ফিরে দেখা: আমার প্রথম কেওক্রাডং অভিযান | পর্ব ৩


২য় পর্বের পর 


আবার সুসাং পাড়ার কথায় ফিরে আসি। কেওক্রাডং থেকে সুসাং পাড়ায় যেতে হলে খাড়া রাস্তায় প্রায় এক হাজার ফিট নামতে হয়। সময় লাগে প্রায় দেড় ঘণ্টা। খাড়া রাস্তাটা প্রায় ৭০ ডিগ্রি খাড়া। কোন কোন জায়গায় সেটা আশি ডিগ্রি পর্যন্ত। এই রাস্তা পাড়ি দিতে গিয়ে আমার বাঁ পায়ের হাঁটুতে প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হয়। বাঁ পায়ে বলতে গেলে কোন ভরই দিতে পারছিলাম না। এরপর পুরো অভিযান আমি শেষ করেছি শুধুমাত্র ডান পা আর বাঁশের লাঠির উপর ভর করে।এই ব্যথা সারতে দশ দিন সময় লেগে যায়।

অনেক কষ্টে সকাল দশটায় সুসাং পাড়া বাজারে পৌঁছাই। এখানে বম, মারমা, মুরং ও ত্রিপুরা এই চারটি জাতির বাস। বাজারেই আমরা সেনা সদস্যদের দেখা পেলাম। তারা আমাদের দেখে রীতিমতো বিস্মিত। শখ করে, এতো কষ্ট সহ্য করে কেউ এই এলাকায় বেড়াতে আসতে পারে তা তাদের কল্পনার বাইরে ছিল।


সুনসংপাড়া আর্মি ক্যাম্পের সামনে হেলিপ্যাডে রিপন ও আমি


এদিকে রিপন আর শাহাবুদ্দিন ক্যারাম খেলায় মেতে উঠল। রিপনের কাছে গো হারা হেরে অতি উৎসাহী শাহাবুদ্দিন এবার দাবা নিয়ে আসলো। কিন্তু আমরা তাকে পাত্তা না দিয়ে আর্মি ক্যাম্পের দিকে রওনা দিলাম। আর্মি ক্যাম্পে গিয়ে আরেকটা নতুন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হলাম। ক্যাম্পের সেন্ট্রি পোস্টে দেখলাম ১৪-১৫ বছরের এক কিশোরকে ঘিরে পাঁচ-ছয় জন সেনা সদস্যের একটা জটলা। সাথে একজন স্থানীয় গ্রামবাসীও আছে। জিজ্ঞেস করতে সেনা সদস্যরা জানালো এই কিশোর বার্মার বিদ্রোহী এক বাহিনীর সদস্য। সে মাসে দুইবার বা একবার সুসাং পাড়া বাজারে আসে তার বাহিনীর প্রয়োজনীয় রসদ-পত্র কিনতে। যেহেতু বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সঙ্গে এদের কোন শত্রুতা নেই তাই সেনারাও এদেরকে ঘাঁটায় না। শুধু কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দেয়। ছেলেটার সাথে আমরা একটা ছবি তুললাম। এরপর সেনারা স্থানীয় দোভাষীর মাধ্যমে ছেলেটার কাছ থেকে কিছু তথ্য নিয়ে এবং কয়েক প্যাকেট হাই প্রোটিন বিস্কুট উপহার দিয়ে ছেড়ে দেয়।

বেলা এগারটার দিকে ক্যাম্প কমান্ডার মেজর ওবায়দুল হক চৌকিতে এসে আমাদের সাথে দেখা করেন। আমি ভোরের কাগজের ‘অবসর’ ম্যাগাজিনটা  আমি সাথে করে নিয়ে গিয়েছিলাম, প্রকাশিত আদিত্য কবিরের ‘আমি বিজয় দেখিনি’ আর্টিকেলটা বের করে দেখালাম। মেজর সাহেব পত্রিকাটা দেখে আমাদের নিশ্চিত করলেন, আমরা বিজয় অর্থাৎ কেওক্রাডংয়ে উঠেছি। এটাই বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চূড়া এবং এই চূড়াটাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্বোধন করার কথা ছিল গত ছাব্বিশে মার্চ।

