ফুনেস উপত্যকা | ডলোমাইটস



ফুনেস উপত্যকা, ডলোমাইটস, দক্ষিণ টিরোল প্রদেশ, ইতালি
জুন, ২০১৮


রাত প্রায় দু’টো। গ্রীষ্মের এই রাতেও তাপমাত্রা দশ ছুঁই ছুঁই। পাইনের জংগল কাটিয়ে ধেয়ে আসা ঠান্ডা বাতাস কাঁপুনি ধরিয়ে দিচ্ছে কিছুটা।

সন্ধ্যায় সরু একফালি চাঁদের দেখা পাওয়া গেলেও এখন আর তার খোঁজ নেই। মাথার ওপরে  আকাশটা ভেসে যাচ্ছে তারার সাগরে। প্রতি ইঞ্চি ভরে আছে অযুত নিযুত জ্বলজ্বলে কিংবা মিটমিটে তারায়। এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকলে বিদ্যুৎ চমকানোর মত সাঁই সাঁই করে খসে পড়ছে অনেকে। নাকি ওসব চোখের ভুল!?

এক খামারবাড়ির সীমানাঘেরা পোক্ত কাঠের বেড়ায় গরিলা পডটার মাকড়সার মত তিনটা পা-ই কষে প্যাঁচালাম। ভয় ছিল বাতাসে আবার না হেলে পড়ে। ‘জোবিই‘র গরিলাপড না নিয়ে কমদামি চীনা গরিলা পড কেনায় সংশয়ে ছিলাম প্যাঁচানোর পরে আবার ঢিল হয়ে খুলে পড়ে কিনা। কিন্তু তেমন কিছুই হল না। লেন্স আর বডিসহ প্রায় বারোশো গ্রামের ক্যামেরাটা নিয়ে বেড়ার গায়ে নিষ্কম্প আটকে রইল জিনিসটা।

কয়েকটা টেস্ট শট নিয়ে মনমত অ্যাঙ্গেল আর দরকারি অ্যালাইনমেন্ট ঠিক করে নিলাম। কিন্তু ফোকাস করা নিয়ে পড়লাম বিপদে। কিছুতেই ফোকাস হচ্ছে না লেন্স। খালি চোখে তারার চাদরের ব্যাকগ্রাউন্ডে সমস্তরকম খাঁজসহ পাহাড়ের অবয়ব স্পষ্ট। সবচে উজ্জ্বল শুকতারাটাকে নিরিখ করে ফোকাস করতে পারছে না ক্যামেরা। লাইভ ভিউতে কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না দেখে ভিউফাইন্ডারে চোখ রেখেও চেষ্টা করলাম অনেকবার। কিন্তু অটোফোকাস মোটর ব্যর্থ হল বারবার। হেডলাইটের আলো ছুঁড়ে সেই আলোকে ফোকাস করার চেষ্টাও সফল হল না। ফোকাস ছাড়াই অন্ধের মত লং এক্সপোজার নিলাম অনেকগুলো। মনে ক্ষীণ দুরাশা, ফোকাস হয়ত হয়ে যাবে কোন জাদুবলে! কিন্তু হল না। সেইসব ‘ঘোলা’ ছবিতেও আকাশভরা তারার পটভূমিতে পাহাড়ের যে দৃশ্য দেখলাম তাতে কষ্টে মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছা করছিল!

একটা বার যদি ফোকাসটা হয়ে যেত কোনভাবে!

কি করব ভেবে পাচ্ছিলাম না কিছুতেই। হতাশ হয়ে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম মনে নেই। একসময় কি মনে করে যেন ফোকাস ম্যানুয়ালে নিয়ে আন্দাজেই লেন্সের রিং কিছুটা ঘুরিয়ে তিরিশ সেকেন্ডের এক্সপোজার সেট করে শাটার চাপলাম। খটাশ করে রিলিজ হল শাটার। দমবন্ধ করে পার করলাম ওই আধা মিনিট। অবশেষে যখন ডিসপ্লেতে জ্বলজ্বলে আকাশে পটভূমিতে পরিষ্কার পাহাড়ের ছবিটা ভেসে উঠল, আপনাতেই অস্ফুট উল্লাস বের হয়ে এল মুখ দিয়ে! শার্প ফোকাস হয়েছে অবশেষে!

ঘড়িতে তখন রাত প্রায় সাড়ে তিনটা। রিং আরেকটু টিউন করে দ্রুত দশ, পনেরো, পঁচিশ আর তিরিশ সেকেন্ডের আরো অনেকগুলো এক্সপোজার নিলাম উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে, নাকি ঠান্ডায় কে জানে!

একটু পরপর বিভিন্ন দিক থেকে অনেকগুলো প্লেন উড়ে যাবার শব্দ পাচ্ছিলাম আগে থেকেই। চলমান সেই আলোগুলোকে ফ্রেমে নেবার চেষ্টা করলাম এবার। এই ছবিতে ধরতে পেরেছি একটাকে।


(Visited 1 times, 1 visits today)
মিলন বাকী বিল্লাহ
মিলন বাকী বিল্লাহ
জীবনযুদ্ধে ব্যস্ততার ভিড়ে একটু হাঁফিয়ে উঠলেই ছুটে চলে যান পাহাড়ে। প্রকৃতির সাথে সাথে পাহাড়ের মানুষের সাথে মিশতে ও তাদের জীবন সম্পর্কে জানতে ভালোবাসেন।

৬ thoughts on “ফুনেস উপত্যকা | ডলোমাইটস

  1. মিলন ভাই, আপনার সাথে কয়েকদিনের জন্যে আউটিংয়ে যাওয়া লাগবে। হাতে কলমে শিখতে পারতাম!! এই মহাকাশগ্রাফিতে একবারও হাত দিতে পারিনি এখনও!

    1. মন্তব্যের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ৷ ইন্টারনেটে প্রচুর টিউটোরিয়াল পাবেন এই ব্যাপারে। ইউটিউবেও পাবেন। অনেক শুভকামনা।

মন্তব্য করুন

*Please Be Cool About Captcha. It's Fun! :)