাতা? ওখানে, এই ঠিকানায় থাকে আমার শালা। ওকে পাঠিয়ে দেবেন।’

‘কি আছে এতে?’

‘গোমূখের পবিত্র গঙ্গাজল, আমার বিবি চেয়ে পাঠিয়েছে, না হলে বাড়ি ঢুকতে দেবে না বলেছে।’

আমার হাঁ করা মুখ বিস্ময়ে আরও হাঁ হল। মনে মনে বললাম ‘বাবা হিমালয়, আর কত খেলা দেখাবে আমার এই এক জীবনে।’


(Visited 1 times, 1 visits today)
রূপাঞ্জন গোস্বামী
রূপাঞ্জন গোস্বামী
লেখক নিজেকে বোহেমিয়ান,বাউন্ডুলে, উড়নচন্ডী এইসব বিশেষণে অভিহিত করতে ভালোবাসেন।হিমালয়কে হৃদয়ের গভীরতায় মাপেন, উচ্চতায় নয়।

৪ thoughts on “বহুরূপী হিমালয়

  1. এতো মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা । রূপাঞ্জন (আমি মিঃ গোস্বামী বলবো না কারণ সেটা বললে
    আমাদের দু’জনের মাঝে যে সেতুটা ছিলো সেটা স্রোতের টানে ভেসে গেছে মনে হবে , কিন্তু তা তো হয়নি ) তুমি বেড়াতে ভালোবাসো সে প্রমাণ এক আধবার চাক্ষুষ পেয়েছি কিন্তু তা বলে এইরকম ভ্রমণ ? শুনেছি হিমালয় নাকি কাছে টানে। কিন্তু তোমার এই লেখাটা আমাকে এমনভাবে টেনে নিয়ে গেলো যে আমি দম বন্ধ করে এক নিঃশ্বাসে গিঁলতে থাকলাম আর কখন যে খাওয়া শেষ হয়ে গেলো তা বুঝতে পারলাম না । ঘোর কাটতে কিছুটা সময় লাগলো।
    আমি ভিতু মানুষ, এই রকম অভিজ্ঞতা এ জীবনে আমার হবে না । কিন্তু তোমার এরকম লেখা পেলে মানসভ্রমণ করে কিছুটা আনন্দের ভাগিদারী হতে পারবো ।
    ভালো থেকো । অনেক অনেক ভালোবাসা….

  2. আনেক ভাল লাগল পড়ে। পশ্চিমবাংলার ম্যাগাজিনে আপনার লেখা পড়ি।খুবই ভাল লেখেন দাদা।

মন্তব্য করুন

*Please Be Cool About Captcha. It's Fun! :)