এরপর ক্যাম্প কমান্ডার আমাদেরকে দুপুরে খাওয়ার নিমন্ত্রণ জানিয়ে বিদায় নিলেন। একটু পর ক্যাম্পের ডাক্তার এসে আমার পায়ের ব্যথাটা পরীক্ষা করে ব্যথার জন্য একটা মলম আর দুটো ক্যাপসুল দিয়ে গেলেন। ঘড়িতে দেখলাম এখনও লাঞ্চের আগে আমাদের হাতে এক-দেড় ঘণ্টা সময় আছে। ঘুরতে বের হয়ে গেলাম। পরিচয় হল বাচ্চু ত্রিপুরা নামের এক স্থানীয় যুবকের সাথে। আর্মি ক্যাম্পের পাশেই তার গ্রাম নতুন পাড়া।


সুসাং পাড়া থেকে কেওক্রাডংয়ের পথে


এখানে বলি রাখি, ২০০৪ সালে আমি আবার যখন সুনসংপাড়া যাই তখন নতুন পাড়া গ্রামটি আর দেখিনি। খোঁজ নিয়ে জানতে পারি ক্যাম্পের নিরাপত্তার স্বার্থে সেনাবাহিনী গ্রামটা অন্য কোথায় সরিয়ে নেয়।

বাচ্চু ত্রিপুরার সাথে তার গ্রাম ঘুরে বেশ কিছু ছবি তুললাম। ত্রিপুরাদের সম্পর্কেও কিছু তথ্য জানলাম।

[১] ত্রিপুরারা হিন্দু ধর্মালম্বী।

[২] এঁদের নিজস্ব ভাষা ত্রিপুরা।

[৩] বিবাহিত রমণীরা গলায় প্রচুর পরিমাণে পুঁতির মালা পরে।

[৪] রমণীরা কানে বড় বড় ছিদ্র করে বিশাল আকারের পিতল বা রূপার দুল পরে।

জোহরের নামাজ আর্মি ক্যাম্পেই পড়লাম। এরপর তারা আমাদের মুরগী, সবজি আর ডাল দিয়ে ভাত খেতে দিল। এতে শাহাবুদ্দিনের মুরগী খাওয়ার আফসোস মিটলো। দুপুর দেড়টায় আমরা সুসাং পাড়া আর্মি ক্যাম্প ত্যাগ করি। যাওয়ার সময় মেজর সাহেব আমাদের কয়েক প্যাকেট বিস্কুট দেয় যা পরবর্তীতে আমাদের খুব কাজে আসে।

এরপর শুরু হয় আবার সেই দুর্গম-গিরি-কান্তার পাড়ি দিয়ে কেওক্রাডং ওঠার পালা। আমার পায়ের ব্যথা তখনও কমেনি। শুধুমাত্র একটা পা আর লাঠির উপর ভর করে ৭০-৮০ ডিগ্রি ঢাল বেয়ে এক হাজার ফুট উপরে ওঠা যে কি অবর্ণনীয় কষ্ট তা যার অভিজ্ঞতা নেই তাকে বোঝানো যাবে না।

১৮ই এপ্রিল ১৯৯৮ তারিখ বিকাল ৩ টায় ২য় বারের মতো আমরা কেওক্রাডং সামিট করি। একই দিনে দার্জিলিং পাড়া থেকে এবং সুসাং পাড়া থেকে ২য় বার কেওক্রাডং ওঠাটা একটা বিরল অভিজ্ঞতা। আমরা মারুফ, রেজা, রিপন-প্রথম বারেই এই অভিজ্ঞতা নিলাম।

২য় বার কেওক্রাডং চূড়ায় উঠে কিছুক্ষণ চিল্লাচিল্লি করলাম (যদিও আমাদের সাফল্য দেখার জন্য গাইড শাহাবুদ্দিন ছাড়া আশেপাশে আর কেউ নেই)। এরপর জাতীয় পতাকা আর ব্যানার নিয়ে ছবি তুললাম। ঢাকা থেকেই ব্যানারটা তৈরি করে নিয়ে গিয়েছিলাম। আমাদের মনে তখন অন্যরকম অনুভূতি। কারণ স্থানীয় লোকজনের কাছে কাছেই আমরা জানতে পেরেছিলাম আমাদের আগে আর ৫টি অভিযাত্রী দল কেওক্রাডং ওঠার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। এর মধ্যে আদিত্য কবিরের দলও ছিল। তবে একথা ঠিক তাঁরা ব্যর্থ হয়েছিল বলেই আজকে আমরা সফল হয়েছি।


কেওক্রাডংয়ের চূড়ায়; বাম দিক থেকে গাইড শাহাবুদ্দিন, রিপন এবং আমি। তথ্য বিভ্রাট: সুনসংপাড়া আর্মি ক্যাম্প থেকে আমাদের জানানো হয়েছিলো কেওক্রাডং, বিজয় এবং তাজিংডং একই পাহাড়ের ভিন্ন ভিন্ন নাম। ফলে ভুলবশত ‘তাজিংডং’ লেখা ব্যানার নিয়ে ছবি তোলা হয়েছিল।


লাফালাফি, চিল্লা-চিল্লি আর ছবি তোলার পর আমাদের আর কোন কাজ নেই। কাজেই বিকাল সাড়ে ৩ টায় আমরা বগা লেকের উদ্দেশে রওনা দিলাম। ৪টা ১৫মিনিটে দার্জিলিং পাড়া থেকে আমাদের জিনিসপত্রগুলো (যেগুলো সকালে আমরা এখানে রেখে গিয়েছিলাম) নিয়ে নিলাম। বিকাল পৌনে ৫টায় দার্জিলিং পাড়া ত্যাগ করলাম। এবার ক্রমাগত নিচে নামতে হবে।

আবিষ্কার করলাম পাহাড়ে উঠার থেকে নামাটা অনেক কঠিন। পায়ের পেশিতে প্রচণ্ড চাপ পড়ে। যদিও নামার জন্য সময় কম লাগে। আধা ঘণ্টা পর একটা সরু পথ পেলাম। এর একদিকে কয়েকশো ফুট গভীর খাদ, আরেক দিকে জ্বলছে জুমের আগুন। আগুনের তাপে পথ চলাই দুরূহ। এরই মাঝে হঠাৎ দেখলাম রাস্তার উপর একটা বিরাটকার গাছ পড়ে আছে। পুরো গাছটাই আগুনে জ্বলছে।

আমাদের ৪ জনের দলটা একটু থেমে দম নিলাম। বাতাস ক্ষণে ক্ষণে দিক বদল করছে। আমাদের দিকে যখন বাতাস ঘুরে যাচ্ছে তখন প্রচণ্ড গরম অনুভব করছি। বাতাসের এই দিক বদলের জটিল হিসাব শেষ করে শাহাবুদ্দিন পথের কিনারা দিয়ে জ্বলন্ত গাছটা টপকে ওপারে চলে গেল। পিছে পিছে রেজাও পার হয়ে গেল।

এরপর আমার পালা। জ্বলন্ত গাছটার কাছ এসে হিসেব করছি আহত পা নিয়ে কিভাবে পার  হবো? শাহাবুদ্দিনের দেখানো পথে পা বাড়ালাম। জ্বলন্ত গাছটা যখন পার হচ্ছি ঠিক তখনই হাওয়া দিক বদল করে আমাদের দিকে বইতে শুরু করলো। প্রচণ্ড তাপে মনে হল কেউ গায়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। বাতাসের সঙ্গে আসা ধোঁয়ায় অন্ধ হয়ে গেলাম, নিশ্বাসও বন্ধ হওয়ার উপক্রম। পেছনে থেকে রিপন চিৎকার করলো, ‘মুভ, মারুফ, মুভ।’ রিপন কখন আমার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে বলতে পারব না। আমি তখন পায়ের ব্যথা ভুলে ভোঁ দৌড়। আমার পেছন পেছন আসতে গিয়ে রিপনের হাঁটুতে একটা জ্বলন্ত ডালের আঘাত লেগে কিছুটা ছিলে গেল।

গোটা ব্যাপারটা ঘটল মাত্র ৩-৪ সেকেন্ডের মধ্যে। এতো বড় বিপদ থেকে উদ্ধার পাবার পরও মনে হল-বিপদ ছাড়া কি আর এসব অভিযান সম্পূর্ণ হয়?


বগা লেকের স্থানীয়দের সাথে। বাম দিক থেকে রেজা, লারাম, রিপন, আমি এবং অন্যান্যরা।


এরপর আর কোন নতুন বিপদ না ঘটিয়েই সন্ধ্যা ছয়টা নাগাদ আমরা বগা লেক পৌঁছালাম। বগা লেক ১৯৯৮ সালে মাত্র ১০-১২ ঘর মানুষ নিয়ে নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করেছিল। তখন লেকের পাড়ে কোন ঘর-বাড়ি, আর্মি ক্যাম্প, কমলা বাজার এমনকি বগা লেকের নিচের মারমা পাড়াটাও ছিল না।

লেকের পানিতে হাত মুখ ধুয়ে নিলাম। এরই মধ্যে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। এরপর গেলাম বমদের গির্জায় প্রার্থনা দেখতে। এরই মধ্যে শাহাবুদ্দিন বগালেকের এক বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করে ফেলেছে। সেই বাড়িতে বসে রিপন তার চিকিৎসা পর্ব শুরু করল। সে কোন এক সময় রেডক্রসের সাথে জড়িত ছিল। সেই বিদ্যাটাই প্রয়োগ করল দুই পাহাড়ি যুবকের উপর। (এদের একজন ছিল বগালেকের বর্তমান বিখ্যাত গাইড লারাম বম- যে পরবর্তীতে আমাকে তার আপন ভাইয়ের আসনে বসিয়েছে)। আমাদের আর পাহাড়ি যুবকদের বিভিন্ন কাটা-ছেঁড়া ব্যান্ডেজ করার পর রিপনের কাজে মুদ্ধ হয়ে আমি আর রেজা ওকে হাক্তার (হাতুড়ে ডাক্তারের সংক্ষিপ্ত রূপ) উপাধিতে ভূষিত করলাম।

রাতের খাওয়া সারলাম পেঁপের তরকারি দিয়ে। বান্দরবান এসে এই প্রথম মশার দেখা পেলাম রাতে ঘুমাতে গিয়ে। তবে সারাদিনের ক্লান্তিতে যে গভীর ঘুম হল তাতে সামান্য কয়েকটা মশার অত্যাচার আমরা টের পেলাম না।

পরদিন ভোর ছয়টায় উঠে তাড়াতাড়ি বগা লেকের পাড়ে গিয়ে কয়েকটা ছবি তুললাম। যেহেতু সেদিনই আমাদের চট্টগ্রাম ফিরতে হবে তাই বগা লেকে আর দেরি করলাম না। তবে সেদিনের বগালেকে আমাদের তোলা সামান্য কয়েকটা ছবি এখন আমার কাছে মহামূল্যবান। বগালেকের বর্তমান চেহারা দেখে আমি নিজেই সেদিনের ছবিগুলো মিলাতে পারি না।

এরপর বগা লেক থেকে বিদায় নিয়ে প্রায় ১২০০ ফুট নেমে বগামুখ জলপ্রপাতে আসলাম। (এই জলপ্রপাতের অদ্ভুত অবস্থানের কারণে কখনই এর কোন সুন্দর ছবি তুলতে পারিনি) মনে হল স্বর্গ থেকে মর্তে নামলাম।


বগা লেকের পাড়ে (১৯শে এপ্রিল, ১৯৯৮)


রুমা খালের বর্ণনা যেহেতু আগেই দিয়েছি তাই এর বর্ণনায় আর যাব না। পথেও কোন উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেনি। বগালেক থেকে রওনা দেওয়ার প্রায় ৪ ঘণ্টা পর রুমা বাজার পৌঁছলাম। পৌঁছেই আর্মি ক্যাম্পের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করলাম। রেস্ট হাউজে গিয়ে আমাদের রেখে যাওয়া জিনিসপত্র গুছিয়ে আবার রুমা বাজারে আসলাম।

আর এখানেই আমাদের সুন্দর অভিযানের সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনাটা ঘটল। মাংস ব্যবসায়ী নাসির (যে আমাদের গাইড ঠিক করে দিয়েছিল) গাইড ভাড়া বাবদ ৫০০টাকা দাবি করে বসলো। অথচ আমরা রওনা দেওয়ার আগে বার বার নাসিরকে জিজ্ঞাস করেছিলাম গাইড শাহাবুদ্দিনকে কত দিতে হবে। সে তখন উত্তরটা এড়িয়ে গিয়েছিল। আমরা ইতিমধ্যেই শাহাবুদ্দিনকে জুতা, সানগ্লাস, তেল, মসলাসহ অনেক জিনিস উপহার হিসেবে দিয়েছিলাম। তাই আমরাও ভেবেছিলাম সে ১০০ টাকা দিলেই সন্তুষ্ট থাকবে।(তখন ঢাকা-বান্দরবান বাস ভাড়া ছিল ১১০-১২০ টাকা)। অনেকক্ষণ তর্ক করার পর তাকে ১৫০ টাকা দিয়েও সন্তুষ্ট করতে পারলাম না। অবশ্য তার দাবি ততক্ষণে ২০০ টাকায় নেমে এসেছে। কিন্তু আমাদের আর বাজেট ছিল না বিধায় শাহবুদ্দিনকে অসন্তুষ্ট রেখেই ফিরে আসতে হয়েছিল।

আজকে প্রায় ১৯ বছর পর যদি আমাদের প্রথম কেওক্রাডং সামিটের মূল্যায়ন করি তাহলে অনেক কথাই বলতে হয়। যেমন-

[১] সেসময় ট্রেকিং করা বা দিনের পর দিন পাহাড় বেয়ে কোথাও শখ করে বেড়াতে যাওয়ার চল বাংলাদেশে ছিল না। দেশের ভেতর বেড়ানোর কথা উঠলে সবার প্রথমে চলে আসতো কক্সবাজারের নাম। বড়জোর সুন্দরবন কিংবা সিলেটের জাফলং। প্রচলিত প্রথা ভেঙ্গে এমন একটি অভিযান বের হওয়াটা খুব দুরূহ ছিল। বন্ধু ও আত্মীয় মহলে আমরা পাগল-ছাগল শ্রেণিতে পরিণত হয়েছিলাম। আবার ভোরের কাগজে আমাদের অভিযান কাহিনী ছাপা হওয়ার পর তারাই আমাদের অভিনন্দন জানাতে ছুটে এসেছিল।

[২] ১৯৯৮-৯৯ সালে বা তার আগে বান্দরবনের দুর্গম এলাকাগুলোতে বছরের একটা সময় নীরব দুর্ভিক্ষ চলতো। উত্তরাঞ্চলে আমরা যেটাকে বলি মঙ্গা। এই মঙ্গাপিরীত লোকগুলোই এখন মোটরসাইকেল চালায়। ঢাকা, চট্টগ্রাম কিংবা বান্দরবানের নামী-দামি স্কুল-কলেজে পড়াশোনা করে পর্যটন এবং যোগাযোগ অবস্থার উন্নয়ন একটা গোটা জেলার সমাজ ও অর্থনীতিকে কিভাবে বদলে দিতে পারে তার বড় উদাহরণ এই বান্দরবান। আর এই পরিবর্তনের সাক্ষী আমি আমাদের প্রথম অভিযানের পর থেকে প্রতি বছর বান্দরবানের এই পরিবর্তন প্রত্যক্ষ্য করেছি। হ্যাঁ, এখন আমি বলতেই পারি এই পরিবর্তনের সূচনা আমাদের ত্রি-রত্নের হাত ধরেই হয়েছিল।

[৩] আমাদের আগে আরও ৫টি  অভিযাত্রী দল কেওক্রাডং ওঠার চেষ্টা করে সফল হতে পারেননি। এই তথ্যটা আমরা স্থানীয় লোকজনের মুখেই শুনেছি। আমাদের অভিযানের কাহিনী পত্রিকায় ছাপা হওয়ার পর তরুণ সমাজের কাছে এই বার্তাটা যায় আমাদের বাঙালিদের পক্ষেও পাহাড়ে উঠা সম্ভব। পাহাড়ে অভিযান করতে হলে এই আত্নবিশ্বাসটা খুব জরুরি।

[৪] ভোরের কাগজে আমি আমাদের অভিযান কাহিনী ও ছবি নিয়ে দেখা করি লেখক আনিসুল হকের সঙ্গে। তিনি ছিলেন ভোরের কাগজের ‘অবসর’ ম্যাগাজিনের সার্বিক দায়িত্বে। আমাদের অভিযান কাহিনী পড়ে ও ছবিগুলো দেখে তার প্রথম প্রশ্নই ছিল- আমরা কি সত্যিই তাজিংডং গিয়েছি নাকি সাধারণ কোন পাহাড়ের চূড়ায় ছবি তুলে সেটাকে তাজিংডং বলে চালিয়ে দিতে চাচ্ছি? আমি এধরনের প্রশ্নের জন্য তৈরিই ছিলাম। জবাবে বললাম, আপনি পাহাড়ের চূড়ায় স্থাপিত ফলকটার দিকে লক্ষ্য করুন। ওখানেই পাহাড়ের পরিচয় দেওয়া আছে। আরো নিশ্চিত হওয়ার জন্য আপনি বান্দরবান ক্যান্টনমেন্টের মাধ্যমে সুনসংপাড়া আর্মি ক্যাম্পে যোগাযোগ করতে পারেন। সেখানে আমরা গাইডসহ আমাদের নাম এন্ট্রি করেছি।

আমার বক্তব্যে সন্তুষ্ট হয়ে আনিসুল হক সাহেব আর কোন প্রশ্ন করলেন না। তিনি আনন্দ রনিকে ডেকে আমাদের অভিযান কাহিনী ছাপানোর ব্যবস্থা করতে বলেন।

১৯৯৮ সালে আমরা নিতান্তই অনভিজ্ঞ তরুণ ছিলাম। তারপরও একটা সফল অভিযান শেষ করে তার সমস্ত প্রমাণ এবং তথ্য উপাত্ত সংগ্রহে আমরা যথেষ্ট পরিপক্কতার পরিচয় দিয়েছি বলেই আমি মনে করি। কারণ আমাদের এসব তথ্য-উপাত্ত এবং পরামর্শ অন্যান্য নতুন অভিযাত্রীদের কাজ সহজ করে দিয়েছিল। (সমাপ্ত)



১৬ বছর পর (২০১৪) মারুফ-রেজা-রিপন


ছবি কৃতজ্ঞতা
লেখাটিতে প্রকাশিত সকল আলোকচিত্রসমূহ অভিযাত্রী দলটির সদস্যদের ব্যক্তিগত সংগ্রহ হতে গৃহীত।


(Visited 1 times, 1 visits today)
মারুফ বিন আলম
মারুফ বিন আলম
পেশায় একজন ব্যাংকার। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে জাতীয় টেলিভিশনে কুইজে অংশগ্রহণ করেন। একসময় ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য বিজ্ঞান বিষয়ে লিখেছেন, আয়োজনে অংশ নিয়েছেন নানা মজার সায়েন্স প্রজেক্টে। বিশ্বাস করেন, এমন কোন কিছুই করা উচিত নয়, যা প্রকৃতি আমাদের অনুমোদন করে না। ভালবাসেন ঘুরাঘুরি, খামাড়বাড়ি ও বৃক্ষরোপণ ।

৭ thoughts on “ফিরে দেখা: আমার প্রথম কেওক্রাডং অভিযান | পর্ব ৩

  1. মীর শামছুল আলম বাবু
    ২৮/০৩/২০১৭; ৮:৫২ এ
    তোমাদের অভিযানের পুরো গল্প সেই সময়েই বিস্তারিত শুনেছি – পত্রিকায়, তোমার বাসায়, আজিমপুরের পাঠচক্রে, ব্যক্তিগত আলাপে। তারপর আমরা আমাদের অভিযানের পরিকল্পনা সাজিয়েছিলাম সেই ১৯৯৯তে। তবুও মনে হল নতুন গল্প। চমৎকার লেখো তুমি মারুফ।

  2. আপনার লেখায় একটা মাদকতা আছে। লেখাটা অনেক বড় তবুও শেষ হয়ে যাবে এই ভয়ে অনেক আস্তে আস্তে পড়লাম। অনেকদিন পর দারুন একটা লেখা পড়লাম। আসলে ভ্রমন কাহিনী কখনো ছোট হতে পারে না বা হওয়া উচিৎ না।
    আমি কেওকাড়াডং গিয়েছিলাম ২০০৭ সালে। আপনার লেখা পড়ে কল্পনায় মিলিয়ে নিলাম ২০০৭ বনাম ১৯৯৮। অনেক অনেক ধন্যবাদ। ভালো থাকবেন।
    আমিও টুকটাক ভ্রমন কাহিনী লেখার চেস্টা করি আর প্রানপণ চেষ্টা করি লেখা ছোট করার… 😀
    নিচে কিছু লেখার লিঙ্ক দিলাম সময় নিয়ে পড়ে দেখবেন আর ভুলত্রুটি গুলো ধরিয়ে দেবেন…
    https://www.facebook.com/hashtag/talashshahnewaz?source=feed_text

  3. অসাধারণ লাগল মারুফ ভাই… পুরোটা পড়লাম একবারে, এত নিখুঁত সব বর্ণ্না। বর্তমানের সাথে তখনকার অবস্থা মিলিয়ে দেখতে বেশ ভালই লাগছিল।
    অভিনন্দন আপনাদের, আমাদের জন্য নতুন পথের সূচনা করে দিয়েছিলেন বলে।

  4. ভ্রমণ বৃত্তান্তটা খুবই ভালো লেগেছে, মারুফ ভাই।
    আমি প্রথম কেওক্রাডং যাই ২০১৩ সালে। আপনার লেখাগুলো পড়ে নিজেকে আপনার স্থানেই আবিস্কার করছিলাম।

    আলহামদুলিল্লাহ,
    আপনারা শুরুটা করেছিলেন বলেই আমরা আজ পাহাড়ে যেতে পারি। সহজ হয়েছে অনেক বিষয়, যা আগে কল্পনারও অতীত ছিল।

    আপনার দলের প্রতি কৃতজ্ঞতা অফুরান, ভাই।

মন্তব্য করুন

*Please Be Cool About Captcha. It's Fun! :)